বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৭

হৃদয়েরই নির্দেশে যে পথে একদিন গিয়েছি এগিয়ে
সেই পথেই নিহত হয়েছে আমার কোমল হৃদয়
আমি মারবো তাই, মরবো নিজেকেই কাউকে না জানিয়ে –
মনে কোনো দুর্বোধ্য অপরাধবোধ নিয়ে নয়
নয় কোনো রাগ ক্ষোভ কিমবা ঘৃণার জ্বালা বুকে নিয়ে,
হয়তো দলছুট কোনো উল্কার মতোন অকারণ অনুনয়ে
সময়ের পৌনঃপুনিক আবরুদ্ধ আবর্তনের মতো …
উদ্ধত সে হৃদয় আবার মৃত! ক্ষতবিক্ষত!
আমি জাগাবো আবার প্রাচীন সে হৃদয় – ভালোবেসে –
তাকে নিপূণ হাতে করবো হত্যা পুরোনো অভ্যাসে।

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৫

বাংলাদেশে বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হার
বাংলাদেশের ঠিক কত শতাংশ মানুষের একটা বাসা বা এ্যাপর্টমেন্টের মালিকানা আছে তার কোনো হিসাব ইন্টারনেট ঘেটে পেলাম না। আমাদের ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ এর যে সাইটটি (http://www.nha.gov.bd/) আছে সেখানেও এই ধরণের কোনো পরিসংখ্যান ০৫ মে ২০২০ এও নেই।

পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে গৃহ-মালিকানার শতকরা-হার কেমন সেটার কিছু পরিসংখ্যান সহজেই পাওয়া গেলো। কোনো কোনো দেশের তালিকা একেবারে হাল নাগাদ করা নেই যদিও।

বিভিন্ন দেশের বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হারের তালিকা (১)

house ownership rate-05.05.20.xlsx

তালিকা থেকে জানতে পারছি গৃহ-মালিকানার দিক থেকে সবার উপরে থাকা দেশটার নাম রোমেইনিয়া বা রুমানিয়া। সিঙ্গাপুর আছে তালিকার তিন নম্বরে। তাদের মোট জন-সংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগের বাস-গৃহের উপর মালিকানা আছে। তালিকাতে কিছু বিষয় উল্লেখ করা নেই। যেমন মালিকানার ধরণ কেমন। সিঙ্গাপুরের ৯১ ভাগ মানুষের কি এ্যাপার্টমেন্ট কেনার মতো টাকা আছে? একটা দেশের তো অন্তত ২০ ভাগ মানুষ থাকেই যাদের বয়স ২০ বছরের কম। তারাও কিভাবে গৃহের মালিক ব’নে যাচ্ছে তালিকার উপরের দিকে থাকা দেশগুলোতে? এর উত্তর আসলে পরিসংখ্যান নেওয়ার ধরণে। কোনো ব্যক্তির নামে যাদি একটি এ্যাপার্টমেন্ট থাকে তবে তার পরিবারের অন্য যে সকল সদস্য তার উপর নির্ভরশীল তারাও আসলে সেই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক। অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তির মতো। স্বামী-স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে সকলকেই এই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার মালিকানাটি কত বছরের জন্য সেটাও বিবেচনার বিষয়। হয়তো জমির মালিক সরকারই থাকছে। তবে এ্যাপার্টমেন্টটির মালিকানা অনেক ক্ষেত্রেই ৯৯ বছরের জন্য।

তালিকাতে দক্ষিণ-এশিয়ার কোনো দেশের নাম নেই। এটার একটা কারণ হ’তে পারে এই ব্যাপারে এই দেশগুলোতে পরিসংখ্যানের অভাব। তবে উইকিপিডিয়া ব’লছে ভারতে গৃহ-মালিকানার হার ২০১১ সালে ছিলো ৮৬.৬ শতাংশ। তাদের তালিকাতে ভারতের অবস্থান ১০ নম্বরে। আর চীনের অবস্থান ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ৫ নম্বরে। উইকিপিডিয়ার তালিকাটিও দেখে নেওয়া যাক।

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

২০১৬ সালের (৩) একটা গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে সে বছর বাংলাদেশে ২,৮০,০০০ (দুই লক্ষ আশি হাজার) মানুষ গৃহহীন ছিলো। অর্থাৎ এই লোকগুলো পথে-ঘাটে বা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটিয়েছে। এই তথ্য থেকেও ধারণা করা যায় না দেশের ঠিক কত ভাগ মানুষের গৃহের উপর মালিকানা আছে বা ঠিক কত ভাগ মানুষ বাসা ভাড়া ক’রে থাকে। ভাড়া ক’রে থাকা বাসাগুলোর গুণগত মান কেমন বা সেখানে বসবাসের ধরণ (লিভিং স্ট্যান্ডার্ড) কেমন সেটাও জানা যায় না; জানা যায় না মাথাপিছু কত বর্গফুট জায়গা বাংলাদেশের নাগরিকেরা গড় হিসেবে থাকার জন্য ব্যবহার করছেন।

১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ‘হাউজিং পলিসি’ তৈরীর ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিউ-ডি-জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলনে ‘পরিবেশ এবং উন্নয়ন’ প্রসঙ্গে আরো একটা ঘোষণা আসে। তার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে একটি জাতীয় গৃহায়ন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল হাউজিং পলিসি) অনুমোদন করা হয়। ১৯৯৯ সালে তাতে কিছু সংশোধনী আনা হয়। আর ২০১৬ সালে এটাকে পুর্নমূল্যায়ন করা হয়। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মোস্তফা সুরাইয়া আক্তার এবং আশরাফি বিনতে আকরাম তালিকাবদ্ধ করেছেন নিচের মতো ক’রে : (৪)

Bangladesh national housing pollicy key points.xlsx

এখান থেকেও ধারণা করা যায় না যে বাসা বা বাসস্থানের মালিকানা নিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবনা কী রকম। যদিও আমাদের দেশের সংবিধানের ১৫ তম অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ তে ‘মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা’ প্রসঙ্গে বলা আছে যে – (৫)

১৫৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার৷

অর্থাৎ সাংবিধানিক ভাবে নাগরিকদের বাস-গৃহের মালিকানা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নেই। রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলার চেষ্টা করবে যেখানে নাগরিকদের জন্য আশ্রয় বা বাস-গৃহের সংস্থান হয়। সেই সংস্থান মালিকানা-নির্ভর হবে না ভাড়া-নির্ভর হবে সেই ধরণের প্রস্তাবণা আসলে সংবিধানের কাজও নয়। সেটা হাউজিং পলিসির কাজ। জাতীয় হাউজিং পলিসি এই ব্যাপারে খুব ভেবেছে ব’লে মনে হয় না। হয়তো তার পেছনে দেশের অর্থনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। কারণ সম্পদের মালিকানার উপরে খুব বেশি ট্যাক্স বা কর ধার্য করা যায় না, যতটা যায় দেনদেনের উপর। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের বাৎসরিক খাজনার পারিমাণ আর এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া থেকে আয়ের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্সের অনুপাত হিসাব করলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হবে।

উপরের দেশ-ভিত্তিক বাসগৃহের মালিকানার দুইটি তালিকা দেখে আমরা বুঝতে পারি যে বাস-গৃহের মালিকানার হারের সাথে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক তেমন একটা নেই। বাজার-অর্থনীতি কিমবা সমাজতান্ত্রিক-অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকদের জন্য বাসগৃহের মালিকানার ব্যবস্থা করা যায় যদি ‘হাউজিং পলিসি’ তে সেটা চাওয়া হয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা।

যদিও ঐতিহ্যগত ভাবে দেখা যায় বাংলাদেশে ভূমি-হীনের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার আনুপাতে বেশ বেশি। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের আগে জমির মালিকানা মূলত জমিদারের হাতেই ছিলো। রায়ত বা চাষীরা যেসব জমিতে থাকতো বা চাষ করতো তার মালিক তারা ছিলো না। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের পর থেকে জমিদারেরা চাইলেই যে কোনো রায়তকে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতো না, যেটা কিনা তার আগে পারতো। এবং হরহামেশাই তারা সেটা করতো। ফলে বিলেতিদের চাপিয়ে দেওয়া আইনি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে সবসময়ই গৃহহীনের সংখ্যা কম ছিলো না। আবার গৃহহীন এই মানুষগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখার একটা ব্যবস্থা বা সিস্টেম হয়তো দাড় করিয়ে ফেলেছে। যার কারনে এটা নিয়ে সমাজে বা রাষ্ট্রে বিশেষ আন্দোলনও নেই। আর আন্দোলন নেই ব’লেই আমাদের হাউজিং পলিসিতে এটা নিয়ে কোনো টু-শব্দটি নেই। যদিও বাস-গৃহের গুণগত মান বৃদ্ধির তাগিদ আছে। কিন্তু সেটা হয়তো শুধু শহুরে এলাকার জন্য। দেশের দক্ষিণের বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটা নিরাপদ আবাসন কি ভাবে এবং কত বছরে গ’ড়ে তোলা যায় তার কোনো দিক-নির্দেশনা সেখানে নেই। আবাসনের নিরাপত্তার সাথে যে  গৃহ-মালিকানার সম্পর্ক আছে সেটাকে পুরোপুরিই অবহেলা ক’রে যাওয়া হয়েছে।

এই অবহেলার পরিণাম হয়তো টের পাওয়া যাবে বিশেষ কোনো সংকটের সময়ে। এই যেমন ২০২০ এর কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেকেই বাস-গৃহে আটকে আছে প্রায় দেড় মাস ধ’রে। আরো বেশ কিছু দিন যে আটকে থকতে হবে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। অনেকেই বাসা-ভাড়ার টাকাটা যোগাড় করতে পারছেন না। পৃথিবীর নানা দেশে বাড়ি-ভাড়ার টাকা মৌকুফের কথা জানতে পারছি। কোনো কোনো দেশ এই সময়ে বাসা-ভাড়া দেওয়ার জন্য বিনা-সুদে ঋণ দিচ্ছে তার নাগরিকদেরকে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষের যদি নিজের বাস-গৃহের উপর মালিকানা থাকতো তবে এই ধরণের বড় অর্থনৈতিক সংকট হয়তো এড়ানো যেতো।

লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক ক’রে বলেছিলেন, ‘if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation.’ জানামতে বাংলাদেশে কখনো আবাসনের চাহিদা নিয়ে অশান্তি বা আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তার পেছনে হয়তো আমাদের পুরোনো ইতিহাসের বেশ খানিকটা ভূমিকা আছে। বাস-গৃহের মালিকানা যে একটা চাহিদা হ’তে পারে সেটা কখনোই আমাদের জনসাধারণের মনে কিমবা মননে আসেনি, এমনকি কর্বুজিয়েরও মালিকানার কথা বলেননি, ব’লেছেন পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থার কথা শুধু। আমাদের অর্থনীতি এখনো এতটা পোক্ত জমিনের উপর দাড়াতে পারেনি যে তা আমাদেরকে একটা মান-সম্মত ও স্থায়ী (স্ট্যান্ডার্ড) গৃহের নিশ্চয়তা দিতে পারে; সে মালিকানা-ভিত্তিক বা ভাড়া-ভিত্তিক যেটাই হোক না কেন। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের নিবন্ধনের জন্য যে ট্যাক্সটা সরকারকে দিতে হয় সেটা থেকে পরিস্কার বোঝা যায় যে, আমাদের অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলো কয়েক দশক ধ’রেই মনে ক’রে এসেছেন যে বাস-গৃহের মালিকানা একটি লাগজারি বিষয়, এটি কোনো মৌলিক প্রয়োজন নয়।

কিন্তু ভবিষ্যতেও কি এমনই চলতে থাকবে? কাজী খালিদ আশরাফ, সাইফুল হক, মাসুদুল ইসলাম সাম্য, রুবাইয়া নাসরিন, ফারহাত আফজাল, হাসান এম রাকিব আর মারিয়া কিপ্তি মিলে এ ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা তুলে ধরেছেন ইংরেজি দৈনিক দ্যডেইলিস্টারে গত বছরের শুরুর দিকে । ‘দ্যা ফিউচার অব হাউজিং ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে।(৬) এখানেও বাসগৃহের মালিকানার বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সূত্র:
(১) – https://tradingeconomics.com/country-list/home-ownership-rate

(২) – https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_by_home_ownership_rate

(৩) – Molla, M. A.-M. (2016). PM: 280,000 homeless people in the country.Dhaka : Dhaka Tribune .Statistics and Informatics Division (SID). (2014). Census of Slum Areas and FloatingPopulation 2014. Dhaka: Bangladesh Bureau of Statistics( BBS)

(৪) 283-286

(৫) http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-957/section-29367.html

(৬)- https://www.thedailystar.net/supplements/28th-anniversary-supplements/avoiding-urban-nightmare-time-get-planning-right/news/the-future-housing-bangladesh-1704259
The future of housing in Bangladesh _ The Daily Star_KKA

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৬

কে যেন দুর্বোধ্য ভাষায় কথা ব’লে চলে
মনের কোনো গভীর অতলে,
কে গো তুমি মেয়ে?
কেন মাঝে মাঝে ওঠো গেয়ে
গুনগুনিয়ে বাতাসের তালে !
কেন ভিজিয়েছো বুক লোনা জলে
গোধুলীর আঁধারে লুকিয়ে নিজেকে একা-
তাতে কি মুছে যায় ব্যথা?

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৫

আমাদের যেসব দিন গিয়েছে চ’লে
তার কিছু রেশ হয়তো থাকবে পড়ে সময়ের কুলে,
তবুও মানুষের জীবন দীর্ঘ –
নিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া নক্ষত্রের ধুলিকণার অর্ঘ্য
গ’ড়ে উঠবে কাঙ্ক্ষিত নতুন সঞ্চয়
আসবে নতুন জোয়ার আমাদের পুরাতন ভাবনায়
তার গতিমুখে হয়তো থাকবে লক্ষ পদধ্বনির ডাক
আবারও সকলে হবো অজানা পথের পথিক,
অনিশ্চয়তাকেই শুধু নিশ্চিত ব’লে জেনে
পথের নতুন সাথীকে সেদিনও নেবো চিনে …
একদিন জানি সেও যাবে চ’লে, হারিয়ে
পৃথিবীর জল হাওয়াদের মতো দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।

যাপিত জীবন – ৩৬

অনেকের মতো আমিও নানা ধরণের সমাবেশ নিয়ে চিন্তিত এখন। চার/পাঁচ দিন পরপর একবারের জন্য হ’লেও আমাকে বাজারে যেতে হচ্ছে। সেখানে যতটা ভীড় দেখছি সেটা চিন্তা বাড়াচ্ছেই। বাসার কাছের সুপার মলে যাচ্ছি সেখানেও খুব একটা আলাদা কিছু দেখছি না। সেখানেও অনেক মানুষ।

আমাদের দেশটাই আসলে এমন। আমাদের সব জায়গাতেই মানুষের ভীড় বেশি। সেটা শুধু রাস্তাঘাট, হাসপাতাল কিমবা বাইরের কোনো জায়গাতে তা নয়। বাড়িতেও ভীড় কি কম? আমাদের কত শতাংশ বাসাতে প্রতিটা মানুষের জন্য একটা ক’রে ঘর আছে? ধারণা করি সেটা ২০ শতাংশের বেশি নয়। আমার ধারণা সঠিক তথ্যের কাছাকাছি নাও হ’তে পারে। কিন্তু অনেক বসাতেই যে ৫/৬ ফুট দূরত্ব মেনে মানুষ বাস করারই সুযোগ নেই সেটা বাস্তবতা। ২০১৩/১৪ এর দিকে সম্ভবত ডেইলিস্টারে একটা ফিচার দেখেছিলাম, যেটাতে বলা ছিলো যে একটা ১২০ বর্গফুটের মতো ঘরে ১৩ জন গার্মেন্টসকর্মী থাকেন।

পরিবারের একজন মানুষকে যদি মাঝে মাঝে বাইরে বের হ’তেই হয় (বাজার, ওষুধ কেনা এসব কাজে) তখন তার করোনা-ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। তার মাধ্যমে ছড়াতে পারে পরিবারের অন্যদের ভেতরে। কারণ সাধারণ হিসাবে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার সুযোগই আমাদের দেশের অনেকের নেই। এই অবস্থায় শুধু সাধারণ ছুটি আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ হয়তো পুরোপুরি কাজে দেবে না। আমাদের এটা নিয়ে আরো কিছু বিকল্প ভাবা দরকার।

জানতে পারলাম সুইডেন লকডাউন করেনি তার শহরগুলো। এমনকি রেস্তোরা, স্কুলও বন্ধ করেনি। কেউ কেউ বলছে বিলেতও শুরুতে এমনই আচরণ করেছিল। তার পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। সুইডেনের সামনেও সেটাই অপেক্ষা করছে। আবার হয়তো করছে না। কারণ সুইডেনের লোকজন রাস্তাতে থাকলেও সেখানে দূরত্ব মানছে। কাজের জন্য বের হচ্ছে। বিনোদনের জন্য নয়। আর সরকারী নির্দেশনা মানছে। ওদের সরকার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের বোঝাপড়া আছে। আমাদের এখানে সেটা যে ততটা নয় সেটাও বাস্তবতা। আবার চিকিৎসা ব্যবস্থা আর অর্থনীতিও একটা বড়সড় পার্থক্য গড়ে দেয়। লোক সংখ্যার ঘনত্ব তো বটেই। ওদের লোকসংখ্যার ঘনত্ব আমাদের থেকে অনেক অনেক কম।

আমার ভেতরে যে ইনট্যুশন কাজ করছে তা বলছে, দেশে যে ভাবে সাধারণ ছুটি চলছে তাতে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়তো যাবে না। আমি নিজেও তো এই দেশেরই লোক। এভাবে হয়তো কেউ ১০ দিন চলতে পারবে। কেউ হয়তো দুই মাস। কিন্তু ৪/৫ মাস চ’লতে পারবে ব’লে মনে হয় না। আমাদের আরো কিছু করা দরকার। জানি না তা কী? তবে আমরা যতটা করছি তা এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়… বিশেষ ক’রে বাংলাদেশে… বিশেষ ক’রে আমাদের বর্তমান বাস্তবতায়…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৪

তার মন ছিলো ঠিক যেন
এক বহতা নদীর মতো কুহকী
নদীর জলের মতোই তার সাগরমুখী
নিত্য সন্তরণ
সন্তরণেই সুখ শুধু যার
কিমবা দুকুল ছাপানো প্লাবণ ভরা-বর্ষার
যেন ভেঙেচুরে নতুন ক’রে তোলা
নিজেকেই প্রতিবেলা
হয়তো খানিকটা অচেনাও ক’রে তোলা
সেই অচেনার সাথেই নতুন প্রেম
হৃদয়ে অজানা বিপুল কম্পন
তার সেই গড়ার খেলা
ভাঙার দোলা
ভালোবাসতে বাসতে কবে যে
ভুলতে বসলাম তারে
পড়ে না মনে আজকে
শুধু মনে পড়ে লোনা জলে ডুবিয়ে যুগল পা
তারে পাশে রেখেও একলা
শুনতে চেয়েছি বহুদূরের মাছেদের গান
জানিনি কেন
সেই গানে ছিলো শুধু ভাঙনের সুর
কিবা সকাল কিবা দুপুর …

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৩

ঘর ছেড়ে কখনো কখনো বারান্দায় গিয়ে বসি
আবার ফিরেও আসি –
সেই সাথে ফিরে আসে মনের অস্থিরতাও
পারিনা ব’লতে নিজেকেও –
এই দুঃসময় কেটে যাবে একদিন,
ধৈর্য ধরো রাজীব আর একটুক্ষণ;
অথচ এই কথাগুলোই ব’লতে চাই তোমাকে,
ব’লতে চাই- জানো কী হয়েছে আজকে !
রাস্তার ঐ পাড়ের গাছটাতে বাসা বেধেছে এক জোড়া পাখি,
কেমন বোকা দেখো, যদি ওঠে হাঠাৎ কালবৈশাখী!
ওদের বাসাটা উড়ে যাবে না ঝড়ে?
বলো এমন সময় কেউ এমনটা করে!
কিন্তু তোমাকেও হয়না বলা কিছুই আর…
আমাদের এই বুড়ো নির্দয় পৃথিবীর উপর
বারবার ফিরে আসে ভ্রষ্ট অতীত –
হাসপাতালের মর্গ ভরে ওঠে অনাকাঙ্ক্ষীত
মৃত মানুষের ক্ষতবিক্ষত লাশের স্তুপে প্রতিদিন,
একটু একটু ক’রে বিস্তৃত হয় কবরস্থান…
মনে হ’তে থাকে আমিও যেন ঐ দিকেই আগাচ্ছি
প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছি –
পেরিয়ে যাচ্ছি তাদের ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ রেখা,
আমার জন্য অপেক্ষায় আছে ভেজা-ভেজা মাটিতে থাকা
কত না কীট, পোকামাকড় আর অনুজীবের দল-
ওদেরও আছে সংসার, জীবনের জটিল
কোনো না-মেলা হিসাব-নিকাস।
আমাদের আজকের এই দীর্ঘ অবরুদ্ধ আবাস
হয়তো সে সবের কিছুই জানবে না।
যেমনটা তুমি জানো না –
কেমন আছি আমি;
কিমবা যেমনটা আমারও অজানা কেমন আছো তুমি।
সব দুঃসময় কি কখনো ঠিক হয় – হ’তে পারে?
ফেরা কি যায় সব সময় আকাঙ্ক্ষার কৈবর্ত নগরে !
সব কিছু ছেড়ে তার হৃদয়ের কাছে যেতে পারে কয় জনা !
বারান্দায় যাওয়ার দরজাটাও যেন বড্ড অচেনা…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১২

ঠিক যখন মনে হ’য়েছিলো বন্ধুকে আর প্রয়োজন নেই তোমার
মনে হ’য়েছিলো তুমি আছো বেশ বাকিদের নিয়ে-
আমি ভেবে নিয়েছিলাম, আমাকেও থাকতে হবে ভালো,
জীবনের প্রতিটা অণুর সাথে নিজেকে নিতে হবে মিলিয়ে,
তখনই আমাকে এলোমেলো ক’রে দিয়ে এলো তোমার ক্ষুদেবার্তা-
কিছু একটা নিয়ে আমাকে জানিয়েছো শুভেচ্ছা।
যেহেতু ক্ষুদেবার্তা তাই হয়তো জানাওনি কেমন আছো তুমি,
কিমবা কোন‌্ শহরে এখন কাটছে তোমার দিন-রাত্রী,
কেন এসেছে মনে হঠাৎ শুভেচ্ছার ভাষা,
যেই ভাষা আমাদেরকে ছেড়ে গেছে কত না যুগ আগে !
বন্ধু, তুমি কি তবে ভালো নেই এই সময়?
তোমার কি আবারো নিঃসঙ্গ হৃদয়?

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১১

তার হৃদয়ে সে রাতে জেগেছিলো কোন্ ব্যথা ?
বুকে ভেসে ওঠা কোন্ সে জমাট অভিমান নিয়েছিলো টেনে,
দূরে – তারে –
যতটা দূরে গেলে পর আর যায় না ফেরানো কাউকে
ততটা দূরত্ব জানে কতটা পরিযায়ী মন?
যে নদীর শীতল জল ছুঁয়েছিলো গভীর অতল
তার পরতে পরতে সঞ্চিত বিপুল ভার
জানি হঠাৎ একদিন তুলবে প্রলঙ্কর ঝড় –
হয়তো কোনো এক বিলিয়মান আগ্নেয় দ্বীপের বাতাসে…
সেখানেও প্রকৃতি আর প্রাণের নিয়ত আশ্রয়
যদিও ক্ষয়, যদিও মৃত্যু তবুও ধূসর স্মৃতি,
আর প্রতিশ্রুতির অনিবার্য পরাজয় জেনেও নতুন প্রতিশ্রুতি।
কোন্ সে বিকেলের একচিলতে আকাশ
আবার ছেড়া-ছেড়া মেঘ এনে ঢেকে দেবে গোধুলী?
মনে করাবে সে রাতের গভীর তন্দ্রা,
আর ব্যথা-ভুক এক প্রেয়সীর মুখ-
কোন্ সে কল্প-মানবী এতটা কাছাকাছি, এতটা ব্যথাতুর?
যদি জানা যেতো কোনো দিন!
যদি ভাটার সাথে ভেসে গিয়ে দুইজনা মানুষ
পৌঁছে যাওয়া যেতো কোনো এক নিরালা দ্বীপে
সেখানেও যাবে কি পৌঁছে পুরোনো স্মৃতির পীড়ন?
অভিমানের খেয়া চেনাবে শুধু বিচ্ছিন্ন বিপরীত পাড়?
অনাদি কালের মতো আবার – আবার !

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১০

আমাদের যাত্রাপথে স্বপ্ন ছিলো – স্বপ্নভঙ্গ ছিলো –
ছিলো আনন্দ, ছিলো বেদনার ঐকান্তিক কাকলি
তুমি ব’লেছিলে তুমি আসবে, সে কথার অন্যথা হয়নি
আমি বলেছিলাম আমরা একসাথে যাবো ভবিষ্যতে
যেখানে হৃদয়ের সমস্ত উষ্ঞতারা সুখে করবে বাস।
পরষ্পরের হৃৎস্পন্দনের প্রতিটা কম্পন বলেছিলো চুপে-
পরস্পরকে – খুব গোপনে – একান্ত আপন জেনে-
ছুঁয়ে দেখো, অনুভব ক’রে দেখো ভালোবাসার মায়া।
যত গভীর সে ভালোবাসা ততটাই পলকা যেন তা,
আর তাইতেই ঝড়ো বর্তমান নিয়ে ছিলো তার যত ভয়
এই বুঝি উবে যায় – ভেঙে যায় – ঝরে যায় – ক্ষয়ে যায়!
আমাদের আনন্দে জীবন ছিলো – জীবনযাপন ছিলো;
সেখানে বিচ্ছেদ ছিলো, ছিলো ফিরে-আসা বারংবার।