কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ৩০

মনে হয় তুমি আছো,
ডাক দিলেই এসে জড়িয়ে ধ’রবে আমাকে
কিংবা হয়তো গলা উচিয়ে ব’লবে শুধু-
‘কী গো!’
আমার মনে হবে সময় স্থির,
আমার ইচ্ছে হবে তোমার জন্য ফুল তুলে আনি
যে ফুল শুধু তোমাকে দেবো ব’লে চাষ করেছিলাম
আজ সেই ফুল ভাসিয়ে দেই্ বৃষ্টির জলে-
বুঝি তুমি নেই কোনো খানে
যে কথা শুধু তোমাকে ব’লবো ব’লে ভেবেছিলাম
তার কিছু লিখে রাখি হেয়ালি মাখিয়ে
হয়তো আর কারো কাজে লাগবে কখনো
কিংবা হয়তো লাগবে না-
এও সেই সব অপচয়িত মুহূর্তগুলোর মতো
নিষ্ফলা হ’য়ে হারিয়ে যাবে অতীতে!
ভাবি তোমাকে একটা চিঠি লিখবো
তারপর ঠিকানা না লিখেই ফেলে আসবো ডাকে
আমার কথাগুলো খুঁজে পাবে না তোমাকে
জানি তুমি যে নেই-
কেউ থাকে না কারো জন্য অনন্তকাল!

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৯

প্রত্যাখ্যানের ভয়ানক চিৎকার
ফিরে আসে বারবার-
স্মৃতির ভাঙাচোরা দুয়ারে,
মাথা কুটে মরে
মিথ্যে প্রতিশ্রুতির বাণী-
জমে ওঠে গ্লানি
হৃদয়ের তলদেশে
অভিমানের আবেশে।
গল্পরা হ’য়ে ওঠে প্রেত
করে ভয়াবহ উৎপাত…
শাদা বেলিফুল
এলো খোলাচুল
চুলের গন্ধে স্মৃতির জট
আঁচল জুড়ে মুগ্ধ পট
ঠোঁটের কোণে কুহকী হাসি
লুকিয়ে বলা ‘ভালোবাসি’
ফিসফিসিয়ে কানের কাছে…
বহু কাল ফেলে পিছে
কোথায় যেন বারবার
বেজে ওঠে হাহাকার…
সময়ের কবাট
অত্যাচারী উৎকট,
ফুলের গন্ধ
জাগিয়ে তোলে কবন্ধ-
কেন?
কোন পুরাতন প্রত্যাখ্যান
আজ করে প্রত্যাঘাত?
অকস্মাৎ!

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৮

যে পথ এতদিন চিনিয়ে দিয়েছে গন্তব্য
তাই যেন আজ গোলক ধাঁধার কাব্য
তোমার কাছে, আমার কাছে…
যে বোধ নিয়ত ভুলিয়েছে অনুপস্থিত সঙ্গ
সেই আজ রাতদুপুরে করে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ
তোমাকে নিয়ে, আমাকে নিয়ে…
যে শহর দিয়েছিলো আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি
সেও কাঁটে সিধ যখন নিশ্চুপ নিষুতি
কোনোখানে আমাদের নেই নিরাপদ গৃহ
অন্ধকারেই কেঁদে চলে নিঃসঙ্গ বিগ্রহ…

উপন্যাস

একটি শহুরে গল্প -১৮

  • ‘রাশেদ জামান স্পিকিং’
  • ‘জ্বি, স্ল্যামালিকুম। আমার নাম রিমি। আমি ঢাকা থেকে বলছি। আপনি বোধহয় আমার মাকে চিনবেন।’
  • ‘কেয়া?’
  • ‘হ্যাঁ। আমার নাম আপনার মনে আছে!’
  • ‘আনফর্চুনেটলি আই এ্যাম গুড উইথ রিমেম্বারিং থিংস। যা হোক, তুমি কেমন আছো। তোমার মা কেমন আছেন?’ ফোনের ওপাশ থেকে জানতে চায় রাশেদ জামান।
  • ‘মা মারা গেছেন সতের মাস হ’লো।’ ব’লে রিমি একটু বিরতি নেয়। রাশেদ জামানও কিছু বলে না। হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ফোনের এপাশ থেকে রিমি ঠিক নিশ্চিত হ’তে পারে না। ‘আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। সে জন্যই গত কয়েক মাস ধরে আপনাকে খুঁজছি।’
  • ‘আমি কিছুদিন বাসায় ছিলাম না। সামারের ছুটি কাটাতে কয়েকটা জায়গাতে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এই সপ্তাহেই ফিরেছি। তুমি কেমন আছো ব’ললে না!’
  • ‘আমি ভালো আছি। আমার প্রশ্নটা মাকে নিয়ে। আপনাদেরকে নিয়ে।’
  • ‘ঠিক বুঝিনি। আপনাদেরকে নিয়ে ব’লতে কি বোঝাচ্ছো?’
  • ‘মা মারা যাওয়ার পর মায়ের চিঠির সংগ্রহে আপনার তিনটা চিঠি পেয়েছি আমি।’
  • ‘ও তাই বলো। কেয়াদের বাসা আমাদের বাসার পাশেই ছিলো, রাজশাহীতে। তো আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ওকে মাঝেমাঝে চিঠি লিখতাম। ও কখনো কখনো উত্তর দিতো। তোমার তো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বয়স হয়েছে। এই বয়সের উত্তেজনা তুমি নিশ্চয় বুঝবে।’
  • ‘চিঠিগুলো ঐ সময়ের নয়। আরো পরের। আশির পরের।’
  • ‘তুমি ঠিক কি জানতে চাও বলো তো? কোন চিঠিগুলো তোমার হাতে আছে তা তো জানি না। তাই বুঝতে পারছি না।’
  • ‘আমি কি আপনার মেয়ে?’ রিমি সরাসরিই প্রশ্নটা করে।
  • ‘না। তবে একটা সময় পর্যন্ত আমার সন্দেহ ছিলো, এটা স্বীকার করতে পারি। হয়তো কেয়ারও ছিলো। তবে তোমার বয়স তিন পেরিয়ে গেলে কেয়ার সে সন্দেহ কেটে যায়। কেয়া আমাকে বলেছিলো তোমার সাথে তোমার বাবার চেহারার অনেক মিল।’
  • ‘থ্যাংক য়ু, সরাসরি উত্তর দেওয়ার জন্য। আর একটা প্রশ্ন করি আপনাকে?’
  • ‘শিওর।’
  • ‘আপনি দেশ ছেড়েছিলেন কেন?’
  • ‘কারণটা আমি কাউকে ব’লতে চাই না। কখনো বলিও নাই কাউকে। তবে তোমার মা জানতো। আমাকে অন্য কোনো প্রশ্ন করো, আমি উত্তর দেবো।’
  • ‘কিন্তু আপনি যে আমাকে সত্যি বলেছেন তা আমি কিভাবে নিশ্চিত হবো? তারউপর আপনি আবার কিছু কথা এড়িয়েও যাচ্ছেন।’
  • ‘আমার দেশ ছাড়ার সাথে তোমার মায়ের কোনো সম্পর্ক নেই, এটা তোমাকে বলতে পারি। যদিও আই লাভড হার … এ্যান্ড য়ু এ্যাজওয়েল…’
  • ‘হোয়াই মি?’
  • ‘ঐ যে সন্দেহের কথা বললাম তার জন্য হয়তো। যা হোক তুমি তোমার বাবার সাথে তোমার চেহারা মিলিয়ে দেখো। আমার মনে হয় না সন্দেহের কোনো কারণ আছে।’
  • ‘আচ্ছা রাখি তাহলে। আমার যা জানার তা জানা হ’য়ে গেছে।’
  • ‘দাড়াও। এখন আর এগুলো লুকিয়ে কি হবে! তোমার মাকে যখন জানিয়েছিলাম তোমাকেও বলি।’ রিমি ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখে না, শুনতে থাকে। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের ছাত্র। আমাদের বাসায় মুসলিম লীগের রাজনীতির প্রভাব ছিলো। তোমার নানাবাড়িতেও ছিলো। তো যুদ্ধের এক পর্যায়ে আমি আল-বদরে যোগ দিই। যুদ্ধ শেষ হ’লে আমার পালানো ছাড়া উপায় ছিলো না। দেশে মাস্টার্সটা আর শেষ করা হয়নি। দুই বছর দেশের নানা জায়গায় লুকিয়ে থেকেছি। তারপর ভারত ঘুরে অস্ট্রেলিয়া চলে আসতে পেরেছিলাম। তা না হ’লে হয়তো মারা পড়তাম, হয়তো তোমার মায়ের সাথেই আমার বিয়ে হ’তো। ’৭৭ এ অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেনশিপ পেলে দেশে ঘুরতে গিয়েছিলাম। তখন আবার তোমার মায়ের সাথে দেখা হয়। সে সময় তোমার বাবা ঢাকাতে কম থাকতেন। সেই সুযোগে আমাদের খানিকটা ঘনিষ্ঠতা হয় আবার। তবে দুই মাস পরই আমাকে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরতে হয়। পরে রাজশাহীতে একটা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তার জন্য ঐ সময়ে অনেকবার দেশে যাতায়াত করেছি। দেশে ফেরার চেষ্টাও ব’লতে পারো। তবে সেটাতে সাক্সেসফুল হ’তে পারিনি। তার উপর আমার তখনকার ওয়াইফ একজন অস্ট্রেলিয়ান। সব মিলিয়ে এখানেই সেটেল করতে হয়েছে আমাকে। তোমার মাও আর সব কিছু ছেড়ে এখানে আসতে চাননি। ’৮৮ এর পর আমাদের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ১৪ বছর পর তোমার মায়ের কথা শুনলাম। জানলাম কেয়া মারা গেছে।’ টানা ব’লে রাশেদ জামান থামেন। রিমিও চুপচাপ। ‘কি হয়েছিলো কেয়ার?’
  • ‘লুইকেইমিয়া।’
  • ‘ও… আচ্ছা, তুমি ভালো থেকো।’ রাশেদ জামান ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখে। রিমিও।

কয়েকদিন পর রিমির মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চয় সব ছাত্র-শিক্ষকের বিষয়ে কোনো না কোনো ডেটাবেজ থাকে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কোনো একটা সাক্ষাৎকারে এমনটা পড়েছিলো রিমি। রিমি রেজিস্টার অফিসে একটু খোঁজ নেবে ব’লে ঠিক করে।

এত পুরাতন ফাইল বের করতে গত ছয় মাসে রিমিকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে রাশেদ জামানের ফাইল থেকে আল-বদর সম্পর্কিত কোনো কিছু জানা যায় না। বরাবরই খুব ভালো ছাত্র ছিলো এটা জানা যায়। রিমি রেজিস্টার অফিসের পিওনকে ২০০ টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে এসে অনেক দিন পর আবিরের কথা মনে পড়ে রিমির। অথচ আবিরের সাথে এখন আর যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। রিমির মনে হ’তে থাকে, সেদিন আবিরকে অমন শক্ত একটা চিঠি না দিলেও পারতো রিমি।

  • ‘তুই এই দিকে!’ রিমিকে চমকে দিয়ে মাইকেল এগিয়ে আসে। 
  • ‘এমনিই, ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি। তুই কোথায় যাস?’
  • ‘আমারো ঠিক নেই। এলোমেলো ঘুরছি বলতে পারিস। তবে ক্ষুধা লেগে গেছে। তেহারী খাবো না ভাত খাবো বুঝতেছি না।’
  • ‘আমারও ক্ষুধা লেগেছে। চল নীলক্ষেতের তেহারী খেয়ে আসি। ঐ দিকটাতে একটু ঘোরাও হবে।’ মাইকেল রাজি হ’য়ে যায়। একটু আগাতেই একটা রিকশাও পেয়ে যায় ওরা।‘এত কম টাকায় এরা এমন তেহারী যে কিভাবে দেয়!’
  • ‘এটা একটা সিক্রেট। যদিও লোকে বলে এটা আসলে কুত্তার মাংস, তাই সস্তায় দিতে পারে।’ মাইকেল বলতে বলতে আর খেতে খেতে হাসতে থাকে।
  • ‘ধুর! কি যে বলিস! প্রতিদিন এত কুকুর পাবে কোথায়!’
  • ‘কেরানীগঞ্জ থেকে ধরে আনে।’
  • ‘কি যে সব যা তা বলিস, তাও খাওয়ার সময়। খা তো। আর আমাকে একটু লেবু দিতে বল।’
  • ‘শুধু লেবু? নাকি আর হাফ নিবি?’
  • ‘না, শুধু লেবু।’
  • ‘এই মামা এই দিকে লেবু দিয়ো তো।’ মেসিয়ার মাইকেলের কথা শুনলো কি শুনলো না বোঝা না গেলেও কিছুক্ষণ পর একটা ১৪/১৫ বছরের ছেলে ওদেরকে ছোট একটা প্লেটে করে তিন পিস লেবু আর কয়েকটা কাঁচা মরিচ দিয়ে যায়। ‘আর কিছু দিমু মামা?’
  • ‘না, আর কিছু লাগবে না। তোর নাম কি রে? আগে তো দেখি নাই এখানে!’
  • ‘মাখন।’
  • ‘মাক্ষন মিয়া! তাইলে ভালো করে গ্লাস ধুয়ে আমাদেরকে দুই গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দাও।’ মাইকেলের মাক্ষন মিয়া বলার ধরণে রিমি আর মাখন দুইজনই হেসে ফেলে। ওদের খাওয়া শেষ হ’লে ওরা মাখনের হাতে ৫ টাকা বকশিস দিয়ে বেরিয়ে আসে তেহারীর ছোট্ট দেকানটা থেকে।
  • ‘এই তুই লোকজনের নাম নিয়ে এইভাবে ভ্যাঙাস কেন? এটা একদম ভালো না।’
  • ‘তাই নাকি রিম্মি ম্যাডাম!’
  • ‘এই তুই আমার সাথে এমন করলে মার খাবি কিন্তু!’
  • ‘তোর ভাড়াটে গুন্ডা আছে নাকি?’ ঠাট্টা করে জানতে চায় মাইকেল। ‘কিন্তু তোর গুন্ডা তো জানি দেশে নেই!’
  • ‘আবিরের সাথে আমার আর যোগাযোগ নেই রে।’
  • ‘বলিস কি! কেন?’
  • ‘ও যাওয়ার আগে আমিই যোগাযোগ করতে না করেছি। রাগ হয়েছিলো সেদিন খুব। কিন্তু আমার রাগের কথায় গুন্ডাটা যে আর একদমই যোগাযোগ করবে না তা বুঝিনি। তোরা ছেলেগুলো এমন কেন বল তো?’
  • ‘আমি বাবা এমন না। আমি ওতো রাগটাগ বুঝি না। তাই কথা বলা বন্ধ করা আমাকে দিয়ে হয় না।’
  • ‘তুই আসলেই আবিরের মতো না। যা হোক বাদ দে, চল এবার টিএসসির দিকে যাই। চা খাওয়া যাবে।’

মাইকেলের সাথে রিকশায় চড়াটা অন্যরকম রিমির জন্য। শুরু থেকেই দুইজনের মধ্যে কোনো সংকোচ কাজ করে না। মাঝেমাঝেই ঝাকুনির ফলে একজনের গায়ের সাথে আরেক জনের গা লেগে যায়। তাতে কখনো কখনো আবিরের কথা মনে পড়ে রিমির। আবিরের অভাবে এক ধরণের নিঃসঙ্গতা বোধ হয় প্রায়ই। রিমির ইচ্ছা করে এইসব নিয়ে কারো সাথে একটু মন খুলে কথা বলতে। কিন্তু কার সাথে যে এ নিয়ে কথা বলা যায় বুঝতে পারে না। ইদানিং মাইকেলের সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে যদিও। ফুর্তিবাজ ছেলে মাইকেল। সবকিছুই যেন খুব সহজে নিতে পারে। আবার রিমির প্রতি এক ধরণের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও যেন আছে।

একদিন মাইকেলই রিমিকে ব’লে বসে, ‘তো, নতুন প্রেম করছিস না কেন?’

  • ‘কে বললো করছি না? তোর সাথে তো এক/দুই দিন পরপরই ঘুরতে বেরোচ্ছি। এটাকে তোর প্রেম মনে হয় না?’
  • ‘উহু। ফিজিক্যাল রিলেশন ছাড়া প্রেম হয় নাকি?’
  • ‘তোকে বলেছে!! এমন প্রেম তুই কয়টা করেছিস শুনি?’
  • ‘দুইটা।’ আড়চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে বলে মাইকেল।
  • ‘সত্যি?’
  • ‘হ্যাঁ’
  • ‘এখন?’
  • ‘এখন কি?’
  • ‘সেই সব প্রেমের আপডেট কি?’
  • ‘আপডেট নেই। একজন আগে থেকেই বিবাহিত ছিলো। এখন দেশের বাইরে চলে গেছে। তাই আর যোগাযোগ নেই। অন্যজন আর একজনের সাথে প্রেম করছে। একে বোধহয়  তুই চিনবি। ইংলিশের ইলোরা।’
  • ‘না, চিনি না। ইলোরা নামের একজন আমাদের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে এবার। আর কোনো ইলোরাকে চিনি না বাবা…’
  • ‘আচ্ছা তোকে চিনিয়ে দেবো একদিন। অবশ্য যদি সুযোগ পাই। শুনি ভদ্রমহিলা এখন দারুন ব্যস্ত।’
  • ‘তা, কার কাছ থেকে এসব শুনিশ শুনি।’
  • ‘ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে গেলে তুইও শুনবি। টক অব দ্যা য়ুনিভার্সিটি এখন। থাকিস কোথায় বল তো।’ মাইকেলের গলায় বিষ্ময়।
  • ‘কোথায় থাকি তা তো দেখিসই। তোর এই টক অব দ্যা য়ুনিভার্সিটির সাথেও কি তোর এই ফিজিক্যাল ব্যাপার ছিলো নাকি?’
  • ‘আবার জিগায়! তোর ভাড়াটে গুন্ডার সাথে তোর যেমন ছিলো আর কি!’
  • ‘আবিরের সাথে আমার কি ছিলো তুই তার কি জানিস?’
  • ‘সব জানার দরকার নেই। তবে কিছু যে ছিলো তা বোঝা যায়।’
  • ‘আচ্ছা তোর ইলোরার কথা মনে ক’রে মন খারাপ হয় না?’
  • ‘হয় আবার হয়ও না। তবে কি জানিস দোস্ত, সেক্স জিনিসটা মিস করি।’
  • ‘আমিও। তবে সব সময় না। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত যেন।’
  • ‘আমি এটার ভেতরে দোষের কিছু পাই না। অথচ সবখানে কেমন রাখঢাক গুড়গুড়। তলে তলে সবাইই করছে, কিন্তু স্বীকার করতে কেউ রাজি না। আমি শালা এই ব্যাপারটা বুঝি না। তুই তো তাও স্বীকার করলি।’

ব্যাপারটাতে রিমিও একমত হয়। বাসায় ফিরে যখন একাএকা ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসে তখন ওর মায়ের কথা মনে আসে। এতগুলো বছর যে মাকে দেখে এসেছে রিমি আর আশিক তার অনেকটাই যেন ওদের কাছে অচেনা এখন। আর বাবা? তারো কি এমন কোনো গল্প থাকতে পারে? ইদানিং বাবাকে দেখে কখনো কখনো মনে হয় বাবার জীবনে সুমাইয়া আব্বাসী কেয়া নামে কারো উপস্থিতি যেন কখনো ছিলো না। অথচ এমন কি হওয়ার কথা? রিমির অস্থির লাগতে থাকে।

উপন্যাস

একটি শহুরে গল্প -১৭

খলিল সাহেবরা আজ চ’লে গেলেন খুলনা শহর ছেড়ে। গত মাসেও কয়েকজনকে খালিশপুর ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। তারা সবাই যে খুলনাই ছেড়ে যায়নি তাই বা কে ব’লতে পারে, মনে মনে ভাবতে থাকে তরিকুল হাবিব। গত বছর দুয়েকে খালিশপুর আর দৌলতপুরের কলকারখানাগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। অথচ কেউ যেন দেখার নেই। পাটকলগুলো পাট কিনলেও তা পরিমাণে আগের থেকে বেশ কম। মাঝেমাঝে ভারতে কিছু চালান পাঠিয়ে ব্যবসাটাকে মোটামুটি টিকেয়ে রেখেছে তরিকুল হাবিব। কিন্তু ব্যবসাতে তার আর আগের মতো উৎসাহ নেই যেন। যে ব্যবসা পড়তির দিকে তা নিয়ে পড়ে থাকাটা বোকামি মনে হয় তরিকুলের। কিন্তু এই বয়সে এসে আবার নতুন ক’রে কিছু শুরু করাটাও কঠিন।

আবার সরকারী পাটকল খারাপ চললেও নোয়াপাড়ার আকিজ জুটমিল যেন প্রতিদিনই একটু একটু ক’রে বাড়ছে। গতকালই নোয়াপাড়া ঘুরে এসেছে তরিকুল। উদ্দেশ্য ছিলো জমি দেখা। নাজিমুদ্দিন পুরাতন একটা শেড বিক্রির খবর এনেছিলো। রেল-স্টেশনটার বেশ কাছেই শেডটা। মূলত সারের গুদাম হিসেবে ব্যবহার হতো এতদিন। শেডটার অবস্থা বেশ খারাপ এখন। কিছু কিছু জায়গার টিন খুলে গেছে। স্টিলের ফ্রেমও সবখানে সোজা নেই। শেডটা মেরামত করতে ঠিক কত টাকা লাগতে পারে তার একটা হিসাব দরকার। নাজিমুদ্দিনকে সেটা বলে তরিকুল।

  • ‘আমার পরিচিত একজন ইঞ্জিনিয়ার আছে। কচি নাম। যোগাযোগ করবো?’
  • ‘আজকে পারবি যোগাযোগ করতে?’
  • ‘দেখি।’

ইঞ্জিনিয়ার কবির আব্দুল্লাহ কচির কাছ থেকে যে হিসাব পাওয়া যায় তাতে তরিকুল খানিকটা দমে যায়। ব্যবসা পড়তির দিকে না থাকলে হয়তো একটা চেষ্টা করা যেতো। তরিকুল মনোস্থির ক’রে ফেলে যে এই শেড কেনার পেছনে আর টাকা খরচ করবে না। কিন্তু ব্যবসা যেন আস্তে আস্তে খুলনা থেকে নোয়াপাড়ার দিকে সরে যাচ্ছে, যেখানকার ব্যবসা  আবার উৎপাদনমুখী নয়, অনেকটা যেন আমদানি নির্ভর। বেনাপল স্থল-বন্দর দিয়ে ওপাড়ের ইন্ডিয়া থেকে জিনিসপত্র এনে দেশের নানা প্রান্তে সেসবের চালান পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে উঠছে সেখানে। এ ধরণের ব্যবসায় নানা জায়গায় প্রচুর দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন পড়ে। আনসার আলীটা থাকলে ভালো হ’তো এই সময়, মনে মনে ভাবে তরিকুল।

কিন্তু যে নেই তার কথা ভেবে তো আর ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া যাবে না। তরিকুল তাই অন্য রকম কিছু করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবতে বসে। আনসার আলীর মৃত্যুর পর খুলনা শহরটার প্রতিও টান যেন একটু একটু ক’রে কমতে শুরু করেছে। শহর বানুকে এসব কথা একবার ব’ললে কেমন হয়? যদিও ব্যবসার ব্যাপারে ওর আগ্রহ কখনোই তেমন একটা ছিলো না। একবার আহসানের কথাও মনে পড়ে। কিন্তু আহসান তো সেই যে পড়াশোনা শেষ ক’রে সরকারী চাকরীতে ঢুকলো এর পর আর কখনোই ব্যবসার কোনো খোঁজ করেনি। তরিকুল ঠিক করে আগে সব কিছু নিয়ে স্ত্রী শহর বানুর সাথেই কথা ব’লে নেবে।

বিকালে বাড়ি ফিরে তরিকুল দেখে বাড়িতে শহর বানু একা। চুপচাপ দক্ষিণমুখি বারান্দাতে ব’সে আছে। তরিকুল হাত-মুখ ধুয়ে এসে পাশে বসে। ‘মন খারাপ?’

  • ‘মেয়ে দুইটা কেমন বড় হ’য়ে গেলো, না?’
  • ‘হুম…’ একটা অস্ফুট শব্দ ক’রে তরিকুল। শহর বানুর মন ভার ব্যাপারটা যেন তরিকুলকেও পেয়ে বসে।
  • ‘ইলোরার ক্লাশ শুরুর ডেট দিয়েছে। আগামী মাসের ৬ তরিখে। কবে যাবে তাই নিয়ে কথা বলার জন্য সুমিদের বাসায় গেলো একটু আগে।’
  • ‘বিলুর সাথে কথা ব’লেছো?’
  • ‘হুম’
  • ‘কি বলে ও?’
  • ‘ওর এক বন্ধু আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার। তার সাথে কথা ব’লবে, হলের সিটের জন্য।’
  • ‘সিট পাওয়া যাবে বললো?’
  • ‘প্রথম বছর সিট পাওয়া খুব ঝামেলার নাকি। আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়?’
  • ‘কি কাজ?’
  • ‘আমরা চ’লো ঢাকা চ’লে যাই।’
  • ‘আর নাবিলা?’
  • ‘তুমি আর নাবিলা এখানে থাকলে; আমি আর ইলোরা ঢাকাতে একটা ছোট বাসা নিয়ে থাকলাম। তুমি মাঝেমাঝে দেখতে গেলে। করা যায় না এমন?’
  • ‘যায়… কিন্তু…’
  • ‘কিন্তু কি?’
  • ‘মেয়েরা তো আর কয়টা দিন পর এমনিই চ’লে যাবে। তখন কি করবে?’
  • ‘সে তখন দেখা যাবে।’
  • ‘আচ্ছা, নাবিলার যে টিচার ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, তার কথা নাবিলাকে ব’লেছো?’
  • ‘উহু…’
  • ‘ব’লবে না?’
  • ‘ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়নি। কেমন ক’রে যেন তাকায়।’
  • ‘তবে থাক আর ব’লে কাজ নেই। কিন্তু নাবিলা কই? ও আবার এই সময় কোথায় গেলো?’
  • ‘যাইনি কোথাও। আজ আসেইনি। রাতে হলে থাকবে আজ। বান্ধবীদের সাথে সিনেমা দেখবে নাকি রাত জেগে। কম্পিউটারে। ওর একটা কম্পিউটার কিনে দেওয়া দরকার। সেদিন ব’লছিলো।’
  • ‘দাম কেমন জানো?’
  • ‘না।’
  • ‘বিলুকে জিজ্ঞেস কোরো তো।’
  • ‘আচ্ছা, করবোখন…’
  • ‘চলো, এক কাজ করি।’
  • ‘কি কাজ?’
  • ‘জেসকোতে খিঁচুড়ি খেতে যাবে?’
  • ‘এখন? খিঁচুড়ি খেতে হ’লে তো দুপুরে গেলে ভালো হয়। বরং শিক-কাবাব খেলে কেমন হয়?’
  • ‘তাই চলো, রেডি হ’য়ে নাও। ইলোরার জন্য প্যাকেট ক’রে আনলে হবে। এর ভেতরে আবার চ’লে আসবে না তো?’
  • ‘ও আসবে আটটার পরে। আচ্ছা, শেষ কবে আমরা দুই জন একসাথে বের হয়েছি মনে পড়ে?’ প্রশ্ন ক’রলেও তার উত্তর শোনার জন্য দাঁড়ায় না শহর বানু। তরিকুল জানে তৈরী হ’য়ে নিতে শহর বানুর দশ মিনিটের বেশি লাগবে না। এদিকে বারান্দার আলো বেশ কমে এসেছে। তরিকুল অন্ধকারেই খানিক্ষণ ব’সে থাকে। আর মনেমনে ভাবে ইলোরার জন্য ওদের ঢাকাতে না গেলেই ভালো হবে। তখন হয়তো হাঠাৎ হঠাৎ শহর বানুকে নিয়ে খুলনা শহরের নানা জায়গায় ঘুরতে বেরোনো যাবে; সেই বহু বছর আগেকার মতো। কত বছর হ’লো মেয়েটার ওর ভাইয়ের বাসা থেকে তরিকুলের কাছে চ’লে আসার?
  • ‘এই, বের হবে ব’ললে! এখনো অন্ধকারে ব’সে আছো যে! ওঠো..’ তরিকুল বুঝতে পারে শহর বানুর শাড়ী পরা হ’য়ে গেছে।
  • ‘এই আসছি। কোন শার্টটা পরবো?’ শহর বানু স্বামীর জন্য একটা নীল রঙের শার্ট বের ক’রে দেয়।

আগামী কাল ইলোরার ক্লাশ শুরু হবে। আপাতত বিলুর বন্ধু আমানুল্লাহ ফেরদৌসের ধানমন্ডির বাসায় থাকবে ইলোরা। আহসান হাবিব বিলুর কথায় আমানুল্লাহ ফেরদৌস নিজেই প্রস্তাব দিয়েছে, ‘হলে সিট পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার বাসাতেই থাকুক না।’ আমানুল্লাহর মেয়ে রুবিনাও এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তবে ইলোরা ফার্মেসিতে আর রুবিনা অর্থনীতিতে।

আমানুল্লাহ ফেরদৌসের সাথে কথা ব’লে শহর বানু কিছুটা নিশ্চিন্ত হ’য়েছে। ঢাকা থেকে ফেরার পথে গাড়িতে শহর বানুর মনে হয়, একবার বড় ভাইয়ের সাথে দেখা ক’রে আসলে কেমন হয়। গাড়ি তো যশোরের উপর দিয়েই যাবে। যদিও যশোরে নেমে মনিরামপুর যেতে কম ক’রে হ’লেও একঘণ্টা লাগবে। আগে তো আরো বেশি সময় লাগতো। এখন নাকি রাস্তা বেশ উন্নত হ’য়েছে। তরিকুল শুনে যদিও ‘যাওয়া যায়’ ব’ললো তবুও ওর যে যেতে ইচ্ছা করছে না সেটা বুঝতে পারে শহর বানু। এত দিনের একসাথে থাকার কারণে এমন বিষয়গুলো সহজেই বুঝে যাওয়া যায়।

আরিচা ঘাটে আজ গাড়ির ভীড় বেশ কম। ওদের গাড়ি একটানেই ফেরীতে উঠে পড়ে। অনেকদিন পর শহর বানু এতবড় ফেরীতে উঠলো। ‘চলো, চা খেয়ে আসি।’

  • ‘চায়ের দোকান তিন তলাতে। ঐ খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারবে?’ স্টিলের সিঁড়ি দেখিয়ে তরিকুল জানতে চায়।
  • ‘পারবো। এক সময় মই বেয়ে গাছে কি কম চড়েছি? আর তুমি তো আছো।’
  • ‘তাই?’
  • ‘ঢং ক’রো না তো। চলো..’ শহর বানুর ঠোটে প্রশ্রয়ের হাসি।

খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শহর বানুর কোনো অসুবিধা হয় না। উঠতে উঠতে ওরা খেয়াল করে, ফেরীর অর্ধেকটাও তখনো গাড়িতে ভরেনি। এই এক অদ্ভুত ব্যাপার, কখনো ফেরীতে ওঠার জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়, আর কখনো ফেরী ভরার জন্য গাড়ি পাওয়া যায় না। পদ্মা পারাপারে কোনো না কোনো ভাবে অপেক্ষা করাটা যেন দুই পাড়ের মানুষের নিয়তি হ’য়ে গেছে।

চা মুখে দিয়ে শহর বানুর খুব ভালো লাগে। কনডেন্সড মিল্কের চা, খুব যে সুস্বাদু তা নয়, তবুও। এমন চা বাড়িতে কখনো খাওয়া হয় না। বাড়িতে সব সময় গরুর দুধ ঘন ক’রে চা বানায় শহর বানু। নিউ-মার্কেটের পেছনের কয়েকটা দোকানে যেমনটা পাওয়া যায়। নাবিলা সুযোগ পেলেই বলে, ‘মা, তুমি একটা চায়ের দোকান দিলে সেই দোকান খুব ভালো চলবে।’ নাবিলার কথা মনে হ’তেই শহর বানুর মনটা আবার হুহু ক’রে ওঠে। চারদিন হ’লো মেয়েটার চেহারা দেখা হয়নি। ফোনে কথাও হয়নি কোনো। চা শেষ ক’রে শহর বানুই বলে, ‘আজ বাড়িতেই চলো। নাবিলা কত দিন একা আছে! কি যে করছে একাএকা কে জানে!’

বাড়িতে ফিরে জানা গেল নাবিলা এই কয়দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে কাটিয়েছে। দুই দিন বিকালে এসে শুধু দেখে গিয়েছে বাড়ির সব ঠিকঠাক আছে কিনা। ‘পাজি মেয়ে! আমি কোথায় চিন্তায় মরি!’ শহর বানু রাগ না দেখিয়ে পারে না।

  • ‘তুমি আমাকে একলা রেখে চ’লে যেতে পারবে আর আমি হলে গিয়ে থাকতে পারবো না!’ হাসতে হাসতে বলে নাবিলা। ‘বাবা, তুমি এর বিচার করো।’ তরিকুলকে দলে টেনে নেয় নাবিলা।
  • ‘যদি বাসায় চুরিটুরি হ’তো!’
  • ‘হয়নিতো মা। তুমি শুধুশুধুই বেশি চিন্তা করো। এসব করে করেই শরীরটা খারাপ ক’রে ফেলবে আবার!’ নাবিলা কথাটা ভুল বলেনি। ইদানিং শহর বনুর ব্ল্যাড-প্রেশারের ওঠা-নামাটা বেশ অনিয়মিত হ’য়ে উঠেছে। ডাক্তার দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে শুধু। আর বিকালের দিকে একটু দৌড়াতে বা দ্রুত লয়ে হাঁটতে বলে অন্তত দুই কিলোমিটার। কিন্তু বললেই কি আর দুশ্চিন্তা বাদ দেওয়া যায়?

রাতে বিছানায় শুয়ে শহর বানু বেশ কয়েকবার পাশ ফেরায়। চোখে ঘুম আসতে চায় না। তরিকুল পাশেই অঘোর ঘুমে। কিছুদিন হ’লো তরিকুল ঘুমের মাঝে নাক ডাকা শুরু করেছে। তাতেও শহর বানুর ঘুম টুটে যায়। আজ অবশ্য তরিকুল একেবারে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। বোঝা যায় লম্বা জার্নি ক’রে শরীর বেশ ক্লান্ত। অথচ জার্নি তো শহর বানুও করেছে। আরো কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি ক’রে এক সময় হাল ছেড়ে দেয় শহর বানু। অন্ধকারেই সাবধানে মশারির কিনারা তুলে বেরিয়ে আসে; খাবার ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে দেয়। ফ্রিজ খুলে গ্লাসে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে সেটা নিয়ে খানিক্ষণ নাড়াচাড়া করে। একবার চোয়ালে ঠেকায় গ্লাসটা। গ্লাসের ঠাণ্ডাটা বেশ লাগে শহর বানুর। কিন্তু পুরো পানিটা আর খায় না। অর্ধেকটার মতো পানি খেয়ে আবার শোবার ঘরে ফিরে আসে।

বিছানায় তরিকুলকে খানিক্ষণ জড়িয়ে রাখে শহর বানু। বুঝতে পারে না তরিকুল ওর স্পর্শ টের পেয়েছে কিনা। পেলে তো নড়াচড়া করার কথা। অনেক দিনের অভ্যাস, অনেক দিনের পাশাপাশি থাকায় যেমনটা হয়। শহর বানু তরিকুলের লুঙ্গির গিট শিথিল করে দেয়। সেটা গলিয়ে ভেতরে হাতও বুলায়। কিন্তু তরিকুলের আজ কোনো বিকার নেই যেন। এক সময় শহর বানু একাই মেহন শুরু করে। কিন্তু শেষ না করে জড়োসড়ো হ’য়ে শুয়ে থাকে আরো কিছুক্ষণ। যখন চোখে ঘুম ধরে আসতে থাকে তখন তরিকুল পাশ ফিরে শুয়ে নাক ডাকা শুরু করে। শহর বানু মাথার নিচের বালিশটা টেনে কানের উপর চাপা দেয়।

কবিতা · নগরী · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৭

প্রচণ্ড আলোর হল্কা উত্তাপে দগ্ধ করেছিলো
সেদিনের স্নিগ্ধ নাগরিক বিকেলটাকে হঠাৎ
অগণিত ক্লান্ত পথিকের পায়েপায়ে দলেছিলো
পরাজিত আর এক দল মানুষরূপী প্রাণী
মেঘে মেঘে যদিও সশব্দে নেচেছিলো বিদ্যুৎ
তপ্ত মাটিতে পড়েনি বর্ষণসুধা এক ফোটাও
নৈমিত্তিক গোধূলি টানেনি কোনো গৃহকোণ
নিয়ম মেনে যখন নেমেছিলো কালো রাত্রি
অতৃপ্ত আত্মায় ভর করেছিলো নিষিদ্ধ যত কল্পনা
আর পঙ্কিলতায় ছাওয়া স্বপ্ন ভেঙেছিলো প্রত্যাশা
ধ্বংসের উল্লাসে মেতেছিলো দ্বৈতাচারী মন
অলক্ষ্যেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড নিভেছিলো নিরুত্তাপে
বারংবার লাঞ্ছিত হৃদয় আবারো উঠেছিলো কেঁপে
নির্দয় সে নগরীর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে…

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৬

ঠিক করেছি তোমার হাত ধরে একদিন মায়াবিনী নদীটার পাড়ে যাবো।
তারপর আর কোনো দিন তোমার কাছে ফিরে আসবো না,
জলে ভাসতে ভাসতে এক পূর্ণিমার রাতে উত্তাল সাগরে গিয়ে পৌঁছাবো;
সেখানে ছাতাঝুরির পিছু নিয়ে যাবো কোনো এক নিঝুম দ্বীপে।
তারপর আর কোনো দিন তোমাকে নিয়ে ভাববো না-
তোমাকে নিয়ে ভাবতে গেলেই শ্রাবণ দিনের কথা মনে আসে,
যখন সকাল বেলা গা হিম করে ঘরের চালে সশব্দে বৃষ্টি নামে।
হতচ্ছাড়া পাখিগুলোর কথা ভাববো না তবুও…
ঠিক করেছি তোমাকে নিয়ে একদিন ইলোরার গুহায় যাবো-
সেখান থেকে বিদিশার নগর খুঁজতে বেরিয়ে গেলে কেমন হয় বলো তো!
তুমি গেলে একদিকে আর আমি ধরলাম তার বিপরীত কোনো পথ-
জানি আমাদের কেউ হারানো সে নগরীর দেখা আর পাবো না।
ঠিক করেছি একদিন আমি কোথাও যাবো না…
অন্তত একটা দিন কাটাবো নিয়ে শুধু তোমার ভাবনা।

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা ১২

কেন গড়ে ওঠে শহর?
কে গড়ে তোলে শহর?
কে বা কি গড়ে দেয় শহরের মূল কাঠামো আর অবয়ব?

প্রশ্নগুলো বহু শতাব্দি প্রাচীন। তবে উত্তরগুলো আর আগের মতো ক’রে দেওয়ার উপায় নেই। ইতিহাসের পুরাতন শহরগুলো গড়ে ওঠার কারণ ছিলো নানাবিধ। প্রাচীন মিশরের থিবস, মেমফিস কিংবা আলেকজান্ড্রিয়ার বড় শহর হ’য়ে ওঠার কারণ একই ছিলো না। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা কিংবা মহেনজোদারো শহরগুলোর গড়ে ওঠা আর বিলুপ্তির কারণও বেশ ইউনিক বা অনন্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত। বল্লাল সেনের আর প্রতাপাদিত্বের শহরও বলে ভিন্ন ভিন্ন গল্প, একই বাংলার অংশ হ’য়েও।

একসময় সংকর-ধাতু ব্রোঞ্জের উপর নির্ভর ক’রে মানুষ বেশ কার্যকর অস্ত্রশস্ত্র বানাতে শুরু করে। একই সময়ে চাষাবাদের কাঠের উপকরণে ধাতুর প্রলেপ যুক্ত হ’তে শুরু করে। তাতে মাটি খোড়া সহজতর হয়। ফলে ফসলের উৎপাদন যায় বেড়ে। বাড়তে থাকে মানুষের আবাদ আর আবাস দুইই। ততদিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ প্ল্যান্ট ডমেস্টিকেশন বা গাছের গৃহপালিত-করণে বেশ সফল হ’য়েও উঠেছে। মনে রাখা দরকার আবাদ শুরুর আগে স্থায়ী আবাস তৈরী করা মানুষের পক্ষে একরকম অসম্ভবই ছিলো। আবাদ শুরু করার আগে মানুষকে নিতে হ’য়েছে হাজার হাজার বছরের প্রস্তুতি আর পর্যবেক্ষণজাত সিদ্ধান্ত। মানুষ দেখেছে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের উপর মানুষের বেঁচে থাকাটা কতটা নির্ভর করে। কিন্তু যেসব গাছ থেকে শর্করা পাওয়া যায় তারা বড্ড অদ্ভুত। কিছু ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের বীজ আর মাটির নিচে হওয়া আলুতে একে পাওয়া যায় বেশ ভালো পরিমাণে। বাংলাদেশের সিলেট, ভারতের আসাম কিংবা চীনের ইউনানের মানুষেরা এক ধরণের ঘাসের সন্ধান পায় মোটামুটি হাজার বিশেক বছর আগে। নাম দেয় ধান। বিজ্ঞানীরা বলেন সেই সময় ধানের শীষে ২/৩ টার মতো ধান হ’তো। সেই ধানগাছকে দীর্ঘ সময় ধ’রে সিলেকটিভ ব্রিডিং ক’রে ক’রে মানুষের তাকে আবাদযোগ্য ক’রে তোলার পরেই সম্ভব হয়েছে এই সব অঞ্চলে চাষবাসের গোড়াপত্তন করার। কাছাকাছি সময়ে মধ্য-এশিয়া আর য়ুরোপের মানুষেরা যব আর গমকে বাগে এনেছিলো। উত্তর আমেরিকার মানুষেরা ভুট্টা বা কর্ন আর দক্ষিণ আমেরিকার মানুষেরা নানা ধরণের আলুকে চাষযোগ্য ক’রে তুলেছিলো ইতিহাসের নানা পর্যায়ে। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে এই ধান, গম, যব, ভুট্টা আর আলুই শর্করা জাতীয় খাদ্যের মূল উৎস।

আর একটা খুব দরকারী জিনিস ছিলো লবণ। উষ্ঞ রক্তের প্রাণী হওয়ায় লবণ ছাড়া মানুষের পক্ষে শরীর গরম রাখা সম্ভব হয় না। সে লবণ নানা ধরণের হ’তে পারে। হ’তে পারে খনিজ লবণ, হ’তে পারে সমুদ্রের পানি থেকে পাওয়া লবণ কিংবা অন্য কোনো উষ্ঞ-রক্তের প্রাণীর রক্ত আর মাংসে থাকা লবণ। ফলে আবাদ আর আবাস এমন জায়গাতে গড়ে তুলতে হ’তো যেখানে লবণের নিশ্চয়তাও পাওয়া যায়। ফলে শুধু নদী থাকলেই বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হ’তো না মানুষের পক্ষে। বসতি গড়ে তোলার জন্য চাই নেভিগেবল বা নৌকা-চলার-উপযোগী নদী। যে নদীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় লবণ সারাবছর আনা-নেওয়া করা যেতো। মানুষের গৃহপালিত বেশির ভাগ প্রাণীর জন্যও লবণের এই ব্যাপারটা সত্য। লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গরু-ছাগল-মুরগী কাউকেই হয়তো গৃহপালিত করা যেতো না। গরু ঠিক কতটা বুদ্ধিমান প্রাণী জানি না, তবে লবণ যোগাড় করার পরিশ্রমসাধ্য কাজটা যে মানুষের ঘাড়ে সেই প্রাচীন কালেই তারা চাপিয়ে দিয়েছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাতে তাদের বেশ কিছু স্বাধীনতা স্যাক্রিফাইস করতে হ’লেও গড়পড়তা গরুদের দৈনন্দিন জীবন যে সহজতর হয়েছিলো তা মানতেই হবে, এমনকি গরুদেরকেও।

এখন বলা যায় যে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আমরা মোটামুটি জানি। যেসব মানুষ শর্করা আর লবণের উৎস নিশ্চত করতে পেরেছে তারাই প্রথমে গড়ে তোলে আবাস, পরবর্তীতে গ্রাম; আরো আরো পরবর্তীতে শহর। কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই তাদের সবাই নয়। ইতিহাসের সব গ্রাম শহরে রূপান্তরিত হয়নি। বা সব গ্রামের মানুষ তাদের গ্রামকে শহর বানিয়ে ফেলেনি বা ফেলতে চায়নি বা হয়তো পারেওনি। এখানে এসেই উত্তরটা আবার যেন একটু ধোঁয়াটে হ’য়ে ওঠে। যদি জানা যায় কেন গড়ে ওঠে শহর তাহ’লে হয়তো সেই ধোঁয়ার খানিকটা সরিয়ে দেওয়া যায়।

সহজ ক’রে ব’লতে গেলে ব’লতে হয়, শহর গড়ে ওঠে বাড়তি কিছু সুবিধা তৈরীর জন্য, বাড়তি কিছু নিশ্চয়তা গড়ে তোলার জন্য, বাড়তি কিছু সেবা পাওয়ার জন্য; যে সুবিধা, নিশ্চয়তা কিংবা সেবা শুধু বসতি বা গ্রাম থেকে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না কারণ অল্প মানুষের বসতি কিংবা আয়োজন দিয়ে এমনতরো সুবিধা, নিশ্চয়তা কিংবা সেবাকে টেকসই বা ভবিষ্যসহ করা যায় না। অনেকগুলো বসতির মানুষ মিলে তাই গড়ে তুলতে হয় কোনো একটা শহর। শহর তাই মূলগত ভাবে সেবা আর সুযোগের উৎপাদক। সেই সাথে তার চারপাশের গ্রামগুলোতে উৎপাদিত প্রাথমিক পণ্যের বড়সড় ভোক্তা। সেই অর্থে গ্রামের প্রয়োজনেই শহরের গোড়াপত্তন। আবার গ্রামের প্রয়োজনেই শহরের রূপান্তর।

যে ধরণের প্রয়োজন মেটানোর তাগিতে কোনো শহর গড়ে ওঠে তার চরিত্রে বা বৈশিষ্ট্যে সেসব প্রয়োজনের বেশ কিছু ছাপ তাই থেকে যায়। আবার শহর বা শহরের মানুষের কোনো কিছু ভোগ করার ধরণও এক্ষেত্রে কম ভূমিকা রাখে না। শহরের মানুষের প্রধান খাবার কি, পোশাকের ধরণ কেমন, বাড়িঘরের উপকরণ কেমন (মাটি, কাঠ, বাঁশ, ইট, পাথর ইত্যাদি) তা মোটামুটি নির্দিষ্ট করে দেয় শহরকে ঘিরে রাখা গ্রামগুলোই; তাদের সরবরাহ করা উৎপাদিত পণ্যগুলোর মাধ্যমে।

বহু শতাব্দির ব্যবধানে হয়তো আস্তে আস্তে কিছু কিছু শহরের ভেতরে যোগাযোগ গড়ে উঠতে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিই সম্ভবত মূল ভূমিকা রেখেছিলো তাতে। বড়সড় নৌকা বা জাহাজ কিংবা চাকা-বসানো গাড়ি আবিষ্কার করার পর মানুষের পক্ষে আরো দূরের দূরত্বে যোগাযোগ করা সহজ হয়। কিন্তু শুধু প্রয়োজনের নিরিখে হয়তো এই নতুন উপযোগকে বহুল ব্যবহার করার যৌক্তিকতা পাওয়া যাবে না। সে যৌক্তিকতা তৈরীর জন্য চাই নতুন কোনো ভাবনা, নতুন কোনো আইডিয়া। প্রয়োজন নতুন কিছু টুল বা আয়ুধ- ধর্ম, ভাষা, সাম্রাজ্য ইত্যাদি।

আমাদের আজকের দৃশ্যমান সবগুলো শহরের পেছনে এই পুরাতন ভাবনাগুলো তো ক্রিয়াশীল আছেই, সেই সাথে যোগ হ’য়েছে আরো হাজারো ভাবনা, হাজারো চাহিদা। আর তাই আজকের শহর অতীতের যে কোনো সময়ের বেশিরভাগ শহরের চেয়ে জটিল; অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিশৃঙ্খল আর অধিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। ফলত অনেকটাই দুর্বোধ্য।

এই প্রেক্ষাপটে উপরের প্রশ্নগুলো ঢাকার জন্য ক’রলে কেমন হয়?
কেন গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর?
কে গড়ে তুলেছে রাজধানী ঢাকা?
কি দিয়ে গড়া ঢাকা শহরের অবয়ব?

খুব সংক্ষেপে এই প্রশ্নগুলোর সর্বজন গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়া যাবে না ব’ললেই চলে। কিন্তু তাই ব’লে প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়াটাও ঠিক হবে না হয়তো, যদি সামনের দিকে আগাতে চাই। উত্তরগুলো হয়তো একই রকম হবে না সব/সবার পরিপ্রেক্ষিত থেকে। কিছু বিতর্ক, কিছু সন্দেহ, কিছু মন-গড়া রোম্যান্টিসিজম থেকেই যাবে। রাজনীতিকের উত্তরের সাথে প্রকৌশলী আর পরিকল্পকের উত্তর মিলবে না। নাগরিকের উত্তরের সাথে মিলবে না শাসকের উত্তর। ব্যবসায়ীর উত্তরের সাথে ভোক্তার উত্তর। উৎপাদকের সাথে মধ্যসত্ত্বভোগীর উত্তরও আলাদাই হবে। আলাদা হবে ঐতিহাসিক আর অর্থনীতিকের উত্তরও। কিন্তু সবার উত্তর নিয়েই গড়ে ওঠে কোনো একটা শহরের সামগ্রিক বয়ান বা ন্যারেটিভ। আজকের দিনের শহরগুলো অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা হ’য়ে ওঠে তার এই বয়ানের পার্থক্যের জন্যই মূলত।

তার কারণও মোটামুটি জানা। সবকিছুর অতিপ্রমিতকরণ। তাতে গঠনপ্রক্রিয়া দ্রুত করা গেলেও বৈচিত্র্যের প্রশ্নে বেশ বড়সড় একটা ছাড় দিতেই হয়েছে। আবার জাহাজীকরণে কন্টেইনারের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে স্থানীয় নির্মাণ-উপকরণ ব’লে আর যেন কিছু থাকলো না। আজ সহজেই ইটালির মার্বেল দিয়ে ঢাকার ভবনের মেঝে সাজানো যায়। ঢাকায় সেলাই করা কাপড় পৃথিবীর সবখানে সহজেই পারা যায়। ভারতে উৎপাদিত টিকা নিতে পারে এখন সব মহাদেশের মানুষ। এক কন্টেইনারাইজেশনই সংকুচিত ক’রে এনেছে পৃথিবীর শহরগুলোর হাজারো বৈচিত্র্যের সুযোগ, যা কিনা পণ্য যোগাযোগের মাত্র একটা মাধ্যম। যখন একসাথে আরো অনেকগুলো মাধ্যমকে বিবেচনা করা হবে তখন দেখা যাবে একুশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো যেন খুব কাছাকাছি লয়ে কথা বলে, হয়তো সকলে মিলে একই কথাও বলে। সমস্ত মানুষের  স্বার্থগুলো, ভাবনাগুলো যেন সব এক হ’য়ে গিয়েছে একুশ শতকের শহরে এসে। আবার হয়তো যায়ওনি, খুব খেয়াল করলে তা হয়তো বোঝা যায়… ডেভিলস রাইট দেয়ার রাইট দেয়ার ইন দ্য ডিটেইলস… (Fink এর লুকিং ঠু ক্লোজলি থেকে… https://www.youtube.com/watch?v=qoWRs7lXtYE)

তাই শেষ বিচারে প্রতিটা শহরই আলাদা। প্রতিটা শহরের শব্দ আলাদা। প্রতিটা শহরের আকাঙ্ক্ষা আলাদা। প্রতিটা শহরকে তাই একই ভাবে পাঠ করা যায় না। যায় না তার অতীতের কারণে। যায় না শহরের মানুষগুলোর কারণে। যায় না মানুষগুলোর বসবাসের ধরণের বৈচিত্র্যের কারণে। মানুষের বসবাসের ধরণের দৃশ্যমান বৈচিত্র্য শহরের আবাসিক ভবনগুলোর চেহারা গড়ে দেয় অনেকটাই। অনেকেই তাই ব’লতে চান, আবাসিক ভবনগুলোই গড়ে দেয় শহরের অবয়ব। কেউ কেউ অবশ্য শহরের রাস্তাগুলোর কথা প্রথমে বলেন। হয়তো শহরের অবয়ব গড়তে এই দুইয়ের ভূমিকাই সবার আগে আসে। কিন্তু শহর তো সভ্যতার উপযাত আর সভ্যতার জন্য চাই খানিকটা হ’লেও রাখঢাক কিংবা পোশাক। সভ্যতার সবকিছু তো আর প্রকাশ করা যায় না; তার অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতে হয়। একটা ভালো শহর জানে তার কতটা লুকিয়ে রাখতে হবে আর কতটা প্রকাশ করতে হবে আগন্তুকের কাছে।

শহরের তাই ভেতরের কাঠামো আর পোশাকী অবয়বে পার্থক্য অনিবার্য। শহরের আগন্তুকের কাছে সেটা সবসময় ধরা না পড়লেও শহরের নিয়মিত বাসিন্দাদের চোখে তা ধরা পড়তে বাধ্য। আগন্তুক হয়তো দেখে পরিস্কার রাস্তা। শহরবাসী জানে রাস্তা পরিস্কারের কাজ করা গরীব আর নোংরা মানুষগুলোর কথা। আগন্তুক হয়তো দেখে কোনো একটা উদ্যানের গাছ না কাটার জন্য একদল শহরবাসী আন্দোলন করছে। আর শহরবাসীরা জানে তারা নিজেদের বাড়ির সামনের সব গাছ কেটে ফেলেছে এতদিনে, তাই উদ্যানটার গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখা তাদের জন্য কতটা দরকারী। আগন্তুক দেখে প্রতিটা ভবনের চারপাশে উঁচুউঁচু দেওয়াল, ফলে নিরাপদ শহর। শহরবাসী জানে এক ভবনের বাসিন্দা পাশের ভবনের বাসিন্দাকে কতটা অবিশ্বাস করে।

দিন শেষে শহরের কিছুই কি আর গোপন থাকে? অন্তত যে বা যারা প্রতিনিয়ত গড়ে চলেছে তাদের নিজেদের শহরটাকে? সব কিছু প্রকাশ হ’য়ে গেলে কি আর সভ্যতা থাকে?

নোট : সচলায়তনের জন্য লেখা। এখানে সংরক্ষণ করলাম। কিছু টাইপো ঠিক করে। লিংকটাও রেখে দিলাম।
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/58004

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৫

যদি চ’লে যেতে পারি তবে থাকবো কেন?
কতটুকু দিতে পারো তুমি তা তো জেনে গেছি এতদিনে,
আর যতটুকু নিতে পারি নিয়েছি তার সবই।
তার উপর চারপাশের যা কিছু প্রলুব্ধ করছে প্রতিনিয়ত
তার মোহ কেমন ক’রে ছেড়ে দিই!
কিংবা ছাড়বোই বা কেন?
তোমার সঙ্গ এরই ভেতরে একঘেয়ে হ’য়ে উঠেছে-
আমাকে যে কতটা টানে বৈচিত্র্য তা হয়তো তুমি বোঝোনি কখনো-
আর তার দায়ই বা আমি নেব কেন?
আমাকে টানছে সদ্যপরিচিত কোনো সঙ্গী- তার অদ্ভুত অজানা-সঙ্গ,
বহু দূরের এক মায়বী নদীর জল হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রতিক্ষণ,
আমাকে ডাকছে জনহীন নামহীন কোনো এক বালিয়াড়ি-
আমি যাবো তাই চ’লে, সিদ্ধান্ত নিশ্চিত;
আলিঙ্গন করবো এতদিনেও হয়নি চেনা এমন কোনো উত্তেজনা
আমি তাই উৎফুল্ল আজ তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার বাসনায়
তুমি তো জানো আমাদের আর কিছু পাওয়ার নেই
পরস্পরের কাছ থেকে-
আমাদের আর কিছু দেওয়ার নেই পরস্পরকে,
আমাদের এই বর্তমান অতীতের পুনরাবৃত্তি শুধু-
আহ! কি দুর্বিসহ ভেবে দেখো তো একবার!
অথচ চাইলেই আমরা এর সব ছাড়তে পারি-
সামনে প্রশস্ত পথ, প্রয়োজনীয় কড়িও পকেটস্থ
চাইলেই ধরতে পারি নতুন স্বপ্ন-
আবার বুনতে পারি নতুন জাল-
আবার বিধতে পারি নতুন শিকার-
আহা! কি উত্তেজনা! আহা!
এই থেকে যাওয়াতে যেটুকু স্বস্তি আছে, যেটুকু আনন্দ আছে
তার সবই পুরোনো, একঘেয়ে আর চেনাচেনা!
তোমার কি মনে হয় না কখনো,
এমন থেকে যাওয়াতে পরাজয় ছাড়া আর যেন কিছু নেই?
চলো ছড়িয়ে পড়ি, চলো ছেড়ে যাই-
সামনের সমস্ত সুযোগ মুঠো ভ’রে নিই আজকে-
চলো সুখি হ’ই আবার দুইজনে…

নগরী

নগরী ঢাকা ১১

প্রসঙ্গ : ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি

প্রতিদিন ঢাকাবাসীরা যে পরিমাণ পানি মাটির নিচ থেকে তুলে এনে ব্যবহার করছে সেই পরিমাণ পানি মাটিতে আবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। প্রতি বছরই তাই একটু একটু ক’রে মাটির নিচের পানির-স্তর নেমে যাচ্ছে। যার ফলে বছরান্তে পানি উত্তোলনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত তৈরী হচ্ছে পানি-পরিশোধনাগার তৈরীর বাড়তি চাহিদা, যেখানে সারফেইস ওয়াটার (স্বাদুপানি বলা যায় হয়তো) বা নদী, খাল কিংবা বড় কোনো জলাধারের পানিকে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। কিন্তু মাটির উপরের এইসব পানিতে যদি দূষণের পরিমাণ বেশি হ’য়ে যায় তবে তাকে পরিশোধনের খরচ লাগে অনেক বেশি। অনেক সময় তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও পাওয়া যায় না। আবার যদিও বা পাওয়া যায়, অনেক সময়ই দেখা যায় যে সেই প্রযুক্তি অর্থাৎ যন্ত্রপাতি ব্যবহার আর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যথাযত লোকবল নেই শহরে।

ফলে সহজ সমাধান হিসেবে বারবার ভূগর্ভস্থ পানি তোলার জন্য নলকূপ বসানোর পরিকল্পনা হাতে নিতে হয়। আবার ১৯৯৩ সালের দিকে যখন দেশব্যাপী অগভীর-নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হ’লো তখন জানা গেলো প্রায় ২৯ শতাংশ অগভীর নল-কূপের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিক আছে। দেশের পার্বত্য তিনটি জেলা ছাড়া বাকি সবগুলো জেলার ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা গেলো। সেই সাথে আরো দেখা গেলো মাটির একটু গভীরের স্তরের পানি আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নিরাপদ। দ্বিতীয় স্তরের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি নেই। এটাতে সারা দেশব্যপী গভীর-নলকূপ বসানোর প্রয়োজন পড়লো আরো বেশি ক’রে। (১)

অর্থনীতির পরিসংখ্যান ব’লছে ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেশ তরান্বিত হ’য়েছে। আর অর্থনৈতিক অগ্রগতি সব সময়ই নগরায়নকে তরান্বিত করে। এই সময় নানা কারণে খুলনা পিছিয়ে পড়তে থাকে। ফলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহরের লোক-সংখ্যা কমতে শুরু করে। বন্ধ হ’তে শুরু করে এই শহরের অনেকগুলো কারখানা। তার বেশ খানিকটা প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ঢাকা আর তার আশপাশের শহরতলীগুলোর উপর, যেখানে পুরোনো কিছু কারখানা আগে থেকেই আছে আর নতুন নতুন পোশাক-কারখানা গ’ড়ে উঠছে।

মনে রাখা দরকার পোশাক-কারখানাতে প্রচুর পরিমাণে পানযোগ্য পানির প্রয়োজন হয়। আর এই কারখানাগুলো উপজাত হিসেবে সমপরিমাণে দূষিত পানি উৎপাদন করে। বিলেতের ম্যানচেস্টার যখন পৃথিবীর কাপড়-তৈরীর কারখানা আর বাজারের সিংহভাগ দখল নিয়েছিলো তখন সেখানকার প্রায় সবগুলো খাল-নদীর পানি এমনই দূষণের শিকার হ’য়েছিলো যে সেখানকার নদীগুলো থেকে প্রায় সব ধরণের মাছ আর জলজ প্রাণী হারিয়ে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে য়ুরোপের বেশির ভাগ বড় শহরকেও শিল্পায়নের এই ধরণের ক্ষতিকর প্রভাবের ভেতর দিয়ে যেতে হ’য়েছে। স্বাদুপানি বা মিঠাপানির মাছ যে কি জিনিস তা যুরোপ এখন আর জানে না ব’ললেই চলে।

ঢাকার সীমান্তবর্তী তুরাগ আর বুড়িগঙ্গার পনি এখন এমনই দূষিত যে সেখানে আর তেমন কোনো জলজ-প্রাণী নেই ব’ললেই চলে। অনেক বিশেষজ্ঞ ব’লছেন এই পানি এখন আর শোধনের উপযোগীও নেই। জানি না সাইদাবাদ কিংবা পাগলার শোধনাগারের ঠিত কতটা পানি এখনো বুড়িগঙ্গা থেকে জোগাড় করা হয়। শোনা যাচ্ছে, পদ্মা নদী থেকে পানি তুলে সেই পানি শোধন ক’রে ঢাকার বাসা বাড়িতে সরবরাহ করার পরিকল্পনা করছে সরকার।(২) এই পরিকল্পনা যে একেবারে বাধ্য হ’য়েই করতে হচ্ছে তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোর পানি এরই ভেতরে এতটাই দূষিত হ’য়ে গিয়েছে যে তাকে শোধন ক’রে পানযোগ্য করা অর্থনৈতিক বিচারে আর লাভজনক নেই। উপরন্তু বুড়িগঙ্গা, বালু আর তুরাগ নদীতে পানির পরিমাণও অনেক কমে গিয়েছে। তার পরিণতিতে প্রতিদিনই ঢাকার পানির-স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০০৯ সালে ঢাকা-ওয়াসার তখনকার ব্যবস্থাপনা-পরিচালক জনাব রায়হানুল আবেদিন বলেছিলেন, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির-স্তর বছরে ৩ মিটার ক’রে নিচে নেমে যাচ্ছে।(৩) এ সম্পর্কিত ২০২১ সালের তথ্য এখনো যোগাড় ক’রতে পারিনি, তবে ধারণা করি পানির-স্তর নেমে যাওয়ার হার আরো বেড়েছে।

ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের একটা সাধারণ রেখাচিত্র দেখে নেওয়া যাক। এটি নেওয়া হ’য়েছে https://wtamu.edu/~cbaird/sq/2013/07/16/how-do-wells-get-their-water-from-underground-rivers/ ওয়েবপেইজ থেকে।

কনফাইন্ড আর আনকনফাইন্ড এ্যাকুইফারকে যথাক্রমে সদা-পরিবর্তনশীল আর তুলনামূলক ভাবে কম-পরিবর্তনশীল ভূ-গর্ভস্থ জলাধার বলা যায়। সদা-পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ জলাধার সাধারণত মাটির কম গভীরতাতে অবস্থিত হয় আর এর উপরে থাকা মাটি এমন বৈশিষ্ট্যের হয় যে তার ভেতরে বৃষ্টি কিংবা নদীর পানি সহজে ঢুকতে পারে। এই ভূগর্ভস্থ জলাধারের পানির একদম উপরের তলকে ‘ওয়াটার-টেবল’ বা পানির-স্তর বলা হয়। পানির এই স্তর বর্ষাকালে উপরে উঠে আসে আর শীতকালে নিচে নেমে যায়। এই ধরণের ভূ-গর্ভস্থ জলাধারের নিচে যাদি এমন একটা মাটির স্তর থাকে যার ভেতরে সহজে পানি ঢুকতে পারে না তবে সেই মাটির স্তরের নিচে কম-পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ জলাধার গড়ে উঠতে পারে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে। এমন ধরণের ভূগর্ভস্থ জলাধার কয়েক স্তরের হ’তে পারে, কখনো কখনো তা মাটির উপরের দিকেও থাকতে পারে, তবে সাধারণত মাটির বেশ নিচেই এদেরকে পাওয়া যায়।

অগভীর নলকূপ দিয়ে খুব সহজেই মাটির উপরের দিকের জলাধারের পানি তুলে আনা যায়। আমাদের দেশের প্রায় সব জায়গাতেই আমরা এটা করছি বেশ অনেক বছর ধ’রে। যেহেতু বাংলাদেশে নদী-নালার পরিমাণ বেশ বেশি তাই এই তুলে আনা পানির কতটা আমরা আবার মাটিতে ফিরিয়ে দিচ্ছি তা নিয়ে আমাদের খুব একটা ভাবতে হয়নি এতদিন। সে যেমন গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে, একই সাথে শহুরে প্রেক্ষাপটেও। কিন্তু দুষ্টুলোকেরা যে বলে, সুখের দিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা এই ক্ষেত্রে পুরো খেটে গেছে।

অধিক জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের নিশ্চয়তা বৃদ্ধির প্রয়োজনে আমাদেরকে বাড়াতে হ’য়েছে আবাদি জমির পরিমাণ, সেই সাথে সেচের ব্যবস্থা। ১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেশের অনেকগুলো জায়গাতে সেচের প্রয়োজনে গভীর নলকূপ বসানোর কার্যক্রম শুরু হয়। (৪) এর সাথে পরবর্তীতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদী থেকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের গ্রামাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যেতে শুরু করে। ফলে দেশের কৃষি-ব্যবস্থাতে গভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়ানোর আপাত প্রয়োজন বেড়ে যায়।

আর শহরের গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে শহরে বাড়তে থাকে জন-ঘনত্ব। তাতে পানযোগ্য পানির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তার সাথে শহরে যদি এমন ধরণের শিল্প-কারখানা গ’ড়ে তোলা হয় যার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন পড়ে তবে সেই পানির চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থাপনা খুব গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে দাঁড়ায়; আজ ঢাকার জন্য যেমনটা হ’য়ে উঠেছে।

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে বেশ বড়সড় একটা জটিলতা দেখা দিয়েছে কয়েক বছর আগে। জাকার্তা শহরের আয়তন আর গড়পড়তা ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খুব দ্রুত শহরের পানির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই চাহিদা পূরণের জন্য প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিতে হয়েছে জাকার্তাবাসীদেরকে। তাতে এই শহর যে মাটির উপর দাড়িয়ে আছে তার বৈশিষ্ট্য গিয়েছে পালটে। মাটির সদা-পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ জলাধারে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই অংশের মাটির চাপ ধারণ ক্ষমতাও গিয়েছে কমে। আবার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইমারত তৈরী হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। যার ফলে মাটির উপর যতটা ভর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ততটা ভর এখানকার মাটি নিতে পারছে না। প্রতিবছরই তাই একটু একটু ক’রে জাকার্তা শহর বসে যাচ্ছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির স্তর যাচ্ছে বেড়ে। সব মিলিয়ে জাকার্তা শহর তলিয়ে যেতে শুরু ক’রেছে। এখন বাধ্য হ’য়ে ইন্দোনেশিয়াকে তার রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।

ঢাকার জন্যও একই ধরণের ভয় বাড়ছে। ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি অতিরিক্ত মাত্রায় দূষণের কবলে পড়েছে মূলত পোশাক আর চামড়া শিল্পের জন্য। সেই সাথে আমরা এত বেশি পলিথিন বর্জ্য নদীতে ফেলেছি যে নদীর নীচের মাটি আর পার্মিয়েবল বা পানি-শোষণক্ষম নেই ব’ললেই চলে।

শোনা যায় রাজা বল্লাল সেনের রাজধানী পদ্মার ভাঙনে খুব অল্প কিছু দিনে বা বছরের ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলো। তার রাজবাড়ির কিছুই এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার নতুন ক’রে  বল্লাল সেন আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য গ’ড়ে তুলতে পরেছিলেন কিনা তা জানতে পারিনি এখনো।

ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একে আর কত দিন রাজধানী হিসেবে টিকিয়ে রাখা যাবে তা এক গুরুতর প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্নটা দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহলে উচ্চারিত হয় কিনা সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই ব’লে দুঃখ প্রকাশ ক’রে নিচ্ছি। তবে এটা ব’লতে পারি সে ধারণা তৈরীর চেষ্টা করছি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার ভাবনা সরকারের আছে কিনা জানি না। তবে ঢাকার পানি-ব্যবস্থাপনা আর দেশে আরো কিছু বড় শহর গ’ড়ে তোলা নিয়ে কার্যকর ভাবনা খুব দ্রুত বিকাশ করা প্রয়োজন। আর তা করা না গেলে রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার মতো ভয়ানক ভাবনা ভাবারও প্রয়োজন পড়তে পারে অদূর ভবিষ্যতে।

সূত্র :

১.  https://old.dphe.gov.bd/index.php?option=com_content&view=article&id=96&Itemid=104

২. https://www.prothomalo.com/bangladesh/%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A6%A8

৩.  https://www.thedailystar.net/news-detail-83387

৪. এই ব্যাপারে কিছু চিত্তাকর্ষক তথ্য পাওয়ার জন্য যৌথভাবে লেখা বেটসি হার্টম্যান এবং জেমস্ কে. বয়সি এর A QUIET VIOLENCE _ View from a Bangladesh Village বইয়ের Tubewells for the Rich অংশটি পড়া যেতে পারে।

৫. সচলায়তনের জন্য লেখা। ওখানকার ক্রম ৬