একটি শহুরে গল্প -১৬

কিছুদিন রিমির আচরণ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না আবির। দেখা ক’রতে চাইলে প্রায়ই বলে ‘আজ না, আর একদিন।’ সেই আর একদিনও যে কবে তাও ঠিক ক’রে বলে না। এদিকে আবিরের ফ্লাইট আর দশ দিন পর। অনেক পিড়াপিড়ির পর রিমি আজ রাজি হ’য়েছে। ক্লাসের পর সাড়ে তিনটায় ক্যাম্পাসে এলে দেখা হবে, নয়তো নয়। আবির প্রথমে চিন্তায় প’ড়ে যায়। যদিও রিমিকে বলে যে ও আসবে সময় মতো। কিন্তু অফিস থেকে কি ব’লে বের হওয়া যায় সেটাই ভেবে বের করতে পারে না। 

অফিসের সহকর্মী হাসিবুল কবিরের সাথে অবিরের বেশ জানাশোনো হ’য়েছে এই ক’দিনে। যদিও মার্কেটিঙের লোক। ফলে সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক রেখে চলে কিনা তাই নিয়ে আবিরের মনে দ্বিধা কাজ করে ঠিকই। তবুও কি মনে ক’রে দুপুরের খাওয়ার সময় আবির ছুটির ব্যাপারটা নিয়ে হাসিবুলের সাথে কথা বলে। হাসিবুল জানতে চায় আবিরের রিপোর্টিং বস কে?

  • ‘জুবায়েদ আলী স্যার।’
  • ‘জুবায়েদ ভাই তো খুব ভালো লোক। কোনো চিন্তা না ক’রে ওনাকে সরাসরি ব’লে ফেলেন। আমার মনে হয় না ঝামেলা হবে।’
  • ‘কিন্তু স্যারকে তো খুব সিরিয়াস মানুষ মনে হয়। তার উপর উনি মাত্র গত মাসেই জয়েন করেছেন আমাদের সেকশনে। কাজের বাইরে কখনো কোনো কথা ব’লতে দেখিনি ওনাকে এর মধ্যে।’
  • ‘আমি ওনাকে অনেক দিন ধ’রে চিনি। ভয় পেয়েন না। দেখেন ব’ললেই হবে।’

হাসিবুলের কথায় ভরসা পেয়ে কিংবা আর মাত্র ৭ দিন চাকরীতে আছে এই চিন্তা ক’রে আবির মনে আর কোনো দ্বিধা রাখে না। সরাসরিই জুবাইদ আলীকে ব’লে ফেলে রিমির কথা। দেখা যায় জুবাইদ আলী আসলেই স্বজ্জন লোক। এক কথাতেই রাজি হ’য়ে গেছে। শুধু হাতে কোনো কাজ থকালে তা ওর সহকর্মী রায়হানকে বুঝিয়ে দিয়ে যেতে বলে।

আবিরের হাতে কোনো কাজ জমে নেই। তাই অফিসের টেবিলটা গুছিয়ে একটু পরই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। শাহবাগ পৌঁছে দেখে হাতে তখনো কিছু সময় আছে। আবির একটা হলুদ গোলাপ কেনে রিমির জন্য। ফুল এখনো ফোটেনি। এক ধরণের নরম জালি দিয়ে কুড়িটাকে মুড়িয়ে রাখা। এটা খুলে পানিতে রাখলে নাকি সন্ধ্যার দিকে ফুল ফুটতে শুরু করবে। কুড়িটা বেশ বড়সড়। দেখতে খুব সতেজ আর তরতাজা মনে হয়।

ফুলটা রিমির খুব পছন্দ হয়। আবিরের হাত ধ’রে টেনে ওকে চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবিরের মনে হয় আজ রিমির মনটা বেশ ভাল। কিংবা গত কয়েক দিনের দুর্ভাবনাটা যেন এখন আর ওর ভেতরে নেই।

  • ‘জানো? আজ একটা নাম্বার পেয়েছি। রাশেদ জামানের। ঠিক করেছি আজ সন্ধ্যায়ই যোগাযোগ করবো। তুমি কী বলো?’
  • ‘নাম্বার কোথায় পেলে?’
  • ‘ফুপু দিয়েছেন। আমার চিঠির কপি পাওয়ার পর ফুপু অস্ট্রেলিয়াতে অনেক যোগাযোগ করেছেন বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। আর ওখানকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাশেদ জামান দুইটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট টিচার এখন।’
  • ‘ফুপু ওনার সাথে কথা বলেছেন?’
  • ‘হুম, বলেছেন।’ তারপর খানিকটা চুপ থেকে রিমি জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার মাথায় এই প্রশ্ন এলো কেন?’
  • ‘কোন প্রশ্ন?’ আবির জানতে চায়।
  • ‘এই যে রাশেদ জামানের সাথে ফুপুর কথা হয়েছে কিনা।’
  • ‘এমনিই। এমনও তো হ’তে পারে এই রাশেদ জামান সেই রাশেদ জামান নন।’
  • ‘না, উনিই। ফুপু নিশ্চিত না হ’ল আমাকে ওনার নাম্বার দিতেন না।’
  • ‘তা হ’লে আর চিন্তা কী! কথা ব’লে দেখো।’

কিন্তু বাসায় ফিরে রিমি কয়েক বার চেষ্টা ক’রেও সেই নাম্বারে কাউকে পায় না। প্রতিবারই রিং হয়, কিন্তু ফোনের রিসিভার তোলে না কেউ। রিমির মনে আবার সেই মনমরা ব্যাপারটা ফিরে আসে। খাবার টেবিলে সেটা জহিরুদ্দিন সিরাজীর নজর এ্যাড়ায় না। ‘কি রে মা! শরীর খারাপ?’

  • ‘না, বাবা।’
  • ‘তবে? তোকে কেমন যেন বিষন্ন দেখাচ্ছে! আমার ছেলে-মেয়েরা বিষন্ন থাকবে কেন?’ জহিরুদ্দিনের কন্ঠে রসিকতার সুর।
  • ‘এমন কিছু না। ক্লাস ছিলো বিকাল পর্যন্ত আজ। তাই খানিকটা ক্লান্ত। খাওয়াদাওয়ার পর চা খেলে ঠিক হ’য়ে যাবে। তুমি যে রাতের বেলা কফি খাও, তোমার কখনো ঘুমের সমস্যা হয় না?’ উল্টো রিমি প্রশ্ন করে বাবাকে।
  • ‘সে তো শুতে শুতে প্রায় দুইটা। কফি এতক্ষণ শরীরে এ্যাফেক্ট করে না।’
  • ‘এত কফি খেয়ো না তো বাবা। তোমার তো বয়স হয়েছে।’
  • ‘নাহ! কত আর বয়স! এখনো তো অবসরেই যায়নি। তারপর ওসব নিয়ে ভাবা যাবে।’
  • ‘আচ্ছা বাবা, তোমার মার কথা মনে পড়ে?’
  • ‘পড়ে। সবসময়ই পড়ে।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘ভেতরে ভেতরে যে এতটা অসুস্থ হ’য়ে গিয়েছিলো কে বলবে! আমাকেও কখনো কিছু বলেনি। আমি টেরও পাইনি। অদ্ভুত লাগে ভাবতে…’
  • ‘আমারো অদ্ভুত লাগে। যে দিন হাসপাতালে নিতে হ’লো তার আগে সম্ভবত দুই দিন দেখেছি আগে আগে কলেজ থেকে চ’লে এসেছে। এখন মনে হয় প্রথম দিনই যদি মাকে ডাক্তারের কাছে যেতে ব’লতাম!’ ব’লে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে রিমি। জহিরুদ্দিনও আর কোনো কথা বলে না। বাকিটা খাওয়া একরকম চুপচাপই শেষ করে ওরা।

খাওয়া শেষ হ’লে জহিরুদ্দিন পড়ার ঘরে ঢুকে যায়। আর রিমি ওর নিজের ঘরে। একটা অদ্ভুত একাকিত্ব যেন রিমিকে ঘিরে ধরে। কেমন একটা দুর্বোধ্য অস্থিরতা আচ্ছন্ন ক’রে ফেলে ওকে। একবার মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে তো পরক্ষণেই আবার তা ঝাপসা হ’য়ে আসে। কখন যে রিমির চোখ গলিয়ে পানি পড়তে শুরু করে তা ও নিজেই টের পায় না। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে রিমি।

পরদিন খুব সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই আবিরের কথা মনে আসে। গতকাল আবিরকে ভর-দুপুরে ডেকে এনেও খুব বেশি কথা বলা হয়নি ওর সাথে। রিমি এগারোটার দিকে আবিরের অফিসে ফোনকল করে। এ্যাডমিনের আব্দুল গফুর ফোনটা ধরে। আব্দুল গফুর রিমিকে জানায় যে আবির বেশ আগেই অফিসের কোনো একটা কাজে বেরিয়ে গিয়েছে আজ। সাথে অফিসের আরো কয়েকজন ছিলো। সম্ভবত আজ আর অফিসে ফিরবে না।

আরো দুই দিন পর আবিরের সাথে রিমির দেখা হয়। আমেরিকা যাওয়ার আগে আবির কিছু কাপড়চোপড় কিনতে চায়। তার জন্য নিউ-এলিফ্যান্ট রোডে এসেছে আবির। রিমি ওর জন্য শার্ট বেছে দেয় দুইটা। আবিরের বেশ পছন্দ হয় শার্ট দুইটা। আবির রিমিকেও কিছু একটা কিনে দিতে চায়। কিন্তু তার জন্য নিউ-মার্কেটে যেতে হবে কিনা বুঝে উঠতে পারে না। ‘কি ভাবছো অত?’ রিমির চোখ এড়ায় না সেটা।

  • ‘না, তেমন কিছু না। তোমাকে একটা শাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু এখানে কি শাড়ি পাওয়া যাবে?’
  • ‘তাই?’
  • ‘হুম।’ একটু টেনে বলে আবির। রিমির এটা খুব আপন আপন লাগে।
  • ‘শাড়ি না, তুমি বরং আমাকে দুইটা টি-শার্ট কিনে দাও।’
  • ‘কোত্থেকে কিনবে?’ জানতে চায় আবির।
  • ‘নতুন একটা দোকান হয়েছে, নিত্য উপহার। দারুন কিছু গ্রাফিক্স করছে ওরা। আজিজ মার্কেটে। চলো দেখি।’

বেশ কয়েকটা টি-শার্ট পছন্দ হয় ওদের দুইজনের। আবির নিজের জন্যও দুইটা কিনে ফেলে। এরপর ওরা ঘুরতে বের হয় রিকশা ক’রে। ‘ইস, আমরা যদি প্রতিদিন এই রকম রিকশা ক’রে ঘুরতে ঘুরতে প্রেম করতে পারতাম!’ রিমি আবিরের হাত ধ’রে বলে।

  • ‘মন্দ হ’তো না, কি বলো?’
  • ‘আচ্ছা তোমার যাওয়ার আগে আমরা প্রতিদিন ঘুরতে বের হবো?’
  • ‘বের হ’তে চাও?’
  • ‘হুম চাই। পারবে আসতে প্রতিদিন?’
  • ‘একবার বাড়ি যাবো। আগামী চার দিন পারবো। তারপর আপাতত ব’লতে পারছি না।’ শুনে একটু মন ভার হয় রিমির। মনে মনে ভাবতে থাকে, আবির কি আরো কিছু দিন থাকতে পারতো না ঢাকাতে! অন্তত ওর এই সময়টাতে। মায়ের চিঠিগুলোর কথা মাথায় আসে। মা কি পারতো না চিঠিগুলো নষ্ট ক’রে ফেলতে! মায়ের উপর, আবিরের উপর এক ধরণের অভিমান ফেনিয়ে উঠতে থাকে রিমির।
  • ‘আবির, আমার খুব একা লাগে ইদানিং।’ কান্না কান্না কন্ঠে বলে রিমি। ‘কখনো কখনো মনে হয় তোমাকে জড়িয়ে ধ’রে বসে থাকি সারাক্ষণ। যাওয়ার আগে একদিন বাসায় আসবে? একদিন সারাদিন আমার সাথে থাকবে?’
  • ‘বাবা?’
  • ‘বাবা তো দিনে অফিসে থাকে। আর থাকলোই না হয় বাবা?’ রিমির গলায় আব্দারের সুর।
  • ‘আমার সিডিউল তো জানো। বৃহস্পতিবার শেষ অফিস। ঐদিন শুধু রিপোর্টিং ব’লতে পারো। লাঞ্চের আগে আগে চ’লে আসতে পারবো। সেদিন হ’লে হবে?’
  • ‘হবে।’ ছোট্ট করে বলে রিমি।

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে আছে আবির। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটা বিমানে ওর জার্নি শুরু হবে। রিমির কথা মনে প’ড়তে থাকে আবিরের। তিনদিন আগে আবিরের রিমিদের বাসায় যাওয়ার কথা ছিলো। কথা ছিলো আবির দুপুরের খাবারের আগেই পৌঁছে যাবে ওদের বাসায়। তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত রিমি আর আবির একসাথে কাটাবে। কিন্তু আবিরকে অফিস থেকে বিদায় জানানোর একটা আয়োজন করেছিলো ওর কলিগরা, জুবাইদ আলীর নির্দেশে। আবিদ আটকে গিয়েছিলো। রিমিদের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আবিরের দুইটা বেজে যায়। রিমি আবিরকে বাসায় ঢুকতে দেয়নি। দারোয়ানের হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিলো, আবির যেন আর কখনো ওর সাথে যোগাযোগ না করে।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -১৫

পার্বতীপুর স্টেশনে এসে ওদের ট্রেন থামে প্রায় সাড়ে আটটার দিকে। চারপাশে ঘন অন্ধকার। প্লাটফর্ম পেরিয়ে স্টেশন-বিল্ডিঙে আসতেই নাবিলা দেখে আহসান হাবিব ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। আহসান হাবিব এগিয়ে এসে নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে। ‘পথে কোনো ঝামেলা হয়নি তো পিচ্চি?’

  • ‘না চাচ্চু। তুমি কেমন আছো?’
  • ‘আমি ভালো।’ তারপর যুথি আর কলির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমরা একটু হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হ’য়ে নিবে? আমাদের দিনাজপুর পৌঁছাতে আরো প্রায় ৪০/৪৫ মিনিট সময় লাগবে।’
  • ‘আমি একটু ওয়াশরুমে যাবো।’ কলি জানায়।
  •  ‘পাবলিক টয়লেটটা একটু সামনে। চলো আমরা ঐ দিকটাতে যাই।’ আহসান হাবিব ওদেরকে পথ দেখিয়ে দেয়। সবাই একটু ফ্রেশ হ’লে পর ওরা স্টেশন বিল্ডিং থেকে বের হ’য়ে আসে। স্টেশনের একরকম মুখেই ওদের গাড়ি অপেক্ষা করছে। একটা নীল মিতসুভিসি পাজেরো। আহসান হাবিব সামনের সিটে গিয়ে বসে। একেএকে গাড়িতে কলি, যুথি আর নাবিলা চ’ড়ে বসে। কলি গাড়িতে ওঠার সময় চাচ্চু যেন শুনতে না পারে এমন ক’রে নবিলাকে বলে, ‘আমি আগে উঠি পিচ্চি?’ নাবিলা চোখ পাকিয়ে তাকায় ওর দিকে।

ওদের ব্যাগপ্যাকগুলো খুব বড় নয়। যে যারটা তার হাতেই রাখে। গাড়ি ছাড়ার পর আহসান হাবিব নাবিলার হাতে একটা ছোট হটপট তুলে দেয়। পথে খাওয়ার জন্য চাচী মাংসের টিকিয়া বানিয়ে পাঠিয়েছে। যুথি আর কলি হামলে পড়ে সেটার উপর। আহসান হাবিব সেটা দেখেও না দেখার ভান ক’রে ড্রাইভার লিটনকে সামনের রাস্তার কোনো একটা ভাঙার দিকে খেয়াল করতে ব’লে। এইদিকের রাস্তায় বেশ কিছু জায়গাতে কাদা জমে আছে। হয়তো দিনে কোনো সময়ে বৃষ্টি হয়েছে।

আহসান হাবিবের সরকারী কোয়ার্টারে পৌঁছাতে প্রায় ১০টা বেজে যায় ওদের। ওরা ভেতরে ঢুকতেই ইকবাল এসে নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে। ‘আপু, আমার জন্য কি এনেছো?’

  • ‘কী চায় তোর বল?’
  • ‘তোমাকে কাল বলবো, এখন মার সামনে বলা যাবে না।’ রানু সেটা শুনে ফেলে। ‘ছাড় তো ওকে এখন। মেয়েটা আসতে পারলো না আর তুই বাইনা শুরু করলি!’ এ কথাতেও ইকবাল নাবিলাকে ছাড়ে না। নাবিলার এক হাত ধ’রে ওদের সাথে সাথে ভেতরে ঢোকে। যুথি তখন ওর ব্যাগ থেকে বের ক’রে ইকবালের হাতে একটা চকলেট তুলে দেয়।

রানু যুথি আর কলিকে ওদের ঘরটা দেখিয়ে দেয়। ‘তোমরা কাপড়-চোপড় ছেড়ে একটু গুছিয়ে নাও। আমি খাবারের ব্যবস্থা করি। খাবার টেবিলেই কথা হবে, কি বলো?’

  • ‘আচ্ছা চাচী।’ যুথি আর কলি একই সাথে বলে।
  • ‘তুই আমার সাথে আয়।’ নাবিলাকে নির্দেশ ক’রে বলে রানু। ওদের ঘর থেকে বের হ’য়ে ওরা ইকবালের ঘরে ঢোকে। বেশ বড়সড় ঘরটা। সেখানে রানু নাবিলার জন্য আর একটা খাট পেতে দিয়েছে। ‘তুই ইকবালের সাথে এই ঘরে থাকবি।  বসার ঘরের খাটে মশারি টাঙানোর ব্যবস্থা নেই। কয়েকদিন খুব মশা হয়েছে।’
  • ‘ঠিক আছে চাচী।’
  • ‘তাহলে তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে খাবার ঘরে আয়।’ ইকবালের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুই ওদেরকে দেখিয়ে দিস। আমি খাবার ঘরে গেলাম।’

নাবিলা চটজলদি গোসল ক’রে নেয়। তারপর ইকবালকে সাথে করে যুথি আর কলিদের ঘরে যায়। যুথি বিছানায় গড়াগড়ি করছে আর কলি বাথরুমে। ‘কলি এখনো বের হয়নি?’

  • ‘উহু। কতক্ষণে যে বেরোবে কে জানে? ততক্ষণে না আমি আবার ঘুমিয়ে যাই!’
  • ‘ঐ ঘরের বাথরুমে যাবি?’
  • ‘না, থাক। দেখি কলিকে একটু নক ক’রে।’ ব’লে বিছানা থেকে উঠে যুথি বাথরুমের দরজায় টোকা দেয়। ‘এই তোর হ’লো?’
  • ‘কেন? তোর ইমারজেন্সি?’ কলির উত্তর আসে। শুনে নাবিলা না হেসে পারে না।
  • ‘তুই চল আমার সাথে। ঐ ঘরের বাথরুমটা দেখিয়ে দিই তোকে। আর আমি গিয়ে দেখি চাচী কী করে।’ যুথি যাওয়ার সময় কলির বাথরুমে আবার টোকা দেয়। ‘৫ মিনিটের ভেতরে যদি বের না হোস তোর কিন্তু আজ খবর আছে!’
  • ‘১০ টাকা বাজি।’ নাবিলা বলে।
  • ‘আচ্ছা যা বাজি। যদিও জানি হারবো।’

ইকবাল আর নাবিলা রান্না ঘরে ঢোকে। কাজের লোক রাহেলা খাবার গরম করছে। চাচী হাড়ি থেকে ভাত একটা বাটিতে তুলে তা ইকবালের হাতে দেয়। ডালের বাটিটা দেয় নাবিলার হাতে। ‘তোরা গিয়ে টেবিলে বস। আর ওরা কই?’

  • ‘ওরা এখনো ওয়াশরুমে। চাচ্চু কই চাচী?’
  • ‘বাবা টিভি দেখে।’ ইকবাল তড়িৎ জানায়।
  • ‘চল, আমরাও টিভি দেখি গিয়ে।’
  • ‘বাবা তো খবর দেখে।’
  • ‘তুই খবর দেখিস না!’
  • ‘দে..খি..’ টেনেটেনে বলে ইকবাল। ‘তবে কম..’
  • ‘আচ্ছা চল দেখি ওরা বের হ’লো কিনা।

নাবিলা বাজিতে হেরে গেছে। ব্যাপারটা যুথিরও বিশ্বাস হচ্ছে না। ‘এই তুই কি আমাদের কথা শুনে ফেলেছিলি?’

  • ‘কোন কথা?’
  • ‘পরে বলবো। চল এখন তাড়াতাড়ি। চাচী খাবার সাজিয়ে বসে আছেন।’

খাওয়াদাওয়া শেষ ক’রে ওরা দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়ে। একেতে লম্বা ভ্রমণের ধকল তার উপর চারপাশটা যেন আরো আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। এমন সময় জেগে থাকাটাই কেমন যেন অস্বাভাবিক।

নাবিলার সব সময়ই খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে মশারির ভেতর থেকেই চারপাশে একটু দেখার চেষ্টা করে। জানলার দিকে তাকিয়ে বোঝা যায় উষার আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। ঘরে খুবই সামান্য আলো আসছে। তাতেও বোঝা যায় ইকবাল পাশের বিছানায় ঘুমাচ্ছে। দূরের কোনো একটা পাখির ডাক শোনা যায় কি যায় না। নাবিলা উঠে পড়ে বিছানা ছেড়ে।

দাঁত মেজে বাথরুম সেরে নাবিলা বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়। আরো একটু আলো ফুটেছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে বেশ দূরের আর একটা কোয়ার্টার দেখা যাচ্ছে। শহর এত চুপচাপ হ’তে পারে! খুলনার কথা মনে আসে নাবিলার। খুলনা শহরের শব্দে কেমন যেন একটা পাগলামী আছে! দিনের শব্দে, রাতের শব্দে, সকালের শব্দে, বিকালের শব্দে, বাড়ির শব্দে, রাস্তার শব্দে, পাটকলের শব্দে, ম্যাচ ফ্যাক্টরির শব্দে…। নাবিলার স্মৃতিতে নানা শব্দ দুলে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শব্দ, রূপসা নদীর শব্দ, ফিসারি ঘাটের লঞ্চের শব্দ, গাড়ির শব্দ, রিকশার শব্দ… চেনা শহরের শব্দ, অচেনা শহরের শব্দ। কয়েক দিন আগে যে যশোর থেকে ঘুরে আসলো তার শব্দ আবার আর এক রকম। আচ্ছা একেক শহরের শব্দ কি একেক রকম? নাকি ওর কাছে আজকের সকালে একেক রকম লাগছে কোনো কারণে? 

  • ‘উঠে পড়েছিস?’ চাচীর কথায় নাবিলার যেন ঘোর কাটে।
  • ‘হুম। তুমি কখন উঠলে?’
  • ‘মাত্রই। তুই হাত-মুখ ধুয়েছিস?
  • ‘হুম।’
  • ‘আয় তবে আমার সাথে। তোর চাচ্চুও উঠে পড়েছে। এক সাথে চা খাই চল।’
  • ‘ইকবালকে তুলবে না?’
  • ‘এখন? দেখ তুলতে পারিস কিনা! আমি আটটার সময়ও টেনে তুলতে পারি না।’
  • ‘আচ্ছা সাতটার দিকে টানাটানি ক’রে দেখবো। চলো… চা বানিয়েছো না বানাবে?’
  • ‘চুলায় পানি দিয়েছি। রং-চা কিন্তু। আমি বিয়ের আগে রং-চা খেতেই পারতাম না। এখন তোর চাচ্চুর পাল্লায় প’ড়ে সকাল বিকাল এটাই খাই। অভ্যাস হ’য়ে গেছে।’
  • ‘তুমি বিয়ের আগে থেকেই সকালে চা খাও?’
  • ‘ও না… আমাদের বাসায় চায়ের চল তেমন একটা ছিলো না। আমাদের বাসায় আমার এক দূর-সম্পর্কের নানী থাকতেন। ওনার ছেলে-মেয়ে ছিলো না কোনো। তাই আমাদের সাথে থাকতেন। ওনার চা খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। সকালের নাস্তা ক’রে বুড়ির এক কাপ গরম-গরম দুধ-চা লাগবেই। নানীর সাথে আমার খুব ভাব ছিলো। ওনার কাপ থেকেই মাঝে মাঝে একদুই চুমুক খেতাম।’ রানু চা বানাতে বানাতে ব’লতে থাকে। ‘কোনো কোনো দিন হয়তো বিকালে নাস্তার সাথে মা চা বানাতো। সব সময় দুধ-চা। এখন যত সহজে চা পাওয়া যায় তখন তো এতটা পাওয়াও যেতো না।’
  • ‘তোরা কি নিয়ে গল্প করছিস?’ আহসান হাবিব রান্না ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে।
  • ‘চাচী ওনার নানীর সাথে চা খাওয়ার গল্প ব’লছে। তোমাকে ব’লেছে কখনো?’ নাবিলার কথায় আহসান রানুর দিকে তাকায়। সে তাকানো প্রেমিকের তাকানো। তাতে অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতুহল।
  • ‘কি জানি! তোর চাচীর অনেক লুকানো গল্প আছে। সবাইকে সব গল্প করে না!’ আহসানের কণ্ঠে কৌতুক। রানু বা নাবিলার কারো সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
  • ‘চান-নানীর কথা বলছি। তুমি তো জানো ওনার কথা।’
  • ‘ও! সেই ধনী ডাইনী বুড়ি?’
  • ‘হয়েছে হয়েছে! নাও এখন চা খাও। নাস্তায় রুটির সাথে কি খাবে বলো।’
  • ‘আলু ছাড়া যে কোনো কিছু।’
  • ‘পটল ভাজিতেও আলু দেয়া যাবে না?’
  • ‘নোপ।’ চাচ্চুর কথায় নাবিলা মিটমিট ক’রে হাসতে থাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুইজন কাজের লোক চ’লে আসে। একজন ঘরদোর পরিস্কার করার। আর অন্যজন রাহেলা, রান্নাবান্নার জন্য। রানু ওদের দুইজনকে কাজের নির্দেশনা দেয়। তারপর নাবিলাকে নিয়ে যুথি আর কলির খোঁজ নিতে যায়। দরজা খোলে কলি। ওরা তখনো ঘুমাচ্ছিলো।

  • ‘তোমরা চাইলে আরো একটু ঘুমাতে পারো। নাস্তা রেডি হ’তে আরো এক ঘন্টা। অবশ্য চাইলে এখন চা খেতে পারো।’
  • ‘তা হ’লে ঘুমাই চাচী। নাস্তার সাথে চা খাবো আমি।’

যুথি আর কলির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রানু দেখে আহসান হাবিব হাঁটতে যাওয়ার জন্য তৈরী। ‘তুমি যাবে আজ?’

  • ‘ওরা আরো একটু ঘুমাবে বললো। চলো যাই।’ স্বামীর সাথে সকালের এই হাঁটাটা রানুর খুব প্রিয়। খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আহসান হাবিবের এই অভ্যাসটা বেশ পুরোনো। ‘তুই যাবি আমাদের সাথে?’ নাবিলাকে জিজ্ঞেস করে রানু।
  • ‘চলো। কত দূর যাবে তোমরা?’
  • ‘দূরে না, এই কমপাউন্ডের ভেতরেই।’ রানু জানায়।
  • ‘এখানে একটা ছোটখাটো মাঠ আছে। বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টোন খেলার মতো। ট্রাক-শুট আনছিস সাথে?’
  • ‘ট্রাউজার-টিশার্ট আছে।’
  • ‘ওকে। দেখি আমাকে ৫০ মিটারে হারাতে পারিস কিনা।’
  • ‘তোমার সাথে পারবো না। আমি তো স্প্রিন্টার না।’
  • ‘আমিও তো না। আমি খেলতাম ফুটবল। যা, তাড়াতাড়ি রেডি হ’য়ে আয়। আর তোর চাচীকে পারলে একটু বোঝা তো ব্যায়ামের সময় শাড়ী না প’রে অন্তত সালোয়ার কামিজ পরা ভালো। আমি এত বছরেও বোঝাতে পারলাম না এটা।’

দেখা যায় নাবিলার কথায় চাচী একবারেই রাজী হয়ে যায়, হয়তো নাবিলার পোশাক দেখে ভরসা পায়। জগিঙের উপযোগী পোশাক রানুর জন্য আসহান হাবিব কয়েক বারই এনে দিয়েছে। রানু কি মনে ক’রে আজ সেগুলো থেকে একটা বের ক’রে পরলো। সেটা দেখে আহসান হাবিব শুধু বললো, ‘বাহ!’

নাবিলার দেখা দেখি রানু একটু দৌড়ানোরও চেষ্টা করলো। অল্প দৌড়েই হাপিয়ে উঠলো যদিও। তবে রানু হাঁটতে পারে বেশ। একটু জিড়িয়ে নিয়ে রানু মাঠটার চারপাশে পাক দিয়ে হাঁটতে লাগলো। আহসান আর নাবিলা একসাথে মাঠটার চারপাশে পাঁচটা পাক দেয়। তারপর দুইজন মাঠের এক কোণে বসে পানি খেতে থাকে। রানু কিছুক্ষণের ভেতরে ওদের সাথে যোগ দেয়। ‘দৌড়ালে তো হার্টবিট বেড়ে যায়। তোমরা এতটা দৌড়ালে কিভাবে?

  • ‘চাচী, তুমি একটু দ্রুত শুরু ক’রে দিয়েছিলে। আস্তে আস্তে স্পিড বাড়াতে হয়। আর একটু তো অভ্যাস লাগেই।’ নাবিলা জানায়।
  • ‘আমাকে আর একটু দেখিয়ে দিস তো।’
  • ‘আচ্ছা। এখন একটু পানি খেয়ে মাঠে গড়াগড়ি করো।’

৪/৫ মিনিট পর নাবিলার সাথে রানু মাঠের লম্বা বরাবর আস্তে আস্তে একটু দৌড়ানোর চেষ্টা করে। আহসান হাবিব মাটিতে গোড়ালি যতটা কম পারা যায় লাগানোর চেষ্টা ক’রতে বলে রানুকে। এবার বেশ সহজেই সেটা পারে রানু।

বাসায় ফিরে দেখা যায় যুথি ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে একটা বই হাতে নিয়ে বসেছে। আর কলি তখনো ঘুমে। নাবিলা কলি আর ইকবাল দুইজনকেই বিছানা থেকে টেনে তুলে ফেলে। অদ্ভুত ভাবে কেউই কোনো অপত্তি করে না।

পরিকল্পনা করা হয় আজ ওরা শুধু শহরটা ঘুরে দেখবে। বিকালে বড়মাঠ আর রামসাগর দেখতে যাবে ওরা। সাথে চাচী আর ইকবালও যাবে। আর টিকেট পাওয়া গেলে লিলি সিনেমা হলে ওরা একটা সিনেমা দেখবে। কান্ত-জিউয়ের মন্দির দেখতে যাবে শুক্রবার চাচ্চু আহসান হাবিবের সাথে। মাঝখানের একটা দিন কি করা যায় তাই নিয়ে কথা হয় কিন্তু ঠিকঠাক হয়না কি করা হবে।

যু্থির একটা স্বভাব যে শহরেই যাক না কেন সেখানকার লাইব্রেরী ঘুরে ২/৩ টা বই কিনবেই। বইয়ের দোকানে গিয়ে ওরা এক লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে জানতে পারে দিনাজপুরের কালিয়া-জিউয়ের মন্দির আর রাজবাড়ির কথা। মন্দিরটা রাজবাড়ির লাগোয়া। রাজবাড়ির লোকজন এই মন্দিরে পূজা করতো। আর সার্বোজনীন পূজার জন্য নাকি রাজবাড়ির বাইরে একটা পূজার মন্ডপও আছে। সবচেয়ে বড় কথা রাজবাড়িটা শহরের ভেতরেই। ফলে সকালে বেরিয়ে দুপুরের ভেতরেই ঘোরাঘুরি শেষ করে বাসায় ফিরে আসা যায়। ওরা ঠিক করে আগামী কাল ওরা ওখানে যাবে।   

(চলবে)

নগরী ঢাকা ১২

পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতে না পারলে তার পরিণতিতে সমাজে ক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে ব’লে লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক করেছিলেন। (১) এই পর্যাপ্ত ব্যাপারটা খুব নির্দিষ্ট ক’রে যে বলা যাবে তা হয়তো নয়। সমাজ, শহর, অর্থনীতি ভেদে এই পর্যাপ্ততার ব্যাপারটা ওঠানামা করে এবং করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ ধারাবাহিক ভাবেই বাড়ছে গত কয়েক দশক ধ’রে। তার পরিণতিতে দেশে ভালো মানের আবাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনও বাড়ছে। দেশে ভবন নির্মাণের গড় গুণগত মান যে বাড়ছে তাতে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সুউচ্চ ভবন আমাদের কাছে বেশ পরিচিত হ’য়ে উঠতে শুরু করেছে। এমনকি সেটা ঢাকা শহরের বাইরেও।

সম্প্রতি সরকারী উদ্যোগে নতুন যে সব আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা হচ্ছে তার অনেকগুলোর উচ্চতাই দশ তলার বেশি। এই আবাসন ব্যবস্থাগুলোর কিছু সরকারী কর্মচারীদের জন্য, ফলে বিক্রির জন্য নয়। অনেকগুলো জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে করছে, যেগুলো বিক্রির জন্য। সামরিক আর আধাসামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ক’রে গ’ড়ে তোলা আবাসিক সুবিধাগুলোর অনেকগুলোই ১৪/১৫ তলার কাছাকাছি উচ্চতার।

ঢাকা আর চট্টগ্রামে এখন যে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮) চালু আছে তাতে রাস্তা যদি তুলনামূলক প্রশস্ত হয় তবে তার পাশের জমিতে মোটামুটি ১৪ তলার আবাসিক ভবন তৈরীর অনুমতি পাওয়া যায়, যদি না জমির আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিমাণের কম হয়। আবার একটু উল্টো ক’রে ব’ললে যেহেতু এ্যাপার্টমেন্ট ভবনের (এ-২ টাইপ ভবন) জন্য সর্বোচ্চ ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) ৬.৫ নির্ধারণ করা আছে, আর সে ক্ষেত্রে নিচতলা আর জামিনদোজ (বেইজমেন্ট) ব্যতীত অন্যান্য তলার জন্য জমির সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ জায়গা সীমাবদ্ধ করা আছে সেহেতু ১৪ তলার উপরে আবাসিক ভবন তৈরীর সুযোগ গিয়েছে কমে। যদিও চাইলে ভূমি-ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে আরো উঁচু আবাসিক ভবন তৈরীর অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা করতে ডিভেলপারদেরকে দেখা যায় না বললেই চলে। তার একটা কারণ অর্থনৈতিক আর একটা কারণ সিভিল-এ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া উচ্চতার সীমা, সেটা খুব কম ক্ষেত্রেই ১৫০ ফুটের বেশি হয়। ফলে ঢাকার বা চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনের উচ্চতা ১৪ তলার ভেতরে সীমাবদ্ধ হ’য়ে পড়ছে; বাস্তব বিবেচনায়।

ওয়াল্ডএ্যাটলাস.কম এর অক্টোবর ০৪, ২০২০ এর একটা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে জনঘনত্বের দিক দিয়ে পৃথিবীর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা বর্তমানে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে। (২) এই প্রতিবেদনের মতে ঢাকাতে প্রতিবর্গকিলোমিটারে ২৯০৬৯ জন মানুষের বাস। আবার ওয়াল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিঙ্গাপুর সিটিতে প্রতিবর্গকিলোমিটারে বাস করে ৮৩৫৮ জন মানুষ। আর উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে জন-ঘনত্বের বিবেচনায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৫৫ তম। (৩) সেখানে প্রতিবর্গকিলোমিটারে বাস করে ১৬৬৬১ জন মানুষ।

জন-ঘনত্বের সাথে শহরের ভবনগুলোর উচ্চতার একটা সম্পর্ক নিশ্চয় থাকে। সেটা শুধু ছবি দেখে হয়তো নিশ্চিত করা যাবে না। তার জন্য যথাযত সমীক্ষা হওয়া দরকার। শুধু ছবি দেখে যেটা বলা যায় তা হ’লো সিঙ্গাপুর-সিটি বা হংকং এর সাপেক্ষে ঢাকা বা চট্টগ্রামের ভবনের উচ্চতা বেশ কম। যেহেতু অধিক উঁচু ভবনের নির্মাণ-খরচ মাঝারি-উঁচু ভবনের তুলনায় কম সেহেতু আশা করা যায় ঢাকা বা চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনের নির্মাণ-খরচ সিঙ্গাপুর কিংবা হংকং এর সুউচ্চ আবাসিক ভবনের অনুপাতে কম।

কিন্তু নির্মাণ-খরচ কম হ’লেই যে সেটা এ্যাফোর্ডেবল হবে তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ তার সাথে অনেক সামাজিক আর অর্থনৈতিক সূচক জড়িত। গড় হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় কম হ’লে তাদের পক্ষে অনেক কম-দামী জিনিসও কেনা সম্ভব নাও হ’তে পারে। প্রাপ্ত তথ্য ব’লছে সিঙ্গাপুরের ৯০ শতাংশের বেশি লোকজনের এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা আছে। ঢাকার জন্য এমন তথ্য বা পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া কঠিন। অল্প কিছু নমুনা যোগাড় করার চেষ্টা করেছি। কিছু বিল্ডিং পেয়েছি যার মালিক কোনো একক ব্যক্তি। নিজে একটা এ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। বাকিগুলো ভাড়া দেন। কিছু বিল্ডিং পেয়েছি যার মালিকানা কয়েকজন আত্মীয়ের মধ্যে ভাগ করা। কেউ কেউ নিজেই থাকেন, কেউ কেউ ভাড়া দেন। বেশ কিছু বিল্ডিং ডিভেলপারের বানানো। তার কিছু এ্যাপার্টমেন্টের মালিক ল্যান্ডওনার। বাকিগুলো যারা কিনেছেন তারা কেউ একটা কিনেছেন কেউ বা একাধিক। অনেকেই এ্যাপার্টমেন্ট কিনে ভাড়া দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেই থাকছেন। ব্যক্তিগতভাবে ধানমন্ডি, মোহম্মদপুর, শ্যামলী আর মিরপুরের মোট ২২টা আবাসিক বিল্ডিঙের সমীক্ষা করে তার ৭২% এ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছি যেগুলো ভাড়া নেওয়া। এই নমুনা সমীক্ষাকে স্ট্যানডার্ড হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবু বলা যায় যে ঢাকাতে নিজেদের মালিকানায় থাকার জায়গার সংস্থান আছে এমন মানুষের সংখ্যা ঢাকার মোট জনসংখ্যার ৪০% এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম।

বাসগৃহের মালিকানার সাথে শহরের জন-ঘনত্ব আর লিভিং-স্ট্যানডার্ডের বেশ সম্পর্ক আছে। শহরের জন-ঘনত্বের সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নিবিড়ভাবে জড়িত। সামান্য কিছু তুলনামূলক তথ্য সংগ্রহ ক’রে আর তা হিসাব ক’রে পেয়েছি যে ধানমন্ডি আর গুলশানের জন-ঘনত্ব মিরপুর আর মোহম্মদপুর থেকে অনেক কম। অথচ ধানমন্ডি আর গুলশানের বিল্ডিংগুলোর গড় উচ্চতা বেশি। সুনির্দিষ্ট উপাত্ত তৈরী না ক’রেও বলা যায় যে জন-প্রতি অনেক বেশি বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করে গুলশান, ধানমন্ডি আর উত্তরার বাসিন্দারা মিরপুর, মোহম্মদপুর কিংবা করাইল বস্তির বাসিন্দাদের অনুপাতে।

বাংলাদেশের একজন মানুষের মোটামুটি মানের আধুনিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করার জন্য ঠিক কত বর্গফুট জায়গা দরকার তার কোনো সরকারী উপাত্ত কিংবা দিকনির্দেশনা দেই। জাতীয় আবাসন নীতিমালাতে এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তাভাবনাও নেই। এই ২০২০ এ দেশের মানুষ-প্রতি কত বর্গফুট জায়গা তার থাকার জন্য স্থায়ী অবকাঠামোতে আছে তার কোনো তথ্য-উপাত্তও এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। ফলে আমাদের হাতে থাকা জন-ঘনত্বের পরিসংখ্যানটা শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার উপযোগী নয়।

আবার কোনো একটা স্থানের জন-ঘনত্বের সাথে সেই স্থানের প্রাকৃতিক কিছু বৈশিষ্টও সম্পর্কিত। ঐতিহাসিক ভাবেই ঢাকা এবং তার আশপাশের কিছু এলাকার জন-ঘনত্ব বেশি। সীমানা আরো একটু প্রসারিত ক’রে দেখলে দেখা যায় বাংলা ব-দ্বীপ অঞ্চলে মানুষের জন-ঘনত্ব তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বেশিরভাগ সময়ই বেশি ছিলো। এই তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে প্রাকৃতিক ভাবেই এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা অধিক সংখ্যক মানুষের বসতিকে ধারণ করতে পারে। তবে এই অধিক-সংখ্যক ব্যাপারটার নিশ্চয় একটা সীমা আছে। ঠিক কত সংখ্যক মানুষকে আজকের পরিস্থিতিকে ঢাকা শহরে স্বাস্থকর উপায়ে বসবাস করানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করা দরকার। সেটা না ক’রে শুধু বাজারের চাহিদার উপর নির্ভর ক’রে এই শহরের বাসযোগ্যতার মান বাড়ানো নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব হওয়ার সুযোগ বেশ সীমিত।

ঢাকার অধিক জন-ঘনত্বের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। এবং দরিদ্র মানুষই মূলত অল্পপরিসরে আটোসাটো পরিবেশে বসবাস করে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নতি জন-ঘনত্ব কমিয়ে আনার একটা কার্যকর উপায় হ’তে পারে।

টিকা ও সূত্র:

১. if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation. লি কর্বুজিয়ের

২. https://www.worldatlas.com/articles/the-world-s-most-densely-populated-cities.html

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_cities_proper_by_population_density

পুনশ্চ:
১. এ্যাফোর্ডেবল এর প্রচলিত বাংলা যদিও সাশ্রয়ী তবুও এটা সঠিক কিনা বলা শক্ত। কিনতে পারার সক্ষমতা শুধু মাত্র কম মূল্যমানের উপর নির্ভর করে না।
২. সচলায়তনের জন্য লেখা। এখানে সংরক্ষণ করলাম
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57909

একটি শহুরে গল্প -১৪

তিন দিন ধ’রে নিজের মতো ক’রে ভাবে রিমি। রাশেদ জামানের চিঠিগুলো নিয়ে। ভাবে বাবা এসব জানে কিনা। আবার বাবাকে জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কিনা। ভাইয়াটাও এখন ঢাকাতে নেই। ফোনে এসব নিয়ে একেবারেই কথা বলতে ইচ্ছা করে না। রিমি একদিন আবিরকে চিঠি তিনটা পড়তে দেয়।

চিঠি পড়া শেষ হ’লে আবির ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কী বলবে। কিন্তু কিছু একটা যে বলা দরকার তাও মনে হ’তে থাকে। আবির চিঠিগুলো নিয়েই কথা বলা শুরু করে। ‘কোথায় পেলে এগুলো?’

  • ‘মার আলমারিতে। মার কাপড়-চোপড়গুলো গুছাতে গিয়ে পেয়েছি। আমরা কেউই অন্য কারো আলমারিতে হাত দিতাম না। বাবা এসব জানে কিনা তাও জানি না। আমার এখন কী করা উচিৎ বলো তো।
  • –      ‘চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলতে পারো। এখন তো আর এসবের কোনো মূল্য নেই। যাকে লেখা চিঠি সেই আর বেঁচে নেই।’
  • –      ‘তা করা যায়। তবে তোমার কী মনে হয় এটা পড়ে?’
  • –      ‘তোমার মায়ের সম্পর্কে?’
  • –      ‘মায়ের সম্পর্কে, আমার সম্পর্কে…’
  • –      ‘তোমার মাকে তো সামনাসামনি দেখিনি কখনো। তবে মানুষের জীবনে জটিলতা থাকে অনেক। শেষ পর্যন্ত মানুষ কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। আমেরিকা ফেরার আগে নিশি ফুপু বলছিলো, যে মানুষের জীবনে কোনো ভুল নেই তা কোনো জীবনই না। আমাকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে বলেছেন জীবনে ছোট ছোট কিছু ভুল করতে আর প্রেমে পড়তে। আমি হেসেছি। এখন মনে হচ্ছে, ফুপু ঠিকই বলেছেন।’
  • –      ‘তোমার আমাকে নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই তো? আমি তিনদিন অনেক ভেবেছি। সামনে কী করবো জানি না। তবে তোমাকে জানানো দরকার মনে করেছি। আমার মনে হয়েছে তোমাকে আমার এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
  • –      ‘ভালো করেছো। এবার চলো একটু রিকশা করে ঘুরি কোথাও। অনেক দিন তোমার হাত ধরাও হয় না।’
  • –      ‘চলো পুরান-ঢাকার দিকে যাই। কোনো একটা নদীর পাড়ে যেতে পারলে ভালো হতো।’
  • –      ‘কিন্তু সদরঘাট তো অনেক দূরে। গেলে ফিরতে অনেক রাত হ’য়ে যাবে। এরই মধ্যে ৬টার বেশি বেজে গেছে…’
  • –      ‘তাও বটে। তবে আর ওদিকে আজ গিয়ে কাজ নেই। কার্জন হলের দিকেই যাই চলো।’

রিকশা ক’রে কার্জন হল যায় ওরা। এই ভ্রমণটা খুব প্রিয় রিমির। ওর মনে পড়ে একবার আবিরের সাথে রিকশা করে এফ. রহমান হলের সামনে থেকে টিএসসি পর্যন্ত এসেছিলো। তখনো ওদের ভেতরে প্রেমের সম্পর্ক হয়নি। রিমি আবিরকে জিজ্ঞেস করে সেদিনের কথা ওর মনে আছে কিনা।

আবির জানায় যে ওর মনে আছে। ‘মনে আছে কারণ সেদিনই আমার মনে হয়েছিলো- এই মেয়েটা অদ্ভুত। এই মেয়েটার ভেতরে কিছু একটা আছে … মুগ্ধ করার মতো কিছু একটা। ’

  • ‘সেই জন্য তখন কথা বলতে চেয়েছিলে আমার সাথে?’
  • ‘হুম।’
  • ‘তা হ’লে তো ফুপু বলার আগেই স্যার প্রেমে পড়েছেন দেখা যাচ্ছে!’ রিমির কথা শুনে আবির হাসতে থাকে।
  • ‘তাই তো দেখি।’
  • ‘আচ্ছা, মাকে বলেছো আমাদের কথা?’
  • ‘না।’
  • ‘কবে বলবে?’
  • ‘তুমি চাইলে আজই ব’লতে পারি। তবে কথাটা সামনাসামনি বলতে চাই আমি। মা আমার বিয়ের কথা ভাবছে।’ কথাটা ব’লে আবির রিমিকে আড়চোখে দেখার চেষ্টা করে। যদিও অন্ধকারে রিমির অভিব্যক্তি কিছু বোঝা যায় না।
  • ‘আমি কিন্তু এখন বিয়ে করতে চাই না। আগে লেখাপড়া শেষ হোক।’ তারপর খানিকটা থেমে ব’লে, ‘এই চিঠিগুলো পড়ার পর বিয়ে ব্যাপারটা নিয়েই মনের ভেতরে খচখচ করছে। তুমি কিছুদিন আমাকে বিয়ের কথা বোলো না তো, প্লিজ।’
  • ‘আমি বিয়ের কথা বলছি না তো। কথায় কথায় চ’লে এলো। সরি।’

আবিরের কথায় রিমির মন ভালো হ’য়ে যায় ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু সেই মন ভালো ব্যাপারটা বেশি সময় স্থায়ী হয় না। তোপখানা মোড় থেকে আবিরের বেবিট্যাক্সি নেয়ার পর থেকেই বিয়ের ব্যাপারটা রিমিকে ঘিরে ধরে। বাবা আর মায়ের সম্পর্ক নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়ে রিমির। রিমি মনেমনে ঠিক ক’রে ফেলে যে ব্যাপারটা নিয়ে বাবাকে ও কোনো প্রশ্ন করবে না। পুরোনো বিষয় টেনে এনে বাবাকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ হয়তো বাবা ব্যাপারটা জনতো। আবার হয়তো জানতো না।

যদি ব্যাপারটা বাবা জেনে থাকে তবে সেটা নিয়ে নিশ্চয় মায়ের সাথে তার কোনো একটা বোঝাপড়া হয়েছিলো। তা না হ’লে এতটা বছর এই দুইজন মানুষ একসাথে থাকতো না নিশ্চয়। আবার এমনও তো হ’তে পারে বাবা আসলে কিছুই জানে না এখনো। তবে কি সারাটা জীবন মা-কে ঠিক মতো না জেনেই ভালোবেসে গেলো বাবা? নাকি ভালোবাসতো না? দায়িত্ব পালনের মতো সংসার ক’রে গেলো এতদিন!?

রিমি আর ভাবতে পারে না। বা ভাবনা জড়িয়ে যায়। বাবা আর মায়ের লম্বা কোনো কথোপোকথন মনে করার চেষ্টা করে রিমি। কিন্তু মনে ক’রতে পারে না। খাবার টেবিলে বাবা খুব কম কথা বলে। সে আগেও, এখনো। তবে বসার ঘরে বাবার সাথে রিমি আর আশিকের অনেক কথা হ’তো এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও। এমন বিষয় খুব কম আছে যা নিয়ে রিমি আর আশিক খাওয়ার পরে বসার ঘরে ব’সে বাবাকে প্রশ্ন করতো না। সেসব প্রশ্ন নিয়ে জহিরুদ্দিন সিরাজীকে কোনো দিন বিরক্ত হ’তে দেখা যায়নি। কোনো কোনো দিন প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অনেক রাতও হ’য়ে যেতো। বাবা হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হয়তো কোনো বইয়ের রেফারেন্স দিতো। রিমি বা আশিক দুইজনই সেসব নিয়ে পরে পড়ে দেখতো। তাতে প্রশ্ন যে কমতো তা নয়। বরং আরো বাড়তো। নতুন প্রশ্ন নিয়ে আবার বাবার সাথে বসতো দুই ভাইবোন। কিন্তু রিমির মাথায় কখনো আসেনি যে সেসব কথোপোকথনের সময় মা কখনো থাকতো না। আজ বড্ড মনে বাজছে রিমির, মা কেন তখন ওদের সাথে থাকতো না।

রিমির কেন যেন মনে হয় ফুপু হয়তো কিছু জানতে পারে। মেয়েরা অনেক কিছু মেয়েদেরকে বলে। অথবা মেয়েরা আনেক কিছু ধরতে পারে, যা ছেলেরা পারে না। এই যেমন আবির। রিমির ভেতরে যে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা কি আবির বুঝতে পেরেছে আজ? পারলে কি এমন সহজ হ’য়ে কথা বলতে পারতো! রিমির এক ধরণের অভিমান হয় আবিরের উপর। এত সিরিয়াস একটা বিষয় কেন আবির গুরুত্ব দিলো না? রাশেদ জামান যদি রিমির প্রকৃত বাবা হয় তবে কি আবির রিমিকে বিয়ে করতে রাজি হবে?

রিমির চোখে ঘুম আসে না এক ফোঁটা। কয়েকবার ঘড়ি দেখে অস্ট্রেলিয়ার সময় মেলায় মনে মনে। সিনথিয়া ফুপু কি এতক্ষণে উঠে পড়েছে? ফোনের রিসিভার সিনথিয়াই তোলে ‘হ্যালো।’

  • ‘হ্যালো ফুপু! কেমন আছো?’
  • ‘আমরা ভালো। তোমরা ঠিক আছো তো? মিয়াভাই ভালো আছে?’
  • ‘বাবা ঘুমাচ্ছে। এখন তো অনেক রাত এখানে…।’ একটু থেমে রিমি বলে, ‘ফুপু, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
  • ‘অবশ্যই, তবে তাড়াতাড়ি। অরিল উঠে পড়েছে।’
  • ‘তুমি রাশেদ জামান নামের কাউকে চেনো?’ রিমির প্রশ্নে খানিকটা চমকে যায় সিনথিয়া। কী ব’লবে বুঝে উঠতেও পারে না। রিমি ঠিক বুঝতে পারে না লাইনটা কেটে গেলো কিনা। ‘হ্যালো, ফুপু…’
  • ‘হ্যাঁ, চিনি।’ সিনথিয়া জানায়। ‘ঠিক মতো ব’ললে, চিনতাম। তোমার নানাবাড়ির ঐ দিকের মানুষ। হঠাৎ ওনার কথা কেন?’
  • ‘ওনার কয়টা চিঠি পেয়েছি, মার কাছে লেখা…’
  • ‘ও, তাই বলো। ভাবি একসময় অনেক চিঠি লিখতো। মিয়াভাইকে তো চাকরীর জন্য নানা জায়গায় থাকতে হ’তো। আবার ভাবির কলেজ ঢাকাতে। কিছু একটা নিয়ে ব্যস্তা থাকলে সময় কাটাতে সহজ হয়।’
  • ‘ফুপু, আমি চিঠিগুলো পড়েছি।’ রিমির এই কথায় আর সিনথিয়া কিছু বলে না। ‘আচ্ছা, বাবা কিছু জানে এ নিয়ে?’ রিমি জানতে চায়।
  • ‘সম্ববত না।’ কিছু ব’লবে না ব’লবে না ক’রেও সিনথিয়া ব’লে ফেলে। ‘আসলে আমিও বেশি কিছু জানি না। আবার অনেক দিন আগের কথা। খুব একটা মনেও নেই। তুমি এ নিয়ে বেশি ভেবো না। তুমি বরং এক কাজ করো। চিঠিগুলো আমাকে পাঠিয়ে দাও। আমি একটু প’ড়ে দেখি।’  

পরদিন সরকারী ডাকে রিমি চিঠিগুলোর একটা কপি ফুপুর ঠিকানায় অস্ট্রেলিয়াতে পাঠিয়ে দেয়। রিমি মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় ফুপুর কাছে চিঠি পৌছালো কিনা। কিন্তু প্রতিবারই ফুপু ওকে জানায় যে চিঠি এসে এখনো পৌঁছায়নি।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -৭

ফেরী ঘাটে গাড়ির লম্বা লাইন। গাবতলী থেকে এ পর্যন্ত আসতে রাস্তায় তেমন কোনো বিড়ম্বনাতে প’ড়তে হয়নি। তবে এখন যে বেশ লম্বা একটা সময় অপেক্ষা করতে হবে তা বুঝতে পারে আবির। অনেকেই গাড়ি থেকে নেমে আশপাশে হাঁটাহাঁটি করছে। আবির খানিকটা অপেক্ষা ক’রে নিজেও নেমে পড়ে। পদ্মা নদী পার হওয়ার এই চিরাচরিত ঝক্কির সাথে অবির বেশ পরিচিত। সবকিছু এখানে ঠিক পরিকল্পনা মাফিক হয় না। অনেকটা যেন জীবনের মতো। আবির হাঁটতে হাঁটতে রিমির কথা ভাবতে থাকে। যখন রিমিকে নিয়ে ও পরিকল্পনা ক’রতে চেয়েছিলো তখন রিমি কাছে আসেনি। কিংবা হয়তো আসতে পারেনি। আর যখন রিমির ভাবনাটা একেবারেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা গিয়েছিলো তখন হঠাৎ ক’রেই রিমি এসে হাজির হলো!

এখন অনেক কিছুই হয়তো নতুন ক’রে ভাবতে হবে। নিশি ফুপু আব্বাকে ফোনে বলেছিলো আবির যেন জিআরই ক’রে নেয় দ্রুত। তাতে ওর আমেরিকাতে মাস্টার্স করতে আসতে সুবিধা হবে। আবির তার প্রস্তুতিও শুরু করেছে। ফুপুও হেল্প ক’রবে ব’লে জানিয়েছে। বাসায় গিয়ে তাই নিয়ে হয়তো নিশি ফুপুর সাথে ওর কথাও হবে। এখন যদি বাইরে পড়তে যাওয়ার সুযোগটা দ্রুত হ’য়ে যায় তবে রিমির সাথে সম্পর্কটা রাখা যাবে কি?

এমন সময় গাড়ির লাইন ধীরে ধীরে আগাতে থাকে। আবির ওর গাড়ির দিকে লক্ষ্য রেখে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। ওর পাশ দিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা অনেকগুলো গাড়ি চ’লে যেতে থাকে। গাড়ির সংখ্যা দেখে মনে হয় অন্তত দুইটা ফেরীর গাড়ি। তাহ’লে ওদের বাসটা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবে। যায়ও। আবির দেখে ওর বাসটা ওকে পেছনে রেখে বেশ একটু সামনে গিয়ে আবার দাড়িয়ে গেলো। আবার পরবর্তী কোনো ফেরী আসা পর্যন্ত একই রকম ভাবে অপেক্ষা করতে হবে।

আবির ঝালমুড়ি মাখানো কেনার জন্য দাড়ায় একটু। কেনা হ’লে একটু একটু ক’রে খেতেখেতেই ওর বাসের দিকে আগাতে থাকে। গাড়িগুলো আবার আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মুড়িওয়ালা বেশ ঝাল দিয়েছে মুড়িমাখানোতে। খাওয়া শেষ হ’লে আবির মুড়ির ঠোঙাতেই হাত মুছে নেয়। তারপর পাশের একটা দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনে বাসে গিয়ে বসে আবির। সিটে শরীরটা খানিকটা এলিয়েও দেয়। গাড়িটা বেশ ফাঁকাফাঁকা লাগে। আবিরের পাশের সিটের ভদ্রলোকও গাড়িতে নেই। গাড়ির ভেতরের বাতি নেভানো। বাইরের আলোও যে বেশি তাও নয়। তবু ভেতর থেকে বাইরের কার্যক্রম বেশ বোঝা যায়। অনেকেই ঝুপড়ির দোকান থেকে ডিম-পরোটা কিনছে। ডাবের বিক্রিও মন্দ নয়। আবির একটা পেয়ারা কেনে। কাজী পেয়ারা। দেখতে বেশ বড়। তবে মিষ্টি কম। ইদানিং এই পেয়ারাগুলোই বেশি পাওয়া যায়। এসব দেখতে দেখতেই আবির একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

হঠাৎ বাঁশির উচ্চ-শব্দে ঘুম ভাঙে আবিরের। ফেরী ছেড়ে দেবে। ওদের গাড়ি ফেরীতে কখন উঠেছে সেটা টের পায়নি আবির। পল্টুনের এই জায়গাটাতে তুলনামূলক আলো বেশি। অনেক হকারের হাকডাকও শোনা যাচ্ছে। ডিম, চানাচুর, পানি, ইলিশ মাছ কত কিছু যে বিক্রি হ’চ্ছে বলা কঠিন। যেন একটা জমজমাট বাজার। আবির গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। একবার টয়লেট সেরে নেওয়া দরকার। গাড়ি ফেরী থেকে নেমে গেলে ঝিনাইদহে পৌছার আগে আর তেমন একটা বিরতি পাওয়া যাবে না। এদিকে আবার টয়লেটের সামনেও বেশ লাম্বা লাইন। ফেরী দৌলতদিয়া পৌছানোর আগেআগে টয়লেট সেরে নেওয়া যাবে চিন্তা ক’রে আবির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। ফেরীর উপরে যে ক্যান্টিন আছে ওখানে মাঝেমাঝেই ভালো ইলিশের তরকারী পাওয়া যায়। দামও খুব বেশি নয়। আজ বেশ বড় পেটির ইলিশ পাওয়া গেলো। আবির একবার ঘড়ি দেখে। প্রায় দশটা বেজে গেছে। খেয়ে নেওয়াটাই ঠিক হবে। সাধারণত নদী পার হ’তে ৪৫/৫০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তারপর চুয়াডাঙ্গা পৌছাতে কম ক’রে হলেও আরো তিন ঘন্টা।

দ্রুত খেয়ে নেয় আবির। আরো অনেকেই জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবির উঠতেই আর একজন ওর ছেড়ে দেওয়া সিটে ব’সে খাবার অর্ডার করে। আবির খাবারের দাম মিটিয়ে পাশের চায়ের দোকানে চ’লে আসে। সেখানেও ভীড় কম নয়। আবির বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই চা খেয়ে নেয়। ফেরী ততক্ষণে মাঝ নদীতে পৌছেছে। এই জায়গাটাতে পানির স্রোত একটু বেশি। ফেরীর দুলুনিতে তা বেশ টের পাওয়া যায়। চা শেষ হ’লে আবির ক্যান্টিন থেকে বের হ’য়ে আসে। ফেরীর পাটাতনের কোনো একটা কিনারাতে গিয়ে পানির স্রোত দেখতে বেশ ভালো লাগে। কখনো কখনো পানি ছিটকে এসে খানিকটা গায়েও লাগে। অবশ্য ফেরী বড় হ’লে সেই সম্ভাবনা কম থাকে। আজকের ফেরীটা বড় ফেরীগুলোর একটা। পানির স্রোত কেটে ফেরীর এগিয়ে যাওয়ার শব্দটা অদ্ভুত। ধীরে ধীরে নদীর অন্য পাড় বেশ এগিয়ে আসছে। আবির সেই দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। আর হয়তো মিনিট দশেকের ভেতরেই ঘাটে ভিড়বে ফেরী। আবির টয়লেটের দিকে পা বাড়ায়। এদিকটাতে এখন আর তেমন একটা ভীড় নেই।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে রেহনুমা উঠে বসে। প্রায় দুইটা বাজে। বাড়ির দরজা কাজের-লোক খুলে দেয়। আবির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে। দোতলার বারান্দায় ছেলের হাত ধরে রেহনুমা। একটু যেন শুকিয়ে গেছে ছেলেটা। ‘এত দেরী হ’লো যে!’‘ঘাটে আজ অনেক জ্যাম ছিলো মা। তোমরা কেমন আছো?’

‘আমরা ঠিক আছি। তুই আগে হাত-মুখ ধুয়ে নে। আমি ভাত রেডি করি।’

‘ফেরীতে খেয়েছি।’

‘অল্প ক’রে আবার খাবি। আমি তোর গামছা এনে চেয়ারের উপর রাখছি।’

‘আচ্ছা।’

ততক্ষণে বদিউজ্জামানও টের পেয়ে উঠে পড়েছে। খাবার ঘরে একটা চেয়ারে এসে বসেছে।  ছেলে হাত-মুখ ধুয়ে বের হ’তেই পথে কোনো ঝামেলা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে।‘না, ঝামেলা হয়নি কোনো; শুধু ঘাটে জ্যাম ছিলো বেশ।’

‘কয়টার গাড়ি?’

‘পাঁচটার।’

‘সাড়ে আট ঘন্টা!’ খানিকটা হিসাব ক’রে বলে বদিউজ্জামান। ‘অনেক সময় লাগলো তো।’

‘ফুপু কই মা?’

‘ওনার ঘরে, শুয়ে পড়েছে বোধহয়। তুই খেয়ে নে তো।’

‘আচ্ছা দাও।’ রেহনুমা থালা আগিয়ে দেয় ছেলেকে। আবির ভাত তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে, ‘ফুপু বাংলাতে কথা বলে না ইংরেজিতে?’

শুনে রেহনুমার হাসি পায়। ‘তুই নিজেই দিখিস’ – বলাটা শেষ হ’তে না হ’তেই নিশি এসে হাজির হয় খাবার ঘরে। ‘হ্যালো আবির!’‘হ্যালো! কেমন আছেন?

‘আমি ভালো। তোমার জার্নি কেমন হ’লো?’ নিশি আবিরের উল্টা দিকের একটা চেয়ার টেনে সেটাতে বসে।

‘লং এ্যান্ড হেকটিক।’ আবিরের বলার ধরণটা নিশির পছন্দ হয়।

‘আমি আসার সময়ও লম্বা জ্যাম পেয়েছিলাম। এমন জ্যাম কি সবসময় থাকে?’

‘বছরের এই সময়টাতে থাকেই বলা যায়। পানি কমে যায় তো। ফেরীগুলোকে চর ঘুরে আসতে হয়। বর্ষার বৃষ্টি শুরু হ’লে আবার সহজ হ’য়ে যায়।’

‘ তোমার চাকরী কেমন লাগছে? ভাবি বলছিলো রেজাল্টের পরপরই চাকরী পেয়ে গেছো।’

‘লাকিলি।’ খেতে খেতেই আবির ব’লে চল, ‘ভার্সিটির এক বড়-ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো; ওনাকে ব’লে রেখেছিলাম। উনিই খবরটা দিয়েছিলেন। ওদের লোকও খুব দ্রুত দরকার ছিলো। ইন্টারভিউ দিতেই হ’য়ে গেলো। কিন্তু আপনি এখনো জেগে আছেন! ঘুমাবেন না?’

‘ঘুমাবো। আসলে জেট ল্যাগটা কাটেনি এখনো। আরো ৩/৪ দিন লাগবে বোধহয় ঠিক হ’তে। আবার ঠিক নাও হ’তে পারে।’ বলে খানিকটা হাসে নিশি। আবিরও সেই হাসিতে যোগ দেয়।

আবিরের হাত গুটানো দেখে রেহনুমা ওকে আর একটু ভাত নেওয়ার জন্য বলে। ‘আর না মা। ফেরীতে খেয়েছি। বড় ইলিশ মাছ দিয়ে। ওদের রান্নাটা মজার। একদম ঝোলঝোল।’‘আচ্ছা, তু্ই হাত ধুয়ে নে। আমি তুলে রাখছি।’ আবির ওর থালাটা নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকে। থালাটা পরিস্কার ক’রে তাকে রেখে তারপর হাত ধুয়ে নেয়। খাবার ঘরে ফিরে আবির পানি খায় এক গ্লাস। নিশি আর বদিউজ্জাম উঠে পড়ে। আবিরের সাথে সাথে রেহনুমা ঢোকে ওর ঘরে।

‘তুমি যাও তো মা, শুয়ে পড়ো। আমাকে সকাল-সকাল ডেকে দিয়ো।’

‘কটায় উঠবি?’ জানতে চায় রেহনুমা।

‘তুমি যখন উঠবে তখনই ডাক দিয়ো।’

‘তোর ফুপু বাগানটার কথা জিজ্ঞেস করছিলো। তখন আমি বললাম তোর সাথে দেখতে যাওয়ার জন্য। আমিও যাবো। অনেকদিন যাওয়া হয় না।’

‘সকালে যাবে?’

‘সকালে গেলেই ভালো হবে না? গরম কম থাকবে।’

‘হুম। ফুপুকে সকালের কথা ব’লেছো?’

‘না, এখনো বলিনি। তুই শুয়ে পড়। আমি গিয়ে বলছি।’

‘আচ্ছা।’

পরদিন আলো ফোটার আগেই রেহনুমা উঠে পড়ে। আবির আর নিশি দুইজনকে ডেকে তোলে। দ্রুত চুলায় খিচুড়ি চড়িয়ে দেয়। রুটি বানাতে গেলে অনেক দেরী হ’য়ে যাবে। কাজেরলোক ভানু আসবে ৭টার দিকে। তার আগেই বেরিয়ে পড়তে চায় রেহনুমা।

নিশি ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা করে না সাধারণত। খেতে বসবে কি বসবে না দ্বিধা নিয়েই খাবার টেবিলে বসে। খিচুড়ির গন্ধটা ভালো হয়েছে। একটু নরম-নরম ক’রে রান্না করা। আবির ডিম ভেজেছে তিনটা। নিশি খেতে শুরু করে। অল্প ক’রে খেয়ে নেয়। খেতে ভালোই লাগে নিশির।

ওদের খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই বাদিউজ্জামানও উঠে পড়ে। ‘আরে! এত সকাল-সকাল নাস্তা করছো! কোথাও যাবে নাকি?’‘ফুপুকে নিয়ে আম-বাগনে যাবো। মাও যাবে।’- আবির জানায়।

‘তোরা সবাই যাবি, আমাকে তো বললি না।’

‘চলো আমাদের সাথে।’ আবিরের সাথে নিশিও যোগ দেয়।

বদিউজ্জামান রাজি হ’য়ে যায়। দ্রুত তৈরী হ’য়েও নেয়। এর ভেতরে রেহনুমা সোহেলকে ডেকে দুইটা রিকশা আনতে বলে। রিকশা আসতে আসতে বদিউজ্জামানের খাওয়া হয়ে যায়। রেহনুমা এক বোতল পানি আর একটা থোলে সাথে নেয়, যদি আচার বানানোর মতো কাঁচা আমা পাওয়া যায় তবে খানিকটা সাথে ক’রে আনবে।

নিশি বেশ খানিকটা ঘুরে ঘুরে দেখে বাগানটা। খানিকটা স্মৃতি মনে করার চেষ্টাও হয়তো করে। তবে তেমন একটা মনে করতে পারে না। আমগাছ গুলোতে ফল ভালো ধরেছে। আরো অনেক ধরণের ফলের গাছ আছে। চালতা, বেল আর কদবেল, সফেদা, বরই আর কাঠাল গাছগুলো চিনতে পারে নিশি। বাগানের পশ্চিম দিকে কয়েকটা তাল, নারকেল, সুপারি আর খেজুর গাছও আছে। বাদিউজ্জাম নিশির সাথে থেকে জাম, আমলকি, করমচা, জলপায়ের মতো আরো কিছু গাছ চিনিয়ে দেয়। গাছগুলো যে যত্নে আছে সেটা বেশ বোঝা যায়। নিশির এটা ভালো লাগে।

ওদিকে আবির আর রেহনুমা আম পাড়া শুরু করেছে। নিশির বাবা পুটলি বাঁধা লাঠি দিয়ে যেভাবে বরই পেড়ে দিতো তেমন ক’রে। নিশিও চেষ্টা করে দেখে। কয়েকটা আম বেশ সহজেই পেড়েও ফেলে।

ফেরার পথে রিকশাতে আবিরের সাথে নিশি বসে। ‘ল্যান্ডস্কেইপটা সুন্দর। এলোমেলো তবে সুন্দর।’ অনেকটা যেন নিজের মনেই বলে নিশি।‘এদিকটাতে তো শুধু ফসলের ক্ষেত আর ছাড়াছাড়া গ্রাম। আমার খানিকটা একঘেয়ে লাগে।’

‘তাই?’

‘হুম, ভ্যারিয়েশন কম তো। আর একটু পানি থাকলে দারুন হ’তো মনে হয়। যেমনটা বরিশাল বা সুনামগঞ্জের দিকে আছে। এখানে পানি কম থাকায় একটু গরম বেশি যেন। আবার হিউমিডিটিটা কম।’

‘সেটা ঠিক। তবে সবুজটা খুব সুন্দর। খুব তরতাজা।’

‘নতুন চাষ হয়েছে তো কিছুদিন আগে। আপনি দেড়/দুই মাস আগে আসলে অন্য রং দেখতেন। তখন ফসল ওঠা শুরু করেছে। অনেক জমি তখন শুকনো খটখটে দেখতেন।’ আবিরের গলায় সহজ স্বর।

‘ফসল তোলার পর জমিগুলো দেখতে অবশ্য তেমন একটা ভালো লাগে না।’ নিশি আবিরের সাথে একমত হয়। ‘আমি ইউএসে কর্নফিল্ড দেখতে গিয়েছি অনেকবার। উঁচু লম্বা-লম্বা গাছ। কর্ন পাকতে শুরু করার আগ পর্যন্ত আমার খুব ভাল লাগে।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘তবে প্রকৃতির ব্যাপারটাই হয়তো এমন। বারবার রং বদলায়।’

‘আপনি কিন্তু খুব সুন্দর ক’রে কথা বলেন।’ আবির নিশিকে জানায়।

‘টিচার তো। কথা বলতেই হয় অনেক।’

‘আপনি এত ভালো বাংলা বলবেন তা আশা করিনি।’

‘তাই? আসলে মার সাথে বেশির ভাগ সময় বাংলাতেই কথা বলতে হয়। বাবার সাথেও কখনো কখনো। তাই অভ্যাসটা আছে। আবার ওখানে অনেক বাঙালিও আছে। তাদের সাথেও বাংলাতে কথা হয় প্রায়ই।’

‘আপনি একা এলেন যে? আমি ভেবেছিলাম সবাইকে নিয়ে আসবেন।’

‘মার আসার কথা ছিলো। তবে বাবার কয়েক মাস আগে মাইল্ড একটা হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। তাই আর এলো না। আর আমার ছেলে-মেয়ে দুইজন এই সময় আসতে চাইলো না। টিনেজ বয়স। তবে আমাকে জানিয়েছে আমি ঘুরে এসে ওদেরকে ছবি দেখালে যদি ওদের পছন্দ হয় তবে নাকি আসবে। ভেবে দেখো একবার, এদেরকে ম্যানেজ করা কতটা কঠিন।’

আবির এ কথায় না হেসে পারে না। ‘কিন্তু আপনি তো ছবি তুললেন না আজ। ওদেরকে দেখাবেন কিভাবে?’‘আর একদিন আসবো ছবি তোলার জন্য। আজ শুধু দেখেতেই ইচ্ছা করছিলো। আমি নিজেও চ’লে যাওয়ার পর এই প্রথম এলাম। তুমি তো কালই চ’লে যাবে, নাকি?’

‘হ্যাঁ, কাল বিকালে। পরশু অফিস আছে যে।’

‘ফেরার সময় ঢাকাতে থাকা হবে কিনা জানি না এখনো। দেখি চেষ্টা করবো তোমার বাসায় একবার যাওয়ার।’

‘ওটা ঠিক বাসা নয়। মেস। দুই রুমের একটা বাসায় আমরা চারজন থাকি। সবাই চাকরীজীবীতো তাই একটু অগোছালো।’

‘আচ্ছা, তুমি না চাইলে যাবো না। অন্য কোথাও দেখা করা যাবে। কিন্তু আমরা তো প্রায় চলে এসেছি বাসায়, না?’

‘হুম।’

সেদিন রাতে নিশি আবিরকে সাউথ-ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন প্রফেসরের ঠিকানা দেয়। ওদের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। আর বলে আমেরিকান এ্যাম্বাসিতে খোঁজ নিতে। ইউএসএতে পড়তে যেতে হ’লে কী কী দরকার হবে সেটা ওরা ব’লে দেয় ঠিক মতো। আবির নিশিকে জানায় যে ও সব খোঁজ নিয়ে যোগাযোগ করবে সময় মতো।

নিশি আবিরকে ওর জন্য আনা দুইটা টি-শার্ট দেয়। টি-শার্টেদুটোর রং পছন্দ হয় আবিরের। দুটোই সবুজ আর নীলের মাঝের দুইটা টোনে। নিশি-ফুপুর জন্য আনা শাড়ীটা বের করে আবির। নিশি উপহার পেয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধারে। আবিরের মনে হয় এই মানুষটা ওর খুব আপন কেউ। নিশি আবিরের জন্য স্টিফেন কিং এর নতুন একটা বই এনেছে। দ্যা গার্ল হু লাভড টম গর্ডন।

(চলবে)

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৩

কোনো কোনো সর্বগ্রাসী একলা থাকার দিনে
পুরোনো কিছু দুঃসহ স্মৃতি ঝেড়ে ফেলা যায়,
গভীর ভাবে জেনে নেওয়া যায় এমন কিছু
যা নিয়ে কখনো জাগেনি প্রশ্ন সচেতন মনে-
যে থাকতে চায় জীবনের দিনরাত্রির ঘনঘটায়
আর যার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ের খুব কাছে পৌঁছার,
তাদের বাস যেন একেবারে বিপরীত জগতে!
এমনতরো বোধের দিনে বোখে যাওয়া যায়;
ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতিও যখন জাগায় প্রগাঢ় স্বস্তি!
আর প্রিয়তম আকাঙ্ক্ষার পুনঃপুনঃ অত্যাচারে
উপসম হয় পুরোনো যত পরাজয়ের শোক;
তখন নিজে নিজেই একটু হেসে নেওয়া যায়-
অতীত ভাগ্যিস অভিজ্ঞতার বেশি কিছু নয়!

একটি শহুরে গল্প – ১৩

ছোট দেবর আহসান হাবিব বিলু সড়ক ও জনপথের প্রকৌশলী। নাবিলার বাপ-চাচাদের ভেতরে বিলুই ছিলো লেখাপড়ায় সবচেয়ে ভালো। দুই মেয়ের লেখা-পড়া নিয়ে কথা বলতে তাই আহসান হাবিবই শহর বানুর মূল ভরসা। তবে সহজে আবার পাওয়াও যায় না ওকে। নানা জায়গায় ঘোরাঘুরির উপর থাকে। আবার চাকরীও ট্রান্সফারের। এখন দিনাজপুরে পোস্টিং। নাবিলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খবরটা জানানোর জন্য ফোন দেয় শহরবানু। ফোনটা আহসান হাবিবই ধরে, ‘কেমন আছো ভাবি? তোমাদের কথাই ভাবছিলাম।’‘আর বানিয়ে বানিয়ে ব’লতে হবে না। রানু এই কথা বললেও না হয় বিশ্বাস করতাম। ও তো তাও মাঝে মাঝে ফোনটোন দেয়। তুমি শেষ কবে নিজে থেকে ফোন দিয়েছো বলো তো।’ রানু আহসান হাবিবের স্ত্রী। নওগাঁর মেয়ে। আহসান হাবিব যখন চাকরীর জন্য নওগাঁতে ছিলো তখন ওদের পরিচয় আর পরবর্তীতে বিয়ে।

‘রানু একটু আগে তোমাদের কথাই বলছিলো খাবার টেবিলে। ইকবাল এখনো ক্লাস সিক্সে আর এবার নাবিলা ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। পিচ্চিটা কত বড় হ’য়ে গেলো তাই ভাবছিলাম।’

‘ওর কথা বলার জন্যই তোমাকে ফোন দিয়েছি। আজ ভর্তি হ’য়ে এলো। খুলানাতেই ভর্তি হ’লো। সিদ্ধান্তটা কি ঠিক হলো, বিলু?’ মেয়ের ভবিষ্যতের ভাবনা শহর বানুর মনে। নাবিলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও সুযোগ পেয়েছিলো।

‘এটাই ভালো হবে ভাবি। বিবিএ এখনকার সাবজেক্ট। এটাতে চাকরীর সুযোগ দিনদিন বাড়ছে। আর একসময় বাপের ব্যবসা দেখতে হবে না কাউকে! ইলোরা তো বিজ্ঞানে পড়ছে।’

‘কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াটা কি ঠিক হলো? রাজধানী শহর। ওখানে থাকলেও তো অনেক কিছু জানতে পারতো, শিখতে পারতো।’

‘শেখা নিজের কাছে ভাবি। তুমি পিচ্চির উপর ছেড়ে দাও তো।’ আহসান হাবিব অনেক আগে থেকেই নাবিলাকে পিচ্চি ব’লে ডাকে। ‘বড় হ’য়ে গেছে না! তুমি এখন ইলোরার দিকে নজর দাও। আর ওর ক্লাস শুরুর আগে আমাদের এখান থেকে একবার ঘুরে যেতে বলো। ক্লাস শুরুর দেরী আছে না?’

‘এখনো তো ক্লাস শুরুর তারিখ দেয়নি। সারাদিন ব’সে-ব’সে গল্পের বই পড়ে। আর ওর দেখাদেখি ইলোরাও গল্পের বই পড়তে চায়। অথচ ক্লাসের বই নিয়ে বসতেই দেখি না। ব’সতে ব’ললেই ঘুম।’

‘মাত্র তো কলেজ শুরু করলো। প্রেশার শুরু হ’লে দেখো নিজেনিজেই পড়বে।’ ভাবিকে ভরসা দেয় আহসান হাবিব।

‘আমার এটাকে নিয়েই চিন্তা বেশি। নাবিলা তো শক্ত আছে। ইলোরাকে একটু বকাও দেওয়া যায় না। একটা কিছু বললেই কান্নাকাটি শুরু ক’রে দেয়।’ শহর বানুর কথায় আহসান হাবিব না হেসে পারে না। ‘এত হেসো না তো। তোমরা ভাই আছো ভালো একটাকে নিয়ে। আমার দুইটাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়।’

‘নাবিলা কই? ওকে দাও তো।’

‘ধরো একটু, ডাকছি।’ শহর বানু নাবিলাকে ডেকে ফোনের রিসিভারটা দেয়।

‘হ্যালো, চাচ্চু! কেমন আছো তোমরা?

‘আমরা ভালো। তোর মাকে বলছিলাম ক্লাস শুরুর আগে আমাদের এখান থেকে একটু ঘুরে যেতে। দিনাজপুর শহর তো আগে দেখিসনি তোরা। আমিও আর বেশি দিন এখানে থাকতে পারবো না সম্ভবত। বদলির সময় হ’য়ে এলো।’

‘মা এখন কোথাও যাবে কিনা জানি না। তবে আমরা তিন বন্ধু মিলে কয়েকটা জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। দেখি ওদের সাথে কথা ব’লে। তোমার ওখানে ওদেরকে নিয়ে আসলে সমস্যা নেই তো?’

‘আমার কোনো সমস্যা নেই। দেখ তোর মা তোদেরকে একলা ছাড়ে কিনা। আর খুলনা থেকে দিনাজপুর কম দূরও তো না। শহরের ভেতরে বা কাছে রেল-স্টেশন থাকলে সহজে চ’লে আসতে পারতি। পার্বতীপুর স্টেশনে খুলনার ট্রেন আসতে আসতে বেশ রাত হ’য়ে যায়। অবশ্য তোরা আসবি শিওর করলে আমি গাড়ির ব্যবস্থা ক’রে রাখতে পারি তোদের জন্য।’

‘আমরা এখনো পর্যন্ত ঠিক করেছি যশোর আর চুয়াডাঙ্গা যাবো। যুথির দাদাবাড়ি যশোর। আর কলির বড় ভাই চুয়াডাঙ্গাতে আছে এখন। ম্যাজিস্ট্রেট। ওর ভাবির সাথে ওর কথা হয়েছে। আমাদেরকে যেতে ব’লেছে।’

‘ভালো পরিকল্পনা। ক্লাস শুরুর আগে এরকম একটু ঘুরে নে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর আগে আমরাও কয়েকজন এমন ঘোরাঘুরি করেছিলাম। মনটা চাঙ্গা হ’য়ে যায়। মার সাথে কথা ব’লে আমাকে জানা। আমি ব্যবস্থা ক’রে রাখবোখন।’

‘থ্যাংক য়ু চাচ্চু।’

শহর বানু যুথি আর কলিকে একদিন বাসায় আসতে বলে। ওদের সাথে কথা বলার পর খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়। আবার ভাবনাও হয়। এই বয়সের তিনটা মেয়ে নিজেরা মিলে এতটা লম্বা জার্নি ক’রতে পারবে কিনা তা নিয়ে। রাস্তা-ঘাটের সব জায়গা তো নিরাপদ নয়। স্বামী তরিকুল হাবিব আগে এসব নিয়ে খুব ভাবতো না। নাবিলা ওর খেলার জন্য কলেজের টিমের সাথে আগে যশোর আর নড়াইলে গিয়েছে। মেয়ে ছোট এসব নিয়ে কখনো কিছু বলেনি। কিন্তু আনসার আলী মারা যাওয়ার পর লোকটা আর আগের মতো নেই। সারাদিন কী সব নিয়ে যেন ভাবে। জিজ্ঞেস ক’রলে ঠিক মতো বলেও না। কিংবা ব’লতে পারে না। শহর বানুর মনে হয় ওকে একটু সময় দেওয়া ভালো। নাবিলাও যদি কিছু দিনের জন্য ঘুরতে যায় তো সেই সময়টা স্বামীর সাথে কথা বলার জন্য বাড়তি একটু সুযোগ পাওয়া যাবে।

কিন্তু নাবিলার ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে ইলোরাও ওদের সাথে যেতে চায়। বিশেষ ক’রে দিনাজপুর, ওদের ছোট চাচার বাসায়। কিন্তু নাবিলারা আবার ওকে নেবে না। শহর বানুও চায় না ইলোরা ওদের সাথে যাক। শেষে ইলোরা সবগুলো শহর থেকে ওর জন্য কিছু না কিছু কিনে আনার কথা বলে। নাবিলা রাজি হয়।

পরের সপ্তাহেই রাজশাহীগামী সকালের প্রথম ট্রেন কপতাক্ষ-এক্সপ্রেসে চেপে বসে নাবিলা, যুথি আর কলি। স্টেশনে নাবিলার সাথে ওর বাবা এসেছে। যুথি আর কলির সাথেও বাসা থেকে লোকজন এসেছে। ট্রেন ছাড়তেই নাবিলার মনে হ’তে থাকে ও যেন বড় হ’য়ে গেছে। এখন থেকে ও একলা যে কোনো জায়গাতে যেতে পারবে।

তিন জনের জন্যই অনেক দিন পর ট্রেন-ভ্রমণ। ধীরে ধীরে ট্রেন চ’লতে শুরু করলে ওরা জানলার দিকে চেপে আসে। ব্রড-গেজ ট্রেনের দ্বিতীয় বিভাগের সিট। প্রতিদুইটা সিট সামনা-সামনি বিন্যাসে বসানো। ওটা ওদের গল্প করার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। খুব অল্প সময়ের ভেতরেই ট্রেন খালিশপুর পেরিয়ে যায়। ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা খালিশপুরকে ওদের চেনা খালিশপুরের থেকে যেন বেশ অচেনা লাগে। নাবিলা বেশ মুগ্ধ হ’য়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। কলির মনোযোগ যেন ট্রেনের বগির দিকে। সিটের উপর নিল-ডাউন হ’য়ে কলি হিসাব ক’রে নিতে চায় কতগুলো সিট ফাঁকা বগিতে।‘স্টেশনে তো অনেক লোক দেখলাম। অথচ ট্রেন তো ফাঁকা।’ কলি ওদেরকে জানালো।

‘এই বগিতে হয়তো ভীড় কম। অনেক মানুষ উঠতে দেখলাম তো।’

‘চল অন্য বগিগুলো ঘুরে দেখি।’ নাবিলা প্রস্তাব দেয়।

‘আগে চা খেয়ে নিই। সকালে চা খেতে পারিনি তড়িঘড়ির জন্য।’

‘চা নিয়ে কখন আসবে তার ঠিক আছে? চল ক্যান্টিন-কারের দিকে যাই।’

‘আর একটু দাড়া তো। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা বলেছে ট্রেন ছাড়ার মিনিট দশেকের ভেতরেই চা-নাস্তা নিয়ে আসার কথা।’ যুথির বাবার কথা ভুল হয় না। ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই শাদা ইউনিফর্ম পরা দুই জনকে খাবারের ট্রে হাতে ওদের বগিতে ঢুকতে দেখা যায়।

একধরণের স্যান্ডউইচ আর মুরগীর মাংসভাজি কেনে ওরা। আর চায়ের অর্ডার করে। মাংসভাজিটা দেখতে খুব একটা ভালো না দেখালেও খেতে ওদের খারাপ লাগে না। এগুলো খেতে খেতেই ওদের চা চ’লে আসে। টি-ব্যাগের চা। রং-চা। বাসাতে ওদের সবারই দুধ-চা খাওয়ার অভ্যাস। পেয়ালাতে চুমুক দিয়ে নাবিলার একবার মনে হ’লো আর খাবে না। যুথির দিকে চেয়ে একবার বলেই ফেললো, ‘ইয়াক! এই জিনিস খাওয়া যায়?’ অথচ সেই বলাতেও যেন আনন্দের ছড়াছড়ি।‘এহ! আসছেন আমার লাট-সাহেবের বাচ্চারা! ট্রেনে আপনাদের জন্য দুধ দিয়ে চা বানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে! যা পাচ্ছিস তাই খা। খাবার নিয়ে এইসব ঝামেলা করলে আমি কিন্তু তোদেরকে চুয়াডাঙ্গা নিয়ে যাবো না ব’লে দিলাম।’ কলির শাসন বা হুমকিতে বেশ কাজ হয়। নাবিলা আর যুথি দুই জনই আবার চায়ে চুমুক দেয়।

প্রতিবার চুমুক দেয় আর কলিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘ইয়াক!’ কলি প্রথম কয়েকবার সেটাকে প্রশ্রয় দেয় না। বাংকার থেকে ওর ব্যাগ নামিয়ে তা থেকে একটা অটো-ক্যামেরা বের করে। যুথি আর নাবিলার চায়ে চুমুক দেওযার ছবি তুলে রাখে।‘আর একবার ইয়াক বলেছিস তো মাইর খাবি।’

‘তুই নাবিলার সাথে মারামারি ক’রে পারবি না। ও তোকে থাবা দিলে দুই দিনের জন্য তোর কথা বন্ধ হ’য়ে যাবে।’

‘তাহলে আর কি করা… তুই মাইর খাবি। নাবিলা ব’ললেও তুই মাইর খাবি।’ শুনে নাবিলা হাসে আর শেষ চুমুকটা দিয়েই ব’লে ওঠে ‘ইয়াক!’

‘যা এবারের মতো মাফ করে দিলাম। পরের বার এমন করলে কিন্তু আর মাফ নেই।’ কলির কথায় একধরণের প্রশ্রয় আছে। ওরা তিনজনই একসাথে হেসে ওঠে।

নোয়াপাড়াতে এসে ট্রেনটা বেশ ধীরে আগাতে থাকে। পরপর দুইটা দাড়িয়ে থাকা মালগাড়িকে পার হয় ওদের ট্রেনটা। কলি আর নাবিলা দ্বিতীয় মালগাড়িটার বগি গুনতে শুরু করে। বগিগুলোতে কয়লা, পাথর আর বস্তাবন্দি কিছু আছে। যুথিই প্রশ্ন করে, ‘বস্তাগুলোতে কী?’‘কি জানি কী? দেখে তো বোঝা যায় না।’ নাবিলা উত্তর দেয়।

অন্যপাশের সিট থেকে একজন বয়স্কলোক উত্তর দেয় নিজে থেকেই। ‘বস্তাতে বিভিন্ন ধরণের সার।’ শুনে ওরা তিনজনই কাঁচাপাকা দাড়ির লোকটার দিকে তাকায়। চোখে বড়-ফ্রেমের চশমা। ওদের তাকানো দেখে ওরা কোথায় যাবে সেটা জানতে চায় লোকটা।‘আমরা যশোর যাবো। আপনি?’ নাবিলা কথা ব’লে লোকটার সাথে।

‘ইশ্বরদি নামবো আমি।’

‘নিয়মিত যাতায়াত করেন এই রুটে?’

‘তা ব’লতে পারেন, মাসে ২/৩ বার।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘আপনারা নতুন মনে হচ্ছে।’

‘অনেকদিন পর দাদাবাড়ি যাচ্ছি। আগে মাঝেমাঝেই যাওয়া হ’তো।’ যুথি জানায়।

কিছুক্ষণ পর কলি অন্য বগিগুলো ঘুরে দেখার কথা জানায় ওদেরকে। কিন্তু ব্যাগগুলো রেখে যাওয়া আবার ঠিক হবে না। নাবিলা আর কলি প্রথমে যাবে ঠিক করে, আর যুথি ব’সে ব’সে ব্যাগগুলো পাহারা দেবে।

ট্রেনের এক বগি থেকে আর এক বগিতে যাওয়ার জায়গাটা বেশ ভীতিকর। রেলগুলো অনেকদিনের পুরাতন, তার উপর রক্ষণাবেক্ষণের যথেষ্ট অভাব। তাই রেলগুলোর সাংযোগের জায়গাটা পেরোনোর সময় বগিতে একটা ঝাঁকি টের পাওয়া যায়। চলন্ত ট্রেনের এক বগি থেকে আর এক বগিতে যাওয়ার সময় নিচের রেল-লাইনের দিকে চোখ চ’লে যায় নাবিলার। যদিও এতটুকু ফাঁক দিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, তবুও মনের ভেতরে কেমন একটা ভয়ের স্রোত ব’য়ে যায়। মনে হয় পড়ে গেলেই টুকরো টুকরো শরীর। একটা অদ্ভুত গা-শিরশির করা অনুভূতি হয়। আবার দ্বিতীয় বগিটা পার হওয়ার পর ভয়টা অনেকটাই কেটে যায়। 

ক্যান্টিন-কারটা বেশ মজার। একটা বগির অর্ধেকটা নিয়ে। খাবারে অবশ্য তেমন বাড়তি কিছু নেই। যেসব খাবার ফেরি ক’রে বগিতে বিক্রি হচ্ছিলো সেগুলো ছাড়া কয়েক ধরণের বিস্কুট আর চকলেট আছে শুধু। একটা ফ্রিজে কোকাকোলা দেখে কলি উৎসাহী হয়। নাবিলা আর কলি দুইটা কাচের বোতলের কোক খুলে একটা জানলার পাশে গিয়ে বসে। কলি একজনকে ডেকে ওদের একটা ছবি তুলে দিতে বলে। ফেরার সময় ওরা যুথির জন্য এক বোতল ঠাণ্ডা কোকাকোলা নিয়ে আসে। এসে দেখে যুথি একটা গল্পের বই খুলে বসেছে। মাহমুদুল হকের অনুর পাঠশালা।   

(চলবে)

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২২

যে আমি স্বপ্ন দেখি, যে আমি মেহন করি
যে তুমি স্বপ্ন ভাঙো, যে তুমি ছলনাময়ী
যে আমি লোভী, প্রতারক, মিথ্যেবাদি
যে তুমি ভঙ্গুর, সদা মনোযোগ-আকাঙ্ক্ষী…
এমন আমরা পলায়নে মুক্তি পারো নাকি!
পাবো না, পাবো না, পাবো না…
পাবে না, পাবে না, পাবে না কখনই…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২১

আবারো প্রয়োজনীয় প্রেম তার ভোল পাল্টে নেবে
খুঁজে নেবে অনভিজ্ঞ হৃদয় বর্তমানের চালান থেকে
দক্ষ ব্রীড়াময়ী হাসি দিয়ে পাতবে অব্যর্থ ফাঁদ।
তারপর প্রথমবারের মতো আহত কোনো হৃদয়
নিজেকে সামলে নিয়ে বদলে নেবে পুরোপুরি…
হয়তো চিরতরের জন্য, হয়তো নিজেরই জন্য…
একটু একটু ক’রে শিখে নেবে আদিম যত দক্ষতা
শরীর ছেনে গ’ড়ে তুলবে নতুন প্রেম-
ক্লিশে সজ্জায় ডুবে থাকা কোনো অবয়ব দেখে
ক্ষণিক থমকে মুগ্ধতার ভান ক’রে এগিয়ে যাবে।
মিথ্যে সে ভান যদিও ঠিক বুঝবে অভিজ্ঞ চোখ
তবুও তাতেই মজবে চিরঅতৃপ্ত কোনো আত্মা-
যে জেনেছে- প্রেম বড় জটিল এক দক্ষতা,
তার কৌশল যে জেনেছে সে বড় অদ্ভুত জাদুকর
বারবার তাকে নতুন ক’রে সাজাতে হবে পসরা;
শুধু পাল্টে নিতে হবে কোনো রং, কোনো ডিটেইল-
ভুলে যেতে হবে পুরাতন যত সাজানো মায়া।
বলিরেখাগুলো শুধু রাখবে তুলে পরাজয়ের চিহ্ন…

তুমি কখনোই নিশ্চিত ক’রে পারো না ব’লতে

অল্প বয়সে প্রেমের বিয়ে, মুরুব্বিরা তবু নিয়েছিলো মেনে।
মনে হ’য়েছিলো সবুজ আসলেই বেসেছিলো ভালো যুথিকে,
তারপর ব’লেছিলো ‘কবুল’ যুবক বর আর যুবতী কনে।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, কি যে আছে ভবিষ্যতে-
তুমি কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা পারো না ব’লতে!

একটা দুইরুমের এ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে ওরা পেতেছিলো ঘর,
কিছু সস্তায় কেনা আসবাব আর অল্প কিছু পাওয়া উপহার,
ওয়ালটনের ফ্রিজ ভরে থাকে দেশী মাছ আর কাগুজে লেবুতে,
ইচ্ছে মতো গলা ভেজানো যায় মিষ্টি ঠাণ্ডা সরবতে,
আর রাতে টিভি দেখতে দেখেতে খাওয়া- আহা কি মধুর!
এরপর দুইজনা চাকরী পেলে আরো গুছিয়ে ওঠে সংসার।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, কি যে আছে ভবিষ্যতে-
তুমি কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা পারো না ব’লতে!

একটা ক্যাসেট-প্লেয়ারও ছিলো ওদের, বাজাতো উচ্চস্বরে প্রায়
বেশ ভালো সংগ্রহ- রবীন্দ্র-শচীন থেকে জেমস-বাচ্চু কি নেই!
কিন্তু কোনো কোনো রাতে আর
উঠতো না বেজে সেই ক্যাসেট প্লেয়ার।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, কি যে আছে ভবিষ্যতে-
তুমি কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা পারো না ব’লতে!

ওরা ঠিক করে বছরপূর্তিতে ঘুরতে যাবে কক্সবাজারের সৈকতে
গ্রিনলাইনের নতুন গাড়ি ওদেরকে নিয়ে ছাড়ে গভীর রাতে,
সুন্দরতম যুথির সাথে সেখানে দারুন কাটে সময় সবুজের
দীর্ঘতম সৈকতের পাড়ে ওরা আরো কাছে আসে পরষ্পরের।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, কি যে আছে ভবিষ্যতে-
তুমি কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা পারো না ব’লতে!

নোট : চাক বেরির ‘য়ু নেভার ক্যান টেইল’ অবলম্বনে…