কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ৩১

কতবার বানের পানিতে ভেসে গেছে বসতি
অভাগা এই জলাঙ্গির দেশে,
কতবার ফেরেনি গ্রামের অর্ধেক মানুষ,
কত অল্পের তরে মানুষ দিয়ে গেছে জীবন-
আবার তুচ্ছ কারণে নিয়েছেও শতেক প্রাণ!
কে জানে তাদের কয়জনা ছিলো আপন!
কয়জনা কেঁদে ভাসিয়েছিলো বুক,
আর কয়জনা ফেলেছিলো স্বস্তির নিঃশ্বাস…
এতএত শতাব্দীর আকাঙ্ক্ষার সম্মিলন
আর অগণিত আত্মার বলিদানেও
সময়কে আজো স্থিরতর করা গেলো না!
তবুও মানুষ আসে মানুষের ডাকে
বানের স্রোতের মতো অনিশ্চিয়তা সাথে নিয়ে!
কোন সে অস্থিরতা ঠোকরায় তাকে প্রতিনিয়ত?
অনিশ্চয়তার থলিতেই কেন যত প্রলোভন!
ওগো! তুমি কি জানো কতটা দূরত্ব,
সময়ের কাছে কতটা নিসহায় সমর্পন,
আর কতটা নিষ্ফলা আস্থার উচ্চারণ-
ভেসে বেড়ায় বুড়ো শকুনের সুস্থির চোখে!
বারবার কেন এখানেই বান ডাকে…
তার কতটা জানো তুমি, ওগো নিয়তি?

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা ১২

কেন গড়ে ওঠে শহর?
কে গড়ে তোলে শহর?
কে বা কি গড়ে দেয় শহরের মূল কাঠামো আর অবয়ব?

প্রশ্নগুলো বহু শতাব্দি প্রাচীন। তবে উত্তরগুলো আর আগের মতো ক’রে দেওয়ার উপায় নেই। ইতিহাসের পুরাতন শহরগুলো গড়ে ওঠার কারণ ছিলো নানাবিধ। প্রাচীন মিশরের থিবস, মেমফিস কিংবা আলেকজান্ড্রিয়ার বড় শহর হ’য়ে ওঠার কারণ একই ছিলো না। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা কিংবা মহেনজোদারো শহরগুলোর গড়ে ওঠা আর বিলুপ্তির কারণও বেশ ইউনিক বা অনন্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত। বল্লাল সেনের আর প্রতাপাদিত্বের শহরও বলে ভিন্ন ভিন্ন গল্প, একই বাংলার অংশ হ’য়েও।

একসময় সংকর-ধাতু ব্রোঞ্জের উপর নির্ভর ক’রে মানুষ বেশ কার্যকর অস্ত্রশস্ত্র বানাতে শুরু করে। একই সময়ে চাষাবাদের কাঠের উপকরণে ধাতুর প্রলেপ যুক্ত হ’তে শুরু করে। তাতে মাটি খোড়া সহজতর হয়। ফলে ফসলের উৎপাদন যায় বেড়ে। বাড়তে থাকে মানুষের আবাদ আর আবাস দুইই। ততদিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ প্ল্যান্ট ডমেস্টিকেশন বা গাছের গৃহপালিত-করণে বেশ সফল হ’য়েও উঠেছে। মনে রাখা দরকার আবাদ শুরুর আগে স্থায়ী আবাস তৈরী করা মানুষের পক্ষে একরকম অসম্ভবই ছিলো। আবাদ শুরু করার আগে মানুষকে নিতে হ’য়েছে হাজার হাজার বছরের প্রস্তুতি আর পর্যবেক্ষণজাত সিদ্ধান্ত। মানুষ দেখেছে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের উপর মানুষের বেঁচে থাকাটা কতটা নির্ভর করে। কিন্তু যেসব গাছ থেকে শর্করা পাওয়া যায় তারা বড্ড অদ্ভুত। কিছু ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের বীজ আর মাটির নিচে হওয়া আলুতে একে পাওয়া যায় বেশ ভালো পরিমাণে। বাংলাদেশের সিলেট, ভারতের আসাম কিংবা চীনের ইউনানের মানুষেরা এক ধরণের ঘাসের সন্ধান পায় মোটামুটি হাজার বিশেক বছর আগে। নাম দেয় ধান। বিজ্ঞানীরা বলেন সেই সময় ধানের শীষে ২/৩ টার মতো ধান হ’তো। সেই ধানগাছকে দীর্ঘ সময় ধ’রে সিলেকটিভ ব্রিডিং ক’রে ক’রে মানুষের তাকে আবাদযোগ্য ক’রে তোলার পরেই সম্ভব হয়েছে এই সব অঞ্চলে চাষবাসের গোড়াপত্তন করার। কাছাকাছি সময়ে মধ্য-এশিয়া আর য়ুরোপের মানুষেরা যব আর গমকে বাগে এনেছিলো। উত্তর আমেরিকার মানুষেরা ভুট্টা বা কর্ন আর দক্ষিণ আমেরিকার মানুষেরা নানা ধরণের আলুকে চাষযোগ্য ক’রে তুলেছিলো ইতিহাসের নানা পর্যায়ে। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে এই ধান, গম, যব, ভুট্টা আর আলুই শর্করা জাতীয় খাদ্যের মূল উৎস।

আর একটা খুব দরকারী জিনিস ছিলো লবণ। উষ্ঞ রক্তের প্রাণী হওয়ায় লবণ ছাড়া মানুষের পক্ষে শরীর গরম রাখা সম্ভব হয় না। সে লবণ নানা ধরণের হ’তে পারে। হ’তে পারে খনিজ লবণ, হ’তে পারে সমুদ্রের পানি থেকে পাওয়া লবণ কিংবা অন্য কোনো উষ্ঞ-রক্তের প্রাণীর রক্ত আর মাংসে থাকা লবণ। ফলে আবাদ আর আবাস এমন জায়গাতে গড়ে তুলতে হ’তো যেখানে লবণের নিশ্চয়তাও পাওয়া যায়। ফলে শুধু নদী থাকলেই বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হ’তো না মানুষের পক্ষে। বসতি গড়ে তোলার জন্য চাই নেভিগেবল বা নৌকা-চলার-উপযোগী নদী। যে নদীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় লবণ সারাবছর আনা-নেওয়া করা যেতো। মানুষের গৃহপালিত বেশির ভাগ প্রাণীর জন্যও লবণের এই ব্যাপারটা সত্য। লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গরু-ছাগল-মুরগী কাউকেই হয়তো গৃহপালিত করা যেতো না। গরু ঠিক কতটা বুদ্ধিমান প্রাণী জানি না, তবে লবণ যোগাড় করার পরিশ্রমসাধ্য কাজটা যে মানুষের ঘাড়ে সেই প্রাচীন কালেই তারা চাপিয়ে দিয়েছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাতে তাদের বেশ কিছু স্বাধীনতা স্যাক্রিফাইস করতে হ’লেও গড়পড়তা গরুদের দৈনন্দিন জীবন যে সহজতর হয়েছিলো তা মানতেই হবে, এমনকি গরুদেরকেও।

এখন বলা যায় যে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আমরা মোটামুটি জানি। যেসব মানুষ শর্করা আর লবণের উৎস নিশ্চত করতে পেরেছে তারাই প্রথমে গড়ে তোলে আবাস, পরবর্তীতে গ্রাম; আরো আরো পরবর্তীতে শহর। কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই তাদের সবাই নয়। ইতিহাসের সব গ্রাম শহরে রূপান্তরিত হয়নি। বা সব গ্রামের মানুষ তাদের গ্রামকে শহর বানিয়ে ফেলেনি বা ফেলতে চায়নি বা হয়তো পারেওনি। এখানে এসেই উত্তরটা আবার যেন একটু ধোঁয়াটে হ’য়ে ওঠে। যদি জানা যায় কেন গড়ে ওঠে শহর তাহ’লে হয়তো সেই ধোঁয়ার খানিকটা সরিয়ে দেওয়া যায়।

সহজ ক’রে ব’লতে গেলে ব’লতে হয়, শহর গড়ে ওঠে বাড়তি কিছু সুবিধা তৈরীর জন্য, বাড়তি কিছু নিশ্চয়তা গড়ে তোলার জন্য, বাড়তি কিছু সেবা পাওয়ার জন্য; যে সুবিধা, নিশ্চয়তা কিংবা সেবা শুধু বসতি বা গ্রাম থেকে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না কারণ অল্প মানুষের বসতি কিংবা আয়োজন দিয়ে এমনতরো সুবিধা, নিশ্চয়তা কিংবা সেবাকে টেকসই বা ভবিষ্যসহ করা যায় না। অনেকগুলো বসতির মানুষ মিলে তাই গড়ে তুলতে হয় কোনো একটা শহর। শহর তাই মূলগত ভাবে সেবা আর সুযোগের উৎপাদক। সেই সাথে তার চারপাশের গ্রামগুলোতে উৎপাদিত প্রাথমিক পণ্যের বড়সড় ভোক্তা। সেই অর্থে গ্রামের প্রয়োজনেই শহরের গোড়াপত্তন। আবার গ্রামের প্রয়োজনেই শহরের রূপান্তর।

যে ধরণের প্রয়োজন মেটানোর তাগিতে কোনো শহর গড়ে ওঠে তার চরিত্রে বা বৈশিষ্ট্যে সেসব প্রয়োজনের বেশ কিছু ছাপ তাই থেকে যায়। আবার শহর বা শহরের মানুষের কোনো কিছু ভোগ করার ধরণও এক্ষেত্রে কম ভূমিকা রাখে না। শহরের মানুষের প্রধান খাবার কি, পোশাকের ধরণ কেমন, বাড়িঘরের উপকরণ কেমন (মাটি, কাঠ, বাঁশ, ইট, পাথর ইত্যাদি) তা মোটামুটি নির্দিষ্ট করে দেয় শহরকে ঘিরে রাখা গ্রামগুলোই; তাদের সরবরাহ করা উৎপাদিত পণ্যগুলোর মাধ্যমে।

বহু শতাব্দির ব্যবধানে হয়তো আস্তে আস্তে কিছু কিছু শহরের ভেতরে যোগাযোগ গড়ে উঠতে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিই সম্ভবত মূল ভূমিকা রেখেছিলো তাতে। বড়সড় নৌকা বা জাহাজ কিংবা চাকা-বসানো গাড়ি আবিষ্কার করার পর মানুষের পক্ষে আরো দূরের দূরত্বে যোগাযোগ করা সহজ হয়। কিন্তু শুধু প্রয়োজনের নিরিখে হয়তো এই নতুন উপযোগকে বহুল ব্যবহার করার যৌক্তিকতা পাওয়া যাবে না। সে যৌক্তিকতা তৈরীর জন্য চাই নতুন কোনো ভাবনা, নতুন কোনো আইডিয়া। প্রয়োজন নতুন কিছু টুল বা আয়ুধ- ধর্ম, ভাষা, সাম্রাজ্য ইত্যাদি।

আমাদের আজকের দৃশ্যমান সবগুলো শহরের পেছনে এই পুরাতন ভাবনাগুলো তো ক্রিয়াশীল আছেই, সেই সাথে যোগ হ’য়েছে আরো হাজারো ভাবনা, হাজারো চাহিদা। আর তাই আজকের শহর অতীতের যে কোনো সময়ের বেশিরভাগ শহরের চেয়ে জটিল; অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিশৃঙ্খল আর অধিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। ফলত অনেকটাই দুর্বোধ্য।

এই প্রেক্ষাপটে উপরের প্রশ্নগুলো ঢাকার জন্য ক’রলে কেমন হয়?
কেন গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর?
কে গড়ে তুলেছে রাজধানী ঢাকা?
কি দিয়ে গড়া ঢাকা শহরের অবয়ব?

খুব সংক্ষেপে এই প্রশ্নগুলোর সর্বজন গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়া যাবে না ব’ললেই চলে। কিন্তু তাই ব’লে প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়াটাও ঠিক হবে না হয়তো, যদি সামনের দিকে আগাতে চাই। উত্তরগুলো হয়তো একই রকম হবে না সব/সবার পরিপ্রেক্ষিত থেকে। কিছু বিতর্ক, কিছু সন্দেহ, কিছু মন-গড়া রোম্যান্টিসিজম থেকেই যাবে। রাজনীতিকের উত্তরের সাথে প্রকৌশলী আর পরিকল্পকের উত্তর মিলবে না। নাগরিকের উত্তরের সাথে মিলবে না শাসকের উত্তর। ব্যবসায়ীর উত্তরের সাথে ভোক্তার উত্তর। উৎপাদকের সাথে মধ্যসত্ত্বভোগীর উত্তরও আলাদাই হবে। আলাদা হবে ঐতিহাসিক আর অর্থনীতিকের উত্তরও। কিন্তু সবার উত্তর নিয়েই গড়ে ওঠে কোনো একটা শহরের সামগ্রিক বয়ান বা ন্যারেটিভ। আজকের দিনের শহরগুলো অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা হ’য়ে ওঠে তার এই বয়ানের পার্থক্যের জন্যই মূলত।

তার কারণও মোটামুটি জানা। সবকিছুর অতিপ্রমিতকরণ। তাতে গঠনপ্রক্রিয়া দ্রুত করা গেলেও বৈচিত্র্যের প্রশ্নে বেশ বড়সড় একটা ছাড় দিতেই হয়েছে। আবার জাহাজীকরণে কন্টেইনারের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে স্থানীয় নির্মাণ-উপকরণ ব’লে আর যেন কিছু থাকলো না। আজ সহজেই ইটালির মার্বেল দিয়ে ঢাকার ভবনের মেঝে সাজানো যায়। ঢাকায় সেলাই করা কাপড় পৃথিবীর সবখানে সহজেই পারা যায়। ভারতে উৎপাদিত টিকা নিতে পারে এখন সব মহাদেশের মানুষ। এক কন্টেইনারাইজেশনই সংকুচিত ক’রে এনেছে পৃথিবীর শহরগুলোর হাজারো বৈচিত্র্যের সুযোগ, যা কিনা পণ্য যোগাযোগের মাত্র একটা মাধ্যম। যখন একসাথে আরো অনেকগুলো মাধ্যমকে বিবেচনা করা হবে তখন দেখা যাবে একুশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো যেন খুব কাছাকাছি লয়ে কথা বলে, হয়তো সকলে মিলে একই কথাও বলে। সমস্ত মানুষের  স্বার্থগুলো, ভাবনাগুলো যেন সব এক হ’য়ে গিয়েছে একুশ শতকের শহরে এসে। আবার হয়তো যায়ওনি, খুব খেয়াল করলে তা হয়তো বোঝা যায়… ডেভিলস রাইট দেয়ার রাইট দেয়ার ইন দ্য ডিটেইলস… (Fink এর লুকিং ঠু ক্লোজলি থেকে… https://www.youtube.com/watch?v=qoWRs7lXtYE)

তাই শেষ বিচারে প্রতিটা শহরই আলাদা। প্রতিটা শহরের শব্দ আলাদা। প্রতিটা শহরের আকাঙ্ক্ষা আলাদা। প্রতিটা শহরকে তাই একই ভাবে পাঠ করা যায় না। যায় না তার অতীতের কারণে। যায় না শহরের মানুষগুলোর কারণে। যায় না মানুষগুলোর বসবাসের ধরণের বৈচিত্র্যের কারণে। মানুষের বসবাসের ধরণের দৃশ্যমান বৈচিত্র্য শহরের আবাসিক ভবনগুলোর চেহারা গড়ে দেয় অনেকটাই। অনেকেই তাই ব’লতে চান, আবাসিক ভবনগুলোই গড়ে দেয় শহরের অবয়ব। কেউ কেউ অবশ্য শহরের রাস্তাগুলোর কথা প্রথমে বলেন। হয়তো শহরের অবয়ব গড়তে এই দুইয়ের ভূমিকাই সবার আগে আসে। কিন্তু শহর তো সভ্যতার উপযাত আর সভ্যতার জন্য চাই খানিকটা হ’লেও রাখঢাক কিংবা পোশাক। সভ্যতার সবকিছু তো আর প্রকাশ করা যায় না; তার অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতে হয়। একটা ভালো শহর জানে তার কতটা লুকিয়ে রাখতে হবে আর কতটা প্রকাশ করতে হবে আগন্তুকের কাছে।

শহরের তাই ভেতরের কাঠামো আর পোশাকী অবয়বে পার্থক্য অনিবার্য। শহরের আগন্তুকের কাছে সেটা সবসময় ধরা না পড়লেও শহরের নিয়মিত বাসিন্দাদের চোখে তা ধরা পড়তে বাধ্য। আগন্তুক হয়তো দেখে পরিস্কার রাস্তা। শহরবাসী জানে রাস্তা পরিস্কারের কাজ করা গরীব আর নোংরা মানুষগুলোর কথা। আগন্তুক হয়তো দেখে কোনো একটা উদ্যানের গাছ না কাটার জন্য একদল শহরবাসী আন্দোলন করছে। আর শহরবাসীরা জানে তারা নিজেদের বাড়ির সামনের সব গাছ কেটে ফেলেছে এতদিনে, তাই উদ্যানটার গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখা তাদের জন্য কতটা দরকারী। আগন্তুক দেখে প্রতিটা ভবনের চারপাশে উঁচুউঁচু দেওয়াল, ফলে নিরাপদ শহর। শহরবাসী জানে এক ভবনের বাসিন্দা পাশের ভবনের বাসিন্দাকে কতটা অবিশ্বাস করে।

দিন শেষে শহরের কিছুই কি আর গোপন থাকে? অন্তত যে বা যারা প্রতিনিয়ত গড়ে চলেছে তাদের নিজেদের শহরটাকে? সব কিছু প্রকাশ হ’য়ে গেলে কি আর সভ্যতা থাকে?

নোট : সচলায়তনের জন্য লেখা। এখানে সংরক্ষণ করলাম। কিছু টাইপো ঠিক করে। লিংকটাও রেখে দিলাম।
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/58004

নগরী

নগরী ঢাকা ১১

প্রসঙ্গ : ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি

প্রতিদিন ঢাকাবাসীরা যে পরিমাণ পানি মাটির নিচ থেকে তুলে এনে ব্যবহার করছে সেই পরিমাণ পানি মাটিতে আবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। প্রতি বছরই তাই একটু একটু ক’রে মাটির নিচের পানির-স্তর নেমে যাচ্ছে। যার ফলে বছরান্তে পানি উত্তোলনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত তৈরী হচ্ছে পানি-পরিশোধনাগার তৈরীর বাড়তি চাহিদা, যেখানে সারফেইস ওয়াটার (স্বাদুপানি বলা যায় হয়তো) বা নদী, খাল কিংবা বড় কোনো জলাধারের পানিকে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। কিন্তু মাটির উপরের এইসব পানিতে যদি দূষণের পরিমাণ বেশি হ’য়ে যায় তবে তাকে পরিশোধনের খরচ লাগে অনেক বেশি। অনেক সময় তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও পাওয়া যায় না। আবার যদিও বা পাওয়া যায়, অনেক সময়ই দেখা যায় যে সেই প্রযুক্তি অর্থাৎ যন্ত্রপাতি ব্যবহার আর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যথাযত লোকবল নেই শহরে।

ফলে সহজ সমাধান হিসেবে বারবার ভূগর্ভস্থ পানি তোলার জন্য নলকূপ বসানোর পরিকল্পনা হাতে নিতে হয়। আবার ১৯৯৩ সালের দিকে যখন দেশব্যাপী অগভীর-নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হ’লো তখন জানা গেলো প্রায় ২৯ শতাংশ অগভীর নল-কূপের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিক আছে। দেশের পার্বত্য তিনটি জেলা ছাড়া বাকি সবগুলো জেলার ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা গেলো। সেই সাথে আরো দেখা গেলো মাটির একটু গভীরের স্তরের পানি আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নিরাপদ। দ্বিতীয় স্তরের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি নেই। এটাতে সারা দেশব্যপী গভীর-নলকূপ বসানোর প্রয়োজন পড়লো আরো বেশি ক’রে। (১)

অর্থনীতির পরিসংখ্যান ব’লছে ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেশ তরান্বিত হ’য়েছে। আর অর্থনৈতিক অগ্রগতি সব সময়ই নগরায়নকে তরান্বিত করে। এই সময় নানা কারণে খুলনা পিছিয়ে পড়তে থাকে। ফলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহরের লোক-সংখ্যা কমতে শুরু করে। বন্ধ হ’তে শুরু করে এই শহরের অনেকগুলো কারখানা। তার বেশ খানিকটা প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ঢাকা আর তার আশপাশের শহরতলীগুলোর উপর, যেখানে পুরোনো কিছু কারখানা আগে থেকেই আছে আর নতুন নতুন পোশাক-কারখানা গ’ড়ে উঠছে।

মনে রাখা দরকার পোশাক-কারখানাতে প্রচুর পরিমাণে পানযোগ্য পানির প্রয়োজন হয়। আর এই কারখানাগুলো উপজাত হিসেবে সমপরিমাণে দূষিত পানি উৎপাদন করে। বিলেতের ম্যানচেস্টার যখন পৃথিবীর কাপড়-তৈরীর কারখানা আর বাজারের সিংহভাগ দখল নিয়েছিলো তখন সেখানকার প্রায় সবগুলো খাল-নদীর পানি এমনই দূষণের শিকার হ’য়েছিলো যে সেখানকার নদীগুলো থেকে প্রায় সব ধরণের মাছ আর জলজ প্রাণী হারিয়ে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে য়ুরোপের বেশির ভাগ বড় শহরকেও শিল্পায়নের এই ধরণের ক্ষতিকর প্রভাবের ভেতর দিয়ে যেতে হ’য়েছে। স্বাদুপানি বা মিঠাপানির মাছ যে কি জিনিস তা যুরোপ এখন আর জানে না ব’ললেই চলে।

ঢাকার সীমান্তবর্তী তুরাগ আর বুড়িগঙ্গার পনি এখন এমনই দূষিত যে সেখানে আর তেমন কোনো জলজ-প্রাণী নেই ব’ললেই চলে। অনেক বিশেষজ্ঞ ব’লছেন এই পানি এখন আর শোধনের উপযোগীও নেই। জানি না সাইদাবাদ কিংবা পাগলার শোধনাগারের ঠিত কতটা পানি এখনো বুড়িগঙ্গা থেকে জোগাড় করা হয়। শোনা যাচ্ছে, পদ্মা নদী থেকে পানি তুলে সেই পানি শোধন ক’রে ঢাকার বাসা বাড়িতে সরবরাহ করার পরিকল্পনা করছে সরকার।(২) এই পরিকল্পনা যে একেবারে বাধ্য হ’য়েই করতে হচ্ছে তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোর পানি এরই ভেতরে এতটাই দূষিত হ’য়ে গিয়েছে যে তাকে শোধন ক’রে পানযোগ্য করা অর্থনৈতিক বিচারে আর লাভজনক নেই। উপরন্তু বুড়িগঙ্গা, বালু আর তুরাগ নদীতে পানির পরিমাণও অনেক কমে গিয়েছে। তার পরিণতিতে প্রতিদিনই ঢাকার পানির-স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০০৯ সালে ঢাকা-ওয়াসার তখনকার ব্যবস্থাপনা-পরিচালক জনাব রায়হানুল আবেদিন বলেছিলেন, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির-স্তর বছরে ৩ মিটার ক’রে নিচে নেমে যাচ্ছে।(৩) এ সম্পর্কিত ২০২১ সালের তথ্য এখনো যোগাড় ক’রতে পারিনি, তবে ধারণা করি পানির-স্তর নেমে যাওয়ার হার আরো বেড়েছে।

ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের একটা সাধারণ রেখাচিত্র দেখে নেওয়া যাক। এটি নেওয়া হ’য়েছে https://wtamu.edu/~cbaird/sq/2013/07/16/how-do-wells-get-their-water-from-underground-rivers/ ওয়েবপেইজ থেকে।

কনফাইন্ড আর আনকনফাইন্ড এ্যাকুইফারকে যথাক্রমে সদা-পরিবর্তনশীল আর তুলনামূলক ভাবে কম-পরিবর্তনশীল ভূ-গর্ভস্থ জলাধার বলা যায়। সদা-পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ জলাধার সাধারণত মাটির কম গভীরতাতে অবস্থিত হয় আর এর উপরে থাকা মাটি এমন বৈশিষ্ট্যের হয় যে তার ভেতরে বৃষ্টি কিংবা নদীর পানি সহজে ঢুকতে পারে। এই ভূগর্ভস্থ জলাধারের পানির একদম উপরের তলকে ‘ওয়াটার-টেবল’ বা পানির-স্তর বলা হয়। পানির এই স্তর বর্ষাকালে উপরে উঠে আসে আর শীতকালে নিচে নেমে যায়। এই ধরণের ভূ-গর্ভস্থ জলাধারের নিচে যাদি এমন একটা মাটির স্তর থাকে যার ভেতরে সহজে পানি ঢুকতে পারে না তবে সেই মাটির স্তরের নিচে কম-পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ জলাধার গড়ে উঠতে পারে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে। এমন ধরণের ভূগর্ভস্থ জলাধার কয়েক স্তরের হ’তে পারে, কখনো কখনো তা মাটির উপরের দিকেও থাকতে পারে, তবে সাধারণত মাটির বেশ নিচেই এদেরকে পাওয়া যায়।

অগভীর নলকূপ দিয়ে খুব সহজেই মাটির উপরের দিকের জলাধারের পানি তুলে আনা যায়। আমাদের দেশের প্রায় সব জায়গাতেই আমরা এটা করছি বেশ অনেক বছর ধ’রে। যেহেতু বাংলাদেশে নদী-নালার পরিমাণ বেশ বেশি তাই এই তুলে আনা পানির কতটা আমরা আবার মাটিতে ফিরিয়ে দিচ্ছি তা নিয়ে আমাদের খুব একটা ভাবতে হয়নি এতদিন। সে যেমন গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে, একই সাথে শহুরে প্রেক্ষাপটেও। কিন্তু দুষ্টুলোকেরা যে বলে, সুখের দিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা এই ক্ষেত্রে পুরো খেটে গেছে।

অধিক জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের নিশ্চয়তা বৃদ্ধির প্রয়োজনে আমাদেরকে বাড়াতে হ’য়েছে আবাদি জমির পরিমাণ, সেই সাথে সেচের ব্যবস্থা। ১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেশের অনেকগুলো জায়গাতে সেচের প্রয়োজনে গভীর নলকূপ বসানোর কার্যক্রম শুরু হয়। (৪) এর সাথে পরবর্তীতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদী থেকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের গ্রামাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যেতে শুরু করে। ফলে দেশের কৃষি-ব্যবস্থাতে গভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়ানোর আপাত প্রয়োজন বেড়ে যায়।

আর শহরের গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে শহরে বাড়তে থাকে জন-ঘনত্ব। তাতে পানযোগ্য পানির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তার সাথে শহরে যদি এমন ধরণের শিল্প-কারখানা গ’ড়ে তোলা হয় যার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন পড়ে তবে সেই পানির চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থাপনা খুব গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে দাঁড়ায়; আজ ঢাকার জন্য যেমনটা হ’য়ে উঠেছে।

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে বেশ বড়সড় একটা জটিলতা দেখা দিয়েছে কয়েক বছর আগে। জাকার্তা শহরের আয়তন আর গড়পড়তা ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খুব দ্রুত শহরের পানির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই চাহিদা পূরণের জন্য প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিতে হয়েছে জাকার্তাবাসীদেরকে। তাতে এই শহর যে মাটির উপর দাড়িয়ে আছে তার বৈশিষ্ট্য গিয়েছে পালটে। মাটির সদা-পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ জলাধারে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই অংশের মাটির চাপ ধারণ ক্ষমতাও গিয়েছে কমে। আবার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইমারত তৈরী হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। যার ফলে মাটির উপর যতটা ভর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ততটা ভর এখানকার মাটি নিতে পারছে না। প্রতিবছরই তাই একটু একটু ক’রে জাকার্তা শহর বসে যাচ্ছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির স্তর যাচ্ছে বেড়ে। সব মিলিয়ে জাকার্তা শহর তলিয়ে যেতে শুরু ক’রেছে। এখন বাধ্য হ’য়ে ইন্দোনেশিয়াকে তার রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।

ঢাকার জন্যও একই ধরণের ভয় বাড়ছে। ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি অতিরিক্ত মাত্রায় দূষণের কবলে পড়েছে মূলত পোশাক আর চামড়া শিল্পের জন্য। সেই সাথে আমরা এত বেশি পলিথিন বর্জ্য নদীতে ফেলেছি যে নদীর নীচের মাটি আর পার্মিয়েবল বা পানি-শোষণক্ষম নেই ব’ললেই চলে।

শোনা যায় রাজা বল্লাল সেনের রাজধানী পদ্মার ভাঙনে খুব অল্প কিছু দিনে বা বছরের ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলো। তার রাজবাড়ির কিছুই এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার নতুন ক’রে  বল্লাল সেন আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য গ’ড়ে তুলতে পরেছিলেন কিনা তা জানতে পারিনি এখনো।

ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একে আর কত দিন রাজধানী হিসেবে টিকিয়ে রাখা যাবে তা এক গুরুতর প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্নটা দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহলে উচ্চারিত হয় কিনা সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই ব’লে দুঃখ প্রকাশ ক’রে নিচ্ছি। তবে এটা ব’লতে পারি সে ধারণা তৈরীর চেষ্টা করছি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার ভাবনা সরকারের আছে কিনা জানি না। তবে ঢাকার পানি-ব্যবস্থাপনা আর দেশে আরো কিছু বড় শহর গ’ড়ে তোলা নিয়ে কার্যকর ভাবনা খুব দ্রুত বিকাশ করা প্রয়োজন। আর তা করা না গেলে রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার মতো ভয়ানক ভাবনা ভাবারও প্রয়োজন পড়তে পারে অদূর ভবিষ্যতে।

সূত্র :

১.  https://old.dphe.gov.bd/index.php?option=com_content&view=article&id=96&Itemid=104

২. https://www.prothomalo.com/bangladesh/%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A6%A8

৩.  https://www.thedailystar.net/news-detail-83387

৪. এই ব্যাপারে কিছু চিত্তাকর্ষক তথ্য পাওয়ার জন্য যৌথভাবে লেখা বেটসি হার্টম্যান এবং জেমস্ কে. বয়সি এর A QUIET VIOLENCE _ View from a Bangladesh Village বইয়ের Tubewells for the Rich অংশটি পড়া যেতে পারে।

৫. সচলায়তনের জন্য লেখা। ওখানকার ক্রম ৬

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা ১২

পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতে না পারলে তার পরিণতিতে সমাজে ক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে ব’লে লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক করেছিলেন। (১) এই পর্যাপ্ত ব্যাপারটা খুব নির্দিষ্ট ক’রে যে বলা যাবে তা হয়তো নয়। সমাজ, শহর, অর্থনীতি ভেদে এই পর্যাপ্ততার ব্যাপারটা ওঠানামা করে এবং করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ ধারাবাহিক ভাবেই বাড়ছে গত কয়েক দশক ধ’রে। তার পরিণতিতে দেশে ভালো মানের আবাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনও বাড়ছে। দেশে ভবন নির্মাণের গড় গুণগত মান যে বাড়ছে তাতে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সুউচ্চ ভবন আমাদের কাছে বেশ পরিচিত হ’য়ে উঠতে শুরু করেছে। এমনকি সেটা ঢাকা শহরের বাইরেও।

সম্প্রতি সরকারী উদ্যোগে নতুন যে সব আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা হচ্ছে তার অনেকগুলোর উচ্চতাই দশ তলার বেশি। এই আবাসন ব্যবস্থাগুলোর কিছু সরকারী কর্মচারীদের জন্য, ফলে বিক্রির জন্য নয়। অনেকগুলো জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে করছে, যেগুলো বিক্রির জন্য। সামরিক আর আধাসামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ক’রে গ’ড়ে তোলা আবাসিক সুবিধাগুলোর অনেকগুলোই ১৪/১৫ তলার কাছাকাছি উচ্চতার।

ঢাকা আর চট্টগ্রামে এখন যে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮) চালু আছে তাতে রাস্তা যদি তুলনামূলক প্রশস্ত হয় তবে তার পাশের জমিতে মোটামুটি ১৪ তলার আবাসিক ভবন তৈরীর অনুমতি পাওয়া যায়, যদি না জমির আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিমাণের কম হয়। আবার একটু উল্টো ক’রে ব’ললে যেহেতু এ্যাপার্টমেন্ট ভবনের (এ-২ টাইপ ভবন) জন্য সর্বোচ্চ ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) ৬.৫ নির্ধারণ করা আছে, আর সে ক্ষেত্রে নিচতলা আর জামিনদোজ (বেইজমেন্ট) ব্যতীত অন্যান্য তলার জন্য জমির সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ জায়গা সীমাবদ্ধ করা আছে সেহেতু ১৪ তলার উপরে আবাসিক ভবন তৈরীর সুযোগ গিয়েছে কমে। যদিও চাইলে ভূমি-ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে আরো উঁচু আবাসিক ভবন তৈরীর অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা করতে ডিভেলপারদেরকে দেখা যায় না বললেই চলে। তার একটা কারণ অর্থনৈতিক আর একটা কারণ সিভিল-এ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া উচ্চতার সীমা, সেটা খুব কম ক্ষেত্রেই ১৫০ ফুটের বেশি হয়। ফলে ঢাকার বা চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনের উচ্চতা ১৪ তলার ভেতরে সীমাবদ্ধ হ’য়ে পড়ছে; বাস্তব বিবেচনায়।

ওয়াল্ডএ্যাটলাস.কম এর অক্টোবর ০৪, ২০২০ এর একটা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে জনঘনত্বের দিক দিয়ে পৃথিবীর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা বর্তমানে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে। (২) এই প্রতিবেদনের মতে ঢাকাতে প্রতিবর্গকিলোমিটারে ২৯০৬৯ জন মানুষের বাস। আবার ওয়াল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিঙ্গাপুর সিটিতে প্রতিবর্গকিলোমিটারে বাস করে ৮৩৫৮ জন মানুষ। আর উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে জন-ঘনত্বের বিবেচনায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৫৫ তম। (৩) সেখানে প্রতিবর্গকিলোমিটারে বাস করে ১৬৬৬১ জন মানুষ।

জন-ঘনত্বের সাথে শহরের ভবনগুলোর উচ্চতার একটা সম্পর্ক নিশ্চয় থাকে। সেটা শুধু ছবি দেখে হয়তো নিশ্চিত করা যাবে না। তার জন্য যথাযত সমীক্ষা হওয়া দরকার। শুধু ছবি দেখে যেটা বলা যায় তা হ’লো সিঙ্গাপুর-সিটি বা হংকং এর সাপেক্ষে ঢাকা বা চট্টগ্রামের ভবনের উচ্চতা বেশ কম। যেহেতু অধিক উঁচু ভবনের নির্মাণ-খরচ মাঝারি-উঁচু ভবনের তুলনায় কম সেহেতু আশা করা যায় ঢাকা বা চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনের নির্মাণ-খরচ সিঙ্গাপুর কিংবা হংকং এর সুউচ্চ আবাসিক ভবনের অনুপাতে কম।

কিন্তু নির্মাণ-খরচ কম হ’লেই যে সেটা এ্যাফোর্ডেবল হবে তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ তার সাথে অনেক সামাজিক আর অর্থনৈতিক সূচক জড়িত। গড় হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় কম হ’লে তাদের পক্ষে অনেক কম-দামী জিনিসও কেনা সম্ভব নাও হ’তে পারে। প্রাপ্ত তথ্য ব’লছে সিঙ্গাপুরের ৯০ শতাংশের বেশি লোকজনের এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা আছে। ঢাকার জন্য এমন তথ্য বা পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া কঠিন। অল্প কিছু নমুনা যোগাড় করার চেষ্টা করেছি। কিছু বিল্ডিং পেয়েছি যার মালিক কোনো একক ব্যক্তি। নিজে একটা এ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। বাকিগুলো ভাড়া দেন। কিছু বিল্ডিং পেয়েছি যার মালিকানা কয়েকজন আত্মীয়ের মধ্যে ভাগ করা। কেউ কেউ নিজেই থাকেন, কেউ কেউ ভাড়া দেন। বেশ কিছু বিল্ডিং ডিভেলপারের বানানো। তার কিছু এ্যাপার্টমেন্টের মালিক ল্যান্ডওনার। বাকিগুলো যারা কিনেছেন তারা কেউ একটা কিনেছেন কেউ বা একাধিক। অনেকেই এ্যাপার্টমেন্ট কিনে ভাড়া দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেই থাকছেন। ব্যক্তিগতভাবে ধানমন্ডি, মোহম্মদপুর, শ্যামলী আর মিরপুরের মোট ২২টা আবাসিক বিল্ডিঙের সমীক্ষা করে তার ৭২% এ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছি যেগুলো ভাড়া নেওয়া। এই নমুনা সমীক্ষাকে স্ট্যানডার্ড হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবু বলা যায় যে ঢাকাতে নিজেদের মালিকানায় থাকার জায়গার সংস্থান আছে এমন মানুষের সংখ্যা ঢাকার মোট জনসংখ্যার ৪০% এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম।

বাসগৃহের মালিকানার সাথে শহরের জন-ঘনত্ব আর লিভিং-স্ট্যানডার্ডের বেশ সম্পর্ক আছে। শহরের জন-ঘনত্বের সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নিবিড়ভাবে জড়িত। সামান্য কিছু তুলনামূলক তথ্য সংগ্রহ ক’রে আর তা হিসাব ক’রে পেয়েছি যে ধানমন্ডি আর গুলশানের জন-ঘনত্ব মিরপুর আর মোহম্মদপুর থেকে অনেক কম। অথচ ধানমন্ডি আর গুলশানের বিল্ডিংগুলোর গড় উচ্চতা বেশি। সুনির্দিষ্ট উপাত্ত তৈরী না ক’রেও বলা যায় যে জন-প্রতি অনেক বেশি বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করে গুলশান, ধানমন্ডি আর উত্তরার বাসিন্দারা মিরপুর, মোহম্মদপুর কিংবা করাইল বস্তির বাসিন্দাদের অনুপাতে।

বাংলাদেশের একজন মানুষের মোটামুটি মানের আধুনিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করার জন্য ঠিক কত বর্গফুট জায়গা দরকার তার কোনো সরকারী উপাত্ত কিংবা দিকনির্দেশনা দেই। জাতীয় আবাসন নীতিমালাতে এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তাভাবনাও নেই। এই ২০২০ এ দেশের মানুষ-প্রতি কত বর্গফুট জায়গা তার থাকার জন্য স্থায়ী অবকাঠামোতে আছে তার কোনো তথ্য-উপাত্তও এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। ফলে আমাদের হাতে থাকা জন-ঘনত্বের পরিসংখ্যানটা শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার উপযোগী নয়।

আবার কোনো একটা স্থানের জন-ঘনত্বের সাথে সেই স্থানের প্রাকৃতিক কিছু বৈশিষ্টও সম্পর্কিত। ঐতিহাসিক ভাবেই ঢাকা এবং তার আশপাশের কিছু এলাকার জন-ঘনত্ব বেশি। সীমানা আরো একটু প্রসারিত ক’রে দেখলে দেখা যায় বাংলা ব-দ্বীপ অঞ্চলে মানুষের জন-ঘনত্ব তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বেশিরভাগ সময়ই বেশি ছিলো। এই তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে প্রাকৃতিক ভাবেই এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা অধিক সংখ্যক মানুষের বসতিকে ধারণ করতে পারে। তবে এই অধিক-সংখ্যক ব্যাপারটার নিশ্চয় একটা সীমা আছে। ঠিক কত সংখ্যক মানুষকে আজকের পরিস্থিতিকে ঢাকা শহরে স্বাস্থকর উপায়ে বসবাস করানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করা দরকার। সেটা না ক’রে শুধু বাজারের চাহিদার উপর নির্ভর ক’রে এই শহরের বাসযোগ্যতার মান বাড়ানো নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব হওয়ার সুযোগ বেশ সীমিত।

ঢাকার অধিক জন-ঘনত্বের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। এবং দরিদ্র মানুষই মূলত অল্পপরিসরে আটোসাটো পরিবেশে বসবাস করে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নতি জন-ঘনত্ব কমিয়ে আনার একটা কার্যকর উপায় হ’তে পারে।

টিকা ও সূত্র:

১. if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation. লি কর্বুজিয়ের

২. https://www.worldatlas.com/articles/the-world-s-most-densely-populated-cities.html

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_cities_proper_by_population_density

পুনশ্চ:
১. এ্যাফোর্ডেবল এর প্রচলিত বাংলা যদিও সাশ্রয়ী তবুও এটা সঠিক কিনা বলা শক্ত। কিনতে পারার সক্ষমতা শুধু মাত্র কম মূল্যমানের উপর নির্ভর করে না।
২. সচলায়তনের জন্য লেখা। এখানে সংরক্ষণ করলাম
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57909

বিভাগবিহীন

নগরী ঢাকা ১০

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া আজকের দিনের বড়সড় কোনো নগরীকেই আর বেশি দিন টিকিয়ে রাখা (সাস্টেইনেবল) বা নিদেনপক্ষে কার্যকর রাখা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন আর তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার এক নগর থেকে আর এক নগরের মাঝে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য, দরকার নগরের অভ্যন্তরে নাগরিকদের এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য দরকার নগরীর জ্বালানী (এ্যানার্জি) চাহিদা মেটানোর জন্য। নগরে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য। নাগরিকদের প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার জন্য। এমনকি এখনকার শহরগুলোর পার্ক, জলাশয় বা প্রাকৃতিক পরিবেশও প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল-পার্ক কিমবা ঢাকার হাতির-ঝিলের কথা বলা যায়। কারণ এই জায়গাগুলোর স্বাভাবিক বাস্তু-সংস্থান (ইকো-সিস্টেম) অনেক আগেই বিঘ্নিত ক’রে ফেলা হয়েছে, কিমবা এই জায়গাগুলোকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই প্রাকৃতিক ভাবে জায়গাগুলো সেরকম নয়।

কিন্তু আধুনিক কালের প্রযুক্তি ব্যাপারটা যেন প্রেমিকার হৃদয়াবেগের থেকেও বেশি দ্রুত পরিবর্তনশীল। মান্ধাত্তার আমলের প্রযুক্তি ঠিক কতটা উপযোগী ছিলো জানি না। তবে সেসব প্রাযুক্তিক উপকরণগুলো বহুদিন টিকতো ব’লে একধরণের প্রচার আছে। টিকে থাকাটাই সাস্টেইন করা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে সূক্ষ্ণ (সফিস্টিকেটেড অর্থে) প্রযুক্তি-পণ্য বা আয়ুধ (টুল) দীর্ঘস্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। ফলে এই ধরণের পণ্যগুলো দ্রুত বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের উৎসে পরিণত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের তাই বেশ কিছু হ্যাপাও আছে। পরিত্যক্ত প্রযুক্তির ভার বহনের ক্ষমতাও আজকের দিনের শহরগুলোর তাই না থাকলেই নয়, অন্তত খানিকটা হলেও। সেক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার-প্রযুক্তি সহায়ক হ’তে পারে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের আর একটা বড়সড় জটিলতা হ’লো এটা চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, তা কিনে ফেলার পরও। (এটা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন আমার বাবা যিনি এখনো মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারেন না।) প্রযুক্তি-পণ্য ব্যবহারের জন্য অনেক সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। আবার দক্ষতাও এমন একটা জিনিস যা সবাইকে সমান ভাবে ধরা দেয় না। তবে আজকের দিনের শহরকে মোটামুটি কর্মক্ষম রাখার জন্য যে প্রযুক্তিগুলোর দরকার পড়ে তার ব্যবহার-প্রণালী শহরের সব নাগরিকের না জানলেও চলে। কিন্তু যাদেরকে এই ব্যাপারগুলো জানতেই হবে তাদের সংখ্যা আর দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শহরে গ’ড়ে তুলতে হয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বা ইনিস্টিটিউট।

এই একুশ শতকের কোনো একটা শহর বা নগরে যে পরিমাণ মানুষ গাদাগাদি হ’য়ে বসবাস করে প্রাকৃতিক (অর্গানিক অর্থে) ভাবে সেভাবে বসবাস করা যায় না। বিলেতিরা যখন ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশ ছেড়ে চ’লে গেলো তখন এই দেশের মানুষের গড় আয়ু ২৭/২৮ বছরের কাছাকাছি ছিলো। যদিও নারীপ্রতি সন্তান নেওয়ার হার এখনকার থেকে কয়েকগুণ বেশি ছিলো, তবুও দেশের মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিলো বেশ কম। তার একটা বড় কারণ এই নিম্ন গড় আয়ুর ব্যাপারটা। আবার প্রেক্ষিত আয়ুস্কাল কম থাকায় মানুষজনকে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরী আর বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্নে কম বয়সে সংসার শুরু করা ছাড়া বিকল্প ছিলো না, যার সামাজিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশ আর ঢাকার মানুষের গড় আয়ু বেশ বেড়েছে। ঢাকার জন-ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে এর নাগরিকদের আয়ুস্কাল বৃদ্ধির বড় ভূমিকা আছে। আবার নাগরিকদের এই আয়ুস্কাল বৃদ্ধিতে শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানের দারুন কিছু কার্যক্রমের ভূমিকাও আছে। অদ্ভুত ভাবে ঢাকাতে এখন নারী-প্রতি সন্তান নেওয়ার হার দেশের সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি।

মোটাদাগে ব’লতে গেলে কারখানা বিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন) পর থেকে শহরের অবকাঠামো খাতে নানা ধরণের পরিবর্তন আনা গেছে ব’লেই আজকের দিনের শহরগুলোতে এতএত মানুষ এতটা ঘনবসতিতেও বেঁচে থেকে বসবাস করতে পারছে। আর সেই পরিবর্তনগুলো সম্ভব হয়েছিলো নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিস্কার আর তার ব্যববহার নিশ্চিত করতে পারার কারণেই। এক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে বিশ শতক পরবর্তী শহরের কাঠামোতে। নাগরিক জীবনে তো বটেই।

অর্থাৎ নগরীকে কার্যক্ষম রাখার জন্য আজকের দিনে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। আর সেই প্রযুক্তিকে সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন যথাযত প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। সিটি-কর্পোরেশন, ওয়াসা, পানি-উন্নয়ন বোর্ড, ডেসা, ডেসকো, পল্লী-বিদ্যুৎ, রাজউক, কেডিএ, সিডিএ, সিভিল-এ্যাভিয়েশন, মেট্রো সার্ভিস, সড়ক কর্পোরেশন ইত্যাকার নানা প্রতিষ্ঠান। আবার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করবে যে মানুষগুলো তাদের দক্ষতা তৈরীর জন্য প্রয়োজন নানা ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। এ এক বিপুল যজ্ঞ।

আজকের ঢাকা নগরীর জন্ম ১৯৪৭ এর আগে নয়, বাস্তবতার নিরিখে। ১৯৪৭ সালের পরে নানা স্থান থেকে যেভাবে ঢাকাতে মানুষ জড়ো হ’তে শুরু করে তার কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি ঢাকার ছিলো না, প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায়। ফলে ঢাকার বিভিন্ন বসতি কেন্দ্রগুলো বর্ধিত গ্রাম বা নিদেনপক্ষে ছোট শহরের চরিত্র নিয়ে বড় হ’তে থাকে পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত। বাজার, বিদ্যালয়, মসজিদ-মাদ্রাসা আর কিছু রাস্তাঘাট ছাড়া আর কোনো নাগরিক সুবিধা এইসব কেন্দ্রগুলোতে অনেক দিন পর্যন্ত গ’ড়ে ওঠেনি ব’ললেই চলে। এমন একটা শহরেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন মানুষের আগমন ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। কেন যে যায়নি তা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো (বিশ্ববিদ্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) খুব বেশি সমীক্ষাও হয়তো করেনি, অন্তত সাধারণের কাছে প্রকাশ যে করেনি তা বলা যায়। আর করেনি ব’লেই এই নগরীতে মানুষের আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি ব’লেই শহরের অনেক অবকাঠামো নিয়ে ন্যুনতম পরিকল্পনাও সাজানো যায়নি। জানি না দক্ষ মানুষের অভাব ছিলো কিনা। তবে নাগরিকদের ভেতরে এই শহরকে গ’ড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি ছিলো প্রকট। এখনো যে নেই তাও বলা যাবে না।

আশার কথা এই যে ঢাকার কাছে এর নাগরিকদের চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে যে কিছুকিছু সুবিধা বা সার্ভিস যদি গ’ড়ে তোলা না যায় তবে এই শহরের বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো এটা বুঝতে শুরু করেছে তাদের কাছে দুইটার বেশি বিকল্প আছে ব’লে মনে হয় না। হয় এই শহরের অনেকগুলো বর্তমান-সুবিধাকে উন্নত করতে হবে, কিছুকিছু নতুন ক’রে গ’ড়তেও হবে অথবা এই শহর থেকে পালাতে হবে। আমার চেনাজানা অনেকেই যে পালিয়ে গেছেন তা ব’লতে দ্বিধা নেই। আবার অনেককে দেখেছি উন্নত কোনো নগরের উন্নত কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন দক্ষতা শিখে এসেছেন। এখন চেষ্টা করছেন সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে সাহায্য করা যায় কিনা।

কিন্তু বুনিয়াদি একটা নগরকে আগামীর জন্য গ’ড়ে উঠতে সাহায্য করাটাও সহজ নয়। তাতে অনেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান/প্রথা/নায়কদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হয়। কিছু দিন আগে দেখলাম স্থপতি মোহম্মদ মাসুম ঢাকার শিশু-পার্কের পরিলেখ নিয়ে দারুন একটা প্রশ্ন করেছেন। শাহবাগের শিশু-পার্কটি যে জায়গাতে গ’ড়ে তোলা হ’য়েছে সেখানেই ছিলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মঞ্চ। যে স্থপতি শিশুপার্কের পরিলেখটি তৈরী করেছেন তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য-শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোধা ব্যক্তিদের একজন। অথচ তিনি তার করা সেই পরিলেখে ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চিহ্ন (সিম্বল) কে একদম এড়িয়ে গেছেন। এটা সচেতন ভাবে করা কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন। যদি সচেতন ভাবে করা হ’য়ে থাকে তবে তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন কিনা। আর যদি সচেতন ভাবে না করে থাকেন তবে শিক্ষক বা মেন্টর হিসেবে তার ভূমিকাকে যতটা সম্মান করা হয় ততটা সম্মান তার প্রাপ্য কিনা।

কখনো কখনো একজন মানুষও প্রতিষ্ঠান হ’য়ে উঠতে পারেন। শহরই তাদেরকে সেই সুযোগ ক’রে দেয়। কিন্তু তেমন প্রতিষ্ঠানকেও প্রশ্ন করতে হবে নির্দ্বিধায় যদি সামনের দিকে আগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে। সম্প্রতি অনেকগুলো পত্রিকাকে দেখলাম ঢাকা-ওয়াসার গত এক যুগ/দশকের কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরণের প্রতিবেদন ছাপাতে। ঢাকার নাগরিকেরা তথা সরকার এই সময়কালে এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে কম খরচ করেনি। অথচ সেই অনুপাতে শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থার উন্নতি খুবই হতাশার। অবশ্যই এখানে দায় আছে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মানুষগুলোর। কিন্তু সাথে এই প্রশ্নও তুলতে হবে কেন আমরা ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তুলতে পারছি না। কি কি কাজ করলে তেমনটা করা সম্ভব হবে।

এই কাজগুলোর একটা নিশ্চিত ক’রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। শুধু নালা বা ড্রেন তৈরী আর মাঝেমাঝে সেগুলোকে সংস্কার করে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আর করা যাবে না। তার একটা বড় কারণ ঢাকার পুকুর আর জলাধারগুলোর পরিমাণ অনেক কমে যাওয়া। পুরোনো খালগুলো দখল বা সংকীর্ণ হ’য়ে যাওয়া। তার উপর ঢাকাতে আচ্ছাদিত স্থানের পরিমাণ গিয়েছে বেড়ে। ফলে বৃষ্টির পানি শোষণ করার মতো উন্মুক্ত জমিও গিয়েছে কমে। এই কারণে নালার উপর বাড়ছে অতিরিক্ত পানির চাপ। আবার নালার আয়তন বাড়ানোর উপায়ও একরকম নেই বললেই চলে। একারণেই প্রযুক্তির প্রসঙ্গ চ’লে আসছে। যান্ত্রিক পাম্প ব্যবহার ক’রে দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্প বসানোও হয়েছে। তবে সেগুলোকে সর্বোক্ষণ কর্মক্ষম রাখার মতো দক্ষ লোকবল রাখা হ’য়েছে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয় যান্ত্রিক পাম্পের ধারণক্ষমতা, যতটা পানি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃষ্টির ফলে জমে ততটা পানি কাঙ্ক্ষিত সময়ের ভেতরে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাম্পগুলোর আছে কিনা। দুঃখজনক ভাবে সবক্ষেত্রে শুধু পাম্প বা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান করা যাবে না। কখনো কখনো রিটেনশন পুকুরের দরকার প’ড়তে পারে। যেটা নিশ্চিত করতে শহর নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা করাটা খুবই দরকারী। যেটা করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান।

নিশ্চিত ভাবেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংকট আছে বাংলাদেশে। কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রামের মতো দ্রুত-বর্ধনশীল দুইটা বড়সড় নগরী থাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ঠিকই আছে। এই দুইটা নগর যদি কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরীতে এগিয়ে আসতে পারে তবে তা উপকারী হ’তে পারে দেশের মাঝারি মানের অন্য শহরগুলোর জন্যও।

এবার আসি যাতায়াত ব্যবস্থাতে প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। এখনো পুরান-ঢাকাতে ঘোড়ায়-টানা গাড়ি চ’লতে দেখা যায়। এটাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার আছে বটে, তবে সে প্রযুক্তি এর ভেতরেই প্রাচীন হ’য়ে গেছে। নগরের চৌহদ্দিও বেড়েছে। তাই সাইকেল-রিকশা আর ঘোড়ায়-টানা গাড়ির মতো বাহন দিয়ে আর কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই বাহনগুলো যে গন-পরিবহন হিসেবে শহরের কিছুকিছু এলাকাতে এখনো দারুন ভাবে কার্যকর সেটা খেয়াল রাখা দরকার। এই বাহনগুলোকে যান্ত্রিক বাহন দিয়ে প্রতিস্থাপনের সময় এসেছে। শুধুমাত্র সময়ের প্রভাবেই এরা প্রতিস্থাপিত হ’য়ে যাবে এটা ভাবা বোকামি হবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনি দিকনির্দেশনা। প্রয়োজন সার্বিক পরিকল্পিত প্রস্তুতি।

১৯৩৬ কিমবা ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে প্রথম সাইকেল-রিকশা আনা হয়। এর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ আমরা তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনিনি। মাত্র কয়েক বছর হ’লো তাতে যান্ত্রিক মোটর যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেও চীন থেকে আনা কিছু ব্যাটারি-পাওয়ারড রিকশা রাস্তাতে চ’লতে শুরু করার পর থেকে। আইনে বৈদ্যুতিন বাহনের অনুমতি এখনো নেই বিধায় এই রিকশাগুলোকে এখনো অননুমদিতই থাকতে হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যাতায়াত ব্যবস্থা বৈদ্যুতিন হওয়ার দিকেই আগাচ্ছে। সাধারণত শুরুতেই কোনো বিষয়ের আইনি কাঠামোটা দাড় করিয়ে নিতে পারলে তার প্রযুক্তি আত্মিকরণে তা সহায়ক হয়।

ঢাকার জন্য যে একটা কার্যকর মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা দরকার সেটা এর নাগরিকেরা বহুদিন ধরেই টের পাচ্ছেন। দেরীতে হ’লেও কিছু কাজ শুরু হ’য়েছে। কিন্তু এর সমস্ত প্রযুক্তিই আমাদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সমস্ত ডিজাইন করিয়ে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। যেহেতু এমন প্রযুক্তি আমাদের নিজেদের আবিস্কার করা নয় সেহেতু শুরুতে আমদানি করা ছাড়া উপায়ও নেই খুব একটা। তবে দীর্ঘ-মেয়াদে চিন্তা করলে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসা সম্ভব ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতরেই। শুরু করা যেতে পারে কোচগুলোর নির্মাণ দিয়ে। ধীরে ধীরে অন্য ব্যাপারগুলোও। সেটা লাভজনক না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কারণ চাহিদা বাড়ছেই। আর এটা শুধু ঢাকাতেই আটকে থাকবে না। অন্য বড় শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। আর যেহেতু এটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় সেহেতু এটাকে কেন্দ্র ক’রে অনেক ধরণের প্রতিষ্ঠানই দাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও লাভবান হ’তে পারে এ থেকে।

টীকা:
১. রিটেনশন পুকুরের বাংলা হিসেবে ধারক-পুকুর লিখতে পারতাম হয়তো। রিটেনশন-পুকুর যেহেতু পানি শোষণ আর ধারণ একই সাথে করে তাই শুধু ধারক-পুকুরে সন্তুষ্ট হ’তে পারিনি। শোষণ আর ধারণকে যুক্ত ক’রে কোনো শব্দ বানাতে পারলে বোধ হয় ভালো হ’তো।
২. মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট : দ্রুত আর বহুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। জানি না কিভাবে ছোট ক’রে আনা যায়।
৩. ডিজাইন শব্দটাকে এখন আর নকশা-প্রণয়ন বলার পক্ষপাতি নই আমি। এটাকে চেয়ারের মতো গৃহীত বিদেশী শব্দ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
৪. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৪
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57828


নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা-৯

ইউএন হ্যাবিটেট বা জাতিসংঘ বসতি টেকসই প্রতিবেশ পরিকল্পনার (sustainable neighbourhood planning) উদ্দেশ্যে নতুন যে কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে সেখানে নিচের পাঁচটি নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ঘোষণা করছে-

১. রাস্তা আর রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা : রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ থাকা দরকার। সেই সাথে প্রতি বর্গকিলোমিটারের জন্য কমপক্ষে ১৮ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা থাকতে হবে।

২. অধিক জনঘনত্ব: প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ১৫,০০০ মানুষ। সেই হিসাবে প্রতি হেক্টরে ১৫০ জন বা প্রতি একরে ৬১ জন।

৩. জমির মিশ্র-ব্যবহার: যে কোনো প্রতিবেশে মেঝের (floor area) মোট পরিমাণের অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থকরী কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা উচিৎ।

৪. সামাজিক সংমিশ্রণ (মিক্সের বাংলা হিসেবে সংযোগও হ’তে পারে এক্ষেত্রে): প্রতিটা প্রতিবেশে বিভিন্ন দাম আর মেয়াদের বাসার সংস্থান থাকতে হবে যেন তা নানা আয়সীমার মানুষকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে পারে। আবাসনের জন্য থাকা মোট মেঝের অন্তত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ নিম্নআয়ের মনুষের আবাসনের জন্য (লো-কস্ট হাউজিং) রাখা উচিত। আর বিশেষ কোনো মেয়াদী-নমুনাই (টাইপ) পুরো প্রকল্পের অর্ধেক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

৫. জমির নির্দিষ্ট ব্যবহারের সীমা: একটা জায়গা বা প্রতিবেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য গ’ড়ে না তোলার জন্য; কোনো একটা উদ্দেশ্য (ফাংশন) সমাধার জন্য তৈরী করা ব্লক যেন কোনো প্রতিবেশের মোট জায়গার ১০ শতাংশের বেশি জায়গা নিয়ে না নেয়।

যেহেতু সারা পৃথিবী জুড়েই নগরীর চৌহদ্দি বাড়ছে, বলা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট মনুষ্য জনসংখ্যার অর্থেকই নগরে বাস করবে, সেই হেতু ভবিষ্যতের নগরীকে কিভাবে টেকসই হিসেবে গ’ড়ে তোলা যায় সেটা এই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জাতিসংঘ বসতি এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে তারা এই বিষয়ে অনেক ধরণের গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেছে। টেকসই প্রতিবেশ বা পাড়া নিয়ে তাদের কিছু আলোচনার সাথে ঢাকার বর্তমান আর ভবিষ্যতের বেড়ে ওঠার ধরণ/ধরণগুলোকে মিলিয়ে দেখার একটা চেষ্টা এই লেখাটা।

নেইবারহুড ব’লতে পাড়া, মহল্লা বা প্রতিবেশ যা-ই বলি না কেন নগরের চরিত্র তৈরীতে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটা সময় নারিন্দা আর গ্যান্ডারিয়া মহল্লাগুলোর চরিত্র বেশ আলাদা ক’রেই সনাক্ত করতে পারতেন এর অধিবাসীরা। এখনো হয়তো মিরপুর আর ধানমন্ডির বৈশিষ্ট্যগুলোও বেশ মোটাদাগেই সনাক্ত করা যায়। এই মোটাদাগের একটা বিষয় হ’লো এই জায়গাগুলোর রাস্তাগুলো। তুলনামূলকভাবে যেমন ধানমন্ডির রাস্তাকে প্রশস্ত বলা যায়, ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেখানকার রাস্তাগুলোতে ফুটপাথের উপস্থিতি আছে, কোনো কোনো জায়গাতে রাস্তার সাথেই বড় বড় গাছের সমাবেশ আছে। আর মিরপুরের আবাসিক প্লটগুলোর সংলগ্ন রাস্তার প্রশস্ততা ২০ ফুট থেকে ২৫ ফুটের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। ফলে সেসব রাস্তাতে ফুটপাথ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেইও। অথচ মিরপুরের রাস্তাতেই পায়ে হাঁটা মানুষের ভীড় থাকে বেশি।

আবাসিক এলাকার ধরণের সাথে তাই এর রাস্তার প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভরশীল। আবাসিক প্লটের আকার আর সেখানে বাস করা অধিকাংশ মানুষের আয়সীমার উপর নির্ভর করে কোনো এলাকার আবাসনের ধরণ। যাদের আয়ের সীমা উপরের দিকে তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকে। নিম্ন-আয়ের মানুষের প্রবণতা থাকে গন-পরিবহন (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) ব্যবহারের দিকে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন আয়-সীমার মানুষের বসতি নিয়ে গ’ড়ে তোলা পাড়াগুলোর রাস্তার ধরণে আর পরিমাণে ভিন্নতা থাকাবেই। জাতিসংঘ বসতি যে অন্তত ৩০ শতাংশ জমি রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য বরাদ্দ রাখতে বলছে তা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই। কিছু পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে বর্তমানে ঢাকা শহরের মোট জমির ৯ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আর ৬ শতাংশ জায়গা পাকা বা পেভমেন্টের (চিপা-গলিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত) জন্য আছে।(১) জাপানের টোকিওতে শহরের মোট জমির ১৬ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আছে। মোটামুটি ভাবে বলা হয় বেশ কিছু উন্নত শহরে রাস্তার পরিমাণ শহরের মোট জমির ২৫ শতাংশের কাছাকাছি।

অর্থাৎ জাতিসংঘ বসতি রাস্তার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে নিতে পরামর্শ দিচ্ছে। ঢাকার মতো একটা পুরোনো শহরে সেটা করা সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে দেখার মতো। তবে শহরের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে যে দিকগুলোতে সেখানে রাস্তার পরিমাণ বৃদ্ধির একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। উত্তরা থার্ড-ফেইজ বা পূর্বাচলে রাস্তার পরিমাণ ২৫ শতাংশের কাছাকাছি ব’লেই দাবি করা হয়। রাজউক ব’লছে পূর্বাচলের মোট জমির ২৫.৯ শতাংশ রাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।(২) এটা থেকে ধ’রে নেওয়া যায় এই এলাকাগুলো মোটামুটিভাবে উঠতি মধ্যবিত্ত্ব আর উচ্চবিত্ত্বের মানুষের আবাসন আর কাজের জায়গার প্রয়োজনকে মাথায় রেখেই করা হয়েছে।

শহরের জন-ঘনত্বের ব্যাপারে জাতিসংঘ বসতি যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫০০০ মানুষের থাকার কথা বলছে সেটাও হয়তো ঢাকাতে নিশ্চিত করা যাবে না। এখনই ঢাকাতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩০০০ এর উপরে মানুষ বাস করছে। দিন দিন সেই ঘনত্ব আরো বাড়ছে। আর বাড়ছে ব’লেই কমছে পড়ে থাকা জমির পরিমাণ। যেমন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বা আফতাব নগরের ফাঁকা প্লটগুলোতে প্রতিদিনই তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। আবার গুলশান বা ধানমন্ডির দোতলা আর ছয়তলা ভবনগুলোর বেশির ভাগ এরই ভেতরে ১৪ তলা হ’তে শুরু করেছে। যে গতিতে এই ভবনগুলোর সংখ্যা বাড়ছে তার সাথে আনুপাতিক হারে বাড়ছে ঢাকার জন-ঘনত্ব। ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান জন-ঘনত্ব নিকট ভবিষ্যতে ঠিক কতটা টেকসই কিংবা বাসযোগ্য হবে সেটা এই মুহূর্তে বলা শক্ত। তবে ঢাকার জন-ঘনত্বের সাপেক্ষে এর ভবনগুলোর গড়পড়তা উচ্চতা যে বেশ কম, পৃথিবীর অন্য বড় শহরগুলোর অনুপাতে, তা নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। এ থেকে বলা যায় ঢাকার মানুষের জনপ্রতি ব্যবহৃত জায়গা বা বর্গফুটের পরিমান খুবই কম। দ্বিতীয়ত ভবনগুলো যেহেতু উচ্চতায় বেশি নয় সেহেতু তারা বেশ গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। দুই কারণেই ঢাকার বাতাসের গুণগত মান কমছে। আবাসিক ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ঢুকতে পারছে না। সব মিলিয়ে ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলো, সে এর উচ্চবিত্ত্বের আবাসিক এলাকাগুলোও, বসবাসের পক্ষে যথেষ্ট স্বাস্থকর থাকছে না। রেম কুলহাস কিছুদিন আগে মানুষের এত ঘন-বসতিপূর্ণ শহর তৈরীর আগ্রহকে সমালোচনা করেছেন, এই করোনা-মহামারিকে বিবেচনাতে নিয়ে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে শহরে বসবাসের কথা ব’লে তাদেরকে একধরণের অস্বাস্থকর পরিবেশে টেনে আনা হচ্ছে ব’লে মনে করছেন তিনি।

আবার পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে নগরের সংখ্যা আর আয়তন বৃদ্ধি করা ছাড়া এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে ব’লেও মনে হয় না। মনে রাখা দরকার এখন মূলত বয়স্ক মানুষের সংখ্যাই বাড়তির দিকে। আর বয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজন বাড়তি চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার সংস্থান শহর ছাড়া করা সম্ভব নয়। ফলে শহর বা নগরের সংখ্যা বৃদ্ধিও একটি বাস্তবতা। এই অবস্থাতে শুধুমাত্র ঢাকাকে আয়তনে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়ে আগালে খুব কার্যকর ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। ২০/২৫ বছর পরও ঢাকাকে টেকসই একটা শহর হিসেবে দেখতে চাইলে প্রয়োজন এখনই বেশ কিছু মাঝারি আকারের শহরকে বড় শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া। আমরা সুযোগ পেলেই বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি। সেটা সম্ভবত সঠিক সমাধান নয় এই ক্ষেত্রে। ১৬ থেকে ২০ কোটির দিকে যেতে থাকা জনগোষ্ঠির নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজন বহু-কেন্দ্রীকরণ।  অর্থাৎ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ নগর বা কেন্দ্র তৈরী করা। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ঠিক কতগুলো বড় নগর তৈরী করা প্রয়োজন তা নিয়ে সমীক্ষা হওয়া উচিত। সচেতন ভাবে না হ’লেও সরকার হয়তো সেই দিকে যাচ্ছে ব’লে মনে হচ্ছে যদিও খানিকটা। যেমন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট আর খুলনাতে চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর উদ্যোগ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি নতুন এমবিবিএস করা ডাক্তাররা শুধুমাত্র উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ঢাকাতে থাকতে বাধ্য হন। কারণ ঢাকার বাইরে এ ধরণের কোনো সুযোগ দেশে নেই।

ঘূর্ণিঘড় সিডর আর আয়লার পর উপকূলীয় এলাকা থেকে অনেক মানুষকে কাজের খোঁজে ঢাকাতে চ’লে আসতে দেখেছি। ঢাকা এই মানুষগুলোর জন্য তখন কতটা প্রস্তুত ছিলো বলা কঠিন। কিন্তু আমাদের যদি আরো কিছু বড় শহর থাকতো তবে হয়তো দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে ঢাকার উপরে জন-ঘনত্ব বৃদ্ধির চাপটা একটু কম পড়তো। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথেও এর সম্পর্ক আছে।

এবার আসি জমির মিশ্র ব্যবহার প্রসঙ্গে। ঐতিহ্যগত ভাবেই আমাদের বাঙালিদের জীবনাচরণে মিশ্র-ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এবং তা বেশ বেশি ভাবেই আছে। গ্রামের চাষী-বাড়িতে, কুমার-বাড়িতে একটা উঠান আগে থাকতই। পানাম নগর কিংবা পুরোনো ঢাকার আগের বাড়িগুলোর অনেকগুলোই উঠানের উপকারিতা মেনে তৈরী হয়েছিলো। রূপলাল হাউজে এখনো কিছু উঠান দেখা যায়। এই উঠান মিশ্র-ব্যবহারের সংস্কৃতির উদাহরণ। আমাদের পুরোনো বাড়িগুলোতে, সে গ্রামের দোচালা বা চারচালা ঘরগুলোতেও, প্রশস্ত বারান্দা থাকতো। এই বারান্দাগুলোতে দিনের নানা সময়ে নানা ধরণের কাজ করা হ’তো। ফলে ভারী আর জড়োয়া ফার্নিচার সেখানে রাখা হ’তো না বললেই চলে। তাতে সহজেই প্রয়োজন অনুযায়ী পরিসরের চরিত্রকে পাল্টে নেওয়া যেতো। দুপুরে যেখানে ব’সে বাড়ির লোকজন পাটি পেতে খেয়ে নিতে পারে সেখানেই হয়তো বিকালে আড্ডা বসে। বা বর্ষার সময় কাঁথা পাতা আর সেলাই করার আয়োজন হয়। ফসলের মাড়াই আর প্রক্রিয়াকরণের নানা কাজ উঠানে করা হতো। ফলে আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে মিশ্র-ব্যবহারের পরিচয় আছেই। এখন এটাকে শহরের সাথে সম্পৃক্ত ক’রে নেওয়া যায় কিভাবে সেটা ভেবে দেখতে হবে।

আবাসন, নাগরিক সুবিধা (সার্ভিস) আর পেশাগত কাজের জায়গাগুলোকে কিভাবে বিন্যস্ত করা যায় সেটা নিয়ে নতুন ক’রে ভাবার সময় এসেছে। ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সময় কালে পৃথিবীব্যাপী শহরের বৃদ্ধি আর পরিকল্পনাতে যে ভাবনাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তাতে মিশ্র-ব্যবহারকে এড়ানোর প্রবণতা ছিলো প্রচণ্ডভাবে। তখনকার নতুন প্রযুক্তিগুলো একরকম বাধ্য করেছিলো সেটা করতে। ফলে অফিস পাড়া, কারখানা এলাকা, পার্ক, বাজার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আর আবাসনের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এতদিন। তাতে ব্যবহার অনুযায়ী গ’ড়ে ওঠা এক ধরণের জায়গা থেকে আর এক ধরণের জায়গাতে মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন বেড়েছে। তাতে বেড়েছে রাস্তা আর গাড়ির প্রয়োজনীয়তাও। ফলস্বরূপ অটো-মোবাইল কারখানার চাহিদা বেড়েছে। অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। সেই সাথে দূষণ আর যানজটের যন্ত্রণা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। শহর পরিকল্পনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা অনেকেই তাই এখন মনে করছেন অফিস পাড়া, কারখানা কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা এমনতরো স্পষ্ট ভাগ না ক’রে মিশ্র-উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। তাতে মানুষের সময় আর অর্থেরও সাশ্রয় করা সম্ভব।

পুরাতন ঢাকাতে এখনো অনেক ভবন আছে যার নিচতলাতে ব্যবসার জয়গা আর উপরে মানুষের আবাস। কোথাও কোথাও হয়তো কারখানাও আছে। তবে সেই কারখানাগুলো নিরাপত্তার প্রশ্নে কতটা যুক্তিসংগত সেটা বিশ্লেষণ করে দেখার সময় এসেছে। মিরপুর আর মোহম্মদপুরের অনেক আবাসিক ভবনের নিচের তলাতে এ্যাম্ব্রয়ডারির ম্যাশিন দেখা যায়। এটা কতটা ঝঁকিপূর্ণ জানি না, তবে মিশ্র-ব্যবহার হিসেবে বেশ কর্যকর ব’লে মনে হয়েছে। জমির মিশ্র-ব্যবহার ভবন কেন্দ্রিক হ’তে হবে এমনও নয়। একটা বড় জমি বা ব্লক কেন্দ্রিকও হ’তে পারে। একটা বড়সড় ব্লকের জন্য প্রয়োজনীয় হাসপাতাল সুবিধা, স্কুল, বাজার আর খানিকটা অফিস এরিয়া সমন্বিত ক’রে গ’ড়ে তোলা গেলে সামগ্রিক হিসাবে শহরের মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে হাউজিং বা আবাসন পরিকল্পনার তৃতীয় ফেইজে সুপার-ব্লক কেন্দ্রিক এই ধরণের মিশ্র-ব্যবহারের কিছু চেষ্টা নেওয়া হয়েছিলো, যেগুলো নাগরিক সুবিধার বিচারে খুব উপযোগী হয়েছিলো। ফলে জমির মিশ্র-ব্যবহার যে শহর পরিকল্পনাতে উপকার দিতে পারে সেটা এখন মোটামুটি জানা। কিন্তু প্রশ্ন হ’লো ঢাকা তথা বাংলাদেশে আমরা সেটা বিবেচনা করছি বা করেছি কিনা।

ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান বা উত্তরার পরিকল্পনাতে জমির মিশ্র ব্যবহারকে বিবেচনা করা হয়নি ব’ললেই চলে। কিন্তু সময়ের সাপেক্ষে প্রশস্ত রাস্তাগুলোর পাশে মিশ্র-ব্যবহারের চাহিদা তৈরী হয়েছে। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই তা গ’ড়ে নিয়েছে। রাজউক বা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে কখনো নিরব থেকেছে, কখনো অসুবিধার সৃষ্টি করেছে আবার কখনো প্লটের ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য বিধি তৈরী করেছে, আবার সেই বিধি ব্যবহার করে নানা ধরণের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকার প্রায় সমস্ত এলাকাতেই জমির মিশ্র-ব্যবহার গ’ড়ে উঠেছে। এমনকি ডিওএইচএসগুলোও এখন আবাসিক আর অফিস এলাকার মিশ্রণ।

প্রয়োজন এই মিশ্রণের প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী দিনের শহর পরিকল্পনা করা, সে যেমন ঢাকার বর্ধিত অংশে তেমনই দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোরও যে গুলোর নতুন কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেই সাথে বর্তমানের শহরে যে নিত্য-পরিবর্তন তাতে দিক-নির্দেশনা দেওয়া।

সামাজিক সংমিশ্রণ ছাড়া কোনো শহরই সাস্টেইনেবল বা টেকসই হতে পারে না। করাইল আর মহাখালির বস্তি ছাড়া গুলশানের আবাসিক এলাকা এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারবে না। এই বস্তিগুলো তুলে দিলে শুগশানের আবাসিক ভবনগুলোর পরিচালন ব্যায় অনেক বেড়ে যাবে। আবার কাছের বাড্ডা আর রামপুরার মতো মধ্যবিত্ত্বের এলাকাগুলো না থাকলে গুলশানের অফিস পাড়াতে পরিণত হওয়ার সুযোগও যেতো কমে। শহরের কোনো এলাকার চরিত্র গঠন আর পরিবর্তনে এরকম নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ভূমিকা এড়াবার নয়। আর যে শহর পরিবর্তিত হ’তে থাকে না তা এক সময় গুরুত্ব হারাতে থাকে।

শেষ যে কথাটা বলা হয়েছে সেটা হ’লো ব্যবহার মিশ্র করতে গিয়ে আবার যেত কোনো একটা বিশেষ ফাংশনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে না ফেলা হয়, যেমনটা ঢাকার গুলশানের ক্ষেত্রে হয়েছে। আবাসিক এলাকা হিসেবে গ’ড়ে তোলা গুলশান-বনানীকে এখন ঢাকার নতুন বিজনেস-ডিস্ট্রিক্ট বা বড়বাজার হিসেবেই মনে করেন অনেকে। একসময় মতিঝিলকে যা মনে করা হ’তো।

প্রতিবেশ বা পাড়া তৈরীতে তাই অন্য ব্যবহারগুলো যেন মূল ব্যবহারের ১০ শতাংশকে পেরিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে ব’লছে জাতিসংঘ বসতি।    

তথ্যসূত্র :
১) http://article.sciencepublishinggroup.com/html/10.11648.j.ijtet.20160201.11.html

২) http://www.rajukdhaka.gov.bd/rajuk/projectsHome?type=purbachal

নোট:
১. বাঁকা হরফের লেখা গুলো ইংরেজি থেকে অনুবাদকৃত।
২. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৩
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57799

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৫

বাংলাদেশে বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হার
বাংলাদেশের ঠিক কত শতাংশ মানুষের একটা বাসা বা এ্যাপর্টমেন্টের মালিকানা আছে তার কোনো হিসাব ইন্টারনেট ঘেটে পেলাম না। আমাদের ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ এর যে সাইটটি (http://www.nha.gov.bd/) আছে সেখানেও এই ধরণের কোনো পরিসংখ্যান ০৫ মে ২০২০ এও নেই।

পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে গৃহ-মালিকানার শতকরা-হার কেমন সেটার কিছু পরিসংখ্যান সহজেই পাওয়া গেলো। কোনো কোনো দেশের তালিকা একেবারে হাল নাগাদ করা নেই যদিও।

বিভিন্ন দেশের বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হারের তালিকা (১)

house ownership rate-05.05.20.xlsx

তালিকা থেকে জানতে পারছি গৃহ-মালিকানার দিক থেকে সবার উপরে থাকা দেশটার নাম রোমেইনিয়া বা রুমানিয়া। সিঙ্গাপুর আছে তালিকার তিন নম্বরে। তাদের মোট জন-সংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগের বাস-গৃহের উপর মালিকানা আছে। তালিকাতে কিছু বিষয় উল্লেখ করা নেই। যেমন মালিকানার ধরণ কেমন। সিঙ্গাপুরের ৯১ ভাগ মানুষের কি এ্যাপার্টমেন্ট কেনার মতো টাকা আছে? একটা দেশের তো অন্তত ২০ ভাগ মানুষ থাকেই যাদের বয়স ২০ বছরের কম। তারাও কিভাবে গৃহের মালিক ব’নে যাচ্ছে তালিকার উপরের দিকে থাকা দেশগুলোতে? এর উত্তর আসলে পরিসংখ্যান নেওয়ার ধরণে। কোনো ব্যক্তির নামে যাদি একটি এ্যাপার্টমেন্ট থাকে তবে তার পরিবারের অন্য যে সকল সদস্য তার উপর নির্ভরশীল তারাও আসলে সেই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক। অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তির মতো। স্বামী-স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে সকলকেই এই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার মালিকানাটি কত বছরের জন্য সেটাও বিবেচনার বিষয়। হয়তো জমির মালিক সরকারই থাকছে। তবে এ্যাপার্টমেন্টটির মালিকানা অনেক ক্ষেত্রেই ৯৯ বছরের জন্য।

তালিকাতে দক্ষিণ-এশিয়ার কোনো দেশের নাম নেই। এটার একটা কারণ হ’তে পারে এই ব্যাপারে এই দেশগুলোতে পরিসংখ্যানের অভাব। তবে উইকিপিডিয়া ব’লছে ভারতে গৃহ-মালিকানার হার ২০১১ সালে ছিলো ৮৬.৬ শতাংশ। তাদের তালিকাতে ভারতের অবস্থান ১০ নম্বরে। আর চীনের অবস্থান ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ৫ নম্বরে। উইকিপিডিয়ার তালিকাটিও দেখে নেওয়া যাক।

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

২০১৬ সালের (৩) একটা গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে সে বছর বাংলাদেশে ২,৮০,০০০ (দুই লক্ষ আশি হাজার) মানুষ গৃহহীন ছিলো। অর্থাৎ এই লোকগুলো পথে-ঘাটে বা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটিয়েছে। এই তথ্য থেকেও ধারণা করা যায় না দেশের ঠিক কত ভাগ মানুষের গৃহের উপর মালিকানা আছে বা ঠিক কত ভাগ মানুষ বাসা ভাড়া ক’রে থাকে। ভাড়া ক’রে থাকা বাসাগুলোর গুণগত মান কেমন বা সেখানে বসবাসের ধরণ (লিভিং স্ট্যান্ডার্ড) কেমন সেটাও জানা যায় না; জানা যায় না মাথাপিছু কত বর্গফুট জায়গা বাংলাদেশের নাগরিকেরা গড় হিসেবে থাকার জন্য ব্যবহার করছেন।

১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ‘হাউজিং পলিসি’ তৈরীর ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিউ-ডি-জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলনে ‘পরিবেশ এবং উন্নয়ন’ প্রসঙ্গে আরো একটা ঘোষণা আসে। তার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে একটি জাতীয় গৃহায়ন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল হাউজিং পলিসি) অনুমোদন করা হয়। ১৯৯৯ সালে তাতে কিছু সংশোধনী আনা হয়। আর ২০১৬ সালে এটাকে পুর্নমূল্যায়ন করা হয়। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মোস্তফা সুরাইয়া আক্তার এবং আশরাফি বিনতে আকরাম তালিকাবদ্ধ করেছেন নিচের মতো ক’রে : (৪)

Bangladesh national housing pollicy key points.xlsx

এখান থেকেও ধারণা করা যায় না যে বাসা বা বাসস্থানের মালিকানা নিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবনা কী রকম। যদিও আমাদের দেশের সংবিধানের ১৫ তম অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ তে ‘মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা’ প্রসঙ্গে বলা আছে যে – (৫)

১৫৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার৷

অর্থাৎ সাংবিধানিক ভাবে নাগরিকদের বাস-গৃহের মালিকানা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নেই। রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলার চেষ্টা করবে যেখানে নাগরিকদের জন্য আশ্রয় বা বাস-গৃহের সংস্থান হয়। সেই সংস্থান মালিকানা-নির্ভর হবে না ভাড়া-নির্ভর হবে সেই ধরণের প্রস্তাবণা আসলে সংবিধানের কাজও নয়। সেটা হাউজিং পলিসির কাজ। জাতীয় হাউজিং পলিসি এই ব্যাপারে খুব ভেবেছে ব’লে মনে হয় না। হয়তো তার পেছনে দেশের অর্থনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। কারণ সম্পদের মালিকানার উপরে খুব বেশি ট্যাক্স বা কর ধার্য করা যায় না, যতটা যায় দেনদেনের উপর। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের বাৎসরিক খাজনার পারিমাণ আর এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া থেকে আয়ের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্সের অনুপাত হিসাব করলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হবে।

উপরের দেশ-ভিত্তিক বাসগৃহের মালিকানার দুইটি তালিকা দেখে আমরা বুঝতে পারি যে বাস-গৃহের মালিকানার হারের সাথে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক তেমন একটা নেই। বাজার-অর্থনীতি কিংবা সমাজতান্ত্রিক-অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকদের জন্য বাসগৃহের মালিকানার ব্যবস্থা করা যায় যদি ‘হাউজিং পলিসি’ তে সেটা চাওয়া হয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা।

যদিও ঐতিহ্যগত ভাবে দেখা যায় বাংলাদেশে ভূমি-হীনের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার আনুপাতে বেশ বেশি। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের আগে জমির মালিকানা মূলত জমিদারের হাতেই ছিলো। রায়ত বা চাষীরা যেসব জমিতে থাকতো বা চাষ করতো তার মালিক তারা ছিলো না। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের পর থেকে জমিদারেরা চাইলেই যে কোনো রায়তকে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতো না, যেটা কিনা তার আগে পারতো। এবং হরহামেশাই তারা সেটা করতো। ফলে বিলেতিদের চাপিয়ে দেওয়া আইনি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে সবসময়ই গৃহহীনের সংখ্যা কম ছিলো না। আবার গৃহহীন এই মানুষগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখার একটা ব্যবস্থা বা সিস্টেম হয়তো দাড় করিয়ে ফেলেছে। যার কারণে এটা নিয়ে সমাজে বা রাষ্ট্রে বিশেষ আন্দোলনও নেই। আর আন্দোলন নেই ব’লেই আমাদের হাউজিং পলিসিতে এটা নিয়ে কোনো টু-শব্দটি নেই। যদিও বাস-গৃহের গুণগত মান বৃদ্ধির তাগিদ আছে। কিন্তু সেটা হয়তো শুধু শহুরে এলাকার জন্য। দেশের দক্ষিণের বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটা নিরাপদ আবাসন কিভাবে এবং কত বছরে গ’ড়ে তোলা যায় তার কোনো দিক-নির্দেশনা সেখানে নেই। আবাসনের নিরাপত্তার সাথে যে  গৃহ-মালিকানার সম্পর্ক আছে সেটাকে পুরোপুরিই অবহেলা ক’রে যাওয়া হয়েছে।

এই অবহেলার পরিণাম হয়তো টের পাওয়া যাবে বিশেষ কোনো সংকটের সময়ে। এই যেমন ২০২০ এর কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেকেই বাস-গৃহে আটকে আছে প্রায় দেড় মাস ধ’রে। আরো বেশ কিছু দিন যে আটকে থকতে হবে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। অনেকেই বাসা-ভাড়ার টাকাটা যোগাড় করতে পারছেন না। পৃথিবীর নানা দেশে বাড়ি-ভাড়ার টাকা মৌকুফের কথা জানতে পারছি। কোনো কোনো দেশ এই সময়ে বাসা-ভাড়া দেওয়ার জন্য বিনা-সুদে ঋণ দিচ্ছে তার নাগরিকদেরকে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষের যদি নিজের বাস-গৃহের উপর মালিকানা থাকতো তবে এই ধরণের বড় অর্থনৈতিক সংকট হয়তো এড়ানো যেতো।

লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক ক’রে বলেছিলেন, ‘if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation.’ জানামতে বাংলাদেশে কখনো আবাসনের চাহিদা নিয়ে অশান্তি বা আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তার পেছনে হয়তো আমাদের পুরোনো ইতিহাসের বেশ খানিকটা ভূমিকা আছে। বাস-গৃহের মালিকানা যে একটা চাহিদা হ’তে পারে সেটা কখনোই আমাদের জনসাধারণের মনে কিংবা মননে আসেনি, এমনকি কর্বুজিয়েরও মালিকানার কথা বলেননি, ব’লেছেন পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থার কথা শুধু। আমাদের অর্থনীতি এখনো এতটা পোক্ত জমিনের উপর দাড়াতে পারেনি যে তা আমাদেরকে একটা মান-সম্মত ও স্থায়ী (স্ট্যান্ডার্ড) গৃহের নিশ্চয়তা দিতে পারে; সে মালিকানা-ভিত্তিক বা ভাড়া-ভিত্তিক যেটাই হোক না কেন। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের নিবন্ধনের জন্য যে ট্যাক্সটা সরকারকে দিতে হয় সেটা থেকে পরিস্কার বোঝা যায় যে, আমাদের অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলো কয়েক দশক ধ’রেই মনে ক’রে এসেছেন যে বাস-গৃহের মালিকানা একটি লাগজারি বিষয়, এটি কোনো মৌলিক প্রয়োজন নয়।

কিন্তু ভবিষ্যতেও কি এমনই চলতে থাকবে? কাজী খালিদ আশরাফ, সাইফুল হক, মাসুদুল ইসলাম সাম্য, রুবাইয়া নাসরিন, ফারহাত আফজাল, হাসান এম রাকিব আর মারিয়া কিপ্তি মিলে এ ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা তুলে ধরেছেন ইংরেজি দৈনিক দ্যডেইলিস্টারে গত বছরের শুরুর দিকে । ‘দ্যা ফিউচার অব হাউজিং ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে।(৬) এখানেও বাসগৃহের মালিকানার বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সূত্র:
(১) – https://tradingeconomics.com/country-list/home-ownership-rate

(২) – https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_by_home_ownership_rate

(৩) – Molla, M. A.-M. (2016). PM: 280,000 homeless people in the country.Dhaka : Dhaka Tribune .Statistics and Informatics Division (SID). (2014). Census of Slum Areas and FloatingPopulation 2014. Dhaka: Bangladesh Bureau of Statistics( BBS)

(৪) 283-286

(৫) http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-957/section-29367.html

(৬)- https://www.thedailystar.net/supplements/28th-anniversary-supplements/avoiding-urban-nightmare-time-get-planning-right/news/the-future-housing-bangladesh-1704259
The future of housing in Bangladesh _ The Daily Star_KKA

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৬

অনেকের মতো আমিও নানা ধরণের সমাবেশ নিয়ে চিন্তিত এখন। চার/পাঁচ দিন পরপর একবারের জন্য হ’লেও আমাকে বাজারে যেতে হচ্ছে। সেখানে যতটা ভীড় দেখছি সেটা চিন্তা বাড়াচ্ছেই। বাসার কাছের সুপার মলে যাচ্ছি সেখানেও খুব একটা আলাদা কিছু দেখছি না। সেখানেও অনেক মানুষ।

আমাদের দেশটাই আসলে এমন। আমাদের সব জায়গাতেই মানুষের ভীড় বেশি। সেটা শুধু রাস্তাঘাট, হাসপাতাল কিমবা বাইরের কোনো জায়গাতে তা নয়। বাড়িতেও ভীড় কি কম? আমাদের কত শতাংশ বাসাতে প্রতিটা মানুষের জন্য একটা ক’রে ঘর আছে? ধারণা করি সেটা ২০ শতাংশের বেশি নয়। আমার ধারণা সঠিক তথ্যের কাছাকাছি নাও হ’তে পারে। কিন্তু অনেক বসাতেই যে ৫/৬ ফুট দূরত্ব মেনে মানুষ বাস করারই সুযোগ নেই সেটা বাস্তবতা। ২০১৩/১৪ এর দিকে সম্ভবত ডেইলিস্টারে একটা ফিচার দেখেছিলাম, যেটাতে বলা ছিলো যে একটা ১২০ বর্গফুটের মতো ঘরে ১৩ জন গার্মেন্টসকর্মী থাকেন।

পরিবারের একজন মানুষকে যদি মাঝে মাঝে বাইরে বের হ’তেই হয় (বাজার, ওষুধ কেনা এসব কাজে) তখন তার করোনা-ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। তার মাধ্যমে ছড়াতে পারে পরিবারের অন্যদের ভেতরে। কারণ সাধারণ হিসাবে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার সুযোগই আমাদের দেশের অনেকের নেই। এই অবস্থায় শুধু সাধারণ ছুটি আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ হয়তো পুরোপুরি কাজে দেবে না। আমাদের এটা নিয়ে আরো কিছু বিকল্প ভাবা দরকার।

জানতে পারলাম সুইডেন লকডাউন করেনি তার শহরগুলো। এমনকি রেস্তোরা, স্কুলও বন্ধ করেনি। কেউ কেউ বলছে বিলেতও শুরুতে এমনই আচরণ করেছিল। তার পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। সুইডেনের সামনেও সেটাই অপেক্ষা করছে। আবার হয়তো করছে না। কারণ সুইডেনের লোকজন রাস্তাতে থাকলেও সেখানে দূরত্ব মানছে। কাজের জন্য বের হচ্ছে। বিনোদনের জন্য নয়। আর সরকারী নির্দেশনা মানছে। ওদের সরকার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের বোঝাপড়া আছে। আমাদের এখানে সেটা যে ততটা নয় সেটাও বাস্তবতা। আবার চিকিৎসা ব্যবস্থা আর অর্থনীতিও একটা বড়সড় পার্থক্য গড়ে দেয়। লোক সংখ্যার ঘনত্ব তো বটেই। ওদের লোকসংখ্যার ঘনত্ব আমাদের থেকে অনেক অনেক কম।

আমার ভেতরে যে ইনট্যুশন কাজ করছে তা বলছে, দেশে যে ভাবে সাধারণ ছুটি চলছে তাতে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়তো যাবে না। আমি নিজেও তো এই দেশেরই লোক। এভাবে হয়তো কেউ ১০ দিন চলতে পারবে। কেউ হয়তো দুই মাস। কিন্তু ৪/৫ মাস চ’লতে পারবে ব’লে মনে হয় না। আমাদের আরো কিছু করা দরকার। জানি না তা কী? তবে আমরা যতটা করছি তা এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়… বিশেষ ক’রে বাংলাদেশে… বিশেষ ক’রে আমাদের বর্তমান বাস্তবতায়…

বিভাগবিহীন

যাপিত জীবন – ৩৫

একুশ শতকের বাংলাদেশে আমাদের যে জীবন-যাপন সেখানে অসন্তোষের কারণের উপস্থিতি কম নয়। যদিও তার প্রকাশ নেই বললেই চলে। এই ক’দিন আগে পর্যন্তও আমাদের সিনেমার সেরা নায়কের কোনো স্ক্যান্ডাল ছিলো না। আমরা ধ’রেই নিতাম তার জীবনটা বড্ড সাজানো গোছানো, আর তাই সেখানে কোনো অসন্তোষ নেই। কিন্তু যে জীবনে অসন্তোষ নেই সে জীবন কি শিল্পীর জীবন হ’তে পারে? কিমবা সন্তুষ্ট জীবন নিয়ে যার বাস তার পক্ষে কি শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব? আমার মনে হয় না। সেই ভাবনা আরো পাঁকা-পোক্ত হয় যখন বাংলাদেশের সিনেমা দেখতে বসি। পুনরাবৃত্তি আর জলো মেলো-ড্রামা। না আছে শিল্প, না আছে শিল্পী। স্বীকার করি আমাদের দর্শকদের তরফ থেকেও এদের থেকে তেমন কোনো চাহিদা নেই।

কিন্তু চাহিদার কথা বলছি কেন? সে কথা তো বলবে ব্যবসায়ীরা। হয়তো আমাদেরই ভুল। এখানে আজকের পরিস্থিতিতে সিনেমা আর কোনো শিল্প মাধ্যম নয়। এটা একটা বিনোদন কেন্দ্রিক ব্যবসা মাত্র। ব্যবসাতে বিনিয়োগ থাকে, মুনাফার হিসাব থাকে। শিল্প নিয়ে ব্যবসা করা গেলেও মুনাফাই তার সব নয়। কারণ শিল্প সৃষ্টির তাগিদটা শুধু মুনাফার ভাবনা থেকে এলে হয় না। সেখানে জীবনের কিংবা কোনো আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন খানিকটা হ’লেও থাকতে হয়। অবশ্য সব ধরণের জীবন কিনা তা বলা শক্ত। শুধু ভোগীর জীবন নিয়ে কি শিল্প হয়? অথবা এমন জীবন যেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু নেই? শিল্প নিজেই কি জীবনের পক্ষে খানিকটা হ’লেও অতিরিক্ত কিছু নয়?

কেমন ক’রে মানুষ তার জীবনের অস্তুষ্টির প্রকাশ ঘটায়? এর কতটা স্বতস্ফূর্ত আর কতটাই বা পরিকল্পিত? প্রকাশটা দরকারী কিনা? সমাজের জন্য, জীবনের জন্য, শিল্পের জন্য তথা আনন্দের জন্য? কিন্তু জীবনে তো আনন্দ নেই ব’ললেই চলে। আছে শুধু সময় কাটানোর বাহানা। তার জন্য কত না আয়োজন! কত না প্রচেষ্টা! তাতে সময় কাটছে বটে; কিন্তু যখন ভাবতে বসি কেমন গেলো সময়টা তখন সময়ের হিসাবের বেশি কিছু মাথায় আসে না। সময়টা পার করাটাই কি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য তবে?! আর পাশের মানুষটার থেকে লুকিয়ে রাখা জীবনের স্বপ্নহীনতাকে?

বিভাগবিহীন

প্রবচন – ২৬

১.
যে সমাজের আইন নিজেই অপরাধী বা ক্রিমিনাল সেখানে হয় সবাই অপরাধী নয়তো সবাই নির্দোষ। অপরাধী আইন হ’লো সেই আইন যে আইন সাধারণ মানুষকে অপরাধ-কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হ’তে বাধ্য করে। সেই আইন যে বিচার নিশ্চিত করে তো না-ই উপরন্তু বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। যার সুবিধাভোগী মূলত তারা যারা একে বিক্রি ক’রে জীবিকা উপার্জন করে।

২.
এক খ্রিস্টান-হুজুর একবার ব’লেছিলো, যে আইনে সাম্যতার বিধান নেই তা কোনো আইনই নয়। লোকটা হয় প্রচণ্ড ধড়িবাজ, নয়তো আইন আর সাম্যতা বিষয়ে কোনো ধরণের বাস্তব জ্ঞানই রাখে না।
আইন সবসময়ই সময়, সমাজ আর পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল একটি বিষয়। আর সে করণেই আইন একেক সময় একেক জনের স্বার্থ রক্ষা ক’রে চলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আর ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষা ক’রেই তাকে টিকে থাকতে হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনের এই টিকে থাকার ব্যাপারটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এর সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাই পালন করে। কারণ এরাই এর সার্বোক্ষণিক সুবিধাভোগী। আর ক্ষমতাবানেরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী একে ব্যবহার ক’রে নেয়।
আর লোকটা ধড়িবাজ এই অর্থে যে, সে প্রচার করতে চায় সমাজের প্রচলিত আইনে সাম্যতা নিশ্চিত হয়নি; এটা শুধুমাত্র নিশ্চিত করা যায় স্রষ্টার তৈরী করা আইন দিয়ে। খ্রিস্টান-হুজুরটির আগ্রহ শুধু মাত্র নিজে যে ব্যবস্থাটির সুবিধাভোগী তাকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। সেই উদ্দেশ্যেই চটকদার সরল বক্তব্য পেশ করা।

৩.
সঙ্গ-সুখের কোনো পরিণতি নেই। আছে শুধু সময়-ক্ষেপন।