জুন 20, 2017

স্থাপত্য পেশা : ২০১৭ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বাংলাদেশের চাষীরা একবার  উৎপাদিত ফসলের হিস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। তার নাম দেয়া হয়েছিল তেভাগা আন্দোলন। বর্গা-চাষীর উৎপাদনের তিন ভাগের একভাগ ভূমি-মালিকদের দেয়ার সে আন্দোলন কখনই সফল হয়নি এই দেশে। ভুমি-মালিকেরা নানা ছল-চাতুরী ক’রে উৎপাদনের অর্ধেকই নিয়ে নেয় আজো। আমি চাষী নই, ভূমি-মালিকও নই। তাই কোনটা যে নৈতিক বিচারে ঠিক হবে, তা নিশ্চিত ক’রে বলা আমার পক্ষে শক্ত।

তবে স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে আমার খানিকটা অভিজ্ঞতা আছে। নিয়ম আনুযায়ী বিল্ডিং কনসালটেন্সির শতকরা ১০ ভাগ রাজস্ব হিসাবে সরকারকে দিয়ে দেয়ার কথা। পেশাজীবী সংগঠনের একটা বাৎসরিক চাঁদা আছে। আবার রাজউক, সিডিএ আর কয়েকটা পৌরসভাতে রেজিস্ট্রেশনের জন্যও চাঁদা দিতে হয়। সে কোন ড্রয়িং জমা দিতে না পারলেও। কারণ রেজিস্ট্রেশন না থাকলে ড্রয়িং জমা দেয়া যায় না। আবার একবার রেজিস্ট্রেশন করলে প্রতিবছরই তার জন্য ফি জমা দিতে হয়। আগের মূসক বাড়িয়ে এখন ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। সেই মূসক দেয়ার কথা ক্লাইন্ট বা বিল্ডিঙের মালিকের। কিন্তু সেই মূসক স্থাপত্য-পরামর্শকের অফিস থেকে দিতে গেলে ভ্যাট চালান করতে হয়। যেটা করতে কিনা ১২০০০/- টাকার মতো খরচ হয় এই ২০১৭ সালে। ভোক্তার মূসক সরকারের কোষাগারে যাওয়ার মাঝে পরামর্শক অপিসের কাছ থেকে প্রতিবছর কেন এই বাড়তি টাকাটা যাবে আমি বুঝি না। এর সাথে আছে অফিসের ট্রেড-লাইসেন্সের ফি। বছর দুয়েক আগে কোন নোটিস না দিয়েই সরকার বা অর্থমন্ত্রী (কোনটা যে সঠিক জানি না) সেটা বাৎসরিক ২৫০০/- টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৫০০/- টাকা করেছেন। যদিও এই টাকা নিজে জমা দিতে গেলে অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হয়। সময়ও নষ্ট হয়। তাতে কাজ করা কিমবা কাজ জোগাড় করা- দুইয়ের জন্যই সময় কমে যায়। শেষে অফিসের আয়টা যায় কমে। তাই এইসব রেজিস্ট্রেশনের ভারটা একজন দালালের (আর্থিক পরামর্শক বললে তারা খুশি হন) উপর ছেড়ে দিতে হয়। তাতে আরো কিছু বাড়তি খরচ হয়। রাজউক টাইপের প্রতিষ্ঠাণগুলোর আরার অনেক উপ-প্রতিষ্ঠাণ আছে। যেমন এমআইএস। কখনো কখনো তাদেরকেও ঘুষ দিতে হয়। তালিকাভূক্ত থাকার জন্য। যদিও এমন তালিকাভূক্তির কোন নিয়ম নেই। তারা এটা চালু করেছে নিজেদের সুবিধার জন্য। আর বেড়েছে স্থপতিদের নাজেহাল করার সুযোগ।

এরপর আছে আয়কর। স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে স্থপতি ইন্সটিটিউটে বিধি মতে নিবন্ধিত হলেই আয়করের রিটার্ন জমা দেয়ার বিধান করা আছে বাংলাদেশের আয়কর আইনে। এবং সর্বনিম্ন আয়কর দেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু মোটামুটি হিসাবে মাসে ৩২০০০/- টাকার মতো আয় হলে সর্বনিম্ন আয়কর বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাংলাদেশের কোন স্থাপত্য পরামর্শক অফিসই আজ অব্দি এই পরিমাণ টাকা প্রারম্ভিক বেতন হিসেবে দেয় না। বছর দুই-তিন কাজ করার পর ভাল কাজ করতে পারে এমন কেউ কেউ এই পরিমাণ টাকা বেতন হিসেবে পেতে পারেন। সে আয়করের আবার অনুপাত আছে অনেক ধরণের। একটা সীমার পর বাড়তি টাকার উপর কখনো ১০%, কখনো ১৫% আবার কখনো আরো বেশি। আমাদের অর্থমন্ত্রী এই নিয়মে কোন পরিবর্তন করতে চান না। তিনি মনে করেন বাংলাদেশে স্থপতিদের আয় অনেক ভাল। তারপরও তারা নাকি আয়কর দিতে চান না।

এরপর আছে বিভিন্ন ধরণের ব্যাংক মাসুল। বেতনের বা কনসালটেন্সি থেকে আয় হওয়া টাকাটা ব্যাংকেই যায় সাধারণত। ব্যাংক এ্যাকাউন্টের সার্ভিস চার্জ আছে। এটিএম চার্জ আছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং চার্জ আছে। আরো আছে সরকারের আবগারি শুল্ক। আমার এক ব্যাংকার বন্ধু সেদিন বললেন, ব্যাংক এ্যাকাউন্টে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকলেই আবগারি শুল্ক কেটে নেয়া হয়, সে বছরের যে কোন সময়ে একবার থাকলেও। তাকে আমার কাজের ধরণটা বললাম। বললাম, আমি হয়তো একটা কাজের জন্য ক্লাইন্টের কাছ থেকে একবারে ৫ লাখ টাকা নিলাম। সেই টাকা আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, প্লাম্বিং ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আর ড্রাফটসম্যানদের দিলাম এ্যাকাউন্টস পে চেকের মাধ্যমে অথবা সরাসরি ওনাদের এ্যাকাউন্টে। আমার ব্যাংকার বন্ধু বললেন. সবগুলো এ্যাকাউন্ট থেকেই আবাগারি শুল্ক কাটা হবে। আমার এ্যাকাউন্ট থেকে ৫ লাখ টাকার উপর, আর বাকিদের এ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ দেয়া হয় তার উপর। কখনো বিপদে পড়ে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি হয়তো। টাকাটা ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন হয়েছে। সে টাকার উপরও কাটা হয়েছে আবগারি শুল্ক। আহা ব্যাংকিং ব্যবস্থা !! একই টাকার উপর যে কতবার কর বা সার্ভিস চার্জ কেটে নেয়া হচ্ছে কে জানে। অথচ সুদের হার কমছে দিনকে দিন।

এরপর আছে যে কোন পণ্য কিনতে গেলে তার জন্য নির্ধারিত কর, মূসক (ভ্যাট) ইত্যাদি। এখন যেটাকে ঢালাও ভাবে ১৫% করার চেষ্টা করছেন অর্থমন্ত্রী। গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিলও এর আওতার ভেতর। কিন্তু সব পণ্যের উপর যে সমান ট্যাক্স-ভ্যাট তা কিন্তু না। একটা মোটর সাইকেল বা গাড়ি কিনতে যান, ট্যাক্স-ভ্যাট কোন ক্ষেত্রেই ১০০% এর নিচে নয়। ইলেকট্রনিক পণ্যের ভ্যাট যে কখন কত কে বলবে? অথচ খুব কম ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় ওয়ারেন্টির সুবিধা। ইলেকট্রিক পণ্যে কেন ওয়ারেন্টি সুবিধা বাধ্যতামূলক নয় তা একদমই বুঝিনা। বিশেষত এখানে স্বার্থটা কার সেটা।

সহজ বিবেচনায় যেটা বুঝি তা হলো, আমার মতো কম আয়ের পেশাজীবীদের আয়ের অর্ধেকের বেশিই বিভিন্ন ধরণের ট্যাক্সের নাম করে সরকার নিয়ে নেয়ার বিধান করে রেখেছে। আয়ের ঠিক কতটা ট্যাক্স হিসেবে সরকারের পক্ষে নিয়ে নেয়াটা নৈতিক সেটা ভাবি। যদিও সে ভাবনা আসলে কোন ফলদায়ক ভাবনা নয়। শেষ পর্যন্ত মাথায় যেটা আসে তা হলো, ট্যাক্স ফাঁকি দিতে হবে। বেঁচে থাকতে হ’লে, টিকে থাকতে হ’লে। অর্থমন্ত্রী শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বা সেসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের স্বার্থই দেখেন। আমার মতো লোকজনের করের টাকা দিয়ে খেলাপি ঋণের টাকার হিসাব ব্যালান্স করেন। একজন সাবেক আমলা এমনটা করতেই পারেন। তার উপর যদি হন অর্থ বিষয়ে অভিজ্ঞ আমলা।

কিন্তু শ্রমিকের উৎপাদনের ঠিক কত ভাগ শেষ পর্যন্ত শ্রমিক পাবে সে আলোচনা কেউ করে না। দেশের সব রাজনীতিক যেন মরে গেছে। অথবা একজন অভিজ্ঞ আমলার হিসাবের মার-প্যাচে জড়িয়ে গেছে।

আমরা এমন এক পেশাজীবী যারা জড়িয়ে গেছি আরো বেশি। দেশে বিল্ডিং করার জন্য সার্বিক কোন আইন নেই। ঢাকা আর চট্টগ্রাম সিটি-কর্পোরেশনের জন্য একটা বিধিমালা আছে। মানা হয় যার কমই। আমাদেরকে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  আর বিল্ডিঙের মালিকেরা এমন একটা লুপ-হোল বা ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে (প্রায় ৯৮%) আমাদেরকে দুইটা ডিজাইন করতে হয়। একটা রাজউক বা সিডিএ তে জমা দেয়ার জন্য আর একটা তৈরীর জন্য। খুলনা আর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে বিল্ডিং বানানোর বিধি একেক সময় একেকরকম। সেটা নির্ভর করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপর। সারা দেশের আর কোন জায়গায় বিল্ডিং বানানোর জন্য আইনত কোন বিধি নেই। পৌরসভাগুলো মেয়রের খেয়াল খুশি মতো বিল্ডিং বানানোর অনুমতি দেয়, যা দেয়ার আইনত কোন ভিত্তি এখনো বাংলাদেশে নেই। পৌরসভার মেয়র বিল্ডিং বুঝবেন এমনটা আশা করাই তো ভুল। সেটা থেকেই তো সন্দেহ হওয়ার কথা, কোথাও ঘাপলা আছে। আদলত কত কত রুল জারি করেন। পৌরসভার মেয়রের বিল্ডিং বানানোর অনুমোদন দেয়াটা যে কেন বেআইনি নয় তা জানতে কথনো রুল জারি করতে দেখলাম না আমরা।

তার উপর উন্নয়ন কর্পোরেশনের বিধি একরকম, ফায়ার সার্ভিসের বিধি একরকম, সিটি কর্পোরেশনের বিধি একরকম, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিধি একরকম, ট্রাফিক বিধি একরকম। আবার বিধিগুলো মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব যাদের তারা টাকা খেয়ে বছরের পর বছর না দেখার ভান করে চলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় এই সেক্টরে সমন্বয়ের অভাব কতটা। অথচ সমন্বয়টা খুব দরাকারি হয়ে পড়েছে এখন। সেটা স্থপতি আর ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থে নয়। টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনেই। অনেক সময়ই মানুষ ১০ তলা বিল্ডিঙের নকশা করে নিয়ে যায়। কিন্তু একবারে পুরোটা বানাতে পারে না। হয়তো বানায় ৪ তলা। বাকি ৬ তলা হয়তো বানাবে ১০ বছর পর। এতে বিল্ডিঙের উপরের ৬ তলার লাইফ-স্প্যান যে ১০ বছর কমে গেলো সেটা কেউ বিবেচনা করতে চায় না। ব্যাংকিং সেক্টর এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টেরের উপর যে মানুষের আস্থা কমে গিয়েছে সেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয় না। অথবা এই যে বিল্ডিঙের লাইফ-স্প্যান বিভিন্ন ভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে আর্থিক কারণ দেখিয়ে তাতেই আর্থিক প্রতিষ্ঠাণের লাভ বেশি।

ফলত সবচেয়ে নাজুক পেশাজীবীদের একটা তালিকা করলে বাংলাদেশে স্থপতিরা উপরের দিকেই থাকবেন। অথচ একটা ভাল ভৌত পরিকল্পনা না থাকলে একটা দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বেশিদূর আগাতে পারে না। কিছু অতিরিক্ত চালু অর্থমন্ত্রী/অর্থ-ব্যবস্থাপক নানা গোজামিল দিয়ে হয়তো কিছু হিসাব দেখাতে পারেন। সে হিসাব শুধুই পরিসংখ্যান। পণ্ডিত লোকেরা ঠিকই বলেন, মিথ্যা তিন রকম। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা আর পরিসংখ্যান। 

তেভাগা অন্দোলন পরিণতি পায়নি, যোগ্য রাজনৈতিক কর্মীর অভাবে। বাংলাদেশের স্থপতিদের তো কোন আন্দোলনই নেই। তারা অনেক আগেই হেরে গেছেন। কেউ কেউ নিজের মতো করে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন হয়তো। কিন্তু তার সার্বিক ফল দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি এখনো। কয়েক বছর পরপরই উপকূলীয় এলাকাতে সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাসে অনেক জান-মালের ক্ষতি হয়। আমাদের এ অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। তারপরও এই এলাকাতে টেকসই বিল্ডিং বা অবকাঠামো বানানোর ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেই। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার বা নগর পরিকল্পনাকারীদের সম্পৃক্ত করে অবকাঠামো তৈরী বা উন্নয়নের কোন সার্বিক চেষ্টা নেই। তার প্রতিফলন হলো, বিল্ডিং বানানো নিয়ে একটা সার্বিক আইনের অনুপস্থিতি।

মে 30, 2017

নগরী ঢাকা – ৪

দুইটা বিষয় নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে গত কয়েক দিন ধরে। বিমান-বন্দর সড়কে ৩ কোটি টাকা খরচ করে বনসাই রোপণ আর সর্বোচ্চ আদালতের সামনে থেকে কোন এক মূর্তি বা ভাস্কর্য সরানো। ব্যাপার দুইটাকে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়। সেটা হলো, নগর কোন না কোন ভাবে তার নাগরিকদের ইচ্ছা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর সামর্থ্যের প্রকাশ করেই।

১.
প্রশ্ন আসতে পারে বনসাই কিভাবে ঢাকা নগরীর মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে পারে। হয়তো সহজ চিন্তায় সেটা ধরা যাবে না, কিন্তু প্রতিফলক যে হয়ে উঠতে চাচ্ছে তা তো আর অস্বীকার করার সুযোগ থাকছে না। বিমান-বন্দরগামী সড়ক দেখে অনেকেই বলছেন, এটা যেন মরুভূমি হয়ে উঠেছে। আগের ২০-২৫ বছরের পুরোনো গাছ এক বারে কেটে ফেললে এমনটা লাগতেই পারে। তার উপর যদি কিম্ভুত-দর্শন গাছ দিয়ে কথিত সোভা-বর্ধনের চেষ্টা করা হয়, তো সেটা মরুভূমির মতো লাগুক বা না লাগুক নিজেদের পরিচিত কিছুর মতো যে লাগছে না তা বলা যায়।

তার উপর মরুভূমির উপর আমাদের ভালোবাসাও বোধহয় বাড়ছে। সে মধ্য-প্রাচ্যে আমাদের নানা কারণে যাতায়াত বাড়ার জন্য কিনা, জানি না। তবে আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যে আমাদের শহরটাকে/শহরগুলোকে খানিকটা মলিন আর ধূসর করে দিচ্ছে তা নিশ্চিত। আর নিজের কর্মকাণ্ডকে কে না ভালোবাসে? গাছগুলো কাটার পর কেউ কেউ মিনমিন ক’রে জানতে চেয়েছিল, কেন কাটা হচ্ছে গাছগুলো। বলা হলো, ফুটপাথ চওড়া করা হবে। সেদিন কেউ আমরা জোর গলায় জানতে চাইলাম না, তার জন্য গাছগুলো কাটা জরুরী কেন। কারণ জোরটা আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। নিজেদের বাসাগুলো/বিল্ডিংগুলো বানাতে গিয়ে আমরা ঘুষটুষ দিয়ে যা-ও বা একটা নকশা পাস করিয়ে আনি রাজউক থেকে, শেষ পর্যন্ত সেটা মেনে বানাই খুব কম জনই। নিয়ম অনুযায়ী ঠিক যতটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে বিল্ডিং বানানোর কথা, তা আমরা আর মানি না। ফলে আমাদের বিল্ডিংগুলো আয়তনে বড় হচ্ছে বটে, কিন্তু আমাদের এলাকা থেকে উঠে যাচ্ছে গাছ – মাটিতে পানির স্তর যাচ্ছে নেমে। আমাদের শহরের মরুকরণের শুরু প্রায় আমাদের প্রতিটা বাড়ি থেকেই।

হ্যা, আমাদের টাকা বাড়ছে। অর্থনীতির পরিসংখ্যান তাই বলে। কিন্তু আমাদের বিল্ডিংগুলো সেই সাথে এ-ও বলে যে টাকাগুলোর একটা বড় অংশ চুরি করা বা কাউকে না কাউকে ফাঁকি দেয়া। আর তাই অন্যের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক অবিশ্বাস। নিজে চোর বলে অন্যকেও চোর ভাবছি। নিজের চুরি করা বা কর ফাঁকি দেয়া টাকা/সম্পদকে অন্যের অগোচরে নিয়ে যেতে আমাদের তাই চেষ্টার অন্ত নেই। আমাদের বিল্ডিঙে তাই উঁচু উঁচু নিরেট প্রাচীর। বিমান-বন্দরগামী সড়কেও তাই। ‘বিউটিফিকেশন’ এর নামে সেই সব দেয়ালে হয়তো লাগানো হবে ভিনদেশী টালি। কি জানি, মহাখালির রাস্তায় যেমন ক’রে টয়লেটের টালি লাগানো হয়েছে তেমন কিছু লাগানো হবে কিনা? আমাদের টাকা বাড়লেও, সে টাকার পরিমাণ যে খুব বেশি না তা এই টয়লেটের টালিগুলোই বলে দেয়। নতুন ধনী হতে থাকা মানুষের রুচি তৈরী হতে সময় লাগেই।

তারপরও, বনসাই যে কখনো একটা রাস্তার দুই ধারে খোলা আকাশের নিচে লাগানো যেতে পারে সেই চিন্তাটা যিনি বা যারা করেছেন তাদের একটু তারিফ না করলেই নয়। কারণ বনসাই প্রচলিতভাবে অন্তঃ-পরিসরেই লাগানো হয়। এর পরিচর্যাও বেশ কঠিন এবং ব্যয়-সাপেক্ষ। ফলে এই চিন্তাটা যারা করেছেন, হয় তারা অনেক বেশি জানেন অথবা তাদের জানা-শোনাতে বড় ধরণের ঘাপলা আছে। নতুবা এই লোকগুলো অতিরিক্ত ধড়িবাজ, যারা জানে এই প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে প্রচুর টাকা এদিক ওদিক করা যাবে। দুঃখজনক ভাবে এই লোকগুলোও এই নগরীর অংশ। এদের কাজের বিরুদ্ধে যে কেউ কথা বলবে, তেমন লোক আমাদের নগরে আজ আর নেই বললেই চলে। হঠাৎ কেউ বলে বসলেও তাদের বলাটা এতটাই মৃদু হয়ে যে, সে বলাটা একরকম না-বলারই নামান্তর হয়ে দাড়ায়। কয়েক দিন আগে দেখলাম কাজী খালিদ আশরাফ লিখেছেন এটা নিয়ে। কেউ গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না।

 

২.
আদালতের সামনের কথিত ভাস্কর্য নিয়ে বেশি কিছু বলাটা সাহসের পরিচায়ক। কিন্তু আজকের আমাদেরকে আর যা-ই হোক ঠিক সাহসী ভাবতেই ভয় পাই আমি। বলা হয়েছিল, এটা নাকি কোন এক গ্রীক দেবীর মূর্তি। আমরা কেউই সাহস ক’রে বলিনি যে আমরা গ্রীক জাতি নই। তার উপর দেব-দেবীরা সময়ের সাথে সাথে গুরুত্বে বাড়ে কমে। মানুষের সভ্যতা অনেক দিন ধরেই মানবমুখী হওয়ার চেষ্টায় আছে। সর্বোচ্চ আদালতের সামনে প্রাচীন দেবীর মূর্তি/ভাস্কর্য স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা এযুগের মানুষ কি ভাবে করতে পারেন জানি না। কিন্তু ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা যে করছেন- সেটা বাস্তবতা।

আমাদের ভাস্করও বেশ। দেবীর পোশাক বদলে দিয়েই কাজ শেষ করতে চান। আমাদের শিল্প-সমালোচকরা এ নিয়ে কিছু বলেছেন কি? দুঃখজনকভাবে তেমন কিছু আমার চোখে পড়েনি। অর্থাৎ কেউ কিছু বললেও তা গুরুত্ব পায় নি আমাদের কাছে সাধারণ বিচারে। অথচ অসুন্দরকে নির্দেশ করাটা জরুরী ছিলো। এটা স্থাপনের পরপরই প্রতিবাদ আসা উচিত ছিলো শিল্পী সমাজের কাছ থেকে। বলা দরকার ছিলো, এ জিনিস আমাদেরকে ‘রিপ্রেজেন্ট’ করার যোগ্য হয়নি। আদালতকে তো নয়ই। যে কোন ধরণের শিল্পগুণ বিচারেই এটি একটি কুৎসিত বর্জ্যের থেকে বেশি কিছু হয়নি। বিশেষ কোন বক্তব্য ধারণ করে এটা- এমন কথা এর নির্মাণকারীও বলতে পারেননি, ইনিয়ে-বিনিয়ে হলেও।

কিন্তু এই কাজটা আমাদের করা হয়নি। তেতুল হুজুরা একে অশালীন বলেছেন। সেটা ঠিক বলা কিনা, জানি না। উপরন্তু তাদের বলাটা এই শহরের বাইরে থেকে। অর্থাৎ শহরের নিয়ন্ত্রণ যে এই শহরের মানুষের হাতে পুরোটা আছে সে দাবীও আর করা যাচ্ছে না।

… এই দুটো ঘটনা তাই নাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতারই স্মারক। আমরা কেউ কেউ হাপিত্যেশ করতে পারি শুধু। কিন্তু এটাই যে আমাদের কার্যকর ‘ইমেজ’ তা অস্বীকার করতে পারি না। বরং অস্বীকার করলেই তা সময় পেরিয়ে হ’য়ে উঠবে আরো বেশি ক্ষতিকর, নগর এবং নাগরিক দুইয়ের জন্যই।

মে 1, 2017

প্রবচন -২৩

১.
যাত্রার পথ দীর্ঘ হলেই যে তা দুর্লঙ্ঘ হয়তা নয়।

২.
মানুষের পক্ষে আমিষ না খাওয়ার একটাই যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। সেটা দারিদ্র। পুরাকালে তার প্রকৃতি ছিলো সামর্থ্যে। অর্থাৎ আমিষ সংগ্রহে ব্যর্থতা। একালেও যে সেটা নেই তা নয়। তবে তার সাথে বাড়তি যোগ হয়েছে বুদ্ধি আর জানা-শোনার দারিদ্র।

৩.
বাঙালি বিধবাদেরকে যে এক সময় আমিষ খেতে দেয়া হ’তো নাতার একটা উদ্দেশ্য ছিলো তাদের মৃত্যুর সময়ক্ষণকে নিশ্চিতভাবেই আরো আগিয়ে আনা।

৪.
সম্পর্ক যখন আর পারস্পারিক থাকে নাতখন তা দায় হয়ে দাড়ায়। আর দায় সময়ের ব্যবধানে এক সময় পীড়াদায়ক হয়ে ওঠেই।

৫.
১৯৪৭ এর দেশভাগকে একধরণের গণ-হত্যা বলা যেতে পারে। মিথ্যা দুইটা জাতীয়তার ধারণা তৈরী ক’রে দুই তীরের মানুষদেরকেই হত্যা করা হয়েছে। যেমন শারীরিক ভাবেতেমন সাংস্কৃতিক ভাবেও। সাংস্কৃতিক হত্যার ব্যাপারটা এত সফল যে তা দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক হত্যার কারণ হয়েছে। এমনকি এতটা বছর পরেও তা ক্রিয়াশীল আছে। সীমান্তে আজকের হত্যাকাণ্ডগুলো সব বিচারেই ১৯৪৭ এর গণহত্যার প্রলম্বিত সংস্করণ।

এপ্রিল 21, 2017

প্রশ্ন – ১৪

অনেক সময়ই আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাও বিশেষ কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট হয় না। পুরাণ হয়তো এমন ঘটনাকেই নিয়তি বলে প্রবোধ দিতে চায়। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ বা সমাজ যখন নিয়তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে বসেতখন তার পক্ষে সর্বোচ্চটা দেয়া কি আর সম্ভবপর হয়?

ফেব্রুয়ারি 21, 2017

a whisper

It’s more like a whisper than talking. So I may not tell you everything. So you may not understand everything I whisper. Moreover, this is not a time favorable for talking. Even a little whisper can cause harm. 

Man itself has become the most lethal enemy of its kind. The ability to talk, that made them phenomenal, is not helping them anymore. As talking contains questioning and questioning is so forbidden right now that we can only talk falsely. In our situation, may be only a little whisper is what we have left for us. 

You know, in old days our ancestors used to travel along the whole world. But we don’t. We are so civilized. Without passport, visa, money, skill in foreign language/s and so on… we can’t travel along the world. we are the slave of a modern civil structure. The structure that says, slavery has been abolished for good. What an irony!

Once I heard about love. Did you ever? Now we only see contracts. May be we really have love for the contracts we could able to make. Otherwise love would have been a myth. ah!!! Do you love myths? I wish I don’t.

ফেব্রুয়ারি 21, 2017

প্রবচন – ২২

১.
পৃথিবীর সবচেয়ে কম দুর্নীতি পরায়ণ দেশগুলোর একটা নাকি সুইৎজারল্যান্ড। অথচ এরাই পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতি-গ্রস্ত মানুষগুলোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেদের ব্যাংকগুলো ভ’রে রেখেছে। আর সেই সব ব্যাংকের জোরে তাদের তরতাজা অর্থনীতি। চোরের উপর বাটপারির- এর থেকে বড় উদাহরণ পাওয়া দুষ্কর।

২.
একদা নির্বাণ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানব-জন্ম বেঁচে ছিলো দীর্ঘকাল। কিন্তু এই জগতে যে নিঃশেষিত হয় না কিছুই – তা জানতে পেরিয়ে গেছে আরো দীর্ঘতরকাল। রূপান্তরের ভাবনা নিয়ে যে বেঁচে থাকা তা আসলে এক ধরণের মরতে থাকামরে যাওয়া আর ধরণের জীবন পাওয়া। নির্বাণ বলে কিছু নেই।

৩.
দেহব্যবসায়ী খেতাবটা এযুগের বাংলাদেশের ডাক্তারদের সাথেই বেশি মানানসই।

৪.
বাংলাদেশের বড়বড় বিল্ডিংগুলোর বেশিরভাগই সরকারিআধা-সরকারিমিলিটারি কিমবা কিছু বিজনেস গ্রুপের। এই বিল্ডিংগুলোর ফলকগুলোতে নাম লেখা থাকে যারা বিল্ডিংগুলো উদ্বোধন করেন বা ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করেন তাদের। কখনোইবিল্ডিংগুলো ডিজাইন করেছেন যারা তাদের নাম উল্লেখ থাকে না সেখানে। কালেভদ্রে হয়তো ডিভেলপারের নাম উল্লেখ থাকে।

উন্নয়নের পেছনে যাদের মেধা আর শ্রম মূল নিয়ামক তাদেরকে আমরা এইভাবে প্রতিনিয়ত উপেক্ষা ক’রে চলেছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম ধারণাই পায় না কাদের হাতে এইসব স্থাপনাব্রিজ বা রাস্তা গুলো তৈরী হলো। তাদের ভেতর তাই যদি উৎসাহহীন আর মেধাহীনের ভীড়ই বেশি থাকেতাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ফেব্রুয়ারি 19, 2017

ত্বকের চোখ (যোহান পালাসমা এর ‘eyes of the skin’ এর অনুবাদ প্রচেষ্টা – ১)

দৃষ্টি ও জ্ঞান

ইউরোপের সংস্কৃতিতে ঐতিহাসিক ভাবেই দৃষ্টিশক্তিকে সেরা ইন্দ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি চিন্তা করা আর দেখার ভেতরে পার্থক্যও করা হয় না। অতীতের গ্রিকরা ভাবতো- শুধুমাত্র যা কিছু দেখা যায় তার-ই নিশ্চয়তা আছে। হেরাক্লিটাসের লেখাতে আছে ‘কানের চেয়ে চোখ ভাল সাক্ষী’। দৃষ্টিশক্তিকে প্লেটো মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহার মনে করতেন। আর নৈতিক কর্মকাণ্ডকে(ethical universals)‘মনের চোখ’ দিয়ে দেখার উপর জোর দিয়েছেন। এ্যারিসটোটলও একইরকম বোধিকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ধরতে পারে বলে দৃষ্টিশক্তিকেই ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

গ্রিকদের সময় থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা নিয়ে দর্শনশাস্ত্রে অসংখ্য লেখনী পাওয়া যায় যেখানে স্বচ্ছ-দৃষ্টিশক্তি জ্ঞানের পরিপূরক হয়ে উঠেছে আর আলো হয়ে উঠেছে সত্যের রূপক। ইতালীয় দার্শনিক এ্যাকুইনাস দেখার ধারণাকে এমনকি অন্যান্য ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধিবৃত্তীয় অনুধাবন-প্রক্রিয়ার উপরও প্রয়োগ করেছেন।

দৃষ্টির ধারণা দর্শন-শাস্ত্রকে কতটা প্রভাবিত করেছে তা পিটার স্লোটারজিক (Sloterdijk) গুছিয়ে লিখেছেন। ‘দর্শন-শাস্ত্রের সাধারণ একক হলো চোখ। চোখের একটা বিশেষ ক্ষমতা হলো- সে শুধু দেখেই না, তাদেরকে আর কেউ দেখছে কিনা সেটাও দেখে। শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর চেয়ে এই জায়গায় চোখ এগিয়ে যায়। তাই দর্শন-শাস্ত্রের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে চোখের প্রতিক্রিয়া আর ভাষা; কাউকে দেখতে দেখা।’ রেনেসান্স বা পুণর্জাগরণের সময় পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের ভেতর দেখাকে শুরুতে রেখে আর স্পর্শকে শেষে রেখে একটা আনুক্রম তৈরী করে অনুধাবন করা হতো। এই রেনেসান্সীয় পদ্ধতিতে ইন্দ্রিয়কে বিভিন্ন মহাজাগতিক উপাদানের সাথে মিলিয়ে নেয়া হতো: দেখার সাথে আগুন বা আলো, শোনার সাথে বাতাস, গন্ধের সাথে বাষ্প, স্বাদের সাথে পানি আর স্পর্শের সাথে মাটি।

পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনার আবিষ্কার চোখকে দৃশ্যমান পৃথিবীর কেন্দ্রে নিয়ে আসে, সেই সাথে ব্যক্তি-ধারণারও। পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনা নিজেই একটি রূপকে পরিণত হয়, যে রূপক বর্ণনা করার সাথে সাথে ধারণাকেও প্রভাবিত করে।

আমাদের প্রযুক্তি-নির্ভরশীলতার ফলে অনুভূতিগুলো যে আরো সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা হয়ে গিয়েছে- সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। দেখা আর শোনা এখনকার সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত সামাজিকতা-সহায়ক অনুভূতি। আর অন্য তিনটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাচীন অনুভূতির অবশিষ্টাংশ হিসেবে, যার অল্প কিছু ব্যক্তিগত উপযোগিতা আজও টিকে আছে। সাংস্কৃতিক চলও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদেরকে দমিয়ে রাখে। আমাদের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক আর প্রচণ্ড স্বাস্থ্য-সচেতন সাংস্কৃতিক রীতি অল্প কিছু অনুভূতি যেমন- কোন খাবারের ঘ্রাণ, ফুলের সৌরভ বা উষ্ঞতা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াগুলোকেই সামষ্টিক সচেতনতা সৃষ্টির অনুমোদন দেয়।

অন্য অনুভূতি গুলোর চেয়ে দৃষ্টিশক্তির প্রাধান্য এবং জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ার উপর এর ধারাবাহিক প্রভাব বেশ কিছু দার্শনিক প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘আধুনিকতা এবং দৃষ্টির কর্তৃত্ব’ শীরোনামের দার্শনিক নিবন্ধের সংকলনে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে- একটি দৃষ্টি-কেন্দ্রিক, দৃশ্য-জাত, জ্ঞানের দৃষ্টি-নির্ভর ব্যাখ্যা, সত্য আর বাস্তবতা – প্রাচীন গ্রিকদের থেকে শুরু ক’রে আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রাধান্য বিস্তার করছে। দৃষ্টি আর জ্ঞানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক, দৃষ্টি আর অধিবিদ্যা (Ontology), দৃষ্টি আর ক্ষমতা, দৃষ্টি আর নৈতিকতা নিয়ে এই চিন্তা-উদ্দীপক বইটাতে আলোচনা কারা হয়েছে।

জগতের সাথে আমাদের এই দৃশ্য-কেন্দ্রিক সম্পর্কের মডেল এবং আমাদের জ্ঞানের ধারণা, যা কিনা দার্শনিকেরা প্রকাশ করেছেন, তাকে দৃষ্টির প্রচলিত জ্ঞানতত্ত্বীয় ধারণা বলা যায়। স্থাপত্যের শিল্পগুণের বোধ এবং চর্চার সাথে অন্যান্য অনুভূতির সাপেক্ষে দৃষ্টির ভূমিকা আরো গভীরভাবে অবলোকন করাটাও জরুরী। অন্য সকল শিল্পের মতো স্থাপত্য মূলগতভাবেই পরিসর আর সময়ের অভ্যন্তরে মানুষের উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। স্থাপত্য পৃথিবীতে মানুষের অবস্থিতিকে প্রকাশ এবং তাকে সম্পর্কযুক্ত করে। ব্যক্তি এবং জগত সম্পর্কিত দর্শনশাস্ত্রীয় ভাবনাগুলো যেমন- অভ্যন্তরীনতা আর বাহ্যিকতা, সময় আর সময়কাল, জীবন আর মৃত্যু – এসবের সাথে স্থাপত্য দারুনভাবে সম্পৃক্ত। ডেভিড হার্ভে বলেছেন, ‘পরিসর এবং সময়ের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার প্রতি নান্দনিক আর সাংস্কৃতিক চর্চা অদ্ভুত রকম সংবেদনশীল, বিশেষত তা যেহেতু মানুষের অভিজ্ঞতাজাত পরিসরিক উপস্থাপনা আর শিল্পদ্রব্যের নির্মাণের হাত ধরে অনিবার্যভাবেই চলে আসে।’ আমাদেরকে সময় এবং পরিসরের সাথে সম্পর্কিত করা এবং এই ব্যাপারগুলোকে একটা লৌকিক পরিমাপ দেয়ার ক্ষেত্রে স্থাপত্য একটি মৌলিক উপকরণ। সীমাহীন পরিসর আর অবিরাম সময়কে ব্যবহার-উপযোগী করার মাধ্য দিয়ে স্থাপত্য মানবজাতির জন্য একে সহনীয়, বাসযোগ্য আর বোধগম্য ক’রে তোলে। সময় আর পরিসরের এই আন্ত-নির্ভরশীলতার ফলস্বরূপ – শিল্প আর স্থাপত্যের উপর বাইরের এবং ভেতরের পরিসরের সম্পর্ক-বোধ, বাস্তবিক এবং আত্মিক উপকরণ এবং ভাবনাগত ও অনুভূতির ব্যাপারে সচেতন এবং অ-সচেতন ঝোঁক কিংবা তাদের পারস্পারিক ভূমিকা আর মিথষ্ক্রিয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

চোখের প্রাধান্যকে উপজীব্য ক’রে দার্শনিক আলোচনা করতে উদ্বুদ্ধ ক’রে ডেভিড মিচেল লেভিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতির দৃষ্টি-কেন্দ্রীকতা বা দৃষ্টির কর্তৃত্বপরায়নতাকে চ্যালেঞ্জ করাটা যথাযথ।’ আর আমি মনে করি, আজকের পৃথিবীতে প্রাধান্য-বিস্তারী দৃষ্টিগ্রাহ্যতার চরিত্রকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।

ফেব্রুয়ারি 17, 2017

প্রশ্ন – ১৩

ঠিক কতটুকু তথ্যকে একান্ত ব্যক্তিগত বলা যাবেযে ব্যাপারে রাষ্ট্র প্রশ্ন করতে পারবে না?

ফেব্রুয়ারি 17, 2017

প্রশ্ন – ১২

হোয়াই এ্য ব্যাংক নিডস টু নো দ্য ক্রিড অব এ্য এ্যাকাউন্ট হোল্ডার?

ফেব্রুয়ারি 10, 2017

প্রবচন – ২১

১.
দেশপ্রেম একটি সেকেলে ধারণা। যে ধারণা আজকের দিনে কিছু স্বার্থভোগীকে বাড়তি কিছু সুবিধা দেয়া ছাড়া তেমন একটা কাজে আসে না।

২.
আমি এমন একটা সময়ে বাস করিযে সময়ে আমার অর্জনগুলো সব টাকায় রূপান্তর হয়েযায়। আর সেই টাকাগুলো আমাকে রাখতে বাধ্য করা হয় যাদের কছেআমি ব্যাংকেরকথা বলছিতারা প্রতিনিয়ত সেখান থেকে চুরি ক’রে চলেছে।

আমার যুগের ব্যাংকারগুলো সুনিপুণ চোর আর সাংবাদিকগুলো সবচেয়ে বড় মিথ্যেবাদী। কথা ছিলোসাংবাদিকেরা চোরদেরকে চিনিয়ে দেবে। অথচ তাদের থেকে সর্বদা শুনি চোরদের গুণগান।

৩.
গত কয়েক বছরে বই যেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। অবশ্য সব বইনয়। যে বইগুলো প্রশ্ন করে বা প্রশ্ন করতে বলে সেগুলো। কিন্তু বাংলাদেশের যে কমিউনিটিতা তো কোন বইয়ের কারণে গড়ে ওঠেনি। বরং এই প্রশ্ন করতে শেখানো বইগুলোই বাংলাদেশের মানুষগুলোকে গড়ে তুলতে পারতো আগামীর জন্য। মুর্খ এই আমরা তাও বুঝতে পারলাম না।

৪.
আজকের নামকরা মিউজিয়ামগুলো ঘুরে ঘুরে আমরা আহা উহু করি আর ভুলে যাই যেসেখানে প্রদর্শিত বেশিরভাগ জিনিসই আসলে চুরি করা। আমাদের সময়ের নৈতিক মানদণ্ড বুঝতে এটা বেশ সহায়ক।