স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – এক

শুরুটা করেছিলাম শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তুমি” কবিতা দিয়ে। অনেক দিন পর্যন্ত ভাবতাম স্বাধীনতা মানে বুঝি এইসবই। পরবর্তীতে যখন “তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা” পড়লাম কেমন যেন খটকা লাগল। রবিঠাকুরের অজর কবিতার কথা না হয় বাদ দিলাম। পিতার জায়নামাজের উদার জমিন বা মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন অথবা নিদের পক্ষে বাগানের ঘর, কোকিলের গান, বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা পাওয়ার জন্য শাহাজাদপুরের জোয়ান কৃষক, জেলেপাড়ার সাহসী লোকটা, মেঘনার দক্ষ মাঝি বা ঢাকার রিকশাওয়া অধীর প্রতীক্ষা করবে কেন ? দুইটা ব্যাপার যেন দুই রকম। অনেক পরে বুঝতে পেরেছি যে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য সেদিনের বা হাজার বছরের খাণ্ডবদাহন তা আসলে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। মানুষের নয়। অথচ স্বাধীনতা তুমির প্রতিটি স্বাধীনতা যেন কোন ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু কেন ? হয়তো এই সব ব্যক্তিমানুষই এক হয়ে রাষ্ট্র গঠন করে, তাই…

তাই রাষ্ট্রের বা দেশের স্বাধীনতার ধারণাটার কথা দিয়েই শুরু করছি এই সিরিজ। কিন্তু ধারণাটা করবে কে ? রাষ্ট্রের নাগরিক যারা তারা ? নাকি অন্যকেউ ? আর একটা স্বাধীন দেশ কতটা ব্যক্তি স্বাধীনতা অনুমোদন করে বা করতে পারে ?

ইতিহাসের যে সময়টুকুতে আমরা নিজেদেরকে পরাধীন ভেবেছি সেই সময়টাতে আসলে আমাদের সম্পদের উপর আমাদের কর্তৃত্ব ছিল না। আমরা কি উৎপাদন করব, কিভাবে করব, কতটুকু করব, কার জন্য করব সেটাও নির্ভর করত বিদেশীদের সিদ্ধান্তের উপর খানিকটা বা অনেকটাই। আর এই সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দেয়া হত আমাদের উপর। বিদেশীরা এই কাজটা যে সবসময় নিজহাতে করত তা কিন্তু না। সেটা করার জন্য তারা তৈরী করেছিল বিশাল কর্মচারী, চাকরবাকর, দালাল, জমিদার, খাজনাদার ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে গঠিত এক বিশাল প্রশাসন যন্ত্র। যার উদ্দেশ্য ছিল খুব পরিস্কার। এই দেশে উৎপাদিত সম্পদ কুক্ষিগত করা। কাজটা পাঠান ও মোগলরা করেছে, পরে ইংরেজরা করেছে এবং আরো পরে করেছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা।

পাঠান আর মোগলরা অবশ্য এই সম্পদ এই উপমহাদেশের বাইরে নিয়ে যায়নি। তবে ইংরেজরা নিয়ে গিয়েছে। ফলস্বরূপ তারা যে পরিমাণ ধনী হয়েছে আমরা তার বিপরীত অনুপাতে হয়েছি নিঃস্ব। ইংরেজরা আমাদের সম্পদ নিয়ে গিয়ে নিজেদের দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে আর আমরা হয়ে পড়েছি সেই শিল্পজাত পণ্যের ক্রেতায়। তারপরও স্বাধীন ক্রেতা নয়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল বিবেচ্য বিয়য় ছিল সম্পদের এই মালিকানার প্রশ্নটিই। কোম্পানি শাসন আর ব্রিটেনের রাণীর শাসনের সময় যা ঘটেছিল, স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রেও তাইই ঘটেছিল।

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি গরীব অনুন্নত দেশ। কিন্তু তার যে সম্পদের অভাব আছে এটা কিন্তু আমরা মনে করি না। তারপরও আমাদের দেশ বা আমরা কেন গরীব থাকছি? উত্তরটা খুব সহজ। আমাদের সম্পদের উপর আমাদের মালিকানা নেই বা থাকছে না। সম্পদ এখনো পাচার হচ্ছে। কথিত পরাধীনতার সময় থেকে হয়তো বেশি পরিমাণেই হচ্ছে। দেশের খরচে আমরা যারা শিক্ষিত হই তাদের বেশিরভাগেরই প্রথম স্বপ্ন থাকে বিদেশ যাওয়ার। আমরা যাইও। পরবর্তী স্বপ্ন থাকে দেশে থেকেই কোন বিদেশী কম্পানিতে চাকরী করার। আমরা সেটাও করি খুবই নিষ্ঠার সাথে। আর যারা সরকারী চাকুরী করেন তারা যে সেটা কতটা নিষ্ঠার সাথে করেন বা করছেন সেটা নিয়ে আমাদের ভেতর সবসময়ই প্রশ্ন ছিল, আছে (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে)। ফলস্বরূপ দেশের খরচে যে দক্ষতা তৈরি করছি আমরা তা দেশের কোন কাজে লাগছে না। কাজে লাগছে বিদেশীদের সম্পদ উৎপাদন এবং বৃদ্ধিতে। এই ব্যাপারটা বুঝতে আমাদেরকে একটু কষ্ট করতে হলেও দেশের খনিজ সম্পদের ব্যাপারটা বুঝতে কিন্তু এত কষ্ট করতে হয় না। সেটার কর্তৃত্ব খুব সাদামাটাভাবেই বিদেশীদের। আমাদের দেশের খনিজ সম্পদ আমরা বিদেশীদের কাছ থেকেই কিনে নেই।

যুদ্ধ জয় দিয়ে আমরা দেশের স্বাধীনতা এনেছি ঠিকই। কিন্তু নিজেদের সম্পদের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি আজো। দুঃখের বিষয় হল আমাদের রাজনীতিবিদরা বা আমরা যারা নিজেদেরকে শিক্ষিত বলে দাবি করি তারা কেউই আজও নিজেদের সম্পদের উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট নই। বরং প্রতি নিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি তাতে বিদেশীদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার। এটা যে একধরণের পরাধীনতা- তা বুঝে করছি নাকি না বুঝে করছি সেটা কে বলতে পারে ?

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s