স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – চার

স্বাধীনতাকে কি শুধু রাজনৈতিক ভাবে বিবেচনা করা যায় বা করা সম্ভব? বোধ হয় না। আবুল মনসুর আহমদের রাষ্ট্রিক বনাম কৃষ্টিক স্বাধীনতা থেকে খানিকটা তুলে দিচ্ছি….

“মার্কিনীরা রাজনৈতীক স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। কিন্তু ভাষিক ও সাহিত্যিক স্বাধীনতা লাভ করিতে তাদের আরো দেড়শ বছর লাগিয়াছিল। এ সব ব্যাপারে স্বকীয়তার আবশ্যকতা উপলব্ধি করিতেই তাদের প্রায় একশ বছর লাগিয়াছিল।….রাজনৈতিক যুদ্ধে জিতার চেয়ে কৃষ্টিক যুদ্ধে জিতা আরো বেশি কঠিন। রাজনৈতিক পরাধীনতাটা দৈহিক ও দৃশ্যমান। কিন্তু কৃষ্টিক পরাধীনতাটা মানসিক ও অদৃশ্য। দীর্ঘদিনের পরাধীনতা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেমন অভ্যাসে পরিণত হয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ততটা হয় না। কৃষ্টিক-ভাষিক-সাহিত্যিক পরাধীনতাটা যেমন একটা এলিটিযমের পোশাকী ভব্যতায় বিস্ফোরণটা যত সহজে গণ-ভিত্তিক হইতে পারে কৃষ্টিক চেতনাটা তেমন গণ-ভিত্তিক হইতে পারে না। এই কারণে আমাদের দেশের বর্তমান লেখক-সাহিত্যিকরা কলিকাতার ভাষা-কৃষ্টির মোকাবিলায় যেমন হীনমন্যতায় ভুগিতেছেন, পুরা ঊনিশ শতকের মার্কিন সাহিত্যিকরা তেমনি হীনমন্যতায় ভুগিতেছিলেন লন্ডনের ভাষা-সাহিত্যের মোকাবিলায়।”

এখান থেকে অন্তত একটা তথ্য আমরা পাচ্ছি। সেটা হল, একটা সময় আমাদের দেশের সাহিত্যিকরা ঠিক আমাদের সাধারণ মানুষের ভাষায় সাহিত্য তৈরীতে খানিকটা হলেও সন্দিহান ছিলেন। অথবা ভাবতেন আমাদের ভাষা নয় ভারতীয় বাঙালিদের বাংলাই উৎকৃষ্ট। আর তাই সাহিত্যের জন্য অধিক যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এই বোধ বেশিদিন টিকতে পারেনি এই ব-দ্বীপে। হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানীদের কিছু প্রচেষ্টা এই এগিয়ে যাওয়াতে ভূমিকা রেখেছিল। যাহোক আমরা বেরিয়ে এসেছি আবুল মনসুর আহমদের বলা হীনমন্যতা থেকে।

কিন্তু তার পর কি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না? আমরা কি ততটা এগিয়েছি যতটা যাওয়ার কথা ছিল? নাকি পিছিয়ে গেছি। আসুন দেখি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কি বলছেন…

“বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। কিন্তু আবার হয়ও নি। মধ্যবিত্ত প্রায়-উন্মত্ত ইংরেজী শিখতে। কোম্পানীর শাসনামলে যা দেখা যেতো, আজো তাই দেখা যাচ্ছে। সর্বত্র ইংরেজী শিখবার উন্মাদনা। পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজী শিক্ষার অধিকারের দাবিতে প্রবল আন্দোলন হয়েছে। সেখানে যুক্তি হচ্ছে – ইংরেজী কম জানার দরুন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীরা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, পিছিয়ে পড়ছে। তদুপরি হিন্দী সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিহত করবার অজুহাতটাও রয়েছে। বাংলাদেশে অবশ্য শুরুর স্তর থেকেই ইংরেজী পড়ানো হয়। ইংরেজী শিক্ষার ব্যাপারে এখানেও সেই একই অত্যুগ্র আগ্রাহ। কৌতুকের ব্যাপার এই যে, বৃটিশ শাসনামলে ইংরেজী ভাষার যে আধিপত্য ছিল সেটা আবার ফিরে আসছে। জাতীয় স্বাধীনতা এসেছে কি আসেনি এই ঘটনা তার একটি দ্যোতক বটে। যেমন ভারতে তেমনি বাংলাদেশে।”

এই কথাগুলো যেন আবুল মনসুর আহমদের কথার থেকেও স্পষ্ট। অথচ একটা কথা বলা হচ্ছে ১৯৭৪ সালে। তাও স্মৃতিচারণে। যে স্মৃতিটা আরো আগের কোন এক সময়ের। আর পরের কথাটা বলা হচ্ছে ২০০০ সালে এসে। অবশ্য দুই ক্ষেত্রে চিহ্নিত শত্রু কিন্তু দুই জন।

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s