স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – তিন

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় জাতীয়তাই স্বাধীনতার অন্যতম প্রেরণাদারকারী। কারণ কোন একটা দলবদ্ধ মানুষের সম্প্রদায় যদি নিজেদেরকে আলাদা করে সনাক্ত করতেই না পারে তাহলে তাদের স্বাধীন হওয়ার বা স্ব-পরিচালিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই যদি হয় তাহলে তো বাঙালির স্বাধীন হওয়ার প্রেরণা অনেক আগে থেকেই বর্তমান… হাজার বছরের বাঙালি বা এই ধরণের কিছু কথা নিশ্চয় প্রায় হাজার বছর ধরেই প্রচলিত ( কেউ কেউ যদি বলে বসেন… এই ব-দ্বীপের বাসিন্দারা খুব বেশি দিন নিজেদেরকে বাঙালি বলা শুরু করেনি, বেশি হলে সাড়ে চারশ বছর… তাহলে কথাটা নাহয় সাড়ে চারশ বছর ধরেই প্রচলিত… বাঙালি অংকে সবসময়ই একটু কাচা বলে এটাকে মাফ করে দেয়া যায়)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বাঙালীর জাতীয়তাবাদ’ বইয়ের অবতরণিকা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করি….” দাস ব্যবস্থার অধিনে যারা থাকে তাদের মধ্যে তিন ধরণের মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে বলে ভি আই লেনিন একদা উল্লেখ করেছিলেন। ইংরেজ শাসনের অধীন অবস্থায় বাঙালীর জীবনে ওই তিনটি মনোভাবই দেখা গেছে। একদল ছিল যারা অসচেতন, যারা জানতো না যে তারা পরাধীন। এরাই ছিল প্রকৃত দাস। এদের সংখ্যাই ছিল সর্বাধিক, বলাই বাহুল্য। আরেক দল ছিল যারা নিজেদের অবস্থানকে সজ্ঞানে মেনে নিয়েছে, এবং নিজেদের পরাধীনতাকে উপভোগ করেছে; এরা হল চাটুকার ও পরগাছা। এরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। এদেরই একাংশের মধ্যে ক্রমে জাতীয়তাবাদের অনুভব জেগে উঠেছে। এরা চাকরি, জনপ্রতিনিধিত্ব, সুযোগ-সুবিধার বৃদ্ধি এবং বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে নানা রকমের আন্দোলন গড়ে তুলেছে। একেবারে অচেতন দাস এবং আপোসে-আন্দোলনকারী এই যে দুই দল এদের বাইরে তৃতীয় একটি দলও ছিল, তুলনায় যেটি ক্ষুদ্র। এই ধারণার মানুষেরা পরাধীনতাকে পরাধীনতা বলেই চিনেছে, তবে ওই বাস্তবতাকে মেনে নেয়নি। ঘাড়ের জোয়ালটাকে তারা ফেলে দেবে ভেবেছে। এই তৃতীয় ধারায় আবার দুই পক্ষ ছিল। উভয়েই স্বাধীনতা চেয়েছে। কিন্তু একপক্ষ চেয়েছে কেবল স্বাধীনতাই, তার বেশি নয়; তারা সাম্রাজ্যবাদকে হটাবে,তবে স্বদেশী সামন্তবাদকে রেখে দেবে। আর অন্যপক্ষ, যাদেরকে বলা যায় বামপন্থী, তারা কেবল স্বাধীনতায় সন্তুষ্ট থাকতে চাই নি, মুক্তিও চেয়েছে, অর্থাৎ সামাজিক বিপ্লবই ছিল তাঁদের চুড়ান্ত লক্ষ্য।”

এখান থেকে আসলে স্বাধীনতার ধারণাটা খুব একটা পরিস্কার হচ্ছে না। বরং আরো জটিলতা ধারণ করছে। কারণ যে খুব অল্প কিছু মানুষ স্বাধীনতা পেতে চাই তাদের চাওয়ার ভেতর পরিমাণগত তারতম্য আছে। আছে উদ্দেশ্যের ভিন্নতা। স্বাধীনতা অর্জনের উপায়ও তাই বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রকম।

যে ভাবছে সাম্রাজ্যবাদকে হটাতে পারলেই সব কিছু হাসিল সে তো ‘৪৭ এ প্রতারিত হলই শেষপর্যন্ত। তারপরও স্বাধীনতার সাথে এই সাম্রাজ্যবাদকে হটানোর ধারণাটাই কিন্তু সবচেয়ে সফল। সে সময় নিলেও ( কখনো ১৯০ বছর আবার কখনো চব্বিশ বছর… আগের গুলোর কথা নাহয় ভুলে থাকলাম আপাতত…) তার উদ্দেশ্য কিন্তু সে হাসিল করেছে একাধিকবার। তার পরিণতির কথা নিয়ে আলোচনা হয়তো পরে করা যাবে…..

আর বামপন্থী বা অন্যপক্ষ যারা কিনা প্রকৃত মুক্তির জন্য ভেবেছিল বলে বলা হল তাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে খুব একটা সাক্সেসফুল যে না সেটা একরকম বলাই যায়। তাহলে ‘ওই বাস্তবতা মেনে নেয়নি’ এবং ‘কেবল স্বাধীনতায় সন্তুষ্ট থাকতে চাই নি’ যারা তারা তারা কি চরমভাবে পরাজিত এবং নিশ্বেষিত? নাকি কেউ কেউ যেমন বলে থাকেন বিপ্লব সাধিত হওয়ার পর একজন চরম বিপ্লবীও কট্টরপন্থী হয়ে যায়… তেমন হয়ে গেছেন। যেটাই হয়ে থাকুক না কেন দুই দিক দিয়েই যে পরাজয় দেখতে পাচ্ছি।

যাহোক উভয়েই কিন্তু জাতীয়তাবাদী, তবে স্বাধীনতাকামী হয়েও আসলে স্বাধীন হতে পারেনা …

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s