স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – দুই

কোন মানুষটা স্বাধীন ? কোন মানুষটা বা স্বাধীন নয় ? আমি পরাধীন শব্দটা ব্যবহার করছি না। একটু অতীতে যাই, দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা। প্রায় ২৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৭০ এর দিকে যুক্তরাজ্যে শিল্পবিপ্লবের শুরু বলে ধরা হয়। তো তখন থেকে সমাজে প্রচলিত বেশকিছু সম্পর্ক পরিবর্তীত হতে শুরু করে। তার একটা হল ভূ-স্বামী এবং চাষীর সম্পর্ক। কারণ বাস্তবে ভূ-স্বামীর সংখ্যা থাকে কম। অথচ ওরাই থাকে কর্তৃত্বে এবং চাষীরা তার নির্ভরশীল। এই চাষীরা কোন মৌসুমে কি উৎপাদন করবে, কিভাবে করবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন এখতিয়ার তাদের থাকত না। এই কর্তৃত্ব এবং নির্ভরশীলতার ভেতর কোন প্রচ্ছন্ন স্বাধীনতা বা পরাধীনতার বোধ কাজ করত কিনা সেটা ধারণা করা আমার পক্ষে অসম্ভব।

আবদুল মমিন চৌধুরী “প্রাচীন বাংলার ভূমিব্যবস্থা” তে বলছেন … বহু প্রাচীনকালে বাংলাদেশের ভূমির স্বত্বাধীকারী কে ছিলেন- রাজা না প্রজাসাধারণ তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে মৌর্য আমলে যে সুষ্ঠু রাজশাসন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল তা থেকে মনে হয় যে তৎকালীন বাংলার ভূমির স্বত্বাধীকারী ছিলেন রাজা।… এক্ষেত্রে প্রমাণস্বরূপ তিনি মহাস্থানগড়ে পাওয়া লিপির কথা বলছেন। আবার দেবখড়েগের আশরাফপুর লিপি থেকে তথ্য হাজির করছেন যে মহিলারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করতে পারতেন। …. অন্যএক জায়গাতে বলছেন,”তবে ভূমির মালিকানা যারই থাকুক না কেন উৎপাদিত শস্যের ছয় ভাগের এক ভাগ রাজাকে দিয়ে দিতে হত সেই প্রমাণ পাওয়া যায়।”

১৭৯৩ সালের মার্চে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ঘোষণাতে কর্নওয়ালিস বলছেন, ” এখন থেকে সমস্ত জমিদার, চৌধুরী, তালুকদারগণ জমির একমাত্র মালিক বলে বিবেচিত হবেন। এখন মালিক হিসেবে তার জমি বিক্রি করতে পারবেন, দান করতে পারবেন, বন্ধক রাখতে পারবেন। এর জন্য সরকারের সম্মতি নিতে হবে না। আর দশবর্ষীয় বন্দোবস্তে যার উপর যত সরকারী খাজনা আরোপ করা হয়েছে তার আর পরিবর্তন হবে না। এই চিরস্থির খাজনা ও বন্দোবস্ত কোন ভবিষ্যৎ সরকারও পরিবর্তন করতে পারবে না।”_proclamation articles 1-6, regulation 1, 1793.
এবার আসুন রমেশচন্দ্র দত্তের কথায়। তিনি দ্যা ইকোনোমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া আন্ডার আর্লি ব্রিটিশ রুল বইয়ে বলছেন… ভারতবর্ষে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হচ্ছিল, বড় বড় যুদ্ধ চালানো হচ্ছিল এবং শাসনকার্যও পরিচালিত হচ্ছিল ভারতের জনসাধারণের অর্থে, এর জন্য ব্রিটিশ জাতি একটি কপর্দকও খরচ করে নাই। বিহার এবং বাংলাদেশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হতেই এই সকল যুদ্ধ এবং শাসনকার্যের জন্য সকল ব্যায় নির্বাহ করা হচ্ছিল।

মাহবুব আহমেদ “বাংলাদেশের ভূমিবিন্যাস ব্যবস্থা” প্রবন্ধে বলছেন, ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ইংরেজগণ যে জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি করেন তার ঐতিহাসিক গোড়াপত্তন মুর্শিদকুলি খানের ‘জমা’ প্রথা ও সুজা-আল-দীনের ‘সুমার’ প্রথায় করেছিল।

বাংলাদেশের মানুষরা বিশেষত চাষীরা পরাধীন হয় প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ১৭৯৩ সালেই। কিন্তু সেদিনের আগে থেকেই তো তাদের এমনটা হওয়ার কথা। অন্তত মুর্শিদকুলি খানের সময় তো বটেই। কিন্তু তা হচ্ছে না কারণ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে যে খাজনা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় তার আকার। এবং এই সময় থেকেই বাংলাদেশের মানুষ বা চাষীরা (সংখ্যাগরিষ্ঠ) তাদের জমিতে কি উৎপাদন করবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার হারাচ্ছে। ফলত পরাধীনতার অনুভূতি লাভ করছে।
শুরুতে উল্লেখ করা শিল্পবিপ্লবের আগে যুক্তরাজ্য বা ইংল্যাণ্ডেও ভূ-স্বমীদের অধীনস্তদেরকে এই ধরণের একটা পরাধীনতার বোধ নিয়েই চলতে হয়েছে কয়েক শতাব্দী। শিল্পবিপ্লব এই অধীনস্তদের অনককেই সুযোগ দিল এক নতুন ধরণের স্বাধীনতার। নিজের কাজ নিজে নির্বাচন করার স্বাধীনতা। কিন্তু কয়েকদশক যেতেই তারা বুঝতে পারল এই স্বাধীনতা তাদেরকে কতটা অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার ভেতর ফেলে দিয়েছে। এবং এরই ফলস্বরূপ বিশ্বে হাজির হয়েছে স্বল্প মজুরীতে শ্রমিক পেষণ এবং গণদারিদ্র। সেটাকে একধরণের মানবিক বিপর্যয় বা এক নতুন ধরণের পরাধীনতা কি বলা যাবে না ? হ্যা মানুষ বলেছেও তাই। আর তাই মানবিকতার ম্যানিফেস্ট নিয়ে সে তৈরী করেছে আর একটি বিপ্লব।

(নোট : আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s