স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – পাঁচ

১৯০৮ সালে করাচিতে মুসলিম লীগের দ্বিতীয় অধিবেশন হয়। সেখানে বাংলার প্রতিনিধি ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। সেখানে তিনি একটা প্রস্তাব দেন। সেটা হল… ” মুসলমান ছাত্রদের জন্য প্রভূত অসুবিধা সৃষ্টি করছে বিধায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে অনুরোধ করা হোক যে, তারা যেন বাংলার স্কুলগুলোতে মাতৃভাষার বাধ্যতামূলক পরীক্ষার যে ব্যবস্থা রয়েছে তা রহিত করেন”

প্রস্তাবটি খুবই অভিনব। প্রথম যখন আমি প্রস্তাবটির কথা শুনি আমার বিশ্বাস করতে বেশ সময় লেগেছিল। বিশ্বাস হওয়ার পরও যা মনে হয়েছিল তা হল… মুসলিম লীগের প্রতিনিধিরা তো এই ধরণের প্রস্তাব করতেই পারে। ওদের কথা এতটা গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু পরে যখন কারণটা জানতে পারলাম তখন আর এই ধরণের চিন্তা স্থায়ী হয়নি। ‘The Mussalman’ পত্রিকার সম্পাদক এই প্রসঙ্গে লিখছেন, ” The bengali books, we may observe, are full of references to hindu mythology and as such there can hardly be anything in them of interest to the mussalman”

বাংলা বইয়ে মুসলামদের অনুপস্থির কারণে এবং হিন্দু পুরাণের পুন পুন ব্যবহারের কারণে সেদিনের অনেক মুসলমানই যে বাংলা বই পড়তে উৎসাহিত হননি সেটা বুঝতে আর বেশি কিছুর দরকার পড়ছে না। কিন্তু এই ভাবেই কি চলতে থাকবে ? মুসলমানদের জন্য কি বাংলা পাঠ্য বই লেখা হবে না ? কি জানি হয়েছিল কিনা। তবে ১৯২৬ এ এসেও স্যার আবদুর রহিমকে ম্যাট্রিকুলেশন স্তর পর্যন্ত বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে দেখা গেছে।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম বৈশিষ্ট্যের অভাব থাকার কারণে মুসলমানরা তাদের জন্য চেয়েছে একটা আলাদা সাহিত্যিক প্লাটফর্ম। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল। যার নাম মুসলিম লীগ। এবং একটা পর্যায়ে তারা ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছে। অংশ হয়েছে এমন একটা মানচিত্রের যেখানে তাদের ভাষায় হিন্দু পুরাণের উপস্থিতি থাকবে না বা যে বাংলাতে সংস্কৃতের প্রভাব থাকবে কম।

বাস্তবে হয়তো সেটাই হতে চলেছিল। ১৯৪৭ এর পর বাংলাকে পরিবর্তনের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। বা চেষ্টা করা হয়েছে তাকে মুসলিম উপযোগী করে তোলার। কিন্তু কিভাবে? প্রচুর আরবি-ফার্সি শব্দ বাংলাতে ব্যবহার করে? বাংলার ব্যাকরণ পালটে ফেলে। আবুল মনসুর আহমদের মত অনেকেই সেই চেষ্টাও করেছেন।

কিন্তু সাধারণ মানুষ অথবা ভাষা নিজেই যে চেয়েছিল নিজের মত করেই টিকে থাকতে। যেখানে না থাকবে সংস্কৃতের ব্যপক প্রভাব। না থাকবে উর্দু-আরবি-ফার্সির প্রভাব। কম বেশি সবার উপস্থিতি থাকতে পারে। কিন্তু তা ভাষার স্বাভাবিক গতিকে নষ্ট করবে না। আর তাই ভাষার নিজেরই প্রয়োজন পড়েছে নতুন একটা মানচিত্রের। ১৯৭১ এ সে সেটা পেয়েছে।

হুমায়ুন আজাদ যতই মনে করুন না কেন ১৯৪৭ এর সংশোধন হল ১৯৭১। বাস্তবতা হল ৭১ হল অতীতের ধারাবাহিকতা। এবং এই ধারাবাহিকতা থেমে যাওয়ার নয়। সে কিন্তু বহমান। হয়তো আগামী কাল তা আরো স্পষ্ট হয়ে আমাদের দৃষ্টি গোচর হবে।

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s