প্রকাশিত খবর নিয়ে উদ্বেগ…

২৯ মার্চ (সোমবার), ২০১০ ১২:০৯ পুর্বাহ্ন

আজকের ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় এরই ভেতর “রাজউকের ফার নিয়ে বিপাকে ক্ষুদ্র প্লট মালিকেরা” শীরনামের খবরটা দেখেছেন। প্রতিবেদক মোহাম্মদ আবু তালেবের তথ্য অনুযায়ী এরই মধ্যে রাজধানীর ছোট প্লটের মালিকদের ৭০ ভাগ ভবন নির্মান বন্ধ রেখেছেন। এবং তাদের কারো কারো ভেতর চাপা ক্ষোভও নাকি দানা বেধেছে।

খবরটা আমাকে খুব একটা বিচলিত করেনি। তবে একটা ব্যাপার বিচলিত করেছে সেটা হল ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬’ এর বেশ কিছু নিয়ম আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। কেন সেটা একে একে বলি… (সবগুলো হয়তো বলতেই পারব না… বেশিরভাগই হয়তো না বলা থেকে যাবে)

ঢাকা শহরে যারা বেশ লম্বা একটা সময় ধরে আছেন তারা বোধহয় খেয়াল করে থাকবেন ১৯৯৬ এর পর থেকে ঢাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে। এই সময় থেকেই ঢাকার যথেচ্ছা এবং বিপুল নির্মাণযজ্ঞ শুরু। কারণ প্রথমত অবশ্যই চাহিদা। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে পুঁজির প্রথমবারের মতো বেড়ে ওঠা। সাথে সাথে শহরেরই বেড়ে ওঠার প্রবণতা। তৃতীয়ত প্রশাসনিক কারণে অন্য শহরগুলোর গুরুত্ব কমে যাওয়া। …. আরো অনেক কারণের সাথে ১৯৯৬ এর ইমারত নির্মাণ বিধিমালাও। কারণ এই বিধিমালাতেই ভূমির ৭৫ শতাংশে ইমারত নির্মাণের অনুমোদন ছিল। আর যেহেতু ডিভেলপাররা মোটামুটি দাড়িয়ে গেছে ততদিনে পুঁজি এবং সংগঠন নিয়ে, তারা তখন সুযোগ নেয় এই নিয়মের। আর যার ফলস্বরুপ আমাদেরকে আজ দেখতে হচ্ছে ঢাকার এই অপরিকল্পিত বেড়ে ওঠা। সামান্য কিছু সেট ব্যাক ছেড়ে দিয়েই তখন ভবন বা বিল্ডিং বানানো যেত। সেই বিল্ডিং এ যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা আছে কিনা তার কোন নির্দেশনা সেই নিয়মে ছিল না। ছিল না ভবনের সাথে পার্কিং লাগবে কি লাগবে না তার নির্দেশনা এবং বাধ্যবাধকতা। তৈরী করা ভবনে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ করা যাবে কিনা সেই নিয়েও কোন ভাবনা ছিল না এই নিয়মের ভেতরে। হয়তো সেদিন এই নিয়ে ভাবার মতো লোকজনও ছিল না আমাদের দেশে।

সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা জমতে শুরু করেছে আরো কিছু বছর আগে থেকেই। বেসরকারী কিছু ব্যাংক ব্যবসা করতে নেমেছে ইতিমধ্যে। তাদেরকে টিকে থাকতে হলে ঋণ বেচতে হবে। সবমিলিয়ে প্রচুর মানুষ ভবন বানাতে শুরু করল। সাথে সাথে মোটর গাড়ির দামও কমানো হয়, বিশেষত রিকণ্ডশনড গাড়ির, এই সময়ে। তাই মানুষ গাড়িও কিনতে লাগল দেদারছে। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই সবাই দেখতে পারবেন এই সময় রাজধানীকে নিয়ে বড় ধরণের কোন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেনি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠাণই। কারণ অবশ্যই তাদের যোগ্যতা এবং সামর্থের অভাব।

দশ বছরের ভেতরেই প্রচুর নতুন নতুন বিল্ডিং যার বেশির ভাগই আবাসিক তৈরী হয়ে গেল। এটা করতে গিয়ে ভরাট হল অনেক ডোবা, নালা, খাল, লেক। কিছু রাস্তাও তৈরী হল। অবশ্য তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বসানো হল প্রচুর গভীর নলকূপ। ভূগর্ভ থেকে উঠানো হতে থাকল বিপুল পরিমাণ পানি। এদিকে মাটির উপরিতল আর খালি নেই বললেই চলে। ফলে একটা সময় আমরা আবিস্কার করলাম, যে পরিমাণ পানি আমরা মাটির নিচ থেকে তুলে নিচ্ছি সেই পরিমাণ পানি আর মাটির নিচে জমা হচ্ছে না। এত দিন আমাদের সমস্যা ছিল পানি না তুলতে পারা এবং সেই পানি ঠিক ভাবে পরিবহন করতে পারা। কিন্তু এখন আমাদের সমস্য হল মাটির নিচে পানিই না থাকা। কিন্তু মাটির নিচে যে জায়গাতে পানি জমে সেখানে তাহলে থাকছে কি? উত্তর হল… সেই জায়গাটা ফাঁকা থাকছে। ফলে বাড়ছে জমি হঠাৎ করে বসে যাওয়ার আশংকা। সেই আশংকা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে জমির উপর গজিয়ে ওঠা বিপুল সংখ‌্যক ইমারত যাদের ভর যে কত বিপুল তা একবার অনুমান করে দেখুন…. ঢাকাতে ভূমিকম্প হলে এই জমি বসে যাওয়ার ভয়টা ইমারত ভেঙে পড়ার থেকেও অনেক বেশি। কিন্তু কে ভাবে কার কথা। সবাই দেখে সাময়িক লাভ।

প্রতিদিন রাস্তায় এত যানজট হয়। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি। কিন্তু রাস্তার পরিমাণ বাড়ানোর কোন চিন্তা আমরা করি না। বরং চিন্তা করি আরো বেশি বেশি বড় বড় ইমারত বানিয়ে কিভাবে রাস্তার উপর প্রেশার আরো বাড়িয়ে দেয়া যায়। একটা ইস্কুলের সামনে বা একটা বড় শপিং-মলের সামনে কতটা চওড়া রাস্তা দরকার সেটা আমরা ভেবে দেখতেই চাইনা।

খানিকটা আশার কথা আমাদেরকে শুনিয়েছিল ইমারত নির্মাণের ২০০৮ এর বিধিমালা। আমি নিজে একজন নির্মাণ শ্রমিক হওয়ায় জানি অন্তত রাস্তা আর জমি উন্মুক্ত রাখার যে ব্যবস্থাটা এই বিধিমালাতে আছে সেটা বেশ ভাল। যদিও যথেষ্ট নয়। আমাদের ২০০৪ সালের একটা আবাসন নীতিমালা আছে। যেখানে বলা আছে এক একর আবাসিক এলাকাতে সর্বোচ্চ ৩৫০ জন লোকের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে। আমাদের মাটি, পানি এবং সার্বিক পরিবেশ বিবেচনায় সেটা বেশ যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ২০০৮ এর বিধিমালার ‘ফার’ হিসেব করে ইমারত বানালে দেখা যায় আমরা আসলে এক একরে প্রায় ১০০০ মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তার জন্য যে রাস্তার ব্যবস্থা করছি সেটা কিন্তু ঐ ৩৫০ জনেরই। পানি, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন আর বিদ্যুতের কথা না হয় বললামই না।

বাতাসের কথা কি বলব ? আমরা ঢাকার লোকজন তো বোধহয় ভুলেই গেছি বেঁচে থাকার জন্য মানুষের বাতাসও লাগে। হৃদরোগের সমস্যা, হাপানির সমস্যার অন্যতম প্রধাণ কারণ যে আমাদের এই আটোশাটো বিল্ডিংগুলো সেটা আমরা কেউ ভাবতেই চাই না। হয়তো কিছু মূল্যবান জমি খোলা রেখে দিলে আমাদের ওষধ পথ্যে খরচ অনেক কমে যেত।

কিন্তু বেশখানিকটা অপরিকল্পিত ভাবে বেড়ে ওঠা এই শহরের অস্থির মানুষদের মাথায় যে চেপেছে টাকার নেশা, মুনাফার নেশা। যেভাবেই হোক তারা ইমারত বানাবে এই ছোট্ট শহরের ভেতরেই। তার জন্য তারা মৃত্যকেও যে মেনে নিতে বা আগিয়ে আনতে রাজি সেটা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি না জেনে না বুঝে বা নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এমনটা করছে মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হল, ঢাকার মানুষ জেনে শুনেই এই ভয়ঙ্কর মরণ খেলায় নেমেছে। প্রয়োজনে সে সেই পুরোনো আইন ফিরিয়ে আনবে যে আইন তাদেরকে দিয়েছে ভগ্নস্বাস্থ, যানজট, পরিবেশ দূষণ… এইরকম আরো অনেক কিছু….

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s