ট্রানজিট নিয়ে সাম্প্রতিক ভাবনা…

আজকের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ট্রানজিট নিয়ে বেশ কিছু খবর এসেছে। খবরগুলোতে অনেক তথ্য উপাত্য এসেছে। সেগুলো থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে সবপক্ষই এই ব্যাপারটাতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। আমি নিজে এই ব্যাপারটা খুবই জটিল বলে ভাবি। অনেক ধরণের হিসাব নিকাশ জড়িত এর ভেতরে। যার সবগুলো জানা বা বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব কিনা জানি না। আর তাই আমি সাধারণত ট্রানজিটের প্রশ্নে কোন বিশেষ পক্ষে যেতে পারি না।

তবে প্রকাশিত খবরের কিছু কিছু আমাকে উদ্বিগ্ন করছে। আমি দেখছি ট্রানজিট নিয়ে আলোচনাতে সজকপথ, রেলপথ এবং জলপথের তিনটিই বিবেচনাতে আছে। সেটাই হয়তো বাণিজ্য বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু আমি বাণিজ্য নিয়ে ভাবছি না। ভাবছি সময় এবং পরিবেশ নিয়ে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়েছি সাড়ে পাঁচ ঘন্টা বা তার কাছাকাছি সময়ে। ঢাকা থেকে খুলনা যেতাম সাত ঘন্টায়। কখনো কখনো একটু বেশি সময় লাগতো। হয়তো এক ঘন্টা যোগ হতো তাতে। ‘৯৭/৯৮ সালের দিকেএকবার আরিচা ঘাট পার হতে গিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পায়ে হেটেছিলাম। তাতেও ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে পৌছাতে সময় লেগেছিল সাথে সাত ঘন্টা। এতদিনে আমাদের রাস্তার প্রশস্ততা বেড়েছে কিছুটা হলেও। কিছু কিছু জায়গাতে বেশ কিছু বাই-পাস তৈরী করা হয়েছে। এখন বেশিরভাগ হাইওয়ে গাড়ি আর শহরের ভেতরে ঢোকে না। অন্তত দিনের বেলাতে। গাড়ির বহরে এরমধ্যে যোগ হয়েছে আরো দ্রুতগামী গাড়ি। তারপরও এইসব গন্তব্যগুলোতে যেতে আমাদের সময় কিন্তু আরো বেশিই লাগছে আজকের দিনে।কয়েকদিন আগেই আমার এক বন্ধু চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছে ১৪ ঘন্টায়। এখন চট্টগ্রাম থেকে ৯/১০ ঘন্টাতে ঢাকা আসতে পারলে আমরা বেশ খুশি হয়ে যায়।

রাস্তা বাড়ার পরও আমাদের এই বাড়তি সময় লাগার কারণ হল আমাদের যোগাযোগের প্রয়োজনও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে গাড়িও বেড়েছে প্রচুর। ফলে রাস্তার উপরে চাপ বেড়েছে অনেক। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এখন আমাদের রাস্তা বাড়ানোর দরকার হয়ে পড়েছে। সেটা শহরের ভেতরে বাইরে সবখানেই। কিন্তু তার জন্য দরকার ব্যাপক বিনিয়োগ। আর রাস্তা তৈরীতে আমাদের দেশে সাধারণত সরকারই বিনিয়োগ করে থাকে। তাই আমরা সাধারণ মানুষেরা এবং অবশ্যই বিনিয়োগকারিরাও তাকিয়ে আছি সরকারের দিকেই।

সরকার কিছু কাজও করছে। বেশ কিছু বড়বড় সেতু হয়েছে আমাদের। আরো কিছু হচ্ছে বা হওয়ার কথাবার্তা চলছে। তার জন্য বিবেচনাতে নিতে হচ্ছে বিস্তৃত পরিমাণ ফসলি জমি। এই ফসলি জমির রূপান্তরটাই আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

আমি একটু পুরোনো কথা মনে করতে চাই এই সময়। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশরা আমাদের দেশে রেল যোগাযোগ চালু করেছিল। এই রেল যোগাযোগের রুট ছিলমোটামুটি পূর্ব থেকে পশ্চিমের দিকে। কারণ তাদের টার্গেট ছিল কাচামাল যোগাড় করে কলকাতা বন্দরে নিয়ে যাওয়া। আর আমাদের এতদিনের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম ছিল যে নৌ-পথ সেটা মোটামুটিভাবে উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে প্রবাহিত। ফলে উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকে এই দুই ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে বেশ একটা টানাপোড়েন শুরু হয়। রেল নতুন প্রযুক্তি। সেটার গোড়াপত্তন যেমন হওয়া দরকার তেমনি দরকার নদীর পানি-প্রবাহ ঠিক রাখা। তা না হলে প্রভাব পড়তে পারে ফসলের উৎপাদনে।

ইতিহাস থেকে আমি যতটুকু জানি সেটা করা সম্ভব হয়নি। হয়তো সেটা করার ইচ্ছাও ছিলনা করো। ফলে এই সময়ে আমাদের দেশে ফসলের উৎপাদন কমতে শুরু করে ভয়াবহ ভাবে। তার পরিণতিতে ১৯৪৩ সালে আমাদেরকে যেতে হয়েছিল ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ভেতর দিয়ে। বাঙালির স্বাস্থ্য ১৮৯০ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত যে ব্যাপাক ক্ষয়ের ভেতর দিয়ে গেছে সেটা আমরা আজো ফিরে পাইনি। ১৯৪৩ এর পর আবার যে কিছুটা ফিরে আসতে শুরু করে তার কারণ এই না যে আমার খাদ্য উৎপাদন আবার বাড়তে থাকে ব্যাপক ভাবে। এর কারণ আমাদের মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া। উৎপাদিত খাদ্যের পরিমাণ আগের মতোই ছিল প্রায়।

১৯৪৮ এর পর আমাদের দেশে শুরু হয় সড়ক পথের নির্মাণযজ্ঞ। সেটা এখনো চলছে। সড়ক পথেই আমরা এখন আমাদের বেশির ভাগ যাতায়াত সারি। খুব সম্ভবত আশির দশক থেকেই আমাদের দেশে সড়কপথের পরিমাণ ব্যাপকতর হতে শুরু করে। সেই সড়ক পরিকল্পনাতেও যে পানি-প্রবাহের ব্যাপারটা ছিল না সেটা আমরা টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে। কয়েকটি ব্যাপক বন্যা থেকে। বন্যা আমাদের দেশে হতই। তাতে পলি পড়ত। আর তার ফলে ফসলের উৎপাদন বাড়ত বলেই জানতাম। কিন্তু রেল চালুর পর থেকে আমরা পরিচিত হই জলাবদ্ধতার সাথে। সড়ক ব্যবস্থার বিকাশের পর এই জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা বেড়েছে বিপুল ভাবে। তার ফলে প্রায় প্রতিবছরই আমাদেরকে বিপুল ফসলহানীর শিকার হতে হয়।

এর ভেতরে আমাদের চাষাবাদেও বেশ কিছু উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে। তাই উৎপাদনও বেড়েছে। তারপরও যে আমরা ব্রিটিশ আমলে ১৯০০ সালের আগে পর্যন্ত চাল রপ্তানি করতাম তা এখনো আমাদেরকে আমদানি করতে হয়। আর এই আমদানির ব্যাপারটাতে কিছুদিন আগেই আমাদের খুব কঠিন একটা শিক্ষা হয়ে যাওয়ার কথা। এইতো বছর ২/৩ আগেই। বিভিন্ন করণেই আমাদের উৎপাদন হয়েছে কম। সারা পৃথিবীতেই তাই। আমাদের হাতে টাকা থাকার পরও আমরা কিন্তু চাল কিনতে পারিনি। ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের অনেকেই তখন চাল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার পাশের বাড়ির মানুষটিও যে তারজন্য প্রয়োজনীয় চাল কিনতে পারছেন না সেটা আমি দেখেছি। এবং কিছুই করতে পারিনি। তখন রাষ্ট্র বলেছে তার হাতে টাকা আছে কিন্তু বিশ্ববাজারে চাল নেই। আর আমি দেখেছি বাজারে চালের দামের উর্ধ্বগতি।

ফিরে আসি ট্রানজিটের প্রশ্নে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে। তাতে সড়কের পরিমাণ এবং মান বাড়বে। বাড়বে বন্দরের অবকাঠামো। বাড়বে রেল পথ। কিন্তু ফসলি জমি যে কমে যাবে সেটা কেন কেউ বলছে না? বিনিয়োগ করা টাকা কত দিনে উঠে আসবে সেই হিসাব আছে। কিন্তু কি পরিমাণ জমি চাষাবাদ থেকে বাদ পড়বে সেটার কোন হিসাব দেখছি না। ফসলের উৎপাদন কতটুকু কমবে সেটা কি কেউ হিসাব করছে? সেটা পুশিয়ে নেয়া হবে কিভাবে সেটা কি আমরা জানতে চাইতে পারি না?

ট্রানজিট নিয়ে যারা আলোচনাতে বসছেন তাদের ভেতরে আমি কোন ইতিহাসবিদ দেখছি না। দেখছি না কোন আরবান বা রুরাল প্লানারের নাম। পরিবেশ-বিশেষজ্ঞের চিহ্নই নেই সেখানে। শুধু একটা কথার উল্লেখ দেখছি। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার কথা। আমি মনে করি না এত গুরুতর একটা বিষয়ে এইটুকুউল্লেখই যথেষ্ট। আপনাদের কি মনে হয় ?

4 thoughts on “ট্রানজিট নিয়ে সাম্প্রতিক ভাবনা…”

  1. >হুম… হাসিব সচলে দিয়েছিলাম… ব্যাপক সময় নিয়ে ওরা পোস্টটা প্রকাশ করেছে… তবে ওখানে দারুন কিছু মন্তব্য এবং প্রশ্নের সম্মুখিন হয়েছি… যার বেশ কিছুর উত্তর আমার কাছে নেই..

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s