ভূমিকা : রিচার্ড মেয়ার

স্থাপত্য এক ধরণের সামাজিক শিল্প। জীবন যাপনের বিভিন্ন গুণাগুন যার বিবেচনার বিষয়। আমাদের কাজের ধরণের মাধ্যমেই যা আকার পায়। প্রয়োজন আর সামঞ্জস্য বিধানকে (accommodation) ছাপিয়ে ওঠার স্বাভাবিক দক্ষতা তৈরীর মাধ্যমে স্থপতিরা দারুন কিছু করতে পারেন, পরিসর এবং ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে; যা কিনা আমাদের মানবিক বিবেচনাকে কাব্যিকভাবে প্রকাশ ক’রে শৈলীর (স্টাইল) বাহ্যিক গুণাগুণকে ছাড়িয়ে যায়।

ইতিহাসের অনুগামী হয়েও কিমবা দৃষ্টিভঙ্গি আর উদ্ভাবনের মধ্যকার চির-পরিবর্তনশীল সম্পর্ককে বিবেচনাতে নিয়েও, স্থাপত্য শেষ পর্যন্ত একই সাথে সুযোগ (opportunity) এবং দায়িত্ব (responsibility)- দুইই। আমাদের নগরে অভিনব এবং অর্থপূর্ণ (meaningful) স্থান তৈরী করতে হ’লে, আমাদের শুধুমাত্র সাধারণ সামাজিক আর আধ্যাত্মিক প্রেরণা থাকলেই চলবে না, যে ঐতিহ্যের হাত ধ’রে আমাদের সমাজের এগিয়ে চলা, তার প্রতি অনুরাগও থাকতে হবে। আমাদের শহরগুলো প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের সকলেই পরিবর্তনশীল শহুরে প্রকরণের (আরবান প্যাটার্ন) অংশ। আর এই শহুরে প্রকরণ আমাদের কাজ-কারবার, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং ভ্রমণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। সে কারণেই স্থাপত্য এবং আরবান-ডিজাইনকে আমাদের যুগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সাথে মিলিয়ে নেওয়াটা এত প্রয়োজনীয়। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বঞ্চনার সমস্যার সাথে। অপর্যাপ্ত আবাসনব্যবস্থার সাথে। সার্বিক বিবেচনায় কমতে থাকা স্বাধীনতার সাথে। অতীতে শহর গ’ড়ে তোলা এতটা ঝঞ্ঝাটময় ছিল না কখনো। অথচ এখনকার রাজনৈতিক পরিমন্ডল এই ব্যাপারে একেবারেই সচেতন নয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, সবখানেই জনমানুষের মধ্যে এই ব্যাপারে অজ্ঞতা র’য়ে গেছে।

স্থপতি হিসেবে, শহরের অবহেলিত এবং নোংরা অঞ্চলগুলো নিয়ে কাজের চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব। এই অঞ্চলগুলোতে কাজ করার কোনো একটা উপায় আমাদের বের করতেই হবে। অঞ্চলগুলোকে আরো কর্ম-চঞ্চল এবং উন্নত করতে; এবং আরবান ফেব্রিকের ভেতরে আরো গতিশীলতা আনার জন্যে। আমার মনে হয়, আমরা বিভিন্ন ভাবেই এটা করতে পারি। সব পরিস্থিতিই আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে- সে আমরা প্যারিস, লস এঞ্জেলস বা নিউইয়র্ক, যেখানেই ভবন বানাই না কেন। লুই কান বলতেন, শহর হবে এমন যায়গা “যার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোনো একটা বাচ্চা কল্পনা ক’রে নিতে পারবে, ভবিষ্যতে সে কী হ’তে চায়”। আমার তো মনে হয়, এমন শহর গ’ড়ে তোলার কথাই আমাদের ভাবা উচিত। এমন একটা শহরের কথা ভাবুন তো- যেখানকার স্কুল, গ্রন্থাগার, হাসপাতাল, কর্মস্থল এবং বিনোদন আর সাংস্কৃতিক সুবিধাগুলোর সবকয়টি মানুষের জীবনবোধের সর্বোচ্চ অনুভূতি জাগাতে সক্ষম। কিন্তু তেমনটা হ’তে হ’লে, আমাদেরকে অবশ্যই- কানের ভাষ্য মতো সুযোগসুবিধাগুলো (availabilities) কে নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুরুতেই গ’ড়ে তুলতে হবে। শহর তো মিলিত হওয়ার জায়গা। মিলিত হওয়ার সুযোগ তৈরী করার জন্যই তার গুরুত্ব। to the degree that institutions remove themselves from the public, to the degree that they keep people at arm’s length and make themselves inaccessible, the very concept of the res publica dies.

আমাদের মিলিত হওয়ার জায়গাগুলো অবশ্যই এমন অনুপ্রেরণার অনুভূতি ধারণ করবে যা শহুরে (আরবান) ধারণার একবারে গভীরে প্রথিত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর শুধুমাত্র মানুষের কার্যক্রমের ব্যবস্থাই ক’রে দেবে না; মানবিক পদক্ষেপের চরিত্র নির্ধারণকারী কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থাও করবে। যার ফলে এই জায়গাগুলো আমাদের কাছে সহজেই অর্থপূর্ণ এবং আনন্দদায়ক (rewarding) হ’য়ে উঠবে। শহুরে জীবনযাত্রার সাথে প্রবেশগম্যতা (accessibility) এবং সুযোগ-সুবিধা (availability) অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রবেশগম্যতা আমাদের চিন্তাভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর ক’রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গ’ড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। স্থপতি হিসেবে এই ধরণের মূল্যবোধ তৈরীতে উৎসাহ যোগানো আমাদের কর্তব্য। শুরুতে সংযোগকারী স্থাপত্যের (architecture of connections) মাধ্যমে এমনটা করা যায়। যে স্থাপত্য আরবান প্লাজা, রাস্তা আর উদ্যানগুলোকে এক সুতায় গেথে ফেলে, যা কিনা এখনো আরবান ফেব্রিকের বড় অংশ গ’ড়ে তোলে।

সিভিক চিন্তা-ভাবনা গ’ড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব। আরবান পরিসর যতটুকু শেয়ারিঙের বাস্তবসম্মত ধারণা অনুমোদন করে, তা আমাদের এই ভাবনাতে থাকতে হবে। আমি দেখতে চাই, আমাদের পেশা দৃঢভাবে আরবান ফেব্রিকের প্রতি তার চিরায়ত উদ্বেগ/সম্বন্ধ (concern) কে পুনর্ব্যক্ত করুক। যে আরবান ফেব্রিক হবে সমবেত হওয়ার সুতিকাগার এবং জনমানুষের কর্মস্পৃহাতে যোগাবে পুষ্টি। শহুরে জীবনযাত্রার একটা প্রচলিত ধরণ আছে, কিন্তু তা সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার। আমাদের কোনো অবস্থাতেই ভুললে চলবে না যে, এই জীবনযাত্রার ধরণকে বোঝা এবং তাকে আরো উন্নত করে তোলাটা আমাদের উদ্দেশ্য। এমন না যে আমাদেরকে সবসময় শূণ্য থেকে শুরু করতে হবে। কখনো কখনো আমাদের জন্য বর্তমান ফেব্রিকের খানিকটা বদলে ফেলা, তাতে পরিবর্তন আনা কিমবা সেখানে কিছু পুনঃনির্মান করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিভিক পরিসর যুক্তিবোধ আর বাস্তবিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক অবস্থার সমন্বয়েই গড়ে তুলতে হবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s