তখন সূর্যাস্তে

১.
পানিটা শেষ ক’রে গ্লাসটা ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতে ইকবাল একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। বারটা সাইত্রিশ। ঝিনুকের এর ভেতরে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এখনো জেগে আছে। মেয়ের ঘর থেকে হাসাহাসির শব্দ আসছে। ইকবাল নন্দিনীর ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আর তখনই মুঠোফোন বেজে ওঠে। ধুর এত রাতে কে আবার! ইকবাল স্টাডি রুমে ফিরে আসে।

সিদ্দিক সাহেবের কল, ’কাল একবার বাসায় আসতে পারবে? তোমার মায়ের দাফন।’ ইকবালের যেন কী হয়। একটা কথাও বলতে পারে না। বেশ খানিকটা সময় পর শুধু বলতে পারে, কখন? সিদ্দিক সাহেব বলেন – আসরের পর। ‘না না বাবা, মা মারা গেছে কখন সেটা জিজ্ঞেস করছিলাম..’ ইকবাল সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে।

রাত আটটায়। এখন বাড়িতে আনলাম। একটু সময় নেন সিদ্দিক সাহেব, ঝিনুক আর দাদুকে নিয়ে এসো- তখন কথা হবে । এখন রাখি – এই বলে সিদ্দিক সাহেব রেখে দেন।

ইকবাল কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। নন্দিনীর ঘরের দরজায় গিয়ে যখন দাড়ায় তখন মা-মেয়ে দুই জনই চুপ। নন্দিনী হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। ঝিনুক খাট থেকে নামতে গিয়েই খেয়াল করে ইকবাল দাড়িয়ে আছে। ‘কি ঘুমালো?’

হ্যা, ঘুমিয়েছে। চলো, তোমার গলা শুনলে আবার না উঠে পড়ে।

ইকবাল তারপরও মেয়ের কাছে যায়। কপালে হাত বুলিয়ে দিতেই মেয়ে চোখ তুলে তাকায়। ঠিক যেন ওর মায়ের চোখ। ঝিনুক চেচিয়ে ওঠে- আমি পারব না বাবা, এবার তুমি ঘুম পাড়াও। আমি শুতে গেলাম। ঝিনুক উঠে গেলে ইকবাল কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। নন্দিনী ততক্ষণে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমিয়ে গেছে।

শোবার ঘরে আসতেই ঝিনুক জড়িয়ে ধরে ইকবালকে। ধরেই যেন টের পায় কিছু একটা, কিন্তু ঠিক ধরতে পারে না। ওর চোখে চোখ পড়তেই থমকে যায় ঝিনুক – কী হয়েছে তোমার? ঝিনুককে যেন আরো খানিকটা জড়িয়ে ধরে ইকবাল, আটটার সময় মা মারা গেছে ঝিনুক।

কিছুটা সময় দুজনই চুপচাপ দুজনকে ধরে থাকে। ইকবালের চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে ঝিনুকের কাধে। এই প্রথম ঝিনুক ইকবালকে কাঁদতে দেখল।

রাশিদার দ্বিতীয় সন্তান ইকবাল। মেয়ে লোপামুদ্রার থেকে ছেলের প্রতিই যেন ভালোবাসাটা বেশি। অন্তত লোপামুদ্রার তাই ধারণা। সুযোগ পেলে মাকে সেটা সে জানিয়েও দেয়। লোপামুদ্রা হয়তো কিছু একটা চেয়েছে। মাসের প্রায় শেষ। রাশিদার একটু গড়িমসি না করে উপায় নেই। অথচ নাছোড় মেয়ে তা বুঝতে চাই না। বলে বসে, ছেলে চাইলে তো ঠিকই সাথে সাথে কিনে দিতে। রাশিদা ধমক দিতে গিয়েও দেন না। সিদ্দিকের জন্য। ছেলে-মেয়েরা যত দুষ্টামিই করুক না কেন সিদ্দিক তাদেরকে বকাঝকা করতে দেন না। রাশিদা কোনো দিন কড়া করে কিছু বললেই হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s