যাপিত জীবন – ১৮

কোনো এক দূর দেশে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখা মানুষে ছেয়ে গেছে আমার চারপাশ। কোন সে দূর দেশ- তার উত্তর একেক জনের কাছে একেকটা। কারণও বহুবিধ। কারো পছন্দ শীতের দেশ। কারোবা পছন্দ এমন দেশ যেখানে ধুলো-বালি আর কাদার ছড়াছড়ি নেই। কেউ কেউ খোঁজে স্রেফ অপারটিউনিটি। এইখানে তাদের আর ভাল লাগে না। কিমবা এই জীবনে তারা সন্তুষ্ট নয়। সন্তুষ্টির জন্য যতটা সম্মৃদ্ধির দরকার তার ছিটেফোটাও এখানে জোগাড় করা যায় না ব’লে। তাই এই মানুষগুলো ছুটতে থাকে। আমি এক রকম বাধ্য হ’য়েই দেখতে থাকি তাদের অস্থির ছোটাছুটি।

আমার এক বন্ধুকে দেখেছি সরকারী চাকরীর জন্য হাপিত্যেস করতে। সেই বন্ধু প্রথম সুযোগেই ছাড়লেন দেশ। অবশ্য সরকারী চাকরীটা নাকি এখনো ছাড়েননি। বাংলাদেশে এই সব ব্যবস্থা করা নাকি কোনো ব্যাপারই না। তবুও দেশটা আমার বন্ধু আর বন্ধু পত্নীকে ধ’রে রাখতে পারলো না। সরকারী চাকরীটা থাকলে নাকি ভাল। না থাকলেও কিছু যায় আসে না। ছুটিতে দেশে বেড়াতে আসলে এমনটাই বলেন তিনি।

দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করেছি এমন এক কলিগ, হঠাৎ ক’রেই চ’লে গেলেন দক্ষিণ গোলার্ধে। নিজের ইচ্ছা আর ভাইয়ের সহায়তায়। খুবই ধার্মিক এই মানুষটির ব্যাপারে আমার কৌতুহল ছিলো বেশ। আমাদের ইদানিং কালের ডিজাইন দেখে মাঝেমাঝে তার আপত্তির কথা জানাতেন। আমাদের কাজে নাকি প্রাইভেসিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আমি সেটা অকপটে স্বীকার ক’রে নিতাম। ফ্লাট বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা যে আমরা সচেতন ভাবেই করি সেটা তাকে বলতাম। প্রাইভেসি ব’লতে আমাদের বিবেচনাতে ভিজ্যুয়াল প্রাইভেসি তার গুরুত্ব হারিয়েছে সাউন্ড প্রাইভেসির কাছে-এটা শুনে আশ্চর্য হয়েছিলেন। সেই কলিগকে দেশ ছাড়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার ছেলে যদি ভিন-দেশে বড় হ’য়ে তার ধর্মকে অস্বীকার করে সেটা মানতে পারবেন কিনা। তিনি কিছু বলেন নি।

তখন তাকে আমার বাবার এক পুরোনো কলিগের কথা বলেছিলাম। যিনি দেশ ছেড়েছিলেন আমার একেবারে ছেলেবেলায়। আমার বাবার মতে অনেকের থেকে প্রতিভাবান ছিলেন তিনি। সেই তিনিই কিনা প্রায় বিশ বছর পর দেশে ফিরে এলেন। কারণ তার ছোট মেয়েটা নাকি কোনো এক আফ্রিকান-এ্যামেরিকানের সাথে একসাথে থাকা শুরু করেছে। এটা শুনে আমার কলিগ যে খানিকটা চিন্তিত হয়েছিলেন সেটা বুঝেছিলাম। পরে, নাহ… আমার ছেলে এমন কিছু করবে না, এই ব’লে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

আবার কাউকে কাউকে দেখি দেশ ছাড়লেও দেশের মায়া ছাড়তে পারেন না। বিদেশে গিয়ে টাকা জমাতে থাকেন। দেশে দ্রুত ফেরার স্বপ্ন নিয়ে। এক বন্ধুর কথা শুনি, তিনি খুব দরকারী কিছু না হ’লে নাকি কিছু কেনেন না। কী হবে কিনে? কয়েক দিন পর তো দেশেই ফিরে যেতে হবে এই ভাবনাতে। যদিও দেশে ফেরা যে কঠিন সেটা বলতে ভোলেন না। এই মানুষগুলোই বোধহয় সব থেকে কষ্টে থাকেন। সন্তানের একটা নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাদেরকে আটকে রাখে । নিজেদের জীবন আর তাদের যাপন করা হ’য়ে ওঠে না। অথবা এমন জীবনই তারা চান। যে জীবনে নিরাপত্তার আশ্বাস আছে, আছে স্বচ্ছলতা আর দেশে ফিরতে না পারার আক্ষেপ।

আর এক দলকে দেখি যারা শুধু ঘুরছে। যতটা পারছে উপভোগ করছে। সমস্ত পৃথিবীটাই যেন তাদের কাছে দেশ। ঘুরছে, দেখছে, শিখছে। আশার কথা, দিন দিন যেন এই দলটা ভারী হচ্ছে। এর বিপরীত একটা দলের সাথেও আমি পরিচিত। তারা পালাতে চান। যে কোনো খানে। যত দ্রুত সম্ভব। এরাও ঘুরছে। তবে উপভোগ করছে কিনা বুঝে উঠতে পারি না।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s