যাপিত জীবন – ১৯

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। সেই কথাটাকে আরো একটু বাড়িয়ে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন – কিন্তু বাঙালির উপর বিশ্বাস রাখা ভয়াবহ। এমতাস্থায় অন্য কোনো জাতির মানুষের উপর বিশ্বাস রাখার পরিণতি কি হতে পারে তাই ভাবি। অন্য জাতির মানুষেরা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য? ইউরোপিয়রা? যারা নাকি দীর্ঘ সময় ধ’রে পৃথিবীটাকে শাসন করেছে। শাসনের নামে অগণিত মানুষ হত্যা করেছে। হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। মানুষের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি করেছে। কাউকে বলেছে নিগ্রো। কাউকে বা বলেছে ইন্ডিয়ান। আফ্রিকান… যদিও আসলে প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ লুন্ঠন আর নিজেদের আরাম-আয়েস নিশ্চিত করা। নিশ্চিত করা নিজেদের ভবিষ্যৎকে। সেই ইউরোপিয়দের উপর বিশ্বাস রাখা কি ঠিক হবে? ররীন্দ্রনাথ এ ব্যাপারে কিছু ব’লে গেছেন কিনা জানি না। তবে কখনো তাদের উপর বিশ্বাস রেখে তাদের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধী গ্রহণ করেন। আবার কখনো বিশ্বাস হারিয়ে তা বর্জনও করেন।

নিজেদের সুবিধা নিশ্চিতকল্পে ইউরোপিয়রা যে ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলে সেই ব্যবস্থাই বহাল রাখেন নেহেরু, জিন্নাহ, ম্যান্ডেলারা। মুজিবও তাই করেন। গান্ধিও শেষপর্যন্ত একজন আস্থাবান হিন্দু। নেহেরুর ধর্মে তেমন একটা আস্থা ছিল না বলেই ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ বইটাতে লিখেছেন। কিন্তু ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ব্যবস্থা আর আর্য শাস্ত্রের সংস্কার থেকে কি খুব বেশি বেরুতে পেরেছেন? ম্যান্ডেলা একজন ক্যাথলিক খ্রিস্টান। খ্রিস্টীয় পুজিতন্ত্রেই আস্থা রাখেন শেষ পর্যন্ত। আর মুজিব আস্থা রাখেন মুসলমানিত্বে। এই সব মানুষেরা কতটুকু আস্থা রেখেছিলেন মানুষের উপর- জানি না। তবে ব্যবস্থার উপর যে আস্থা রেখেছিলেন সেটা নিশ্চিত। আবার ব্যবস্থা থেকে প্রতারিতও হয়েছেন। তাই প্রতিবাদ করেছেন। পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন ব্যবস্থাতে। কতটা পেরেছেন সেটা অন্য প্রশ্ন।

এদিকে আমার এক সহকর্মীর অগাধ বিশ্বাস তার স্ত্রীর উপর। বিয়ের আগে তারা তিন মাস লিভ-টুগেদার করেছেন। তার আগে বারো বছর ধ’রে করেছেন প্রেম। সহকর্মী দাবি করেন তিনি তার স্ত্রীর সবকিছু জানেন। আবার তার স্ত্রীও নাকি তার সবকিছু জানেন। তারা নাকি আগে থেকেই বুঝে যেতে পারেন পরস্পরের পরবর্তী ক্রিয়াকান্ড। আমি সন্দেহ প্রকাশ করেছি স্বাভাবিক ভাবেই। তিনি দাবি করেছেন, বিশ্বাস ছিলো ব’লেই বারো বছর প্রেম করতে পেরেছেন। বিশ্বাস ছিলো ব’লেই বিয়ের আগে লিভ-টুগেদার করেছেন। আমি প্রশ্ন করেছিলাম লিভ-টুগেদার করার সময় তাদের বিয়ে করার দরকার পড়ল কেন? তাদের লিভ-টুগেদারে কি সমাজ আপত্তি জানিয়েছিল? তিনি বলেন সমাজ বা তার পরিবার নাকি কিছু বলেনি। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনা। জিজ্ঞেস করা সোভন হবে না ভেবে। তবু ভাবনা আসে – তারপরও তারা বিয়ে করলেন কেন? তাদের কারো ভেতরে কি বিশ্বাস কমতে শুরু করেছিল? নাকি ব্যক্তি-মানুষের থেকে সমাজের উপর বা ব্যবস্থার উপর মানুষের বিশ্বাসটা ভিত্তি পায় বেশি?

এক সময়ের দস্যু-দেশ জাপান রাতারাতি তাদের চরিত্র পালটে ফেলে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষেরা তা বিশ্বাসও ক’রে বসে। ভুলে যেতে চায় অতীত। কেন মানুষ এতটা বিস্মৃতিপ্রবণ? কেন মানুষ এতটা বিশ্বাসপ্রবণ? বিশ্বাসে বস্তু, ঋণ, সহযোগীতা, প্রযুক্তি – এইসব পাওয়া যায় ব’লে? কিন্তু এই মানুষেরা কি আসলেই পালটে যায়? এই সব মানুষের হাজার হাজার বছরের পুরনো চরিত্র কি আবার ফিরে আসতে পারে? ভাবতে ভয় হয়। যদিও জানি মানুষের থেকে স্বজাতি হত্যায় পারঙ্গম আর কোনো প্রাণীর নাম খুঁজে পাওয়া ভার। আবার সেই মানুষেই বিশ্বাস রাখার সবক সবখানে।

নাকি এই মানুষেরা অন্য মানুষ? যে মানুষে বিশ্বাস রাখা যায়? প্রাণী মানুষ থেকে এই মানুষদেরকে আলাদা করার উপায় কি?

আমার পিতা কখনোই ব্যবসায়ীদের উপর বিশ্বাস রাখেন না। বা রাখতে পারেন না। অনেকবার প্রতারিত হওয়ার দরুনই বোধহয়। আমাকেও তাই পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীদের উপর আস্থা না রাখার জন্য। সেই পিতাকে যখন প্রশ্ন রাখি, ব্যবসায়ী মোহাম্মদের উপর বিশ্বাস রাখা নিয়ে- তখন তেড়ে আসেন। আমিও পালিয়ে বাঁচি। শেষ পর্যন্ত বণিকের উপর আস্থা রাখা আর হয় না। যেমন হয়না ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির উপর আস্থা রাখা। মেনে নেই রাষ্ট্রনীতিকদের উপপাদ্য – বণিকের শাসনই সব থেকে ভয়াবহ। এই বণিকদের থেকে কেমন ক’রে আলাদা করি মানুষদেরকে? কেমন ক’রে?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s