কিছুটাতো চাই …

১.
রাত অনেক হয়েছে। অথচ জীবনের ঘুম আসছে না। এমন হলে জীবন সাধারণত কবিতার বই টেনে নেয়। খানিকটা পড়ে। আবার পড়ে না। কয়েক পাতা উলটে আবার খানিকটা পড়ে। ভাল লাগলে কোন লাইন হয়তো আর একবার পড়ে। এই করতে করতেই রুদ্রর কয়েকটা লাইনে হঠাৎ করে আটকে যায় জীবন –

 … প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা-
এই খেলা আর কতকাল আর কতটা জীবন !
কিছুটাতো চাই – হোক ভুলহোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই,
কিছুটাতো চাইকিছুটাতো চাই…

জীবনের অনেক পাওনা বাকি। আবার জীবনের কাছেও অনেকের পাওনা আছে। অনেক লেনাদেনার হিসেব বাকি। সে হিসেব হয়তো কোনদিনই মিলবে না। তাই নিয়ে জীবন খুব একটা ভাবে না। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ভাবতে ভালওবাসে। সে ভাবনায় কোন হিসেবের গরমিল থাকে না। প্রাপ্তির অনটন থাকে না। থাকে শুধু চাওয়া। অথচ আজ রাতে জীবন থমকে যায়। ওর যেন কোনো চাওয়া নেই। ঠিক যেমন ওর চোখে আজ ঘুম নেই…

সকাল বেলা রাতের এই সব ঘটনা আর মনে থাকে না। অথবা মনে থাকে। আর থাকে বলেই পরবর্তী কোন রাতে হয়তো আবার তারা ফিরে আসে। এমন হ’লে জীবন কখনো কখনো তার কোনো ঘনিষ্ট বন্ধুকে ফোন করে। পুরোনো কোন বন্ধু। যার সাথে অনেক দিন কোনো যোগাযোগ নেই। হয়তো গহনের কথা মনে পড়ে। কিন্তু ফোন দেয় সুমনকে। কারণ গহনের ফোন নাম্বার আজ আর ওর কাছে নেই। সুমন এত রাতে ফোন পেয়ে বিরক্ত হয়।

হ্যাঁ বল, কি হইছে?” “>সুমনের কন্ঠে ঘুমের জড়তা। ” না এমনিই..” জীবন খানিকটা ভয়ে ভয়ে বলে, ”তুই ঘুমাইতেছিস, ঘুমা… পরে বলব..”

“শালার চোৎমারানী, রাইত দুপুরে ফোন দিয়া ছিনালী ! যত্তসব… ” গজগজ করতে করতে ফোন রেখে দেয় সুমন। জয়িতার ঘুমও ভেঙে যায়, “কে? এত রাতে?.. “কিছু না- জীবন। তুমি ঘুমাও।” সুমনের কথায় জয়িতা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সুমনও।

পরদিন বিকালে চায়ের দোকানে যখন সুমনের সাথে জীবনের দেখা হয় তখন আর এই নিয়ে কোনো কথা হয়না ওদের মধ্যে। অথবা কিইবা বলার থাকবে ওদের? জীবন জানে সুমন এমনই। সুমন জানে জীবনের মেয়েটা মরে যাওয়ার পর থেকে জীবন পালটে যাচ্ছে। আবার ওকে দেখে রাখতে পারতো যে লোপা সেও নেই। অনেকটা যেন থেকেও নেই।

২.

রনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকে। আজ শফিক স্যার একেবারে খেয়ে ফেলবে। একে বাসা থেকে বের হতে দেরী হয়ে গেছে। তার উপর বাসের দেখা নেই। নয়টা বাজতে আর মাত্র আঠারো মিনিট বাকি। পল্টন যেতে কম করে হলেও চল্লিশ মিনিট লাগবে। রনি রিকশা খুঁজতে থাকে। ভেঙে ভেঙে যদি যাওয়া যায়। একটা রিকশা পেয়েও যায় রনি। চৌধুরী পাড়া ক্রস করতেই শফিক স্যারের ফোন। রনি চমকে ওঠে। খানিকটা ভয়ে। খানিকটা অনিশ্চয়তায়। ফোন ধরতেই, ”রনি, তুমি তাড়াতাড়ি টঙ্গী চলে যাও তো। ঢাকা ডাইং এর আজিজ সাহেবের সাথে দেখা করে আমাকে একটা ফোন দিও। আমাদের রঙের স্যাম্পলটা ওকে করেছেন আজিজ সাহেব।” “ঠিক আছে স্যার আমি এখনই যাচ্ছি।” রনির কণ্ঠে বাড়তি তৎপরতা। তাড়াতাড়ি রিকশা ঘুরিয়ে দেয় মহাখালির দিকে। যে ভাগ্যকে রনি সব সময় গাল দিয়ে এসেছে তাকেই আজ কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকে।

ঢাকা ডাইং এর মতো পুরোনো কারখানাতে ঢুকতে পারা সহজ কথা নয়। রাতুলের সাথে রনির সেদিন দেখা না হলে হয়তো এই সুযোগটা পাওয়াই হতো না। রাতুল, রনি, জিকো, মুরাদ আর বাবলা ছিল স্কুলের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক মুরাদ ছাড়া আর কারো সাথে রনির অনেকদিন কোন যোগাযোগ নেই। মুরাদের সাথে কি রাতুলের যোগাযোগ আছে? রাতুলের সাথে সেদিন যে সামান্য সুযোগ হয়েছিল তাতে সে কথা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। বরং রাতুলই জিজ্ঞেস করছিল বিভিন্ন কিছু। কি করছিস? কোথায় আছিস? এই সব। রাস্তায় দাড়িয়ে আর কত কথা বলা যায়? রাতুল তাই ওর ফোন নাম্বার নিয়ে -পরে কথা হবে, আজ আসি রে দোস্ত, বলে মোটর সাইকেল বাড়িয়ে দিল।

সেদিন রাতেই রাতুল ফোন দিয়েছিল রনিকে। তখনই নানা কথায় রাতুল জানতে পারে সুইস কালারের কথা। এই রঙের ব্যবসা প্রতিষ্ঠাণে চাকরী করে রনি। দুই বছরের বেশি হতে চলল। কাজের চাপটা একটু বেশি হলেও স্যালারীটা ভাল দেন শফিক আহমেদ। তবে কাজে গাফিলতি হলে কথা শোনাতে কম যাননা এই দক্ষ রং ব্যবসায়ী। সেলস ম্যানেজারদের কেউ যদি নিজে থেকে কোন চালানের যোগাযোগ করে দিতে পারে তাকে বাড়তি কমিশনও দেন শফিক আহমেদ। রনি দেখে শফিক সাহেবের নাম রাতুলের জানা। তবে তার সাথে রাতুলের পরিচয় নেই। রাতুলই দুই দিন পরে রনিকে আজিজ সাহেবের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। অর্ডারটা যে হয়ে যাবে রনি এতটা আশা করেনি। যদিও অর্ডারের পরিমাণটা যে কত সেটা রনি জানে না এখনো।

এদিকে রিকশা মহাখালি এসে পৌছে। রনি গাজিপুরের একটা বাসে চড়ে বসে।

৩.

অবসরে যাওয়ার পর থেকে ইদ্রিস ভুইয়ার স্বভাবটা কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। ইদ্রিস সাহেবের স্ত্রী সুরাইয়া আখতার রাখি ঠিক ধরতে পারেন না। আবার কখনো যেন পারেন। কখনো মনে হয় ইদ্রিস যেন একটু বেশি কথা বলছেন। কখনো মনে হয় অতিরিক্ত চুপচাপ। রাখি ঠিক করেন, আজ অফিস থেকে ফিরে মিম আর পিয়ালের সাথে এই নিয়ে কথা বলবেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s