যাপিত জীবন – ২২

কয়েকদিন আগে আমার এক বন্ধু ওর নিজের মতো হ’তে না পারার জন্য আক্ষেপ করছিলেন। খানিকটা বোধহয় হতাশ হ’য়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হচ্ছিলেন। বলছিলেন জড়িয়ে যাওয়ার কথা, তলিয়ে যাওয়ার কথা। যেমনটা আমরা প্রায় সবাই-ই যাচ্ছি। কিন্তু তা নিয়ে আমাদের তেমন একটা শঙ্কা নেই। যেমনটা আছে আমার ঐ বন্ধুর। কেন আছে- কে জানে? রবীন্দ্রনাথ কি জানতেন? যদি না জানতেন তাহলে এই কথাগুলো লিখলেন কেন ?

এ কী কৌতুক নিত্য-নূতন
ওগো কৌতুকময়ী!
যে দিকে পান্থ চাহে চলিবারে
চলিতে দিতেছ কই?
গ্রামের যে পথ ধায় গৃহপানে,
চাষিগণ ফিরে দিবা-অবসানে,
গোঠে ধায় গোরুবধু জল আনে 
শতবার যাতায়াতে-
একদা প্রথম প্রভাতবেলায়
সে পথে বাহির হইনু হেলায়,
মনে ছিল দিন কাজে ও খেলায়
কাটায়ে ফিরিব রাতে।
পদে পদে তুমি ভুলাইলে দিক,
কোথা যাব আজি নাহি পাই ঠিক,
ক্লান্তহৃদয় ভ্রান্ত পথিক
এসেছি নূতন দেশে।
কখনো উদার গিরির শিখরে
কভু বেদনার তমোগহ্বরে
চিনি না যে পথ সে পথের ‘পরে
চলেছি পাগলবেশে।”

কি জানি রবীন্দ্রনাথও হারিয়ে যাওয়ার ভয় পেয়েছিলেন কিনা। তবে কোনো কৌতুকময়ী যে পথ ভোলানোর তালে আছে সেটা ঠিক বুঝেছিলেন। সে কৌতুক যে নিত্য নতুন তাও আমাদের জানিয়ে গেছেন। আর তাই যে কৌতুকে রবীন্দ্রনাথ পদে পদে দিক ভুলেছিলেন, সেই কৌতুকে আমরা হয়তো নাও ভুলতে পারি। আবার ভুলতেও পারি। বরং ভোলাটাই স্বাভাবিক। আমাদের হারিয়ে যাওয়াটা তাই যেন এক-রকম অনিবার্য। কিংবা তাও নয়। যার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই সে হারিয়ে যাবে কোথায় ?

কাফকা বলেছিলেন, স্বাধীন হওয়ার কারণে তিনি হারিয়ে গেছেন। স্বাধীন হওয়ার পরিণতিতে এই যে হারিয়ে যাওয়া, কেমন সে হারিয়ে যাওয়া? তখনো কি কোনো অচেনা পথে পাগলবেশে ঘুরে ফিরতে হয়? নাকি পাগলেরাই শুধু ঘুরেফেরে? নাকি ঘুরতে ঘুরতেই মানুষ পাগল হয়? পাগল হ’য়ে যাওয়া কি এক ধরণের হারিয়ে যাওয়া নয়? মানুষ কি শেষ পর্যন্ত হারাতে পারে? মনে পড়ে, শহীদুল জহিরের কথা। যিনি লিখেছিলেন, “মানুষ কি কখনো পাগল হয়, অথবা পাগল না হ’য়ে কি মানুষ পারে?” মানুষকে পাগল হতেই হয়। অন্তত কখনো কখনো তো বটেই। তখন তাকে ঘুরতে হয় যত অচেনা পথে। মিলতে হয়, মিলাতে হয় নিজেকে অজানার সাথে। পরিণতিতে নিজেকে হারাতে হয়। যে কারণে আমরা, আমার বন্ধু সবাই হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজেদেরকে।

কিন্তু কতটা অনিবার্য এই হারিয়ে যাওয়া? অন্তত যখন আমরা প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু গ্রহণ করছি আমাদের চারপাশ থেকে। রাস্তা থেকে। দোকান থেকে। টেলিভিশন থেকে। ইউ-টিউব থেকে। সোশাল-মিড়িয়া থেকে। বন্ধুর কাছ থেকে। খবর থেকে। প্রপাগান্ডা থেকে। সাহিত্য থেকে। চুটকি থেকে। বিজ্ঞাপন থেকে। সম্ভব প্রায় সব কিছু থেকে। তাতে যতটা ঋদ্ধ হচ্ছি তার থেকে অনেক বেশি হচ্ছি প্রভাবিত। এদের দূরপণেয় প্রভাব আমাদেরকে যেন ক’রে তুলছে অন্য কেউ। তাতে আমাদের সমর্থনও থাকছে। আমরা ভাবছি এভাবেই সুখি হ’তে হয়। তাই দৌড়ে মরছি। ক্লান্ত হচ্ছি। তাই হয়তো একটু বিশ্রাম দরকার। দরকার নিজেকে, নিজের ভাবনাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটু অবসর। কারণ এই ভাবনাগুলোই যে আমাকে/আমাদেরকে একক ক’রে তোলে। ভাবনা আছে তো আমি আছি। ভাবনা নেই তো আমি নেই।

আবারো সেই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই ধার ক’রতে হচ্ছে।  ব’লতে হচ্ছে…

এ কী কৌতুক নিত্যনূতন
ওগো কৌতুকময়ী!
আমি যাহা-কিছু চাহি বলিবারে
বলিতে দিতেছ কই।
অন্তরমাঝে বসি অহরহ
মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,
মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ
মিশায়ে আপন সুরে।
কি বলিতে চাই সব ভুলে যাই,
তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,
সংগীতস্রোতে কূল নাহি পাই-
কোথা ভেসে যাই দূরে।”

রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে কি কম পাল্টে দিয়েছেন? বা দিচ্ছেন? আমার তো মনে হয়, যে একক লোকটা আমাদের/আমার গ’ড়ে ওঠাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু তার প্রভাব/লেখা যতটা পাল্টে দিয়েছে আমাদেরকে তার থেকে অনেক বেশি দিয়েছে/দেয় অনুপ্রেরণা- নিজেকে আবিস্কারের। যে অবিস্কারের পথ কখনো হয় না শেষ। প্রতিনিয়ত প্রভাবিত হওয়ার হাত থেকেও তাই আমাদের মুক্তি নেই। আমাদের গ’ড়ে ওঠা, হারিয়ে যাওয়া, নিজেকে হারিয়ে খোঁজা তাই চলতেই থাকে…

One thought on “যাপিত জীবন – ২২”

  1. শব্দের গাঁথুনিতে কিছু অনুচ্চারিত কথা থেকে যায়,সেগুলা পড়ে ফেলায় আপ্লুত, আর রবি বুড়ো সত্যইই মনকে অনেক সহজ করে আনেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s