প্রবচন – ১৮

১.
আমি বলি আমার বাঙালিত্বে কোন ভেজাল নেই। কারণ আমি জানি বাঙালির রক্ত, তার সংস্কৃতি অসংখ্য ভেজালে ভরা। অগণন মিলেমিশেই বাঙালির গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা। তাই সে পুরোনো যত কিছুই ধারণ করুক না কেন, নতুন কিছু আত্মীকরণে পিছপা হয় না কখনোই। ভেজাল আছে ব’লেই বাঙালিত্ব গতিশীল। ভেজাল আছে বলেই বাঙালি এতটা ঋদ্ধ। ভেজালের ফলতই এখানে এত দ্বন্দ্ব, সংঘাত, টানাপোড়েন, মতামতের বাহুল্য। যার বাঙালিত্বে ভেজাল আছে সে এসব ধারণ করবে কি করে? বৈচিত্র ধারণের আকাঙ্ক্ষাই বাঙালিত্বের মূল শর্ত।

২.
১৪০০/১৫০০ বর্গফুটের একটা একতলা পাকা বাড়ি ৬ মাসে বানাতে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের একটা তালিকা –
রাজমিস্ত্রী – ১২ জন (৫মাস)
রডের মিস্ত্রী – ৪ জন (১৫ দিন)
প্লাম্বিং মিস্ত্রী – ২জন (৭ দিন)
ইলেকট্রিক মিস্ত্রী – ৩ জন (৭ দিন)
কাঠ মিস্ত্রী – ৩ জন (১ মাস)
রং মিস্ত্রী – ৪ জন (৭ দিন) অন্যান্য সাহয্যকারী – ৩জন (৭ দিন)

এর সাথে পরিকল্পনাতে জড়িত স্থপতি, প্রকৌশলীদেরকে আপাতত বিবেচনাতে রাখছি না। ২০১৬ সালের আর্থিক মানদণ্ডে এটি বানাতে ন্যুনতম ২০ লক্ষ টাকার মত দরকার পড়ে। এর সাথে জমির দামও আমি আপাতত বিবেচনাতে নিচ্ছি না। হিসেবের সুবিধা বা বোঝার সুবিধার জন্য এই ২০ লক্ষ টাকাকেই প্রামাণ্য হিসেবে রাখছি। এই এক তলা বাড়িটির যিনি মালিক হবেন তিনি ঠিক কত মাসে এই পরিমাণ টাকা আয় করেছেন বা জোগাড় করেছেন বা সঞ্চয় করেছেন সেটাও বিবেচনা করছি না। আমি বিবেচনাতে আনছি শুধু মাত্র এই বাড়িটি বানাতে যে শ্রমিকেরা কাজ করেছে তাদের কর্মঘণ্টা আর পারিশ্রমিককে।

একজন রাজমিস্ত্রীকে আমরা দিনে ৪০০ টাকা করে দিলে (মাসে ২২ দি কাজ ধরে) তার মাসে আয় হবে ৮৮০০ টাকা। এর অর্ধেক যদি সে সঞ্চয় করতে পারে তাহলে মাস শেষে তার হাতে থাকবে ৪৪০০ টাকা। ২০ লক্ষ টাকা তার সঞ্চয় করতে সময় লাগবে ৪৫৪.৫৪ মাস বা ৩৭.৮৭ বছর।

নির্মাণ কাজে যুক্ত অন্যান্য শ্রমিকের আয় দিনে ঐ ৪০০ টাকার কাছাকাছিই। অনেকের আবার এর থেকেও কম। ১৮ বছর বয়সে যদি কেউ শ্রমিকের কাজ শুরু করে (যা প্রায় অসম্ভব) তাহলে তার পক্ষে মোটামুটি ৫৬ বছর বয়সে গিয়ে এমন একটা বাড়ি বানানো সম্ভব হবে। এটা অবশ্যই একটা অনৈতিক পরিস্থিতি। তার উপর বাসস্থানকে যদি আমরা মৌলিক অধিকার ব’লে মনে করি তাহলে তো বটেই।

আমরা যারা বিল্ডিঙের মালিক হচ্ছি তারা অবশ্যই এই শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করছি। বাজার অর্থনীতি বা অন্য যে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে আমরা শ্রমের মূল্য নির্ধরণের যে কথা বলছি তা এক ধরণের প্রতারণার কৌশল মাত্র।

৩.
৬ মাসের ভেতরে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকার কাগুজে আবাসিক ভবন থেকে অন্যান্য ব্যবহার দূর করার যে কথা সরকার বলছে তা কার্যকর করা বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তব কারণেই সম্ভব হবে না। প্রথম কারণ, অন্যান্য ব্যবহারকে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে- এমন ভবনের অভাব। যা প্রকারান্তরে আমাদের দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনাহীনতাকেই সামনে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় কারণ, দীর্ঘদিন ধ’রে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা ভাল বা খারাপ যা-ই হোক, একটা কর্যকারীতা আছে। আছে প্রয়োজনীয়তাও। তাকে এত অল্প সময়ে মুখের কথাতেই পরিবর্তন করা যায় না। তবু সরকার এটা করার কথা বলছে কেন, সেটা একটা ভাবনার বিষয় হতে পারে। নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থতা যার পরিণতি তার পেছনে কেন এত কালক্ষেপণ, এত শ্রম-নিয়োগ? কাগজে-কলমের আবাসিক এলাকাকে পুরোপুরি আবাসিক এলাকাতে পরিণত করা-ই এর গূঢ় উদ্দেশ্য নয়।

৪.
প্রচলিত অধিকাংশ বিধি জন-মানুষের বোধগম্য উপকার দেয় না বলেই মানুষ বারংবার বিধি লঙ্ঘন করে। অথবা লঙ্ঘন করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের খুব কম বিধিতেই সত্যিকারের ন্যায্যতা আছে। আছে সমতার বিধান। অনেক বিধি-ই তৈরী করা হয়েছে অগ্র-পশ্চাত বিবেচনা না করেই, যেগুলো মানলে বরং ক্ষতির পরিমাণই বাড়ে।ব্যক্তি মানুষ এবং রাষ্ট্র উভয়েরই। এত বেশি সংখ্যক মানুষ তাই বিধি ভাঙে যে তাকে আর বিচারের আওতায় আনা যায় না। (উদাহরণ স্বরূপ রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা কিমবা আয়কর বিধিমালার কথা বলা যায়। যদিও এ দুটো আসলে ত্রুটিপূর্ণ এবং সৎ-উদ্দেশ্যহীন অসংখ্য বিধির সামান্য অংশ মাত্র) ফলত রাষ্ট্রের উপর মানুষ আস্থা হারায় আর মানুষের উপর রাষ্ট্র হারায় তার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ পুরো হারিয়ে ফেলেছে- এটা প্রকাশ হয়ে গেলে আর রাষ্ট্রের অস্তিত্বই থাকে না। তখন রাষ্ট্রকে অস্তিত্ব রক্ষার নামে নেমে পড়তে হয় অবদমনের কাজে। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় রাষ্ট্র-গঠনে মূখ্য ভূমিকা নেয়া সাধারণ মানুষেরাই।

One thought on “প্রবচন – ১৮”

  1. পেস্টটি এপ্রিল ২৯, ২০১৬ এ লেখা… বিভিন্ন পোস্ট একটু গোছাতে গিয়ে এটা মুছে ফেলেছিলাম ভুলে… তাই রিপোস্ট করলাম… তবে তারিখটা আগের মত করতে পারলাম না… তবে চেষ্টা করছি…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s