প্রবচন – ২০

১.

লেখকরা যে সবসময় নতুন কিছু লেখেন তা নয়। শেক্সপিয়রের লেখাতে মৌলিক প্লট কোনো বিচারেই দেড়খানার বেশি নয় ব’লে বলা হয়। তারপরও শেক্সপিয়র গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি প্রচলিত প্লটগুলোকে নিজের মতো ক’রে, নিজের সময়ের মতো ক’রে লিখতে পেরেছিলেন। এই নিজের মতো ক’রে বলতে পারা এই সময়ের লেখক চাই। যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে পুরোনো লেখকদের লেখা পড়েই সময় পার করতে হবে এই সময়ের পাঠকদেরকে। তাতে পাঠকেরা নিশ্চিতভাবেই নিজেদের সময়ের সংকটকে পুরোপুরি জানতে পারবেন না। ফলে হতাশায় ভুগবেন।

যে সময়ে বা যে অঞ্চলে ভাল লেখক তৈরী হয়না তা পরিণামে গুরুত্ব হারায়।

২.

আকাঙ্ক্ষা ভাল না মন্দ – সেটা কোন কার্যকর প্রশ্ন নয়। সঠিক প্রশ্ন হলো, মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাকে কোথায় নিয়ে যায় বা যেতে পারে।

৩.

বাংলাদেশের ডিভেলপমেন্ট এবং তার গতিপ্রকৃতি অনেকটাই রাজনীতি নির্ভর। কোথায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় হবে, কোথায় একটা মেডিকেল কলেজ হবে, কোথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট বসবে, বা নতুন একটা সেনাকুঞ্জ হবে তার সিদ্ধান্ত রাজনীতিকরাই নেন বা তাদেরকেই নিতে হয়। তারা সেসব সিদ্ধান্ত সব সময় যে কোনো সম্ভাব্যতা যাচায়ের পর নেন তা নয়। হয়তো এমন যাচাই করার মতো শিক্ষা-দিক্ষা আমাদের এখনো হয়নি। কিংবা হয়তো আমাদের প্রধান রাজনীতিকরা অন্যের উপর আস্থা রাখতে পারেন না। যে কারণেই হোক না কেন, এই প্রতিষ্ঠাণগুলো যে যথেষ্ট চিন্তা ক’রে গড়ে তোলা হচ্ছে না সেটা তাদের অবস্থানগুলো একবার ম্যাপে বসিয়ে দেখলেই টের পাওয়া যায়। পরিণামে তাদের কাছ থেকে যতটা পাওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়, তারা দিতে পারে তার খুব কমই।

আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লোকেশন আর প্ল্যান দেখতে বসেছিলাম। গুগোল-ম্যাপে। কিছু কিছু ছবিও দেখলাম। প্ল্যানগুলোর ভেতর কোন প্যাটার্ন নেই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অবশ্য সবগুলোকেই গ’ড়ে তোলা হয়েছে শহরের বেশ বাইরে। সে যেমন অর্থনৈতিক কারণে, তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের রাজনীতিকদের ভীতির কারণেও। বছরের পর বছর ধ’রে এইসব বিচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকে যারা বের হচ্ছে তাদের একটা বড় অংশ যে দেশের মূলধারাতে আর মিলতে পারছে না তা আর বিচিত্র কি? যারা পারে তারা ব্যতিক্রম। তাদের সংখ্যাও তাই নিতান্ত নগণ্য।

সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের বেশির ভাগই তাই মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেকেই তাই পালিয়ে যান দেশ থেকে। যারা পালাতে পারেন না তাদের বেশির ভাগই নিজের সাথে, সমাজের সাথে যুধতে যুধতে হ’য়ে ওঠেন সমাজের জন্য সব থেকে ক্ষতিকর মানুষ। আমাদের দেশের সবচেয়ে স্টার ঘুষখোর মানুষগুলোর বেশির ভাগই যে এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ছিলেন তা আমরা জানি। ব্যাপারটার সাথে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এবং এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপর তাদের ডিজাইনের প্রভার নিয়ে পর্যালোচনা করার সময় এসেছে বলে মনে করি।

৪.

ভারতীয়রা/ভারতীয়-বাঙালিরা যেভাবে পদ্মা, তিস্তা বা অন্য নদীগুলোর পানি সরিয়ে নিয়ে নিজেদের ছোট নদীগুলোকে বড় নদী করতে চাচ্ছেন তা কতটা সফল হবে জানি না। কিন্তু বাংলাদেশের নাব্য নদীগুলো যে ওনাদের ভাল লেগেছে তা বুঝতে কষ্ট হয় না। একটা জায়গায় থেকে সে জায়গাকে পাল্টে ফেলার- মানুষের এই চাওয়াটা অদ্ভুত। কোনো জায়গার চরিত্র বদলে গেলে সে জায়গার মানুষেরাও যে বদলে যায়, তা কে না জানে। পদ্মার পানি শুকিয়ে গেলে যেমন পদ্মা-পাড়ের মানুষগুলো বদলে যাবে/যাচ্ছে, হুগলির পানি বাড়লে তার পাড়ের মানুষগুলোও যাবে বদলে। শেষ পর্যন্ত তারা কি পদ্মা পাড়ের মানুষের মতো হয়ে উঠবে? উঠলেই বা সে কত দিনে?

কিন্তু এই যে এক স্থানের মানুষের অন্য স্থানের মানুষের মতো হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা তা নতুন কিছু হয়তো নয়। হাজার হাজার বছর ধ’রে মানুষের মাইগ্রেশনের পেছনে সারভাইভালের সাথে সাথে এই অন্য রকম বা অন্যের মতো হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাও কার্যকর ছিলো বোধকরি। আজকের দিনের মানুষের পক্ষে অতটা স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ নেই ব’লে তারা আগে পাল্টাতে চায় প্রকৃতিকে।

ভারতীয়-বাঙালিরা তাদের পূর্বপাশে বাস করা মানুষদের মতো হয়ে ওঠার এই চেষ্টাটা কত দিন ধ’রে ক’রে যাবে, কে জানে!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s