ত্বকের দর্শন ইন্দ্রিয় – ১

(যোহানি পালাসমা এর ‘eyes of the skin’ এর অনুবাদ প্রচেষ্টা: পর্ব – ১)
_________________________________________________

‘হাতগুলো দেখতে চায়, আর চোখগুলো চায় আলিঙ্গন করতে।’
-জোহান উল্পগ্যাং ভন গেটে

‘পায়ের পাতাতে থাকে নৃত্যশিল্পীর কান।’
-ফ্রেডরিক নিটসে

‘শরীরকে বোঝা যদি আরো সহজতর হ’তো, তবে আমাদের যে মনন আছে তার কথা হয়তো কেউ ভাবতো না।’
– রিচার্ড রর্টি

‘প্যালেটের (palate) সাথে আপেলের সংযুক্তির উপরই নির্ভর করে আপেলের স্বাদ, শুধুমাত্র ফলের উপর নয়। একই ভাবে, কাব্যিকতা নির্ভর করে কবিতা আর পাঠকের বৈঠকের ভেতর, বইয়ের পাতায় মুদ্রিত শব্দ দিয়ে গড়া বাক্যের ভেতরে নয়। পঠনের সাথে যে উত্তেজনা, যে প্রায় শারীরিক একটা আবেগ আমাদেরকে আচ্ছন্ন ক’রে সেই নান্দনিক কার্যক্রমটার উপস্থিতি থাকতেই হবে।
-জর্জ লুই বোরেস

‘জগতের মুখোমুখি দাড়ানোর অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন চিত্রশিল্পী কি কোনো কিছু প্রকাশ ক’রতে পারতো?’
-মৌরিস মার্লিউ-পন্টি

_____________________________________________

দৃষ্টি ও জ্ঞান
ইউরোপের সংস্কৃতিতে ঐতিহাসিক ভাবেই দৃষ্টিশক্তিকে সেরা ইন্দ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি চিন্তা করা আর দেখার ভেতরে পার্থক্যও করা হয় না। অতীতের গ্রিকরা ভাবতো- শুধুমাত্র যা কিছু দেখা যায় তার-ই নিশ্চয়তা আছে। হেরাক্লিটাসের লেখাতে আছে ‘কানের চেয়ে চোখ ভাল সাক্ষী’। দৃষ্টিশক্তিকে প্লেটো মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহার মনে করতেন। আর নৈতিক কর্মকাণ্ডকে(ethical universals)‘মনের চোখ’ দিয়ে দেখার উপর জোর দিয়েছেন। এ্যারিস্টোটলও একইরকম বোধিকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ধ’রতে পারে ব’লে দৃষ্টিশক্তিকেই ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

গ্রিকদের সময় থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা নিয়ে দর্শনশাস্ত্রে অসংখ্য লেখনী পাওয়া যায় যেখানে স্বচ্ছ-দৃষ্টিশক্তি জ্ঞানের পরিপূরক হ’য়ে উঠেছে আর আলো হ’য়ে উঠেছে সত্যের রূপক। ইতালীয় দার্শনিক এ্যাকুইনাস দেখার ধারণাকে এমনকি অন্যান্য ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধিবৃত্তীয় অনুধাবন-প্রক্রিয়ার উপরও প্রয়োগ করেছেন।

দৃষ্টির ধারণা দর্শন-শাস্ত্রকে কতটা প্রভাবিত ক’রেছে তা পিটার স্লোটারজিক গুছিয়ে লিখেছেন। ‘দর্শন-শাস্ত্রের সাধারণ একক হ’লো চোখ। চোখের একটা বিশেষ ক্ষমতা হ’লো- সে শুধু দেখেই না, তাদেরকে আর কেউ দেখছে কিনা সেটাও দেখে। শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর চেয়ে এই জায়গায় চোখ এগিয়ে যায়। তাই দর্শন-শাস্ত্রের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে চোখের প্রতিক্রিয়া আর ভাষা; কাউকে দেখতে দেখা।’ রেনেসান্স বা পুণর্জাগরণের সময় পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের ভেতর দেখাকে শুরুতে রেখে আর স্পর্শকে শেষে রেখে একটা আনুক্রম তৈরী ক’রে অনুধাবন করা হতো। এই রেনেসান্সীয় পদ্ধতিতে ইন্দ্রিয়কে বিভিন্ন মহাজাগতিক উপাদানের সাথে মিলিয়ে নেওয়া হ’তো: দেখার সাথে আগুন বা আলো, শোনার সাথে বাতাস, গন্ধের সাথে বাষ্প, স্বাদের সাথে পানি আর স্পর্শের সাথে মাটি।
পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনার আবিষ্কার চোখকে দৃশ্যমান পৃথিবীর কেন্দ্রে নিয়ে আসে, সেই সাথে ব্যক্তি-ধারণারও। পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনা নিজেই একটি রূপকে পরিণত হয়, যে রূপক বর্ণনা করার সাথে সাথে ধারণাকেও প্রভাবিত করে।

আমাদের প্রযুক্তি-নির্ভরশীলতার ফলে অনুভূতিগুলো যে আরো সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা হ’য়ে গিয়েছে- সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা আর শোনা এখনকার সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত সামাজিকতা-সহায়ক অনুভূতি। আর অন্য তিনটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাচীন অনুভূতির অবশিষ্টাংশ হিসেবে, যার অল্প কিছু ব্যক্তিগত উপযোগিতা আজও টিকে আছে। সাংস্কৃতিক চলও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদেরকে দমিয়ে রাখে। আমাদের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক আর প্রচণ্ড স্বাস্থ্য-সচেতন সাংস্কৃতিক-রীতি অল্প কিছু অনুভূতি যেমন কোনো খাবারের ঘ্রাণ, ফুলের সৌরভ বা উষ্ঞতা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াগুলোকেই সামষ্টিক সচেতনতা সৃষ্টির অনুমোদন দেয়।

অন্য অনুভূতি গুলোর চেয়ে দৃষ্টিশক্তির প্রাধান্য এবং জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ার উপর এর ধারাবাহিক প্রভাব বেশ কিছু দার্শনিক প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘আধুনিকতা এবং দৃষ্টির কর্তৃত্ব’ শীরোনামের দার্শনিক নিবন্ধের সংকলনে যুক্তি দেওয়া হ’য়েছে যে- একটি দৃষ্টি-কেন্দ্রিক, দৃশ্য-জাত, জ্ঞানের দৃষ্টি-নির্ভর ব্যাখ্যা, সত্য আর বাস্তবতা প্রাচীন গ্রিকদের থেকে শুরু ক’রে আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রাধান্য বিস্তার করছে। দৃষ্টি আর জ্ঞানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক, দৃষ্টি আর অধিবিদ্যা (Ontology), দৃষ্টি আর ক্ষমতা, দৃষ্টি আর নৈতিকতা নিয়ে এই চিন্তা-উদ্দীপক বইটাতে আলোচনা কারা হয়েছে।
জগতের সাথে আমাদের এই দৃশ্য-কেন্দ্রিক সম্পর্কের মডেল এবং আমাদের জ্ঞানের ধারণা, যা কিনা দার্শনিকেরা প্রকাশ করেছেন, তাকে দৃষ্টির প্রচলিত জ্ঞানতত্ত্বীয় ধারণা বলা যায়। স্থাপত্যের শিল্পগুণের বোধ এবং চর্চার সাথে অন্যান্য অনুভূতির সাপেক্ষে দৃষ্টির ভূমিকা আরো গভীরভাবে অবলোকন করাটাও জরুরী। অন্য সকল শিল্পের মতো স্থাপত্য মূলগতভাবেই পরিসর আর সময়ের অভ্যন্তরে মানুষের উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। স্থাপত্য পৃথিবীতে মানুষের অবস্থিতিকে প্রকাশ এবং তাকে সম্পর্কযুক্ত করে। ব্যক্তি এবং জগত সম্পর্কিত দর্শনশাস্ত্রীয় ভাবনাগুলো যেমন- অভ্যন্তরীনতা আর বাহ্যিকতা, সময় আর সময়কাল, জীবন আর মৃত্যু – এসবের সাথে স্থাপত্য দারুনভাবে সম্পৃক্ত। ডেভিড হার্ভে বলেছেন, ‘পরিসর এবং সময়ের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার প্রতি নান্দনিক আর সাংস্কৃতিক চর্চা অদ্ভুত রকম সংবেদনশীল, বিশেষত তা যেহেতু মানুষের অভিজ্ঞতা-জাত পরিসরিক উপস্থাপনা আর শিল্পদ্রব্যের নির্মাণের হাত ধ’রে অনিবার্যভাবেই চলে আসে।’ আমাদেরকে সময় এবং পরিসরের সাথে সম্পর্কিত করা এবং এই ব্যাপারগুলোকে একটা লৌকিক পরিমাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থাপত্য একটি মৌলিক উপকরণ। সীমাহীন পরিসর আর অবিরাম সময়কে ব্যবহার-উপযোগী করার মাধ্য দিয়ে স্থাপত্য মানবজাতির জন্য একে সহনীয়, বাসযোগ্য আর বোধগম্য ক’রে তোলে। সময় আর পরিসরের এই আন্ত-নির্ভরশীলতার ফলস্বরূপ – শিল্প আর স্থাপত্যের উপর বাইরের এবং ভেতরের পরিসরের সম্পর্ক-বোধ, বাস্তবিক এবং আত্মিক উপকরণ এবং ভাবনাগত ও অনুভূতির ব্যাপারে সচেতন এবং অ-সচেতন ঝোঁক কিংবা তাদের পারস্পারিক ভূমিকা আর মিথষ্ক্রিয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

চোখের প্রাধান্যকে উপজীব্য ক’রে দার্শনিক আলোচনা করতে উদ্বুদ্ধ ক’রে ডেভিড মিচেল লেভিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতির দৃষ্টি-কেন্দ্রীকতা বা দৃষ্টির কর্তৃত্বপরায়নতাকে প্রশ্নের সম্মুখিন করাটা যথাযথ।’ আর আমি মনে করি, আজকের পৃথিবীতে প্রাধান্য-বিস্তারী দৃষ্টিগ্রাহ্যতার চরিত্রকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।
দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতা এবং চোখের লঙ্ঘন

১. স্থাপত্যকে চাক্ষুষ শিল্প-মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। – লুইস ব্যুনুয়েল।

২. ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতরে দৃষ্টিকে শ্রেষ্ঠ ব’লে ভাবা হয়, আর দৃষ্টি-শক্তি হারানোকে চরম শারীরিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। – সালভাদর দালি।

আমাদের প্রতিদিনের দেখাকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ক’রে দেখা দরকার- সেই সাথে দরকার আমাদের নিজেদেরকে দূর-দৃষ্টিসম্পন্ন জীব হিসেবে বিশেষভাবে বোঝা।
দৃষ্টির একলা-চলা এবং আগ্রাসী চরিত্র, এবং সেই সাথে ‘পিতৃ-তান্ত্রিকতার যে ভূত’ আমাদের সংস্কৃতির পিছু ধেয়ে চ’লেছে তা নির্দেশ ক’রে লেভিন বলেন –
“দৃষ্টির ভেতর নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা বেশ পরিস্কার। আকড়ে ধরা আর বদ্ধমূল করা (fixate), অনুমোদন দেওয়া (retify) আর সম্পূর্ণ করার একটা দারুণ ঝোঁক আছে দৃষ্টি ব্যাপারটাতে। যে ঝোঁক দমন করতে চায়, নিরাপত্তা দিতে চায়, সাথে সাথে চায় নিয়ন্ত্রণ করতে। ব্যাপারটা এত ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে যে তার ফলে আমাদের সংস্কৃতির উপর এর সুনির্দিষ্ট এবং প্রতিযোগীতাহীন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
আমার মনে হয়, একইভাবে ইদানিংকালের দৈনন্দিন স্থাপত্যের নানা খুঁটিনাটি দিককে অনুধাবন করা যাবে ইন্দ্রিয়-সম্পর্কিত ধারণাসমূহের বিশ্লেষণের মাধ্যমে, আমাদের মুক্ত সংস্কৃতিতে দৃষ্টির প্রতি থাকা পক্ষপাতকে সমালোচনা ক’রে, এবং বিশেষ ক’রে স্থাপত্যের আলোচনার মধ্য দিয়ে। সমকালীন স্থাপত্য ও নগরের অমানবিকতাকে শরীর আর ইন্দ্রিয়গুলোর প্রতি অবহেলা এবং সংবেদজ অঙ্গগুলোর (sensory system) মধ্যবর্তী ভারসাম্যহীনতার পরিণতি হিসেবে ভেবে নেওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজকের প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে/দুনিয়ায় বাড়তে থাকা ব্যবধান, বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতা হয়তো বোধের কোনো ধরণের খুঁটিনাটির সাথে সম্পর্কিত। প্রযুক্তিক বিচারে সবচেয়ে অগ্রসর ক্ষেত্র যেমন হাসপাতাল বা বিমান-বন্দরে যে এমন বিচ্ছিন্নতার উদ্ভব হচ্ছে তা বেশ ভাবার বিষয়। চোখের এই আধিপত্য এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর অবদমন আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র্য এবং বহিরাগত বানিয়ে ফেলতে প্ররোচনা দিচ্ছে। চোখের এই শিল্প নিশ্চিতভাবেই চিত্তাকর্ষক এবং ভাবনা-উদ্রেককারী কাঠামো উৎপাদন করেছে, কিন্তু তা পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ককে সহায়তা/সহজ (facilitate) করেনি। বাস্তবে আধুনিকতাবাদ সাধারণভাবে যে জনপ্রিয় রুচি আর মূল্যবোধের সীমানা ছাড়িয়ে গভীরে ঢুকতে পারেনি তা মূলত এর একমুখী যুক্তি আর দৃষ্টির প্রাধান্যের জন্য। আধুনিকতা-আশ্রয়ী ডিজাইন খুব বেশি হ’লে এই যুক্তি আর দৃষ্টিকে ধারণ করেছে; কিন্তু শরীর আর অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে অন্তর্ভুক্ত করেনি, এমনকি আমাদের স্মৃতি, কল্পনা আর স্বপ্নকেও আশ্রয় দেয়নি।

দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতার সমালোচনায়
পাশ্চাত্যের চিন্তা-ভাবনায় দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতার ঐতিহ্য এবং তার ফলস্বরূপ দর্শক-তত্ত্বীয় যে জ্ঞান তার সমালোচনা পুরোনো দিনের দার্শনিকেরাও করেছেন। যেমন, রেনে ডেকার্তে ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতরে দৃষ্টিকে সবচেয়ে সার্বজনীন আর সম্মানিত ব’লে বিবেচনা করতেন; আর তাই তার বস্তুবাদী দর্শন (অবজেক্টিফাইয়িং) দৃষ্টিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েই গ’ড়ে উঠেছে। তারপরও, তিনি দৃষ্টিকে স্পর্শের সমানও মনে করেছেন, অনুভূতি হিসেবে স্পর্শকে দৃষ্টির তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য এবং তাতে ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে ব’লে বিবেচনা করেছেন।

আপাত প্রতীয়মান দ্বন্দের ক্ষেত্রে চিন্তার স্বাভাবিক পদ্ধতি ব্যবহার ক’রে ফ্রেডরিক নিটসে দৃষ্টি-কেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনার কর্তৃত্বকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিভিন্ন দার্শনিকের ‘চোখকে সময় আর ইতিহাসের বাইরের বিষয়’ ব’লে বিবেচনা করার ব্যাপারটার সমালোচনা করেছেন। তিনি এমনকি ইন্দ্রিয়গুলোর প্রতি বিশ্বাসঘাতী এবং অন্ধভাবে  বিরুদ্ধতাকারী দার্শনিকদেরকে অভিযুক্ত করেছেন। মার্ক স্কেলার স্পষ্ট ভাষায় এই মনোভাবকে শরীর-বিদ্বেষ ব’লে উল্লেখ করেছেন।

পাশ্চাত্যের এই প্রতি-দৃষ্টিকেন্দ্রিক (এন্টি-অকুলারসেন্ট্রিক) ধারণা আর চিন্তার উদ্ভব বিশ শতকের ফরাসী বুদ্ধিবৃত্তিক-সমাজে। আর এটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যাবে মার্টিন জ লিখিত ‘অবনত চোখ : বিশ শতকের ফরাসী ভাবনাতে দৃষ্টির সন্মানহানী’ শিরোনামের বইটাতে। লেখক নানা বৈচিত্রময় ক্ষেত্র যেমন প্রিন্টিং-প্রেসের আবিস্কার, কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা, স্থিরচিত্রধারণ(ফটোগ্রাফি), ভিজ্যুয়াল কাব্য আর সময়ের নতুন অভিজ্ঞতার ভেতরে আধুনিক কালের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশের সূত্র খুঁজেছেন। অপরপক্ষে হেনরি বার্গসন, জর্জ বাটেইলি, জ্যা পল সার্ত্র, মেউরিস মারলেউ-পন্টি, জ্যাক লাকান, লুই এ্যালথ্রুসার, গে ডিবোর্ড, রোল্যান্ড বার্থেজ, জ্যাক দেরিদা, লুসি ইরগারে, ইমানুয়েল লেভিনাস এবং জ্যা-ফ্রান্সিস লয়োটার্ড প্রমুখদের মতো পরবর্তীকালের ভাবনা গ’ড়ে দেয়া বেশ কিছু ফরাসী লেখকদের প্রতি-দৃষ্টিকেন্দ্রিক অবস্থান বিশ্লেষণ করেছেন।

সার্ত্রে দ্বার্থহীনভাবে দৃষ্টির ধারণার বিরোধী হ’য়ে তাকে দৃষ্টিকেন্দ্রিক-ভীতি বলেছেন; ‘দেখা’ বিষয়ে তার রচনাবলীতে ৭০০০ বারের মতো উল্লেখ আছে।…

আত্ম-মগ্ন আর অস্তিত্ববাদী চোখ (The Narcissistic and Nihilistic Eye)
সর্বপ্রথম হাইডেগার দৃষ্টির কর্তৃত্বকে প্রশংসার ধারণা দেন, কিন্তু এটা আধুনিক কালে ধীরে ধীরে অস্তিত্ববাদের দিকে ঝুঁকে যায়। একটি অস্তিত্ববাদী চোখের ব্যাপারে হাইডেগারের মতামত আজকের দিনে বিশেষভাবে চিন্তার উদ্রেগ করে; স্থাপত্য-সম্পর্কিক পত্রিকাগুলোতে নজর কাড়তে পারা গত বিশ বছরের বেশ কিছু স্থাপত্য প্রকল্প আত্ম-মগ্নতা আর অস্তিত্ববাদ দুইকেই প্রকাশ করে।

কর্তৃত্বকারী চোখ সব ধরণের সাংস্কৃতিক উৎপাদনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়, যা সম্ভবত আমাদের সহানুভূতি, সমবেদনা আর বাস্তবের সাথে অংশগ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। আত্ম-মগ্ন চোখ স্থাপত্যকে দেখে শুধুমাত্র আত্ম-প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে, আর একটি বৃদ্ধিবৃত্তিক-শিল্পীত খেলা হিসেবে অবশ্য-প্রয়োজনীয় মানসিক এবং সামাজিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, যেখানে কিনা অস্তিত্ববাদী চোখ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবেদনশীল এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা আর ভিন্নতাকে বাড়িয়ে দেয়। মানুষের শরীর-কেন্দ্রিক এবং বাস্তবতার সমন্বিত অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে অস্তিত্ববাদী স্থাপত্য শরীরকে বিজোড়িত করে না এবং পৃথক করে, উপরন্তু সাংস্কৃতিক বিন্যাসকে পুনর্নির্মানের চেষ্টা না ক’রে সামগ্রিক গুরুত্বায়নের পাঠকে অসম্ভব ক’রে তোলে। …

মৌখিক বনাম চাক্ষুষ পরিসর
Oral versus Visual Space

তবুও দৃষ্টি সবসময় মানুষের উপর কর্তৃত্ব করেনি। প্রকৃতপক্ষে, প্রথমদিকে মনুষের উপর শ্রবণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিলো আর ধীরে ধীরে সেটার জায়গা নিয়েছে দৃষ্টি। প্রত্ন-সাহিত্যে এমন কিছু জনপদের কথা পাওয়া যায় যেখানে আচার-আচরণ আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘ্রাণ, স্বাদ আর স্পর্শের মতো একান্ত অনুভূতিগুলোর সমষ্টিবদ্ধ গুরুত্ব ছিলো।… অনেকগুলো জন-গোষ্ঠীতে সামগ্রিক আর ব্যক্তিগত পরিসর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুভূতিগুলোর ভূমিকা কেমন ছিলো তা নিয়ে এডওয়ার্ড টি হলের বই ‘গোপন পরিমাপ’ (দ্য হিডেন ডাইমেনসন) এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ, যদিও দুঃখজনকভাবে স্থপতিরা এটার কথা ভুলে গেছেন বলেই মনে হয়।

চোখের শক্তি এবং দুর্বলতা

….

প্রকৃতপক্ষে, দৃষ্টির সংশয়হীন কর্তৃত্ব হয়তো খুব প্রাচীন বিষয় নয়, গ্রিকদের চিন্তা এবং আলোকবিদ্যার সাথে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকার পরও।লুসিয়েন ফেভরির মতে –“ ষোড়শ শতকের মানুষেরা দেখার আগে শুনতো এবং গন্ধ শুকতো, তারা বাতাস টেনে নিতো এবং শব্দ খেয়াল করতো (caught sound)। অনেক পরে এসে মানুষ গুরুত্বসহকারে এবং সক্রিয়ভাবে জ্যামিতির সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে নিয়েছে, কেপলার (১৫৭১-১৬৩০) আর Desargues of Lyon (১৫৯৩-১৬৬২) এর প্রভাবে বস্তুর নানা ধরণের গড়নের প্রতি মনোযোগী হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s