নগরী ঢাকা – ৪

দুইটা বিষয় নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে গত কয়েক দিন ধ’রে। বিমান-বন্দর সড়কে ৩ কোটি টাকা খরচ ক’রে বনসাই রোপণ আর সর্বোচ্চ আদালতের সামনে থেকে কোন এক মূর্তি বা ভাস্কর্য সরানো। ব্যাপার দুইটাকে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়। সেটা হলো, নগর কোন না কোন ভাবে তার নাগরিকদের ইচ্ছা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর সামর্থ্যের প্রকাশ করেই।

১.
প্রশ্ন আসতে পারে বনসাই কিভাবে ঢাকা নগরীর মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে পারে। হয়তো সহজ চিন্তায় সেটা ধরা যাবে না, কিন্তু প্রতিফলক যে হয়ে উঠতে চাচ্ছে তা তো আর অস্বীকার করার সুযোগ থাকছে না। বিমান-বন্দরগামী সড়ক দেখে অনেকেই বলছেন, এটা যেন মরুভূমি হ’য়ে উঠেছে। আগের ২০-২৫ বছরের পুরোনো গাছ এক বারে কেটে ফেললে এমনটা লাগতেই পারে। তার উপর যদি কিম্ভুত-দর্শন গাছ দিয়ে কথিত সোভা-বর্ধনের চেষ্টা করা হয়, তো সেটা মরুভূমির মতো লাগুক বা না লাগুক নিজেদের পরিচিত কিছুর মতো যে লাগছে না তা বলা যায়।

তার উপর মরুভূমির উপর আমাদের ভালোবাসাও বোধহয় বাড়ছে। সে মধ্য-প্রাচ্যে আমাদের নানা কারণে যাতায়াত বাড়ার জন্য কিনা, জানি না। তবে আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যে আমাদের শহরটাকে/শহরগুলোকে খানিকটা মলিন আর ধূসর করে দিচ্ছে তা নিশ্চিত। আর নিজের কর্মকাণ্ডকে কে না ভালোবাসে? গাছগুলো কাটার পর কেউ কেউ মিনমিন ক’রে জানতে চেয়েছিল, কেন কাটা হচ্ছে গাছগুলো। বলা হলো, ফুটপাথ চওড়া করা হবে। সেদিন কেউ আমরা জোর গলায় জানতে চাইলাম না, তার জন্য গাছগুলো কাটা জরুরী কেন। কারণ জোরটা আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। নিজেদের বাসাগুলো/বিল্ডিংগুলো বানাতে গিয়ে আমরা ঘুষটুষ দিয়ে যা-ও বা একটা নকশা পাস করিয়ে আনি রাজউক থেকে, শেষ পর্যন্ত সেটা মেনে বানাই খুব কম জনই। নিয়ম অনুযায়ী ঠিক যতটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে বিল্ডিং বানানোর কথা, তা আমরা আর মানি না। ফলে আমাদের বিল্ডিংগুলো আয়তনে বড় হচ্ছে বটে, কিন্তু আমাদের এলাকা থেকে উঠে যাচ্ছে গাছ – মাটিতে পানির স্তর যাচ্ছে নেমে। আমাদের শহরের মরুকরণের শুরু প্রায় আমাদের প্রতিটা বাড়ি থেকেই।

হ্যা, আমাদের টাকা বাড়ছে। অর্থনীতির পরিসংখ্যান তাই বলে। কিন্তু আমাদের বিল্ডিংগুলো সেই সাথে এ-ও বলে যে টাকাগুলোর একটা বড় অংশ চুরি করা বা কাউকে না কাউকে ফাঁকি দেওয়া। আর তাই অন্যের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক অবিশ্বাস। নিজে চোর ব’লে অন্যকেও চোর ভাবছি। নিজের চুরি করা বা কর ফাঁকি দেয়া টাকা/সম্পদকে অন্যের অগোচরে নিয়ে যেতে আমাদের তাই চেষ্টার অন্ত নেই। আমাদের বিল্ডিঙে তাই উঁচু উঁচু নিরেট প্রাচীর। বিমান-বন্দরগামী সড়কেও তাই। ‘বিউটিফিকেশন’ এর নামে সেই সব দেয়ালে হয়তো লাগানো হবে ভিনদেশী টালি। কি জানি, মহাখালির রাস্তায় যেমন ক’রে টয়লেটের টালি লাগানো হয়েছে তেমন কিছু লাগানো হবে কিনা? আমাদের টাকা বাড়লেও, সে টাকার পরিমাণ যে খুব বেশি না তা এই টয়লেটের টালিগুলোই বলে দেয়। নতুন ধনী হতে থাকা মানুষের রুচি তৈরী হতে সময় লাগেই।

তারপরও, বনসাই যে কখনো একটা রাস্তার দুই ধারে খোলা আকাশের নিচে লাগানো যেতে পারে সেই চিন্তাটা যিনি বা যারা করেছেন তাদের একটু তারিফ না করলেই নয়। কারণ বনসাই প্রচলিতভাবে অন্তঃ-পরিসরেই লাগানো হয়। এর পরিচর্যাও বেশ কঠিন এবং ব্যয়-সাপেক্ষ। ফলে এই চিন্তাটা যারা করেছেন, হয় তারা অনেক বেশি জানেন অথবা তাদের জানা-শোনাতে বড় ধরণের ঘাপলা আছে। নতুবা এই লোকগুলো অতিরিক্ত ধড়িবাজ, যারা জানে এই প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে প্রচুর টাকা এদিক-ওদিক করা যাবে। দুঃখজনক ভাবে এই লোকগুলোও এই নগরীর অংশ। এদের কাজের বিরুদ্ধে যে কেউ কথা বলবে, তেমন লোক আমাদের নগরে আজ আর নেই বললেই চলে। হঠাৎ কেউ ব’লে বসলেও তাদের বলাটা এতটাই মৃদু হয় যে, সে বলাটা একরকম না-বলারই নামান্তর হয়ে দাড়ায়। কয়েক দিন আগে দেখলাম কাজী খালিদ আশরাফ লিখেছেন এটা নিয়ে। কেউ গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না।

 

২.
আদালতের সামনের কথিত ভাস্কর্য নিয়ে বেশি কিছু বলাটা সাহসের পরিচায়ক। কিন্তু আজকের আমাদেরকে আর যা-ই হোক ঠিক সাহসী ভাবতেই ভয় পাই আমি। বলা হয়েছিল, এটা নাকি কোন এক গ্রীক দেবীর মূর্তি। আমরা কেউই সাহস ক’রে বলিনি যে আমরা গ্রীক জাতি নই। তার উপর দেব-দেবীরা সময়ের সাথে সাথে গুরুত্বে বাড়ে কমে। মানুষের সভ্যতা অনেক দিন ধরেই মানবমুখী হওয়ার চেষ্টায় আছে। সর্বোচ্চ আদালতের সামনে প্রাচীন দেবীর মূর্তি/ভাস্কর্য স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা এযুগের মানুষ কি ভাবে করতে পারেন জানি না। কিন্তু ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা যে করছেন- সেটা বাস্তবতা।

আমাদের ভাস্করও বেশ। দেবীর পোশাক বদলে দিয়েই কাজ শেষ করতে চান। আমাদের শিল্প-সমালোচকেরা এ নিয়ে কিছু বলেছেন কি? দুঃখজনকভাবে তেমন কিছু আমার চোখে পড়েনি। অর্থাৎ কেউ কিছু বললেও তা গুরুত্ব পায় নি আমাদের কাছে সাধারণ বিচারে। অথচ অসুন্দরকে নির্দেশ করাটা জরুরী ছিলো। এটা স্থাপনের পরপরই প্রতিবাদ আসা উচিত ছিল শিল্পী সমাজের কাছ থেকে। বলা দরকার ছিলো, এ জিনিস আমাদেরকে ‘রিপ্রেজেন্ট’ করার যোগ্য হয়নি। আদালতকে তো নয়ই। যে কোন ধরণের শিল্পগুণ বিচারেই এটি একটি কুৎসিত বর্জ্যের থেকে বেশি কিছু হয়নি। বিশেষ কোন বক্তব্য ধারণ করে এটা- এমন কথা এর নির্মাণকারীও বলতে পারেননি, ইনিয়ে-বিনিয়ে হলেও।

কিন্তু এই কাজটা আমাদের করা হয়নি। তেতুল হুজুরা একে অশালীন বলেছেন। সেটা ঠিক বলা কিনা, জানি না। উপরন্তু তাদের বলাটা এই শহরের বাইরে থেকে। অর্থাৎ শহরের নিয়ন্ত্রণ যে এই শহরের মানুষের হাতে পুরোটা আছে সে দাবীও আর করা যাচ্ছে না।

… এই দুটো ঘটনা তাই নাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতারই স্মারক। আমরা কেউ কেউ হাপিত্যেশ করতে পারি শুধু। কিন্তু এটাই যে আমাদের কার্যকর ‘ইমেজ’ তা অস্বীকার করতে পারি না। বরং অস্বীকার করলেই তা সময় পেরিয়ে হ’য়ে উঠবে আরো বেশি ক্ষতিকর, নগর এবং নাগরিক দুইয়ের জন্যই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s