স্থাপত্য পেশা : ২০১৭ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বাংলাদেশের চাষীরা একবার  উৎপাদিত ফসলের হিস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। তার নাম দেওয়া হয়েছিল তেভাগা আন্দোলন। বর্গা-চাষীর উৎপাদনের তিন ভাগের একভাগ ভূমি-মালিকদের দিয়ে দেওয়ার সে আন্দোলন কখনই সফল হয়নি এই দেশে। ভুমি-মালিকেরা নানা ছল-চাতুরী ক’রে উৎপাদনের অর্ধেকই নিয়ে নেয় আজো। আমি চাষী নই, ভূমি-মালিকও নই। তাই কোনটা যে নৈতিক বিচারে ঠিক হবে, তা নিশ্চিত ক’রে বলা আমার পক্ষে বেশ শক্ত।

তবে স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে আমার খানিকটা অভিজ্ঞতা আছে। নিয়ম আনুযায়ী বিল্ডিং কনসালটেন্সির শতকরা ১০ ভাগ রাজস্ব হিসাবে সরকারকে দিয়ে দেওয়ার কথা। পেশাজীবী সংগঠনের একটা বাৎসরিক চাঁদা আছে। আবার রাজউক, সিডিএ আর কয়েকটা পৌরসভাতে রেজিস্ট্রেশনের জন্যও চাঁদা দিতে হয়। সে কোনো ড্রয়িং জমা দিতে না পারলেও। কারণ রেজিস্ট্রেশন না থাকলে ড্রয়িং জমা দেওয়া যায় না। আবার একবার রেজিস্ট্রেশন করলে প্রতিবছরই তার জন্য ফি জমা দিতে হয়। আগের মূসক বাড়িয়ে এখন ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। সেই মূসক দেয়ার কথা ক্লাইন্ট বা বিল্ডিঙের মালিকের। কিন্তু সেই মূসক স্থাপত্য-পরামর্শকের অফিস থেকে দিতে গেলে ভ্যাট চালান করতে হয়। যেটা করতে কিনা ১২০০০/- টাকার মতো খরচ হয় এই ২০১৭ সালে। ভোক্তার মূসক সরকারের কোষাগারে যাওয়ার মাঝে পরামর্শক অফিসের কাছ থেকে প্রতিবছর কেন এই বাড়তি টাকাটা যাবে সেটা আমি বুঝি না। এর সাথে আছে অফিসের ট্রেড-লাইসেন্সের ফি। বছর দুয়েক আগে কোনো প্রকার নোটিস না দিয়েই সরকার বা অর্থমন্ত্রী (কোনটা যে সঠিক জানি না) সেটা বাৎসরিক ২৫০০/- টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৫০০/- টাকা করেছেন। যদিও এই টাকা নিজে জমা দিতে গেলে অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হয়। সময়ও নষ্ট হয়। তাতে কাজ করা কিমবা কাজ জোগাড় করা- দুইয়ের জন্যই সময় কমে যায়। শেষে অফিসের আয়টা যায় কমে। তাই এইসব রেজিস্ট্রেশনের ভারটা একজন দালালের (আর্থিক পরামর্শক বললে তারা খুশি হন) উপর ছেড়ে দিতে হয়। তাতে আরো কিছু বাড়তি খরচ হয়। রাজউক টাইপের প্রতিষ্ঠানগুলোর আরার অনেক উপ-প্রতিষ্ঠান আছে। স্থপতিদের নামের তালিকা কম্পিউটারে তুলে রাখার জন্যও আছে এমন একটি উপ-প্রতিষ্ঠান। কখনো কখনো তাদেরকেও ঘুষ দিতে হয়। তালিকাভূক্ত থাকার জন্য। যদিও এমন তালিকাভূক্তির কোনো নিয়ম নেই। তারা এটা চালু করেছে নিজেদের সুবিধার জন্য। আর বেড়েছে স্থপতিদের নাজেহাল করার সুযোগ।

এরপর আছে আয়কর। স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে স্থপতি ইন্সটিটিউটে বিধি-মতো নিবন্ধিত হ’লেই আয়করের রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান করা আছে বাংলাদেশের আয়কর আইনে। এবং সর্বনিম্ন আয়কর দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু মোটামুটি হিসাবে মাসে ৩২০০০/- টাকার মতো আয় হ’লে সর্বনিম্ন আয়কর বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাংলাদেশের কোনো স্থাপত্য পরামর্শক অফিসই আজ অব্দি এই পরিমাণ টাকা প্রারম্ভিক বেতন হিসেবে দেয় না। বছর দুই-তিন কাজ করার পর ভাল কাজ করতে পারেন এমন কেউ কেউ এই পরিমাণ টাকা বেতন হিসেবে পেতে পারেন। সে আয়করের আবার অনুপাত আছে অনেক ধরণের। একটা সীমার পর বাড়তি টাকার উপর কখনো ১০%, কখনো ১৫% আবার কখনো আরো বেশি। আমাদের অর্থমন্ত্রী এই নিয়মে কোনো পরিবর্তন করতে চান না। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে স্থপতিদের আয় অনেক ভাল; তারপরও তারা নাকি আয়কর দিতে চান না।

এরপর আছে বিভিন্ন ধরণের ব্যাংক মাসুল। বেতন বা কনসালটেন্সি থেকে আয় হওয়া টাকাটা ব্যাংকেই যায় সাধারণত। ব্যাংক এ্যাকাউন্টের সার্ভিস চার্জ আছে। এটিএম চার্জ আছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং চার্জ আছে। আরো আছে সরকারের আবগারি শুল্ক। আমার এক ব্যাংকার বন্ধু সেদিন বললেন, ব্যাংক এ্যাকাউন্টে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকলেই আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হয়, সে বছরের যে কোনো সময়ে একবার থাকলেও। তাকে আমার কাজের ধরণটা বললাম। বললাম, আমি হয়তো একটা কাজের জন্য ক্লাইন্টের কাছ থেকে একবারে ৫ লাখ টাকা নিলাম। সেই টাকা আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, প্লাম্বিং ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আর ড্রাফটসম্যানদের দিলাম এ্যাকাউন্টস-পে চেকের মাধ্যমে অথবা সরাসরি ওনাদের এ্যাকাউন্টগুলোতে। আমার ব্যাংকার বন্ধু বললেন, সবগুলো এ্যাকাউন্ট থেকেই আবাগারি শুল্ক কাটা হবে। আমার এ্যাকাউন্ট থেকে ৫ লাখ টাকার উপর, আর বাকিদের এ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ দেওয়া হয় তার উপর। কখনো বিপদে প’ড়ে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি হয়তো। টাকাটা ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন হয়েছে। সে টাকার উপরও কাটা হয়েছে আবগারি শুল্ক। আহা ব্যাংকিং ব্যবস্থা !! একই টাকার উপর যে কতবার কর বা সার্ভিস চার্জ কেটে নেওয়া হচ্ছে কে জানে! অথচ আমানতের উপর সুদের হার কমছে দিনকে দিন।

এরপর আছে যে কোনো পণ্য কিনতে গেলে তার জন্য নির্ধারিত কর, মূসক (ভ্যাট) ইত্যাদি। এখন যেটাকে ঢালাও ভাবে ১৫% করার চেষ্টা করছেন অর্থমন্ত্রী। গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিলও এর আওতার ভেতর। কিন্তু সব পণ্যের উপর যে সমান ট্যাক্স-ভ্যাট তা কিন্তু না। একটা মোটর সাইকেল বা গাড়ি কিনতে যান, ট্যাক্স-ভ্যাট কোন ক্ষেত্রেই ১০০% এর নিচে নয়। ইলেকট্রনিক পণ্যের ভ্যাট যে কখন কত কে বলবে? অথচ খুব কম ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় ওয়ারেন্টির সুবিধা। ইলেকট্রনিক পণ্যে কেন ওয়ারেন্টি সুবিধা বাধ্যতামূলক নয় তা একদমই বুঝিনা। বিশেষত এখানে স্বার্থটা কার সেটা।

সহজ বিবেচনায় যেটা বুঝি তা হলো, আমার মতো কম আয়ের পেশাজীবীদের আয়ের অর্ধেকের বেশিই বিভিন্ন ধরণের ট্যাক্সের নাম ক’রে সরকার নিয়ে নেওয়ার বিধান করে রেখেছেন। আয়ের ঠিক কতটা ট্যাক্স হিসেবে সরকারের পক্ষে নিয়ে নেওয়াটা নৈতিক সেটা ভাবি। যদিও সে ভাবনা আসলে কোনো ফলদায়ক ভাবনা নয়। শেষ পর্যন্ত মাথায় যেটা আসে তা হ’লো, ট্যাক্স ফাঁকি দিতে হবে। বেঁচে থাকতে হ’লে, টিকে থাকতে হ’লে। অর্থমন্ত্রী শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বা সেসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের স্বার্থই দেখেন। আমার মতো লোকজনের করের টাকা দিয়ে খেলাপি ঋণের টাকার হিসাব ব্যালান্স করেন। একজন সাবেক আমলা এমনটা করতেই পারেন। তার উপর যদি হন অর্থ বিষয়ে অভিজ্ঞ আমলা।

কিন্তু শ্রমিকের উৎপাদনের ঠিক কত ভাগ শেষ পর্যন্ত শ্রমিক পাবে সে আলোচনা কেউ করে না। দেশের সব রাজনীতিক যেন মরে গেছে। অথবা একজন অভিজ্ঞ আমলার হিসাবের মার-প্যাচে জড়িয়ে গেছে।

আমরা এমন এক পেশাজীবী যারা জড়িয়ে গেছি আরো বেশি। দেশে বিল্ডিং করার জন্য সার্বিক কোনো আইন নেই। ঢাকা আর চট্টগ্রাম সিটি-কর্পোরেশনের জন্য একটা বিধিমালা আছে। মানা হয় যার কমই। আমাদেরকে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  আর বিল্ডিঙের মালিকেরা এমন একটা লুপ-হোল বা ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে (প্রায় ৯৮%) আমাদেরকে দুইটা ডিজাইন করতে হয়। একটা রাজউক বা সিডিএ তে জমা দেওয়ার জন্য আর একটা নির্মাণ কাজের জন্য। খুলনা আর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে বিল্ডিং বানানোর বিধি ১৯৯৩ এর বিএনবিসি অনুযায়ী হওয়ার কথা। কিন্তু ৯৩ এর বিএনবিসিতে যেহেতু সবকিছু যথাযত ভাবে বলা নেই তাই এই শহরগুলোর বেশ কিছু নির্মাণ-বিধি নির্ভর করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপর। সারা দেশের আর কোনো জায়গায় বিল্ডিং বানানোর জন্য আইনত কোন বিধি নেই। পৌরসভাগুলো কখনো মেয়রের খেয়াল-খুশি মতো বিল্ডিং বানানোর অনুমতি দেয়, যা দেয়ার আইনগত কোন ভিত্তি এখনো বাংলাদেশে নেই। পৌরসভার মেয়র বিল্ডিং বুঝবেন এমনটা আশা করাই তো ভুল। একই ঘটনা জেলা-প্রশাসকের ক্ষেত্রেও। পৌর-এলাকাতে বিশেষ কিছু বিল্ডিং অনুমোদন করেন জেলা-প্রশাসক, নিশ্চিত ভাবেই যার এই বিষয়ে দক্ষতা নেই। এই ব্যাপারগুলো থেকেই তো সন্দেহ হওয়ার কথা- কোথাও ঘাপলা আছে। আদালত কত কত রুল জারি করেন। পৌরসভার মেয়রের কিমবা জেলা-প্রশাসকের বিল্ডিং বানানোর অনুমোদন দেয়াটা যে কেন বেআইনি নয় তা জানতে কথনো রুল জারি করতে দেখলাম না আমরা।

তার উপর উন্নয়ন কর্পোরেশনের বিধি একরকম, ফায়ার সার্ভিসের বিধি একরকম, সিটি কর্পোরেশনের বিধি একরকম, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিধি একরকম, ট্রাফিক বিধি একরকম। আবার বিধিগুলো মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব যাদের তারা টাকা খেয়ে বছরের পর বছর না দেখার ভান ক’রে চলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় এই সেক্টরে সমন্বয়ের অভাব কতটা। অথচ সমন্বয়টা খুব দরাকারি হয়ে পড়েছে এখন। সেটা স্থপতি আর ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থে নয়। টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনেই। অনেক সময়ই মানুষ ১০ তলা বিল্ডিঙের নকশা করিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু একবারে পুরোটা বানাতে পারে না। হয়তো বানায় ৪ তলা। বাকি ৬ তলা হয়তো বানাবে ১০ বছর পর। এতে বিল্ডিঙের উপরের ৬ তলার লাইফ-স্প্যান যে ১০ বছর কমে গেলো সেটা কেউ বিবেচনা করতে চায় না। ব্যাংকিং সেক্টর এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টেরের উপর যে মানুষের আস্থা কমে গিয়েছে সেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয় না। অথবা এই যে বিল্ডিঙের লাইফ-স্প্যান বিভিন্ন ভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে, আর্থিক কারণ দেখিয়ে, তাতেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাভ বেশি।

ফলত সবচেয়ে নাজুক পেশাজীবীদের একটা তালিকা করলে বাংলাদেশে স্থপতিরা উপরের দিকেই থাকবেন। অথচ একটা ভাল ভৌত-পরিকল্পনা না থাকলে একটা দেশের অর্থনৈতিক-পরিকল্পনা বেশিদূর আগাতে পারে না। কিছু অতিরিক্ত চালু অর্থমন্ত্রী/অর্থ-ব্যবস্থাপক নানা গোজামিল দিয়ে হয়তো কিছু হিসাব দেখাতে পারেন। সে হিসাব শুধুই পরিসংখ্যান। পণ্ডিত লোকেরা ঠিকই বলেন, মিথ্যা তিন রকম। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা আর পরিসংখ্যান। 

তেভাগা অন্দোলন পরিণতি পায়নি, যোগ্য রাজনৈতিক কর্মীর অভাবে। বাংলাদেশের স্থপতিদের তো কোন আন্দোলনই নেই। তারা অনেক আগেই হেরে গেছেন। কেউ কেউ নিজের মতো ক’রে যুদ্ধ ক’রে যাচ্ছেন হয়তো। কিন্তু তার সার্বিক ফল দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি এখনো। কয়েক বছর পরপরই উপকূলীয় এলাকাতে সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাসে অনেক জান-মালের ক্ষতি হয়। আমাদের এ অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। তারপরও এই এলাকাতে টেকসই বিল্ডিং বা অবকাঠামো বানানোর ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেই। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার বা নগর পরিকল্পনাকারীদের সম্পৃক্ত ক’রে অবকাঠামো তৈরী বা উন্নয়নের কোন সার্বিক প্রচেষ্টা নেই। তার প্রতিফলন হ’লো, বিল্ডিং বানানো নিয়ে একটা সার্বিক আইনের অনুপস্থিতি। দেশে বর্তমানে বিল্ডিং নিয়ে যেটুকু আইন আছে তার অনেকটা বিভিন্নভাবে অপরাধে ইন্ধন যুগিয়ে চলেছে বছরের পর বছর। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো এই অবস্থার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s