প্রবচন – ২৪

১.

এরশাদ অবশ্যই একজন ব্যতিক্রমী স্বৈরাচার, যিনি প্রথা মাফিক আরেক জন স্বৈরাচারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে কেটে পড়তে চাননি। হয়তো আরেক জন স্বৈরাচারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেওয়ার যে ঝুঁকি থাকে সাধারণত তা এড়াতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় নিজের প্রাণটা বাঁচিয়ে নিতে এবং তারপর দেশেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। আর সেজন্যই দরকার পড়েছিলো কোনো না কোনো রাজনীতিকের উপর নির্ভর করা। সে রাজনীতিক রাজনীতিতে তেমন অভিজ্ঞ না হলেই এরশাদের পক্ষে ভাল- এমন ধারণা করাটা বেশ সহজই। শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার পেছনে এরশাদের ভূমিকা কতটা প্রত্যক্ষ জানি না তবে পরোক্ষ প্রভাব কম নয়।

২.

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র-বিমোচনে ভূমিকা রাখে বা রেখেছে – তা যে প্রধাণমন্ত্রী জানেন না তা নয়। তিনি যে এটা নিষিদ্ধ করছেন না – তা থেকেই এটা বোঝা যায়। তবুও রাজনৈতিক কারণে যখন তিনি এটার বিরোধীতা করেন তখন এই ব্যাপারে তাঁর কাছ থেকে আরো একটু বাড়তি ডিটেইল আশা করছি। কারণ আমাদের জানাশোনা অনুযায়ী কিছু ক্ষুদ্রঋণ যেমন কাজ দিয়েছে কিছু তেমন কাজ দেয়ওনি। যেগুলো সামগ্রিক বিচারে নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে সেগুলোকে চিহ্নিত ক’রে সে ব্যাপারে তাঁর পদক্ষেপ কাম্য।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতে সব ধরণের মানুষকে যুক্ত করে নেওয়াটা এই সময়ের উন্নয়ন ভাবনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ যে সহায়ক হয়েছিলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খানিকটা হলেও সেটা আমাদের অর্থমন্ত্রী ঠিকই জানেন। তবু রাজনীতিতে একটু কম পটু হওয়ায় সেই ব্যাপারটা স্বীকার করতে গিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রী তার দলেরই একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রশংসা করে বসেন। একজন সাবেক আমলা এবং স্বৈরাচারের সাবেক অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে খুব বেশি রাজনৈতিক দক্ষতা আশা করা যে যায় না তা আবারো জানলাম। (২২ জানুয়ারি ২০১৭)

৩.

বাংলাদেশে প্রচুর আইন আছে যেগুলো পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। আমি বিল্ডিং সেক্টর নিয়ে এটা নিশ্চিত ক’রেই বলতে পারি। নির্মাণ বিধি এক রকম তো পরিবেশের বিধি আর এক রকম। সিটি-কর্পোরেশনের বিধির সাথে ট্রাফিক আর বিদ্যুত অধিদপ্তরের বিধির অনেক স্থানেই মিল নেই। আগুন নির্বাপণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধি আবার অন্য কথা নিয়ে হাজির হয়। মোটের উপর স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও আমরা সারা দেশের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ বিল্ডিং কোড বা ইমারত নির্মাণ বিধি পাইনি। আমাদের ইমারত নির্মাণ আইন সেই ১৯৫২ সালে প্রনয়ন করা, যেটা আবার সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। যার রিভিশন দরকার হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। ব্যাপারটা এই সেক্টরে যারা কাজ করছেন তারা যে সংসদ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানাননি তাও নয়। অনেক অনেক বার বলা হয়েছে। অনেকবার খসড়া তৈরী করে সংসদের বিবেচনার জন্য পাঠানোও হয়েছে। যে সব খসড়া তৈরী করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ এবং বিজ্ঞ অনেকে দীর্ঘ সময় খেটেছেনও। একটু খোঁজ নিলেই সেগুলো জানা যাবে। ২০০৬ এর পর ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অফিসিয়ালি প্রিন্ট করা হয়নি। হাউজ বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট প্রতিবছর বিল্ডিং কোড আপডেট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তা গেজেট আকারে আসছে না। কেন আসছে না তাও জানানো হয়না কাউকে।

পৌরসভাগুলোতে নির্মাণ বাড়ছে। তার স্টান্ডার্ড কেমন হবে তা বলা বিধির আইনগত ভিত্তি নেই আজও, কারণ সেই ১৯৫২ সালের ‘বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন এ্যাক্ট’ এর সীমাবদ্ধতা – যা পৌরসভাগুলোতে ইমারত নির্মাণ নিয়ে কোনো ধরণের বিধি এর উপস্থিতির বৈধতা দেয়নি।(পৌরসভাগুলোতে যে বিধিগুলো সাধারণভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে সে বিধিগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই। সত্যি বলতে সেগুলো বিধি নামের প্রহসন। এ বিষয়ে দক্ষ এক ব্যক্তি এ বিধিগুলোকে ‘ব্যাধি-মালা’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন ‘বিধিমালা’র পরিবর্তে।) আমাদের মতো জনবহুল অথচ আয়তনে ছোট একটা দেশের জন্য নির্মাণ প্রসঙ্গে সার্বিক একটা পরিকল্পনা থাকাটা এই সময়ে খুবই দরকারী। সেটা মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে যেমন সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থেও তেমন। ব্যাপারগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে বলে জানতে পারিনি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আছে রাজউকের প্লট আর ফ্ল্যট ব্যবসা নিয়ে। অতীব প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়েও বিধি প্রণয়নের মতো সময় যে তাদের হাতে নেই সে আমরা বুঝে গেছি।

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কিছু লোকের তৈরী করা বিধিগুলো শেষ পর্যন্ত সংসদ থেকে পাস হয়ে গেজেট আকারে প্রকাশ হয়না। কারণ নতুন সেসব বিধিগুলো অনেকের স্বার্থের সাথে মেলে না। বিশেষ ক’রে সেই সমস্ত সংসদ সদস্যদের যাদের সাথে বিল্ডিং ব্যবসার সরাসরি সংযোগ আছে। সংসদ যে এই ব্যাপারে অকার্যকর বা ডিসফাংশনাল হয়ে গিয়েছে দীর্ঘসূত্রীতার কারণে তা বলাটা ভুল হবে না। ব্যবসায়ীরা আইন প্রণয়নের হর্তাকর্তা হয়ে বসলে এমনই হওয়ার কথা। ইস্ট-ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন আমাদের তো ভোলার কথা নয়। আবার হয়তো পুরোটা মনেও নেই আমাদের। তাই সংসদের অর্ধেকের বেশি আমরা ব্যবসায়ী দিয়ে ভরে তুলেছি।

রাজনীতিক সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদের অভাব বোধ করছি বড্ড বেশি আজ। যারা আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলবেন। আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করবেন। প্রণীত আইন কার্যকর করার উপায় নিয়ে কথা বললেন। যারা আইনের সাথে ব্যক্তিপূজা গুলিয়ে ফেলবেন না। নিশ্চিত ভাবেই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াতে ধর্ম আর ব্যক্তিপূজা টেনে আনেন যারা তাদেরকে দক্ষ আইন প্রণেতা বলা যায় না।

৪.

‘ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট’ ব্যাপারটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কথা হচ্ছে বাংলাদেশে। প্রত্রিকার পাতায় খবরও কম আসেনি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ব্যাপারটা নিয়ে কতটা কী ভেবেছে সেটা আমার কাছে ঠিক পরিস্কার নয়। ২০০০ সালের পর থেকে দেশে অবকাঠামো খাতে যতটা বিনিয়োগ করা হয়েছে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা কম নয়। কিন্তু ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্টের সুবিধা নেয়ার জন্য তা বিশেষ সহায়ক নয়। একটা পদ্মা-সেতু তৈরী করতে বছর চারেক লাগতে পারে। তাতে অর্থনীতির অনেক সূচকে উন্নতি আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ একটা তরুণকে আজকের পৃথিবীর জন্য তৈরী ক’রে নিতে তার পেছনে প্রায় বিশ বছরের প্রচেষ্টা দরকার। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা তার দক্ষতার উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

অথচ বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতাবৃদ্ধির পেছনে তুলনামূলকভাবে গত ১৭ বছরে যথেষ্ট বিনিয়োগ করা হয়নি। ১৬/১৭ কোটি মানুষের একটা দেশে অন্তত পাঁচটা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থাকা দরকার। আছে একটা। তাও তার লোকেশন এমন একটা স্থানে যে তার কলেবর বৃদ্ধি করাটা বেশ কঠিন। কোনো কাজের জন্য দক্ষতা অর্জন করতে হ’লে আগে শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা চায়। জানি না নীতি-নির্ধারকেরা এটা নিয়ে কতটা ভেবেছেন। 

তরুণরা যদি কাজ না পায় তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তারা মাদকের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। তার একটা ভাল প্রতিকার হতে পারে ক্রীড়া আর সংস্কৃতি। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট। অথচ অনেকগুলো জেলা র’য়ে গেছে যেখানে ভাল-মানের মাঠ নেই ক্রিকেট খেলার জন্য। আমরা যদি সবগুলো জেলাতে একটা ক’রে ক্রিড়া কমপ্লেক্স তৈরী করতাম- তা বেশ উপকারী হতো। প্রথম অবস্থায় সেখানে প্রচুর অবকাঠামো তৈরীর দরকার নেই। বড়সড়ো খোলা মাঠ (অন্তত আলাদা আলাদা ২/৩টা ক্রিকেট মাঠ আর ১/২টা ফুটবল মাঠ) আর জিম হ’লেই চলবে। তবে মাঠগুলো নিয়মিত মেইনটেনেন্সে থাকতে হবে। গ্রাউন্ড যেন সবসময় খেলার উপযোগী থাকে তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাতে বেশ কিছু ইন্সট্রাকটর আর গ্রাউন্ডসম্যানের চাকরীও হবে। আর ক্রীড়া ক্ষেত্রের উন্নতি তো আশা করা যায়ই। সংস্কৃতি ক্ষেত্রটা নিয়ে ভাবনার অবকাশ তো আরো বেশি। যখন সংস্কৃতিটা আবার ব্যবসার অংশও হয়ে উঠেছে। গান-নাটক-চিত্রকলার স্কুলের পেছনে অনেক আনেক বিনিয়োগ আর মনোযোগ দরকার। দেশের টিভি চ্যানেল আর পাইরেসি নিয়ে নতুন ক’রে না ভাবলেই নয়। আমাদের ছেলেমেয়েদের ক্রিকেট খেলা বা অন্য কোনো খেলা আমাদেরকে দেখতে হবে। টিভিতে সেটা দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাধুলা নিয়ে কী ক’রে টিভি প্রোগ্রাম বানাতে হয় সেটা শেখাতে হবে মিডিয়া স্কুলে। এতদিন সেটা ঠিক মতো হয়নি বলেই আজো আমাদের একটা ভাল স্পোর্টস চ্যানেল নেই।

তরুণদের জানাশোনাতে যেন বৈচিত্র থাকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। তাদের কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। এগুলো করার জন্য প্রথমেই যেটা দরকার তা হলো শিক্ষা আর চিকিৎসা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ। সেটা আমরা করতে পারিনি বলেই আজো আমাদেরকে অনেক ব্যাপারেই বাইরের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ছোটখাটো একটা সেতু তৈরীর জন্যও আমাদের তাই বাইরের ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্য নিতে হয়। ২০০৮ থেকে স্বল্প-পরিসরে জাহাজ রপ্তানি শুরু করলেও জাহাজ ডিজাইন করার মতো দক্ষতা আজো আমাদের নেই। পোশাক তৈরীতে আমাদের দক্ষতা এখনো নিচের দিকে। আমরা পোশাকের ডিজাইন করি না বললেই চলে। একটা ভাল ফ্যাশন স্কুল আর প্রডাক্ট ডিজাইন স্কুল তৈরী করা খুবই দরকারী এখন। এটা করার জন্য যদি কিছু অবকাঠামোগত কাজ বাদ দিতেও হয় আমি তার পক্ষে। যদিও সবগুলো একসাথে করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। করতে চাই কিনা সেটাই বোধহয় আসল বিষয়। আমি এখানে যেটা বলতে চাইছি সেটা হলো অনেকগুলো ব্যাপার আমাদের যথাযত মনোযোগ পাচ্ছে না ব’লে মনে হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s