নগরী ঢাকা-৫

ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম। … সিএনজি অটোরিকশা একটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। যেটি কিনতে দাম পড়ে ৫ লক্ষ টাকার মতো। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন ক’রে রাস্তায় নামাতে গেলে এই ২০১৭ সালে সব মিলিয়ে খরচ পড়ে যায় ১৯ লক্ষের মতো টাকা। তাও সেই অটোরিকশাটি নতুন গাড়ি হয় না সাধারণত। পুরনো নষ্ট হ’য়ে যাওয়া কোনো মিশুক বা সিএনজি-অটোরিকশার নাম্বার ঘুষের বিনিময়ে নবায়ন করা হয়। এখন যে লোকটা ১৯ লক্ষ টাকার মতো বিনিয়োগ করলো ২০১৭ সালে একটা অটোরিকশার পেছনে তা সে তুলে নিতে পারবে কত বছরে এবং কিভাবে- সেটা একটা প্রশ্ন বটে।

হাইওয়েতে বিভিন্ন বাস কম্পানি প্রতিদিনই প্রায় কোনো না কোনো নতুন বাস নামাচ্ছে। ভাল ব্যবসাও করছে। এতে সাধারণ মানুষ ভাল সেবাও পাচ্ছে। অথচ এমনটা ঢাকা বা চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীন বাস যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘটছে না। এর পেছনের কারণটা মূলত অর্থনৈতিকই। সরকারী প্রতিষ্ঠানের ঘুষ আর রাজনৈতিক কিমবা স্থানীয় মাফিয়ার চাঁদাবাজির কারণে নতুন কোনো গণপরিবহনের নিবন্ধন নিতে খরচ প’ড়ে যায় গাড়ির প্রকৃত মূল্যের থেকে অনেক বেশি। যে কারণে ভাল মানের গাড়ি, যার দাম একটু বেশি পড়ে, তা শহরের গণপরিবহনে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা গিয়েছে কমে।

রাস্তায় লেইন মেনে চলাচলের রেওয়াজ আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। তার জন্য কোনো পুলিশি ব্যবস্থাও নেই। ফলে অহরহ লেইন পরিবর্তনের পরিণতিতে বেশিরভাগ গাড়িই অল্প কিছু দিনের ভেতরেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। কারো বা ভিউয়িং-মিরর খুলে প’ড়ে যায়। কারো বা বাম্পার ভেঙে যায় রাস্তায় নামার প্রথম দিনই। জানালার গ্লাস ভাঙা থাকার ব্যাপারটা এতটাই ক্লিশে হয়ে উঠেছে যে এটা নিয়ে কেউ সামান্য বিচলিত বোধও করে না। অথচ ফিটনেসের খড়গ ঠিকই আছে। অর্থাৎ পুলিশ মাঝে মাঝেই এইসব ক্ষতবিক্ষত গাড়িগুলোকে জরিমানার মুখোমুখি হ’তে বাধ্য করে। তাতে গাড়ির পরিচালন খরচ যায় বেড়ে। যে পুলিশের কাজ সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা তারাই শেষে তাদের ব্যর্থতাকে উপজিব্য ক’রে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়। কারণ তাদের জন্য এক ধরণের বাধ্যবাধকতা থাকে মাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক কেইস বা মামলা দেওয়ার। তারা সেটা দেয়ও। আর বাড়তি হিসেবে মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়ে ঘুষ নেয়া তো আছেই। সেটা পাবলিক এবং প্রাইভেট দুই ধরণের গাড়ির জন্যই।

আর কোলাটেরাল ড্যামেজের হিসাবটা খুব সহজ নয়। বিভিন্ন ধরণের হরতালের প্রচলন আর ব্যবহার আমাদের দেশে কম নয়। তাতে প্রথমেই সরাসরি ক্ষতির শিকার হয় গণপরিবহন খাতই। আবার ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরণের গুণ্ডা বাহিনী আছে। আমাকেই অনেকবার বাস থেকে নেমে যেতে হয়েছে এইধরণের গুণ্ডাদের কারণে। কখনো তেজগাঁও, কখনো মিরপুর, আবার কখনো বা ঢাকা কলেজের সামনে। ভাড়া নিয়ে হয়তো শিক্ষার্থীদের সাথে গ্যাঞ্জাম হয়েছে, তার কারণে তারা বাস থামিয়ে সাধারণ যাত্রীদেরকে নামিয়ে দিয়ে বাস ভাঙতে শুরু করেছে- এমনটা আমি অন্তত ৬ বার দেখেছি। আর ড্রাইভার আর কন্ডাকটরদেরকে মারধরের ঘটনা তো অহরহই ঘটে।

শহরের গনপরিবহন ব্যবস্থার ভেতর ক্রিয়াশীল রয়েছে এই ধরণের নানা অরাজকতা। আমি অবশ্যই সবগুলোর কথা বলতে পারিনি। এই নৈরাজ্যগুলোর কারণে গণপরিবহনের খরচ যায় বেড়ে। এইসব বাড়তি খরচগুলো শেষ পর্যন্ত যাত্রীদেরকেই বহন করতে হয়। ঢাকাতে শুধুমাত্র অফিসে যাতায়াতের জন্যই অনেককে মাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। যদি কখনো একটু বাড়তি বৃষ্টি বা শহরে বিদেশী সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান টাইপের কেউ আসেন তবে সেদিন খরচ যায় আরো বেড়ে। এর উপর যদি মাসে অন্তত ৩ বার বাজার বা শপিং বা কোনো বিনোদনের উদ্দেশ্যে কোথাও যাওয়া পড়ে তাহলে আরো ১৫০০ টাকা বাড়তি যোগ করা যায় যাতায়াত খরচ হিসাবে। জনপ্রতি মাসে শহরের ভেতরে যাতায়াত বাবদ প্রায় ৬ হাজার টাকা খরচ করেন এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু সেই যাতায়াত অভিজ্ঞতাকে এক কথায় দুর্বিষহ বলাটা ভুল হবে না। অথচ আর সামান্য আড়তি খরচ করলেই একটা ব্যক্তিগত গাড়ি পোষা যায়। মানুষ সেদিকেই ঝুঁকছে। মানুষ লোন ক’রে, টাকা জমিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি কিনছে। তাই দেখে অর্থমন্ত্রী হয়তো ভাবছেন দেশের অর্থনীতি তরতর ক’রে এগিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য তিনি এটা ঠিকই আইডেন্টিফাই করছেন যে অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী যে পরিমাণ টাকা বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে না। আমি যেটা মনে করি সেটা হলো, কাগজ-কলমে থাকা অর্থনৈতিক হিসাবের বাড়তি টাকাটা যে কোথায় খরচ হ’য়ে যাচ্ছে তা বুঝতে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন।

একটা ভাল এবং কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরী করতে হ’লে তাই শুধু নগর-পরিকল্পনাবিদদের দেওয়া প্রয়োজনীয় গাড়ির হিসাবের সংখ্যা আর তাদের রুট বিবেচনা করলেই হবে না। এর আর্থিক অব্যবস্থাপনার দিকটিও ঠিকঠাক করতে হবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s