নগরী ঢাকা-৭

মাঝে মাঝেই ঢাকা শহরের গতি থেমে যায়। রাস্তায় প্রচুর গাড়ীর থেমে যেতে হয়, থেমে থাকতে হয়। যখন গাড়ীগুলো চলে তখনও যে দরকারী গতিতে চ’লতে পারে সেটাও সবসময় নয়। এর নানা কারণ আমরা বলতে পারি। তবে এক-কথায় যদি ব’লতে হয় তা হ’লো, শহরের যাতায়াতের ব্যাপারটা নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা করা হয়নি।

অবশ্য শুধু যাতায়াতের কথা ব’ললে ঠিক বলা হয় না। এত বড় একটা শহর, অথচ তাকে নিয়ে কোনো সামগ্রিক ভৌত-পরিকল্পনা করা হ’য়েছে এটা বলা যাবে না। সামগ্রিক ভৌত-পরিকল্পনার কথা আদতে ভাবা হ’য়েছে নীতিনির্ধারণী মহলে- তাও বলা যাবে না। তবু যে চ’লছে শহরটা, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হ’লেও তা নিশ্চিত। দুষ্টু লোকেরা কেউ কেউ মাঝে মাঝে বলার চেষ্টা করেন, এভাবেও আর চলবে না বেশি দিন। শহরেরও প্রতিরোধ করার একটা সীমা আছে। সেই সীমা ছাড়াতে আর বিশেষ বাকি নেই। আর আশাবাদীরা কেউ কেউ বলেন, সব শহরেরই কিছু কিছু সমস্যা থাকে, কোনো কোনো বিশেষ সময় এবং পরিস্থিতিতে তারা হয়তো প্রকট হ’য়ে ওঠে, তবে চেষ্টা ক’রলে সেই সমস্যাগুলোকে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। একটা প্রাণবন্ত শহরের জন্য এর নাগরিকদের মধ্যে এই সমস্যাদেরকে সহনীয় পর্যায়ের মধ্যে রাখার আকাঙ্ক্ষা থাকাটা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এখন ঢাকা শহরের মানুষদের মধ্যে এই আকাঙ্ক্ষাটা সামাজিকভাবে আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। অনেক ব্যক্তির ভেতরে আলাদা ক’রে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে তারা যদি সঙ্ঘবদ্ধ হ’য়ে সামাজিক আকার না নিতে পারে তবে তা কার্যকরী হ’য়ে ওঠে না এই ২১ শতকের বাস্তবতায়।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়- ঢাকার মানুষদের ভেতরে এই সামাজিক আকাঙ্ক্ষাটা কার্যকর নয়। আর নয় ব’লেই ঢাকার মানুষগুলোর পরস্পরের উপর আস্থা নেই। নেই ব’লেই তারা শহরের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কখনো কখনো অথোরিটির লোকজন সামান্য কিছু খোঁজখরব ক’রে কোনো একটা বিধান জারি করে মাত্র। সেই সব বিধান মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না, সে খোঁজ কেউ করে না। তবে কখনো কখনো বিধানগুলোর অপব্যবহার যে হয় তা টের পাওয়া যায়। আর একবার অপব্যবহার শুরু হ’লে তা আরো অপব্যবহারের কারণ হ’য়ে ওঠে। ভাল পুলিশী ব্যবস্থা করতে পারলে এ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে কিনা বলা শক্ত। আবার বেরিয়ে আসাটা উপকারী হবে এমন দাবি করাও কঠিন। তবে ভাল পুলিশী ব্যবস্থা থাকুক বা না থাকুক, বর্তমান বিধির ব্যাপারে ঢাকার অধিবসীদের যে সম্মতি নেই সেটা মেনে নিতেই হবে। সম্মতি নেই বলেই তারা বিধি মানতে চান না অথবা বিধি-ব্যবস্থা তাদের স্বার্থের সাথে সাংর্ঘিক।

কখনো সুচিন্তিতভাবে ঢাকাকে গ’ড়ে তোলার চেষ্টা হয়নি ব’লেই ঢাকাতে অনেক কিছুই নেই। এমন অনেক কিছু যা একটা বড় শহরের জন্য খুবই দরকারী। যেমন সমাবেশের জন্য খোলা বড় কোনো জায়গা বা চাতাল কিমবা বড়সড় একটা খোলা মাঠ। ফলে মানুষের যাতায়াতের বিঘ্ন না ঘটিয়ে দরকারী সমাবেশ করা যায় না। মানুষ যদি কখনো কোনো ব্যাপারে প্রতিবাদ জানাতে চায়, তো রাস্তা বন্ধ না ক’রে আর উপায় থাকে না। আর সমাজ-ব্যবস্থা, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, বিশ্ব-পরিস্থিতি, উৎপাদন সম্পর্ক, প্রযুক্তি আর সভ্যতার অভিজ্ঞতা সবসময়ই পরিবর্তনশীল ব’লে- এদেরকে ধারণ করে যে নগর-কাঠামো তাও সদা পরিবর্তনশীল। কিন্তু পুরোনো-প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা তাদের অবস্থান সহজে ছেড়ে দিতে রাজি থাকে কমই। আর তাই মতভেদ একটি নাগরিক বাস্তবতা। নগরের প্রয়োজনেই নাগরিকদের মতভেদগুলো অন্য নাগরিকদের জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সে ব্যবস্থা থাকলে মতভেদগুলো অসহনীয়ভাবে পুঞ্জিভূত হ’য়ে ওঠার দরকার পড়ে না। হঠাৎ কখনো পুঞ্জিভূত হ’য়ে উঠলেও তা সবাই মিলে মোকাবেলা করাও যায় যদি মতভেদগুলো নিয়ে মুখোমুখি বসার বা অলোচনা করার মতো জায়গা থাকে, ব্যবস্থা থাকে, একটা অভ্যাস বা সংস্কৃতি থাকে। অজকের দিনে ইলেকট্রোনিক মিডিয়া হয়তো একটা ব্যবস্থা। তবে তা যে সর্বদা কার্যকরী সে দাবি করা বোকামি হবে, কারণ সবাই এটা ব্যবহার করার সুযোগ সবসময় পায় না।

নগরের বেড়ে ওঠার জন্য প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি আর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব প্রতিষ্ঠানের ধরণও নানাবিধ। সেসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও প্রতিনিয়ত চ’লতে থাকে ভাঙাগড়া। আর তা না চ’ললেই দিনে দিনে তার কার্যকারীতা কমতে থাকে। কোনো নগরে যখন অকার্যকরী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন সে নগরের বাস-যোগ্যতা কমতে থাকে। নাগরিকদেরই মূলত খেয়াল রাখতে হয় তাই প্রতিষ্ঠানগুলো দিকে। আর এই খেয়াল রাখার সবচেয়ে সহজ আর কার্যকরী উপায় হ’লো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে নাগরিকদের সদা-অংশগ্রহন। সেটা থেকেই নাগরিকেরা জানতে পারবেন তাদেরই পরিশ্রম, মেধা আর অর্থে গ’ড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে কিনা। তাদেরকে নিয়ে নতুন ক’রে ভাবা দরকার কিনা। প্রতিষ্ঠানে নাগরিকদের এই অংশগ্রহন নিশ্চিত করার জন্যও দরকার জায়গার। সে প্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দির ভেতরে তো বটেই, কখনো কখনো বাইরেও।

আবার নগর কখনই একটা একক ইউনিট হিসেবে গ’ড়ে ওঠে না। ঢাকাও ওঠেনি। এর মিরপুর, গুলশান, আজিমপুর, গ্যান্ডারিয়া, উত্তরা সবই আলাদা আলাদা একক ইউনিট। এসব ইউনিটগুলো আরো ছোট ছোট অনেকগুলো সাব-ইউনিটের সমাবেশ। অথচ এই ইউনিটগুলোর একক সামাজিক ইউনিট হ’য়ে ওঠার জন্য যে ধরণের অবকাঠামো দরকার তা গ’ড়ে তোলা হয়নি বললেই চলে। হয় যে নি, তা ঐ ভৌত-পরিকল্পনার অভাবের কারণেই। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, সেটা ঢাকার আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামগুলো নিয়ে। একটা মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকাতে, আর একটা মিরপুর আবাসিক এলাকাতে। দুইটার কোনোটার সাথেই নগরের সাধারণ মানুষের খেলার বা অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠ নেই। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যে একটা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অনুশীলনে যাবে – তারা একদিন ঐ চারপাশে গ্যালারী-ঘেরা মাঠে নিজেরা খেলতে নামবে আর সারা দেশ না হলেও অন্তত সারা শহরের মানুষ ওদেরকে দেখতে চাইবে- সে সুযোগ নেই। আর নেই ব’লেই তাদের মনে তৈরী হয়না ভাল খেলোয়ার হ’য়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।

এই যে নগরের ভেতরে প্রতিবাদ জানানোর জায়গা না থাকা, আকাঙ্ক্ষা জাগানোর মতো মাঠ না থাকার ব্যাপারটা- এগুলো এই নগরের মানুষদেরকেই খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। এবং এই জায়গাগুলো গ’ড়েও তুলতে হবে। সে নাগরিকদের অংশগ্রহন আর সম্মতিতেই।

One thought on “নগরী ঢাকা-৭”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s