যাপিত জীবন – ৩৩

হয়তো নাগরিক হ’লে ভাবনার থেকে দুর্ভাবনাই বেশি ক’রে গ্রাস করে। কারণ নাগরিক জীবনে নিশ্চয়তার স্বপ্ন যতটা থাকে তার থেকে অনেক বেশি থাকে আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙ্ক্ষা অনেক কিছু অর্জনের, ম্যাটেরিয়ালিস্টিক আর ননম্যাটেরিয়ালিস্টিক উভয়ই। অথচ নাগরিক হিসেবে আমরা যে চার্টার লিখে রাখি তাতে সুযোগের সাম্যতার বিষয়টা বেশ ফুলিয়ে ফাপিয়ে লেখা। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে আমরা জানতে থাকি আমাদের গড়া ব্যবস্থাগুলো বড্ড প্রতিযোগিতামূলক। সবার জন্য সব কিছুর সুযোগ সেখানে নেই। তখনই যোগ্যতার প্রশ্ন চ’লে আসে আমাদের সামনে। যোগ্যতা তৈরীর কারখানা যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে সবার জন্য প্রবেশের সমান সুযোগ আবার নেই। হয়তো কাগজে কলমে আছে। অর্থাৎ অনুশাসনের বইয়ে। আর বাস্তবতা অনেকটাই অন্য রকম গল্পের পসরা নিয়ে হাজির হয়।

আমি, আমরা দেখি মূলত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাকরীর জন্য পথে নেমে আসছে; তাদের নানা দাবি দাওয়া। উদ্যোগতা আর ব্যবসায়ীরা ব’লছেন, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জানাশোনার মান সন্তোষজনক নয়। ব্যবসায়ীরা তাই তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কখনো ভারত, কখনো শ্রীলঙ্কার লোকজন খুঁজে আনছেন। পরিসংখ্যানও ব’লছে গেলো বছর ১০ বিলিয়ন মার্কিন-ডলারের বেশি অর্থ ভারতে রেমিটেন্স হিসেবে গিয়েছে [১][২]। আর আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস ক’রে আসা তরুণেরা কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। সুযোগের সাম্যতা আর যোগ্যতার মুখোমুখি সংঘর্ষ। জানি না কে জিতে আসবে শেষে।

তবে দৃষ্টিসীমায় যতটা দেখতে পারছি, তাতে বুঝি সব কিছু ব্যবসায়ীদের দখলে যাবে। সরকারও আজ বড্ড বেশি ব্যবসায়ী-বান্ধব। সে সারা পৃথিবীতেই। ভোক্তা-বান্ধব ব’লে বোধহয় কোনো শব্দবন্ধই নেই। অথচ ব্যবসায়ী আর কয়টা লোক? ভোক্তাই তো বেশি। রণদা প্রসাদ সাহা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, কিন্তু আমরা বাঙালিরা তাকে ব্যবসায়ী ব’লে মনে রেখেছি কমই। সমাজ হিতৈষী ব’লেই চিনেছি তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানিদের হাতে তাঁর এবং তাঁর ছেলের একসাথে নিহত হওয়ার এতগুলো বছর পরও আমাদের সেই চেনাটা একটুও পাল্টে যায়নি। লোকটা বেশ কিছু স্কুল কলেজ হাসপাতাল গড়েছিলেন ব’লেই হয়তো। আজকের দিনেও অনেকেই এসব গড়ছেন। দেশে আজ শতাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। কতগুলো বেসরকারী হাসপাতাল আর ক্লিনিং আছে তার হয়তো সরকারী পরিসংখ্যান থাকতে পারে নানা মন্ত্রনালয়ের খাতায়; অর্থ-মন্ত্রনালয়ের খাতায় তো অবশ্যই। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে উপকারে আসছে না তা নয়। তবু আমরা এদেরকে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ব’লেই জানছি বা ভাবছি। সরকারও হয়তো ভাবছে। তাই মাঝে মাঝেই ভ্যাট-ট্যাক্সের নানা প্রশ্ন শুনি।

ব্যবাসায়ীরা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে আজ খুব কমই সরকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। সেখানকার শিক্ষার মান যে কমে গিয়েছে বা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার কারিকুলাম যে আগানো হয়নি বা সেখানে ঠিক মতো ক্লাস হয়না – এমন তরো অভিযোগ কম নয়। আমাদের ব্যবসায়ীরা সেটা যে জানেন না তাও নয়। তারা তাদের ব্যবসার সুবিধার জন্য নিশ্চয় কোনো একটা ব্যবস্থা ক’রে নেন। সেটাই ব্যবসার প্রকৃতি। ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য মুনাফা উৎপাদন। অযোগ্য বা কম যোগ্যতার মানুষদেরকে নিয়োগ করেন ব্যবসায়ী শুধু মাত্র তখনই যখন তারা কিনা তাদের উত্তরাধিকারী। সব মিলিয়ে সাধারণ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস ক’রে আসা শিক্ষার্থীগুলোর জন্য কাজের বা চাকুরীর সুযোগ গিয়েছে ক’মে। ওরাই তাই ওদের মতো ক’রে দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হচ্ছে রাস্তায়।

আমাদের যে এতে দায় নেই তাও নয়। গত ৭/৮ বছর ধরেই পাবলিক পরীক্ষাতে প্রশ্ন ফাঁস হ’তে দেখেছি আমরা। প্রতিবাদ করেছি খুব কম লোকই। না-শিখে বা কম-শিখেও ভাল ফল পেতে দেখেছি আমরা বছরের পর বছর। এই ছেলেমেয়েরাই আজ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ ক’রে চাকরীর জন্য, বিশেষত বিসিএস ক্যাডারের চাকরীর জন্য, পথে পথে সময় কাটাচ্ছে। এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমার মথায় একটা কথাই বারবার আসে- অপচয়, ভয়াবহ অপচয়। কয়েক লক্ষ তরুণ এক-দুই হাজার চাকরীর জন্য তাদের জীবন থেকে গড়ে তিন থেকে চার বছর খরচ করছে। ব্যবসায়ীক বা সামাজিক সব হিসাবেই এই অপচয় যে ভয়ঙ্কর পরিণতি টেনে আনবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং আশংকাই বেশি।

অনিশ্চয়তার ভাবনা নিয়েই তাই এই নাগরিক জীবন যাপন। কিমবা নগরে যাপন করা জীবন।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.dailyindustry.news/bangladesh-becomes-4th-largest-remittance-source-india/

২. https://cpd.org.bd/cpd-study-bangladesh-indian-remittance-source/

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s