২০১৮ তে সড়ক সম্পর্কে

শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহের উপরে রাস্তায়। মূলত চাওয়া সড়কে নিরাপত্তা। চাওয়াটা আমাদের অনেকেরই। আমাদের যাদেরকে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়। শহরের ভেতরে এবং বাইরেও। অথচ আমরা অনেক দিন ধ’রেই জানি আমাদের সড়ক নিরাপদ নয়। কেন নয় তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। সব কারণ খুঁজে বের ক’রতে হয়তো কয়েক মাসের স্ট্যাডি আর সার্ভের দরকার প’ড়বে। তবে আমরা যারা নিয়মিত রাস্তায় যাতায়াত করি তারা অভিজ্ঞতা আর কমন-সেন্স থেকে বেশ কিছু কারণ বলতে পারি। যেমন,

১. মান-সম্পন্ন/দক্ষ চালকের অপ্রতুলতা আছে দেশে। ডেইলি স্টার বলছে ঢাকাতে ৩৫ লাখের বেশি নিবন্ধিত গাড়ি আছে। তার বিপরীতে নিবন্ধন-ধারী চালক আছে ২৬ লাখের কিছু বেশি। অবার প্রচুর সংখ্যক গাড়ি নিবন্ধনের বাইরেও রয়ে গিয়েছে।

২. পাবলিক ট্রান্সপোর্টের গাড়িগুলোর অনেকগুলোর ফিটনেস নেই, ফিটনেস-সার্টিফিকেটের কথা বলছি না। এই ব্যাপারটা কিছুক্ষণ রাস্তায় দাড়িয়ে থাকলেই টের পাওয়া যায়। তার জন্য এমনকি গাড়িগুলোকে কোনো ফিটনেস টেস্টের মুখোমুখি করারও দরকার পড়ে না। গাড়ির সবগুলো ভিউয়িং-আয়না আছে, জানলার সবগুলো কাঁচ অক্ষত আছে, সবগুলো ইন্ডিকেটর (নির্দেশক) বাতি জ্বলতে পারে এমন বাস ঢাকাতে দেখতে পাওয়া বিরল ঘটনা। বরং রাংচটা আর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ঝুলে আছে এমন বাসের সাংখ্যাই বেশি ঢাকার কিংবা চট্টগ্রামের রাস্তাতে।

৩. নগরীতে পর্যাপ্ত পাবলিক-ট্রান্সপোর্ট নেই। যে পরিমাণ মানুষ ঢাকার রাস্তায় যাতায়াত করে তার কোনো হিসাব আছে ব’লে মনে হয় না। থাকলেও তার ভিত্তিতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সংখ্যা নির্ণয় ক’রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কখনোই। সরকারের গত বিশ/ত্রিশ বছরের উন্নয়ন ভাবনাতেও এর উপস্থিতি ছিলো ব’লে মনে হয় না। বাসগুলোতে মানুষের গাদাগাদি ক’রে যাতায়াত করতে দেখলেই বোঝা যায় প্রয়োজনের তুলনায় কত কম পাবলিক-ট্রান্সপোর্ট সুবিধা এই ঢাকাতে আছে।

৪. পাবলিক-ট্রান্সপোর্টগুলোর ভেতর অসুস্থ প্রতিযোগীতা বেড়েই চ’লেছে। একই রুটে একাধিক কোম্পানির রুট-পারমিট থাকায় এটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে অনেক দিনই। তার উপর গাড়িগুলোর ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কোম্পানির উপর খুব কম ক্ষেত্রেই। গাড়ির মালিকেরা সকালে দুই/তিন জনকে গাড়ির দায়িত্ব দিয়ে ব’লে দেন দিন শেষে এত টাকা তাদেরকে দিতে হবে আর বাকিটা তাদের। এই ব্যবস্থাতে অসুস্থ প্রতিযোগীতা তৈরী হবেই। এমনকি একই কোম্পানির গাড়ির ভেতরেও প্রতিযোগীতা দেখা যায়। সেটা এই ধরণের ব্যবস্থাপনার জন্যই।

৫. পাবলিক-ট্রান্সপোর্টে নানা ধরণের চাঁদাবাজি আর মাফিয়ার উপস্থিতি আছে। যারা পাবলিক-ট্রান্সপোর্টের চালক আর হেলপারদের সাথে সামান্য কথা-বার্তা বলেন, তারা সবাইই খানিকটা এটা সম্পর্কে জানেন। ঢাকার বাসগুলোর মালিকানা মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের, পুলিশের আর আর্মির। পত্রিকার খবরও অনেকটা তাই বলছে।

৬. গাড়ির নিবন্ধন নিতে ঘুষ দিতে হয় বিআরটিএ তে। ফিটনেস সনদ নিতে ঘুষ দিতে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা দিতে গেলে ঘুষ দিতে হয়। তার উপর পুরো শহরের জন্য পরীক্ষা দেওয়ার জায়গার কমতি আছে। ফলে ঘুষ না দিয়ে ওগুলো করতে গেলে সময়ের অপচয় হয় প্রচুর। কোনো দিন হয়তো এক হাজার গাড়ি ফিটনেস সনদ নিতে এলো, অথচ দিনে ফিটনেস সনদ দেওয়ার সক্ষমতা হয়তো আছে অর্ধেকেরও কম। ফলাফল ঘুষের লেনদেন। কিংবা হয়তো এগুলো সাজিয়েই ঘুষের বন্দোবস্ত করা হয়।

৭. ড্রাইভিং শেখার স্কুলের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। যাও বা আছে তাদের বেতন-কাঠামো শহরের বা দেশের গড়পড়তা জনসাধারণের সার্বিক আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ড্রাইভিং শেখার স্কুলগুলোতে গাড়ি চালানোর জন্য জায়গাও আছে খুব কম ক্ষেত্রেই।

৮. নিজে ড্রাইভিং পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখেছি পরীক্ষা দিতে আসা অষ্টম শ্রেণী পাস করা অনেকে ঠিক মতো পড়তেই পারে না। ড্রাইভিঙের সনদের জন্য যে লিখিত পরীক্ষা হয় তার অনেক কিছুই তারা পড়তে পারছে না। লিখতে পারা তো আরো পরের কথা। স্কুল লেভেলের শিক্ষার মান নিয়ে এখানে বাড়তি কথা না বলাই ঠিক হবে সম্ভবত।

৯. যেহেতু দেশে গাড়ির উৎপাদন হয় না তাই অনেক সময়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। ফলে কোনো গাড়িতে ছোটখাটো কোনো সমস্যা দেখা দিলে অনেকসময়ই তা ঠিকঠাক করার উপায় থাকে না। বা তা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। বিআরটিসির দোতলা ভলভো বাসগুলোর ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছে। বেসরকারী বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের টাকাটা ওঠার আগে তাদের গাড়িগুলো ছোটখাট কিছু ত্রুটির জন্য ডাম্প করবেন এমনটা আশা করা বাতুলতা।

১০. ঢাকা শহরের রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। বেশির ভাগ রাস্তাই ভাঙাচোরা। যেগুলো ভাঙাচোরা নয় ব’লে মনে হয় সেখানকার ম্যানহোলগুলো হয় রাস্তার লেভেল থেকে উঁচু নয় নিচু। সড়কের স্পিড-ব্রেকারগুলোর উচ্চতা কখনই বাজারের গাড়িগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক’রে নির্ধারণ করা হয়না। তার উপর শহরে খুব কম রাস্তা আছে যেখানে বৃষ্টির পানির ড্রেনেজ ব্যবস্থা যথাযত। এমন রাস্তায় গাড়ির ফিটনেস ধ’রে রাখাও কঠিন।

১১. বাংলাদেশের রাস্তায় বিভিন্ন গতির গাড়ি চলার অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ সেগুলোর সমন্বয়ের জন্য তেমন কোনো ট্রাফিক প্ল্যানিং নেই। রাস্তার লেইনগুলো কেমন হওয়া দরকার তা নিয়ে ট্রাফিকের কোনো ভাবনা নেই। প্রয়োগ তো নেইই।

১২. ঢাকাতে গাড়ির ডিজাইন পরিবর্তনের হার খুব বেশি। প্রেট্রোল চালিত গাড়িকে সিএনজি চালিত করাটাকে আমরা হয়তো গণনাতেই নিতে চাই না। অথচ গাড়ি-ডিজাইনের সময় ডিজাইনার কিন্তু এই গ্যাস সিলিন্ডারটির ভরের ব্যাপারটা বিবেচনা করেননি। লেগুনাগুলোর কথা না বললেই নয়। এই গাড়িগুলো মানুষ পরিবহনের জন্য তৈরীই নয়। নগরীতে চলাচল করা বাসগুলোর বেশির ভাগ তাদের মূল চ্যাসিস থেকে লম্বা, আর সেগুলো স্থানীয়ভাবে করা। এই বাসগুলো ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন।

১৩. পর্যাপ্ত ফুটপাথ না থাকায় পথচারীদেরকে বেশির ভাগ সময়ই মোটরযানের পাশাপাশি হাঁটতে হয়। যা সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ। ফুটপাথ যেটুকু আছে তার একটা বড় অংশ বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়ীরা দখল ক’রে নিয়েছেন। আবার মোটরসাইকেল চালকেরা যখন তখনই ফুটপাথে উঠে পড়েন। অনেক পথচারী আবার ফুটপাথের সাথে থাকা ফুট-ওভারব্রিজগুলো একদমই ব্যবহার করতে চান না।

১৪. সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যেসব অথরিটির উপর তাদের অযোগ্যতা আর অবহেলার সীমা-পরিসীমা নেই। উপরন্তু এই অরাজকতাকে পুঁজি ক’রেই তারা দিনের পর দিন অবৈধ উপায়ে অর্থ বানিয়ে চ’লেছেন।

এ রকম আরো নানা কারণে রাজধানী ঢাকা এবং সারা দেশের রাস্তা নিরাপদ নয়। নয় সেটা অনেকদিন ধ’রেই। এবং এই ব্যবস্থা হঠাৎ ক’রে তৈরী হয়নি। রাজনীতি আর আমলাতন্ত্র এর জন্য পুরাপুরিই দায়ী। অথচ তাদেরকে সেটা বলারও যো নেই। বলতে গেলেই তারা আমাদের বিরুদ্ধে ‘sedition’ বা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তোলেন। তাদের দৃষ্টিতে আমরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হ’য়ে উঠি। অথচ এই অব্যবস্থাপনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করাটাই রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক হ’তে পারতো। প্রশ্নগুলো থেকে আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে পারতাম। এই প্রশ্ন করার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই হয়তো এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কাজ করতে পারেন এমন বেশ কিছু দক্ষ মানুষও আমরা গ’ড়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু আমরা তা পারিনি। ফলে সড়কের এই সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান আছে ব’লেই আজ আমরা সাধারণভাবে ভাবতে পারছি না।

দায়টা আমাদের। আবার আমাদের নয়ও। কারণ আমরা জন-সাধারণ। কাগজে-কলমে আমরা ক্ষমতার মালিক হ’তে পারি, আবার তা প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা যে আমাদের নেই তাও সেই কাগজে-কলমেই লেখা আছে। অর্থাৎ পাওয়ার অব এ্যাটর্নি আমরা সরকারের উপর দিয়ে রেখেছি। সেই হিসাবে দায়টা সরকারের। আমাদের দায়টা প্রশ্ন তোলার। সরকারকে আমরা যে দায়িত্ব দিয়েছি তারা তা পালন করছে কিনা তা নিয়ে। এই লেখাটা সেই প্রশ্ন তোলারই একটা উপায় মাত্র। আমি প্রশ্ন তুলছি সরকারের প্রতি। সরকারের ব্যর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে সরকার-প্রধান কী ব্যবস্থা নেন সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি। নিশ্চিত ভাবেই সড়ক-মন্ত্রণালয় দীর্ঘ সময় ধ’রে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযত ভাবে পালন করেনি। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক-ব্যবস্থাপনার আইনগুলো যুগোপোযোগীও করা হয়নি। যে আইনগুলো আছে তার যথেষ্ট প্রয়োগও করা হয়নি। সমন্বয়হীনতা যে একধরণের অযোগ্যতা তা বলতেই হবে। আমাদের সড়ক মন্ত্রণালয়ের সে অযোগ্যতার কমতি নেই। দেদারসে গাড়ি নিবন্ধন দিয়ে চ’লেছে মন্ত্রণালয়, অথচ প্রশিক্ষিত চালক তৈরী করা হ’চ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখেনি। এই অযোগ্যতার ক্ষমা থাকতে পারে না।

The Great Debaters (2007), আমার খুব প্রিয় একটা মুভি । সেটাতে একটা ডায়ালগ আছে। When the law itself is the criminal we have a duty to resist it. ‘আইন নিজেই যখন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যায় তখন তাকে প্রতিরোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হ’য়ে দাঁড়ায়।’ শিক্ষার্থীরা আমাকে সেটাই আবার শিখিয়ে দিলো। অসংখ্য ধন্যবাদ তাদেরকে। তবে নিজের জন্য হতাশার যা তা হলো, আমার এবং আমাদের অনেকের ভেতর থেকেই এই রেজিস্ট করার সক্ষমতাটা মরে গেছে অনেক দিন হলো। আমরা শুধু অপেক্ষা করি, কবে আসবে আগামী। জেনে গেছি, এই আমলাতন্ত্র এই রাজনীতি আমাদের শহরের রাস্তাগুলোতে আগামী আনবে না। আক্রোশ জাগে দিনেদিনে…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s