বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০২

২০১২ সালের এক হিসাব মতে (১) ৩২৫ বর্গকিলোমিটারের ঢাকা শহরে প্রতি বর্গ-কিলোমিটারে মোটামুটি ৪৫০০০ জন মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান থেকে ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকার জন-ঘনত্ব বের করা একরকম অসম্ভব। কারণ শহরের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে বিভিন্ন ধরণের সেনানিবাস, দুইটি বিমান-বন্দর, অফিস-পাড়া, আদালত পাড়া, অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি বিভিন্ন ধরণের শিল্প ও বাণিজ্য এলাকা। এই সব এলাকাগুলোতে যারা কাজ করতে যায় তাদের বেশির ভাগই শহরের আবসিক এলাকাতে বসবাস করে। কেউ কেউ হয়তো দিনের কাজ শেষ ক’রে পার্শ্ববর্তী শহর যেমন নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ বা সাভারে চ’লে যায়। প্রতিদিন যত সংখ্যক মানুষ ঢাকা শহরে কাজ করতে আসে তা হিসাবে নিলে ঢাকা শহরের জন-ঘনত্ব আরো বেশি হবে। আবার এই বিবেচনায় বলা যায় জন-ঘনত্ব ব্যাপারটা দিন এবং রাতের সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল।

ঢাকা শহরের কি পরিমাণ জায়গা আবাসিক এলাকা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সেটা বের করা গেলে আবাসিক এলাকার জন-ঘনত্ব বের করা যাবে। অথবা আমরা একটা বিপরীত পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি। আগের পোস্টের উত্তরা ১৩ নাম্বার সেক্টরটি একটু হিসাব ক’রে দেখা যাক। আমরা সেক্টরটির একটি ডায়াগ্রাম বা পরিলেখ তৈরী করেছি। সেখানে বিভিন্ন আকারের মোট ৮৮৪ টি আবাসিক প্লট আছে। প্রতিটি প্লটে ৭ তলা বিল্ডিং এবং প্রতিটি তলাতে একটি ক’রে আবাসিক ইউনিট ধ’রলে মোট ইউনিটের সংখ্যা দাড়ায় ৫৩০৪টি। প্রতিটি ইউনিটে ৪ জন ক’রে মানুষ হিসাব ক’রলে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে মোট বসবাস করছে ২১,২১৬ জন।(যদিও অনেকগুলো প্লটের প্রতিতলায় একের অধিক মহল বা এ্যাপার্টমেন্ট আছে। আমরা হিসাবের সুবিধার জন্য এখানে একটি ক’রে ধ’রে নিয়ে হিসাব করছি। আবার তিনটি শোবার-ঘরের একটি মহলে অনেক ক্ষেত্রেই ৫ জন ক’রে বাস করে ব’লে হিসাব করা হয়।)

Uttara Sector 13 LAYOUT
উত্তরা সেক্টর ১৩ এর লে-আউট পরিলেখ

১৩ নম্বর সেক্টরের তিন দিকের রাস্তার পুরোটা, মাঝের মাঠ এবং পার্ক, ভেতরের সমস্ত রাস্তা এবং উত্তর দিকের বাণিজ্যিক প্লটগুলো সহ মোট জমির পরিমাণ ৫৫৭৪ কাঠা। সেই হিসাবে এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করছে ৬,১২,০৫২.২৯ জন। ছয় লক্ষ বারো হাজার বায়ান্ন জন। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য রকমের বড়।

হাউজিঙের জন্য বাংলাদেশে একটি বিধিমালা আছে। বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি-উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪ নামে। ২০১৫ সালে এই বিধিমালাতে বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই বিধি মোতাবেক বেসরকারী-আবাসন প্রকল্পের প্রতি একরে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ বাস করার অনুমোদন নেই। উপরের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে প্রতি একরে ২৩০.২৮ জন মানুষ বসবাস করছে। অর্থাৎ বিধি মোতাবেক এখানে আরো বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার সুযোগ আছে। সেই সুযোগ নিতে চাইলে প্লটগুলোর লে-আউট যে পাল্টাতে হবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ প্লটগুলোর লে-আউট এমনভাবে করা হয়েছে যেখানে ৭ বা ৮ তলার বেশি উঁচু ভবন বানানো অর্থনৈতিক বিবেচনায় লাভজনক নয়।

এই ধরণের প্লট-কেন্দ্রিক আবাসিক প্রকল্পে মানুষের শরীরের পক্ষে সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকছে না। কিভাবে সেটার ব্যবস্থা করা যায় সেটা নিয়ে শহর পরিকল্পনা আর ভবন পরিকল্পনার সাথে জড়িত পেশাজীবীদেরকে ভাবতে হবে। এই সব ক্ষেত্রের একাডেমিতেও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আর ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ঘন-বসতির শহরগুলোতে বর্তমানের ছোট ছোট কিছু প্লট একত্রিত ক’রে বড় আকারের প্লট তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার বিলম্ব না ক’রেই। কারণ ছোট প্লট সব বিচারেই সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন সুউচ্চ আবাসিক ভবন তৈরী হচ্ছে এবং সে সব ভবন পরিবেশ-বান্ধবও। আমাদের দেশেও সেটার চাহিদা আছে। কারণ পরিবেশ বান্ধব ভবনের বাসিন্দাদের চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে ঢাকার বা চট্টগ্রামের আলো-বাতাসহীন ভবনের বাসিন্দাদের থেকে কম হয়। আবাসিক ভবনগুলো পরিবেশ-বান্ধব হওয়াটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এই ভবনগুলোর ব্যবহারকারী আক্ষরিক অর্থেই সব বয়সের, সব পেশার মানুষ। আর অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক মানুষের আবাসিক ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতে হ’লে ভবনগুলোকে আকাশমুখী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন আমাদের হাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ প্রচুর। কিন্তু উত্তরার সেক্টর-১৩ এর মতো হাউজিং-পরিকল্পনা নানা ভাবে আমাদের হাতে থাকা সমসাময়িক নির্মাণ-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধ’রে এই সব ভবনে বাস করা মানুষের শরীরে বাড়ছে দুরারোগ্য আর স্থায়ী নানা অসুখ। আথচ মানুষের ঘর বা আবাসিক স্থান বানানোর মূলে যে ভাবনাগুলো ছিলো তার একটা হ’লো বেচে থাকার ভাবনা এবং তা সুস্থভাবে।

সুউচ্চ আবাসিক ভবনের সবকিছুই যে আমাদেরকে সুবিধা দেয় তাও নয়। যেমন তার নির্মাণ খরচ আপাতভাবে বেশি। এমন ভবন ডিজাইন এবং নির্মাণ করার মতো দক্ষ লোকেরও ঘাটতি আছে দেশে। এই ধরণের ভবনে বাস করা মানুষগুলোর ভেতরে সামাজিক সম্পর্ক কিভাবে গ’ড়ে উঠবে সে সম্পর্কে আমাদের বোধগম্য ধারণা খুব বেশি নেই, যেহুতু সুউচ্চ আবাসিক ভবনে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি দিনের নয়। আবার এই কিছু দিন আগেও ১০ তলা ভবনকেই আমরা সুউচ্চ ব’লে মনে করতাম। উপরন্তু সুউচ্চ ভবনের ব্যবহারগত (অপারেশন) খরচ বেশি। আবার আমাদের বেশিরভাগই প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে অর্থাৎ গাছপালা আর পশুপাখির সাথে, এমনকি পোষা হ’লেও, থাকতে স‌্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমাদের সাধারণ ধারণায় নেই যে সুউচ্চ ভবনে এগুলোর সবই ব্যবস্থা করা যায়। হয়তো কিছু বছর আগেও যেতো না। কিন্তু এখন যায়। পৃথিবীর নানা দেশেই স্থপতিরা এমনসব সুবিধাসহ আবাসিক ভবন ডিজাইন করছেন। স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশেও এমন কিছু ভবন তৈরী হয়েছে। তবে সেগুলোর খবর আমাদের সবার কাছে পৌছেনি বললেই চলে।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.newgeography.com/content/003004-evolving-urban-form-dhaka

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s