বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৩

একটা দেশের সার্বিক বাসস্থানের পরিকল্পনার সাথে তার অর্থনীতি আর উৎপাদন ব্যবস্থার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কয়েকদিন আগে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগ ক’রে অনেকেই বিপদে পড়েছেন। (১) তার একটা বড় কারণ সেখানকার আবাসন ব্যবস্থা। বলা হ’য়েছিল ইথিওপিয়ার পোশাক-শ্রমিকদেরকে ন্যুনতম ২৬ মার্কিন-ডলার বেতন দিলেই হবে। যে সময় এটা প্রচার করা হয়েছিল সেই সময় ইথিওপিয়াতে এমন একজন শ্রমিককে তার আবাসনের পেছনে মাসে ১৫/১৬ মার্কিন-ডলারের সমপরিমাণ খরচ করলেই চলতো। কিন্তু নানা দেশ থেকে বড় আকারের বিনিয়োগ আসার পর ইথিওপিয়াতে যখন অনেকগুলো বৃহদায়তন কারখানার নির্মাণ শেষ হ’লো তখন দেখা গেলো কারখানাতে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিকের অর্থনৈতিক অঞ্চলের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা নেই। ফলে হয় শ্রমিকদেরকে অনেক দূর থেকে এসে কাজ করতে হবে নয়তো শ্রমিকদের জন্য দ্রুত আবাসন ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে কারাখানাতে আসার যাতায়াত খরচ আর সময় দুইই বেশ বেশি। তার উপর যোগাযোগ ব্যবস্থাও যথেষ্ট উন্নত নয়। সমাধান হিসেবে চীনা বিনিয়োগকারিরা শ্রমিকদের জন্য আবাসন অবকাঠামো দ্রুত তৈরীর উদ্যোগ নিয়ে ফেললো। ফল-স্বরূপ মাসের আবাসন খরচ ১৫/১৬ মার্কিন-ডলার থেকে বেড়ে ৫২ মার্কিন-ডলারে গিয়ে দাড়ালো।

যে শ্রমিকের মাসে আবাসনের পেছনে ৫২ মার্কিন-ডলার খরচ করতে হয় তাকে মাসে ২৬ মার্কিন-ডলার বেতন দেওয়া যায় না। পুরো কাঠামোটাই সাস্টেইনেবল হয় না।

বাংলাদেশের পোশাক-শ্রমিকদের আবাসন নিয়ে তেমন একটা ভাবা হ’য়েছে ব’লে আমার মনে হয় না। ইদানিং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান যদিও এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, তবে সেগুলো সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ যে নয় তা এক রকম নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। শুরুতেই বাংলাদেশের সফল দুইটা রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের ২০১৩ এবং ২০১৮ এর তুলনামূলক উপগ্রহ-চিত্র দেখে নিই, খানিকটা ধারণা পাওয়ার জন্য।

Shavar EPZ 2013
সাভার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা – ২০১৩

সাভারের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ২০১৩ সালের চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে এর খুব নিকটেই নানা আয়সীমার মানুষের থাকার ব্যবস্থা ছিলো। যার ফলে শ্রমিকের ন্যুনতম মজুরির ব্যাপারটাও সম্ভবপর হয়েছিল। ২০১৮ সালে এই এলাকার আবাসনের চিত্র বেশ একটু পরিবর্তীত হ’য়েছে। রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকাকে ঘিরে বহুতল আবাসন এলাকার ঘনত্ব বেড়েছে। আশেপাশে আরো কিছু কারখানা নির্মাণ হওয়ায় শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। তবে আশপাশের গ্রামগুলো এখনো কম মজুরির শ্রমিক সরবরাহ ক’রে চলেছে। সেটা নিচের চিত্র থেকে খানিকটা বোঝা যাবে।

Shavar EPZ 2018
সাভার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা – ২০১৮

এই এলাকাতে বা এর খুব নিকটে আরো একটি রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গ’ড়ে তুললে সেখানে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক এর আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করার সুযোগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। চট্টগ্রামের রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকার জন্যও মোটামুটিভাবে একই কথা বলা যায়।

Chattogram EPZ 2013
চট্টগ্রাম রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল – ২০১৩

২০১৩ এর চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বেশ নিকটেই নিম্ন-আয়ের শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা আছে। এবং এই ব্যবস্থার জন্য কারখানা-বিনিয়োগকারীদেরকে কোনো উদ্যোগ নিতে হয়নি। ফলে শ্রমিকের কম মজুরির ব্যাপারটা খানিকটা হ’লেও সাস্টেইনেবল হ’য়েছে। আর সেজন্যই ২০১৮ এর শেষে এসেও চিত্রটা মোটামুটি একই রকম আছে।

Chattogram EPZ 2018
চট্টগ্রাম রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল – ২০১৮

যদিও রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের চিত্র খুব একটা পাল্টায়নি, তবে আশেপাশের আবাসিক এলাকার ভবন-ঘনত্ব বেড়েছে। বন্দর-সুবিধা বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। এই এলাকার উত্তরে অবস্থিত হালিশহরের জন-ঘনত্ব দিনদিন বাড়ছে। তাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি শ্রমিকের চালান পেতে এখনো পর্যন্ত বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। আর হয়নি ব’লেই শ্রমিকদের আবাসন নিয়ে বাংলাদেশকে ইথিওপিয়ার মতো বিপদে পড়তে হয়নি এখনো পর্যন্ত।

(চট্টগ্রামের পতেঙ্গা-শৈকত সংলগ্ন ইপিজেডের পশ্চিম পাশের ভূমিরূপের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সাগরের পানির উচ্চতা যে বাড়ছে তা এই জায়গার ২০১৩ আর ২০১৮ এর উপগ্রহ-চিত্র থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে।  সাড়ে ৫ বছর সময়ের ব্যবধানে অনেকটা জায়গা সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছে।  ইপিজেডকে রক্ষা করার জন্য নতুন বাধ তৈরী করা ছাড়া বিশেষ একটা বিকল্পও ছিলো না খুব সম্ভবত। এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ আছে)

এই সুযোগে ইথিওপিয়ার নতুন রপ্তানি-নির্ভর কারখানা-অঞ্চলের উপগ্রহ-চিত্রও একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে।

Ethiopian EPZ 2019
ইথিওপিয়ার বিদেশী বিনিয়োগ অঞ্চল – ২০১৯

গুগল-আর্থ ব’লছে উপরের চিত্রটি ২০১৯ এর মার্চ মাসের। কারখানা-অঞ্চলটি ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার বেশ নিকটে হ’লেও কারখানা-এলাকার গা ঘেষেই তেমন কোনো আবাসিক এলাকা দেখা যাচ্ছে না, যেমনটা বাংলাদেশের দুইটা রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আর এজন্যই এখানে শ্রমিকদের আবাসনের পেছনেও বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত ব্যবস্থার পেছনেও নতুন ক’রে খরচ করতে হচ্ছে। আলোচনাটা শুধুমাত্র আবাসন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নিমিত্তে শ্রমিকের দক্ষতার প্রশ্নটা আপাতত মুলতবি রাখছি।

উপরের উদাহরণ থেকে অন্তত একটা বিষয় বেশ বোঝা যায়। আর সেটা হ’লো কারখানার উৎপাদন খরচ কম রাখতে পারার পেছনে আবাসন ব্যবস্থার ধরণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আর এ কারণেই কারখানা কিমবা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জায়গা নির্বাচন এবং তার পরিমাণ নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

সাভার এবং চট্টগ্রামের রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের আশেপাশের আবাসন ব্যবস্থাকে একটা সফল (খানিকটা হ’লেও) কেস-স্ট্যাডি হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। যদিও এই আবাসন ব্যবস্থা সেই অর্থে পরিকল্পিত নয়। কিন্তু নতুন কারখানা-অঞ্চল আর তার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ক’রতে গেছে এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বুঝে নেওয়াটা সহায়ক হ’তে পারে। কিছু বৈশিষ্ট্য এমন হ’তে পারে –

– কারখানা অঞ্চলটি একটি মূল-সড়কের সাথে যুক্ত।
– করখানা অঞ্চলটি আকারে অনেক বড় নয়। ফলে মোটামুটি ১৫ থেকে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে না।
– আশপাশের গ্রাম বা উপশহর এলাকা থেকেই প্রয়োজনীয় শ্রমিকের বড় অংশের সংস্থান হয়।
– একটি বড় শহর থেকে কারখানা অঞ্চলটি খুব বেশি দূরত্বে নয়। ফলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়েছে।

দেশে নতুন ক’রে যে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গ’ড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হ’চ্ছে সেখানে আবাসনের ব্যাপারটা কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে সেটা জানতে পারিনি এখনো। সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া-শিল্পের জন্য যে অঞ্চলটি গ’ড়ে তোলা হয়েছে সেখানে নানা ধরণের সমস্যা এরই ভেতরে শুরু হয়েছে ব’লে খবরে আসতে শুরু করেছে। উপগ্রহ-চিত্র থেকেই ধরতে পারা যায় যে এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিক পাওয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ার সম্ভাবনা বেশ বেশি।

Hemayetpur Leather Industry Zone 2019
সাভারের হেমায়েতপুর চামড়া শিল্প/কারখানা অঞ্চল – ২০১৯

হেমায়েতপুরের এই জায়গাটাতে আরো কিছু কারখানা আগে থেকে থাকলেও এর আশপাশের আবাসিক এলাকা এতবড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সাপোর্ট দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। আর এই এলাকাতে আগে থেকে বাস ক’রে আসা মানুষগুলো মূলত কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিলো। ট্যানারির কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা দক্ষ শ্রমিকদেরকে এই অঞ্চলের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা করাটা এখন খুবই জরুরি হ’য়ে পড়েছে। তাদের জন্য কী ধরণের আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা যায় সেটা নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা উচিত। আমার মনে হয় না কাজটা খুব সহজ হবে। যদিও মূল-সড়ক থেকে এটা খুব দূরে অবস্থিত নয় তার পরও।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরেরসরাই এবং ফেনীর কিছুটা এলাকা নিয়ে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল গ’ড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে যে পরিমাণ লোক কাজ করবে ব’লে বলা হচ্ছে তার ১০ শতাংশ মানুষও ঐ এলাকার আশেপাশে বাস করে না। তার উপর যারা কাছাকাছি বাস করছে তাদের দক্ষতা  নতুন কারখানাগুলোর জন্য পয়োজনীয় দক্ষতার সমকক্ষও নয়। ফলে এখানে একেবারে নতুন ক’রে আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতেই হবে। তার ধরণ বা প্রকৃতি যে আমাদের দেশের আগের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে ধার করা যাবে তা মনে হয় না। হেমায়েতপুরের ট্যানারি-কারখানা অঞ্চল থেকে এই ধরণের পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। আর সেটা খুব দ্রুতই শুরু করা দরকার ব’লে মনে করি।

সূত্র :
১. https://www.prothomalo.com/economy/article/1608205/%E0%A6%87%E0%A6%A5%E0%A6%BF%E0%A6%93%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%80

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s