বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৪

পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশের আবাসিক পরিকাঠামোতে সুউচ্চ বা হাই-রাইজ ভবনের ব্যবহার খুবই কম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের মতো কয়েকটি বড়-শহর যেখানে জমির দাম যথাযত কারণ ছাড়াই হুহু ক’রে বেড়ে যাওয়ায় সে সব শহরে সুউচ্চ ভবনের চাহিদা বেড়েছে। তৈরীও হচ্ছে বেশ কিছু। খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বগুড়া আর সিলেটেও বেশ কিছু সুউচ্চ ভবন গ’ড়ে উঠেছে, সেও ব্যবসায়িক চাহিদার কারণেই। তবে সুউচ্চ আবাসিক ভবনের সংখ্যা এসব শহরের জন-ঘনত্বের অনুপাতে বেশ কম। আর কম ব’লেই শহরের আয়তন বাড়ছে। বাড়ছে অতিরিক্ত গাদাগাদি ক’রে বাস করার পরিবেশ। তাতে আলো-বাতাসের পরিমাণ যাচ্ছে কমে। ফলস্বরূপ শহরের মানুষের স্বাস্থ ঝুঁকি বাড়ছে।

আবার কৃষি আর প্রাকৃতিক জমির পরিমাণও যাচ্ছে কমে। নদীর পাড় দখল হচ্ছে। বনভূমি উজাড় ক’রে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতি, শিল্প-এলাকা, বন্দর। এসবের সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে ইকো-সিস্টেমের উপর। বিলেতিরা অনেক বন্য-প্রাণী বিলুপ্ত ক’রে দিয়ে গিয়েছে আমাদের দেশ থেকে। যেমন নীলগাই, তিন প্রজাতির গন্ডার, চিতাবাঘ; বিলেতিদের হত্যার বাসনা পূরণের নিমিত্তে। নদীর অনেক মাছ আর প্রাণীর সংখ্যাও দিনদিন কমে আসছে। এসবের একটা সমাধান হ’তে পারে সুউচ্চ আবাসিক ভবনের ব্যবহার। অর্থাৎ মানুষের বসবাসের জায়গার ফুটপ্রিন্ট (যতটা জমির উপর বিল্ডিং করা হয়) যতটা সম্ভব কমিয়ে এনে সেই জমির বেশ কিছুটা আবার প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

কিন্তু শহরের আবাসিক ভবনের ফেবরিকটা এক-দুই তলাবিশিষ্ট ভবন থেকে পাল্টে দশ বা ততধিক তলাবিশিষ্ট ভবনে পাল্টে ফেলাটা সহজ নয়। আবার লো-রাইজ বা কম-উচ্চতার আবাসিক  ভবন ভেঙে সেখানেই বহুতল ভবন বানিয়ে নিলে তার পরিণতি যে কেমন হ’তে পারে তা আমরা এখনকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে জানতে পারি। একসময়ের মোটামুটিভাবে দোতলা আবাসিক ভবনের একটা আবাসিক এলাকা সময়ের ব্যবধানে হ’য়ে যেতে থাকে ছয় তলা বিশিষ্ট। ঢাকার জন্য ২০০৮ এ নতুন বিল্ডিং-বিধি চালু হওয়ায় এখন তার অনেকগুলো রাস্তাতেই পনের তলা-বিশিষ্ট ভবন গ’ড়ে উঠছে। আর সেসব ভবনগুলো শহরের অন্যান্য বিষয়গুলোর সাথে বিবেচনা না ক’রে তৈরী করার কারণে সেসব এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ সেখানে বাস করা মানুষের মনে স্বস্তি আনতে পারছে না। অথচ আবাসের স্থান বা গৃহেই স্বস্তি খুঁজেছে মানুষ বছরের পর বছর ধরে।

মোটা দাগে ব’লতে গেলে, যেভাবে আমরা আমাদের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলছি তার ভেতরে বেশ কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ত্রুটিগুলোকে সমাধানের চেষ্টা কারার আগে তাকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার যাকে ত্রুটি বলছি তা হয়তো ঠিক ত্রুটিও নয়, হয়তো বৈশিষ্ট্য মাত্র। আগে হয়তো ৯টা প্লটে ৯টা পরিবার থাকতো। বর্তমানে হয়তো একটা ৫ কাঠার প্লটেই ৯টা পরিবারের থাকার ব্যবস্থা তৈরী করছি আমরা। অথচ এই ৯টা পরিবারের জন্য কমন কোনো কমিউনিটি-স্পেস বিল্ডিঙের ভেতরে বা বাইরে গড়ে তুলছি না আমরা। হয়তো ঠিক মতো হিসাবও করতে পারছি না কতটা জায়গা দরকার এই ৯টা পরিবারের জন্য কমিউনিটি-স্পেস হিসেবে। আবার কতগুলো পরিবারের জন্য একটা কমন কমিউনিটি-স্পেস কার্যকরভাবে উপযোগী হ’তে পারে তা নিয়েও আমাদের গবেষণা নেই।  নির্দিষ্টি কিছু সংখ্যক পরিবারের পক্ষে পরষ্পরের জন্য প্রয়োজনীয় কমিউনিটি-স্পেস কতটা লাগবে তার হিসাব করাটা জরুরী। এই কমিউনিটি-স্পেস হিসাব করতে গেলে সেই পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পেশাগত কাজের ধরণ, যাতায়াতের প্রকৃতি, জীবনযাপনের রুচি আর সামর্থ, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক পরিচয়, বর্তমান সময় আর আধুনিক-প্রযুক্তির ব্যবহার – সর্বোপরি আবাসনের প্রকৃতির সবগুলো বিষয় বিবেচনাতে নিতে হবে। মনে রাখা দরকার যে এ কাজটা খুব সহজ নয়। এবং কাজটা কোনো একক মানুষের কাজও নয়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s