বিভাগবিহীন

নগরী ঢাকা ১০

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া আজকের দিনের বড়সড় কোনো নগরীকেই আর বেশি দিন টিকিয়ে রাখা (সাস্টেইনেবল) বা নিদেনপক্ষে কার্যকর রাখা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন আর তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার এক নগর থেকে আর এক নগরের মাঝে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য, দরকার নগরের অভ্যন্তরে নাগরিকদের এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য দরকার নগরীর জ্বালানী (এ্যানার্জি) চাহিদা মেটানোর জন্য। নগরে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য। নাগরিকদের প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার জন্য। এমনকি এখনকার শহরগুলোর পার্ক, জলাশয় বা প্রাকৃতিক পরিবেশও প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল-পার্ক কিমবা ঢাকার হাতির-ঝিলের কথা বলা যায়। কারণ এই জায়গাগুলোর স্বাভাবিক বাস্তু-সংস্থান (ইকো-সিস্টেম) অনেক আগেই বিঘ্নিত ক’রে ফেলা হয়েছে, কিমবা এই জায়গাগুলোকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই প্রাকৃতিক ভাবে জায়গাগুলো সেরকম নয়।

কিন্তু আধুনিক কালের প্রযুক্তি ব্যাপারটা যেন প্রেমিকার হৃদয়াবেগের থেকেও বেশি দ্রুত পরিবর্তনশীল। মান্ধাত্তার আমলের প্রযুক্তি ঠিক কতটা উপযোগী ছিলো জানি না। তবে সেসব প্রাযুক্তিক উপকরণগুলো বহুদিন টিকতো ব’লে একধরণের প্রচার আছে। টিকে থাকাটাই সাস্টেইন করা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে সূক্ষ্ণ (সফিস্টিকেটেড অর্থে) প্রযুক্তি-পণ্য বা আয়ুধ (টুল) দীর্ঘস্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। ফলে এই ধরণের পণ্যগুলো দ্রুত বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের উৎসে পরিণত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের তাই বেশ কিছু হ্যাপাও আছে। পরিত্যক্ত প্রযুক্তির ভার বহনের ক্ষমতাও আজকের দিনের শহরগুলোর তাই না থাকলেই নয়, অন্তত খানিকটা হলেও। সেক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার-প্রযুক্তি সহায়ক হ’তে পারে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের আর একটা বড়সড় জটিলতা হ’লো এটা চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, তা কিনে ফেলার পরও। (এটা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন আমার বাবা যিনি এখনো মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারেন না।) প্রযুক্তি-পণ্য ব্যবহারের জন্য অনেক সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। আবার দক্ষতাও এমন একটা জিনিস যা সবাইকে সমান ভাবে ধরা দেয় না। তবে আজকের দিনের শহরকে মোটামুটি কর্মক্ষম রাখার জন্য যে প্রযুক্তিগুলোর দরকার পড়ে তার ব্যবহার-প্রণালী শহরের সব নাগরিকের না জানলেও চলে। কিন্তু যাদেরকে এই ব্যাপারগুলো জানতেই হবে তাদের সংখ্যা আর দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শহরে গ’ড়ে তুলতে হয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বা ইনিস্টিটিউট।

এই একুশ শতকের কোনো একটা শহর বা নগরে যে পরিমাণ মানুষ গাদাগাদি হ’য়ে বসবাস করে প্রাকৃতিক (অর্গানিক অর্থে) ভাবে সেভাবে বসবাস করা যায় না। বিলেতিরা যখন ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশ ছেড়ে চ’লে গেলো তখন এই দেশের মানুষের গড় আয়ু ২৭/২৮ বছরের কাছাকাছি ছিলো। যদিও নারীপ্রতি সন্তান নেওয়ার হার এখনকার থেকে কয়েকগুণ বেশি ছিলো, তবুও দেশের মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিলো বেশ কম। তার একটা বড় কারণ এই নিম্ন গড় আয়ুর ব্যাপারটা। আবার প্রেক্ষিত আয়ুস্কাল কম থাকায় মানুষজনকে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরী আর বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্নে কম বয়সে সংসার শুরু করা ছাড়া বিকল্প ছিলো না, যার সামাজিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশ আর ঢাকার মানুষের গড় আয়ু বেশ বেড়েছে। ঢাকার জন-ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে এর নাগরিকদের আয়ুস্কাল বৃদ্ধির বড় ভূমিকা আছে। আবার নাগরিকদের এই আয়ুস্কাল বৃদ্ধিতে শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানের দারুন কিছু কার্যক্রমের ভূমিকাও আছে। অদ্ভুত ভাবে ঢাকাতে এখন নারী-প্রতি সন্তান নেওয়ার হার দেশের সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি।

মোটাদাগে ব’লতে গেলে কারখানা বিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন) পর থেকে শহরের অবকাঠামো খাতে নানা ধরণের পরিবর্তন আনা গেছে ব’লেই আজকের দিনের শহরগুলোতে এতএত মানুষ এতটা ঘনবসতিতেও বেঁচে থেকে বসবাস করতে পারছে। আর সেই পরিবর্তনগুলো সম্ভব হয়েছিলো নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিস্কার আর তার ব্যববহার নিশ্চিত করতে পারার কারণেই। এক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে বিশ শতক পরবর্তী শহরের কাঠামোতে। নাগরিক জীবনে তো বটেই।

অর্থাৎ নগরীকে কার্যক্ষম রাখার জন্য আজকের দিনে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। আর সেই প্রযুক্তিকে সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন যথাযত প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। সিটি-কর্পোরেশন, ওয়াসা, পানি-উন্নয়ন বোর্ড, ডেসা, ডেসকো, পল্লী-বিদ্যুৎ, রাজউক, কেডিএ, সিডিএ, সিভিল-এ্যাভিয়েশন, মেট্রো সার্ভিস, সড়ক কর্পোরেশন ইত্যাকার নানা প্রতিষ্ঠান। আবার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করবে যে মানুষগুলো তাদের দক্ষতা তৈরীর জন্য প্রয়োজন নানা ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। এ এক বিপুল যজ্ঞ।

আজকের ঢাকা নগরীর জন্ম ১৯৪৭ এর আগে নয়, বাস্তবতার নিরিখে। ১৯৪৭ সালের পরে নানা স্থান থেকে যেভাবে ঢাকাতে মানুষ জড়ো হ’তে শুরু করে তার কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি ঢাকার ছিলো না, প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায়। ফলে ঢাকার বিভিন্ন বসতি কেন্দ্রগুলো বর্ধিত গ্রাম বা নিদেনপক্ষে ছোট শহরের চরিত্র নিয়ে বড় হ’তে থাকে পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত। বাজার, বিদ্যালয়, মসজিদ-মাদ্রাসা আর কিছু রাস্তাঘাট ছাড়া আর কোনো নাগরিক সুবিধা এইসব কেন্দ্রগুলোতে অনেক দিন পর্যন্ত গ’ড়ে ওঠেনি ব’ললেই চলে। এমন একটা শহরেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন মানুষের আগমন ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। কেন যে যায়নি তা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো (বিশ্ববিদ্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) খুব বেশি সমীক্ষাও হয়তো করেনি, অন্তত সাধারণের কাছে প্রকাশ যে করেনি তা বলা যায়। আর করেনি ব’লেই এই নগরীতে মানুষের আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি ব’লেই শহরের অনেক অবকাঠামো নিয়ে ন্যুনতম পরিকল্পনাও সাজানো যায়নি। জানি না দক্ষ মানুষের অভাব ছিলো কিনা। তবে নাগরিকদের ভেতরে এই শহরকে গ’ড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি ছিলো প্রকট। এখনো যে নেই তাও বলা যাবে না।

আশার কথা এই যে ঢাকার কাছে এর নাগরিকদের চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে যে কিছুকিছু সুবিধা বা সার্ভিস যদি গ’ড়ে তোলা না যায় তবে এই শহরের বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো এটা বুঝতে শুরু করেছে তাদের কাছে দুইটার বেশি বিকল্প আছে ব’লে মনে হয় না। হয় এই শহরের অনেকগুলো বর্তমান-সুবিধাকে উন্নত করতে হবে, কিছুকিছু নতুন ক’রে গ’ড়তেও হবে অথবা এই শহর থেকে পালাতে হবে। আমার চেনাজানা অনেকেই যে পালিয়ে গেছেন তা ব’লতে দ্বিধা নেই। আবার অনেককে দেখেছি উন্নত কোনো নগরের উন্নত কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন দক্ষতা শিখে এসেছেন। এখন চেষ্টা করছেন সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে সাহায্য করা যায় কিনা।

কিন্তু বুনিয়াদি একটা নগরকে আগামীর জন্য গ’ড়ে উঠতে সাহায্য করাটাও সহজ নয়। তাতে অনেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান/প্রথা/নায়কদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হয়। কিছু দিন আগে দেখলাম স্থপতি মোহম্মদ মাসুম ঢাকার শিশু-পার্কের পরিলেখ নিয়ে দারুন একটা প্রশ্ন করেছেন। শাহবাগের শিশু-পার্কটি যে জায়গাতে গ’ড়ে তোলা হ’য়েছে সেখানেই ছিলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মঞ্চ। যে স্থপতি শিশুপার্কের পরিলেখটি তৈরী করেছেন তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য-শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোধা ব্যক্তিদের একজন। অথচ তিনি তার করা সেই পরিলেখে ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চিহ্ন (সিম্বল) কে একদম এড়িয়ে গেছেন। এটা সচেতন ভাবে করা কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন। যদি সচেতন ভাবে করা হ’য়ে থাকে তবে তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন কিনা। আর যদি সচেতন ভাবে না করে থাকেন তবে শিক্ষক বা মেন্টর হিসেবে তার ভূমিকাকে যতটা সম্মান করা হয় ততটা সম্মান তার প্রাপ্য কিনা।

কখনো কখনো একজন মানুষও প্রতিষ্ঠান হ’য়ে উঠতে পারেন। শহরই তাদেরকে সেই সুযোগ ক’রে দেয়। কিন্তু তেমন প্রতিষ্ঠানকেও প্রশ্ন করতে হবে নির্দ্বিধায় যদি সামনের দিকে আগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে। সম্প্রতি অনেকগুলো পত্রিকাকে দেখলাম ঢাকা-ওয়াসার গত এক যুগ/দশকের কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরণের প্রতিবেদন ছাপাতে। ঢাকার নাগরিকেরা তথা সরকার এই সময়কালে এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে কম খরচ করেনি। অথচ সেই অনুপাতে শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থার উন্নতি খুবই হতাশার। অবশ্যই এখানে দায় আছে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মানুষগুলোর। কিন্তু সাথে এই প্রশ্নও তুলতে হবে কেন আমরা ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তুলতে পারছি না। কি কি কাজ করলে তেমনটা করা সম্ভব হবে।

এই কাজগুলোর একটা নিশ্চিত ক’রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। শুধু নালা বা ড্রেন তৈরী আর মাঝেমাঝে সেগুলোকে সংস্কার করে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আর করা যাবে না। তার একটা বড় কারণ ঢাকার পুকুর আর জলাধারগুলোর পরিমাণ অনেক কমে যাওয়া। পুরোনো খালগুলো দখল বা সংকীর্ণ হ’য়ে যাওয়া। তার উপর ঢাকাতে আচ্ছাদিত স্থানের পরিমাণ গিয়েছে বেড়ে। ফলে বৃষ্টির পানি শোষণ করার মতো উন্মুক্ত জমিও গিয়েছে কমে। এই কারণে নালার উপর বাড়ছে অতিরিক্ত পানির চাপ। আবার নালার আয়তন বাড়ানোর উপায়ও একরকম নেই বললেই চলে। একারণেই প্রযুক্তির প্রসঙ্গ চ’লে আসছে। যান্ত্রিক পাম্প ব্যবহার ক’রে দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্প বসানোও হয়েছে। তবে সেগুলোকে সর্বোক্ষণ কর্মক্ষম রাখার মতো দক্ষ লোকবল রাখা হ’য়েছে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয় যান্ত্রিক পাম্পের ধারণক্ষমতা, যতটা পানি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃষ্টির ফলে জমে ততটা পানি কাঙ্ক্ষিত সময়ের ভেতরে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাম্পগুলোর আছে কিনা। দুঃখজনক ভাবে সবক্ষেত্রে শুধু পাম্প বা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান করা যাবে না। কখনো কখনো রিটেনশন পুকুরের দরকার প’ড়তে পারে। যেটা নিশ্চিত করতে শহর নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা করাটা খুবই দরকারী। যেটা করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান।

নিশ্চিত ভাবেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংকট আছে বাংলাদেশে। কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রামের মতো দ্রুত-বর্ধনশীল দুইটা বড়সড় নগরী থাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ঠিকই আছে। এই দুইটা নগর যদি কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরীতে এগিয়ে আসতে পারে তবে তা উপকারী হ’তে পারে দেশের মাঝারি মানের অন্য শহরগুলোর জন্যও।

এবার আসি যাতায়াত ব্যবস্থাতে প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। এখনো পুরান-ঢাকাতে ঘোড়ায়-টানা গাড়ি চ’লতে দেখা যায়। এটাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার আছে বটে, তবে সে প্রযুক্তি এর ভেতরেই প্রাচীন হ’য়ে গেছে। নগরের চৌহদ্দিও বেড়েছে। তাই সাইকেল-রিকশা আর ঘোড়ায়-টানা গাড়ির মতো বাহন দিয়ে আর কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই বাহনগুলো যে গন-পরিবহন হিসেবে শহরের কিছুকিছু এলাকাতে এখনো দারুন ভাবে কার্যকর সেটা খেয়াল রাখা দরকার। এই বাহনগুলোকে যান্ত্রিক বাহন দিয়ে প্রতিস্থাপনের সময় এসেছে। শুধুমাত্র সময়ের প্রভাবেই এরা প্রতিস্থাপিত হ’য়ে যাবে এটা ভাবা বোকামি হবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনি দিকনির্দেশনা। প্রয়োজন সার্বিক পরিকল্পিত প্রস্তুতি।

১৯৩৬ কিমবা ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে প্রথম সাইকেল-রিকশা আনা হয়। এর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ আমরা তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনিনি। মাত্র কয়েক বছর হ’লো তাতে যান্ত্রিক মোটর যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেও চীন থেকে আনা কিছু ব্যাটারি-পাওয়ারড রিকশা রাস্তাতে চ’লতে শুরু করার পর থেকে। আইনে বৈদ্যুতিন বাহনের অনুমতি এখনো নেই বিধায় এই রিকশাগুলোকে এখনো অননুমদিতই থাকতে হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যাতায়াত ব্যবস্থা বৈদ্যুতিন হওয়ার দিকেই আগাচ্ছে। সাধারণত শুরুতেই কোনো বিষয়ের আইনি কাঠামোটা দাড় করিয়ে নিতে পারলে তার প্রযুক্তি আত্মিকরণে তা সহায়ক হয়।

ঢাকার জন্য যে একটা কার্যকর মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা দরকার সেটা এর নাগরিকেরা বহুদিন ধরেই টের পাচ্ছেন। দেরীতে হ’লেও কিছু কাজ শুরু হ’য়েছে। কিন্তু এর সমস্ত প্রযুক্তিই আমাদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সমস্ত ডিজাইন করিয়ে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। যেহেতু এমন প্রযুক্তি আমাদের নিজেদের আবিস্কার করা নয় সেহেতু শুরুতে আমদানি করা ছাড়া উপায়ও নেই খুব একটা। তবে দীর্ঘ-মেয়াদে চিন্তা করলে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসা সম্ভব ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতরেই। শুরু করা যেতে পারে কোচগুলোর নির্মাণ দিয়ে। ধীরে ধীরে অন্য ব্যাপারগুলোও। সেটা লাভজনক না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কারণ চাহিদা বাড়ছেই। আর এটা শুধু ঢাকাতেই আটকে থাকবে না। অন্য বড় শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। আর যেহেতু এটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় সেহেতু এটাকে কেন্দ্র ক’রে অনেক ধরণের প্রতিষ্ঠানই দাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও লাভবান হ’তে পারে এ থেকে।

টীকা:
১. রিটেনশন পুকুরের বাংলা হিসেবে ধারক-পুকুর লিখতে পারতাম হয়তো। রিটেনশন-পুকুর যেহেতু পানি শোষণ আর ধারণ একই সাথে করে তাই শুধু ধারক-পুকুরে সন্তুষ্ট হ’তে পারিনি। শোষণ আর ধারণকে যুক্ত ক’রে কোনো শব্দ বানাতে পারলে বোধ হয় ভালো হ’তো।
২. মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট : দ্রুত আর বহুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। জানি না কিভাবে ছোট ক’রে আনা যায়।
৩. ডিজাইন শব্দটাকে এখন আর নকশা-প্রণয়ন বলার পক্ষপাতি নই আমি। এটাকে চেয়ারের মতো গৃহীত বিদেশী শব্দ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
৪. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৪
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57828


মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s