উপন্যাস

একটি শহুরে গল্প -৭

ফেরী ঘাটে গাড়ির লম্বা লাইন। গাবতলী থেকে এ পর্যন্ত আসতে রাস্তায় তেমন কোনো বিড়ম্বনাতে প’ড়তে হয়নি। তবে এখন যে বেশ লম্বা একটা সময় অপেক্ষা করতে হবে তা বুঝতে পারে আবির। অনেকেই গাড়ি থেকে নেমে আশপাশে হাঁটাহাঁটি করছে। আবির খানিকটা অপেক্ষা ক’রে নিজেও নেমে পড়ে। পদ্মা নদী পার হওয়ার এই চিরাচরিত ঝক্কির সাথে অবির বেশ পরিচিত। সবকিছু এখানে ঠিক পরিকল্পনা মাফিক হয় না। অনেকটা যেন জীবনের মতো। আবির হাঁটতে হাঁটতে রিমির কথা ভাবতে থাকে। যখন রিমিকে নিয়ে ও পরিকল্পনা ক’রতে চেয়েছিলো তখন রিমি কাছে আসেনি। কিংবা হয়তো আসতে পারেনি। আর যখন রিমির ভাবনাটা একেবারেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা গিয়েছিলো তখন হঠাৎ ক’রেই রিমি এসে হাজির হলো!

এখন অনেক কিছুই হয়তো নতুন ক’রে ভাবতে হবে। নিশি ফুপু আব্বাকে ফোনে বলেছিলো আবির যেন জিআরই ক’রে নেয় দ্রুত। তাতে ওর আমেরিকাতে মাস্টার্স করতে আসতে সুবিধা হবে। আবির তার প্রস্তুতিও শুরু করেছে। ফুপুও হেল্প ক’রবে ব’লে জানিয়েছে। বাসায় গিয়ে তাই নিয়ে হয়তো নিশি ফুপুর সাথে ওর কথাও হবে। এখন যদি বাইরে পড়তে যাওয়ার সুযোগটা দ্রুত হ’য়ে যায় তবে রিমির সাথে সম্পর্কটা রাখা যাবে কি?

এমন সময় গাড়ির লাইন ধীরে ধীরে আগাতে থাকে। আবির ওর গাড়ির দিকে লক্ষ্য রেখে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। ওর পাশ দিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা অনেকগুলো গাড়ি চ’লে যেতে থাকে। গাড়ির সংখ্যা দেখে মনে হয় অন্তত দুইটা ফেরীর গাড়ি। তাহ’লে ওদের বাসটা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবে। যায়ও। আবির দেখে ওর বাসটা ওকে পেছনে রেখে বেশ একটু সামনে গিয়ে আবার দাড়িয়ে গেলো। আবার পরবর্তী কোনো ফেরী আসা পর্যন্ত একই রকম ভাবে অপেক্ষা করতে হবে।

আবির ঝালমুড়ি মাখানো কেনার জন্য দাড়ায় একটু। কেনা হ’লে একটু একটু ক’রে খেতেখেতেই ওর বাসের দিকে আগাতে থাকে। গাড়িগুলো আবার আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মুড়িওয়ালা বেশ ঝাল দিয়েছে মুড়িমাখানোতে। খাওয়া শেষ হ’লে আবির মুড়ির ঠোঙাতেই হাত মুছে নেয়। তারপর পাশের একটা দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনে বাসে গিয়ে বসে আবির। সিটে শরীরটা খানিকটা এলিয়েও দেয়। গাড়িটা বেশ ফাঁকাফাঁকা লাগে। আবিরের পাশের সিটের ভদ্রলোকও গাড়িতে নেই। গাড়ির ভেতরের বাতি নেভানো। বাইরের আলোও যে বেশি তাও নয়। তবু ভেতর থেকে বাইরের কার্যক্রম বেশ বোঝা যায়। অনেকেই ঝুপড়ির দোকান থেকে ডিম-পরোটা কিনছে। ডাবের বিক্রিও মন্দ নয়। আবির একটা পেয়ারা কেনে। কাজী পেয়ারা। দেখতে বেশ বড়। তবে মিষ্টি কম। ইদানিং এই পেয়ারাগুলোই বেশি পাওয়া যায়। এসব দেখতে দেখতেই আবির একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

হঠাৎ বাঁশির উচ্চ-শব্দে ঘুম ভাঙে আবিরের। ফেরী ছেড়ে দেবে। ওদের গাড়ি ফেরীতে কখন উঠেছে সেটা টের পায়নি আবির। পল্টুনের এই জায়গাটাতে তুলনামূলক আলো বেশি। অনেক হকারের হাকডাকও শোনা যাচ্ছে। ডিম, চানাচুর, পানি, ইলিশ মাছ কত কিছু যে বিক্রি হ’চ্ছে বলা কঠিন। যেন একটা জমজমাট বাজার। আবির গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। একবার টয়লেট সেরে নেওয়া দরকার। গাড়ি ফেরী থেকে নেমে গেলে ঝিনাইদহে পৌছার আগে আর তেমন একটা বিরতি পাওয়া যাবে না। এদিকে আবার টয়লেটের সামনেও বেশ লাম্বা লাইন। ফেরী দৌলতদিয়া পৌছানোর আগেআগে টয়লেট সেরে নেওয়া যাবে চিন্তা ক’রে আবির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। ফেরীর উপরে যে ক্যান্টিন আছে ওখানে মাঝেমাঝেই ভালো ইলিশের তরকারী পাওয়া যায়। দামও খুব বেশি নয়। আজ বেশ বড় পেটির ইলিশ পাওয়া গেলো। আবির একবার ঘড়ি দেখে। প্রায় দশটা বেজে গেছে। খেয়ে নেওয়াটাই ঠিক হবে। সাধারণত নদী পার হ’তে ৪৫/৫০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তারপর চুয়াডাঙ্গা পৌছাতে কম ক’রে হলেও আরো তিন ঘন্টা।

দ্রুত খেয়ে নেয় আবির। আরো অনেকেই জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবির উঠতেই আর একজন ওর ছেড়ে দেওয়া সিটে ব’সে খাবার অর্ডার করে। আবির খাবারের দাম মিটিয়ে পাশের চায়ের দোকানে চ’লে আসে। সেখানেও ভীড় কম নয়। আবির বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই চা খেয়ে নেয়। ফেরী ততক্ষণে মাঝ নদীতে পৌছেছে। এই জায়গাটাতে পানির স্রোত একটু বেশি। ফেরীর দুলুনিতে তা বেশ টের পাওয়া যায়। চা শেষ হ’লে আবির ক্যান্টিন থেকে বের হ’য়ে আসে। ফেরীর পাটাতনের কোনো একটা কিনারাতে গিয়ে পানির স্রোত দেখতে বেশ ভালো লাগে। কখনো কখনো পানি ছিটকে এসে খানিকটা গায়েও লাগে। অবশ্য ফেরী বড় হ’লে সেই সম্ভাবনা কম থাকে। আজকের ফেরীটা বড় ফেরীগুলোর একটা। পানির স্রোত কেটে ফেরীর এগিয়ে যাওয়ার শব্দটা অদ্ভুত। ধীরে ধীরে নদীর অন্য পাড় বেশ এগিয়ে আসছে। আবির সেই দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। আর হয়তো মিনিট দশেকের ভেতরেই ঘাটে ভিড়বে ফেরী। আবির টয়লেটের দিকে পা বাড়ায়। এদিকটাতে এখন আর তেমন একটা ভীড় নেই।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে রেহনুমা উঠে বসে। প্রায় দুইটা বাজে। বাড়ির দরজা কাজের-লোক খুলে দেয়। আবির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে। দোতলার বারান্দায় ছেলের হাত ধরে রেহনুমা। একটু যেন শুকিয়ে গেছে ছেলেটা। ‘এত দেরী হ’লো যে!’‘ঘাটে আজ অনেক জ্যাম ছিলো মা। তোমরা কেমন আছো?’

‘আমরা ঠিক আছি। তুই আগে হাত-মুখ ধুয়ে নে। আমি ভাত রেডি করি।’

‘ফেরীতে খেয়েছি।’

‘অল্প ক’রে আবার খাবি। আমি তোর গামছা এনে চেয়ারের উপর রাখছি।’

‘আচ্ছা।’

ততক্ষণে বদিউজ্জামানও টের পেয়ে উঠে পড়েছে। খাবার ঘরে একটা চেয়ারে এসে বসেছে।  ছেলে হাত-মুখ ধুয়ে বের হ’তেই পথে কোনো ঝামেলা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে।‘না, ঝামেলা হয়নি কোনো; শুধু ঘাটে জ্যাম ছিলো বেশ।’

‘কয়টার গাড়ি?’

‘পাঁচটার।’

‘সাড়ে আট ঘন্টা!’ খানিকটা হিসাব ক’রে বলে বদিউজ্জামান। ‘অনেক সময় লাগলো তো।’

‘ফুপু কই মা?’

‘ওনার ঘরে, শুয়ে পড়েছে বোধহয়। তুই খেয়ে নে তো।’

‘আচ্ছা দাও।’ রেহনুমা থালা আগিয়ে দেয় ছেলেকে। আবির ভাত তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে, ‘ফুপু বাংলাতে কথা বলে না ইংরেজিতে?’

শুনে রেহনুমার হাসি পায়। ‘তুই নিজেই দিখিস’ – বলাটা শেষ হ’তে না হ’তেই নিশি এসে হাজির হয় খাবার ঘরে। ‘হ্যালো আবির!’‘হ্যালো! কেমন আছেন?

‘আমি ভালো। তোমার জার্নি কেমন হ’লো?’ নিশি আবিরের উল্টা দিকের একটা চেয়ার টেনে সেটাতে বসে।

‘লং এ্যান্ড হেকটিক।’ আবিরের বলার ধরণটা নিশির পছন্দ হয়।

‘আমি আসার সময়ও লম্বা জ্যাম পেয়েছিলাম। এমন জ্যাম কি সবসময় থাকে?’

‘বছরের এই সময়টাতে থাকেই বলা যায়। পানি কমে যায় তো। ফেরীগুলোকে চর ঘুরে আসতে হয়। বর্ষার বৃষ্টি শুরু হ’লে আবার সহজ হ’য়ে যায়।’

‘ তোমার চাকরী কেমন লাগছে? ভাবি বলছিলো রেজাল্টের পরপরই চাকরী পেয়ে গেছো।’

‘লাকিলি।’ খেতে খেতেই আবির ব’লে চল, ‘ভার্সিটির এক বড়-ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো; ওনাকে ব’লে রেখেছিলাম। উনিই খবরটা দিয়েছিলেন। ওদের লোকও খুব দ্রুত দরকার ছিলো। ইন্টারভিউ দিতেই হ’য়ে গেলো। কিন্তু আপনি এখনো জেগে আছেন! ঘুমাবেন না?’

‘ঘুমাবো। আসলে জেট ল্যাগটা কাটেনি এখনো। আরো ৩/৪ দিন লাগবে বোধহয় ঠিক হ’তে। আবার ঠিক নাও হ’তে পারে।’ বলে খানিকটা হাসে নিশি। আবিরও সেই হাসিতে যোগ দেয়।

আবিরের হাত গুটানো দেখে রেহনুমা ওকে আর একটু ভাত নেওয়ার জন্য বলে। ‘আর না মা। ফেরীতে খেয়েছি। বড় ইলিশ মাছ দিয়ে। ওদের রান্নাটা মজার। একদম ঝোলঝোল।’‘আচ্ছা, তু্ই হাত ধুয়ে নে। আমি তুলে রাখছি।’ আবির ওর থালাটা নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকে। থালাটা পরিস্কার ক’রে তাকে রেখে তারপর হাত ধুয়ে নেয়। খাবার ঘরে ফিরে আবির পানি খায় এক গ্লাস। নিশি আর বদিউজ্জাম উঠে পড়ে। আবিরের সাথে সাথে রেহনুমা ঢোকে ওর ঘরে।

‘তুমি যাও তো মা, শুয়ে পড়ো। আমাকে সকাল-সকাল ডেকে দিয়ো।’

‘কটায় উঠবি?’ জানতে চায় রেহনুমা।

‘তুমি যখন উঠবে তখনই ডাক দিয়ো।’

‘তোর ফুপু বাগানটার কথা জিজ্ঞেস করছিলো। তখন আমি বললাম তোর সাথে দেখতে যাওয়ার জন্য। আমিও যাবো। অনেকদিন যাওয়া হয় না।’

‘সকালে যাবে?’

‘সকালে গেলেই ভালো হবে না? গরম কম থাকবে।’

‘হুম। ফুপুকে সকালের কথা ব’লেছো?’

‘না, এখনো বলিনি। তুই শুয়ে পড়। আমি গিয়ে বলছি।’

‘আচ্ছা।’

পরদিন আলো ফোটার আগেই রেহনুমা উঠে পড়ে। আবির আর নিশি দুইজনকে ডেকে তোলে। দ্রুত চুলায় খিচুড়ি চড়িয়ে দেয়। রুটি বানাতে গেলে অনেক দেরী হ’য়ে যাবে। কাজেরলোক ভানু আসবে ৭টার দিকে। তার আগেই বেরিয়ে পড়তে চায় রেহনুমা।

নিশি ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা করে না সাধারণত। খেতে বসবে কি বসবে না দ্বিধা নিয়েই খাবার টেবিলে বসে। খিচুড়ির গন্ধটা ভালো হয়েছে। একটু নরম-নরম ক’রে রান্না করা। আবির ডিম ভেজেছে তিনটা। নিশি খেতে শুরু করে। অল্প ক’রে খেয়ে নেয়। খেতে ভালোই লাগে নিশির।

ওদের খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই বাদিউজ্জামানও উঠে পড়ে। ‘আরে! এত সকাল-সকাল নাস্তা করছো! কোথাও যাবে নাকি?’‘ফুপুকে নিয়ে আম-বাগনে যাবো। মাও যাবে।’- আবির জানায়।

‘তোরা সবাই যাবি, আমাকে তো বললি না।’

‘চলো আমাদের সাথে।’ আবিরের সাথে নিশিও যোগ দেয়।

বদিউজ্জামান রাজি হ’য়ে যায়। দ্রুত তৈরী হ’য়েও নেয়। এর ভেতরে রেহনুমা সোহেলকে ডেকে দুইটা রিকশা আনতে বলে। রিকশা আসতে আসতে বদিউজ্জামানের খাওয়া হয়ে যায়। রেহনুমা এক বোতল পানি আর একটা থোলে সাথে নেয়, যদি আচার বানানোর মতো কাঁচা আমা পাওয়া যায় তবে খানিকটা সাথে ক’রে আনবে।

নিশি বেশ খানিকটা ঘুরে ঘুরে দেখে বাগানটা। খানিকটা স্মৃতি মনে করার চেষ্টাও হয়তো করে। তবে তেমন একটা মনে করতে পারে না। আমগাছ গুলোতে ফল ভালো ধরেছে। আরো অনেক ধরণের ফলের গাছ আছে। চালতা, বেল আর কদবেল, সফেদা, বরই আর কাঠাল গাছগুলো চিনতে পারে নিশি। বাগানের পশ্চিম দিকে কয়েকটা তাল, নারকেল, সুপারি আর খেজুর গাছও আছে। বাদিউজ্জাম নিশির সাথে থেকে জাম, আমলকি, করমচা, জলপায়ের মতো আরো কিছু গাছ চিনিয়ে দেয়। গাছগুলো যে যত্নে আছে সেটা বেশ বোঝা যায়। নিশির এটা ভালো লাগে।

ওদিকে আবির আর রেহনুমা আম পাড়া শুরু করেছে। নিশির বাবা পুটলি বাঁধা লাঠি দিয়ে যেভাবে বরই পেড়ে দিতো তেমন ক’রে। নিশিও চেষ্টা করে দেখে। কয়েকটা আম বেশ সহজেই পেড়েও ফেলে।

ফেরার পথে রিকশাতে আবিরের সাথে নিশি বসে। ‘ল্যান্ডস্কেইপটা সুন্দর। এলোমেলো তবে সুন্দর।’ অনেকটা যেন নিজের মনেই বলে নিশি।‘এদিকটাতে তো শুধু ফসলের ক্ষেত আর ছাড়াছাড়া গ্রাম। আমার খানিকটা একঘেয়ে লাগে।’

‘তাই?’

‘হুম, ভ্যারিয়েশন কম তো। আর একটু পানি থাকলে দারুন হ’তো মনে হয়। যেমনটা বরিশাল বা সুনামগঞ্জের দিকে আছে। এখানে পানি কম থাকায় একটু গরম বেশি যেন। আবার হিউমিডিটিটা কম।’

‘সেটা ঠিক। তবে সবুজটা খুব সুন্দর। খুব তরতাজা।’

‘নতুন চাষ হয়েছে তো কিছুদিন আগে। আপনি দেড়/দুই মাস আগে আসলে অন্য রং দেখতেন। তখন ফসল ওঠা শুরু করেছে। অনেক জমি তখন শুকনো খটখটে দেখতেন।’ আবিরের গলায় সহজ স্বর।

‘ফসল তোলার পর জমিগুলো দেখতে অবশ্য তেমন একটা ভালো লাগে না।’ নিশি আবিরের সাথে একমত হয়। ‘আমি ইউএসে কর্নফিল্ড দেখতে গিয়েছি অনেকবার। উঁচু লম্বা-লম্বা গাছ। কর্ন পাকতে শুরু করার আগ পর্যন্ত আমার খুব ভাল লাগে।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘তবে প্রকৃতির ব্যাপারটাই হয়তো এমন। বারবার রং বদলায়।’

‘আপনি কিন্তু খুব সুন্দর ক’রে কথা বলেন।’ আবির নিশিকে জানায়।

‘টিচার তো। কথা বলতেই হয় অনেক।’

‘আপনি এত ভালো বাংলা বলবেন তা আশা করিনি।’

‘তাই? আসলে মার সাথে বেশির ভাগ সময় বাংলাতেই কথা বলতে হয়। বাবার সাথেও কখনো কখনো। তাই অভ্যাসটা আছে। আবার ওখানে অনেক বাঙালিও আছে। তাদের সাথেও বাংলাতে কথা হয় প্রায়ই।’

‘আপনি একা এলেন যে? আমি ভেবেছিলাম সবাইকে নিয়ে আসবেন।’

‘মার আসার কথা ছিলো। তবে বাবার কয়েক মাস আগে মাইল্ড একটা হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। তাই আর এলো না। আর আমার ছেলে-মেয়ে দুইজন এই সময় আসতে চাইলো না। টিনেজ বয়স। তবে আমাকে জানিয়েছে আমি ঘুরে এসে ওদেরকে ছবি দেখালে যদি ওদের পছন্দ হয় তবে নাকি আসবে। ভেবে দেখো একবার, এদেরকে ম্যানেজ করা কতটা কঠিন।’

আবির এ কথায় না হেসে পারে না। ‘কিন্তু আপনি তো ছবি তুললেন না আজ। ওদেরকে দেখাবেন কিভাবে?’‘আর একদিন আসবো ছবি তোলার জন্য। আজ শুধু দেখেতেই ইচ্ছা করছিলো। আমি নিজেও চ’লে যাওয়ার পর এই প্রথম এলাম। তুমি তো কালই চ’লে যাবে, নাকি?’

‘হ্যাঁ, কাল বিকালে। পরশু অফিস আছে যে।’

‘ফেরার সময় ঢাকাতে থাকা হবে কিনা জানি না এখনো। দেখি চেষ্টা করবো তোমার বাসায় একবার যাওয়ার।’

‘ওটা ঠিক বাসা নয়। মেস। দুই রুমের একটা বাসায় আমরা চারজন থাকি। সবাই চাকরীজীবীতো তাই একটু অগোছালো।’

‘আচ্ছা, তুমি না চাইলে যাবো না। অন্য কোথাও দেখা করা যাবে। কিন্তু আমরা তো প্রায় চলে এসেছি বাসায়, না?’

‘হুম।’

সেদিন রাতে নিশি আবিরকে সাউথ-ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন প্রফেসরের ঠিকানা দেয়। ওদের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। আর বলে আমেরিকান এ্যাম্বাসিতে খোঁজ নিতে। ইউএসএতে পড়তে যেতে হ’লে কী কী দরকার হবে সেটা ওরা ব’লে দেয় ঠিক মতো। আবির নিশিকে জানায় যে ও সব খোঁজ নিয়ে যোগাযোগ করবে সময় মতো।

নিশি আবিরকে ওর জন্য আনা দুইটা টি-শার্ট দেয়। টি-শার্টেদুটোর রং পছন্দ হয় আবিরের। দুটোই সবুজ আর নীলের মাঝের দুইটা টোনে। নিশি-ফুপুর জন্য আনা শাড়ীটা বের করে আবির। নিশি উপহার পেয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধারে। আবিরের মনে হয় এই মানুষটা ওর খুব আপন কেউ। নিশি আবিরের জন্য স্টিফেন কিং এর নতুন একটা বই এনেছে। দ্যা গার্ল হু লাভড টম গর্ডন।

(চলবে)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s