উপন্যাস

একটি শহুরে গল্প -১৭

খলিল সাহেবরা আজ চ’লে গেলেন খুলনা শহর ছেড়ে। গত মাসেও কয়েকজনকে খালিশপুর ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। তারা সবাই যে খুলনাই ছেড়ে যায়নি তাই বা কে ব’লতে পারে, মনে মনে ভাবতে থাকে তরিকুল হাবিব। গত বছর দুয়েকে খালিশপুর আর দৌলতপুরের কলকারখানাগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। অথচ কেউ যেন দেখার নেই। পাটকলগুলো পাট কিনলেও তা পরিমাণে আগের থেকে বেশ কম। মাঝেমাঝে ভারতে কিছু চালান পাঠিয়ে ব্যবসাটাকে মোটামুটি টিকেয়ে রেখেছে তরিকুল হাবিব। কিন্তু ব্যবসাতে তার আর আগের মতো উৎসাহ নেই যেন। যে ব্যবসা পড়তির দিকে তা নিয়ে পড়ে থাকাটা বোকামি মনে হয় তরিকুলের। কিন্তু এই বয়সে এসে আবার নতুন ক’রে কিছু শুরু করাটাও কঠিন।

আবার সরকারী পাটকল খারাপ চললেও নোয়াপাড়ার আকিজ জুটমিল যেন প্রতিদিনই একটু একটু ক’রে বাড়ছে। গতকালই নোয়াপাড়া ঘুরে এসেছে তরিকুল। উদ্দেশ্য ছিলো জমি দেখা। নাজিমুদ্দিন পুরাতন একটা শেড বিক্রির খবর এনেছিলো। রেল-স্টেশনটার বেশ কাছেই শেডটা। মূলত সারের গুদাম হিসেবে ব্যবহার হতো এতদিন। শেডটার অবস্থা বেশ খারাপ এখন। কিছু কিছু জায়গার টিন খুলে গেছে। স্টিলের ফ্রেমও সবখানে সোজা নেই। শেডটা মেরামত করতে ঠিক কত টাকা লাগতে পারে তার একটা হিসাব দরকার। নাজিমুদ্দিনকে সেটা বলে তরিকুল।

  • ‘আমার পরিচিত একজন ইঞ্জিনিয়ার আছে। কচি নাম। যোগাযোগ করবো?’
  • ‘আজকে পারবি যোগাযোগ করতে?’
  • ‘দেখি।’

ইঞ্জিনিয়ার কবির আব্দুল্লাহ কচির কাছ থেকে যে হিসাব পাওয়া যায় তাতে তরিকুল খানিকটা দমে যায়। ব্যবসা পড়তির দিকে না থাকলে হয়তো একটা চেষ্টা করা যেতো। তরিকুল মনোস্থির ক’রে ফেলে যে এই শেড কেনার পেছনে আর টাকা খরচ করবে না। কিন্তু ব্যবসা যেন আস্তে আস্তে খুলনা থেকে নোয়াপাড়ার দিকে সরে যাচ্ছে, যেখানকার ব্যবসা  আবার উৎপাদনমুখী নয়, অনেকটা যেন আমদানি নির্ভর। বেনাপল স্থল-বন্দর দিয়ে ওপাড়ের ইন্ডিয়া থেকে জিনিসপত্র এনে দেশের নানা প্রান্তে সেসবের চালান পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে উঠছে সেখানে। এ ধরণের ব্যবসায় নানা জায়গায় প্রচুর দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন পড়ে। আনসার আলীটা থাকলে ভালো হ’তো এই সময়, মনে মনে ভাবে তরিকুল।

কিন্তু যে নেই তার কথা ভেবে তো আর ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া যাবে না। তরিকুল তাই অন্য রকম কিছু করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবতে বসে। আনসার আলীর মৃত্যুর পর খুলনা শহরটার প্রতিও টান যেন একটু একটু ক’রে কমতে শুরু করেছে। শহর বানুকে এসব কথা একবার ব’ললে কেমন হয়? যদিও ব্যবসার ব্যাপারে ওর আগ্রহ কখনোই তেমন একটা ছিলো না। একবার আহসানের কথাও মনে পড়ে। কিন্তু আহসান তো সেই যে পড়াশোনা শেষ ক’রে সরকারী চাকরীতে ঢুকলো এর পর আর কখনোই ব্যবসার কোনো খোঁজ করেনি। তরিকুল ঠিক করে আগে সব কিছু নিয়ে স্ত্রী শহর বানুর সাথেই কথা ব’লে নেবে।

বিকালে বাড়ি ফিরে তরিকুল দেখে বাড়িতে শহর বানু একা। চুপচাপ দক্ষিণমুখি বারান্দাতে ব’সে আছে। তরিকুল হাত-মুখ ধুয়ে এসে পাশে বসে। ‘মন খারাপ?’

  • ‘মেয়ে দুইটা কেমন বড় হ’য়ে গেলো, না?’
  • ‘হুম…’ একটা অস্ফুট শব্দ ক’রে তরিকুল। শহর বানুর মন ভার ব্যাপারটা যেন তরিকুলকেও পেয়ে বসে।
  • ‘ইলোরার ক্লাশ শুরুর ডেট দিয়েছে। আগামী মাসের ৬ তরিখে। কবে যাবে তাই নিয়ে কথা বলার জন্য সুমিদের বাসায় গেলো একটু আগে।’
  • ‘বিলুর সাথে কথা ব’লেছো?’
  • ‘হুম’
  • ‘কি বলে ও?’
  • ‘ওর এক বন্ধু আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার। তার সাথে কথা ব’লবে, হলের সিটের জন্য।’
  • ‘সিট পাওয়া যাবে বললো?’
  • ‘প্রথম বছর সিট পাওয়া খুব ঝামেলার নাকি। আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়?’
  • ‘কি কাজ?’
  • ‘আমরা চ’লো ঢাকা চ’লে যাই।’
  • ‘আর নাবিলা?’
  • ‘তুমি আর নাবিলা এখানে থাকলে; আমি আর ইলোরা ঢাকাতে একটা ছোট বাসা নিয়ে থাকলাম। তুমি মাঝেমাঝে দেখতে গেলে। করা যায় না এমন?’
  • ‘যায়… কিন্তু…’
  • ‘কিন্তু কি?’
  • ‘মেয়েরা তো আর কয়টা দিন পর এমনিই চ’লে যাবে। তখন কি করবে?’
  • ‘সে তখন দেখা যাবে।’
  • ‘আচ্ছা, নাবিলার যে টিচার ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, তার কথা নাবিলাকে ব’লেছো?’
  • ‘উহু…’
  • ‘ব’লবে না?’
  • ‘ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়নি। কেমন ক’রে যেন তাকায়।’
  • ‘তবে থাক আর ব’লে কাজ নেই। কিন্তু নাবিলা কই? ও আবার এই সময় কোথায় গেলো?’
  • ‘যাইনি কোথাও। আজ আসেইনি। রাতে হলে থাকবে আজ। বান্ধবীদের সাথে সিনেমা দেখবে নাকি রাত জেগে। কম্পিউটারে। ওর একটা কম্পিউটার কিনে দেওয়া দরকার। সেদিন ব’লছিলো।’
  • ‘দাম কেমন জানো?’
  • ‘না।’
  • ‘বিলুকে জিজ্ঞেস কোরো তো।’
  • ‘আচ্ছা, করবোখন…’
  • ‘চলো, এক কাজ করি।’
  • ‘কি কাজ?’
  • ‘জেসকোতে খিঁচুড়ি খেতে যাবে?’
  • ‘এখন? খিঁচুড়ি খেতে হ’লে তো দুপুরে গেলে ভালো হয়। বরং শিক-কাবাব খেলে কেমন হয়?’
  • ‘তাই চলো, রেডি হ’য়ে নাও। ইলোরার জন্য প্যাকেট ক’রে আনলে হবে। এর ভেতরে আবার চ’লে আসবে না তো?’
  • ‘ও আসবে আটটার পরে। আচ্ছা, শেষ কবে আমরা দুই জন একসাথে বের হয়েছি মনে পড়ে?’ প্রশ্ন ক’রলেও তার উত্তর শোনার জন্য দাঁড়ায় না শহর বানু। তরিকুল জানে তৈরী হ’য়ে নিতে শহর বানুর দশ মিনিটের বেশি লাগবে না। এদিকে বারান্দার আলো বেশ কমে এসেছে। তরিকুল অন্ধকারেই খানিক্ষণ ব’সে থাকে। আর মনেমনে ভাবে ইলোরার জন্য ওদের ঢাকাতে না গেলেই ভালো হবে। তখন হয়তো হাঠাৎ হঠাৎ শহর বানুকে নিয়ে খুলনা শহরের নানা জায়গায় ঘুরতে বেরোনো যাবে; সেই বহু বছর আগেকার মতো। কত বছর হ’লো মেয়েটার ওর ভাইয়ের বাসা থেকে তরিকুলের কাছে চ’লে আসার?
  • ‘এই, বের হবে ব’ললে! এখনো অন্ধকারে ব’সে আছো যে! ওঠো..’ তরিকুল বুঝতে পারে শহর বানুর শাড়ী পরা হ’য়ে গেছে।
  • ‘এই আসছি। কোন শার্টটা পরবো?’ শহর বানু স্বামীর জন্য একটা নীল রঙের শার্ট বের ক’রে দেয়।

আগামী কাল ইলোরার ক্লাশ শুরু হবে। আপাতত বিলুর বন্ধু আমানুল্লাহ ফেরদৌসের ধানমন্ডির বাসায় থাকবে ইলোরা। আহসান হাবিব বিলুর কথায় আমানুল্লাহ ফেরদৌস নিজেই প্রস্তাব দিয়েছে, ‘হলে সিট পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার বাসাতেই থাকুক না।’ আমানুল্লাহর মেয়ে রুবিনাও এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তবে ইলোরা ফার্মেসিতে আর রুবিনা অর্থনীতিতে।

আমানুল্লাহ ফেরদৌসের সাথে কথা ব’লে শহর বানু কিছুটা নিশ্চিন্ত হ’য়েছে। ঢাকা থেকে ফেরার পথে গাড়িতে শহর বানুর মনে হয়, একবার বড় ভাইয়ের সাথে দেখা ক’রে আসলে কেমন হয়। গাড়ি তো যশোরের উপর দিয়েই যাবে। যদিও যশোরে নেমে মনিরামপুর যেতে কম ক’রে হ’লেও একঘণ্টা লাগবে। আগে তো আরো বেশি সময় লাগতো। এখন নাকি রাস্তা বেশ উন্নত হ’য়েছে। তরিকুল শুনে যদিও ‘যাওয়া যায়’ ব’ললো তবুও ওর যে যেতে ইচ্ছা করছে না সেটা বুঝতে পারে শহর বানু। এত দিনের একসাথে থাকার কারণে এমন বিষয়গুলো সহজেই বুঝে যাওয়া যায়।

আরিচা ঘাটে আজ গাড়ির ভীড় বেশ কম। ওদের গাড়ি একটানেই ফেরীতে উঠে পড়ে। অনেকদিন পর শহর বানু এতবড় ফেরীতে উঠলো। ‘চলো, চা খেয়ে আসি।’

  • ‘চায়ের দোকান তিন তলাতে। ঐ খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারবে?’ স্টিলের সিঁড়ি দেখিয়ে তরিকুল জানতে চায়।
  • ‘পারবো। এক সময় মই বেয়ে গাছে কি কম চড়েছি? আর তুমি তো আছো।’
  • ‘তাই?’
  • ‘ঢং ক’রো না তো। চলো..’ শহর বানুর ঠোটে প্রশ্রয়ের হাসি।

খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শহর বানুর কোনো অসুবিধা হয় না। উঠতে উঠতে ওরা খেয়াল করে, ফেরীর অর্ধেকটাও তখনো গাড়িতে ভরেনি। এই এক অদ্ভুত ব্যাপার, কখনো ফেরীতে ওঠার জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়, আর কখনো ফেরী ভরার জন্য গাড়ি পাওয়া যায় না। পদ্মা পারাপারে কোনো না কোনো ভাবে অপেক্ষা করাটা যেন দুই পাড়ের মানুষের নিয়তি হ’য়ে গেছে।

চা মুখে দিয়ে শহর বানুর খুব ভালো লাগে। কনডেন্সড মিল্কের চা, খুব যে সুস্বাদু তা নয়, তবুও। এমন চা বাড়িতে কখনো খাওয়া হয় না। বাড়িতে সব সময় গরুর দুধ ঘন ক’রে চা বানায় শহর বানু। নিউ-মার্কেটের পেছনের কয়েকটা দোকানে যেমনটা পাওয়া যায়। নাবিলা সুযোগ পেলেই বলে, ‘মা, তুমি একটা চায়ের দোকান দিলে সেই দোকান খুব ভালো চলবে।’ নাবিলার কথা মনে হ’তেই শহর বানুর মনটা আবার হুহু ক’রে ওঠে। চারদিন হ’লো মেয়েটার চেহারা দেখা হয়নি। ফোনে কথাও হয়নি কোনো। চা শেষ ক’রে শহর বানুই বলে, ‘আজ বাড়িতেই চলো। নাবিলা কত দিন একা আছে! কি যে করছে একাএকা কে জানে!’

বাড়িতে ফিরে জানা গেল নাবিলা এই কয়দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে কাটিয়েছে। দুই দিন বিকালে এসে শুধু দেখে গিয়েছে বাড়ির সব ঠিকঠাক আছে কিনা। ‘পাজি মেয়ে! আমি কোথায় চিন্তায় মরি!’ শহর বানু রাগ না দেখিয়ে পারে না।

  • ‘তুমি আমাকে একলা রেখে চ’লে যেতে পারবে আর আমি হলে গিয়ে থাকতে পারবো না!’ হাসতে হাসতে বলে নাবিলা। ‘বাবা, তুমি এর বিচার করো।’ তরিকুলকে দলে টেনে নেয় নাবিলা।
  • ‘যদি বাসায় চুরিটুরি হ’তো!’
  • ‘হয়নিতো মা। তুমি শুধুশুধুই বেশি চিন্তা করো। এসব করে করেই শরীরটা খারাপ ক’রে ফেলবে আবার!’ নাবিলা কথাটা ভুল বলেনি। ইদানিং শহর বনুর ব্ল্যাড-প্রেশারের ওঠা-নামাটা বেশ অনিয়মিত হ’য়ে উঠেছে। ডাক্তার দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে শুধু। আর বিকালের দিকে একটু দৌড়াতে বা দ্রুত লয়ে হাঁটতে বলে অন্তত দুই কিলোমিটার। কিন্তু বললেই কি আর দুশ্চিন্তা বাদ দেওয়া যায়?

রাতে বিছানায় শুয়ে শহর বানু বেশ কয়েকবার পাশ ফেরায়। চোখে ঘুম আসতে চায় না। তরিকুল পাশেই অঘোর ঘুমে। কিছুদিন হ’লো তরিকুল ঘুমের মাঝে নাক ডাকা শুরু করেছে। তাতেও শহর বানুর ঘুম টুটে যায়। আজ অবশ্য তরিকুল একেবারে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। বোঝা যায় লম্বা জার্নি ক’রে শরীর বেশ ক্লান্ত। অথচ জার্নি তো শহর বানুও করেছে। আরো কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি ক’রে এক সময় হাল ছেড়ে দেয় শহর বানু। অন্ধকারেই সাবধানে মশারির কিনারা তুলে বেরিয়ে আসে; খাবার ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে দেয়। ফ্রিজ খুলে গ্লাসে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে সেটা নিয়ে খানিক্ষণ নাড়াচাড়া করে। একবার চোয়ালে ঠেকায় গ্লাসটা। গ্লাসের ঠাণ্ডাটা বেশ লাগে শহর বানুর। কিন্তু পুরো পানিটা আর খায় না। অর্ধেকটার মতো পানি খেয়ে আবার শোবার ঘরে ফিরে আসে।

বিছানায় তরিকুলকে খানিক্ষণ জড়িয়ে রাখে শহর বানু। বুঝতে পারে না তরিকুল ওর স্পর্শ টের পেয়েছে কিনা। পেলে তো নড়াচড়া করার কথা। অনেক দিনের অভ্যাস, অনেক দিনের পাশাপাশি থাকায় যেমনটা হয়। শহর বানু তরিকুলের লুঙ্গির গিট শিথিল করে দেয়। সেটা গলিয়ে ভেতরে হাতও বুলায়। কিন্তু তরিকুলের আজ কোনো বিকার নেই যেন। এক সময় শহর বানু একাই মেহন শুরু করে। কিন্তু শেষ না করে জড়োসড়ো হ’য়ে শুয়ে থাকে আরো কিছুক্ষণ। যখন চোখে ঘুম ধরে আসতে থাকে তখন তরিকুল পাশ ফিরে শুয়ে নাক ডাকা শুরু করে। শহর বানু মাথার নিচের বালিশটা টেনে কানের উপর চাপা দেয়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s