উপন্যাস

একটি শহুরে গল্প -১৮

  • ‘রাশেদ জামান স্পিকিং’
  • ‘জ্বি, স্ল্যামালিকুম। আমার নাম রিমি। আমি ঢাকা থেকে বলছি। আপনি বোধহয় আমার মাকে চিনবেন।’
  • ‘কেয়া?’
  • ‘হ্যাঁ। আমার নাম আপনার মনে আছে!’
  • ‘আনফর্চুনেটলি আই এ্যাম গুড উইথ রিমেম্বারিং থিংস। যা হোক, তুমি কেমন আছো। তোমার মা কেমন আছেন?’ ফোনের ওপাশ থেকে জানতে চায় রাশেদ জামান।
  • ‘মা মারা গেছেন সতের মাস হ’লো।’ ব’লে রিমি একটু বিরতি নেয়। রাশেদ জামানও কিছু বলে না। হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ফোনের এপাশ থেকে রিমি ঠিক নিশ্চিত হ’তে পারে না। ‘আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। সে জন্যই গত কয়েক মাস ধরে আপনাকে খুঁজছি।’
  • ‘আমি কিছুদিন বাসায় ছিলাম না। সামারের ছুটি কাটাতে কয়েকটা জায়গাতে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এই সপ্তাহেই ফিরেছি। তুমি কেমন আছো ব’ললে না!’
  • ‘আমি ভালো আছি। আমার প্রশ্নটা মাকে নিয়ে। আপনাদেরকে নিয়ে।’
  • ‘ঠিক বুঝিনি। আপনাদেরকে নিয়ে ব’লতে কি বোঝাচ্ছো?’
  • ‘মা মারা যাওয়ার পর মায়ের চিঠির সংগ্রহে আপনার তিনটা চিঠি পেয়েছি আমি।’
  • ‘ও তাই বলো। কেয়াদের বাসা আমাদের বাসার পাশেই ছিলো, রাজশাহীতে। তো আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ওকে মাঝেমাঝে চিঠি লিখতাম। ও কখনো কখনো উত্তর দিতো। তোমার তো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বয়স হয়েছে। এই বয়সের উত্তেজনা তুমি নিশ্চয় বুঝবে।’
  • ‘চিঠিগুলো ঐ সময়ের নয়। আরো পরের। আশির পরের।’
  • ‘তুমি ঠিক কি জানতে চাও বলো তো? কোন চিঠিগুলো তোমার হাতে আছে তা তো জানি না। তাই বুঝতে পারছি না।’
  • ‘আমি কি আপনার মেয়ে?’ রিমি সরাসরিই প্রশ্নটা করে।
  • ‘না। তবে একটা সময় পর্যন্ত আমার সন্দেহ ছিলো, এটা স্বীকার করতে পারি। হয়তো কেয়ারও ছিলো। তবে তোমার বয়স তিন পেরিয়ে গেলে কেয়ার সে সন্দেহ কেটে যায়। কেয়া আমাকে বলেছিলো তোমার সাথে তোমার বাবার চেহারার অনেক মিল।’
  • ‘থ্যাংক য়ু, সরাসরি উত্তর দেওয়ার জন্য। আর একটা প্রশ্ন করি আপনাকে?’
  • ‘শিওর।’
  • ‘আপনি দেশ ছেড়েছিলেন কেন?’
  • ‘কারণটা আমি কাউকে ব’লতে চাই না। কখনো বলিও নাই কাউকে। তবে তোমার মা জানতো। আমাকে অন্য কোনো প্রশ্ন করো, আমি উত্তর দেবো।’
  • ‘কিন্তু আপনি যে আমাকে সত্যি বলেছেন তা আমি কিভাবে নিশ্চিত হবো? তারউপর আপনি আবার কিছু কথা এড়িয়েও যাচ্ছেন।’
  • ‘আমার দেশ ছাড়ার সাথে তোমার মায়ের কোনো সম্পর্ক নেই, এটা তোমাকে বলতে পারি। যদিও আই লাভড হার … এ্যান্ড য়ু এ্যাজওয়েল…’
  • ‘হোয়াই মি?’
  • ‘ঐ যে সন্দেহের কথা বললাম তার জন্য হয়তো। যা হোক তুমি তোমার বাবার সাথে তোমার চেহারা মিলিয়ে দেখো। আমার মনে হয় না সন্দেহের কোনো কারণ আছে।’
  • ‘আচ্ছা রাখি তাহলে। আমার যা জানার তা জানা হ’য়ে গেছে।’
  • ‘দাড়াও। এখন আর এগুলো লুকিয়ে কি হবে! তোমার মাকে যখন জানিয়েছিলাম তোমাকেও বলি।’ রিমি ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখে না, শুনতে থাকে। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের ছাত্র। আমাদের বাসায় মুসলিম লীগের রাজনীতির প্রভাব ছিলো। তোমার নানাবাড়িতেও ছিলো। তো যুদ্ধের এক পর্যায়ে আমি আল-বদরে যোগ দিই। যুদ্ধ শেষ হ’লে আমার পালানো ছাড়া উপায় ছিলো না। দেশে মাস্টার্সটা আর শেষ করা হয়নি। দুই বছর দেশের নানা জায়গায় লুকিয়ে থেকেছি। তারপর ভারত ঘুরে অস্ট্রেলিয়া চলে আসতে পেরেছিলাম। তা না হ’লে হয়তো মারা পড়তাম, হয়তো তোমার মায়ের সাথেই আমার বিয়ে হ’তো। ’৭৭ এ অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেনশিপ পেলে দেশে ঘুরতে গিয়েছিলাম। তখন আবার তোমার মায়ের সাথে দেখা হয়। সে সময় তোমার বাবা ঢাকাতে কম থাকতেন। সেই সুযোগে আমাদের খানিকটা ঘনিষ্ঠতা হয় আবার। তবে দুই মাস পরই আমাকে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরতে হয়। পরে রাজশাহীতে একটা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তার জন্য ঐ সময়ে অনেকবার দেশে যাতায়াত করেছি। দেশে ফেরার চেষ্টাও ব’লতে পারো। তবে সেটাতে সাক্সেসফুল হ’তে পারিনি। তার উপর আমার তখনকার ওয়াইফ একজন অস্ট্রেলিয়ান। সব মিলিয়ে এখানেই সেটেল করতে হয়েছে আমাকে। তোমার মাও আর সব কিছু ছেড়ে এখানে আসতে চাননি। ’৮৮ এর পর আমাদের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ১৪ বছর পর তোমার মায়ের কথা শুনলাম। জানলাম কেয়া মারা গেছে।’ টানা ব’লে রাশেদ জামান থামেন। রিমিও চুপচাপ। ‘কি হয়েছিলো কেয়ার?’
  • ‘লুইকেইমিয়া।’
  • ‘ও… আচ্ছা, তুমি ভালো থেকো।’ রাশেদ জামান ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখে। রিমিও।

কয়েকদিন পর রিমির মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চয় সব ছাত্র-শিক্ষকের বিষয়ে কোনো না কোনো ডেটাবেজ থাকে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কোনো একটা সাক্ষাৎকারে এমনটা পড়েছিলো রিমি। রিমি রেজিস্টার অফিসে একটু খোঁজ নেবে ব’লে ঠিক করে।

এত পুরাতন ফাইল বের করতে গত ছয় মাসে রিমিকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে রাশেদ জামানের ফাইল থেকে আল-বদর সম্পর্কিত কোনো কিছু জানা যায় না। বরাবরই খুব ভালো ছাত্র ছিলো এটা জানা যায়। রিমি রেজিস্টার অফিসের পিওনকে ২০০ টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে এসে অনেক দিন পর আবিরের কথা মনে পড়ে রিমির। অথচ আবিরের সাথে এখন আর যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। রিমির মনে হ’তে থাকে, সেদিন আবিরকে অমন শক্ত একটা চিঠি না দিলেও পারতো রিমি।

  • ‘তুই এই দিকে!’ রিমিকে চমকে দিয়ে মাইকেল এগিয়ে আসে। 
  • ‘এমনিই, ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি। তুই কোথায় যাস?’
  • ‘আমারো ঠিক নেই। এলোমেলো ঘুরছি বলতে পারিস। তবে ক্ষুধা লেগে গেছে। তেহারী খাবো না ভাত খাবো বুঝতেছি না।’
  • ‘আমারও ক্ষুধা লেগেছে। চল নীলক্ষেতের তেহারী খেয়ে আসি। ঐ দিকটাতে একটু ঘোরাও হবে।’ মাইকেল রাজি হ’য়ে যায়। একটু আগাতেই একটা রিকশাও পেয়ে যায় ওরা।‘এত কম টাকায় এরা এমন তেহারী যে কিভাবে দেয়!’
  • ‘এটা একটা সিক্রেট। যদিও লোকে বলে এটা আসলে কুত্তার মাংস, তাই সস্তায় দিতে পারে।’ মাইকেল বলতে বলতে আর খেতে খেতে হাসতে থাকে।
  • ‘ধুর! কি যে বলিস! প্রতিদিন এত কুকুর পাবে কোথায়!’
  • ‘কেরানীগঞ্জ থেকে ধরে আনে।’
  • ‘কি যে সব যা তা বলিস, তাও খাওয়ার সময়। খা তো। আর আমাকে একটু লেবু দিতে বল।’
  • ‘শুধু লেবু? নাকি আর হাফ নিবি?’
  • ‘না, শুধু লেবু।’
  • ‘এই মামা এই দিকে লেবু দিয়ো তো।’ মেসিয়ার মাইকেলের কথা শুনলো কি শুনলো না বোঝা না গেলেও কিছুক্ষণ পর একটা ১৪/১৫ বছরের ছেলে ওদেরকে ছোট একটা প্লেটে করে তিন পিস লেবু আর কয়েকটা কাঁচা মরিচ দিয়ে যায়। ‘আর কিছু দিমু মামা?’
  • ‘না, আর কিছু লাগবে না। তোর নাম কি রে? আগে তো দেখি নাই এখানে!’
  • ‘মাখন।’
  • ‘মাক্ষন মিয়া! তাইলে ভালো করে গ্লাস ধুয়ে আমাদেরকে দুই গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দাও।’ মাইকেলের মাক্ষন মিয়া বলার ধরণে রিমি আর মাখন দুইজনই হেসে ফেলে। ওদের খাওয়া শেষ হ’লে ওরা মাখনের হাতে ৫ টাকা বকশিস দিয়ে বেরিয়ে আসে তেহারীর ছোট্ট দেকানটা থেকে।
  • ‘এই তুই লোকজনের নাম নিয়ে এইভাবে ভ্যাঙাস কেন? এটা একদম ভালো না।’
  • ‘তাই নাকি রিম্মি ম্যাডাম!’
  • ‘এই তুই আমার সাথে এমন করলে মার খাবি কিন্তু!’
  • ‘তোর ভাড়াটে গুন্ডা আছে নাকি?’ ঠাট্টা করে জানতে চায় মাইকেল। ‘কিন্তু তোর গুন্ডা তো জানি দেশে নেই!’
  • ‘আবিরের সাথে আমার আর যোগাযোগ নেই রে।’
  • ‘বলিস কি! কেন?’
  • ‘ও যাওয়ার আগে আমিই যোগাযোগ করতে না করেছি। রাগ হয়েছিলো সেদিন খুব। কিন্তু আমার রাগের কথায় গুন্ডাটা যে আর একদমই যোগাযোগ করবে না তা বুঝিনি। তোরা ছেলেগুলো এমন কেন বল তো?’
  • ‘আমি বাবা এমন না। আমি ওতো রাগটাগ বুঝি না। তাই কথা বলা বন্ধ করা আমাকে দিয়ে হয় না।’
  • ‘তুই আসলেই আবিরের মতো না। যা হোক বাদ দে, চল এবার টিএসসির দিকে যাই। চা খাওয়া যাবে।’

মাইকেলের সাথে রিকশায় চড়াটা অন্যরকম রিমির জন্য। শুরু থেকেই দুইজনের মধ্যে কোনো সংকোচ কাজ করে না। মাঝেমাঝেই ঝাকুনির ফলে একজনের গায়ের সাথে আরেক জনের গা লেগে যায়। তাতে কখনো কখনো আবিরের কথা মনে পড়ে রিমির। আবিরের অভাবে এক ধরণের নিঃসঙ্গতা বোধ হয় প্রায়ই। রিমির ইচ্ছা করে এইসব নিয়ে কারো সাথে একটু মন খুলে কথা বলতে। কিন্তু কার সাথে যে এ নিয়ে কথা বলা যায় বুঝতে পারে না। ইদানিং মাইকেলের সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে যদিও। ফুর্তিবাজ ছেলে মাইকেল। সবকিছুই যেন খুব সহজে নিতে পারে। আবার রিমির প্রতি এক ধরণের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও যেন আছে।

একদিন মাইকেলই রিমিকে ব’লে বসে, ‘তো, নতুন প্রেম করছিস না কেন?’

  • ‘কে বললো করছি না? তোর সাথে তো এক/দুই দিন পরপরই ঘুরতে বেরোচ্ছি। এটাকে তোর প্রেম মনে হয় না?’
  • ‘উহু। ফিজিক্যাল রিলেশন ছাড়া প্রেম হয় নাকি?’
  • ‘তোকে বলেছে!! এমন প্রেম তুই কয়টা করেছিস শুনি?’
  • ‘দুইটা।’ আড়চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে বলে মাইকেল।
  • ‘সত্যি?’
  • ‘হ্যাঁ’
  • ‘এখন?’
  • ‘এখন কি?’
  • ‘সেই সব প্রেমের আপডেট কি?’
  • ‘আপডেট নেই। একজন আগে থেকেই বিবাহিত ছিলো। এখন দেশের বাইরে চলে গেছে। তাই আর যোগাযোগ নেই। অন্যজন আর একজনের সাথে প্রেম করছে। একে বোধহয়  তুই চিনবি। ইংলিশের ইলোরা।’
  • ‘না, চিনি না। ইলোরা নামের একজন আমাদের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে এবার। আর কোনো ইলোরাকে চিনি না বাবা…’
  • ‘আচ্ছা তোকে চিনিয়ে দেবো একদিন। অবশ্য যদি সুযোগ পাই। শুনি ভদ্রমহিলা এখন দারুন ব্যস্ত।’
  • ‘তা, কার কাছ থেকে এসব শুনিশ শুনি।’
  • ‘ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে গেলে তুইও শুনবি। টক অব দ্যা য়ুনিভার্সিটি এখন। থাকিস কোথায় বল তো।’ মাইকেলের গলায় বিষ্ময়।
  • ‘কোথায় থাকি তা তো দেখিসই। তোর এই টক অব দ্যা য়ুনিভার্সিটির সাথেও কি তোর এই ফিজিক্যাল ব্যাপার ছিলো নাকি?’
  • ‘আবার জিগায়! তোর ভাড়াটে গুন্ডার সাথে তোর যেমন ছিলো আর কি!’
  • ‘আবিরের সাথে আমার কি ছিলো তুই তার কি জানিস?’
  • ‘সব জানার দরকার নেই। তবে কিছু যে ছিলো তা বোঝা যায়।’
  • ‘আচ্ছা তোর ইলোরার কথা মনে ক’রে মন খারাপ হয় না?’
  • ‘হয় আবার হয়ও না। তবে কি জানিস দোস্ত, সেক্স জিনিসটা মিস করি।’
  • ‘আমিও। তবে সব সময় না। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত যেন।’
  • ‘আমি এটার ভেতরে দোষের কিছু পাই না। অথচ সবখানে কেমন রাখঢাক গুড়গুড়। তলে তলে সবাইই করছে, কিন্তু স্বীকার করতে কেউ রাজি না। আমি শালা এই ব্যাপারটা বুঝি না। তুই তো তাও স্বীকার করলি।’

ব্যাপারটাতে রিমিও একমত হয়। বাসায় ফিরে যখন একাএকা ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসে তখন ওর মায়ের কথা মনে আসে। এতগুলো বছর যে মাকে দেখে এসেছে রিমি আর আশিক তার অনেকটাই যেন ওদের কাছে অচেনা এখন। আর বাবা? তারো কি এমন কোনো গল্প থাকতে পারে? ইদানিং বাবাকে দেখে কখনো কখনো মনে হয় বাবার জীবনে সুমাইয়া আব্বাসী কেয়া নামে কারো উপস্থিতি যেন কখনো ছিলো না। অথচ এমন কি হওয়ার কথা? রিমির অস্থির লাগতে থাকে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s