একটি শহুরে গল্প -১৬

কিছুদিন রিমির আচরণ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না আবির। দেখা ক’রতে চাইলে প্রায়ই বলে ‘আজ না, আর একদিন।’ সেই আর একদিনও যে কবে তাও ঠিক ক’রে বলে না। এদিকে আবিরের ফ্লাইট আর দশ দিন পর। অনেক পিড়াপিড়ির পর রিমি আজ রাজি হ’য়েছে। ক্লাসের পর সাড়ে তিনটায় ক্যাম্পাসে এলে দেখা হবে, নয়তো নয়। আবির প্রথমে চিন্তায় প’ড়ে যায়। যদিও রিমিকে বলে যে ও আসবে সময় মতো। কিন্তু অফিস থেকে কি ব’লে বের হওয়া যায় সেটাই ভেবে বের করতে পারে না। 

অফিসের সহকর্মী হাসিবুল কবিরের সাথে অবিরের বেশ জানাশোনো হ’য়েছে এই ক’দিনে। যদিও মার্কেটিঙের লোক। ফলে সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক রেখে চলে কিনা তাই নিয়ে আবিরের মনে দ্বিধা কাজ করে ঠিকই। তবুও কি মনে ক’রে দুপুরের খাওয়ার সময় আবির ছুটির ব্যাপারটা নিয়ে হাসিবুলের সাথে কথা বলে। হাসিবুল জানতে চায় আবিরের রিপোর্টিং বস কে?

  • ‘জুবায়েদ আলী স্যার।’
  • ‘জুবায়েদ ভাই তো খুব ভালো লোক। কোনো চিন্তা না ক’রে ওনাকে সরাসরি ব’লে ফেলেন। আমার মনে হয় না ঝামেলা হবে।’
  • ‘কিন্তু স্যারকে তো খুব সিরিয়াস মানুষ মনে হয়। তার উপর উনি মাত্র গত মাসেই জয়েন করেছেন আমাদের সেকশনে। কাজের বাইরে কখনো কোনো কথা ব’লতে দেখিনি ওনাকে এর মধ্যে।’
  • ‘আমি ওনাকে অনেক দিন ধ’রে চিনি। ভয় পেয়েন না। দেখেন ব’ললেই হবে।’

হাসিবুলের কথায় ভরসা পেয়ে কিংবা আর মাত্র ৭ দিন চাকরীতে আছে এই চিন্তা ক’রে আবির মনে আর কোনো দ্বিধা রাখে না। সরাসরিই জুবাইদ আলীকে ব’লে ফেলে রিমির কথা। দেখা যায় জুবাইদ আলী আসলেই স্বজ্জন লোক। এক কথাতেই রাজি হ’য়ে গেছে। শুধু হাতে কোনো কাজ থকালে তা ওর সহকর্মী রায়হানকে বুঝিয়ে দিয়ে যেতে বলে।

আবিরের হাতে কোনো কাজ জমে নেই। তাই অফিসের টেবিলটা গুছিয়ে একটু পরই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। শাহবাগ পৌঁছে দেখে হাতে তখনো কিছু সময় আছে। আবির একটা হলুদ গোলাপ কেনে রিমির জন্য। ফুল এখনো ফোটেনি। এক ধরণের নরম জালি দিয়ে কুড়িটাকে মুড়িয়ে রাখা। এটা খুলে পানিতে রাখলে নাকি সন্ধ্যার দিকে ফুল ফুটতে শুরু করবে। কুড়িটা বেশ বড়সড়। দেখতে খুব সতেজ আর তরতাজা মনে হয়।

ফুলটা রিমির খুব পছন্দ হয়। আবিরের হাত ধ’রে টেনে ওকে চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবিরের মনে হয় আজ রিমির মনটা বেশ ভাল। কিংবা গত কয়েক দিনের দুর্ভাবনাটা যেন এখন আর ওর ভেতরে নেই।

  • ‘জানো? আজ একটা নাম্বার পেয়েছি। রাশেদ জামানের। ঠিক করেছি আজ সন্ধ্যায়ই যোগাযোগ করবো। তুমি কী বলো?’
  • ‘নাম্বার কোথায় পেলে?’
  • ‘ফুপু দিয়েছেন। আমার চিঠির কপি পাওয়ার পর ফুপু অস্ট্রেলিয়াতে অনেক যোগাযোগ করেছেন বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। আর ওখানকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাশেদ জামান দুইটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট টিচার এখন।’
  • ‘ফুপু ওনার সাথে কথা বলেছেন?’
  • ‘হুম, বলেছেন।’ তারপর খানিকটা চুপ থেকে রিমি জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার মাথায় এই প্রশ্ন এলো কেন?’
  • ‘কোন প্রশ্ন?’ আবির জানতে চায়।
  • ‘এই যে রাশেদ জামানের সাথে ফুপুর কথা হয়েছে কিনা।’
  • ‘এমনিই। এমনও তো হ’তে পারে এই রাশেদ জামান সেই রাশেদ জামান নন।’
  • ‘না, উনিই। ফুপু নিশ্চিত না হ’ল আমাকে ওনার নাম্বার দিতেন না।’
  • ‘তা হ’লে আর চিন্তা কী! কথা ব’লে দেখো।’

কিন্তু বাসায় ফিরে রিমি কয়েক বার চেষ্টা ক’রেও সেই নাম্বারে কাউকে পায় না। প্রতিবারই রিং হয়, কিন্তু ফোনের রিসিভার তোলে না কেউ। রিমির মনে আবার সেই মনমরা ব্যাপারটা ফিরে আসে। খাবার টেবিলে সেটা জহিরুদ্দিন সিরাজীর নজর এ্যাড়ায় না। ‘কি রে মা! শরীর খারাপ?’

  • ‘না, বাবা।’
  • ‘তবে? তোকে কেমন যেন বিষন্ন দেখাচ্ছে! আমার ছেলে-মেয়েরা বিষন্ন থাকবে কেন?’ জহিরুদ্দিনের কন্ঠে রসিকতার সুর।
  • ‘এমন কিছু না। ক্লাস ছিলো বিকাল পর্যন্ত আজ। তাই খানিকটা ক্লান্ত। খাওয়াদাওয়ার পর চা খেলে ঠিক হ’য়ে যাবে। তুমি যে রাতের বেলা কফি খাও, তোমার কখনো ঘুমের সমস্যা হয় না?’ উল্টো রিমি প্রশ্ন করে বাবাকে।
  • ‘সে তো শুতে শুতে প্রায় দুইটা। কফি এতক্ষণ শরীরে এ্যাফেক্ট করে না।’
  • ‘এত কফি খেয়ো না তো বাবা। তোমার তো বয়স হয়েছে।’
  • ‘নাহ! কত আর বয়স! এখনো তো অবসরেই যায়নি। তারপর ওসব নিয়ে ভাবা যাবে।’
  • ‘আচ্ছা বাবা, তোমার মার কথা মনে পড়ে?’
  • ‘পড়ে। সবসময়ই পড়ে।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘ভেতরে ভেতরে যে এতটা অসুস্থ হ’য়ে গিয়েছিলো কে বলবে! আমাকেও কখনো কিছু বলেনি। আমি টেরও পাইনি। অদ্ভুত লাগে ভাবতে…’
  • ‘আমারো অদ্ভুত লাগে। যে দিন হাসপাতালে নিতে হ’লো তার আগে সম্ভবত দুই দিন দেখেছি আগে আগে কলেজ থেকে চ’লে এসেছে। এখন মনে হয় প্রথম দিনই যদি মাকে ডাক্তারের কাছে যেতে ব’লতাম!’ ব’লে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে রিমি। জহিরুদ্দিনও আর কোনো কথা বলে না। বাকিটা খাওয়া একরকম চুপচাপই শেষ করে ওরা।

খাওয়া শেষ হ’লে জহিরুদ্দিন পড়ার ঘরে ঢুকে যায়। আর রিমি ওর নিজের ঘরে। একটা অদ্ভুত একাকিত্ব যেন রিমিকে ঘিরে ধরে। কেমন একটা দুর্বোধ্য অস্থিরতা আচ্ছন্ন ক’রে ফেলে ওকে। একবার মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে তো পরক্ষণেই আবার তা ঝাপসা হ’য়ে আসে। কখন যে রিমির চোখ গলিয়ে পানি পড়তে শুরু করে তা ও নিজেই টের পায় না। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে রিমি।

পরদিন খুব সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই আবিরের কথা মনে আসে। গতকাল আবিরকে ভর-দুপুরে ডেকে এনেও খুব বেশি কথা বলা হয়নি ওর সাথে। রিমি এগারোটার দিকে আবিরের অফিসে ফোনকল করে। এ্যাডমিনের আব্দুল গফুর ফোনটা ধরে। আব্দুল গফুর রিমিকে জানায় যে আবির বেশ আগেই অফিসের কোনো একটা কাজে বেরিয়ে গিয়েছে আজ। সাথে অফিসের আরো কয়েকজন ছিলো। সম্ভবত আজ আর অফিসে ফিরবে না।

আরো দুই দিন পর আবিরের সাথে রিমির দেখা হয়। আমেরিকা যাওয়ার আগে আবির কিছু কাপড়চোপড় কিনতে চায়। তার জন্য নিউ-এলিফ্যান্ট রোডে এসেছে আবির। রিমি ওর জন্য শার্ট বেছে দেয় দুইটা। আবিরের বেশ পছন্দ হয় শার্ট দুইটা। আবির রিমিকেও কিছু একটা কিনে দিতে চায়। কিন্তু তার জন্য নিউ-মার্কেটে যেতে হবে কিনা বুঝে উঠতে পারে না। ‘কি ভাবছো অত?’ রিমির চোখ এড়ায় না সেটা।

  • ‘না, তেমন কিছু না। তোমাকে একটা শাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু এখানে কি শাড়ি পাওয়া যাবে?’
  • ‘তাই?’
  • ‘হুম।’ একটু টেনে বলে আবির। রিমির এটা খুব আপন আপন লাগে।
  • ‘শাড়ি না, তুমি বরং আমাকে দুইটা টি-শার্ট কিনে দাও।’
  • ‘কোত্থেকে কিনবে?’ জানতে চায় আবির।
  • ‘নতুন একটা দোকান হয়েছে, নিত্য উপহার। দারুন কিছু গ্রাফিক্স করছে ওরা। আজিজ মার্কেটে। চলো দেখি।’

বেশ কয়েকটা টি-শার্ট পছন্দ হয় ওদের দুইজনের। আবির নিজের জন্যও দুইটা কিনে ফেলে। এরপর ওরা ঘুরতে বের হয় রিকশা ক’রে। ‘ইস, আমরা যদি প্রতিদিন এই রকম রিকশা ক’রে ঘুরতে ঘুরতে প্রেম করতে পারতাম!’ রিমি আবিরের হাত ধ’রে বলে।

  • ‘মন্দ হ’তো না, কি বলো?’
  • ‘আচ্ছা তোমার যাওয়ার আগে আমরা প্রতিদিন ঘুরতে বের হবো?’
  • ‘বের হ’তে চাও?’
  • ‘হুম চাই। পারবে আসতে প্রতিদিন?’
  • ‘একবার বাড়ি যাবো। আগামী চার দিন পারবো। তারপর আপাতত ব’লতে পারছি না।’ শুনে একটু মন ভার হয় রিমির। মনে মনে ভাবতে থাকে, আবির কি আরো কিছু দিন থাকতে পারতো না ঢাকাতে! অন্তত ওর এই সময়টাতে। মায়ের চিঠিগুলোর কথা মাথায় আসে। মা কি পারতো না চিঠিগুলো নষ্ট ক’রে ফেলতে! মায়ের উপর, আবিরের উপর এক ধরণের অভিমান ফেনিয়ে উঠতে থাকে রিমির।
  • ‘আবির, আমার খুব একা লাগে ইদানিং।’ কান্না কান্না কন্ঠে বলে রিমি। ‘কখনো কখনো মনে হয় তোমাকে জড়িয়ে ধ’রে বসে থাকি সারাক্ষণ। যাওয়ার আগে একদিন বাসায় আসবে? একদিন সারাদিন আমার সাথে থাকবে?’
  • ‘বাবা?’
  • ‘বাবা তো দিনে অফিসে থাকে। আর থাকলোই না হয় বাবা?’ রিমির গলায় আব্দারের সুর।
  • ‘আমার সিডিউল তো জানো। বৃহস্পতিবার শেষ অফিস। ঐদিন শুধু রিপোর্টিং ব’লতে পারো। লাঞ্চের আগে আগে চ’লে আসতে পারবো। সেদিন হ’লে হবে?’
  • ‘হবে।’ ছোট্ট করে বলে রিমি।

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে আছে আবির। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটা বিমানে ওর জার্নি শুরু হবে। রিমির কথা মনে প’ড়তে থাকে আবিরের। তিনদিন আগে আবিরের রিমিদের বাসায় যাওয়ার কথা ছিলো। কথা ছিলো আবির দুপুরের খাবারের আগেই পৌঁছে যাবে ওদের বাসায়। তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত রিমি আর আবির একসাথে কাটাবে। কিন্তু আবিরকে অফিস থেকে বিদায় জানানোর একটা আয়োজন করেছিলো ওর কলিগরা, জুবাইদ আলীর নির্দেশে। আবিদ আটকে গিয়েছিলো। রিমিদের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আবিরের দুইটা বেজে যায়। রিমি আবিরকে বাসায় ঢুকতে দেয়নি। দারোয়ানের হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিলো, আবির যেন আর কখনো ওর সাথে যোগাযোগ না করে।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -১৫

পার্বতীপুর স্টেশনে এসে ওদের ট্রেন থামে প্রায় সাড়ে আটটার দিকে। চারপাশে ঘন অন্ধকার। প্লাটফর্ম পেরিয়ে স্টেশন-বিল্ডিঙে আসতেই নাবিলা দেখে আহসান হাবিব ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। আহসান হাবিব এগিয়ে এসে নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে। ‘পথে কোনো ঝামেলা হয়নি তো পিচ্চি?’

  • ‘না চাচ্চু। তুমি কেমন আছো?’
  • ‘আমি ভালো।’ তারপর যুথি আর কলির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমরা একটু হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হ’য়ে নিবে? আমাদের দিনাজপুর পৌঁছাতে আরো প্রায় ৪০/৪৫ মিনিট সময় লাগবে।’
  • ‘আমি একটু ওয়াশরুমে যাবো।’ কলি জানায়।
  •  ‘পাবলিক টয়লেটটা একটু সামনে। চলো আমরা ঐ দিকটাতে যাই।’ আহসান হাবিব ওদেরকে পথ দেখিয়ে দেয়। সবাই একটু ফ্রেশ হ’লে পর ওরা স্টেশন বিল্ডিং থেকে বের হ’য়ে আসে। স্টেশনের একরকম মুখেই ওদের গাড়ি অপেক্ষা করছে। একটা নীল মিতসুভিসি পাজেরো। আহসান হাবিব সামনের সিটে গিয়ে বসে। একেএকে গাড়িতে কলি, যুথি আর নাবিলা চ’ড়ে বসে। কলি গাড়িতে ওঠার সময় চাচ্চু যেন শুনতে না পারে এমন ক’রে নবিলাকে বলে, ‘আমি আগে উঠি পিচ্চি?’ নাবিলা চোখ পাকিয়ে তাকায় ওর দিকে।

ওদের ব্যাগপ্যাকগুলো খুব বড় নয়। যে যারটা তার হাতেই রাখে। গাড়ি ছাড়ার পর আহসান হাবিব নাবিলার হাতে একটা ছোট হটপট তুলে দেয়। পথে খাওয়ার জন্য চাচী মাংসের টিকিয়া বানিয়ে পাঠিয়েছে। যুথি আর কলি হামলে পড়ে সেটার উপর। আহসান হাবিব সেটা দেখেও না দেখার ভান ক’রে ড্রাইভার লিটনকে সামনের রাস্তার কোনো একটা ভাঙার দিকে খেয়াল করতে ব’লে। এইদিকের রাস্তায় বেশ কিছু জায়গাতে কাদা জমে আছে। হয়তো দিনে কোনো সময়ে বৃষ্টি হয়েছে।

আহসান হাবিবের সরকারী কোয়ার্টারে পৌঁছাতে প্রায় ১০টা বেজে যায় ওদের। ওরা ভেতরে ঢুকতেই ইকবাল এসে নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে। ‘আপু, আমার জন্য কি এনেছো?’

  • ‘কী চায় তোর বল?’
  • ‘তোমাকে কাল বলবো, এখন মার সামনে বলা যাবে না।’ রানু সেটা শুনে ফেলে। ‘ছাড় তো ওকে এখন। মেয়েটা আসতে পারলো না আর তুই বাইনা শুরু করলি!’ এ কথাতেও ইকবাল নাবিলাকে ছাড়ে না। নাবিলার এক হাত ধ’রে ওদের সাথে সাথে ভেতরে ঢোকে। যুথি তখন ওর ব্যাগ থেকে বের ক’রে ইকবালের হাতে একটা চকলেট তুলে দেয়।

রানু যুথি আর কলিকে ওদের ঘরটা দেখিয়ে দেয়। ‘তোমরা কাপড়-চোপড় ছেড়ে একটু গুছিয়ে নাও। আমি খাবারের ব্যবস্থা করি। খাবার টেবিলেই কথা হবে, কি বলো?’

  • ‘আচ্ছা চাচী।’ যুথি আর কলি একই সাথে বলে।
  • ‘তুই আমার সাথে আয়।’ নাবিলাকে নির্দেশ ক’রে বলে রানু। ওদের ঘর থেকে বের হ’য়ে ওরা ইকবালের ঘরে ঢোকে। বেশ বড়সড় ঘরটা। সেখানে রানু নাবিলার জন্য আর একটা খাট পেতে দিয়েছে। ‘তুই ইকবালের সাথে এই ঘরে থাকবি।  বসার ঘরের খাটে মশারি টাঙানোর ব্যবস্থা নেই। কয়েকদিন খুব মশা হয়েছে।’
  • ‘ঠিক আছে চাচী।’
  • ‘তাহলে তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে খাবার ঘরে আয়।’ ইকবালের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুই ওদেরকে দেখিয়ে দিস। আমি খাবার ঘরে গেলাম।’

নাবিলা চটজলদি গোসল ক’রে নেয়। তারপর ইকবালকে সাথে করে যুথি আর কলিদের ঘরে যায়। যুথি বিছানায় গড়াগড়ি করছে আর কলি বাথরুমে। ‘কলি এখনো বের হয়নি?’

  • ‘উহু। কতক্ষণে যে বেরোবে কে জানে? ততক্ষণে না আমি আবার ঘুমিয়ে যাই!’
  • ‘ঐ ঘরের বাথরুমে যাবি?’
  • ‘না, থাক। দেখি কলিকে একটু নক ক’রে।’ ব’লে বিছানা থেকে উঠে যুথি বাথরুমের দরজায় টোকা দেয়। ‘এই তোর হ’লো?’
  • ‘কেন? তোর ইমারজেন্সি?’ কলির উত্তর আসে। শুনে নাবিলা না হেসে পারে না।
  • ‘তুই চল আমার সাথে। ঐ ঘরের বাথরুমটা দেখিয়ে দিই তোকে। আর আমি গিয়ে দেখি চাচী কী করে।’ যুথি যাওয়ার সময় কলির বাথরুমে আবার টোকা দেয়। ‘৫ মিনিটের ভেতরে যদি বের না হোস তোর কিন্তু আজ খবর আছে!’
  • ‘১০ টাকা বাজি।’ নাবিলা বলে।
  • ‘আচ্ছা যা বাজি। যদিও জানি হারবো।’

ইকবাল আর নাবিলা রান্না ঘরে ঢোকে। কাজের লোক রাহেলা খাবার গরম করছে। চাচী হাড়ি থেকে ভাত একটা বাটিতে তুলে তা ইকবালের হাতে দেয়। ডালের বাটিটা দেয় নাবিলার হাতে। ‘তোরা গিয়ে টেবিলে বস। আর ওরা কই?’

  • ‘ওরা এখনো ওয়াশরুমে। চাচ্চু কই চাচী?’
  • ‘বাবা টিভি দেখে।’ ইকবাল তড়িৎ জানায়।
  • ‘চল, আমরাও টিভি দেখি গিয়ে।’
  • ‘বাবা তো খবর দেখে।’
  • ‘তুই খবর দেখিস না!’
  • ‘দে..খি..’ টেনেটেনে বলে ইকবাল। ‘তবে কম..’
  • ‘আচ্ছা চল দেখি ওরা বের হ’লো কিনা।

নাবিলা বাজিতে হেরে গেছে। ব্যাপারটা যুথিরও বিশ্বাস হচ্ছে না। ‘এই তুই কি আমাদের কথা শুনে ফেলেছিলি?’

  • ‘কোন কথা?’
  • ‘পরে বলবো। চল এখন তাড়াতাড়ি। চাচী খাবার সাজিয়ে বসে আছেন।’

খাওয়াদাওয়া শেষ ক’রে ওরা দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়ে। একেতে লম্বা ভ্রমণের ধকল তার উপর চারপাশটা যেন আরো আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। এমন সময় জেগে থাকাটাই কেমন যেন অস্বাভাবিক।

নাবিলার সব সময়ই খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে মশারির ভেতর থেকেই চারপাশে একটু দেখার চেষ্টা করে। জানলার দিকে তাকিয়ে বোঝা যায় উষার আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। ঘরে খুবই সামান্য আলো আসছে। তাতেও বোঝা যায় ইকবাল পাশের বিছানায় ঘুমাচ্ছে। দূরের কোনো একটা পাখির ডাক শোনা যায় কি যায় না। নাবিলা উঠে পড়ে বিছানা ছেড়ে।

দাঁত মেজে বাথরুম সেরে নাবিলা বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়। আরো একটু আলো ফুটেছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে বেশ দূরের আর একটা কোয়ার্টার দেখা যাচ্ছে। শহর এত চুপচাপ হ’তে পারে! খুলনার কথা মনে আসে নাবিলার। খুলনা শহরের শব্দে কেমন যেন একটা পাগলামী আছে! দিনের শব্দে, রাতের শব্দে, সকালের শব্দে, বিকালের শব্দে, বাড়ির শব্দে, রাস্তার শব্দে, পাটকলের শব্দে, ম্যাচ ফ্যাক্টরির শব্দে…। নাবিলার স্মৃতিতে নানা শব্দ দুলে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শব্দ, রূপসা নদীর শব্দ, ফিসারি ঘাটের লঞ্চের শব্দ, গাড়ির শব্দ, রিকশার শব্দ… চেনা শহরের শব্দ, অচেনা শহরের শব্দ। কয়েক দিন আগে যে যশোর থেকে ঘুরে আসলো তার শব্দ আবার আর এক রকম। আচ্ছা একেক শহরের শব্দ কি একেক রকম? নাকি ওর কাছে আজকের সকালে একেক রকম লাগছে কোনো কারণে? 

  • ‘উঠে পড়েছিস?’ চাচীর কথায় নাবিলার যেন ঘোর কাটে।
  • ‘হুম। তুমি কখন উঠলে?’
  • ‘মাত্রই। তুই হাত-মুখ ধুয়েছিস?
  • ‘হুম।’
  • ‘আয় তবে আমার সাথে। তোর চাচ্চুও উঠে পড়েছে। এক সাথে চা খাই চল।’
  • ‘ইকবালকে তুলবে না?’
  • ‘এখন? দেখ তুলতে পারিস কিনা! আমি আটটার সময়ও টেনে তুলতে পারি না।’
  • ‘আচ্ছা সাতটার দিকে টানাটানি ক’রে দেখবো। চলো… চা বানিয়েছো না বানাবে?’
  • ‘চুলায় পানি দিয়েছি। রং-চা কিন্তু। আমি বিয়ের আগে রং-চা খেতেই পারতাম না। এখন তোর চাচ্চুর পাল্লায় প’ড়ে সকাল বিকাল এটাই খাই। অভ্যাস হ’য়ে গেছে।’
  • ‘তুমি বিয়ের আগে থেকেই সকালে চা খাও?’
  • ‘ও না… আমাদের বাসায় চায়ের চল তেমন একটা ছিলো না। আমাদের বাসায় আমার এক দূর-সম্পর্কের নানী থাকতেন। ওনার ছেলে-মেয়ে ছিলো না কোনো। তাই আমাদের সাথে থাকতেন। ওনার চা খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। সকালের নাস্তা ক’রে বুড়ির এক কাপ গরম-গরম দুধ-চা লাগবেই। নানীর সাথে আমার খুব ভাব ছিলো। ওনার কাপ থেকেই মাঝে মাঝে একদুই চুমুক খেতাম।’ রানু চা বানাতে বানাতে ব’লতে থাকে। ‘কোনো কোনো দিন হয়তো বিকালে নাস্তার সাথে মা চা বানাতো। সব সময় দুধ-চা। এখন যত সহজে চা পাওয়া যায় তখন তো এতটা পাওয়াও যেতো না।’
  • ‘তোরা কি নিয়ে গল্প করছিস?’ আহসান হাবিব রান্না ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে।
  • ‘চাচী ওনার নানীর সাথে চা খাওয়ার গল্প ব’লছে। তোমাকে ব’লেছে কখনো?’ নাবিলার কথায় আহসান রানুর দিকে তাকায়। সে তাকানো প্রেমিকের তাকানো। তাতে অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতুহল।
  • ‘কি জানি! তোর চাচীর অনেক লুকানো গল্প আছে। সবাইকে সব গল্প করে না!’ আহসানের কণ্ঠে কৌতুক। রানু বা নাবিলার কারো সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
  • ‘চান-নানীর কথা বলছি। তুমি তো জানো ওনার কথা।’
  • ‘ও! সেই ধনী ডাইনী বুড়ি?’
  • ‘হয়েছে হয়েছে! নাও এখন চা খাও। নাস্তায় রুটির সাথে কি খাবে বলো।’
  • ‘আলু ছাড়া যে কোনো কিছু।’
  • ‘পটল ভাজিতেও আলু দেয়া যাবে না?’
  • ‘নোপ।’ চাচ্চুর কথায় নাবিলা মিটমিট ক’রে হাসতে থাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুইজন কাজের লোক চ’লে আসে। একজন ঘরদোর পরিস্কার করার। আর অন্যজন রাহেলা, রান্নাবান্নার জন্য। রানু ওদের দুইজনকে কাজের নির্দেশনা দেয়। তারপর নাবিলাকে নিয়ে যুথি আর কলির খোঁজ নিতে যায়। দরজা খোলে কলি। ওরা তখনো ঘুমাচ্ছিলো।

  • ‘তোমরা চাইলে আরো একটু ঘুমাতে পারো। নাস্তা রেডি হ’তে আরো এক ঘন্টা। অবশ্য চাইলে এখন চা খেতে পারো।’
  • ‘তা হ’লে ঘুমাই চাচী। নাস্তার সাথে চা খাবো আমি।’

যুথি আর কলির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রানু দেখে আহসান হাবিব হাঁটতে যাওয়ার জন্য তৈরী। ‘তুমি যাবে আজ?’

  • ‘ওরা আরো একটু ঘুমাবে বললো। চলো যাই।’ স্বামীর সাথে সকালের এই হাঁটাটা রানুর খুব প্রিয়। খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আহসান হাবিবের এই অভ্যাসটা বেশ পুরোনো। ‘তুই যাবি আমাদের সাথে?’ নাবিলাকে জিজ্ঞেস করে রানু।
  • ‘চলো। কত দূর যাবে তোমরা?’
  • ‘দূরে না, এই কমপাউন্ডের ভেতরেই।’ রানু জানায়।
  • ‘এখানে একটা ছোটখাটো মাঠ আছে। বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টোন খেলার মতো। ট্রাক-শুট আনছিস সাথে?’
  • ‘ট্রাউজার-টিশার্ট আছে।’
  • ‘ওকে। দেখি আমাকে ৫০ মিটারে হারাতে পারিস কিনা।’
  • ‘তোমার সাথে পারবো না। আমি তো স্প্রিন্টার না।’
  • ‘আমিও তো না। আমি খেলতাম ফুটবল। যা, তাড়াতাড়ি রেডি হ’য়ে আয়। আর তোর চাচীকে পারলে একটু বোঝা তো ব্যায়ামের সময় শাড়ী না প’রে অন্তত সালোয়ার কামিজ পরা ভালো। আমি এত বছরেও বোঝাতে পারলাম না এটা।’

দেখা যায় নাবিলার কথায় চাচী একবারেই রাজী হয়ে যায়, হয়তো নাবিলার পোশাক দেখে ভরসা পায়। জগিঙের উপযোগী পোশাক রানুর জন্য আসহান হাবিব কয়েক বারই এনে দিয়েছে। রানু কি মনে ক’রে আজ সেগুলো থেকে একটা বের ক’রে পরলো। সেটা দেখে আহসান হাবিব শুধু বললো, ‘বাহ!’

নাবিলার দেখা দেখি রানু একটু দৌড়ানোরও চেষ্টা করলো। অল্প দৌড়েই হাপিয়ে উঠলো যদিও। তবে রানু হাঁটতে পারে বেশ। একটু জিড়িয়ে নিয়ে রানু মাঠটার চারপাশে পাক দিয়ে হাঁটতে লাগলো। আহসান আর নাবিলা একসাথে মাঠটার চারপাশে পাঁচটা পাক দেয়। তারপর দুইজন মাঠের এক কোণে বসে পানি খেতে থাকে। রানু কিছুক্ষণের ভেতরে ওদের সাথে যোগ দেয়। ‘দৌড়ালে তো হার্টবিট বেড়ে যায়। তোমরা এতটা দৌড়ালে কিভাবে?

  • ‘চাচী, তুমি একটু দ্রুত শুরু ক’রে দিয়েছিলে। আস্তে আস্তে স্পিড বাড়াতে হয়। আর একটু তো অভ্যাস লাগেই।’ নাবিলা জানায়।
  • ‘আমাকে আর একটু দেখিয়ে দিস তো।’
  • ‘আচ্ছা। এখন একটু পানি খেয়ে মাঠে গড়াগড়ি করো।’

৪/৫ মিনিট পর নাবিলার সাথে রানু মাঠের লম্বা বরাবর আস্তে আস্তে একটু দৌড়ানোর চেষ্টা করে। আহসান হাবিব মাটিতে গোড়ালি যতটা কম পারা যায় লাগানোর চেষ্টা ক’রতে বলে রানুকে। এবার বেশ সহজেই সেটা পারে রানু।

বাসায় ফিরে দেখা যায় যুথি ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে একটা বই হাতে নিয়ে বসেছে। আর কলি তখনো ঘুমে। নাবিলা কলি আর ইকবাল দুইজনকেই বিছানা থেকে টেনে তুলে ফেলে। অদ্ভুত ভাবে কেউই কোনো অপত্তি করে না।

পরিকল্পনা করা হয় আজ ওরা শুধু শহরটা ঘুরে দেখবে। বিকালে বড়মাঠ আর রামসাগর দেখতে যাবে ওরা। সাথে চাচী আর ইকবালও যাবে। আর টিকেট পাওয়া গেলে লিলি সিনেমা হলে ওরা একটা সিনেমা দেখবে। কান্ত-জিউয়ের মন্দির দেখতে যাবে শুক্রবার চাচ্চু আহসান হাবিবের সাথে। মাঝখানের একটা দিন কি করা যায় তাই নিয়ে কথা হয় কিন্তু ঠিকঠাক হয়না কি করা হবে।

যু্থির একটা স্বভাব যে শহরেই যাক না কেন সেখানকার লাইব্রেরী ঘুরে ২/৩ টা বই কিনবেই। বইয়ের দোকানে গিয়ে ওরা এক লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে জানতে পারে দিনাজপুরের কালিয়া-জিউয়ের মন্দির আর রাজবাড়ির কথা। মন্দিরটা রাজবাড়ির লাগোয়া। রাজবাড়ির লোকজন এই মন্দিরে পূজা করতো। আর সার্বোজনীন পূজার জন্য নাকি রাজবাড়ির বাইরে একটা পূজার মন্ডপও আছে। সবচেয়ে বড় কথা রাজবাড়িটা শহরের ভেতরেই। ফলে সকালে বেরিয়ে দুপুরের ভেতরেই ঘোরাঘুরি শেষ করে বাসায় ফিরে আসা যায়। ওরা ঠিক করে আগামী কাল ওরা ওখানে যাবে।   

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -১৪

তিন দিন ধ’রে নিজের মতো ক’রে ভাবে রিমি। রাশেদ জামানের চিঠিগুলো নিয়ে। ভাবে বাবা এসব জানে কিনা। আবার বাবাকে জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কিনা। ভাইয়াটাও এখন ঢাকাতে নেই। ফোনে এসব নিয়ে একেবারেই কথা বলতে ইচ্ছা করে না। রিমি একদিন আবিরকে চিঠি তিনটা পড়তে দেয়।

চিঠি পড়া শেষ হ’লে আবির ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কী বলবে। কিন্তু কিছু একটা যে বলা দরকার তাও মনে হ’তে থাকে। আবির চিঠিগুলো নিয়েই কথা বলা শুরু করে। ‘কোথায় পেলে এগুলো?’

  • ‘মার আলমারিতে। মার কাপড়-চোপড়গুলো গুছাতে গিয়ে পেয়েছি। আমরা কেউই অন্য কারো আলমারিতে হাত দিতাম না। বাবা এসব জানে কিনা তাও জানি না। আমার এখন কী করা উচিৎ বলো তো।
  • –      ‘চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলতে পারো। এখন তো আর এসবের কোনো মূল্য নেই। যাকে লেখা চিঠি সেই আর বেঁচে নেই।’
  • –      ‘তা করা যায়। তবে তোমার কী মনে হয় এটা পড়ে?’
  • –      ‘তোমার মায়ের সম্পর্কে?’
  • –      ‘মায়ের সম্পর্কে, আমার সম্পর্কে…’
  • –      ‘তোমার মাকে তো সামনাসামনি দেখিনি কখনো। তবে মানুষের জীবনে জটিলতা থাকে অনেক। শেষ পর্যন্ত মানুষ কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। আমেরিকা ফেরার আগে নিশি ফুপু বলছিলো, যে মানুষের জীবনে কোনো ভুল নেই তা কোনো জীবনই না। আমাকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে বলেছেন জীবনে ছোট ছোট কিছু ভুল করতে আর প্রেমে পড়তে। আমি হেসেছি। এখন মনে হচ্ছে, ফুপু ঠিকই বলেছেন।’
  • –      ‘তোমার আমাকে নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই তো? আমি তিনদিন অনেক ভেবেছি। সামনে কী করবো জানি না। তবে তোমাকে জানানো দরকার মনে করেছি। আমার মনে হয়েছে তোমাকে আমার এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
  • –      ‘ভালো করেছো। এবার চলো একটু রিকশা করে ঘুরি কোথাও। অনেক দিন তোমার হাত ধরাও হয় না।’
  • –      ‘চলো পুরান-ঢাকার দিকে যাই। কোনো একটা নদীর পাড়ে যেতে পারলে ভালো হতো।’
  • –      ‘কিন্তু সদরঘাট তো অনেক দূরে। গেলে ফিরতে অনেক রাত হ’য়ে যাবে। এরই মধ্যে ৬টার বেশি বেজে গেছে…’
  • –      ‘তাও বটে। তবে আর ওদিকে আজ গিয়ে কাজ নেই। কার্জন হলের দিকেই যাই চলো।’

রিকশা ক’রে কার্জন হল যায় ওরা। এই ভ্রমণটা খুব প্রিয় রিমির। ওর মনে পড়ে একবার আবিরের সাথে রিকশা করে এফ. রহমান হলের সামনে থেকে টিএসসি পর্যন্ত এসেছিলো। তখনো ওদের ভেতরে প্রেমের সম্পর্ক হয়নি। রিমি আবিরকে জিজ্ঞেস করে সেদিনের কথা ওর মনে আছে কিনা।

আবির জানায় যে ওর মনে আছে। ‘মনে আছে কারণ সেদিনই আমার মনে হয়েছিলো- এই মেয়েটা অদ্ভুত। এই মেয়েটার ভেতরে কিছু একটা আছে … মুগ্ধ করার মতো কিছু একটা। ’

  • ‘সেই জন্য তখন কথা বলতে চেয়েছিলে আমার সাথে?’
  • ‘হুম।’
  • ‘তা হ’লে তো ফুপু বলার আগেই স্যার প্রেমে পড়েছেন দেখা যাচ্ছে!’ রিমির কথা শুনে আবির হাসতে থাকে।
  • ‘তাই তো দেখি।’
  • ‘আচ্ছা, মাকে বলেছো আমাদের কথা?’
  • ‘না।’
  • ‘কবে বলবে?’
  • ‘তুমি চাইলে আজই ব’লতে পারি। তবে কথাটা সামনাসামনি বলতে চাই আমি। মা আমার বিয়ের কথা ভাবছে।’ কথাটা ব’লে আবির রিমিকে আড়চোখে দেখার চেষ্টা করে। যদিও অন্ধকারে রিমির অভিব্যক্তি কিছু বোঝা যায় না।
  • ‘আমি কিন্তু এখন বিয়ে করতে চাই না। আগে লেখাপড়া শেষ হোক।’ তারপর খানিকটা থেমে ব’লে, ‘এই চিঠিগুলো পড়ার পর বিয়ে ব্যাপারটা নিয়েই মনের ভেতরে খচখচ করছে। তুমি কিছুদিন আমাকে বিয়ের কথা বোলো না তো, প্লিজ।’
  • ‘আমি বিয়ের কথা বলছি না তো। কথায় কথায় চ’লে এলো। সরি।’

আবিরের কথায় রিমির মন ভালো হ’য়ে যায় ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু সেই মন ভালো ব্যাপারটা বেশি সময় স্থায়ী হয় না। তোপখানা মোড় থেকে আবিরের বেবিট্যাক্সি নেয়ার পর থেকেই বিয়ের ব্যাপারটা রিমিকে ঘিরে ধরে। বাবা আর মায়ের সম্পর্ক নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়ে রিমির। রিমি মনেমনে ঠিক ক’রে ফেলে যে ব্যাপারটা নিয়ে বাবাকে ও কোনো প্রশ্ন করবে না। পুরোনো বিষয় টেনে এনে বাবাকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ হয়তো বাবা ব্যাপারটা জনতো। আবার হয়তো জানতো না।

যদি ব্যাপারটা বাবা জেনে থাকে তবে সেটা নিয়ে নিশ্চয় মায়ের সাথে তার কোনো একটা বোঝাপড়া হয়েছিলো। তা না হ’লে এতটা বছর এই দুইজন মানুষ একসাথে থাকতো না নিশ্চয়। আবার এমনও তো হ’তে পারে বাবা আসলে কিছুই জানে না এখনো। তবে কি সারাটা জীবন মা-কে ঠিক মতো না জেনেই ভালোবেসে গেলো বাবা? নাকি ভালোবাসতো না? দায়িত্ব পালনের মতো সংসার ক’রে গেলো এতদিন!?

রিমি আর ভাবতে পারে না। বা ভাবনা জড়িয়ে যায়। বাবা আর মায়ের লম্বা কোনো কথোপোকথন মনে করার চেষ্টা করে রিমি। কিন্তু মনে ক’রতে পারে না। খাবার টেবিলে বাবা খুব কম কথা বলে। সে আগেও, এখনো। তবে বসার ঘরে বাবার সাথে রিমি আর আশিকের অনেক কথা হ’তো এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও। এমন বিষয় খুব কম আছে যা নিয়ে রিমি আর আশিক খাওয়ার পরে বসার ঘরে ব’সে বাবাকে প্রশ্ন করতো না। সেসব প্রশ্ন নিয়ে জহিরুদ্দিন সিরাজীকে কোনো দিন বিরক্ত হ’তে দেখা যায়নি। কোনো কোনো দিন প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অনেক রাতও হ’য়ে যেতো। বাবা হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হয়তো কোনো বইয়ের রেফারেন্স দিতো। রিমি বা আশিক দুইজনই সেসব নিয়ে পরে পড়ে দেখতো। তাতে প্রশ্ন যে কমতো তা নয়। বরং আরো বাড়তো। নতুন প্রশ্ন নিয়ে আবার বাবার সাথে বসতো দুই ভাইবোন। কিন্তু রিমির মাথায় কখনো আসেনি যে সেসব কথোপোকথনের সময় মা কখনো থাকতো না। আজ বড্ড মনে বাজছে রিমির, মা কেন তখন ওদের সাথে থাকতো না।

রিমির কেন যেন মনে হয় ফুপু হয়তো কিছু জানতে পারে। মেয়েরা অনেক কিছু মেয়েদেরকে বলে। অথবা মেয়েরা আনেক কিছু ধরতে পারে, যা ছেলেরা পারে না। এই যেমন আবির। রিমির ভেতরে যে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা কি আবির বুঝতে পেরেছে আজ? পারলে কি এমন সহজ হ’য়ে কথা বলতে পারতো! রিমির এক ধরণের অভিমান হয় আবিরের উপর। এত সিরিয়াস একটা বিষয় কেন আবির গুরুত্ব দিলো না? রাশেদ জামান যদি রিমির প্রকৃত বাবা হয় তবে কি আবির রিমিকে বিয়ে করতে রাজি হবে?

রিমির চোখে ঘুম আসে না এক ফোঁটা। কয়েকবার ঘড়ি দেখে অস্ট্রেলিয়ার সময় মেলায় মনে মনে। সিনথিয়া ফুপু কি এতক্ষণে উঠে পড়েছে? ফোনের রিসিভার সিনথিয়াই তোলে ‘হ্যালো।’

  • ‘হ্যালো ফুপু! কেমন আছো?’
  • ‘আমরা ভালো। তোমরা ঠিক আছো তো? মিয়াভাই ভালো আছে?’
  • ‘বাবা ঘুমাচ্ছে। এখন তো অনেক রাত এখানে…।’ একটু থেমে রিমি বলে, ‘ফুপু, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
  • ‘অবশ্যই, তবে তাড়াতাড়ি। অরিল উঠে পড়েছে।’
  • ‘তুমি রাশেদ জামান নামের কাউকে চেনো?’ রিমির প্রশ্নে খানিকটা চমকে যায় সিনথিয়া। কী ব’লবে বুঝে উঠতেও পারে না। রিমি ঠিক বুঝতে পারে না লাইনটা কেটে গেলো কিনা। ‘হ্যালো, ফুপু…’
  • ‘হ্যাঁ, চিনি।’ সিনথিয়া জানায়। ‘ঠিক মতো ব’ললে, চিনতাম। তোমার নানাবাড়ির ঐ দিকের মানুষ। হঠাৎ ওনার কথা কেন?’
  • ‘ওনার কয়টা চিঠি পেয়েছি, মার কাছে লেখা…’
  • ‘ও, তাই বলো। ভাবি একসময় অনেক চিঠি লিখতো। মিয়াভাইকে তো চাকরীর জন্য নানা জায়গায় থাকতে হ’তো। আবার ভাবির কলেজ ঢাকাতে। কিছু একটা নিয়ে ব্যস্তা থাকলে সময় কাটাতে সহজ হয়।’
  • ‘ফুপু, আমি চিঠিগুলো পড়েছি।’ রিমির এই কথায় আর সিনথিয়া কিছু বলে না। ‘আচ্ছা, বাবা কিছু জানে এ নিয়ে?’ রিমি জানতে চায়।
  • ‘সম্ববত না।’ কিছু ব’লবে না ব’লবে না ক’রেও সিনথিয়া ব’লে ফেলে। ‘আসলে আমিও বেশি কিছু জানি না। আবার অনেক দিন আগের কথা। খুব একটা মনেও নেই। তুমি এ নিয়ে বেশি ভেবো না। তুমি বরং এক কাজ করো। চিঠিগুলো আমাকে পাঠিয়ে দাও। আমি একটু প’ড়ে দেখি।’  

পরদিন সরকারী ডাকে রিমি চিঠিগুলোর একটা কপি ফুপুর ঠিকানায় অস্ট্রেলিয়াতে পাঠিয়ে দেয়। রিমি মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় ফুপুর কাছে চিঠি পৌছালো কিনা। কিন্তু প্রতিবারই ফুপু ওকে জানায় যে চিঠি এসে এখনো পৌঁছায়নি।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -৭

ফেরী ঘাটে গাড়ির লম্বা লাইন। গাবতলী থেকে এ পর্যন্ত আসতে রাস্তায় তেমন কোনো বিড়ম্বনাতে প’ড়তে হয়নি। তবে এখন যে বেশ লম্বা একটা সময় অপেক্ষা করতে হবে তা বুঝতে পারে আবির। অনেকেই গাড়ি থেকে নেমে আশপাশে হাঁটাহাঁটি করছে। আবির খানিকটা অপেক্ষা ক’রে নিজেও নেমে পড়ে। পদ্মা নদী পার হওয়ার এই চিরাচরিত ঝক্কির সাথে অবির বেশ পরিচিত। সবকিছু এখানে ঠিক পরিকল্পনা মাফিক হয় না। অনেকটা যেন জীবনের মতো। আবির হাঁটতে হাঁটতে রিমির কথা ভাবতে থাকে। যখন রিমিকে নিয়ে ও পরিকল্পনা ক’রতে চেয়েছিলো তখন রিমি কাছে আসেনি। কিংবা হয়তো আসতে পারেনি। আর যখন রিমির ভাবনাটা একেবারেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা গিয়েছিলো তখন হঠাৎ ক’রেই রিমি এসে হাজির হলো!

এখন অনেক কিছুই হয়তো নতুন ক’রে ভাবতে হবে। নিশি ফুপু আব্বাকে ফোনে বলেছিলো আবির যেন জিআরই ক’রে নেয় দ্রুত। তাতে ওর আমেরিকাতে মাস্টার্স করতে আসতে সুবিধা হবে। আবির তার প্রস্তুতিও শুরু করেছে। ফুপুও হেল্প ক’রবে ব’লে জানিয়েছে। বাসায় গিয়ে তাই নিয়ে হয়তো নিশি ফুপুর সাথে ওর কথাও হবে। এখন যদি বাইরে পড়তে যাওয়ার সুযোগটা দ্রুত হ’য়ে যায় তবে রিমির সাথে সম্পর্কটা রাখা যাবে কি?

এমন সময় গাড়ির লাইন ধীরে ধীরে আগাতে থাকে। আবির ওর গাড়ির দিকে লক্ষ্য রেখে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। ওর পাশ দিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা অনেকগুলো গাড়ি চ’লে যেতে থাকে। গাড়ির সংখ্যা দেখে মনে হয় অন্তত দুইটা ফেরীর গাড়ি। তাহ’লে ওদের বাসটা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবে। যায়ও। আবির দেখে ওর বাসটা ওকে পেছনে রেখে বেশ একটু সামনে গিয়ে আবার দাড়িয়ে গেলো। আবার পরবর্তী কোনো ফেরী আসা পর্যন্ত একই রকম ভাবে অপেক্ষা করতে হবে।

আবির ঝালমুড়ি মাখানো কেনার জন্য দাড়ায় একটু। কেনা হ’লে একটু একটু ক’রে খেতেখেতেই ওর বাসের দিকে আগাতে থাকে। গাড়িগুলো আবার আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মুড়িওয়ালা বেশ ঝাল দিয়েছে মুড়িমাখানোতে। খাওয়া শেষ হ’লে আবির মুড়ির ঠোঙাতেই হাত মুছে নেয়। তারপর পাশের একটা দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনে বাসে গিয়ে বসে আবির। সিটে শরীরটা খানিকটা এলিয়েও দেয়। গাড়িটা বেশ ফাঁকাফাঁকা লাগে। আবিরের পাশের সিটের ভদ্রলোকও গাড়িতে নেই। গাড়ির ভেতরের বাতি নেভানো। বাইরের আলোও যে বেশি তাও নয়। তবু ভেতর থেকে বাইরের কার্যক্রম বেশ বোঝা যায়। অনেকেই ঝুপড়ির দোকান থেকে ডিম-পরোটা কিনছে। ডাবের বিক্রিও মন্দ নয়। আবির একটা পেয়ারা কেনে। কাজী পেয়ারা। দেখতে বেশ বড়। তবে মিষ্টি কম। ইদানিং এই পেয়ারাগুলোই বেশি পাওয়া যায়। এসব দেখতে দেখতেই আবির একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

হঠাৎ বাঁশির উচ্চ-শব্দে ঘুম ভাঙে আবিরের। ফেরী ছেড়ে দেবে। ওদের গাড়ি ফেরীতে কখন উঠেছে সেটা টের পায়নি আবির। পল্টুনের এই জায়গাটাতে তুলনামূলক আলো বেশি। অনেক হকারের হাকডাকও শোনা যাচ্ছে। ডিম, চানাচুর, পানি, ইলিশ মাছ কত কিছু যে বিক্রি হ’চ্ছে বলা কঠিন। যেন একটা জমজমাট বাজার। আবির গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। একবার টয়লেট সেরে নেওয়া দরকার। গাড়ি ফেরী থেকে নেমে গেলে ঝিনাইদহে পৌছার আগে আর তেমন একটা বিরতি পাওয়া যাবে না। এদিকে আবার টয়লেটের সামনেও বেশ লাম্বা লাইন। ফেরী দৌলতদিয়া পৌছানোর আগেআগে টয়লেট সেরে নেওয়া যাবে চিন্তা ক’রে আবির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। ফেরীর উপরে যে ক্যান্টিন আছে ওখানে মাঝেমাঝেই ভালো ইলিশের তরকারী পাওয়া যায়। দামও খুব বেশি নয়। আজ বেশ বড় পেটির ইলিশ পাওয়া গেলো। আবির একবার ঘড়ি দেখে। প্রায় দশটা বেজে গেছে। খেয়ে নেওয়াটাই ঠিক হবে। সাধারণত নদী পার হ’তে ৪৫/৫০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তারপর চুয়াডাঙ্গা পৌছাতে কম ক’রে হলেও আরো তিন ঘন্টা।

দ্রুত খেয়ে নেয় আবির। আরো অনেকেই জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবির উঠতেই আর একজন ওর ছেড়ে দেওয়া সিটে ব’সে খাবার অর্ডার করে। আবির খাবারের দাম মিটিয়ে পাশের চায়ের দোকানে চ’লে আসে। সেখানেও ভীড় কম নয়। আবির বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই চা খেয়ে নেয়। ফেরী ততক্ষণে মাঝ নদীতে পৌছেছে। এই জায়গাটাতে পানির স্রোত একটু বেশি। ফেরীর দুলুনিতে তা বেশ টের পাওয়া যায়। চা শেষ হ’লে আবির ক্যান্টিন থেকে বের হ’য়ে আসে। ফেরীর পাটাতনের কোনো একটা কিনারাতে গিয়ে পানির স্রোত দেখতে বেশ ভালো লাগে। কখনো কখনো পানি ছিটকে এসে খানিকটা গায়েও লাগে। অবশ্য ফেরী বড় হ’লে সেই সম্ভাবনা কম থাকে। আজকের ফেরীটা বড় ফেরীগুলোর একটা। পানির স্রোত কেটে ফেরীর এগিয়ে যাওয়ার শব্দটা অদ্ভুত। ধীরে ধীরে নদীর অন্য পাড় বেশ এগিয়ে আসছে। আবির সেই দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। আর হয়তো মিনিট দশেকের ভেতরেই ঘাটে ভিড়বে ফেরী। আবির টয়লেটের দিকে পা বাড়ায়। এদিকটাতে এখন আর তেমন একটা ভীড় নেই।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে রেহনুমা উঠে বসে। প্রায় দুইটা বাজে। বাড়ির দরজা কাজের-লোক খুলে দেয়। আবির সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে। দোতলার বারান্দায় ছেলের হাত ধরে রেহনুমা। একটু যেন শুকিয়ে গেছে ছেলেটা। ‘এত দেরী হ’লো যে!’‘ঘাটে আজ অনেক জ্যাম ছিলো মা। তোমরা কেমন আছো?’

‘আমরা ঠিক আছি। তুই আগে হাত-মুখ ধুয়ে নে। আমি ভাত রেডি করি।’

‘ফেরীতে খেয়েছি।’

‘অল্প ক’রে আবার খাবি। আমি তোর গামছা এনে চেয়ারের উপর রাখছি।’

‘আচ্ছা।’

ততক্ষণে বদিউজ্জামানও টের পেয়ে উঠে পড়েছে। খাবার ঘরে একটা চেয়ারে এসে বসেছে।  ছেলে হাত-মুখ ধুয়ে বের হ’তেই পথে কোনো ঝামেলা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে।‘না, ঝামেলা হয়নি কোনো; শুধু ঘাটে জ্যাম ছিলো বেশ।’

‘কয়টার গাড়ি?’

‘পাঁচটার।’

‘সাড়ে আট ঘন্টা!’ খানিকটা হিসাব ক’রে বলে বদিউজ্জামান। ‘অনেক সময় লাগলো তো।’

‘ফুপু কই মা?’

‘ওনার ঘরে, শুয়ে পড়েছে বোধহয়। তুই খেয়ে নে তো।’

‘আচ্ছা দাও।’ রেহনুমা থালা আগিয়ে দেয় ছেলেকে। আবির ভাত তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে, ‘ফুপু বাংলাতে কথা বলে না ইংরেজিতে?’

শুনে রেহনুমার হাসি পায়। ‘তুই নিজেই দিখিস’ – বলাটা শেষ হ’তে না হ’তেই নিশি এসে হাজির হয় খাবার ঘরে। ‘হ্যালো আবির!’‘হ্যালো! কেমন আছেন?

‘আমি ভালো। তোমার জার্নি কেমন হ’লো?’ নিশি আবিরের উল্টা দিকের একটা চেয়ার টেনে সেটাতে বসে।

‘লং এ্যান্ড হেকটিক।’ আবিরের বলার ধরণটা নিশির পছন্দ হয়।

‘আমি আসার সময়ও লম্বা জ্যাম পেয়েছিলাম। এমন জ্যাম কি সবসময় থাকে?’

‘বছরের এই সময়টাতে থাকেই বলা যায়। পানি কমে যায় তো। ফেরীগুলোকে চর ঘুরে আসতে হয়। বর্ষার বৃষ্টি শুরু হ’লে আবার সহজ হ’য়ে যায়।’

‘ তোমার চাকরী কেমন লাগছে? ভাবি বলছিলো রেজাল্টের পরপরই চাকরী পেয়ে গেছো।’

‘লাকিলি।’ খেতে খেতেই আবির ব’লে চল, ‘ভার্সিটির এক বড়-ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো; ওনাকে ব’লে রেখেছিলাম। উনিই খবরটা দিয়েছিলেন। ওদের লোকও খুব দ্রুত দরকার ছিলো। ইন্টারভিউ দিতেই হ’য়ে গেলো। কিন্তু আপনি এখনো জেগে আছেন! ঘুমাবেন না?’

‘ঘুমাবো। আসলে জেট ল্যাগটা কাটেনি এখনো। আরো ৩/৪ দিন লাগবে বোধহয় ঠিক হ’তে। আবার ঠিক নাও হ’তে পারে।’ বলে খানিকটা হাসে নিশি। আবিরও সেই হাসিতে যোগ দেয়।

আবিরের হাত গুটানো দেখে রেহনুমা ওকে আর একটু ভাত নেওয়ার জন্য বলে। ‘আর না মা। ফেরীতে খেয়েছি। বড় ইলিশ মাছ দিয়ে। ওদের রান্নাটা মজার। একদম ঝোলঝোল।’‘আচ্ছা, তু্ই হাত ধুয়ে নে। আমি তুলে রাখছি।’ আবির ওর থালাটা নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকে। থালাটা পরিস্কার ক’রে তাকে রেখে তারপর হাত ধুয়ে নেয়। খাবার ঘরে ফিরে আবির পানি খায় এক গ্লাস। নিশি আর বদিউজ্জাম উঠে পড়ে। আবিরের সাথে সাথে রেহনুমা ঢোকে ওর ঘরে।

‘তুমি যাও তো মা, শুয়ে পড়ো। আমাকে সকাল-সকাল ডেকে দিয়ো।’

‘কটায় উঠবি?’ জানতে চায় রেহনুমা।

‘তুমি যখন উঠবে তখনই ডাক দিয়ো।’

‘তোর ফুপু বাগানটার কথা জিজ্ঞেস করছিলো। তখন আমি বললাম তোর সাথে দেখতে যাওয়ার জন্য। আমিও যাবো। অনেকদিন যাওয়া হয় না।’

‘সকালে যাবে?’

‘সকালে গেলেই ভালো হবে না? গরম কম থাকবে।’

‘হুম। ফুপুকে সকালের কথা ব’লেছো?’

‘না, এখনো বলিনি। তুই শুয়ে পড়। আমি গিয়ে বলছি।’

‘আচ্ছা।’

পরদিন আলো ফোটার আগেই রেহনুমা উঠে পড়ে। আবির আর নিশি দুইজনকে ডেকে তোলে। দ্রুত চুলায় খিচুড়ি চড়িয়ে দেয়। রুটি বানাতে গেলে অনেক দেরী হ’য়ে যাবে। কাজেরলোক ভানু আসবে ৭টার দিকে। তার আগেই বেরিয়ে পড়তে চায় রেহনুমা।

নিশি ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা করে না সাধারণত। খেতে বসবে কি বসবে না দ্বিধা নিয়েই খাবার টেবিলে বসে। খিচুড়ির গন্ধটা ভালো হয়েছে। একটু নরম-নরম ক’রে রান্না করা। আবির ডিম ভেজেছে তিনটা। নিশি খেতে শুরু করে। অল্প ক’রে খেয়ে নেয়। খেতে ভালোই লাগে নিশির।

ওদের খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই বাদিউজ্জামানও উঠে পড়ে। ‘আরে! এত সকাল-সকাল নাস্তা করছো! কোথাও যাবে নাকি?’‘ফুপুকে নিয়ে আম-বাগনে যাবো। মাও যাবে।’- আবির জানায়।

‘তোরা সবাই যাবি, আমাকে তো বললি না।’

‘চলো আমাদের সাথে।’ আবিরের সাথে নিশিও যোগ দেয়।

বদিউজ্জামান রাজি হ’য়ে যায়। দ্রুত তৈরী হ’য়েও নেয়। এর ভেতরে রেহনুমা সোহেলকে ডেকে দুইটা রিকশা আনতে বলে। রিকশা আসতে আসতে বদিউজ্জামানের খাওয়া হয়ে যায়। রেহনুমা এক বোতল পানি আর একটা থোলে সাথে নেয়, যদি আচার বানানোর মতো কাঁচা আমা পাওয়া যায় তবে খানিকটা সাথে ক’রে আনবে।

নিশি বেশ খানিকটা ঘুরে ঘুরে দেখে বাগানটা। খানিকটা স্মৃতি মনে করার চেষ্টাও হয়তো করে। তবে তেমন একটা মনে করতে পারে না। আমগাছ গুলোতে ফল ভালো ধরেছে। আরো অনেক ধরণের ফলের গাছ আছে। চালতা, বেল আর কদবেল, সফেদা, বরই আর কাঠাল গাছগুলো চিনতে পারে নিশি। বাগানের পশ্চিম দিকে কয়েকটা তাল, নারকেল, সুপারি আর খেজুর গাছও আছে। বাদিউজ্জাম নিশির সাথে থেকে জাম, আমলকি, করমচা, জলপায়ের মতো আরো কিছু গাছ চিনিয়ে দেয়। গাছগুলো যে যত্নে আছে সেটা বেশ বোঝা যায়। নিশির এটা ভালো লাগে।

ওদিকে আবির আর রেহনুমা আম পাড়া শুরু করেছে। নিশির বাবা পুটলি বাঁধা লাঠি দিয়ে যেভাবে বরই পেড়ে দিতো তেমন ক’রে। নিশিও চেষ্টা করে দেখে। কয়েকটা আম বেশ সহজেই পেড়েও ফেলে।

ফেরার পথে রিকশাতে আবিরের সাথে নিশি বসে। ‘ল্যান্ডস্কেইপটা সুন্দর। এলোমেলো তবে সুন্দর।’ অনেকটা যেন নিজের মনেই বলে নিশি।‘এদিকটাতে তো শুধু ফসলের ক্ষেত আর ছাড়াছাড়া গ্রাম। আমার খানিকটা একঘেয়ে লাগে।’

‘তাই?’

‘হুম, ভ্যারিয়েশন কম তো। আর একটু পানি থাকলে দারুন হ’তো মনে হয়। যেমনটা বরিশাল বা সুনামগঞ্জের দিকে আছে। এখানে পানি কম থাকায় একটু গরম বেশি যেন। আবার হিউমিডিটিটা কম।’

‘সেটা ঠিক। তবে সবুজটা খুব সুন্দর। খুব তরতাজা।’

‘নতুন চাষ হয়েছে তো কিছুদিন আগে। আপনি দেড়/দুই মাস আগে আসলে অন্য রং দেখতেন। তখন ফসল ওঠা শুরু করেছে। অনেক জমি তখন শুকনো খটখটে দেখতেন।’ আবিরের গলায় সহজ স্বর।

‘ফসল তোলার পর জমিগুলো দেখতে অবশ্য তেমন একটা ভালো লাগে না।’ নিশি আবিরের সাথে একমত হয়। ‘আমি ইউএসে কর্নফিল্ড দেখতে গিয়েছি অনেকবার। উঁচু লম্বা-লম্বা গাছ। কর্ন পাকতে শুরু করার আগ পর্যন্ত আমার খুব ভাল লাগে।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘তবে প্রকৃতির ব্যাপারটাই হয়তো এমন। বারবার রং বদলায়।’

‘আপনি কিন্তু খুব সুন্দর ক’রে কথা বলেন।’ আবির নিশিকে জানায়।

‘টিচার তো। কথা বলতেই হয় অনেক।’

‘আপনি এত ভালো বাংলা বলবেন তা আশা করিনি।’

‘তাই? আসলে মার সাথে বেশির ভাগ সময় বাংলাতেই কথা বলতে হয়। বাবার সাথেও কখনো কখনো। তাই অভ্যাসটা আছে। আবার ওখানে অনেক বাঙালিও আছে। তাদের সাথেও বাংলাতে কথা হয় প্রায়ই।’

‘আপনি একা এলেন যে? আমি ভেবেছিলাম সবাইকে নিয়ে আসবেন।’

‘মার আসার কথা ছিলো। তবে বাবার কয়েক মাস আগে মাইল্ড একটা হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। তাই আর এলো না। আর আমার ছেলে-মেয়ে দুইজন এই সময় আসতে চাইলো না। টিনেজ বয়স। তবে আমাকে জানিয়েছে আমি ঘুরে এসে ওদেরকে ছবি দেখালে যদি ওদের পছন্দ হয় তবে নাকি আসবে। ভেবে দেখো একবার, এদেরকে ম্যানেজ করা কতটা কঠিন।’

আবির এ কথায় না হেসে পারে না। ‘কিন্তু আপনি তো ছবি তুললেন না আজ। ওদেরকে দেখাবেন কিভাবে?’‘আর একদিন আসবো ছবি তোলার জন্য। আজ শুধু দেখেতেই ইচ্ছা করছিলো। আমি নিজেও চ’লে যাওয়ার পর এই প্রথম এলাম। তুমি তো কালই চ’লে যাবে, নাকি?’

‘হ্যাঁ, কাল বিকালে। পরশু অফিস আছে যে।’

‘ফেরার সময় ঢাকাতে থাকা হবে কিনা জানি না এখনো। দেখি চেষ্টা করবো তোমার বাসায় একবার যাওয়ার।’

‘ওটা ঠিক বাসা নয়। মেস। দুই রুমের একটা বাসায় আমরা চারজন থাকি। সবাই চাকরীজীবীতো তাই একটু অগোছালো।’

‘আচ্ছা, তুমি না চাইলে যাবো না। অন্য কোথাও দেখা করা যাবে। কিন্তু আমরা তো প্রায় চলে এসেছি বাসায়, না?’

‘হুম।’

সেদিন রাতে নিশি আবিরকে সাউথ-ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন প্রফেসরের ঠিকানা দেয়। ওদের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। আর বলে আমেরিকান এ্যাম্বাসিতে খোঁজ নিতে। ইউএসএতে পড়তে যেতে হ’লে কী কী দরকার হবে সেটা ওরা ব’লে দেয় ঠিক মতো। আবির নিশিকে জানায় যে ও সব খোঁজ নিয়ে যোগাযোগ করবে সময় মতো।

নিশি আবিরকে ওর জন্য আনা দুইটা টি-শার্ট দেয়। টি-শার্টেদুটোর রং পছন্দ হয় আবিরের। দুটোই সবুজ আর নীলের মাঝের দুইটা টোনে। নিশি-ফুপুর জন্য আনা শাড়ীটা বের করে আবির। নিশি উপহার পেয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধারে। আবিরের মনে হয় এই মানুষটা ওর খুব আপন কেউ। নিশি আবিরের জন্য স্টিফেন কিং এর নতুন একটা বই এনেছে। দ্যা গার্ল হু লাভড টম গর্ডন।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প – ১৩

ছোট দেবর আহসান হাবিব বিলু সড়ক ও জনপথের প্রকৌশলী। নাবিলার বাপ-চাচাদের ভেতরে বিলুই ছিলো লেখাপড়ায় সবচেয়ে ভালো। দুই মেয়ের লেখা-পড়া নিয়ে কথা বলতে তাই আহসান হাবিবই শহর বানুর মূল ভরসা। তবে সহজে আবার পাওয়াও যায় না ওকে। নানা জায়গায় ঘোরাঘুরির উপর থাকে। আবার চাকরীও ট্রান্সফারের। এখন দিনাজপুরে পোস্টিং। নাবিলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খবরটা জানানোর জন্য ফোন দেয় শহরবানু। ফোনটা আহসান হাবিবই ধরে, ‘কেমন আছো ভাবি? তোমাদের কথাই ভাবছিলাম।’‘আর বানিয়ে বানিয়ে ব’লতে হবে না। রানু এই কথা বললেও না হয় বিশ্বাস করতাম। ও তো তাও মাঝে মাঝে ফোনটোন দেয়। তুমি শেষ কবে নিজে থেকে ফোন দিয়েছো বলো তো।’ রানু আহসান হাবিবের স্ত্রী। নওগাঁর মেয়ে। আহসান হাবিব যখন চাকরীর জন্য নওগাঁতে ছিলো তখন ওদের পরিচয় আর পরবর্তীতে বিয়ে।

‘রানু একটু আগে তোমাদের কথাই বলছিলো খাবার টেবিলে। ইকবাল এখনো ক্লাস সিক্সে আর এবার নাবিলা ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। পিচ্চিটা কত বড় হ’য়ে গেলো তাই ভাবছিলাম।’

‘ওর কথা বলার জন্যই তোমাকে ফোন দিয়েছি। আজ ভর্তি হ’য়ে এলো। খুলানাতেই ভর্তি হ’লো। সিদ্ধান্তটা কি ঠিক হলো, বিলু?’ মেয়ের ভবিষ্যতের ভাবনা শহর বানুর মনে। নাবিলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও সুযোগ পেয়েছিলো।

‘এটাই ভালো হবে ভাবি। বিবিএ এখনকার সাবজেক্ট। এটাতে চাকরীর সুযোগ দিনদিন বাড়ছে। আর একসময় বাপের ব্যবসা দেখতে হবে না কাউকে! ইলোরা তো বিজ্ঞানে পড়ছে।’

‘কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াটা কি ঠিক হলো? রাজধানী শহর। ওখানে থাকলেও তো অনেক কিছু জানতে পারতো, শিখতে পারতো।’

‘শেখা নিজের কাছে ভাবি। তুমি পিচ্চির উপর ছেড়ে দাও তো।’ আহসান হাবিব অনেক আগে থেকেই নাবিলাকে পিচ্চি ব’লে ডাকে। ‘বড় হ’য়ে গেছে না! তুমি এখন ইলোরার দিকে নজর দাও। আর ওর ক্লাস শুরুর আগে আমাদের এখান থেকে একবার ঘুরে যেতে বলো। ক্লাস শুরুর দেরী আছে না?’

‘এখনো তো ক্লাস শুরুর তারিখ দেয়নি। সারাদিন ব’সে-ব’সে গল্পের বই পড়ে। আর ওর দেখাদেখি ইলোরাও গল্পের বই পড়তে চায়। অথচ ক্লাসের বই নিয়ে বসতেই দেখি না। ব’সতে ব’ললেই ঘুম।’

‘মাত্র তো কলেজ শুরু করলো। প্রেশার শুরু হ’লে দেখো নিজেনিজেই পড়বে।’ ভাবিকে ভরসা দেয় আহসান হাবিব।

‘আমার এটাকে নিয়েই চিন্তা বেশি। নাবিলা তো শক্ত আছে। ইলোরাকে একটু বকাও দেওয়া যায় না। একটা কিছু বললেই কান্নাকাটি শুরু ক’রে দেয়।’ শহর বানুর কথায় আহসান হাবিব না হেসে পারে না। ‘এত হেসো না তো। তোমরা ভাই আছো ভালো একটাকে নিয়ে। আমার দুইটাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়।’

‘নাবিলা কই? ওকে দাও তো।’

‘ধরো একটু, ডাকছি।’ শহর বানু নাবিলাকে ডেকে ফোনের রিসিভারটা দেয়।

‘হ্যালো, চাচ্চু! কেমন আছো তোমরা?

‘আমরা ভালো। তোর মাকে বলছিলাম ক্লাস শুরুর আগে আমাদের এখান থেকে একটু ঘুরে যেতে। দিনাজপুর শহর তো আগে দেখিসনি তোরা। আমিও আর বেশি দিন এখানে থাকতে পারবো না সম্ভবত। বদলির সময় হ’য়ে এলো।’

‘মা এখন কোথাও যাবে কিনা জানি না। তবে আমরা তিন বন্ধু মিলে কয়েকটা জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। দেখি ওদের সাথে কথা ব’লে। তোমার ওখানে ওদেরকে নিয়ে আসলে সমস্যা নেই তো?’

‘আমার কোনো সমস্যা নেই। দেখ তোর মা তোদেরকে একলা ছাড়ে কিনা। আর খুলনা থেকে দিনাজপুর কম দূরও তো না। শহরের ভেতরে বা কাছে রেল-স্টেশন থাকলে সহজে চ’লে আসতে পারতি। পার্বতীপুর স্টেশনে খুলনার ট্রেন আসতে আসতে বেশ রাত হ’য়ে যায়। অবশ্য তোরা আসবি শিওর করলে আমি গাড়ির ব্যবস্থা ক’রে রাখতে পারি তোদের জন্য।’

‘আমরা এখনো পর্যন্ত ঠিক করেছি যশোর আর চুয়াডাঙ্গা যাবো। যুথির দাদাবাড়ি যশোর। আর কলির বড় ভাই চুয়াডাঙ্গাতে আছে এখন। ম্যাজিস্ট্রেট। ওর ভাবির সাথে ওর কথা হয়েছে। আমাদেরকে যেতে ব’লেছে।’

‘ভালো পরিকল্পনা। ক্লাস শুরুর আগে এরকম একটু ঘুরে নে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর আগে আমরাও কয়েকজন এমন ঘোরাঘুরি করেছিলাম। মনটা চাঙ্গা হ’য়ে যায়। মার সাথে কথা ব’লে আমাকে জানা। আমি ব্যবস্থা ক’রে রাখবোখন।’

‘থ্যাংক য়ু চাচ্চু।’

শহর বানু যুথি আর কলিকে একদিন বাসায় আসতে বলে। ওদের সাথে কথা বলার পর খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়। আবার ভাবনাও হয়। এই বয়সের তিনটা মেয়ে নিজেরা মিলে এতটা লম্বা জার্নি ক’রতে পারবে কিনা তা নিয়ে। রাস্তা-ঘাটের সব জায়গা তো নিরাপদ নয়। স্বামী তরিকুল হাবিব আগে এসব নিয়ে খুব ভাবতো না। নাবিলা ওর খেলার জন্য কলেজের টিমের সাথে আগে যশোর আর নড়াইলে গিয়েছে। মেয়ে ছোট এসব নিয়ে কখনো কিছু বলেনি। কিন্তু আনসার আলী মারা যাওয়ার পর লোকটা আর আগের মতো নেই। সারাদিন কী সব নিয়ে যেন ভাবে। জিজ্ঞেস ক’রলে ঠিক মতো বলেও না। কিংবা ব’লতে পারে না। শহর বানুর মনে হয় ওকে একটু সময় দেওয়া ভালো। নাবিলাও যদি কিছু দিনের জন্য ঘুরতে যায় তো সেই সময়টা স্বামীর সাথে কথা বলার জন্য বাড়তি একটু সুযোগ পাওয়া যাবে।

কিন্তু নাবিলার ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে ইলোরাও ওদের সাথে যেতে চায়। বিশেষ ক’রে দিনাজপুর, ওদের ছোট চাচার বাসায়। কিন্তু নাবিলারা আবার ওকে নেবে না। শহর বানুও চায় না ইলোরা ওদের সাথে যাক। শেষে ইলোরা সবগুলো শহর থেকে ওর জন্য কিছু না কিছু কিনে আনার কথা বলে। নাবিলা রাজি হয়।

পরের সপ্তাহেই রাজশাহীগামী সকালের প্রথম ট্রেন কপতাক্ষ-এক্সপ্রেসে চেপে বসে নাবিলা, যুথি আর কলি। স্টেশনে নাবিলার সাথে ওর বাবা এসেছে। যুথি আর কলির সাথেও বাসা থেকে লোকজন এসেছে। ট্রেন ছাড়তেই নাবিলার মনে হ’তে থাকে ও যেন বড় হ’য়ে গেছে। এখন থেকে ও একলা যে কোনো জায়গাতে যেতে পারবে।

তিন জনের জন্যই অনেক দিন পর ট্রেন-ভ্রমণ। ধীরে ধীরে ট্রেন চ’লতে শুরু করলে ওরা জানলার দিকে চেপে আসে। ব্রড-গেজ ট্রেনের দ্বিতীয় বিভাগের সিট। প্রতিদুইটা সিট সামনা-সামনি বিন্যাসে বসানো। ওটা ওদের গল্প করার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। খুব অল্প সময়ের ভেতরেই ট্রেন খালিশপুর পেরিয়ে যায়। ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা খালিশপুরকে ওদের চেনা খালিশপুরের থেকে যেন বেশ অচেনা লাগে। নাবিলা বেশ মুগ্ধ হ’য়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। কলির মনোযোগ যেন ট্রেনের বগির দিকে। সিটের উপর নিল-ডাউন হ’য়ে কলি হিসাব ক’রে নিতে চায় কতগুলো সিট ফাঁকা বগিতে।‘স্টেশনে তো অনেক লোক দেখলাম। অথচ ট্রেন তো ফাঁকা।’ কলি ওদেরকে জানালো।

‘এই বগিতে হয়তো ভীড় কম। অনেক মানুষ উঠতে দেখলাম তো।’

‘চল অন্য বগিগুলো ঘুরে দেখি।’ নাবিলা প্রস্তাব দেয়।

‘আগে চা খেয়ে নিই। সকালে চা খেতে পারিনি তড়িঘড়ির জন্য।’

‘চা নিয়ে কখন আসবে তার ঠিক আছে? চল ক্যান্টিন-কারের দিকে যাই।’

‘আর একটু দাড়া তো। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা বলেছে ট্রেন ছাড়ার মিনিট দশেকের ভেতরেই চা-নাস্তা নিয়ে আসার কথা।’ যুথির বাবার কথা ভুল হয় না। ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই শাদা ইউনিফর্ম পরা দুই জনকে খাবারের ট্রে হাতে ওদের বগিতে ঢুকতে দেখা যায়।

একধরণের স্যান্ডউইচ আর মুরগীর মাংসভাজি কেনে ওরা। আর চায়ের অর্ডার করে। মাংসভাজিটা দেখতে খুব একটা ভালো না দেখালেও খেতে ওদের খারাপ লাগে না। এগুলো খেতে খেতেই ওদের চা চ’লে আসে। টি-ব্যাগের চা। রং-চা। বাসাতে ওদের সবারই দুধ-চা খাওয়ার অভ্যাস। পেয়ালাতে চুমুক দিয়ে নাবিলার একবার মনে হ’লো আর খাবে না। যুথির দিকে চেয়ে একবার বলেই ফেললো, ‘ইয়াক! এই জিনিস খাওয়া যায়?’ অথচ সেই বলাতেও যেন আনন্দের ছড়াছড়ি।‘এহ! আসছেন আমার লাট-সাহেবের বাচ্চারা! ট্রেনে আপনাদের জন্য দুধ দিয়ে চা বানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে! যা পাচ্ছিস তাই খা। খাবার নিয়ে এইসব ঝামেলা করলে আমি কিন্তু তোদেরকে চুয়াডাঙ্গা নিয়ে যাবো না ব’লে দিলাম।’ কলির শাসন বা হুমকিতে বেশ কাজ হয়। নাবিলা আর যুথি দুই জনই আবার চায়ে চুমুক দেয়।

প্রতিবার চুমুক দেয় আর কলিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘ইয়াক!’ কলি প্রথম কয়েকবার সেটাকে প্রশ্রয় দেয় না। বাংকার থেকে ওর ব্যাগ নামিয়ে তা থেকে একটা অটো-ক্যামেরা বের করে। যুথি আর নাবিলার চায়ে চুমুক দেওযার ছবি তুলে রাখে।‘আর একবার ইয়াক বলেছিস তো মাইর খাবি।’

‘তুই নাবিলার সাথে মারামারি ক’রে পারবি না। ও তোকে থাবা দিলে দুই দিনের জন্য তোর কথা বন্ধ হ’য়ে যাবে।’

‘তাহলে আর কি করা… তুই মাইর খাবি। নাবিলা ব’ললেও তুই মাইর খাবি।’ শুনে নাবিলা হাসে আর শেষ চুমুকটা দিয়েই ব’লে ওঠে ‘ইয়াক!’

‘যা এবারের মতো মাফ করে দিলাম। পরের বার এমন করলে কিন্তু আর মাফ নেই।’ কলির কথায় একধরণের প্রশ্রয় আছে। ওরা তিনজনই একসাথে হেসে ওঠে।

নোয়াপাড়াতে এসে ট্রেনটা বেশ ধীরে আগাতে থাকে। পরপর দুইটা দাড়িয়ে থাকা মালগাড়িকে পার হয় ওদের ট্রেনটা। কলি আর নাবিলা দ্বিতীয় মালগাড়িটার বগি গুনতে শুরু করে। বগিগুলোতে কয়লা, পাথর আর বস্তাবন্দি কিছু আছে। যুথিই প্রশ্ন করে, ‘বস্তাগুলোতে কী?’‘কি জানি কী? দেখে তো বোঝা যায় না।’ নাবিলা উত্তর দেয়।

অন্যপাশের সিট থেকে একজন বয়স্কলোক উত্তর দেয় নিজে থেকেই। ‘বস্তাতে বিভিন্ন ধরণের সার।’ শুনে ওরা তিনজনই কাঁচাপাকা দাড়ির লোকটার দিকে তাকায়। চোখে বড়-ফ্রেমের চশমা। ওদের তাকানো দেখে ওরা কোথায় যাবে সেটা জানতে চায় লোকটা।‘আমরা যশোর যাবো। আপনি?’ নাবিলা কথা ব’লে লোকটার সাথে।

‘ইশ্বরদি নামবো আমি।’

‘নিয়মিত যাতায়াত করেন এই রুটে?’

‘তা ব’লতে পারেন, মাসে ২/৩ বার।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘আপনারা নতুন মনে হচ্ছে।’

‘অনেকদিন পর দাদাবাড়ি যাচ্ছি। আগে মাঝেমাঝেই যাওয়া হ’তো।’ যুথি জানায়।

কিছুক্ষণ পর কলি অন্য বগিগুলো ঘুরে দেখার কথা জানায় ওদেরকে। কিন্তু ব্যাগগুলো রেখে যাওয়া আবার ঠিক হবে না। নাবিলা আর কলি প্রথমে যাবে ঠিক করে, আর যুথি ব’সে ব’সে ব্যাগগুলো পাহারা দেবে।

ট্রেনের এক বগি থেকে আর এক বগিতে যাওয়ার জায়গাটা বেশ ভীতিকর। রেলগুলো অনেকদিনের পুরাতন, তার উপর রক্ষণাবেক্ষণের যথেষ্ট অভাব। তাই রেলগুলোর সাংযোগের জায়গাটা পেরোনোর সময় বগিতে একটা ঝাঁকি টের পাওয়া যায়। চলন্ত ট্রেনের এক বগি থেকে আর এক বগিতে যাওয়ার সময় নিচের রেল-লাইনের দিকে চোখ চ’লে যায় নাবিলার। যদিও এতটুকু ফাঁক দিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, তবুও মনের ভেতরে কেমন একটা ভয়ের স্রোত ব’য়ে যায়। মনে হয় পড়ে গেলেই টুকরো টুকরো শরীর। একটা অদ্ভুত গা-শিরশির করা অনুভূতি হয়। আবার দ্বিতীয় বগিটা পার হওয়ার পর ভয়টা অনেকটাই কেটে যায়। 

ক্যান্টিন-কারটা বেশ মজার। একটা বগির অর্ধেকটা নিয়ে। খাবারে অবশ্য তেমন বাড়তি কিছু নেই। যেসব খাবার ফেরি ক’রে বগিতে বিক্রি হচ্ছিলো সেগুলো ছাড়া কয়েক ধরণের বিস্কুট আর চকলেট আছে শুধু। একটা ফ্রিজে কোকাকোলা দেখে কলি উৎসাহী হয়। নাবিলা আর কলি দুইটা কাচের বোতলের কোক খুলে একটা জানলার পাশে গিয়ে বসে। কলি একজনকে ডেকে ওদের একটা ছবি তুলে দিতে বলে। ফেরার সময় ওরা যুথির জন্য এক বোতল ঠাণ্ডা কোকাকোলা নিয়ে আসে। এসে দেখে যুথি একটা গল্পের বই খুলে বসেছে। মাহমুদুল হকের অনুর পাঠশালা।   

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -১২

কেয়া মারা যাওয়ার পর এক মাস পেরিয়ে গেলে নরসিংদিতে কুলখানির আয়োজন করে জহিরুদ্দিন সিরাজী। সমস্ত রান্নার তদারকি আর নিকট আত্মীয়রা যারা এসেছে তাদের দেখা-শোনার ভার আশিক আর রিমির উপর পড়ে। আর দাওয়াতের দায়িত্ব জহিরুদ্দিন নিজের উপর রেখেছে। না রেখে উপায়ও নেই। আশিক বা রিমি গ্রামের সবাইকে চেনেও না। আবার এমনো কেউ কেউ আছে যাদেরকে শুধু চিঠি লিখে বা ফোনে ব’ললেই হবে না, সশরীরে গিয়ে দাওয়াত ক’রে আসতে হবে। সুবিধা এই যে তাদের বাসা মোটামুটি গাড়ির দূরত্বের ভেতরেই।

অবশ্য শেষ পর্যন্ত আশিককেও গ্রামের কয়েকটি বাসায় যেতে হয়। কেউ কেউ আশিককে বেশ স্নেহ ক’রে যখন ওর বাবা-দাদার পরিচয় জানতে পারে। আবার কেউ কেউ অনেক অনুযোগও শোনায়। কেয়া গ্রামের বউ হ’য়েও খুব একটা গ্রামে আসতো না সেটা জানায় অনেকেই। এখন ম’রে যাওয়ার পর তো ঠিকই কবর দেওয়ার জন্য আসতে হ’লো। জহিরুদ্দিন ছেলেকে ব’লে দিয়েছেন, যে যা বলে সব শুনে আসতে শুধু। আর বাবা আসতে পারছে না ব’লে আশিক এসেছে। তারপরও যদি পারে বাবা একবার ঘুরে যাবে বলেছে।

কুলখানির দিন ওদের বাড়িতে আশপাশের কয়েক গ্রামের লোক জমে যায়। রান্না বেশ ভালো হয়েছে। খাওয়ার পর বেশির ভাগই প্রশংসা করে। অনেককে ফিরে যাওয়ার সময় কিছুটা খাবার আবার বেধেও দিয়ে দিতে বলে জহিরুদ্দিন সিরাজি। রিমি আর আশিকের তত্তাবধানে সেগুলো বেশ সুচারু ভাবে সম্পন্ন হয়।

বিকালের পর থেকে আত্মীয়রাও একে একে চলে যেতে থাকে। থেকে যায় শুধু জহিরুদ্দিনের একমাত্র বোন সিনথিয়া সিরাজি। আগামী কাল সবার সাথে সিনথিয়াও ঢাকাতে ফিরবে। কয়েক দিন জহিরুদ্দিনদের সাথে থেকে তারপর আবার অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাবে।

শেষ কবে সিনথিয়া ফুপুকে দেখেছে সেটা মনে করতে পারে না রিমি। রাতে ঘুমের আগে রিমি আশিককে চা খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে। আশিক শুয়ে পড়েছিলো। তবু উঠে আসে। ‘হুম, চা হ’লে মন্দ হয় না।’‘ববাকে ডাকবো?’ রিমি আশিককে জিজ্ঞেস করে।

‘দেখ জেগে আছে কিনা। আর বাবা তো চা খেতে চায় না। কফি আছে এখানে?’

‘কফিও আছে। বাবা কোথাও গেলে মা সবসময় ড্রাইভারকে কফি আর কফি-মেইট দিয়ে দিতো। আমি আসার সময় এনেছি।’ একটু থেমে রিমি আবার বলে, ‘না, থাক বাবাকে ডেকে আর কাজ নেই। চলো, আমরা দুইজন বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে গল্প করি একটু।’

‘আচ্ছা, চল। কোন বারান্দায় বসবি?’

‘এই ঘরের বারান্দাতেই বসি। দাদার ঘরটা দারুন। বারান্দাটাও। তুমি আগে এই ঘরে শুয়েছো কখনো?’

‘উহু। দাদার ঘরে তো মা শুতে দিতো না।’

‘এবার বাবাই তোমাকে এখানে শুতে বললো!’

‘অনেক লোক ছিলো তো গত দুই দিন। কাউকে না কাউকে এই ঘরে থাকতেই হ’তো। বাবা তো নিজের ঘরেই থাকবে। ফুপুও ফুপুর ঘরে।’ তারপর কথা ঘুরিয়ে আশিক বলে, ‘চল, চা বানিয়ে আনি আগে। শীতশীত করছে।’

আশিক দুধ চা পছন্দ করে। ফ্রিজ থেকে জমা দুধ বের করে রিমি। একটা চুলাতে দুধ আর একটা চুলাতে পানি চড়িয়ে দেয় রিমি। এই দুই দিনে রান্না ঘরের কোথায় কী আছে সেটা বেশ জানা হ’য়ে গেছে দুই ভাই-বোনের। দাদা বেশ যত্ন ক’রে এই বাড়িটা বানিয়েছিলো। রান্না ঘরটা দেখলেও সেটা বোঝা যায়। রান্না ঘর হিসাবে আকারে বেশ বড়ই বলতে হবে। আবার তৈজসপত্রের দিকেও দাদার নজর ছিলো বেশ। পুরোনো যতগুলো চিনামাটির সেট আছে সেগুলোর বেশির ভাগই বাইরের, দামও বেশি ব’লেই মনে হয়। আশিক পাল্লা খুলে একটা তাক থেকে দুইটা কাপ-পিরিচ বের করে। এমন ডিজাইনের কাপ-পিরিচ এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না। আশিক কাপটা হাতে নিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে।‘সুন্দর, না?’ রিমি জিজ্ঞেস করে।

‘হুম। এমন খুরওয়ালা কাপ আমাদের বাসায় আছে?’

‘আছে। তবে বের করা হয় না তেমন। মা বের করতো না কাজের লোকেরা ভেঙে ফেলবে ব’লে।’

‘এবার বাসায় গিয়ে দেখাস তো।’ দুধের পাতিলের দিকে নির্দেশ ক’রে আশিক বলে, ‘দুধ তো হ’য়ে এলো। এবার চুলা নিভিয়ে দে।’

পানিও ফুটে এলো। রিমি পানিতে চা-পাতা ছেড়ে দেয় প্রয়োজন মতো। চায়ের কাপে দুধ-চিনি ঢালতে ঢালতে চা-পাতাও ফুটতে শুরু করলো।

আশিক আর রিমি যে যার চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাদাভাইয়ের ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসে। বারান্দাতে ঘরের ভেতরের তুলনায় বেশ ঠাণ্ডা। আশিক আবার ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না। রিমির আবার ঠিক উল্টো। ‘আচ্ছা, ফুপুর সাথে কি মার কোনো ঝামেলা ছিলো?’ চায়ে চুমুক দিতে দিতে রিমি আশিককে জিজ্ঞিস করে।‘কি জানি! ঝামেলা থাকবে কেন?’

‘আমার কেন জানি মনে হ’লো! ফুপু এই ক’দিনে আমার সামনে একবারও মাকে নিয়ে কিছু বলেনি।’

‘কী ব’লবে? ফুপু নিজেই তো প্রায় ১৪ বছর পরে দেশে আসলো। আমাদের সাথেও তো ফুপুর খুব একটা কথা হয় না বহুদিন।’

‘সেটা ঠিক ব’লেছো।’ রিমি কিছুক্ষণ আর কিছু বলে না। আশিকও চুপচাপ চা খেতে থাকে। রিমিই নিরবতা ভাঙে, ‘তুমি খুলনা যাবে কবে?’

‘দেখি, পারলে পরশু সকালে রওনা দেবো। বেশি দেরী করলে চাকরী থাকবে না।’

‘কয়টা দিন থেকে যাও না, ভাইয়া? বাসাটা কেমন যেন লাগে।’

‘এবার না রে। কয়েক দিন পরে না হয় আবার ছুটি নিয়ে আসবো।’

‘তাড়াতাড়ি এসো।’

এরপর আর কোনো কথা হয় না দুই ভাই-বোনের। রিমি হাত বাড়িয়ে আশিকের খালি কাপটা নিয়ে নেয়। কাপ দুইটা রান্না ঘরের সিঙ্কে রেখে ওর ঘরে চ’লে আসে। বিছানায় উঠে গায়ে কাথা জড়িয়ে নিতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে জহিরুদ্দিন সিরাজির ডাকে ঘুম ভাঙে রিমির। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে হবে। দ্রুত নাস্তা সেরে গাড়িতে উঠে পড়ে সবাই। পথে কাঁচপুর ব্রিজে আধা-ঘন্টার জ্যামে পড়েও দুপুরের আগে আগেই ওদের গাড়ি ঢাকায় এসে পৌছায়।

তারপরের কয়েকটা দিন খুব দ্রুত কাটে রিমির। পরদিন সকালেই আশিক খুলনা ফিরে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া-শোনার চাপও বেড়েছে। এক সপ্তাহের ভেতরেই সিনথিয়া ফুপুও অস্ট্রেলিয়া ফিরে যায়। কোনো কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে রিমির বাড়িটাকে কেমন যেন ভুতুলে মনে হয়। ভাগ্যিস পাশের জমিতে নতুন ভবনের কাজ চ’লছে। সেখান থেকে সব সময়ই কোনো না কোনো শব্দ আসছে সারা দিন।

বাড়িতে সার্বক্ষণিক একজন কাজের-লোক আছে যদিও। তবুও বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মায়ের বইপত্র আর কাপড়-চোপড়গুলোর খানিকটা এখনো এলোমেলো পড়ে আছে। রিমি একদিন কাপড়গুলো গোছানো শুরু করে। মা বেশ সৌখিন ছিলো পোশাকের ব্যাপারে। জহিরুদ্দিন সিরাজি একদিন মেয়েকে বলে, ‘মার কাপড়গুলো কী করবে?’‘তোমার কী মনে হয়? কাউকে দিয়ে দিতে চাও?’

‘ওর তো অনেক ধরণের কাপড়। শেষের দিকে তো শুধু শাড়ীই পরতো। আগের কাপড়-চোপড়গুলো থাকার কথা। তুমি একটু চেক কোরো।’

কয়েকদিন পরে করি বাবা। সামনেই পরীক্ষা; তার পর।

অবশ্যই। কোনো তাড়া নেই। আমি বলছি, ও যেহেতু যত্ন ক’রে রাখতো তাই। শেষের দিকে তো খানিকটা এলোমেলোও হয়ে গিয়েছে।

আচ্ছা বাবা, আমি গুছিয়ে রাখবো।

‘কাপড়গুলো এলোমেলো হ’য়ে আছে এটা দেখতে আমার ভালো লাগে না।’ এ কথায় রিমি আর কিছু বলে না। বাড়ির সবকিছু গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে কেয়ার একধরণের বাতিক ছিলো বলা যায়। সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে রিমি বিদ্রোহ ক’রে বসতো। স্কুলের পোশাকটা না ছেড়েই হয়তো রিমি বিছানায় গড়াগড়ি শুরু করে দিতো।

রিমি পরদিন মায়ের এলোমেলো কাপড়গুলো বের ক’রে সেগুলো পরিস্কার করার জন্য কাজেরলোকে ব’লে দেয়।

পরীক্ষা শেষ হ’তে এক মাসের উপরে সময় লেগে যায়। এর পর টানা দুই দিন রিমি বেশ একটু ঘুমিয়ে নেয়। পরীক্ষার ভেতরে আবিরের সাথে শুধু একদিন দেখা হয়েছে। আবির নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলো ওর সাথে দেখা করার জন্য। আজ বিকালে আবিরের সাথে দেখা হবে। রিমি একবার ভাবে মায়ের কোনো একটা শাড়ী পরলে কেমন হয়। কিন্তু মায়ের বেশিরভাগ শাড়ী কেমন যেন বযস্কলোকদের জন্য যেন। অন্তত রিমি যেগুলোর কথা মনে করতে পারে।

নিজের জন্য শাড়ী খোঁজা বা মায়ের কাপড়গুলো একটু গুছিয়ে রাখা যে কোনো করণেই হোক রিমি মায়ের আলমারিতে হাত দেয়। চার/পাঁচশ শাড়ীর ভেতর থেকে বেশ কয়েকটা শাড়ী রিমির পছন্দও হয়ে যায় নিজের জন্য। একটা মনিপুরি শাড়ী ওর খুব পছন্দ হয়। এমন শাড়ী ইদানিং কাউকে খুব একটা পরতে দেখা যায় না। কয়েকটা গাঢ় রঙের মিশেলে শাড়ীটা। রিমির মনে হয় আবির এই শাড়ীতে রিমিকে পছন্দ করবে।

আবির আসলেই পছন্দ করে। সেটা আবিরের তাকানো দেখেও বোঝা যায় সহজেই। ‘আমাকে কেমন লাগছে বললে না?’ রিমি জানতে চায়।‘সুন্দর।’

‘শুধু সুন্দর?’

‘একটু আনকমনও।’ আবির একটু সময় নিয়ে ব’লে।

‘সেটা ভালো না খারাপ?’

‘মনে রাখার জন্য তো খুবই ভালো।’

‘মনে রাখতে চাও বুঝি?’

‘মনে এমনিতেই থাকে। কিন্তু এমন কাপড় কোথায় পেলে? আগে দেখেছি ব’লে তো মনে পড়ে না।’

‘মনিপুরি শাড়ী। মায়ের। ঢাকাতে তেমন একটা পাওয়া যায় না। আবার ঢাকার মেয়েরা এত বোল্ড রংও পরে না বললেই চলে।’ তারপর একটু থেমে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার পছন্দ হ’য়েছে বলছো?’

‘হুম, মানিয়েছে ভালো।’

‘মার সংগ্রহে আরো থাকতে পারে। খুঁজে দেখতে হবে।’

ওদের কথার ফাঁকেই শিক-কাবাব আর নানরুটি চ’লে আসে। নয়াপল্টনের এই রেস্তোরার শিক-কাবাব রিমির দারুন পছন্দ। আবির গরম-গরম কাবাবের খানিকটা মুখে দিয়েই মুগ্ধ হ’য়ে যায়। ‘বাহ! দারুন তো! আমি আগে কখনো এখানে আসিনি কেন?’‘কারণ আগে তুমি আমার সাথে প্রেম করতে না, তাই।’

‘য়া… তাই তো মনে হচ্ছে’- ব’লে আবির রিমির দিকে একধরণের প্রেমপ্রেম দৃষ্টি দেয়।

‘আমার দিকে এ ভাবে তাকিয়ো না তো। কাবাবের দিকে তাকাও।’

‘কেন? তোমার দিকে এভাবে তাকানো যাবে না!’

‘যাবে… তবে তার জন্য অনেক সময পাবেন স্যার। এখন গরম-গরম খেয়ে নেন।’

‘আচ্ছা ম্যাম।’

রেস্তোরা থেকে বেরিয়ে ওরা একবার কার্জন-হলের দিকে ঘুরতে যায়। রিকশা ক’রে ঘোরার এই ব্যাপারটা দুইজনই খুব উপভোগ করে। রিকশাতে আবিরের হাতটা ধরে রাখতে রিমির কোনো সংকোচ হয় না। এই ব্যাপারটার ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালো-লাগা মাখানো উত্তেজনা আছে।

বাসায় ফিরে মনিপুরি শাড়িটা রিমি নিজের অয়াড্রবে তুলে রাখে। রিমি বুঝতে পারে এটা মাত্র শুরু। মনে মনে ঠিক ক’রে ফেলে কাল মায়ের আলমারিটা গোছানো শুরু করবে।

কয়েকদিন আগে পরিস্কার ক’রে রাখা কাপড়গুলো ইস্ত্রি করা দিয়ে শুরু করে। সেটা হ’তেই কয়েক ঘন্টা পার হ’য়ে যায়। তখন পুরো আলমারিটা গোছানোর ভাবনা আজকের মতো বাদ দিয়ে পুরোটা একবার একটু নেড়েচেড়ে দেখার চিন্তা করে রিমি। আর সেটা করতে গিয়েই রিমি ওর মায়ের কাছে লেখা পুরোনো কিছু চিঠির একটা সংগ্রহ পায়। অনেকের লেখা। সেগুলোও যত্ন ক’রে রাখা। যদিও বোঝা যায় অনেক দিন এগুলোতে কেউ হাত দেয়নি। অনেকগুলো চিঠি ওর দাদা আর নানা-নানীর লেখা। অনেকগুলো নাম একেবারেই অপরিচিত। কিন্তু ওর বাবা জহিরুদ্দিন সিরাজির লেখা কোনো চিঠি নেই সেখানে।

রিমি ওর দাদার লেখা একটা চিঠি খাম থেকে বের করে। পুরোনো দিনের লোকের মতো পেচিয়ে লেখা। পড়া যায়, তবে আবার খানিকটা কষ্টও হয়। ফাউন্টেন কলমের পুরোনো কালি অনেক জায়গায় ছড়িয়ে গিয়েছে। সেসব জায়গা আবার পড়া যায় না। রিমি গুনে দেখে ৩৬৮ টা চিঠি। রিমি ঠিক করে চিঠিগুলো সময় নিয়ে সব প’ড়ে দেখবে।

পরিচিত মানুষগুলোর চিঠিই রিমি আগে পড়ে। পড়া শুরুর তৃতীয় দিন রাশেদ জামান নামের একজনের লেখা চিঠি হাতে নেয় রিমি। প্রথম চিঠিতেই রিমি প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খায়। এই লোকটার সাথে বিয়ের আগে মায়ের প্রেম ছিলো। কিন্তু ধাক্কার কারণ চিঠিটার তারিখ। বিয়ের পরও রাশেদ জামানের সাথে মায়ের সম্পর্ক ছিলো-এটা জেনে প্রথমে মজা পেলেও পরের দুইটা চিঠি থেকে রিমি যা জানতে পারে তার জন্য রিমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না।

কেয়া আর রাশেদ দুই জনেরই অনেক দিন পর্যন্ত সন্দেহ ছিলো যে রাশেদই রিমির বাবা। রিমির জন্মের তিন বছর পরও কেয়ার খুব ইচ্ছা ছিলো রিমিকে নিয়ে রাশেদের কাছে অস্ট্রেলিয়ায় চ’লে যাওয়ার। কিন্তু কোনো একটা কারণে ওই সময় কেয়া আর রাশেদের ভেতরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হ’য়ে যায়। কেয়ার বয়স যখন প্রায় ৫ বছর তখন একবার রাশেদ দেশে আসে। কেয়া তখন আর রাশেদের সাথে যেতে রাজি হয় না। তৃতীয় চিঠিতে রাশেদ জামান লিখেছে, সাত মাস আগে তার স্ত্রী সন্তান-জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছে। আর তাই কেয়া যদি এখন অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসে তাহলে আর কোনো সমস্যা হবে না। রিমির সব দায়-দায়িত্ব নিতেও রাশেদ রাজি। সবচেয়ে বড় কথা দেশ ছাড়ার আগে কেয়াকে যতটা ভালোবাসতো রাশেদ এখন তার চেয়েও বেশি ক’রে কেয়াকে মনে পড়ে তার।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -১০

কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-পরীক্ষার ফল আগেই প্রকাশ হয়েছে। দুইটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক তালিকাতে নাবিলা বিনতে হাবিবের নাম আছে। আজ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা-প্রশাসনের তালিকা দেখে মা-মেয়ে দুই জনই বেশ খুশি। মেয়েটা নিজের কাছেই থাকবে এই ভাবনাই যেন বেশি ক’রে কাজ করে শহর বানুর মনে।

ভর্তি-পরীক্ষা দিতে এসেই নাবিলার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়টাকে ভালো লেগে গিয়েছিলো। ওর কলেজের পরিচিত সিনিয়রদের অনেকেই এখানে পড়ছে এখন। তাদের কয়েকজন বলেছিলো সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবসা-প্রশাসন বেশ ভালো। পড়া শেষে চাকরীবাকরী পেতে তেমন একটা অসুবিধায় পড়তে হয়না ইদানিং। তবে ফল দেখে নাবিলার খানিকটা মন খারাপও হয়। ওর স্কুল-কলেজের বন্ধুদের কেউ এই বিষয়ে সুযোগ পায়নি। অবশ্য ওর বেশির ভাগ বন্ধুই কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে প’ড়েছে। তাদের কেউ কেউ আবার অন্য কিছু বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েই সুযোগ পেয়েছে। যেমন উর্মী ট্রিপল-ই তে সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ও নাকি ঢাকাতে সুযোগ পেলে এখানে পড়বে না। তবে কলি স্থাপত্যে পড়বে ব’লে জানালো নাবিলাকে। ওদের ভর্তি হওয়ার তারিখ একই।

নাবিলার সাথে শহর বানু এলেও উর্মী আর কলির সাথে কেউ আসেনি। নোটিসবোর্ড থেকে ফল জানার পর ওরা দুই জন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের দিকে যায় বাসায় ফোন ক’রে জানানোর জন্য। নাবিলা ওর মায়ের সাথে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। ওদের মতো আরো অনেকেই এসেছে আজ। একটু আগে আরো বেশি ভিড় ছিলো্। এখন একটু একটু ক’রে অনেকেই চ’লে যাচ্ছে। ময়লাপোতা যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। অদ্ভুত ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দিকটাতে মানুষের যাতায়াতের জন্য রিকশা নয় বরং ভ্যানের জনপ্রিয়তা বেশি। ফাঁকা কোনো ভ্যান আসলেই সাথে সাথে ভাড়া হ’য়ে যাচ্ছে। অনেক্ষণ পরপর হয়তো একটা রিকশা দেখা যায়। সেগুলোর একটাও ফাঁকা পাওয়া যায় না। আনেককেই ভ্যানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্যাফেটেরিয়ার পাশে বিক্রি হ’তে থাকা ডাবের দরদাম করতে দেখা যাচ্ছে। কারো কারো আগ্রহ ডাব-বিক্রেতার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ঝাড়মুড়িওয়ালার প্রতি। লোকটা মুড়ির সাথে খানিকটা ছোলা আর কোনো একটা আচারের মসলা দেয়। তাতে বেশ একটা সুঘ্রাণও তৈরী হয়েছে। সব মিলিয়ে তার আয়োজনটা দেখলেই মনে হয় বেশ মজার হবে খেতে।

শহর বানু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ব’লে মনে হয় এমন একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে আর কোথাও সহজে ভ্যান পাওয়া যাবে কিনা। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট বা গল্লামারি ব্রিজের কাছ পর্যন্ত হেঁটে যেতে বললো। ওসব জায়গায় নাকি তুলনামূলক ভাবে বেশি ভ্যান পাওয়া যায়। এতটা রাস্তা হাঁটবে নাকি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা ক’রে দেখবে তাই ভাবতে থাকে শহর বানু। এদিকে উর্মী আর কলির ফোনকল ক’রে ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা না ক’রেও উপায় নেই।

আরো চার/পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার পর উর্মী আর কলি ফিরে এলে শহর বানু ওদেরকে নিয়ে ক্যাফের ভেতরে যায়। তেমন একটা ভিড় নেই ক্যাফেতে এখন। গরম গরম সিঙ্গাড়া আসতে দেখে সবার জন্য দুইটা ক’রে অর্ডার করে শহর বানু। খেতে খারাপ নয় ওগুলো। খাওয়া শেষ হ’লে পর ওরা ক্যাফে থেকে বের হ’য়ে ভ্যান খুঁজতে থাকে। এবার যেন ভ্যানের সংখ্যা একটু বেশি। বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও দেখা যাচ্ছে একাডেমিক বিল্ডিংগুলো থেকে বের হ’তে। হয়তো ক্লাস শেষ হয়েছে কোনো। ওরা একটা ভ্যান পেয়ে যায় যেটা একেবারে ময়লাপোতা মোড় পর্যন্ত যাবে। শহর বানু কী মনে ক’রে মেয়েদেরকে সামনে বসতে দিয়ে নিজে ভ্যানের পেছনের দিকে বসে। নাবিলা আর উর্মী দৌড়ে গিয়ে ভ্যানের সামনের দিকে উঠে পড়ে। বেচারা কলিকে শহর বানুর পাশে বসতে হয়।

নাবিলা আর উর্মী মুগ্ধ হ’য়ে রাস্তার দুইপাশ দেখতে থাকে। মহাসড়কের একপাশে বিশ্ববিদ্যালয় আর অন্যপাশে বিস্তৃত ধান ক্ষেত। বেশ কিছুটা পার হ’তেই একটা উঁচু সেতু পড়ে। সেই সেতুতে উঠতে ভ্যানওয়ালার বেশ খাটতে হয়। উর্মী ভ্যানওয়ালাকে নদীটার নাম জিজ্ঞেস করে। নদীর যতটা দেখা যায় সবটাই কচুরিপানাতে ডুবে গেছে। এমন মজা-নদীও আজ ওদের ভালো লাগছে।

নদীটা পার হওয়ার একটু পরই একটা বেশ ব্যস্ত তিন-রাস্তার মোড়। বাম দিকের রাস্তাটা মেডিকেল কলেজের দিকে গিয়েছে। মেডিকেল কলেজ পেরিয়ে একটু সামনে গেলেই শহরের প্রধান বাস-টার্মিনালটা পাওয়া যায়। হয়তো এই কারণেই মোড়টাতে বেশ কিছু গাড়ি দাড়িয়ে আছে, লোকজনের হাকডাকও কম নয়। মোড়টা পার হওয়ার জন্য নাবিলাদের ভ্যানকে বেশ খানিকটা সময় আটকে থাকতে হয়। সিগনাল পাওয়ার পরই ভ্যানওয়ালা বেশ জোরে একটা টান দেয়। মোড়ের বাতাসে উড়তে থাকা ধুলোবালির বেশ খানিকটা উর্মী আর নাবিলার গায়ে এসে লাগে। উর্মী আর নাবিলা পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে হেসে দেয়। বাকি রাস্তাটাতে আর ধুলোবালি নেই। রাস্তার দক্ষিণ দিকের বেশির ভাগই ফাঁকা বলা যায়। আর উত্তর দিকটাতে ছাড়াছাড়া ভাবে খুলনা শহরের প্রলম্বিত অংশকে চোখে পড়ে। এই দিকটাতেই একটা বেশ পুরোনো স্কুল চোখে পড়ে ওদের। তার সামনে বেশ বড় একটা মাঠ। এই ভর দুপুরেও মাঠ ভরা ছেলে-মেয়ের দল।

আসার সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে শহর থেকে যতটা দূরে মনে হয়েছিলো নাবিলার ফেরার সময় আর ততটা মনে হয় না। হয়তো খোলা ভ্যানে চ’ড়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে আসার কারণেই। আবার হয়তো রাস্তাটার সাথে খানিকটা পরিচিতি বাড়ার জন্যও এমনটা হ’তে পারে। এই নিয়ে চতুর্থবার আসা হলো এই রাস্তায়। কিছুদিন পর থেকে হয়তো নিয়োমিতই আসতে হবে।

ময়লাপোতা মোড়ে ভ্যান থেকে নামার পর ওরা রিকশা নেয়। একটাতে কলি আর উর্মী, অন্যটাতে মেয়েকে নিয়ে শহর বানু। মেয়েগুলো দেখতে দেখতে বড় হ’য়ে গেলো! অদ্ভুত একটা ভালো লাগা নিয়ে শহর বানু বাসায় ফেরে। স্বামীকে খবরটা জানানোর জন্য শহর বানুর তর সয় না। এদিকে তরিকুল হাবিব আড়ত বন্ধ করে দিয়েছে কয়েক মাস হ’লো। আগে আড়তে চাইলেই ফোন ক’রে খবর দেওয়া যেতো। এখন সে উপায় নেই।

গোসলে ঢোকার আগে শহর বানু চুলায় ভাত চড়িয়ে দেয়। নাবিলা বাথরুম থেকে বের হ’লে পর শহর বানু নাবিলাকে ভাত দেখতে ব’লে গোসলে ঢোকে। নাবিলা রান্নাঘরে এসে দেখে মা ডিম আর ঝাল-পেয়াজ বের ক’রে রেখেছে। সাথে ফ্রিজ থেকে আগের দিনের ডাল। নাবিলা ডিম ভাজির প্রস্তুতি শুরু করে। শহর বানুর গোসল শেষ হওয়ার আগেই ডিম ভাজি করা হ’য়ে যায় নাবিলার। ভাতও হয়হয়। শহর বানু চুলের সাথে গামছা প্যাচাতে প্যাচাতে রান্নাঘরে ঢোকে। ‘ডিম ভেজে ফেলেছিস?’‘হুম’

-‘শুধু ডিম আর ডাল দিয়ে খাবি? না বেগুনও ভাজবি একটা?’

-‘আমার ডিমেই হবে। আমি খেয়েই একটা ঘুম দিবো। তুমি বেগুন ভাজি খাবে কিনা বলো। কড়াই এখনো গরম আছে।’

-‘আমিও ডিম-ডাল দিয়েই খাবো। বেগুন ইলোরা এলে ওকে ভেজে দিলেই হবে। ও ডালের সাথে বেগুন খুব পছন্দ করে। তুই ডিম নিয়ে গিয়ে টেবিলে বস। আমি ভাত নামিয়ে আনছি।’

ওরা খেতে বসার মাঝেই তরিকুল হাবিব চলে আসে। নাবিলা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। ‘রেজাল্টি কী রে মা?’‘বিবিএ তে হয়েছে।’

-‘বাহ!’ ব’লেই তরিকুল হাবিব মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। মেয়ের হাতে লেগে থাকা ডাল খানিকটা তরিকুলের শার্টে লেগে যায়। সেদিকে বাপ বা মেয়ে কারো খেয়াল থাকে না। খেয়াল করিয়ে দেয় শহর বানু। ‘হয়েছে, হয়েছে। ওকে খাওয়া শেষ ক’রতে দাও আগে।’

নাবিলা আবার খেতে বসে। তরিকুল খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে শহর বানু্। তরিকুল ‘হুম’ ব’লে হাত-মুখ ধুতে চলে যায়। শহর বানু খাওয়া শেষ না ক’রেই আবার রান্নাঘরের দিকে যেতে থাকে। নাবিলা থামিয়ে দেয়। ‘তুমি আগে খেয়ে নাও তো। ভাত আর ডাল তো আছেই। আব্বা একটু বসুক। আব্বার ডিম আমি ভেজে দিচ্ছি।’

শহর বানু ফিরে আসে টেবিলে। নাবিলা বেশ ঝটপট খাওয়া শেষ ক’রে ফেলে। তারপর উঠে গিয়ে আর একটা ডিম ভাজতে শুরু করে। তরিকুল হাবিব হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় পালটে লুঙ্গি-গেঞ্জি প’রে খাবার টেবিলে এসে বসে। ‘ভর্তির তারিখ দিয়েছে?’‘হুম, দুই মাস পর। এর ভেতরে সব সার্টিফিকেট তুলে ফেলতে হবে। নাবিলার তো এসএসসির সার্টিফিকেট আসেনি এখনো। এর জন্য আবার যশোর যেতে হবে কিনা কে জানে!’

-‘যেত হ’লে যাবে। আমি নিয়ে যাবো না হয়। সার্টিফিকেট তো সবারই তুলতে হবে। এরা যে মূল সার্টিফিকেট দিতে এত দেরি করে কেন কে জানে!’

-‘সব টাকা-পয়সার ধান্দা। প্রভিশনাল সার্টিফিকেট তুলতে নাকি ঘুষও দেয়া লাগে। গত বছর সাব্বিরেরটা তুলতে নাকি ২৫০ টাকা দিতে হ’য়েছিলো।’

-‘তোমাকে কে ব’ললো?’

-‘সাব্বিরের মা। স্কুলের সার্টিফিকেটটা ঠিকই সময় মতো চ’লে আসে। কলেজেরটা আসে না কেন? কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা তো আরো কম হওয়ার কথা। তাই না?’

-‘তাই তো হওয়ার কথা। স্কুল পাশের পর সবাই তো আর কলেজে পড়ে না। আবার বোর্ড দেখো সেই একই।’

-‘হুম।’ ব’লতে ব’লতে নাবিলা ডিম ভাজি নিয়ে চ’লে আসে। শহর বানু স্বামীর থালাতে ভাত তুলে দেয়। তরিকুল হাবিব খাওয়া শুরু করে। ‘ইলোরার আসার সময় হ’য়ে গেলো না?’

-‘এই চ’লে আসবে। তুমি খাও।’

রাতে স্বামী-স্ত্রী দুইজন বেশ একটা স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে যায়। অন্তত এক জনকে নিয়ে ভাবনা কমলো।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -৯

মায়ের শরীর প্রতিদিনই যেন একটু একটু ক’রে খারাপ হচ্ছে। ডাক্তারও তেমন একটা ভরসা দিচ্ছে না। লুইকেইমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার যদি শেষের দিকে ধরা পড়ে তবে ডাক্তারদের তেমন কিছু করারও থাকে না। মায়ের কষ্টটা দেখার মতো নয়। রিমি প্রথম দিকে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ ক’রে একাএকা কাঁদতো। এখন বুঝে গেছে মাকে আর বাঁচানো যাবে না। ডাক্তার যে নির্দিষ্ট ক’রে কিছু বলছে না এই বরং ভালো।

বাড়িতে রিমির বড্ড একা লাগে। বাড়িটাও খালি একরকম। জহিরুদ্দিন সিরাজী রাতে বেশিরভাগ দিন হাসপাতালের কেবিনে স্ত্রীর সাথে থাকা শুরু করেছে। আশিক খুলনা থেকে এসে দুই দিন ছিলো। গত একমাসে সেই দুইদিন বাবা রাতে বাসায় ছিলো শুধু। কোনো কোনো দিন রাতের বেলা আবিরের সাথে ফোনে কথা হয়। ও কোনো একটা দোকান থেকে ফোনকল করে। তাই লম্বা সময় কথা বলা যায় না। রিমির একবার মনে হয় আজ আবির ফোন দিলে ওকে বাসায় চ’লে আসতে ব’ললে কেমন হয়। বাবা তো জানেই আবিরের কথা। আর আবিরকে বাবার অপছন্দ হয়নি। আবিরের সাথে ওর অনেক অনেক কথা বলা দরকার। আবিরের ঘাড়ে মাথা রেখে ওর একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।

আবির ফোনকল করে রাত আটটার একটু পরপরই। রিমির কথায় আবির প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। একবার মনে হয় গেলে রিমি একটু আস্থা পাবে। আবার পরদিন সকালের অফিসের কথা ভাবে। কাল একটা জরুরী কাজ আছে অফিসে। সেটার কথা বলতেই রিমি বলে, ‘তুমি সকাল সকাল চ’লে যেও।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘খুব একা লাগছে আবির। আই উইশ আই কুড হাগ য়ু ফর এ্য হোয়াইল!’

-‘আচ্ছা আমি আসছি’- জানায় আবির।
-‘তাড়াতাড়ি আসো তবে, একসাথে খাবো আমরা।’
-‘আচ্ছা। আমি একবার মেসে গিয়েই বের হচ্ছি।’
-‘মেসে আবার এখন কী? সরাসরি চ’লে আসা যায় না?’
-‘টি-শার্ট প’রে আছি, একটা জামা অন্তত গায়ে দিয়ে আসি। তোমার বাবার সাথে দেখা হ’য়ে যায় যদি!’ ব’লে নিজেই একটু হাসে আবির।
-‘সুন্দর জামা হয় যেন! মেয়ের বাবাকে ইমপ্রেস করার এমন সুযোগ আর হয়তো পাবে না!’ রিমিও সেই হাসিতে যোগ দেয়। একটু পরে হাসি থামিয়ে বলে, ‘তবে বাবার সাথে তোমার দেখা হওয়ার চান্স কম। তোমার তো সকালে কাজ আছে বললে। বাবা আটটার দিকে বাসায় এসে নাস্তা করে। জানোই তো বাবার সবকিছু খুব ঘড়ি-ধরা।’
-‘আমি তো আর দেখিনি। শুনি শুধু তোমার কাছে।’
-‘দেখো পরে। সময় তো আছে। আর টি-শার্টটা খুব পচা না হ’লে ওটা পরেই চ’লে আসো।’
-‘না, খুব পচা নয়। তবে তোমার কেমন লাগবে তা বলতে পারি না।’
-‘তাহলে আর মেসে না যাও এখন। সরাসরি চ’লে আসো আমার কাছে।’

আমার কাছে- বলার সময় একটু টেনে বলে রিমি। আবির আর বিশেষ কিছু ভাবে না। একটা হলুদ রঙের বেবিট্যাক্সি পেয়েও যায় দ্রুত। রাস্তাও বেশ ফাঁকা হ’য়ে এসেছে এতক্ষণে। প্রায় চল্লিশ মিনিটের ভেতরেই আবির রিমিদের বাসার ফটকে পৌছে যায়। এ্যাপার্টমেন্ট-বাড়ির দারোয়ান আবিরের নাম আর সময় লিখে রাখে একটা খাতায়। তারপাশে আবির সই করে দেয়। ব্যবস্থাটা বেশ ভালো লাগে আবিরের।

এ্যাপার্টমেন্টের কলিং-বেল বাজার প্রায় সাথে সাথেই রিমি দরজা খুলে দেয়। ও আবিরের জন্য বসার ঘরেই অপেক্ষা করছিলো। আবির ভেতরে এলে রিমি ওকে জড়িয়ে ধরে। বেশ একটু সময় নিয়েই আবিরকে ধরে রাখে রিমি। আবিরের গায়ের গন্ধটাও যেন রিমির ভালো লাগে। আবির রিমির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তখন আলিঙ্গন একটু সিথিল করে রিমি। টি-শার্টটার দিকে খেয়াল যায় তাতে, ‘বাহ! সুন্দর তো টি-শার্টটা। টিল(teal)  রঙের এই গেঞ্জি কোথায় পেলে?’

-‘নিশি ফুপু দিয়েছে। সুন্দর?’
-‘হুম। তাই বলো। তোমার গায়ের সাথে মাপেও মিলেছে ঠিকঠাক।’
-‘কিন্তু আমি তো এটাকে সবুজ রং ভেবেছি!’
-‘এটা নীল আর সবুজের মেশানো টোন। মেয়েরা এমন অনেক রং চেনে।’
-‘সব মেয়ে?’
-‘সব মেয়ে কিনা জানি না। আমি অনেকগুলো চিনি। আমার চেয়ে মা বেশি চেনে। মার কাছ থেকেই কিছু কিছু চিনেছি। মা বেশ ফ্যাশন সচেতন।’
-‘তাই?’
-‘তুমি তো মাকে দেখোনি। দেখলে বুঝতে। মা একসময় টিভিতে কাজ করতো সেজন্যও হ’তে পারে।’
-‘কী কাজ?’
-‘বলবো, তার আগে চলো আমরা খেয়ে নিই। আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে।’
-‘আমারও। সাধারণত আরো আগেই খেয়ে নিই প্রতিদিন।’ জানায় আবির।

রিমি আবিরকে ওয়াশরুম দেখিয়ে দেয়। তারপর খাবার টেবিলে গিয়ে খাবার সাজাতে বসে। ভাত হটপটে থাকায় এখনো গরম আছে। সবজিটা গরম না করলেও চলবে। তবে ডাল আর মাংসটা গরম না করলেই নয়। রিমি রান্নাঘরে ঢোকে।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রিমিকে খাবার ঘরে খুঁজে পায় না আবির। একবার ভাবে কোনো একটা চেয়ারে গিয়ে বসবে কিনা। অপরিচিত বাসা হওয়ায় নড়াচড়ার দ্বিধাটা বেশ বোঝা যায়। রান্না ঘর থেকে শব্দ আসছে খুন্তি-কড়াইয়ের। আবির একটু গলা খাকারি দেয়। রিমি রান্নাঘর থেকে সেটা শুনে বেরিয়ে আসে। ‘তুমি বসো টেবিলে। আমি মাংসটা একটু গরম করে আনি।’

-‘ওকে।’ আবিরের গলায় সহজ হওয়ার চেষ্টা।
-‘নাকি রান্না ঘরের দরজায় দাড়াবে? গল্প করতে করতে খাবার গরম করি?’ রিমির চাওয়াটা বেশ বোঝা যায়। আবির এগিয়ে যায় রান্না ঘরের দিকে। ‘তোমাকে ভেতরে আসতে হবে না। তুমি এখানে দাড়াও।’ দরজার চৌকাঠটা নির্দেশ ক’রে বলে রিমি।
-‘নো প্রবলেম।’ আবিরের গলায় মুগ্ধতা।
-‘হ’য়ে গেছে প্রায়। আর সামান্য একটু।’
-‘তোমার রান্না?’
-‘উহু… আমি রান্না পারি না। একটু গরম-টরম করতে পারি শুধু। কেন? তোমার রান্না জানা বউ চায়?’ রিমির কণ্ঠে কৌতুক। সেটা বুঝেই আবির উত্তর দেয়, ‘তেমন হ’লে মন্দ হয় না।’
-‘তুমি রাধতে পারো?’
-‘অল্প কিছুকিছু পারি। মার কাছ থেকে শিখেছি।’
-‘মা খুব ভালো রান্না করেন?’
-‘মার রান্নার সুনাম আছে। বড় দাদীর কাছ থেকে নাকি অনেক রান্না শিখেছে মা।’
-‘বড় দাদী!? তোমার দাদার একাধিক বিয়ে?’ কৌতুহল প্রকাশ করে রিমি।
-‘আরে না! আমার দাদারা তিন ভাই দিলেন।’ সহজভাবেই জবাব দেয় আবির। ‘নিশি ফুপুর কথা বলেছি না তোমাকে? উনি ছোট-দাদার মেয়ে।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘বড় দাদাকে দেখিনি কখনো। শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় মারা যান। বড়দাদী আমাদের সাথেই ছিলেন বাকিটা জীবন।’
-‘তোমাকে আদর করতো?’
-‘খুব।’ ততক্ষণে মাংস গরম হ’য়ে গিয়েছে। রিমি চুলা বন্ধ ক’রে কড়াই থেকে মাংস একটা বাটিতে নামায়। তারপর সেটা আবিরের হাতে দেয়, ‘তুমি এটা নিয়ে টেবিলে বসো। আমি সবজিটা ডালটা নিয়ে আসছি।’

মাংসটা বেশ লাগে খেতে আবিরের। একদিন আগের মাংস। বেশ একটু ঝুরঝুরে হ’য়ে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ওঠার পর থেকে আবিরের দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস। রিমিরও অপেক্ষা করতে করতে বেশ ক্ষুধা লেগে গিয়েছে। ওদের খাওয়ার ভেতরে তেমন আর কথা হয় না। খাওয়া শেষ হ’লে রিমি আবিরকে চা বানাতে পারে কিনা জজ্ঞেস করে। আবির জানায় যে আগে বেশ ভালো পারতো, তবে অনেক দিন বানানো হয় না।

রিমি আবিরকে চায়ের উপকরণ এনে দেয় সব। আবির দুধ-চা বানানো শুরু করে।

চায়ে চুমুক দিয়ে রিমি মুগ্ধ হয়। আসলেই দারুন চা। ‘বাহ! দারুন বানাও তো। তোমার বানানো ঠিক মতো খেয়াল করা হ’লো না। শিখিয়ে দিয়ো তো।’

-‘শিখতে চাও?’
-‘নাহ!’ ব’লে একটু হাসে রিমি। ‘বরং না শেখাই ভালো হবে। তুমি প্রতিদিন আমাকে চা বানিয়ে খাওয়াবে।’ আবিরও সেই হাসিতে যোগ দেয়। রিমির খুব ভালো লাগে আবিরের এই হাসি। রিমি ওর হাতের পেয়ালা নামিয়ে রাখে টেবিলে। জড়িয়ে ধ’রে চুমু দেয় আবিরের ঠোটে।

আবিরেরও আর চা-টা খাওয়া হয় না। বরং পরষ্পরের শরীরের স্বাদ নিতে ভালো লাগে বেশি ওদের। অনভ্যাসের আড়ষ্ঠতা প্রথমে একটু অস্বস্তি তৈরী করলেও তা কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগে না ওদের।

আবির আর রিমি নগ্ন শরীরে পরস্পরকে জড়িয়ে রাখে কিছুক্ষণ। একসময় রিমিই উঠে ওয়াশরুমের দিকে যায়। আবির মুগ্ধ হয়ে রিমির নগ্ন শরীর দেখে। রিমি ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করলে আবিরও বিছানা ছাড়ে। মেঝেতে পড়ে থাকা ছাড়ানো-ছিটানো কাপড় তুলে নেয়।

সকাল সকাল মহাখালি ফিরতে হবে আবিরকে, তারপর সেখান থেকে অফিস। ঘুমের আগে তাই ঘড়ির এ্যালার্মটা এক ঘণ্টা আগিয়ে রেখেছিলো আবির। সকাল ছয়টা বাজতেই উঠে প’ড়তে তাই কোনো সমস্যা হয় না। রিমি তখনো নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়েই রিমিকে ডেকে তুলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে আবির। রিমির সকালটা অন্য রকম লাগে; কেমন একটা ঘোর লাগা মুহূর্ত যেন। আর না ঘুমিয়ে এক পেয়ালা কফি খেলে মন্দ হয় না। বাবা প্রতিদিন সকালে উঠে কালো-কফি খায়। তিতকুটে একটা জিনিস। তবে পোড়াপোড়া গন্ধটা বেশ।

রিমি চুলায় পানি চড়িয়ে দিয়ে ফ্রেঞ্চ-প্রেসটা বের করার জন্য কাপর্বোডের পাল্লা খুলেছে এমন সময় ফোন বেজে ওঠে। এত সকালে আবার কে ফোনকল করে! রিমি ফ্রেঞ্চ-প্রেসটা নামিয়ে টেবিলে রেখে তারপর ফোনের দিকে আগায়।

বাবার ফোন। হাসপাতাল থেকে। একটু আগে মা মারা গিয়েছে। রিমির একদম বিশ্বাস হ’তে চায় না। মৃত্যু এত সহজ! বাবা আরো কী সব যেন বলতে থাকে। সে সবের কিছু রিমি বুঝতে পারে, কিছু পারে না। একটু পরে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার আসবে। হাসপাতালে যেতে হবে- এইটুকু বোঝা যায়।

রিসিভারটা নামিয়ে রাখে রিমি। কেমন একটা শো-শো শব্দ আসছে কোথাও থেকে। আর সব বড্ড চুপচাপ। বড্ড একলা চারপাশ। রিমি কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। ঘোর কাটে কেটলির শো-শো শব্দটা যখন আরো বাড়লো তখন। রিমি দৌড়ে রান্না ঘরের দিকে যায়। গ্যাসের চুলার নবটা ঘুরিয়ে চুলা নিভিয়ে দেয়।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -৮

ভারতের কয়েকটা পাটকল ঘুরে আর তার আশেপাশের কয়েকজন আড়তদারদের সাথে কথা ব’লে ফিরে এসেছে তরিকুল হাবিব আর আনসার আলী। অনুপম সাহা আর জয়ন্ত লাহিড়ীর সাথে কথা ব’লে বেশ ভরসা পেয়েছে দুই জনই। অনুপম সাহা প্রথমেই বেশ বড় একটা অর্ডার করেছে। তরিকুল হাবিবের নিজের আড়তেই পর্যাপ্ত পাটের মজুত আছে। সেগুলো ট্রাকে ক’রে বেনাপোল স্থলবন্দরে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য উদ্যোগ শুরু হয়। আর আনসার আলী রপ্তানির জন্য দরকারী কাগজপত্র আর ব্যাংকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হ’য়ে পড়ে। আনসার আলী যেখানেই যায় তার সাথে তরিকুলের বিশ্বস্ত ম্যানেজার নাজিমুদ্দিনও যায়। ব্যাংকে দুইদিন তরিকুল নিজেও গিয়েছে। এ্যাকাউন্টে এলসির টাকা জমা হওয়ার পরদিনই বারোটা ট্রাক বোঝাই ক’রে তরিকুলদের পাটের চালান বেনাপোল যায়। তিনদিনের ভেতরে কাস্টমসের সব ক্লিয়ারেন্স হ’য়ে যায়। পেট্রোপোল বন্দরে অনুপম সাহার ট্রাকে যখন পাট বোঝাই হয় তখন অনুপম সাহা পাটের মান নিয়ে তার খুশির কথা জানায়। আর ব’লে যায় কয়েকদিন পর যোগাযোগ করবে।

অনুপম সাহার যোগাযোগের আগেই যোগাযোগ করে জয়ন্ত লাহিড়ী। সাহার চালানের প্রায় দ্বিগুন পরিমাণ পাটের অর্ডার করে লাহিড়ী। তরিকুলদের পাঠানো পাট দেখে লাহিড়ী মুগ্ধ হয়েছে। এমন দামে এমন পাট কলকাতায় পাওয়া যায় না। তরিকুল নিজের গুদামের হিসাব নিয়ে বসে। এমন আরো অন্তত ৬টা চালান সে তার নিজের মজুদ থেকেই দিতে পারবে। বেশি পাট কিনে ধরা খাওয়ার যে ভয় কয়েকদিন আগেও ঘিরে ধরেছিলো তরিকুলকে তা একেবারেই কেটে যায়। কিছুদিন পর কলকাতা থেকে আরো অর্ডার আসতে থাকে। আনসার আলী কলকাতার আরো ৪ জন আড়তদারের সাথে কথা বলা শুরু করেছে। ওরা যে দাম দিতে চায় তা বেশ ভালো।

আনসার আলীর বিনিয়োগ করা টাকা আর ইন্ডিয়া থেকে আসা ব্যাংকে জমা হওয়া টাকা দিয়ে তরিকুল খুলনা আর যশোরের নোয়াপাড়ার বেশ কয়েকজন পাট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাট কেনা শুরু করে। শীতকাল আসার আগেই বছরের শেষ চালানটা পাঠানোর পর দেখা গেলো গত চার বছরে তরিকুলের প্রতিষ্ঠান পাট ব্যবসা ক’রে যতটা আয় করেছিল এবার ভারতে পাট পাঠিয়ে এক বছরেই তার চেয়ে কিছু বেশি ব্যবসা করেছে তারা। আনসার আলীর হিসাব বুঝিয়ে দেয়ার পরও তরিকুলের হাতে আড়াই কোটি টাকার বেশি থেকে গিয়েছে। আনসার আলীর আয়ও কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে।

এক মৌসুমে এতটা আয় আনসার আলী আগে কখনো করেনি। তার প্রভাব পড়ে তার জীবনযাত্রাতে। বয়রাতে পাঁচকাঠার একটা জমিও কিনে ফেলে আনসার আলী। অন্যদিকে অনেকদিনের পুরোনো ব্যবসায়ী তরিকুলের জীবন আগের মতই চ’লতে থাকে। ব্যবসার বাড়তি আয় অন্য কিছুতে বিনিয়োগ করা যায় কিনা সেই ভাবনাতেই কাটে তরিকুলের অবসর।

এর ভেতরে একদিন তরিকুলের বাড়িতে রাত সাড়ে বারোটার দিকে ফোন বেজে ওঠে। ততক্ষণে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোনের ঐ পাশ থেকে নাজিমুদ্দিন জানায় যে আজ সন্ধ্যার পর থেকে আনসার আলীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্ত্রী হালিমা খাতুনের কাছ থেকে জানা গিয়েছে যে বিকালে বয়রাতে নতুন বাড়ির কাজ দেখতে গিয়েছিল সে। ব’লে গিয়েছিল রাত সাড়ে সাতটা থেকে আটটার ভেতরে ফিরে আসবে। নয়টার পরও না ফিরলে আড়তে একবার ফোন করেছিল হালিমা খাতুন। ততক্ষণে আড়ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ সেই ফোন ধরেনি। দশটার দিকে নাজিমুদ্দিনের বাসায় হালিমার ছোট ভাই মাসুম এসে খবর দেয়। তরিকুল ফোনেই নাজিমুদ্দিনকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর সদর হাসপাতালে লোক পাঠাতে বলে। আর চ’লে আসতে বলে তরিকুলদের বাসায়।

নাজিমুদ্দিন যখন এসে পৌছায় ততক্ষণে তরিকুল হাবিব আর শহর বানু দুইজনই উঠে পড়েছে। শহর বানু মেয়েদের ঘরের দরজা টেনে দেয়। ওরা ঘুমাক। সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে তরিকুল দরজা খুলে দেয়। ভেতরে এসে নাজিমুদ্দিন জানায় ওদের আড়ত থেকে মফিজ আর কবিরকে হাসপাতালে খোঁজ নিতে পাঠিয়ে তারপর ও এখানে এসেছে। 

শহর বানু নাজিমুদ্দিনদেরকে বসতে ব’লে চুলায় চায়ের পানি চড়িয়ে দেয়। হাসপাতাল থেকে খোঁজ না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর আপাতত উপায় নেই। তরিকুল একবার স্থানীয় কমিশনারকে জানোনোর কথা বলে। কমিশনারের বাসা তরিকুলদের বাসার দুইটা প্লট পরেই। কমিশনার তৈয়েবুরের সাথে মাঝেমাঝে দেখাও হয় তরিকুলের। তৈয়েবুর নিজেও খুলনার ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য। তবে কমিশনার হওয়ার পর থেকে সংগঠনের অফিসে তৈয়েবুরকে তেমন একটা দেখা যায় না।

নাজিমুদ্দিনের হঠাৎ মনে হয় যে, ওর এক নিকট আত্মীয়ের বড় ছেলে ফিরোজ বছর দুয়েক আগে পুলিশে ঢুকেছে। অফিসার হিসেবেই। যশোরে পোস্টিং। নাজিমুদ্দিনের ছোট পকেট-ডাইরীতে সেই পুলিশ অফিসারের ফোন নাম্বার পাওয়া যায়। সেটা জেনে তরিকুল তাকে ফোন ক’রতে বলে নাজিমুদ্দিনকে। এই অবস্থায় এখনই থানায় ডাইরী করা ঠিক হবে কিনা সে ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য।

পুলিশের আইএস ফিরোজ সব শুনে বলে, ‘যেহেতু ২৪ ঘণ্টা পার হয়নি এখনো, থানা ডাইরী নিবে না এখনই। আপনারা হাসপাতাল আর নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের ভেতরে খোঁজ নিতে থাকেন। কোথাও খোঁজ না পেলে আমাকে আর একটা ফোন দিয়েন। আমি খুলনার থানার সাথে যোগাযোগ ক’রে রাখবো।’ – এই কথায় সবাই বেশ একটু ভরসা পায়। নাজিমুদ্দিন ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখার একটু পরই মফিজ আর কবির এসে হাজির হয়। দুইটা হাসপাতালের কোনোখানেই আনসার আলীর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আর দেরী না ক’রে সবাই বেরিয়ে পড়ে আনসার আলীর বাসায় যাওয়ার জন্য। শহর বানুর বানানো চা আর কারো খাওয়া হয় না।

রাত আড়াইটা পর্যন্তও যখন কোনো খবর পাওয়া যায় না তখন একটু একটু ক’রে ভয় কাজ ক’রতে শুরু করে তরিকুলের মনে। তবে হালিমা খাতুনকে সেটা বুঝতে দিতে চায় না তরিকুল। ‘ভাবি, আল্লাহ ভরসা। আনসার তো কাজের লোক। কোথাও হয়তো আটকা প’ড়ে গিয়েছে। নতুন চালানটালানের কোনো খোঁজটোজ হ’তে পারে।’ ব’লে খানিকটা থামে তরিকুল।

-‘কিন্তু উনি তো না ব’লে কখনো কোথাও যাওয়া লোক না। এত বছর ধ’রে দেখছি লোকটাকে, কোনো দিন এমন হয়নি।’ হালিমা খাতুনের মন সায় দেয় না তরিকুলের কথায়।
-‘আমিও তেমনই দেখলাম এত দিন। কিন্তু এখন তো আর অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ভাবি। থানাও তো কিছু করবে না ২৪ ঘণ্টা পার না হ’লে। আমি বাসায় গিয়ে ফিরোজকে জানিয়ে রাখি সবকিছু। আর আপনি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেন। আমরা সকাল সাকাল আবার চ’লে আসবো।’ তরিকুলের কথার সাথে বাকিরাও একমত হয়।

দুই দিন পার হ’য়ে যাওয়ার পরও আনসার আলীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। থানায় জিডি করা হ’য়েছে এর ভেতরে। এলাকার প্রভাবশালী রাজনীতিক অনেকের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকেও জানানো হয়েছে। তিনি যতটুকু পারেন করবেন ব’লে আশ্বাস দিয়েছেন।

হালিমা খাতুন বেশ ভেঙে পড়েছে। ছেলে-মেয়ে দুইজন আপাতত স্কুলে যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই ওদেরকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে হালিমা খাতুন।

তৃতীয় দিন জানা যায়, আনসার আলী বেঁচে আছে। দুপুরের দিকে একটা ফোনকল আসে। অন্যপ্রান্ত থেকে জড়ানো গলায় কেউ একজন কথা বলে হালিমা খাতুনের সাথে। আনসার আলীকে জীবিত ফিরে পেতে চাইলে আট লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। কোথায় কখন সেই টাকা পৌছে দিতে হবে সেটা পরে জানাবে। তবে আজকের ভেতরে যেন থানার ডাইরী তুলে নেয়। তা না হ’লে পরিণতি ভালো হবে না।

এর বেশি কথা হালিমা খাতুন বুঝতে পারে না। বাসায় হালিমার সাথে ছেলে-মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। কয়েক দিনের চিন্তা আর মানসিক চাপে হালিমা এমনিতেই অস্থির হ’য়ে আছে। মাসুমও বাসায় নেই। হালিমা তড়িঘড়ি তরিকুলদের আড়তে ফোন দেয়। তরিকুল আড়ত বন্ধ করে নাজিমুদ্দিনকে সাথে নিয়ে আনসার আলীর বাসায় চলে আসে। দ্রুতই আট লাখ টাকা যোগাড় হ’য়ে যায়।

অপেক্ষার সাথে সাথে অস্থিরতা বাড়তে থাকে সবার। অথচ রাত দশটা পর্যন্তও আর কোনো ফোনকল আসে না আনসার আলীর বাসায়। বসার ঘরে কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। হঠাৎ সদর দরজা থেকে শব্দ এলে সবাই চমকে ওঠে। অথচ শহর বানু রান্না ক’রে খাবার পাঠিয়েছে। তরিকুল আড়ত থেকে বের হওয়ার আগে আগে শহর বানুকে ফোনে জানিয়েছিলো আনসার আলীর বাসায় যাওয়ার কথা। এতক্ষণে কেউই খেয়াল করেনি যে রাতের খাবার রান্না করা হয়নি। সন্ধ্যাতেও নাস্তা জোটেনি কারো মুখে।

খাবার টেবিলে কেউ কোনো কথা বলে না। আবার হয়তো অনেক কথা বলে নিরবতার ভেতর দিয়েই। কিমবা হয়তো সবার একই কথা।

ফজরের আজান শেষ হ’ওয়ার একটু পর ফোন বেজে ওঠে। প্রতীক্ষার ফোন। টাকা রেডি আছে কিনা জানতে চাওয়া হয় ফোনের ঐপাশ থেকে। হালিমা জানায় যে টাকা রেডি আছে।

‘বাড়ির যে কোনো একজন লোককে সাথে নিয়ে আপনি এখনই রেল-স্টেশনে চলে আসেন। কাউকে না পেলে একা আসেন। বাড়ির বাইরের কাউকে সাথে আনবেন না। কাউকে জানাবেনও না। বাজারের একটা থ’লেতে ভ’রে টাকা নিয়ে রিকশা ক’রে চ’লে আসেন।’ এরপরই ফোনটা কেটে যায়।

মাসুমকে সাথে নিয়ে হালিমা বেরিয়ে পড়ে। তখনো চারপাশে বেশ অন্ধকার। রাস্তাও ফাঁকা। রিকশা দ্রুতই রেল-স্টেশনে পৌছে দেয় ওদেরকে। হালিমা একবার চারপাশে তাকিয়ে দেখে। একটু একটু আলো ফুটতে শুরু ক’রেছে। অনেকেই স্টেশনে আসতেও শুরু ক’রছে। বেশির ভাগের হাতেই কোনো না কোনো ব্যাগ। হালিমা ভেবে পায় না কী করা যায় এখন। স্টেশন বিল্ডিঙের সামনেই দাড়িয়ে থাকবে নাকি একবার লবিতে গিয়ে বসবে।

মাসুমের মনে হয় লবিতে গিয়ে অপেক্ষা করাটাই ভালো হবে।

হালিমা আর মাসুম লবিতে ঢুকতেই একটা লোক ওদের দিকে এগিয়ে আসে। লোকটা কোনো কথা না ব’লে হালিমা খাতুনের চোখের দিকে তাকায় একবার। তারপর হাতটা বাড়িয়ে দেয়। হালিমা যন্ত্রের মতো হাতের থোলেটা আগিয়ে দেয়। লোকটা খুব স্বাভাবিকভাবে টাকার থোলেটা নিয়ে স্টেশনের প্লাটফর্মের দিকে চ’লে যায়। মাসুম বা হালিমা খাতুন কেউই কিছু ব’লার মতো খুঁজে পায় না।

আরো কিছুক্ষণ স্টেশনের লবিতে দাড়িয়ে থেকে ওরা দুইজনই বের হ’য়ে আসে। ‘তুই কি একটু প্লাটফর্মের দিকে আগিয়ে দেখবি?’ হালিমা খাতুন তার ছোট ভাইকে বলে।

একটা অস্পষ্ট ‘হু’ ব’লেই মাসুম আবার স্টেশন-বিল্ডিঙের লবির দিকে পা বাড়ায়। আর হালিমা খাতুন একা দাড়িয়ে থাকে পোর্চের নিচে। কতক্ষণ পর মাসুম ফিরে আসে সে হিসাব আর থাকেনা হালিমা খাতুনের। দাড়িয়ে থাকতে থাকতে শরীরে অদ্ভুত একটা কাঁপুনি টের পায় হালিমা। কেমন যেন ভেঙে পড়ার কাঁপুনি। ‘না আপা। কেউ নেই। লোকটাও না, দুলাভাইও না।’ মাসুমের কথায় খানিকটা চমকে ওঠে হালিমা।

সেদিন রাত দশটার দিকে একটা মাইক্রো বাস থেকে চোখবাধা অবস্থায় আনসার আলীকে তার বাসার সামনের রাস্তায় ফেলে রেখে যায় একদল লোক। আনসার আলী নিজেই চোখে বাঁধা কাপড় সরিয়ে উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করে। অথচ শরীরে শক্তি নেই যেন একটুও। জীবনের সবচেয়ে কঠিন দূরত্বটা তবু আনসার আলী একাই পার হয়। কিভাবে যে নিজেনিজেই উঠে দাঁড়িয়ে বাসার দরজা পর্যন্ত পৌছায় তা সে নিজেও জানে না। এরপর আনসার আলীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। ডাক্তারদের অনেক চেষ্টার পরও আনসার আলীকে বাঁচানো যায় না। চার দিন পর আনসার আলীর মৃতদেহ নিয়ে হাসপাতাল থেকে একটি এ্যাম্বুলেন্স বের হয়ে যায়।

(চলবে)

একটি শহুরে গল্প -৬

বৃত্তির টাকা জমা হ’য়েছে কিনা খোঁজ করার জন্য টিএসসির জনতা ব্যাংকে এসেছে রিমি। একটা কাউন্টার থেকে রিমি আবিরকে খেয়াল করে। আবির টাকা জমা দেওয়ার একটা কাউন্টারে দাড়িয়ে আছে। আবির ঠিক রিমিকে খেয়াল করে কিনা রিমি বুঝতে পারে না। রিমি ওর লাইনে দাড়িয়ে মাঝে মাঝে আড় চোখে আবিরকে খেয়াল করতে থাকে।

আবিরের টাকা জমা হ’য়ে গিয়েছে। ওকে বেরিয়ে যেতে দেখে রিমি ওর লাইন থেকে বেরিয়ে আসে। একটু দ্রুত হেটে আবিরের মুখোমুখি দাড়ায়। ‘কেমন আছো? অনেক দিন যে দেখি না!’ রিমির তুমি ক’রে বলাটা আবিরকে চমকে দেয়।

– ‘ভালো, তুমি কেমন আছো?’ বলতে একটু সময় নেয় আবির।
– ‘তোমার সময় হবে একটু? কথা ছিলো।’
– ‘এখানে বলবে?’
– ‘না। চলো বাইরে কোথাও গিয়ে বসি।’ রিমির গলায় কোনো দ্বিধা নেই। খানিকটা আনন্দ আছে সেটা টের পাওয়া যায়। ওরা টিএসসি থেকে বের হ’য়ে রিকশা নেয়। রিকশাতেই রিমি আবিরকে জিজ্ঞেস করে সেদিন আবির ওকে কী বলতে চেয়েছিলো।

আবির খানিকটা হাসে। রিমি কেন ওকে আজ তুমি ক’রে ব’লছে সেটা যেন ধ’রতে পারে। ‘যা ব’লতে চেয়েছিলাম তা তো সেদিন ব’লতে দাওনি। আজ আর ব’লে কী হবে?’ – আবির একটু যেন পিছিয়ে আসতে চায়।

‘সেদিন আমার অমন কিছু শোনার প্রস্তুতি ছিলো না। আজ আছে। আজ যদি ব’লতে চাও আমি শুনবো।’ ব’লতে ব’লতে আবিরের হাতে হাত রাখে রিমি। আবির একবার সেদিকে তাকিয়ে নিয়ে রিমির চোখের দিকে তাকায়। সেখানে অনেক কথা। অনেক চঞ্চলতা। অনেক মায়া।

নীলক্ষেতের মোড়ে বেশ ভিড় দেখে ওরা রিকশাটা ছেড়ে দেয়। তারপর একসাথে হাঁটতে হাঁটতে ওরা নিউমার্কেটের দিকে এগুতে থাকে। কখনো কখনো একজনের হাতের সাথে আর একজনের হাত লাগছে। রিমির একবার ইচ্ছা করে আবিরের হাতটা শক্ত ক’রে ধ’রে রাখে। হয়তো সাহসে কুলায় না। ও আবিরের কথা শুনতে থাকে। ‘গত সপ্তাহে প্রথম বেতন পেয়েছি। তারই কিছু টাকা রাখতে এসেছিলাম। এই এ্যাকাউন্টটা তো অনেক দিন ব্যবহার করছি। একটা মায়া প’ড়ে গেছে। অফিস থেকে ব’লেছে নতুন একটা এ্যাকাউন্ট খুলে দেবে।’ – রিমি আর কিছু ব’লছে না দেখে আবিরই ওকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি টিএসসির দিকে এই সময়, কোনো কাজ ছিলো?’

– ‘ঐ স্কলারশিপের খোঁজ নিতে এসেছিলাম।’
– ‘টাকা এলো?’
– ‘খোঁজ নিতে আর পারলাম কই! তুমি বেরিয়ে যাচ্ছো দেখে চ’লে আসতে হ’লো তো!’
– ‘তখন ব’ললে তো দাড়াতাম! আবার যাবে?’
– ‘আজ থাক। তেমন দরকারী কিছু না। কাজ ছিলো না, ভাবলাম একটু খোঁজ নিয়ে যাই। তোমার সাথে যে দেখা হ’য়ে যাবে তা তো ভাবিনি। গত দুই মাস তোমাকে অনেক জায়গায় খুঁজেছি। কেউ বলতে পারে না তোমার কথা।’
– ‘জবটা হঠাৎ ক’রেই পেয়ে গেলাম। হলে আরো কিছুদিন থাকা যেতো। তবে মহাখালিতে একটা মেস পেয়ে গেলাম। ভালোই। অফিসের কাছাকাছি। এর মধ্যে আর এদিকে আসা হয়নি। মহাখালি ওঠার পর আজই প্রথম এলাম। শুধু তোমার সাথেই দেখা হ’লো।’ – রিমি শুনতে থাকে। ‘হলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো। তুমি তো আটকে দিলে!’ – ব’লে আবির রিমির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে থাকে।

– ‘হুউম, দিলামই তো!’ রিমিও সেই হাসিতে যোগ দেয়।
– ‘আচ্ছা আশিকের খবর কী?’
– ‘ভাইয়া খুলনার একটা বিদেশি পাওয়ার কম্পানিতে ঢুকেছে। দুই সপ্তাহ হ’লো খুলনাতে গিয়েছে। আচ্ছা তুমি ভাইয়ার সাথে কথা ব’লো না?’
– ‘শুরুর দিকে বলতাম। পরে আর তেমন একটা বলা হ’তো না। একটা ছোটখাটো গ্যাঞ্জাম হয়েছিলো মিছিলে। আই শুড হ্যাভ সেইড সরি টু হিম। বলা হ’য়ে ওঠেনি।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আবির। রিমির কাছে সেটা লুকানো থাকে না।

আবির দুইটা শাড়ি কিনতে চায়। একটা ওর মায়ের জন্য আর একটা নিশি ফুপুর জন্য। রিমিকে ব’লতেই রিমি ওকে ব’ললো, ‘চলো আমি তোমাকে দেখে দিই।’

– ‘চলো।’
– ‘আমাকেও একটা কিনে দাও না?’ ব’লেই রিমি অন্য দিকে তাকায়। আবির হেসে ফেলে সেটা দেখে।
– ‘আচ্ছা, চলো’। ব’লে আবির রিমির হাত ধরে। খুব স্বাভাবিক সেই হাত ধরা। রিমি একটা হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি পছন্দ করে। কেনাকাটা শেষে আবিরকে দ্রুত মহাখালি যেতে হবে। আজ বিকালের একটা গাড়িতে ও চুয়াডাঙ্গা ফিরবে। অনেক দিন পর নিশি ফুপু দেশে এসেছে। ওনার সাথে আবিরের আগে কখনো দেখা হয়নি।

আবির বাসে উঠে পড়ে মহাখালি ফেরার জন্য। আর রিমি রিকশা নেয় নিউমার্কেটের সামনে থেকে। সেগুন বাগিচার দিকে রিকশা আগাতে থাকে। রিমির মাথায় অনেক ভাবনা। মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালো লাগা। আর মনে হ’তে থাকে বিদায় দেওয়ার আগে আবিরকে যদি একবার জড়িয়ে ধরা যেতো।

বাসায় ঢুকেই রিমি জানতে পারে মা আগেই বাসায় চ’লে এসেছে আজও। মা সাধারণত এই সময় বাসায় ফেরে না। কাজের লোক রিমিকে জানায় যে আজ ফেরার পর মাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। এসেই শুয়ে পড়েছে। আর ডাকতে নিষেধ করেছে। রিমি একবার মায়ের ঘরে ঢু দিয়ে দেখে। মায়ের গায়ে তখনো বাইরের কাপড়। রিমি মাকে আর জাগায় না। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভিজিয়ে দেয়। আবিরের দেওয়া শাড়িটা একটু নেড়েচেড়ে দেখে। ঠিক ক’রে ফেলে যে আগামী মঙ্গলবার যখন আবিরের সাথে আবার দেখা হবে সেদিন এই শাড়িটা প’রে যাবে। তার আগেই ব্লাউজটা বানিয়ে ফেলতে হবে। কালই দর্জির কাছে যেতে হবে।

শাড়ির প্যাকেটটা অয়াড্রবে তুলে রেখে রিমি ওয়াশরুমে ঢোকে। মুখে পানি দিতেই দরজায় কাজের লোকের টোকা, ‘আপা তাড়াতাড়ি আসেন। খালাম্মা যেন কেমন করতেছে!’ শুনে মুখের পানি তাড়াতাড়ি মুছে রিমি ওর মায়ের ঘরে দৌড়ে আসে। কেয়া জানায় যে বুকে বেশ ব্যথা করছে। মায়ের গায়ে হাত দিয়ে রিমি বুঝতে পারে বেশ জ্বর। ‘জ্বর কখন থেকে মা?’ রিমি জিজ্ঞিস করে।

-‘কাল দুপুর থেকে। প্যারাসিটামল তো খেলাম।’
-‘আর বুকের ব্যথা?’
-‘কাশি হ’লে ব্যথা করছিলো কয়েকদিন। আজ বেশি ব্যথা করছে।’
-‘রফিক আঙ্কেলের সাথে কথা বলেছো?’
-‘না।’
-‘দাড়াও আমি একটা ফোন দিই আঙ্কেলকে।’ বলে একটা ড্রয়ার থেকে থার্মোমিটার বের ক’রে বেসিন থেকে সেটা ধুয়ে আনে রিমি। কেয়ার মুখের ভেতরে সেটা দিয়ে রিমি অপেক্ষা করে। জ্বর মেপে নিয়ে রিমি ডক্টর আসাদ রফিকুল্লাহকে ফোনকল দেয়। উক্টর আসাদ রিমির বাবার ছোটবেলার বন্ধু। এখন পিজির কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টে আছে। পারিবারিক যোগাযোগ থাকায় ওরা সহজেই যোগাযোগ করতে পারে। উক্টর আসাদ ছয়টার পরে ওনার চেম্বারে আসতে বলে। রোগী না দেখে কোনো ওষুধ দেয় না।

কেয়া রিমিকে ওর পাশে ব’সতে বলে। রিমি খাটের উপর পা তুলে দিয়ে ওর মায়ের মাথার কাছে বসে। মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে রিমি খেয়াল করে চোখ বন্ধ ক’রে কষ্ট সহ্য করার চেষ্টা ক’রে যাচ্ছে মা। রিমি সেদিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। একটু পর উঠে গিয়ে বাবাকে ফোনকল দেয়। জহিরুদ্দিন সিরাজী সবকিছু শুনে তৈরী হ’য়ে থাকতে বললো রিমিদের। গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে। এখনই যেন পিজির ইমারজেন্সিতে চ’লে যায়।

মিনিট বিশেকের ভেতরেই গাড়ি চ’লে আসে। গাড়িতে ওঠার সময়ও মাকে ধ’রে রাখে রিমি। পিজির ইমারজেন্সির ডাক্তার কেয়াকে প্রাথমিক প্ররীক্ষা ক’রে হাসপাতালে ভর্তি হ’য়ে যেতে বলে। কিছু প্যাথলজিক্যাল টেস্ট দেয়। কিছুক্ষণের ভেতরে ডক্টর আসাদ কেবিনে দেখা করতে আসে। টেস্টগুলোর রেজাল্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা ক’রতে বলে রিমিকে।

অফিস শেষ হ’তেই জহিরুদ্দিন সিরাজী হাসপাতালে চ’লে আসে। কেয়া তখন ঘুমাচ্ছে। চেহারায় বেশ একটা ক্লান্তির ছাপ। জহিরুদ্দিন ড্রাইভারকে কিছু খাবার আনার কথা ব’লে ডাক্তারদের সাথে কথা বলার জন্য বেরিয়ে যায়। ততক্ষণে সিনিয়র ডাক্তারদের সবাই বেরিয়ে গেছে। শুধুমাত্র ডিউটির ডাক্তাররা আছে হাসপাতালে। তারা কেউই টেস্টগুলোর রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিছু ব’লতে পারবে না। ইমার্জেন্সির যে ডাক্তার দেখেছিলো তাকে পাওয়া গেলো। সেও নিশ্চিত ক’রে কিছু বলতে পারে না। রোগীর শারীরিক অবস্থা দুর্বল দেখে এ্যাডমিট হ’তে ব’লেছে।

জহিরুদ্দিন সিরাজী ডক্টর আসাদ রফিকুল্লাহর চেম্বারে ফোনকল দেয়। এখনো চেম্বারে এসে পৌছায়নি উক্টর আসাদ। জহিরুদ্দিন কেবিনে ফিরে এসে দেখে ড্রাইভার এর ভেতরেই ফিরে এসেছে। অনেকগুলো ফলমূল এনেছে। রিমি সেগুলো সাজিয়ে রাখছে।

রাতে কেয়ার সাথে জহিরুদ্দিন সিরাজী হাসপাতালে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর রিমিকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ‘আমার জন্য এক সেট রাতের কাপড় পাঠিয়ে দিস তো মা। আর তোর মায়েরও কিছু। সাথে তো আর কোনো কাপড় আনেনি। আর খাবারের জন্য আমি সাতটার পরে ফোন দিবো। এখন বাসায় গিয়ে তুই একটু রেস্ট নে। আমি দেখছি এইদিকটা।’

রিমি বাসায় ফিরে আসে। বাবার কথা মতো কাপড়চোপড় পাঠিয়ে দেয় ড্রাইভারের মাধ্যমে। কেয়া রাতে মুরগীর মাংসের ঝোল দিয়ে আটার রুটি খেতে চেয়েছে। কাজের বুয়া সেগুলো বানানো শুরু করেছে। বাবাও মাংস-রুটি খাবে।

রাতে রিমির একবার আশিকের কথা মনে পড়ে। আশিক এখন খুলনাতে। গত সপ্তাতেই একটা পাওয়ার প্লান্টে যোগ দিয়েছে আশিক। সেই অফিসের একটা ফোন নাম্বার দিয়ে গেছে আশিক। রিমি সেটাতে কল করে। আশিকের শিফট শেষ হয়েছে আগেই। ওকে তাই পাওয়া যায় না। তবে যে লোকটা ফোন ধরে রিমি তাকে ওর মায়ের অসুস্থতার কথা ব’লে খবরটা আশিককে জানানোর অনুরোধ করে।

রাত সাড়ে দশটার দিকে আশিকের ফোন-কল আসে। ‘ভাইয়া, আমার বেশ ভয় ক’রছে। সিরিয়াস কিছু না হ’লে ডাক্তারদের তো বলার কথা।’ রিমির গলা বেশ আর্দ্র।

-‘সিরিয়াস কিছু নাও তো হ’তে পারে। মা কয়েকদিন বেশি কাজ করছিলো। আমি আসার দিনও ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। ঠিকঠাক মতো খাওয়া আর যত্ন পেলে দেখিস ঠিক হ’য়ে যাবে।’ রিমিকে ভরসা দিতে চায় আশিক।
-‘মার তো সহজে তেমন অসুখ-বিসুখ হয় না। এই জন্য হয়তো ভয় লাগছে। আচ্ছা দেখি। তুমি ফোন দিয়ে খবর নিয়ো। আমি একটু ঘুম দিই। ক্লান্ত হ’য়ে গেছি।’
-‘আচ্ছা। খেয়েদেয়ে ঘুমাস কিন্তু।’
-‘আচ্ছা।’

সারাদিনের ক্লান্তির জন্যই হয়তো বিছানায় শুতেই রিমির চোখে ঘুম চ’লে আসে। তবে টানা ঘুম হয় না। মাঝ রাতে একবার উঠে পানি খায় রিমি। তখন আবার বিছানায় শুতে শুতে ওর মনে হয়, ওর সাথে আবির থাকলে ভালো হ’তো।

(চলবে)