বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৫

যদি চ’লে যেতে পারি তবে থাকবো কেন?
কতটুকু দিতে পারো তুমি তা তো জেনে গেছি এতদিনে,
আর যতটুকু নিতে পারি নিয়েছি তার সবই।
তার উপর চারপাশের যা কিছু প্রলুব্ধ করছে প্রতিনিয়ত
তার মোহ কেমন ক’রে ছেড়ে দিই!
কিংবা ছাড়বোই বা কেন?
তোমার সঙ্গ এরই ভেতরে একঘেয়ে হ’য়ে উঠেছে-
আমাকে যে টানছে বৈচিত্র্য তা হয়তো তুমি বোঝোনি কখনো-
আর তার দায়ই বা আমি নেব কেন?
আমাকে টানছে অচেনা কোনো সঙ্গী- তার অদ্ভুত অজানা-সঙ্গ,
বহু দূরের এক মায়বী নদীর জল হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রতিক্ষণ,
আমাকে ডাকছে জনহীন নামহীন কোনো এক বালিয়াড়ি-
আমি যাবো তাই চ’লে, সিদ্ধান্ত নিশ্চিত;
আলিঙ্গন করবো এতদিনেও হয়নি চেনা এমন উত্তেজনা
আমি তাই উৎফুল্ল আজ তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার বাসনায়
তুমি তো জানো আমাদের আর কিছু পাওয়ার নেই
পরস্পরের কাছ থেকে-
আমাদের আর কিছু দেওয়ার নেই পরস্পরকে,
আমাদের এই বর্তমান অতীতের পুনরাবৃত্তি শুধু-
আহ! কি দুর্বিসহ ভেবে দেখো তো একবার!
অথচ চাইলেই আমরা এর সব ছাড়তে পারি-
সামনে প্রশস্ত পথ, প্রয়োজনীয় কড়িও পকেটস্থ
চাইলেই ধরতে পারি নতুন স্বপ্ন-
আবার বুনতে পারি নতুন জাল-
আবার বিধতে পারি নতুন শিকার-
আহা! কি উত্তেজনা! আহা!
এই থেকে যাওয়াতে যেটুকু স্বস্তি আছে, যেটুকু আনন্দ আছে
তার সবই পুরোনো, একঘেয়ে আর চেনাচেনা!
তোমার কি মনে হয় না কখনো,
এমন থেকে যাওয়াতে পরাজয় ছাড়া আর যেন কিছু নেই?
চলো ছড়িয়ে পড়ি, চলো ছেড়ে যাই-
সামনের সমস্ত সুযোগ মুঠো ভ’রে নিই আজকে-
চলো সুখি হ’ই আবার দুইজনে…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৪

আজও কি তোমার অভিমানের সারাদিন?
জানো! এখানে আজ আকাশটা রোদহীন,
দক্ষিণের গাঢ় জলের সমুদ্র
একটু একটু ক’রে আবারও হ’য়েছে রুদ্র-
উপকূলে তাই বৃষ্টি সবিরাম,
নকশি কাঁথার ভাজে খুঁজি আলসে আরাম!
বুঝি সমাগত বহু কাঙ্ক্ষিত বসন্ত-
শীতের উপদ্রব তবে কি নিঃশেষ এবারের মতো?
সতর্ক পরিযায়ী যত পাখি,
আবারো উত্তর দিকে ফিরবে নাকি!
চারপাশে ধুলো, ঝড় আর এলোমেলো উষ্ঞতা-
থেকে থেকেই অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা
ফেনিয়ে ওঠে আমাদের পুরোনো ছিন্ন পালে।
কে যেন হঠাৎ হাসে অট্টহাসি মনের খেয়ালে!
একি স্মৃতি নাকি দূর-কল্পনা?
কেউ তা কখনো জানবে না, জানতে চাইবে না…
তবুও তোমার অভিমানের আঙিনায়
নতুন ফাল্গুনদিন যেন ঘটনাবিহীন না যায়।

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৩

কোনো কোনো সর্বগ্রাসী একলা থাকার দিনে
পুরোনো কিছু দুঃসহ স্মৃতি ঝেড়ে ফেলা যায়,
গভীর ভাবে জেনে নেওয়া যায় এমন কিছু
যা নিয়ে কখনো জাগেনি প্রশ্ন সচেতন মনে-
যে থাকতে চায় জীবনের দিনরাত্রির ঘনঘটায়
আর যার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ের খুব কাছে পৌঁছার,
তাদের বাস যেন একেবারে বিপরীত জগতে!
এমনতরো বোধের দিনে বোখে যাওয়া যায়;
ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতিও যখন জাগায় প্রগাঢ় স্বস্তি!
আর প্রিয়তম আকাঙ্ক্ষার পুনঃপুনঃ অত্যাচারে
উপসম হয় পুরোনো যত পরাজয়ের শোক;
তখন নিজে নিজেই একটু হেসে নেওয়া যায়-
অতীত ভাগ্যিস অভিজ্ঞতার বেশি কিছু নয়!

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২২

যে আমি স্বপ্ন দেখি, যে আমি মেহন করি
যে তুমি স্বপ্ন ভাঙো, যে তুমি ছলনাময়ী
যে আমি লোভী, প্রতারক, মিথ্যেবাদি
যে তুমি ভঙ্গুর, সদা মনোযোগ-আকাঙ্ক্ষী…
এমন আমরা পলায়নে মুক্তি পারো নাকি!
পাবো না, পাবো না, পাবো না…
পাবে না, পাবে না, পাবে না কখনই…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২১

আবারো প্রয়োজনীয় প্রেম তার ভোল পাল্টে নেবে
খুঁজে নেবে অনাঘ্রাত হৃদয় বর্তমানের চালান থেকে
দক্ষ ব্রীড়াময়ী হাসি দিয়ে পাতবে অব্যর্থ ফাঁদ।
তারপর প্রথমবারের মতো আহত কোনো হৃদয়
নিজেকে সামলে নিয়ে বদলে নেবে পুরোপুরি…
হয়তো চিরতরের জন্য, হয়তো নিজেরই জন্য…
একটু একটু ক’রে শিখে নেবে আদিম যত দক্ষতা
শরীর ছেনে গ’ড়ে তুলবে নতুন প্রেম-
ক্লিশে সজ্জায় ডুবে থাকা কোনো অবয়ব দেখে
ক্ষণিক থমকে মুগ্ধতার ভান ক’রে এগিয়ে যাবে।
মিথ্যে সে ভান যদিও ঠিক বুঝবে অভিজ্ঞ চোখ
তবুও তাতেই মজবে চিরঅতৃপ্ত কোনো আত্মা-
যে জেনেছে- প্রেম বড় জটিল এক দক্ষতা,
তার কৌশল যে জেনেছে সে বড় অদ্ভুত জাদুকর
বারবার তাকে নতুন ক’রে সাজাতে হবে পসরা;
শুধু পাল্টে নিতে হবে কোনো রং, কোনো ডিটেইল-
ভুলে যেতে হবে পুরাতন যত সাজানো মায়া।
বলিরেখাগুলো শুধু রাখবে তুলে পরাজয়ের যত চিহ্ন…

তুমি কখনোই নিশ্চিত ক’রে পারো না ব’লতে

অল্প বয়সে প্রেমের বিয়ে, মুরুব্বিরা তবু নিয়েছিলো মেনে।
মনে হ’য়েছিলো সবুজ আসলেই বেসেছিলো ভালো যুথিকে,
তারপর ব’লেছিলো ‘কবুল’ যুবক বর আর যুবতী কনে।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, ‘কি যে আছে ভবিষ্যতে-
কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা কেউ পারে না ব’লতে!’

একটা দুইরুমের এ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে ওরা পেতেছিলো ঘর,
কিছু সস্তায় কেনা আসবাব আর অল্প কিছু পাওয়া উপহার,
ওয়ালটনের ফ্রিজ ভরে থাকে দেশী মাছ আর কাগুজে লেবুতে,
ইচ্ছে মতো গলা ভেজানো যায় মিষ্টি ঠাণ্ডা সরবতে,
আর রাতে টিভি দেখতে দেখেতে খাওয়া- আহা কি মধুর!
এরপর দুইজনা চাকরী পেলে আরো গুছিয়ে ওঠে সংসার।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, ‘কি যে আছে ভবিষ্যতে-
কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা কেউ পারে না ব’লতে!’

একটা ক্যাসেট-প্লেয়ারও ছিলো ওদের, বাজাতো উচ্চস্বরে প্রায়
বেশ ভালো সংগ্রহ- রবীন্দ্র-শচীন থেকে জেমস-বাচ্চু কি নেই!
কিন্তু কোনো কোনো রাতে আর
উঠতো না বেজে সেই ক্যাসেট প্লেয়ার।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, ‘কি যে আছে ভবিষ্যতে-
কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা কেউ পারে না ব’লতে!’

ওরা ঠিক করে বছরপূর্তিতে ঘুরতে যাবে কক্সবাজারের সৈকতে
গ্রিনলাইনের নতুন গাড়ি ওদেরকে নিয়ে ছাড়ে গভীর রাতে,
সুন্দরতম যুথির সাথে সেখানে দারুন কাটে সময় সবুজের
দীর্ঘতম সৈকতের পাড়ে ওরা আরো কাছে আসে পরষ্পরের।
‘আহা জীবন!’ আওড়েছিলো মুরুব্বিরা, ‘কি যে আছে ভবিষ্যতে-
কখনোই নিশ্চিত ক’রে তা কেউ পারে না ব’লতে!’

নোট : চাক বেরির ‘য়ু নেভার ক্যান টেইল’ অবলম্বনে…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২০

বিগত বছরের শেষ দিকে তার সাথে হ’য়েছিলো দেখা
পথের প্রান্তে অবেলার অচেনা আলোকে আচমকা…
তারপর কিছুদিন বাস্তবতা, স্বাভাবিক প্রত্যাশাহীনতা।
কোনো এক শরতের গোধূলির রহস্য মুখে মেখে
আবার সে এসেছিলো একবার আমাদের চেনা মেঠোপথে
জোনাকির ভীড়ে তাদেরই দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো নিমেষমাত্র!
অথচ জীবন ডেকেছিলো আমাদেরকে অন্যত্র-
হৃদয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও আমরা ফিরে এসেছি সেদিন
যে যার জীবনে… সে সব স্মৃতি আজ বড্ড প্রাচীন,
তবুও মন প্রতারক, হৃদয় হৃদয়-হন্তারক !

কি কথা যায় বলা তাকে

কি কথা যায় বলা তাকে!
যে আসে মুহূর্তের ঝড়ের মতোন চারপাশে নামিয়ে অদ্ভুত আঁধার,
কিংবা হঠাৎ প্লাবনের মতো ভাসিয়ে আদিগন্ত চরাচর-
জানে কি তা প্রাচীন শিলাবাসী কোনো জীবাশ্ব?
কেমন ক’রে তারে করা যায় প্রতিস্পর্শ!
প্রথম আবেগে ছুঁয়ে দিয়ে যে অবশ ক’রে দেয় শরীর,
তার নরম পালকের মতো হাতে যদি লাগে আমার নখের আচড়!
তারে কেমন ক’রে বুকের কাছে টানি?
কেমন ক’রে ব’লি তারে, এই নাও আমার হুদয়খানি-
তোমারই আগমনের ব্যাকুলতায় আমার কেটেছে সমস্ত অতীত?
তারে কি বলা যায় হঠাৎ-
বিগত ঝড়ের ঝঞ্ঝায় এখনো যেটুকু টিকে আছে সঞ্চয়-
তাতে বড় অনিশ্চিত আগামী। মনে নিত্য ভয়-
সংশয় হারাবার নিজেকেই নিজের কাছ থেকে,
যাকে তিলেতিলে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে বিগত মারীতে, শোকে;
খড়কুটোর সাথে ভেসে পেরুতে হয়েছে কতগুলো জলোচ্ছ্বাস,
রুক্ষ জীবনের স্মৃতি কেড়ে নিয়েছে যার সবটুকু বিশ্বাস…
তার সবটা অনুভূতির কথা কি জানানো যায় তারে,
যে আসে শুধু ক্ষণিকের তরে?
বাকিটা জীবনের সমান পরিমাণ সময় নিয়ে হাতে
কেউ কি আসে কখনো হৃদয়ের সমস্তটা নিয়ে আদর নিতে- দিতে?
ইত্যবসরে কতটা গল্প যায় করা তাকে?

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৯

হয়তো একদিন আমিও ঝিনুক হবো
শক্ত খোলসে লুকিয়ে রাখবো কষ্টে বোনা মুক্তো আমার
অন্তত কিছু দিনের জন্য হ’লেও
তোমাদেরকে পুড়তে হবে তারে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণায়
আমি হয়তো হরিয়ে যাবো কোনো একদিন
মারিয়ানা ট্রান্সের গভীরতম গহ্বরে
আমাকে চূর্ণ করবে অথৈ জলের শক্তি
তখন হয়তো হবো আমি শুধু মুক্তোর স্মৃতি…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৮

আমাকে ভালোবেসেছিলো আকাশ, নিলীমা
আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলো ভাঙনপ্রিয় যমুনার তীর
একবার এক নিঃস্ব যুবক নৌকো বেয়ে এসেছিলো সেখানে
শুনিয়েছিলো নদীর কাছে তার সব হারানোর গল্প
আর গল্প শেষে আমাকে নিয়েছিলো টেনে তার বুকে
আমি সেখানে তন্নতন্ন ক’রে খুঁজেছি হারানো ভালোবাসা
মুহূর্তে মনেও হয়েছিলো পেয়েছি বুঝি –
কিন্তু যার কাছে যা নেই তা সে দেবে কেমন ক’রে!
কেমন ক’রে বুঝি সে পারে দিতে শুধু ক্ষণিকের সঙ্গ?
তার বৈঠায় প্রতিনিয়ত জোয়ারে ভাসার আকাঙ্ক্ষা
আর আমার আলিঙ্গনে তাকে বেঁধে রাখার ছলনা।
পালিয়ে গিয়ে হয়তো জীবন পেয়েছিলো সে-
কেঁদে পার করেছিলাম পুরো একটা দুপুর সেদিন
সে রাতেই আবার ভাঙতে শুরু করে পাড়
তল্পিতল্পা দ্রুত গুছিয়ে পাড়-ভাঙা মানুষের মিছিলে আবার
সেখানে আমার হাত ধ’রেছিলো এক স্বাবলম্বী পুরুষ
পোড়খাওয়া মধ্যবয়স্ক এক নিঃসঙ্গ প্রাণ
আমাকে সুখেই রেখেছিলো সে সংসারে…
একবার তবু অদ্ভুত গোধূলি আকাশ, নিলীমা নয় রক্তিম
কি এক অবুঝ নিয়মে আমারে ক’রে তোলে উতলা অন্তিম!