গল্প

চক্র

দুঃস্বপ্নটা আমি আজো দেখি। বারবার দেখি। অথচ আমার স্ত্রী আর সেটা জানে না। আমিই এখন আর জানাই না। কতবারই বা বলা যায় সেই একঘেয়ে পুরোনো গল্প। ওরও যে বারবার শুনতে তেমন ভাল লাগে না- সেটা টের পাই। কিন্তু ও চায় না- আমি সেটা টের পাই। আমি চাই না, আমি যে টের পাচ্ছি সেটা জানাতে। আর তাই যদি কোনো রাতে আবার আমার ঘুম ভেঙে যায়, আমি আর ওকে জাগাই না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। কোনো দিন হয়তো উঠে গিয়ে একটু পানি খেয়ে এসে আবার শুয়ে পড়ি। অনি সেটা জানতে পারে না।

অনি, মানে আমার স্ত্রী। ওর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল ১৭ বছর আগে। ধর্ম মতে। যদিও আমরা কেউই তেমন একটা ধার্মিক ছিলাম না। তবুও আমরা ধর্মমতেই বিয়ে করেছিলাম। এ ছাড়া অন্য কোনো ভাবে বিয়ে করা যায় ব’লেও আমাদের জানা ছিল না। আমরা এটা নিয়ে খুব একটা ভাবিওনি তখন। ভাবার অবকাশও ছিল না। যা কিছু হয়েছিল- হয়েছিল খুব দ্রুত। যেন সবকিছু ঘটেছিল কল্পনাতে। আর সেজন্যই হয়তো আমার স্মৃতিগুলো সব মেলাতে পারি না। কিন্তু আমার মেলাতে ইচ্ছা করে। যেদিন ইচ্ছাটা একটু বেশি করে সেদিনই আমি দুঃস্বপ্নটা আবার দেখি। দেখি আমরা পালাচ্ছি। আমাদের পেছনে অনেক মানুষের চিৎকার। আমি কারো কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। আবার চারপাশটা কেমন যেন অন্ধকার। যেন সন্ধ্যা হয়-হয়। আমি সব কিছু দেখতে পারছি না। কিন্তু হয়তো দেখেছিলাম। অন্তত যেটুকু না দেখলেই নয়। তাই পালাতে পেরেছিলাম। কিন্তু মানুষ কি শেষ পর্যন্ত পালাতে পারে? আমি কি পেরেছি? অনি কি পেরেছে?

হয়তো পেরেছে। ও খুব শক্ত মেয়ে। কিন্তু পালাতে ও চায়নি। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিল যেন আমাদের পালাতে না হয়। এখন ও চেষ্টা করে যেন ওর মেয়েটাকে, আমাদের মেয়েটাকে, যেন পালাতে না হয়। মেয়েটা এখনো অতটা বড় হয়নি। তবুও ওর ভয় হয়, মেয়েটা যদি পালায় ! কিন্তু আমাকে সেটা বলতে পারে না। আমি টের পাই। তবুও আমি কিছু বলি না। বলার মতো কিছু খুঁজে পাই না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমিও শঙ্কিত হ’য়ে উঠি। কারণ ওকেও পালাতে হবে। না পালিয়ে যে ওর উপায় নেই।

 

 

গল্প

কিছুটাতো চাই …

১.
রাত অনেক হয়েছে। অথচ জীবনের ঘুম আসছে না। এমন হলে জীবন সাধারণত কবিতার বই টেনে নেয়। খানিকটা পড়ে। আবার পড়ে না। কয়েক পাতা উলটে আবার খানিকটা পড়ে। ভাল লাগলে কোন লাইন হয়তো আর একবার পড়ে। এই করতে করতেই রুদ্রর কয়েকটা লাইনে হঠাৎ করে আটকে যায় জীবন –

 … প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা-
এই খেলা আর কতকাল আর কতটা জীবন !
কিছুটাতো চাই – হোক ভুলহোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই,
কিছুটাতো চাইকিছুটাতো চাই…

জীবনের অনেক পাওনা বাকি। আবার জীবনের কাছেও অনেকের পাওনা আছে। অনেক লেনাদেনার হিসেব বাকি। সে হিসেব হয়তো কোনদিনই মিলবে না। তাই নিয়ে জীবন খুব একটা ভাবে না। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ভাবতে ভালওবাসে। সে ভাবনায় কোন হিসেবের গরমিল থাকে না। প্রাপ্তির অনটন থাকে না। থাকে শুধু চাওয়া। অথচ আজ রাতে জীবন থমকে যায়। ওর যেন কোনো চাওয়া নেই। ঠিক যেমন ওর চোখে আজ ঘুম নেই…

সকাল বেলা রাতের এই সব ঘটনা আর মনে থাকে না। অথবা মনে থাকে। আর থাকে বলেই পরবর্তী কোন রাতে হয়তো আবার তারা ফিরে আসে। এমন হ’লে জীবন কখনো কখনো তার কোনো ঘনিষ্ট বন্ধুকে ফোন করে। পুরোনো কোন বন্ধু। যার সাথে অনেক দিন কোনো যোগাযোগ নেই। হয়তো গহনের কথা মনে পড়ে। কিন্তু ফোন দেয় সুমনকে। কারণ গহনের ফোন নাম্বার আজ আর ওর কাছে নেই। সুমন এত রাতে ফোন পেয়ে বিরক্ত হয়।

হ্যাঁ বল, কি হইছে?” “>সুমনের কন্ঠে ঘুমের জড়তা। ” না এমনিই..” জীবন খানিকটা ভয়ে ভয়ে বলে, ”তুই ঘুমাইতেছিস, ঘুমা… পরে বলব..”

“শালার চোৎমারানী, রাইত দুপুরে ফোন দিয়া ছিনালী ! যত্তসব… ” গজগজ করতে করতে ফোন রেখে দেয় সুমন। জয়িতার ঘুমও ভেঙে যায়, “কে? এত রাতে?.. “কিছু না- জীবন। তুমি ঘুমাও।” সুমনের কথায় জয়িতা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সুমনও।

পরদিন বিকালে চায়ের দোকানে যখন সুমনের সাথে জীবনের দেখা হয় তখন আর এই নিয়ে কোনো কথা হয়না ওদের মধ্যে। অথবা কিইবা বলার থাকবে ওদের? জীবন জানে সুমন এমনই। সুমন জানে জীবনের মেয়েটা মরে যাওয়ার পর থেকে জীবন পালটে যাচ্ছে। আবার ওকে দেখে রাখতে পারতো যে লোপা সেও নেই। অনেকটা যেন থেকেও নেই।

২.

রনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকে। আজ শফিক স্যার একেবারে খেয়ে ফেলবে। একে বাসা থেকে বের হতে দেরী হয়ে গেছে। তার উপর বাসের দেখা নেই। নয়টা বাজতে আর মাত্র আঠারো মিনিট বাকি। পল্টন যেতে কম করে হলেও চল্লিশ মিনিট লাগবে। রনি রিকশা খুঁজতে থাকে। ভেঙে ভেঙে যদি যাওয়া যায়। একটা রিকশা পেয়েও যায় রনি। চৌধুরী পাড়া ক্রস করতেই শফিক স্যারের ফোন। রনি চমকে ওঠে। খানিকটা ভয়ে। খানিকটা অনিশ্চয়তায়। ফোন ধরতেই, ”রনি, তুমি তাড়াতাড়ি টঙ্গী চলে যাও তো। ঢাকা ডাইং এর আজিজ সাহেবের সাথে দেখা করে আমাকে একটা ফোন দিও। আমাদের রঙের স্যাম্পলটা ওকে করেছেন আজিজ সাহেব।” “ঠিক আছে স্যার আমি এখনই যাচ্ছি।” রনির কণ্ঠে বাড়তি তৎপরতা। তাড়াতাড়ি রিকশা ঘুরিয়ে দেয় মহাখালির দিকে। যে ভাগ্যকে রনি সব সময় গাল দিয়ে এসেছে তাকেই আজ কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকে।

ঢাকা ডাইং এর মতো পুরোনো কারখানাতে ঢুকতে পারা সহজ কথা নয়। রাতুলের সাথে রনির সেদিন দেখা না হলে হয়তো এই সুযোগটা পাওয়াই হতো না। রাতুল, রনি, জিকো, মুরাদ আর বাবলা ছিল স্কুলের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক মুরাদ ছাড়া আর কারো সাথে রনির অনেকদিন কোন যোগাযোগ নেই। মুরাদের সাথে কি রাতুলের যোগাযোগ আছে? রাতুলের সাথে সেদিন যে সামান্য সুযোগ হয়েছিল তাতে সে কথা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। বরং রাতুলই জিজ্ঞেস করছিল বিভিন্ন কিছু। কি করছিস? কোথায় আছিস? এই সব। রাস্তায় দাড়িয়ে আর কত কথা বলা যায়? রাতুল তাই ওর ফোন নাম্বার নিয়ে -পরে কথা হবে, আজ আসি রে দোস্ত, বলে মোটর সাইকেল বাড়িয়ে দিল।

সেদিন রাতেই রাতুল ফোন দিয়েছিল রনিকে। তখনই নানা কথায় রাতুল জানতে পারে সুইস কালারের কথা। এই রঙের ব্যবসা প্রতিষ্ঠাণে চাকরী করে রনি। দুই বছরের বেশি হতে চলল। কাজের চাপটা একটু বেশি হলেও স্যালারীটা ভাল দেন শফিক আহমেদ। তবে কাজে গাফিলতি হলে কথা শোনাতে কম যাননা এই দক্ষ রং ব্যবসায়ী। সেলস ম্যানেজারদের কেউ যদি নিজে থেকে কোন চালানের যোগাযোগ করে দিতে পারে তাকে বাড়তি কমিশনও দেন শফিক আহমেদ। রনি দেখে শফিক সাহেবের নাম রাতুলের জানা। তবে তার সাথে রাতুলের পরিচয় নেই। রাতুলই দুই দিন পরে রনিকে আজিজ সাহেবের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। অর্ডারটা যে হয়ে যাবে রনি এতটা আশা করেনি। যদিও অর্ডারের পরিমাণটা যে কত সেটা রনি জানে না এখনো।

এদিকে রিকশা মহাখালি এসে পৌছে। রনি গাজিপুরের একটা বাসে চড়ে বসে।

৩.

অবসরে যাওয়ার পর থেকে ইদ্রিস ভুইয়ার স্বভাবটা কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। ইদ্রিস সাহেবের স্ত্রী সুরাইয়া আখতার রাখি ঠিক ধরতে পারেন না। আবার কখনো যেন পারেন। কখনো মনে হয় ইদ্রিস যেন একটু বেশি কথা বলছেন। কখনো মনে হয় অতিরিক্ত চুপচাপ। রাখি ঠিক করেন, আজ অফিস থেকে ফিরে মিম আর পিয়ালের সাথে এই নিয়ে কথা বলবেন।

গল্প

তখন সূর্যাস্তে

১.
পানিটা শেষ ক’রে গ্লাসটা ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতে ইকবাল একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। বারটা সাইত্রিশ। ঝিনুকের এর ভেতরে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এখনো জেগে আছে। মেয়ের ঘর থেকে হাসাহাসির শব্দ আসছে। ইকবাল নন্দিনীর ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আর তখনই মুঠোফোন বেজে ওঠে। ধুর এত রাতে কে আবার! ইকবাল স্টাডি রুমে ফিরে আসে।

সিদ্দিক সাহেবের কল, ’কাল একবার বাসায় আসতে পারবে? তোমার মায়ের দাফন।’ ইকবালের যেন কী হয়। একটা কথাও বলতে পারে না। বেশ খানিকটা সময় পর শুধু বলতে পারে, কখন? সিদ্দিক সাহেব বলেন – আসরের পর। ‘না না বাবা, মা মারা গেছে কখন সেটা জিজ্ঞেস করছিলাম..’ ইকবাল সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে।

রাত আটটায়। এখন বাড়িতে আনলাম। একটু সময় নেন সিদ্দিক সাহেব, ঝিনুক আর দাদুকে নিয়ে এসো- তখন কথা হবে । এখন রাখি – এই বলে সিদ্দিক সাহেব রেখে দেন।

ইকবাল কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। নন্দিনীর ঘরের দরজায় গিয়ে যখন দাড়ায় তখন মা-মেয়ে দুই জনই চুপ। নন্দিনী হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। ঝিনুক খাট থেকে নামতে গিয়েই খেয়াল করে ইকবাল দাড়িয়ে আছে। ‘কি ঘুমালো?’

হ্যা, ঘুমিয়েছে। চলো, তোমার গলা শুনলে আবার না উঠে পড়ে।

ইকবাল তারপরও মেয়ের কাছে যায়। কপালে হাত বুলিয়ে দিতেই মেয়ে চোখ তুলে তাকায়। ঠিক যেন ওর মায়ের চোখ। ঝিনুক চেচিয়ে ওঠে- আমি পারব না বাবা, এবার তুমি ঘুম পাড়াও। আমি শুতে গেলাম। ঝিনুক উঠে গেলে ইকবাল কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। নন্দিনী ততক্ষণে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমিয়ে গেছে।

শোবার ঘরে আসতেই ঝিনুক জড়িয়ে ধরে ইকবালকে। ধরেই যেন টের পায় কিছু একটা, কিন্তু ঠিক ধরতে পারে না। ওর চোখে চোখ পড়তেই থমকে যায় ঝিনুক – কী হয়েছে তোমার? ঝিনুককে যেন আরো খানিকটা জড়িয়ে ধরে ইকবাল, আটটার সময় মা মারা গেছে ঝিনুক।

কিছুটা সময় দুজনই চুপচাপ দুজনকে ধরে থাকে। ইকবালের চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে ঝিনুকের কাধে। এই প্রথম ঝিনুক ইকবালকে কাঁদতে দেখল।

রাশিদার দ্বিতীয় সন্তান ইকবাল। মেয়ে লোপামুদ্রার থেকে ছেলের প্রতিই যেন ভালোবাসাটা বেশি। অন্তত লোপামুদ্রার তাই ধারণা। সুযোগ পেলে মাকে সেটা সে জানিয়েও দেয়। লোপামুদ্রা হয়তো কিছু একটা চেয়েছে। মাসের প্রায় শেষ। রাশিদার একটু গড়িমসি না করে উপায় নেই। অথচ নাছোড় মেয়ে তা বুঝতে চাই না। বলে বসে, ছেলে চাইলে তো ঠিকই সাথে সাথে কিনে দিতে। রাশিদা ধমক দিতে গিয়েও দেন না। সিদ্দিকের জন্য। ছেলে-মেয়েরা যত দুষ্টামিই করুক না কেন সিদ্দিক তাদেরকে বকাঝকা করতে দেন না। রাশিদা কোনো দিন কড়া করে কিছু বললেই হয়েছে।

গল্প

কথোপকথন : মুখোমুখি পিতা পুত্র…

বেশির ভাগ সময়ই তারা কোন ব্যাপারে একমত হতে পারে না। পিতা যদি বলেন, আজ গরমটা একটু বেশি পড়ছে না? পুত্র হয়তো কোন একটা বই বা পত্রিকার পাতায় ডুবে ছিল বা টিভি দেখছিল, উত্তরে বলবে… গ্রীষ্ম কালে গরম তো পড়বেই, এর আর কম-বেশি কি। পেপারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে পিতার হয়তো একটু ধূমপানের ইচ্ছা হল। পিতা সিগারেট ধরানোর সাথে সাথে পুত্র হয়তো বলল… অনেক তো হল এবার সিগারেটটা ছাড়েন। এই জিনিস তো ক্ষতিকর। কিন্তু পিতা তো দমবার পাত্র নন… ধুর এতদিনে যখন কিছু হয়নি, আমার কিছু হবে না, তোরা না খেলেই হবে…

তো এই রকমই চলে প্রায় প্রতিদিনই…. কিছু দিন আগে…

পিতা : তোর তো বয়স হয়ে গেছে… বিয়ে করবি না?
পুত্র : করব না কেন? কিন্তু আমার সাথে বিয়ে বসতে কে রাজি হবে বলেন ?
পিতা : তো, আমাদেরকে বল তোর কেমন মেয়ে পছন্দ… আমরা খোজ খবর করি…
পুত্র : এত খোজ খবর করার কিছু নেই… যে কোন মেয়ে হলেই আমি রাজি…
পিতা : তা হয় নাকি ? শেষে বনিবনা না হলে ?
পুত্র : তখন অন্য ব্যবস্থা…
পিতা : কি ব্যবস্থা ?
পুত্র : শরীয়া ব্যবস্থা… অর্থাৎ চুক্তি বাতিল করে নতুন করে চুক্তি করা…

এই অবস্থায় পিতা প্রথমে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থাকেন। কিন্তু সে অবস্থা দুঃখজনকভাবে এবং চিরকালই ক্ষণস্থায়ী। এবং এর পরপরই শ্রদ্ধাভাজন পিতাকুলের প্রায় সবাই যা বলেন তাই হল… আগামী দুই দিন তুই আমার চোখের সামনে আসবি না… সাথে সাথে স্বগক্তির মত করে বলতে থাকবেন, কত্তবড় সাহস- বলে কিনা নতুন করে চুক্তি করা?

দুই দিন পুত্র পিতাকে খানিকটা এড়িয়ে চললেও সেটা তো আর সম্ভব হয়ে ওঠেনা পুরাপুরি। তবে কথোপোকোথন বন্ধ থাকে এবং পুত্রের খবরা খবর পিতাকে নিতে হয় পুত্রের মাতার কাছ থেকে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেহেতু মাতারা এই ধরণের পরিস্থিতিতে অসত্য তথ্যই বেশি দিয়ে থাকেন তাই পিতাকেই আবার পুত্রকে কাছে ডাকতে হয়… কি রে মাথা থেকে ঐসব উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা গেছে? পুত্র সাধারণত মৌনব্রতই পালন করে তখন। অতপর..

পিতা : শোন বাবা, তোর বংশে কেউ কোন দিন দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। আর বয়স হয়ে গেলে সবারই বিয়ে করতে হয়। আমি করেছি। তোর দাদা করেছে। আমার দাদাও করেছে। তো তোর যখন বয়স হয়েই গেছে, আমরা তোর জন্য মেয়ে দেখা শুরু করেছি। এখন ঐসব উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে বল তোর কোন আপত্তি আছে কিনা?

কিন্তু পুত্র আজ কোন কারণে হু-হা কিছুই বলে না। এক্ষেত্রে মাতারা মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ ধরে নিলেও পিতারা কিন্তু নেয় না। তাই তাদের কে বলতেই হয়… কি রে কিছু বলছিস না যে ?

পুত্র : কি বলব ?
পিতা : তুই রাজি আছিস কিনা সেটা বল…
পুত্র : ঠিক বুঝতেছি না, ভাবছি…
পিতা : এতে এত ভাবাভাবির কি আছে ? (খানিকটা উষ্মার সাথে)
পুত্র : আমাদের বংশের মুখ তাহলে আর উজ্জ্বল করা হল না…
পিতা : মানে ?
পুত্র : বেশির ভাগ উচ্চ বংশের লোকজনকে তো দেখি একাধিক বিয়ে করতে… নবী রাসুল করেছেন…

পুত্রের আর কথা শেষ করা হয়ে ওঠে না… এই … এর মা, ওরে আমার সামনে থেকে যেতে বল… ওর আগামী দুই দিন ভাত বন্ধ… কত্তবড় সাহস বলে কিনা… …

রাতে খাবার টেবিলে দেখা যায় পুত্র হাত গুটিয়ে বসে থাকে । পিতা কয়েক গাল খেয়ে উঠে যান। মাতা তো ভাতে হাতই দেন না। পুত্রের জন্য পরোটা বানাতে বসে যান তিনি। আর বলতে থাকবেন যেমন বাপ তেমন ছেলে… দুই জন মিলে আমার জীবনটা ভাজাভাজা করে ফেলল… কিছুক্ষণ পরে পুত্র চরম আয়েশ করে পরোটা মাংস খায়। পাশে বসে মাতা খানিকটা খাবার খেয়ে স্বামীর জন্য দুধ গরম করে নিয়ে যান… তখন পিতা , বান্দরটা খেয়েছে ? মাতা হু বলে দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দেন… পিতা হাত বাড়িয়ে সেটা নেন।

যথারীতি দুই দিন পর পুত্র এক পেয়ালা চা আগিয়ে দিয়ে পিতাকে বলবে… আপনার চা। দুই জন চুপচাপ কিছুক্ষণ চা খাবে। এক পর্যায়ে পিতাই বলবেন… এই খবরটা পড়েছিস আজ ?….