গল্প

গল্প – ৫

গত কয়েক দিন ধ’রেই তাহমিদ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে। ওর বন্ধুর বিয়ে, খুব ক’রে বলেছে ও যেন যায়। ওদের বন্ধুত্বের ভেতরে একটা সজীবতা আছে। সেটা সময়ের সাথে সাথে যেন আরো বেড়েছে। এটা ভাবলেই তাহমিদের মনে হয়- ওর যাওয়া উচিৎ।

তবুও ওর পক্ষে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয় না। রিয়াজের সাথে যে বিয়ে হবে মিথিলার। মিথিলা ওর স্কুলের সহপাঠী। অনেক দিনের চেনা। আবার বলা যায় অনেক দিনের অচেনাও।

ওদের স্কুলটাতে ছিল কো-এডিকেশন। নিচের ক্লাসে থাকতেই ওদের ভেতর বেশ একটা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ওরা যখন ক্লাস নাইনে ওঠে তখন মিথিলারা নতুন বাসা ক’রে তাহমিদদের বাসার কাছাকাছি চ’লে আসে। তাতে ওদের বন্ধুত্বটা আরো গাঢ়ই হয়েছিল। কলেজে উঠে দুইজন দুই কলেজে চ’লে গেলেও তাই যোগাযোগটা ছিল।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পর যখন দেখা গেল তাহমিদ আর মিথিলা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছে তখন মিথিলা একবার ঠাট্টা ক’রে তাহমিদকে বলেছিল, এই ছেলে তুমি তো দেখি আমার পিছুই ছাড়ছো না। ব’লে মিথিলা বেশ হেসেছিল। অথচ ঐ প্রথম বারের মতো তাহমিদ মিথিলার রসিকতাতে হাসতে পারেনি। সেই নিয়েও তাহমিদ আজকের মতো দোটানায় পড়েছিল।

বেশ কয়েক মাস ভেবে ভেবে আর নিজেকে প্রশ্ন ক’রে উত্তর পেয়েছিল তাহমিদ। ও মিথিলার প্রেমে পড়েছে। তখন ভাবতে বসেছিল মিথালাকে সেটা জানাবে কি জানাবে না সেটা নিয়ে। হয়তো একটু বেশিই ভাবনায় পেয়ে বসেছিল ওকে। হলের রুম-মেইট বজলু ঠিক বুঝেছিল ব্যাপারটা। তাহমিদকে জিজ্ঞেস করলে ও বজলুকে বলেছিল মিথিলার কথা, বলেছিল মিথিলার জন্য ওর অনুভূতির কথা। বজলু ওকে পরামর্শ দিয়েছিল মিথিলার সাথে সরাসরি কথা বলার।

তাহমিদ মিথিলার সাথে কথা বলেছিল এর কয়েকদিন পরই। মিথিলা খুব কঠিন একটা দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছিল তাহমিদের দিকে। হয়তো তাহমিদ ঠাট্টা করছে কিনা এটা বোঝার জন্য। সেদিন মিথালা কী বুঝেছিল তাহমিদ তা জানেনি কখনো। তাহমিদ শুধু জেনেছিল, মিথিলা চায় ও যেন আর কখনো ওর সামনে না আসে।

তাহমিদ আর কখনো ওর সামনে যায়নি। মিথিলাকে দেখলেও দূরে চ’লে যেতো। ছুটিতে বাসায় এলেও ওরা কখনো একসাথে আসেনি। বা কখনো একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেনি। এগুলো যে খুব অভিমান বা রাগের জন্য হয়েছে তা নয়। কিন্তু কেন যে হয়েছে তাও তাহমিদ জানে না। মাঝে মাঝে ভেবেছে। যদিও উত্তর পায়নি।

রিয়াজ তার বিয়ের খবরটা তাহমিদকে দিয়েছে গত সপ্তাহে। বেশ একটু নাটক ক’রেই দিয়েছিল খবরটা। ফোন ক’রে বলেছিল কোনো একটা ইন্টারেস্টিং খবর আছে নাকি তাহমিদের জন্য। সেটা দেওয়ার জন্য রিয়াজ উত্তরা থেকে আজিমপুরে এসেছিল। হয়তো বন্ধুকে সামনাসামনি ব’লতে চেয়েছিল ব’লেই এমনটা করেছিল রিয়াজ। মিথিলার সাথে তাহমিদের বিয়ে – এটা শুনে তাহমিদ খুশি হয়েছিল মিথিলার জন্য। রিয়াজ ভাল ছেলে। জানা-শোনাও ভাল। চাকরীতেও ভাল করছে। তাহমিদ রিয়াজকে অভিনন্দন জানিয়েছিল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে।

বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হচ্ছে। রিয়াজদের বাড়ি জামালপুর থেকে ওরা যাবে মেয়ের বাড়িতে। জামালপুর থেকে ঝিনাইদহে যাতায়াত করা খুব সহজ নয়। রিয়াজদের আয়োজন তাই খুব বড় নয়। দুইটা ১২ সিটের টয়োটা হায়েস নিয়ে ওরা যাবে বিয়ের দিন। নিজেদের লোক ১২/১৩ জনের মতো। তাহমিদদের বাসাও যেহেতু ঝিনাইদহে তাই রিয়াজের বিশেষ অনুরোধ তাহমিদের কাছে। অথচ তাহমিদ একবাক্যে রাজি হ’তে পারে না। আবার রাজি না হওয়ার কোনো কারণও ব’লতে পারে না।

তাহমিদ একবার ভাবে যাবে। আবার ভাবে যাবে না। কিন্তু পরদিন যখন মিথিলার মায়ের ফোন আসে তাহমিদের কাছে, তখন তাহমিদ ঠিক করে ও যাবে। পরে ও রিয়াজকে জানায় সেটা। তবে ও রিয়াজদের সাথে যাবে না। নিজের মতো ক’রে সব সময় যেভাবে বাড়িতে যায় সেভাবে যাবে। তারপর রিয়াজরা এলে ওদের সাথে দেখা করবে।

তাহমিদ একদিন আগে বাড়িতে যায়। বিশেষ কোনো কারণে নয়। মা-বাবা বোনের সাথে একটা দিন থাকা হবে এই ভাবনায়। সেদিন কোনো একটা কারণে মিথিলা তাহমিদদের বাসায় এসেছিল। ফেরার সময় ওর মা বলেছিল, যা তো বাবা মেয়েটাকে ওর বাড়িতে পৌছে দিয়ে আয়। তাহমিদ মিথিলার সাথে সাথে গিয়েছিল ওদের বাসা পর্যন্ত। সহজ স্বাভাবিক কিছু কথা হয়েছিল ওদের। মিথিলাকে ওদের বাসার গেটে বিদায় জানানোর সময় তাহমিদ হঠাৎ জানতে চেয়েছিল, তুমি আমার উপর রাগ রাখোনি তো?

মিথিলা আবার যেন ঠিক সে দিনের মতো ক’রে তাকিয়েছিল তাহমিদের দিকে। পরে একটু সহজ হ’য়ে ব’লেছিল, আমি ভেবেছিলাম তুমি আবার আসবে, আরো কিছু ব’লবে। অথচ তুমি আর কখনো কিছু বলোনি।

এরপর মিথিলার সাথে রিয়াজের বিয়ে হয়ে যায়। তাহমিদের সাথে ওদের আর যোগাযোগ থাকে না। ৬ মাস পর তাহমিদ জার্মানিতে চলে আসে আর একবার মাস্টার্স করার জন্য।

তাহমিদের মাস্টার্স যখন প্রায় শেষের দিকে তখন একদিন গভীর রাতে ওর কাছে একটা ফোন আসে। বাংলাদেশের ফোন কোড, তবে নাম্বারটা অপরিচিত। তাহমিদ ফোনটা ধ’রে হ্যালো বলে। মিথিলার ফোন। ও তাহমিদকে বলে, আমার মনে হয় আমি তোমাকে বিয়ে করলে অনেক সুখী হ’তাম।

গল্প

গল্প-৪

কলাবাগানের লেক-সার্কাস রোডের আমির-হোসেন জেনারেল স্টোরে কিছু একটা কেনার জন্য কিংবা হয়তো অভ্যাসবশেই অগ্রণী ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার তৌফিক আহমেদ আকন্দ একটু দাড়ান। ভাবতে থাকেন গতকাল কাজের-বুয়া কিছু নিতে বলেছিলো কিনা। তৌফিক আহমেদ আকন্দের ভাবা শেষ হওয়ার আগেই দোকানের কর্মচারী তালহা জিজ্ঞেস ক’রে বসে, স্যার কী দিমু। তখন দুই হালি ডিমের কথা বলা ছাড়া আকন্দ সাহেবের আর উপায় থাকে না। তালহার ডিম গোনা শেষ হয় কি হয়না এমন সময় খয়েরী পাড়ের হলুদ রঙের শাড়ি পরা ৪০/৪২ বছরের এক ভদ্রমহিলা দোকানের সিড়িতে উঠে সেফটি-পিন আছে কিনা জানতে চান। ভদ্রমহিলার যে তাড়া আছে সেটা বেশ বোঝা যায়। তৌফিক আহমেদ আকন্দ সেদিকে তেমন একটা খেয়াল না ক’রে মানিব্যাগ থেকে হিসেব ক’রে টাকা বের করতে থাকেন। ডিম বুঝে নিয়ে ফিরতে ফিরতে আকন্দ সাহেবের হয়তো কোনো পুরোনো কথা মনে পড়ে। কিন্তু আসলেই গতকাল বুয়া কিছু আনতে বলেছিলো কিনা সেই ভাবনাটা আবার এসে পড়াতে দোকানের দিকে ফিরতে হয়। মরিচের ফাঁকি নিতে হবে।

৪০/৪২ বছরের সেই ভদ্রমহিলা তখন একটা নিশান-সানিতে উঠে তার দরজাটা বন্ধ করলেন মাত্র। তৌফিক আহমেদ আকন্দ নিশান-সানির দরজা বন্ধের শব্দে সেদিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলাকে চিনতে পারেন। মোহম্মদপুরের জহুরী মহল্লার নুসাইবা ফাহমিদা ওরফে রিনিকে দেখে একটু কি থমকে দাড়ান আকন্দ সাহেব?

মরিচের ফাঁকির ২৫০ গ্রামের প্যাকেটের দাম দুই টাকা বাড়া নিয়ে তালহার কাছে খানিকটা অনুযোগ না ক’রে পারেন না আকন্দ সাহেব। বছর শুরুর এই সময়টাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কথা নয়। তবুও বেড়েছে। অথচ আগামী বাজাটের আগে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এইসব ভাবতে ভাবতে অথবা না ভাবতে ভাবতেই কিংবা এতদিন পরে কলাবাগানের লেক-সার্কাস রোডেই কেন রিনি এলো সেটা ভাবতে ভাবতে আকন্দ সাহেব তার এ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে যান।

ঢাকা শহরের বাড়ীওয়ালাগুলো সব এক একটা ধড়িবাজ। আকন্দ সাহেবের এ্যাপার্টমেন্টের দরজার তালাটা অনেকদিন ধরেই ঝামেলা করছে। লক খোলার সময় চাবি ঢুকতে চায় না একেক সময়। কখনো বা তালা খোলার পরও চাবি বের করতে বেশ হাঙ্গামা পোহাতে হয়। গত মাস চারেক ধ’রে এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া দেওয়ার সময় এটা নিয়ে বাড়ীওয়ালার সাথে আকন্দ সাহেবের কথা হচ্ছে। অথচ তালাটা পাল্টানো তো দূরের কথা একবার মেরামতের চেষ্টাও করেনি বাড়ীওয়ালা হামিদ মোল্লা। আজ আবার এ্যাপার্টমেন্টের তালাটা থেকে চাবি বের করা নিয়ে ঝামেলায় পড়লে আকন্দ সাহেব মনে-মনে ভাবতে থাকেন, আর এই এ্যাপার্টমেন্টটাতে থাকবেন কিনা। যে এ্যাপর্টমেন্টের মূল দরজার তালাতেই ঝামেলা থাকে তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হওয়াই যায়। অথচ বাড়ীওয়ালা হামিদ মোল্লার মতে, এই এলাকাতে তার বাড়ীতে চুরিদারি করার সাহস কারো নেই। কথাটা কতটা ঠিক বলা মুশকিল। আকন্দ সাহেব এ্যাপার্টমেন্টটা ভাড়া নিয়েছিলেন সেও প্রায় ৬ বছর হ’তে চললো। কখনো চুরি-ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু পাশের বাড়ীর তিন তলা আর পাঁচ তলাতে নাকি মাঝে মাঝেই চোরের উপদ্রব দেখা যায়। হয়তো এই কারণেই ঐ বাড়ীর ভাড়াটিয়া বারবার পাল্টে যায়।

অবশেষে তালা থেকে চাবিটা বের করা গেলে আকন্দ সাহেব তার ভাড়া নেওয়া এ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে পারেন। দুই বেডের বেশ গোছানো একটা বাসা। বাসাটাতে আকন্দ সাহেব একা একাই থাকেন। গত ৬ বছরে তার বাসাটাতে কোনো অতিথী আসতে দেখেনি কেউ। ফলে এই এ্যাপার্টমেন্টের জন্য পানি খরচ কম হয়। তাতে বাড়ীওয়ালা হামিদ মোল্লার বেশ একটু লাভই হয়। এমন একটা নির্ঝঞ্ঝাট ভাড়াটিয়ার প্রতিও বাড়ীওয়ালার অবহেলার কথা ভেবে আকন্দ সাহেব মনে-মনে খানিকটা আহত বোধ করতে থাকেন। সেই আহত বোধের মাঝেই কি ক’রে যেন আবার ৪০/৪২ বছরের খয়েরী পাড়ের হলুদ রঙের শাড়ি পরা নুসাইবা ফাহমিদা রিনি চ’লে আসে। ভদ্রমহিলার শরীরে বেশ মাংস লেগেছে। শেষবার যখন ভদ্রমহিলার সাথে আকন্দ সাহেবের দেখা হয়েছিলো তখন তাদের দুজনের বয়স আরো প্রায় ১৭ বছর কম ছিলো। আকন্দ সাহেব হিসাব মেলান। এই প্রায় ১৭ বছর সময়ের মাঝে কত কত লোকের সাথে আকন্দ সাহেবের দেখা হয়েছে, অথচ নুসাইবা ফাহমিদা রিনির সাথে একটি বারের জন্যও নয়।

আবার কি কখনো দেখা হতে পারে- এমন একটা ভাবনা ভাবতে ভাবতেই আকন্দ সাহেব কিনে আনা দুই হালি ডিম ফ্রিজে আর মরিচের ফাঁকিটা রান্না ঘরের তাকে রেখে বসার ঘরে এসে টিভিটা ছেড়ে চ্যানেল পাল্টাতে থাকেন। সব চ্যানেলেই এ্যাড চ’লছে দেখে রিমোটটা নামিয়ে রেখে ওয়াশরুমের দিকে আগাতে থাকেন আকন্দ সাহেব। মুখে পানির ছিটা লেগেছে কি লাগেনি এমন সময় আকন্দ সাহেবের মনে কেমন একটা সন্দেহ হ’তে থাকে, রিনি বোধহয় তাকে দেখেছে। তাকে কি চেনার কথা না রিনির? তিনি তো ঠিকই চিনতে পেরেছেন রিনিকে, শরীর এতটা ভারী হ’য়ে যাওয়ার পরও। অথচ আকন্দ সাহেবের শরীরের পরিবর্তন ব’লতে চুলগুলো সব পেকে যাওয়া আর মুখে একটু ভারিক্কি ভাব আসার বেশি কিছু তো নয়।

হাত-মুখ ধুয়ে অফিসের কাপড় বদলে আকন্দ সাহেব আবার টিভি দেখতে বসেন। এ্যাডের যন্ত্রণায় বারবার চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে যখন বেশ খানিকটা ক্লান্ত হ’য়ে উঠেছেন, তেমন একটা সময় অফিসের কলিগ সুলতান কিবরিয়া সাহেবের ফোনকল আসে। কিবরিয়া সাহেবের বড় মেয়ের বাচ্চা হওয়া নিয়ে কোনো একটা জটিলতার কারণে গ্রীন-রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে জরুরী মুহূর্তে আকন্দ সাহেবের রক্ত দেওয়ার কথা। কিবরিয়া সাহেব ফোন করেছেন সেই জন্যই, এখনই একটু হাসপাতালে যাওয়া দরকার আকন্দ সাহেবের। আকন্দ সাহেব টিভির সুইচটা বন্ধ ক’রে নিজের শোওয়ার ঘরে ঢুকে কাপড় বদলাতে শুরু করেন দ্রুত। সেসময় পাশের বাড়ীর পাঁচতলাতে আসা নতুন ভাড়াটিয়ার বাসা থেকে কোনো একটা প্রোগ্রামের শব্দ আসতে থাকে, হয়তো বিয়ে বা গায়ে হলুদের প্রোগ্রাম। আকন্দ সাহেবের সেদিকে খেয়াল থাকে না।

দুইজন মধ্য-বয়স্ক ভদ্রমহিলা হাতে সিগারেট নিয়ে সেই সময় পাশের বাড়ীর পাঁচ তলার এ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় এসে দাড়ান। রাতের ভারী খাওয়াদাওয়ার পর একটু আয়েস ক’রে ধুমপান করার জন্যই হোক বা অনুষ্ঠানের ভিড়-ভাট্টার ভেতর থেকে একটু আলাদা হ’য়ে পুরোনো দুই বান্ধবী মন খুলে একটু গল্প ক’রে নেওয়ার জন্যই হোক বারান্দায় এসে চারপাশে একটু চোখ বুলিয়ে নেন। তাদেরই একজন আকন্দ সাহেবের শোওয়ার ঘরের দিকে নির্দেশ ক’রে বলেন, এই রিনি, দেখ তো, লোকটা কি হীরা ভাই? রিনি যেন চমকে ওঠেন, তাই তো!! ততক্ষণে আকন্দ সাহেবের কাপড় বদলানো হ’য়ে গেছে। তিনি দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। মধ্য-বয়স্ক দুইজন ভদ্রমহিলাই হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের কথা ভুলে যান কিছুক্ষণের জন্য। অথবা মনে ক’রতে থাকেন বছর ১৭ কিংবা তারো আগের কোনো গল্প, যে গল্পে অনেক অনেক স্বপ্ন আর স্বপ্ন-ভঙ্গ দুইই।

গল্প

চক্র

দুঃস্বপ্নটা আমি আজো দেখি। বারবার দেখি। অথচ আমার স্ত্রী আর সেটা জানে না। আমিই এখন আর জানাই না। কতবারই বা বলা যায় সেই একঘেয়ে পুরোনো গল্প। ওরও যে বারবার শুনতে তেমন ভাল লাগে না- সেটা টের পাই। কিন্তু ও চায় না- আমি সেটা টের পাই। আমি চাই না, আমি যে টের পাচ্ছি সেটা জানাতে। আর তাই যদি কোনো রাতে আবার আমার ঘুম ভেঙে যায়, আমি আর ওকে জাগাই না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। কোনো দিন হয়তো উঠে গিয়ে একটু পানি খেয়ে এসে আবার শুয়ে পড়ি। অনি সেটা জানতে পারে না।

অনি, মানে আমার স্ত্রী। ওর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল ১৭ বছর আগে। ধর্ম মতে। যদিও আমরা কেউই তেমন একটা ধার্মিক ছিলাম না। তবুও আমরা ধর্মমতেই বিয়ে করেছিলাম। এ ছাড়া অন্য কোনো ভাবে বিয়ে করা যায় ব’লেও আমাদের জানা ছিল না। আমরা এটা নিয়ে খুব একটা ভাবিওনি তখন। ভাবার অবকাশও ছিল না। যা কিছু হয়েছিল- হয়েছিল খুব দ্রুত। যেন সবকিছু ঘটেছিল কল্পনাতে। আর সেজন্যই হয়তো আমার স্মৃতিগুলো সব মেলাতে পারি না। কিন্তু আমার মেলাতে ইচ্ছা করে। যেদিন ইচ্ছাটা একটু বেশি করে সেদিনই আমি দুঃস্বপ্নটা আবার দেখি। দেখি আমরা পালাচ্ছি। আমাদের পেছনে অনেক মানুষের চিৎকার। আমি কারো কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। আবার চারপাশটা কেমন যেন অন্ধকার। যেন সন্ধ্যা হয়-হয়। আমি সব কিছু দেখতে পারছি না। কিন্তু হয়তো দেখেছিলাম। অন্তত যেটুকু না দেখলেই নয়। তাই পালাতে পেরেছিলাম। কিন্তু মানুষ কি শেষ পর্যন্ত পালাতে পারে? আমি কি পেরেছি? অনি কি পেরেছে?

হয়তো পেরেছে। ও খুব শক্ত মেয়ে। কিন্তু পালাতে ও চায়নি। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিল যেন আমাদের পালাতে না হয়। এখন ও চেষ্টা করে যেন ওর মেয়েটাকে, আমাদের মেয়েটাকে, যেন পালাতে না হয়। মেয়েটা এখনো অতটা বড় হয়নি। তবুও ওর ভয় হয়, মেয়েটা যদি পালায় ! কিন্তু আমাকে সেটা বলতে পারে না। আমি টের পাই। তবুও আমি কিছু বলি না। বলার মতো কিছু খুঁজে পাই না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমিও শঙ্কিত হ’য়ে উঠি। কারণ ওকেও পালাতে হবে। না পালিয়ে যে ওর উপায় নেই।

 

 

গল্প

শুচির গল্প

১.

সন্ধ্যা হচ্ছে। শুচির ইচ্ছা করে বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে। কখন যে চারপাশ অন্ধকার হ’য়ে যায় সেদিকে খেয়াল থাকে না। খেয়াল হয় সামিয়া ফিরে আসাতে। এই মেয়েটা ঘরে ঢুকেই চেচামেচি শুরু ক’রে দেয়। ‘শুচি আপু, তোমার ফোন’ ব’লেই মুখহাত ধুতে চ’লে যায় সামিয়া।

হাসিব এর ভেতরে অনেক বার ফোন করেছে। হয়তো অনেক্ষণ অপেক্ষা ক’রে ছিলো। শুচির কেমন যেন অস্থির লাগতে থাকে মোবাইলটা হাতে নিয়েই। অস্তিরতা নিয়েই কল-ব্যাক করে। ‘কি ব্যাপার ফোন ধরো না কেন?’ হাসিব খানিকটা গরম দেখায়। শুচি ভেবে পায় না কী বলবে। শেষে – পরে ফোন দিবো- ব’লে ফোনটা রেখে দেয়। পরক্ষণেই আবার ফোন বেজে ওঠে। ধরবে না ধরবে না ক’রেও শুচি ধরে। এবার হাসিবের কণ্ঠে সমর্পণের সুর, “বাবু, কী হয়েছে তোমার? আমাকে বলবে না?” শুচির হাসি পেয়ে যায়।

কথা শেষ হ’লেও শুচির ভাবনা কাটে না। হাসিবকে কেমন ক’রে বলা যায় কথাটা? ক্লাশ না ক’রে, আজ সারাদিন ঘরে ব’সে শুচি তাই ভেবেছে। সারাদিন ঘরে ব’সে থাকায়, বিকালের দিকে যখন শরীরে একটা অবসাদ বোধ হ’তে থাকে তখন শুচি বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়। এতক্ষণ পর এই ফোন ধরতেই ঘরে ঢোকে। শুচির কথা শেষ হ’তে না হ’তেই তোয়ালে হাতে মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢোকে সামিয়া। “আপু, কখন এসেছ? খেয়েছ কিছু?” সামিয়ার কথায় শুচির হুস হয়। আসলেই তো দুপুর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। শুচির যেন হঠাৎ করেই প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগতে থাকে। “না রে। তুই নাস্তা করছিস?” শুচি সামিয়াকে জিজ্ঞেস করে। “করছি, তবে তুমি খাওয়ালে আবার যাবো”- লাজুক একটা হাসি দিয়ে বলে সামিয়া। যে হাসির জন্য আজ প্রায় তিন মাস ধ’রে রূপক ওর পেছনে পেছনে ঘুরছে। হয়তো আজো ঘুরেছে। শুচি জানে এখন ক্যান্টিনে গেলে সামিয়ার কাছ থেকে সেই সব কথা শুনতে হবে। শুচি রাজি হয়ে যায়। বলে, “চল।”

পরদিন ঠিক মতো আলো ফোটার আগেই ঘুম ভেঙে যায় শুচির। অন্য দিন হ’লে হয়তো আরো কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করতো। তবে আজ উঠে বসে। বসতেই ওর মনে হয়, ব্যাপারটা আজ সকালেই হাসিবকে জানাতে হবে। ওর খুব ইচ্ছা করে হাসিবকে এখনই একটা কল দিতে। কিন্তু হাসিব সাধারণত দেরীতে ঘুমায় ব’লে ওকে সকালে খুব একটা পাওয়া যায় না। শুচি তাই ঠিক করে সরাসরি ওর হলের গেটে চ’লে যাবে। গিয়ে দারোয়ান খলিলকে বলবে ৪২৮ থেকে হাসিবকে ডেকে দিতে।

চোখ ডলতে ডলতে হাসিব এসে হাজির হয়। গায়ে একটা নীল টি-শার্ট। টি-শার্টটা শুচি কিনে দিয়েছিলো গত মাসে। এর মধ্যে একবারও হাসিব এটা প’রে শুচির সামনে আসেনি। এই প্রথম এলো। “কয়টা বাজে?” একটা অস্পষ্ট কণ্ঠে হাসিব কথাটা জিজ্ঞেস করে। শুচির কাছে হাসিবকে কেমন যেন একটা বাচ্চার মতো লাগে। বলে, “এইতো প্রায় ছয়টা। তুমি ঘুমিয়েছ কখন?” “চারটার দিকে হবে… কিন্তু এত সাকালে হলে আসছ কেন? ফোন দিলেই তো হতো…” হাসিব বলে। “তুমি সকালের কল ধরো কখনো ? তাই চলে এসেছি। চলো মাঠের দিক থেকে একটু হেঁটে আসি।” বলেই শুচি পা বাড়ায়। হাসিবও ওর সাথে সাথে এগুতে থাকে। শুচি হাসিবের হাতে একবার ওর হাত ছোয়ায়। অনেকটা যেন আনমনে। কিছুক্ষণ পর শক্ত ক’রেই ধরে। তারপর কথাটা ব’লে দেয়।

হাসিব যেন কেঁপে ওঠে। ঘুরে দাড়িয়ে সরাসরি শুচির চোখের দিকে তাকায়। কিছু একটা হয়তো খোঁজে। কিছু একটা হয়তো ভাবে, হয়তো ভাবে না। বলে, “চলো আমরা বিয়ে ক’রে ফেলি।” শুনে শুচির খুব ভাল লাগে। কিন্তু ঠিক কী বলবে ভেবে পায় না।

২.

শুচি শেষ পর্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলে। বাচ্চাটা ও রাখবে না। এই বাচ্চাটার কথা ও ওর মাকে বলতে পারবে না। যে মায়ের সাথে শুচি রোজ কথা বলে। যে মাকে শুচি সব কথা বলতো। সেই মাকেও এই কথাটা বলা যায় না। আর তাই দুই দিন পরই শুচি মেরী-স্টোপসে যায়। রিকশায় ক’রে যেতে যেতে হাসিব ব্যাপারটা আর একবার ভেবে দেখতে বলে। শুচি হয়তো ভাবে হয়তো ভাবে না। হয়তো ভাবে বাড়ির কথা। লোকের কথা। “না , লোকজনকে কি বলবো তখন? তার থেকে এই ভাল।” হাসিব আর কিছু বলে না। শুধু শুচির হাতটা শক্ত ক’রে ধ’রে রাখে।

দুই দিন পর বিশেষ কোনো জটিলতা ছাড়াই শুচি হলে ফেরে। আবার নিয়মিত ক্লাশ করা শুরু করে। সহপাঠীদের কেউ কেউ শুচির কালি পড়া চোখ ঠিকই খেয়াল করে। খেয়াল করে হাসিব যেন একটু কম কথা বলছে। সবার সাথেই। জাকারিয়া একদিন জিজ্ঞেস ক’রেই বসে, “কি হইছে তোর?” “না, কি হবে?” বলে এড়িয়ে যায় হাসিব।

দেখতে দেখতেই পরীক্ষার সময় এসে যায়। সেমিস্টার সিস্টেমের কারণে। শুচি ব্যস্ত হ’য়ে পড়ে লেখাপড়া নিয়ে। বরাবরের ভাল শিক্ষার্থী শুচি তাই এই নিয়ে আর ভাবার সময় পায় না। দুই মাসের ভেতরেই পরীক্ষা শেষ হ’য়ে যায়। শুচি সচরাচর ট্রেনে ক’রে বাড়ি যায়। চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের সবুজ দেখতে ওর খুব ভাল লাগে। এবার বাড়ি যাওয়ার পথে এমনই তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ওর দুই মাস আগের কথা মনে পড়ে। কাজটা কি শুচি ঠিক করলো? অথবা এমনটা যদি না হতো? ও যদি আরো একটু শতর্ক হতো সিনথিয়ার মতো। সিনথিয়া আর রাকিবের দেখা-দেখিই তো শুচি অমন সাহসী হ’য়ে উঠেছিলো। কই ওদের তো এমন কিছু হয়নি! শুচি একবার ভাবে সিনথিয়াকে ফোন দেওয়ার কথা। আবার ভাবে, পরে বাসায় গিয়ে না হয় দেবে। কিন্তু বাসায় পৌছে আর ফোন দেওয়া হয় না। হয়তো মায়ের কারণে। মা সারাক্ষণ শুচির কাছে কাছে থাকেন। এটা খা, সেটা কর- করতে থাকেন। জানেন দুই সপ্তাহ পরই মেয়ে আবার চ’লে যাবে- তাই হয়তো। এদিকে সম্যর পরীক্ষা শেষ হ’তে আরো সপ্তাহ তিনেক বাকি। ছোট ভাইয়ের সাথে তাই শুচির এবার আর দেখা হবে না- এই নিয়ে মায়ের মন খারাপ। ছেলে-মেয়ে দুইটা একসাথে বাড়িতে থাকলে বাড়িটা ভরা ভরা লাগে।

৩.

শেষ সেমিস্টারটা শেষ হয়। শুচির সিরিয়াসনেস তাই ছিলো বাড়াবাড়ি রকমের। রেজাল্টে সেটা বেশ টের পাওয়া যায়। সবার ওপরে থেকেই অনার্স শেষ করে শুচি। হাসিবের রেজাল্টও ভাল। এখন দুজনের একসাথে বসার সময়। হয়তো খানিকটা বোঝাপড়ারও। আবার সবকিছু ছেড়ে যাওয়ারও সময়। যেতে হবে অন্য কোথাও। হয়তো ঢাকাতে। হয়তো অন্য কোনো শহরে। অন্য কোনো দেশেও হ’তে পারে। তাই সব কাগজ-পত্র ঠিকঠাক তোলা চায়। তার জন্য দৌড়াও একাডেমিক ভবন। প্রশাসনিক ভবন। ব্যাংক। হল। সব করতে করতে হাসিব আর শুচির আর সময় করা হয় না একসাথে বসার। কিন্তু দুজনেই ভাবতে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার আগের দিন খানিকটা সময় হয়। দুজনে ওদের খুব পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টে বসে। ওরা ঠিক করে অন্তত দুই বছর চাকরি করবে দুইজনই। তা সে যেখানেই হোক। তারপর বিয়ে।

বাড়িতে এসে শুচি কয়েকদিন শুধু খায় আর ঘুমায়। মায়ের তাতে বিশেষ সাই আছে। মেয়েটা কত খাটাখাটনি না করলো। তাইতেই না এত ভাল রেজাল্ট। বাবাও খুব খুশি। বারবার জিজ্ঞেস করেন শুচির কিছু লাগবে কিনা। শুচি শুধু কয়েক দিন আরাম করতে চায়। বাবা হাসেন। কয়েকদিন পর সম্যর ছুটি শুরু হয়। তখন দুই ভাই-বোন ঠিক করে মামার বাড়িতে যাবে। দিনাজপুর। শুরু হয় মায়ের আয়োজন। ছেলে-মেয়ে মামার বাড়িতে যাবে অথচ তার যাওয়ার উপায় নেই।

৪.

দিনাজপুর থেকে ফিরে শুচি আর দেরী করে না। ব্যাগ গুছিয়ে ঢাকা রওনা করে। এবার চাকরীর খোঁজ। তার আগে নিজের একটা থাকার জায়গাও ঠিক ক’রে নেওয়া দরকার। ঢাকা শহরে স্থানীয় মানুষের চেয়ে বাইরের মানুষ বেশি হ’লেও শহরটা যে তেমন ওয়েলকামিং নয়, সেটা বুঝতে শুচির বেশি সময় লাগে না। থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে তা আরো হাড়েহাড়ে টের পায়। 

গল্প

কিছুটাতো চাই …

১.
রাত অনেক হয়েছে। অথচ জীবনের ঘুম আসছে না। এমন হলে জীবন সাধারণত কবিতার বই টেনে নেয়। খানিকটা পড়ে। আবার পড়ে না। কয়েক পাতা উলটে আবার খানিকটা পড়ে। ভাল লাগলে কোন লাইন হয়তো আর একবার পড়ে। এই করতে করতেই রুদ্রর কয়েকটা লাইনে হঠাৎ করে আটকে যায় জীবন –

 … প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা-
এই খেলা আর কতকাল আর কতটা জীবন !
কিছুটাতো চাই – হোক ভুলহোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই,
কিছুটাতো চাইকিছুটাতো চাই…

জীবনের অনেক পাওনা বাকি। আবার জীবনের কাছেও অনেকের পাওনা আছে। অনেক লেনাদেনার হিসেব বাকি। সে হিসেব হয়তো কোনদিনই মিলবে না। তাই নিয়ে জীবন খুব একটা ভাবে না। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ভাবতে ভালওবাসে। সে ভাবনায় কোন হিসেবের গরমিল থাকে না। প্রাপ্তির অনটন থাকে না। থাকে শুধু চাওয়া। অথচ আজ রাতে জীবন থমকে যায়। ওর যেন কোনো চাওয়া নেই। ঠিক যেমন ওর চোখে আজ ঘুম নেই…

সকাল বেলা রাতের এই সব ঘটনা আর মনে থাকে না। অথবা মনে থাকে। আর থাকে বলেই পরবর্তী কোন রাতে হয়তো আবার তারা ফিরে আসে। এমন হ’লে জীবন কখনো কখনো তার কোনো ঘনিষ্ট বন্ধুকে ফোন করে। পুরোনো কোন বন্ধু। যার সাথে অনেক দিন কোনো যোগাযোগ নেই। হয়তো গহনের কথা মনে পড়ে। কিন্তু ফোন দেয় সুমনকে। কারণ গহনের ফোন নাম্বার আজ আর ওর কাছে নেই। সুমন এত রাতে ফোন পেয়ে বিরক্ত হয়।

হ্যাঁ বল, কি হইছে?” “>সুমনের কন্ঠে ঘুমের জড়তা। ” না এমনিই..” জীবন খানিকটা ভয়ে ভয়ে বলে, ”তুই ঘুমাইতেছিস, ঘুমা… পরে বলব..”

“শালার চোৎমারানী, রাইত দুপুরে ফোন দিয়া ছিনালী ! যত্তসব… ” গজগজ করতে করতে ফোন রেখে দেয় সুমন। জয়িতার ঘুমও ভেঙে যায়, “কে? এত রাতে?.. “কিছু না- জীবন। তুমি ঘুমাও।” সুমনের কথায় জয়িতা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সুমনও।

পরদিন বিকালে চায়ের দোকানে যখন সুমনের সাথে জীবনের দেখা হয় তখন আর এই নিয়ে কোনো কথা হয়না ওদের মধ্যে। অথবা কিইবা বলার থাকবে ওদের? জীবন জানে সুমন এমনই। সুমন জানে জীবনের মেয়েটা মরে যাওয়ার পর থেকে জীবন পালটে যাচ্ছে। আবার ওকে দেখে রাখতে পারতো যে লোপা সেও নেই। অনেকটা যেন থেকেও নেই।

২.

রনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকে। আজ শফিক স্যার একেবারে খেয়ে ফেলবে। একে বাসা থেকে বের হতে দেরী হয়ে গেছে। তার উপর বাসের দেখা নেই। নয়টা বাজতে আর মাত্র আঠারো মিনিট বাকি। পল্টন যেতে কম করে হলেও চল্লিশ মিনিট লাগবে। রনি রিকশা খুঁজতে থাকে। ভেঙে ভেঙে যদি যাওয়া যায়। একটা রিকশা পেয়েও যায় রনি। চৌধুরী পাড়া ক্রস করতেই শফিক স্যারের ফোন। রনি চমকে ওঠে। খানিকটা ভয়ে। খানিকটা অনিশ্চয়তায়। ফোন ধরতেই, ”রনি, তুমি তাড়াতাড়ি টঙ্গী চলে যাও তো। ঢাকা ডাইং এর আজিজ সাহেবের সাথে দেখা করে আমাকে একটা ফোন দিও। আমাদের রঙের স্যাম্পলটা ওকে করেছেন আজিজ সাহেব।” “ঠিক আছে স্যার আমি এখনই যাচ্ছি।” রনির কণ্ঠে বাড়তি তৎপরতা। তাড়াতাড়ি রিকশা ঘুরিয়ে দেয় মহাখালির দিকে। যে ভাগ্যকে রনি সব সময় গাল দিয়ে এসেছে তাকেই আজ কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকে।

ঢাকা ডাইং এর মতো পুরোনো কারখানাতে ঢুকতে পারা সহজ কথা নয়। রাতুলের সাথে রনির সেদিন দেখা না হলে হয়তো এই সুযোগটা পাওয়াই হতো না। রাতুল, রনি, জিকো, মুরাদ আর বাবলা ছিল স্কুলের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক মুরাদ ছাড়া আর কারো সাথে রনির অনেকদিন কোন যোগাযোগ নেই। মুরাদের সাথে কি রাতুলের যোগাযোগ আছে? রাতুলের সাথে সেদিন যে সামান্য সুযোগ হয়েছিল তাতে সে কথা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। বরং রাতুলই জিজ্ঞেস করছিল বিভিন্ন কিছু। কি করছিস? কোথায় আছিস? এই সব। রাস্তায় দাড়িয়ে আর কত কথা বলা যায়? রাতুল তাই ওর ফোন নাম্বার নিয়ে -পরে কথা হবে, আজ আসি রে দোস্ত, বলে মোটর সাইকেল বাড়িয়ে দিল।

সেদিন রাতেই রাতুল ফোন দিয়েছিল রনিকে। তখনই নানা কথায় রাতুল জানতে পারে সুইস কালারের কথা। এই রঙের ব্যবসা প্রতিষ্ঠাণে চাকরী করে রনি। দুই বছরের বেশি হতে চলল। কাজের চাপটা একটু বেশি হলেও স্যালারীটা ভাল দেন শফিক আহমেদ। তবে কাজে গাফিলতি হলে কথা শোনাতে কম যাননা এই দক্ষ রং ব্যবসায়ী। সেলস ম্যানেজারদের কেউ যদি নিজে থেকে কোন চালানের যোগাযোগ করে দিতে পারে তাকে বাড়তি কমিশনও দেন শফিক আহমেদ। রনি দেখে শফিক সাহেবের নাম রাতুলের জানা। তবে তার সাথে রাতুলের পরিচয় নেই। রাতুলই দুই দিন পরে রনিকে আজিজ সাহেবের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। অর্ডারটা যে হয়ে যাবে রনি এতটা আশা করেনি। যদিও অর্ডারের পরিমাণটা যে কত সেটা রনি জানে না এখনো।

এদিকে রিকশা মহাখালি এসে পৌছে। রনি গাজিপুরের একটা বাসে চড়ে বসে।

৩.

অবসরে যাওয়ার পর থেকে ইদ্রিস ভুইয়ার স্বভাবটা কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। ইদ্রিস সাহেবের স্ত্রী সুরাইয়া আখতার রাখি ঠিক ধরতে পারেন না। আবার কখনো যেন পারেন। কখনো মনে হয় ইদ্রিস যেন একটু বেশি কথা বলছেন। কখনো মনে হয় অতিরিক্ত চুপচাপ। রাখি ঠিক করেন, আজ অফিস থেকে ফিরে মিম আর পিয়ালের সাথে এই নিয়ে কথা বলবেন।

গল্প

তখন সূর্যাস্তে

১.
পানিটা শেষ ক’রে গ্লাসটা ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতে ইকবাল একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। বারটা সাইত্রিশ। ঝিনুকের এর ভেতরে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এখনো জেগে আছে। মেয়ের ঘর থেকে হাসাহাসির শব্দ আসছে। ইকবাল নন্দিনীর ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আর তখনই মুঠোফোন বেজে ওঠে। ধুর এত রাতে কে আবার! ইকবাল স্টাডি রুমে ফিরে আসে।

সিদ্দিক সাহেবের কল, ’কাল একবার বাসায় আসতে পারবে? তোমার মায়ের দাফন।’ ইকবালের যেন কী হয়। একটা কথাও বলতে পারে না। বেশ খানিকটা সময় পর শুধু বলতে পারে, কখন? সিদ্দিক সাহেব বলেন – আসরের পর। ‘না না বাবা, মা মারা গেছে কখন সেটা জিজ্ঞেস করছিলাম..’ ইকবাল সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে।

রাত আটটায়। এখন বাড়িতে আনলাম। একটু সময় নেন সিদ্দিক সাহেব, ঝিনুক আর দাদুকে নিয়ে এসো- তখন কথা হবে । এখন রাখি – এই বলে সিদ্দিক সাহেব রেখে দেন।

ইকবাল কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। নন্দিনীর ঘরের দরজায় গিয়ে যখন দাড়ায় তখন মা-মেয়ে দুই জনই চুপ। নন্দিনী হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। ঝিনুক খাট থেকে নামতে গিয়েই খেয়াল করে ইকবাল দাড়িয়ে আছে। ‘কি ঘুমালো?’

হ্যা, ঘুমিয়েছে। চলো, তোমার গলা শুনলে আবার না উঠে পড়ে।

ইকবাল তারপরও মেয়ের কাছে যায়। কপালে হাত বুলিয়ে দিতেই মেয়ে চোখ তুলে তাকায়। ঠিক যেন ওর মায়ের চোখ। ঝিনুক চেচিয়ে ওঠে- আমি পারব না বাবা, এবার তুমি ঘুম পাড়াও। আমি শুতে গেলাম। ঝিনুক উঠে গেলে ইকবাল কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। নন্দিনী ততক্ষণে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমিয়ে গেছে।

শোবার ঘরে আসতেই ঝিনুক জড়িয়ে ধরে ইকবালকে। ধরেই যেন টের পায় কিছু একটা, কিন্তু ঠিক ধরতে পারে না। ওর চোখে চোখ পড়তেই থমকে যায় ঝিনুক – কী হয়েছে তোমার? ঝিনুককে যেন আরো খানিকটা জড়িয়ে ধরে ইকবাল, আটটার সময় মা মারা গেছে ঝিনুক।

কিছুটা সময় দুজনই চুপচাপ দুজনকে ধরে থাকে। ইকবালের চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে ঝিনুকের কাধে। এই প্রথম ঝিনুক ইকবালকে কাঁদতে দেখল।

রাশিদার দ্বিতীয় সন্তান ইকবাল। মেয়ে লোপামুদ্রার থেকে ছেলের প্রতিই যেন ভালোবাসাটা বেশি। অন্তত লোপামুদ্রার তাই ধারণা। সুযোগ পেলে মাকে সেটা সে জানিয়েও দেয়। লোপামুদ্রা হয়তো কিছু একটা চেয়েছে। মাসের প্রায় শেষ। রাশিদার একটু গড়িমসি না করে উপায় নেই। অথচ নাছোড় মেয়ে তা বুঝতে চাই না। বলে বসে, ছেলে চাইলে তো ঠিকই সাথে সাথে কিনে দিতে। রাশিদা ধমক দিতে গিয়েও দেন না। সিদ্দিকের জন্য। ছেলে-মেয়েরা যত দুষ্টামিই করুক না কেন সিদ্দিক তাদেরকে বকাঝকা করতে দেন না। রাশিদা কোনো দিন কড়া করে কিছু বললেই হয়েছে।

গল্প

কথোপকথন : মুখোমুখি পিতা পুত্র…

বেশির ভাগ সময়ই তারা কোন ব্যাপারে একমত হতে পারে না। পিতা যদি বলেন, আজ গরমটা একটু বেশি পড়ছে না? পুত্র হয়তো কোন একটা বই বা পত্রিকার পাতায় ডুবে ছিল বা টিভি দেখছিল, উত্তরে বলবে… গ্রীষ্ম কালে গরম তো পড়বেই, এর আর কম-বেশি কি। পেপারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে পিতার হয়তো একটু ধূমপানের ইচ্ছা হল। পিতা সিগারেট ধরানোর সাথে সাথে পুত্র হয়তো বলল… অনেক তো হল এবার সিগারেটটা ছাড়েন। এই জিনিস তো ক্ষতিকর। কিন্তু পিতা তো দমবার পাত্র নন… ধুর এতদিনে যখন কিছু হয়নি, আমার কিছু হবে না, তোরা না খেলেই হবে…

তো এই রকমই চলে প্রায় প্রতিদিনই…. কিছু দিন আগে…

পিতা : তোর তো বয়স হয়ে গেছে… বিয়ে করবি না?
পুত্র : করব না কেন? কিন্তু আমার সাথে বিয়ে বসতে কে রাজি হবে বলেন ?
পিতা : তো, আমাদেরকে বল তোর কেমন মেয়ে পছন্দ… আমরা খোজ খবর করি…
পুত্র : এত খোজ খবর করার কিছু নেই… যে কোন মেয়ে হলেই আমি রাজি…
পিতা : তা হয় নাকি ? শেষে বনিবনা না হলে ?
পুত্র : তখন অন্য ব্যবস্থা…
পিতা : কি ব্যবস্থা ?
পুত্র : শরীয়া ব্যবস্থা… অর্থাৎ চুক্তি বাতিল করে নতুন করে চুক্তি করা…

এই অবস্থায় পিতা প্রথমে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থাকেন। কিন্তু সে অবস্থা দুঃখজনকভাবে এবং চিরকালই ক্ষণস্থায়ী। এবং এর পরপরই শ্রদ্ধাভাজন পিতাকুলের প্রায় সবাই যা বলেন তাই হল… আগামী দুই দিন তুই আমার চোখের সামনে আসবি না… সাথে সাথে স্বগক্তির মত করে বলতে থাকবেন, কত্তবড় সাহস- বলে কিনা নতুন করে চুক্তি করা?

দুই দিন পুত্র পিতাকে খানিকটা এড়িয়ে চললেও সেটা তো আর সম্ভব হয়ে ওঠেনা পুরাপুরি। তবে কথোপোকোথন বন্ধ থাকে এবং পুত্রের খবরা খবর পিতাকে নিতে হয় পুত্রের মাতার কাছ থেকে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেহেতু মাতারা এই ধরণের পরিস্থিতিতে অসত্য তথ্যই বেশি দিয়ে থাকেন তাই পিতাকেই আবার পুত্রকে কাছে ডাকতে হয়… কি রে মাথা থেকে ঐসব উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা গেছে? পুত্র সাধারণত মৌনব্রতই পালন করে তখন। অতপর..

পিতা : শোন বাবা, তোর বংশে কেউ কোন দিন দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। আর বয়স হয়ে গেলে সবারই বিয়ে করতে হয়। আমি করেছি। তোর দাদা করেছে। আমার দাদাও করেছে। তো তোর যখন বয়স হয়েই গেছে, আমরা তোর জন্য মেয়ে দেখা শুরু করেছি। এখন ঐসব উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে বল তোর কোন আপত্তি আছে কিনা?

কিন্তু পুত্র আজ কোন কারণে হু-হা কিছুই বলে না। এক্ষেত্রে মাতারা মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ ধরে নিলেও পিতারা কিন্তু নেয় না। তাই তাদের কে বলতেই হয়… কি রে কিছু বলছিস না যে ?

পুত্র : কি বলব ?
পিতা : তুই রাজি আছিস কিনা সেটা বল…
পুত্র : ঠিক বুঝতেছি না, ভাবছি…
পিতা : এতে এত ভাবাভাবির কি আছে ? (খানিকটা উষ্মার সাথে)
পুত্র : আমাদের বংশের মুখ তাহলে আর উজ্জ্বল করা হল না…
পিতা : মানে ?
পুত্র : বেশির ভাগ উচ্চ বংশের লোকজনকে তো দেখি একাধিক বিয়ে করতে… নবী রাসুল করেছেন…

পুত্রের আর কথা শেষ করা হয়ে ওঠে না… এই … এর মা, ওরে আমার সামনে থেকে যেতে বল… ওর আগামী দুই দিন ভাত বন্ধ… কত্তবড় সাহস বলে কিনা… …

রাতে খাবার টেবিলে দেখা যায় পুত্র হাত গুটিয়ে বসে থাকে । পিতা কয়েক গাল খেয়ে উঠে যান। মাতা তো ভাতে হাতই দেন না। পুত্রের জন্য পরোটা বানাতে বসে যান তিনি। আর বলতে থাকবেন যেমন বাপ তেমন ছেলে… দুই জন মিলে আমার জীবনটা ভাজাভাজা করে ফেলল… কিছুক্ষণ পরে পুত্র চরম আয়েশ করে পরোটা মাংস খায়। পাশে বসে মাতা খানিকটা খাবার খেয়ে স্বামীর জন্য দুধ গরম করে নিয়ে যান… তখন পিতা , বান্দরটা খেয়েছে ? মাতা হু বলে দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দেন… পিতা হাত বাড়িয়ে সেটা নেন।

যথারীতি দুই দিন পর পুত্র এক পেয়ালা চা আগিয়ে দিয়ে পিতাকে বলবে… আপনার চা। দুই জন চুপচাপ কিছুক্ষণ চা খাবে। এক পর্যায়ে পিতাই বলবেন… এই খবরটা পড়েছিস আজ ?….