নগরী ঢাকা – ৩

নগরের একটা আকর্ষণ আছে। তাই সে মানুষকে টানে। ব্যর্থ মানুষ। স্বপ্নাতুর মানুষ। নিস্ব মানুষ। সম্পদশালী মানুষ। হতাশ মানুষ। আশাবাদী মানুষ। সবাইকেই টানে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কাজ দিয়ে। থাকার জায়গা দিয়ে। আনন্দ দিয়ে। বিনোদন দিয়ে। স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। সম্ভাবনার রঙিন ফানুস উড়িয়ে।

আবার মানুষও তার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ চায়। খুব তীব্রভাবেই চায়। সহস্র বছর ধ’রে সে চেয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠা। গড়তে চেয়েছে এমন কিছু যা টিকে থাকবে তার জীবনকে ছাপিয়ে। অথচ যার সমস্ত গায়ে থাকা চায় তার স্মৃতি, তার অভিজ্ঞতা। তার আবিস্কার দিয়ে, তার যত আয়োজন দিয়ে, তার শত কল্পনা দিয়ে তাই মানুষ গড়ে যায় শহর-নগরী।

নগরীর গড়ে তোলা তাই কখনো শেষ হয় না। প্রতি যুগের মানুষ একটু একটু করে পরিবর্তন আনে পুরোনো নগরীর অবয়বে। ধুলো ঝেড়ে, আলো জ্বেলে, অনেকটা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে তাকে ক’রে তোলে সময়োপযোগী। কখনো কখনো যে একেবারে আনকোরা কোনো নগরী গড়ে তুলতে চায়নি মানুষ তাও নয়। অন্তত বিশ শতকের বেশ কিছু উজ্জ্বল মানুষ বেশ ঘটা ক’রেই চেয়েছিলেন। সময়টা যে ছিল কারখানা বিপ্লবের। তাই দূষণ ছিল যত্রতত্র। শব্দ মানেই যেন ক্যাওয়াস। ধুলো আর ধোয়া তো আছেই । সেই সাথে রাসায়নিক বর্জ্যেরও কমতি নেই। অনেকেই তাই সবকিছু মিলিয়ে নগর তৈরীর পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। চেয়েছিল কারখানা থেকে দূরে গিয়ে তার কল্লোলিনী তীলোত্তমা গড়ে তুলতে।

কিন্তু শুধু কয়েক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তো আর নগর গড়া যায় না। বিশ শতকের মানুষের পক্ষেও তাই সফলভাবে আনকোরা নগর আর গড়া সম্ভব হয়নি। হয়নি লি কর্বুজিয়েরের পক্ষেও। ইবেনিজার হাওয়ার্ড, ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট, লি কর্বুজিয়েরদের দুর্বিনিত অদম্য ইচ্ছের ব্যর্থতা আজ আমাদের সামনে হাজির হয় নতুন কোনো স্বপ্নের আকর হ’য়ে। আমরা যেন নগর গড়ার নতুন হাতিয়ারে সমৃদ্ধ হ’য়ে উঠি। নতুন উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে যাই আমাদের পুরনো জীর্ণ নগরীর সংস্কারে। বিশ শতকের ব্যর্থতারও যেমন সংস্কার দরকার আজ, তেমনি দরকার তারও আগের সাফল্যেরও। আজ সেটা করা না গেলে তা হয়ে ওঠবে একুশ শতকের এক উল্ল্যেখযোগ্য ব্যর্থতা।

নগরী ঢাকা – ১

লুই কান বলেছিলেন, “শহর সবসময় অপরিকল্পিত ভাবেই গড়ে ওঠে – তবে আমরা একটা শহরকে নগরে রূপান্তরিত করতে পারি।” এর মানে কিন্তু এই নয় যে অপরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে ওঠে না। অপরিকল্পিতভাবেও নগর গড়ে উঠতে পারে। তবে তা শেষ পর্যন্ত ঠিক কতটা বাসযোগ্য থাকে সেটাই প্রশ্ন।

ঢাকা এমনই একটা নগরী যা ঠিক পরিকল্পনা ক’রে গড়ে ওঠেনি। এর ছোট ছোট কোনো পাড়া, মহল্লা কিংবা এলাকা হয়তো কখনো কখনো অল্প-স্বল্প কিছু পরিকল্পনার ছোঁয়া পেয়েছিল এই যা। আর তাই ঢাকা নগরীর নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র বা ইমেজ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ঢাকা একটা দেশের রাজধানী। অর্থাৎ মূল প্রশাসনিক শহর। আবার প্রধান সামরিক ঘাঁটিও।আজকের ঢাকা নগরীর একেবারে মাঝখানের বিশাল জায়গা জুড়ে আছে প্রকাণ্ড এক ক্যান্টনমেন্ট। অনেকগুলো সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ঢাকা একটা শিক্ষা-নগরীও। দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রায় সবগুলোই ঢাকাতে তৈরী করা হয়েছে। এরপরও ঢাকাই ১৬ কোটি-মানুষ নিয়ে গড়া বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর। শিল্প-শহরও বটে। ফলে ঢাকাতে প্রতিনিয়তই অগণিত মানুষের আনাগোনা। যা ঢাকা শহরকে পরিণত করেছে ঢাকা নগরীতে।

কারণ নগরের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেখানে থাকতে হবে প্রচুর বহিরাগত আর অপরিচিত মানুষ। শুধু স্থায়ী মানুষের বসতি দিয়ে নগর তৈরী হয় না। হয়তো একটা বড় শহর গড়ে তোলা যেতে পারে মাত্র।(১)

আর অপরিচিত মানুষের মধ্যে একধরণের অবিশ্বাস কাজ করেই। পরিচিত বা নিজের গণ্ডির ভেতরের কাউকে ঠকানোর চিন্তা মানুষের মধ্যে কমই আসে। কাছের মানুষের কোনো বিপদে মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই তার পাশে গিয়ে দাড়ায়। কিন্তু একজন অপরিচিত মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগে বেশিরভাগ মানুষই অন্তত একবার হ’লেও ভাবে। তারপর অনেকেই পিছিয়ে আসে। যে কারণে নগরীর মানুষেরা এত একা। এত এত মানুষের ভীড়েও।

শহরকে নগরে রূপান্তর করার কাজটা তাই খুব সহজ নয়। যেমন সহজ নয় নগরীর মানুষকে বুঝে ওঠা। আবার এই বুঝে ওঠার কাজটা ঠিকমত করতে না পারলে বাসযোগ্য নগরী তৈরী করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ঢাকা হয়তো অ-বাসযোগ্য নগরীর বিভিন্ন তালিকার প্রথম দিকেই থাকে। তবুও বাস্তবতা হলো- আড়াই থেকে তিন কোটির মতো মানুষ এই নগরীতে থাকছে এই মুহূর্তে। সেই সাথে প্রতিনিয়ত আরো মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঢাকার লোকসংখ্যা তাই বাড়ছে। বাড়ছে খুব দ্রুত। এতটা দ্রুত আর কোনো শহরের লোকসংখ্যা বেড়েছে কিনা তা বলা শক্ত। যা ঢাকাকে নিয়ে পরিকল্পনা করাটাকে করে তুলছে আরো দুরুহ।

নগরীর বাসযোগ্যতার প্রশ্নে তার নিরাপত্তাই বোধকরি মূল বিষয়। আর সাধরণভাবে নিরাপত্তা ব’লতে রাস্তাঘাটের নিরাপত্তাকেই বোঝানো হয়। যে নগরীর রাস্তাঘাট নিরাপদ সে নগরী হ’য়ে ওঠে প্রাণবন্ত। মানুষ তাকে উৎসবের নগরী বানিয়ে ফেলতে চায়। কারণ উৎসবই পারে মানুষকে আরো মানুষের কাছে টানতে। নগরীর এও একধরণের চাহিদা। নগরে তাই মিছিল ওঠে। র‍্যালি হয়। যা কিনা এক ধরণের যাত্রাই। অথচ নগরীর মানুষেরা তো প্রতিদিনই যাতায়াত করছে। একটু আয়োজন ক’রে যাতায়াত করাটাই তাই হয়ে ওঠে নগরীর মূল উৎসব। রাস্তা হয়ে ওঠে উৎসবের মাঠ।

নগরীর রাস্তা আর ফুটপাথ তাই শুধু গাড়ি-ঘোড়া, মানুষ আর মালামাল আনা-নেওয়ার একটা মাধ্যম শুধু নয়। এ আরো অনেক বেশি কিছু। একটা নগর কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নের উত্তরে লুই কান তাই বলেছিলেন, “একটা শিশু নগরীর একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যেন ভেবে নিতে পারে সে বড় হয়ে কি হতে চায়”।

কিন্তু আমাদের ঢাকা নগরীর রাস্তাগুলো কি এমন? কতটা নিরাপদ এর রাস্তাগুলো? মানুষের জন্য ? বাচ্চাদের জন্য? আগন্তুকদের জন্য? প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বেশিরভাগের কাছে একই রকম। সেটা হলো ঢাকার রাস্তা খুব একটা নিরাপদ নয়। যখন তখনই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ছিনতাইয়ের শিকার হতে পারে যে কেউ যে কোনো সময়। নারীদের জন্যও স্বস্তিদায়ক নয় ঢাকার রাস্তাঘাট। রাতের রাস্তা তো কারো জন্যই নয়।

তবুও ঢাকা বড় হচ্ছে। ঢাকাতে চলছে প্রচুর ভাঙা-গড়ার কাজ।

১) Great cities are not like towns, only larger. They are not like suburbs, only denser. They differ from towns and suburbs in basic ways, and one of these is that cities are, by definition, full of strangers. To any one person, strangers are far more common in big cities than acquaintances. More common not just in places of public assembly, but more common at a man’s own doorsteps. Even residents who live near each other are strangers, and must be, because of the sheer number of people in small geographical compass. –জেন য্যাকবস

সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম।
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/54646