পাঠ প্রতিক্রিয়া

পাঠ প্রতিক্রিয়া – আশার ছলনে ভুলি

গল্পটা হয়তো খুব বড় না। ১৮২৪ এ জন্ম নেয়া একজন মানুষের গল্প। ছেলেবেলার প্রথম কয়েক বছর যশোরের গ্রামের বাড়িতেই। একটু বড় হয়ে মায়ের হাত ধরে যেতে হয় কলকাতাতে যেখানে বাবা কাজ করেন। সেখানেই বসবাস আর লেখাপড়ার সাথে সাথে অন্যরকম হয়ে ওঠা। পরে বাবার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে না চাওযার দরুন ধর্ম পরিবর্তন। তাই নিয়ে টানাপোড়েন। সাথে বড় কবি হয়ে ওঠার স্বপ্ন। স্বচ্ছল জীবনের ছন্দপতন। একসময় মাদ্রাসে যাওয়া বা পালানো। সেখানেই সত্যিকারের কবি বা লেখক হয়ে ওঠার চেষ্টা। সাথে বিয়ে সংসার। একজন শেতাঙ্গ।রেবেকা। চার সন্তারের বাবা হওয়া। টানাটানির সংসার যাপন।

সেখান থেকেও পালানো। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সম্পত্তির অধিকার নেয়ার যুদ্ধ। রেবেকার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করা। হেনরিয়েটার সাথে বিয়ে ছাড়া সংসার করা। সন্তানের পিতা হওয়া। পরপর তিনটি। এইসময়ে বাংলাতে লেখালেখির শুরু। শুরু ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ দিয়ে হলেও দ্রুতই তিনি লিখে ফেলেন ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’। তারপর মাত্র চার বছরের মত সময়ে ‘মেঘনাদ বধ’এ পৌছে যাওয়া বা এই ধরণের ছোটখাট মহাকাব্য লিখে হাত পাকিয়ে নেয়ার চেষ্টা। কিন্তু ছোটখাট মহাকাব্যই যখন যশ এনে দিল তখন লেখালেখি প্রায় ছেড়েই দেয়া। তখন অন্য যশের পেছনে ছোটা। ব্যারিস্টার হতে হবে। তাই বিলেত যাত্রা। তার জন্যটাকাপয়সার যোগার যন্ত্র। সেখানে গিয়ে টাকপয়সার সংকটে পড়া। সেখানে হেনরিয়েটার আগমণ। তাই ফ্রান্সের ভার্সায় যাওয়া। ব্যারিস্টারি পড়া স্থগিত রেখে সেখানে থাকা। ইউরোপিয়ান কিছু ভাষা শেখা। ‘হেক্টর বধ’ অনুবাদ বা লেখা। পরে আবার বিলেতে ফিরে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করা। এই সময়ের মধ্যে বিদ্যাসাগরের দারস্থ হওয়া। টাকা-পয়সার জন্য।

ব্যারিস্টার হয়ে পসার করতে না পারা। উচ্চাভিলাসী জীবন যাপন। পরিণামে অর্থাভাব। নিজের এবং হেনরিয়েটার জীবন সংসয়কে এগিয়ে আনা। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে শর্মিষ্ঠার বিয়ে দেয়া। অথচ একসময় নিজে পিতার পছন্দে বিয়ে করেননি। সন্তানদের জন্য নিশ্চিত কোন ভবিষ্যৎ রেখে যেতে না পারা এক জীবন। কবি জীবন। ১৮৭৩ এ যার অবসান।

গল্পটা খুব ছোট হলেও সেখানে অনেক বাঁক। সময়ের ভূমিকাও কম নয়। ইংরেজি না জানা পিতা ছেলেকে শিখিয়েছেন ইংরেজি। সেই ছেলে একসময় সযতনে ভুলে যেতে চেয়েছিল বাংলা। নিজের কোন ছেলে-মেয়েকে কখনো বাংলা শেখানও নি। সেই তাকেই বলতে হয়েছে ‘ রেখ গো মা দাসের মনে…’ নিয়তিই এর নির্ণায়ক কিনা কে জানে?

এই গল্পের খুটিনাটি বের করে আনা সহজ কাজ ছিল না। অন্তত এতবছর আগের নথিপত্র, চিঠিপত্র সব যাচাই বাছাই করা চারটিখানি কথা না। তার উপর যশোর, কলকাতা, মাদ্রাস, লন্ডন, ভার্সায়,ঢাকা এতগুলো শহরে ছড়ানো যে গল্প।

গোলাম মুরশিদের ‘আশার ছলনে ভুলি’ আসলে সেই গল্প বের করে আনারই গল্প বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। গোলাম মুরশিদের লেখা আমার ভাল লাগা শুরু করে তার ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ পড়ার পর থেকেই। এরপর থেকেই আমি খুজতে থাকি এই লোকের লেখা অন্য বইগুলো। তেমন একটা সফল হয়নি আমার এই অভিযান। কারণ ওনার বইয়ের বেশ কিছু ভারত থেকে প্রকাশ হয়েছে। বেশ কিছু বোধহয় এখন ছাপার বাইরে। আর খুব বেশি সংখ্যায় বোধহয় প্রিন্টও হয়না।

আনন্দ থেকে প্রকাশ হওয়া ‘আশার ছলনে ভুলি’এর তৃতীয় সংস্করণ দুই দফায় মোট প্রিন্ট হয়েছে ২০০০ (২০০৮ সাল পর্যন্ত)কপি। আর তাই এই বই যোগাড় করাটা খুব সহজ হবে এটা বোধহয় না। তারপরও আমি যে এককপি যোগাড় করতে পেরেছি সেটা ভেবে ভাল লাগছে। কারণ? এইভাবে যে কারো জীবনী লেখা সম্ভব সেটা আমার ধারণাতেই ছিল না।

আমি নাহয় খুব সহজে বলে দিতে পারি… জাহাজে করে কলকাতা থেকে কবি মাদ্রাস গেলেন। সাথে হয়তো যাত্রার তারিখও উল্লেখ করলাম। কিন্তু কবি কোন জাহাজেগিয়েছিলেন? সেই জাহাজটা কি ধরণের জাহাজ? যেতে কতদিন লেগেছিল? জাহাজের যাত্রীতালিকাতে কবি কি নামে টিকেট করেছিলেন? এই সব খুটিনাটি এতবছর পরে খুজে বের করা আজকের দিনে আর কারো পক্ষে কি সম্ভব?

বিয়ে বা ব্যাপটিজমের ক্ষেত্রেও কি কম তথ্য যোগার করেছেন গোলাম মুরশিদ ? মাইকেলকে লেখা কোন চিঠি সংরক্ষিত নেই। তবে মাইকেলের লেখা বেশ কিছু চিঠিসংরক্ষণ করা গেছে। সেখানে আবার তারিখের উল্লেখ আছে কমটাতেই। তাই সেখান থেকে ঘটনার ধারাবাহিকতা ঠিক করা !! ব্যাপক পরিশ্রম সাধ্য কাজ। প্যাশন না থাকলেএটা করা সম্ভব হয় না। লেখকের এই প্যাশন পাঠককে মুগ্ধ করবেই। আবার হয়তো পাঠককে একেবারে সমর্পিত করতে বাধ্য করবে। আমার ক্ষেত্রে অনেকটা তাই হয়েছে।

এর আগে কোন লেখকের জীবনী পড়ার পর সেই সব লেখকের লেখা পড়ার আগ্রহ তৈরী হয়েছে সাধারণত। কিন্তু এইবার হল অন্য রকম। গোলাম মুরশিদের লেখা মাইকেলের লেখার সমালোচনা পড়ার আগ্রহ তৈরী হয়েছে।

পাঠ প্রতিক্রিয়া

ট্রানজিট নিয়ে সাম্প্রতিক ভাবনা…

আজকের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ট্রানজিট নিয়ে বেশ কিছু খবর এসেছে। খবরগুলোতে অনেক তথ্য উপাত্য এসেছে। সেগুলো থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে সবপক্ষই এই ব্যাপারটাতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। আমি নিজে এই ব্যাপারটা খুবই জটিল বলে ভাবি। অনেক ধরণের হিসাব নিকাশ জড়িত এর ভেতরে। যার সবগুলো জানা বা বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব কিনা জানি না। আর তাই আমি সাধারণত ট্রানজিটের প্রশ্নে কোন বিশেষ পক্ষে যেতে পারি না।

তবে প্রকাশিত খবরের কিছু কিছু আমাকে উদ্বিগ্ন করছে। আমি দেখছি ট্রানজিট নিয়ে আলোচনাতে সজকপথ, রেলপথ এবং জলপথের তিনটিই বিবেচনাতে আছে। সেটাই হয়তো বাণিজ্য বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু আমি বাণিজ্য নিয়ে ভাবছি না। ভাবছি সময় এবং পরিবেশ নিয়ে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়েছি সাড়ে পাঁচ ঘন্টা বা তার কাছাকাছি সময়ে। ঢাকা থেকে খুলনা যেতাম সাত ঘন্টায়। কখনো কখনো একটু বেশি সময় লাগতো। হয়তো এক ঘন্টা যোগ হতো তাতে। ‘৯৭/৯৮ সালের দিকেএকবার আরিচা ঘাট পার হতে গিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পায়ে হেটেছিলাম। তাতেও ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে পৌছাতে সময় লেগেছিল সাথে সাত ঘন্টা। এতদিনে আমাদের রাস্তার প্রশস্ততা বেড়েছে কিছুটা হলেও। কিছু কিছু জায়গাতে বেশ কিছু বাই-পাস তৈরী করা হয়েছে। এখন বেশিরভাগ হাইওয়ে গাড়ি আর শহরের ভেতরে ঢোকে না। অন্তত দিনের বেলাতে। গাড়ির বহরে এরমধ্যে যোগ হয়েছে আরো দ্রুতগামী গাড়ি। তারপরও এইসব গন্তব্যগুলোতে যেতে আমাদের সময় কিন্তু আরো বেশিই লাগছে আজকের দিনে।কয়েকদিন আগেই আমার এক বন্ধু চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছে ১৪ ঘন্টায়। এখন চট্টগ্রাম থেকে ৯/১০ ঘন্টাতে ঢাকা আসতে পারলে আমরা বেশ খুশি হয়ে যায়।

রাস্তা বাড়ার পরও আমাদের এই বাড়তি সময় লাগার কারণ হল আমাদের যোগাযোগের প্রয়োজনও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে গাড়িও বেড়েছে প্রচুর। ফলে রাস্তার উপরে চাপ বেড়েছে অনেক। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এখন আমাদের রাস্তা বাড়ানোর দরকার হয়ে পড়েছে। সেটা শহরের ভেতরে বাইরে সবখানেই। কিন্তু তার জন্য দরকার ব্যাপক বিনিয়োগ। আর রাস্তা তৈরীতে আমাদের দেশে সাধারণত সরকারই বিনিয়োগ করে থাকে। তাই আমরা সাধারণ মানুষেরা এবং অবশ্যই বিনিয়োগকারিরাও তাকিয়ে আছি সরকারের দিকেই।

সরকার কিছু কাজও করছে। বেশ কিছু বড়বড় সেতু হয়েছে আমাদের। আরো কিছু হচ্ছে বা হওয়ার কথাবার্তা চলছে। তার জন্য বিবেচনাতে নিতে হচ্ছে বিস্তৃত পরিমাণ ফসলি জমি। এই ফসলি জমির রূপান্তরটাই আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

আমি একটু পুরোনো কথা মনে করতে চাই এই সময়। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশরা আমাদের দেশে রেল যোগাযোগ চালু করেছিল। এই রেল যোগাযোগের রুট ছিলমোটামুটি পূর্ব থেকে পশ্চিমের দিকে। কারণ তাদের টার্গেট ছিল কাচামাল যোগাড় করে কলকাতা বন্দরে নিয়ে যাওয়া। আর আমাদের এতদিনের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম ছিল যে নৌ-পথ সেটা মোটামুটিভাবে উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে প্রবাহিত। ফলে উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকে এই দুই ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে বেশ একটা টানাপোড়েন শুরু হয়। রেল নতুন প্রযুক্তি। সেটার গোড়াপত্তন যেমন হওয়া দরকার তেমনি দরকার নদীর পানি-প্রবাহ ঠিক রাখা। তা না হলে প্রভাব পড়তে পারে ফসলের উৎপাদনে।

ইতিহাস থেকে আমি যতটুকু জানি সেটা করা সম্ভব হয়নি। হয়তো সেটা করার ইচ্ছাও ছিলনা করো। ফলে এই সময়ে আমাদের দেশে ফসলের উৎপাদন কমতে শুরু করে ভয়াবহ ভাবে। তার পরিণতিতে ১৯৪৩ সালে আমাদেরকে যেতে হয়েছিল ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ভেতর দিয়ে। বাঙালির স্বাস্থ্য ১৮৯০ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত যে ব্যাপাক ক্ষয়ের ভেতর দিয়ে গেছে সেটা আমরা আজো ফিরে পাইনি। ১৯৪৩ এর পর আবার যে কিছুটা ফিরে আসতে শুরু করে তার কারণ এই না যে আমার খাদ্য উৎপাদন আবার বাড়তে থাকে ব্যাপক ভাবে। এর কারণ আমাদের মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া। উৎপাদিত খাদ্যের পরিমাণ আগের মতোই ছিল প্রায়।

১৯৪৮ এর পর আমাদের দেশে শুরু হয় সড়ক পথের নির্মাণযজ্ঞ। সেটা এখনো চলছে। সড়ক পথেই আমরা এখন আমাদের বেশির ভাগ যাতায়াত সারি। খুব সম্ভবত আশির দশক থেকেই আমাদের দেশে সড়কপথের পরিমাণ ব্যাপকতর হতে শুরু করে। সেই সড়ক পরিকল্পনাতেও যে পানি-প্রবাহের ব্যাপারটা ছিল না সেটা আমরা টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে। কয়েকটি ব্যাপক বন্যা থেকে। বন্যা আমাদের দেশে হতই। তাতে পলি পড়ত। আর তার ফলে ফসলের উৎপাদন বাড়ত বলেই জানতাম। কিন্তু রেল চালুর পর থেকে আমরা পরিচিত হই জলাবদ্ধতার সাথে। সড়ক ব্যবস্থার বিকাশের পর এই জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা বেড়েছে বিপুল ভাবে। তার ফলে প্রায় প্রতিবছরই আমাদেরকে বিপুল ফসলহানীর শিকার হতে হয়।

এর ভেতরে আমাদের চাষাবাদেও বেশ কিছু উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে। তাই উৎপাদনও বেড়েছে। তারপরও যে আমরা ব্রিটিশ আমলে ১৯০০ সালের আগে পর্যন্ত চাল রপ্তানি করতাম তা এখনো আমাদেরকে আমদানি করতে হয়। আর এই আমদানির ব্যাপারটাতে কিছুদিন আগেই আমাদের খুব কঠিন একটা শিক্ষা হয়ে যাওয়ার কথা। এইতো বছর ২/৩ আগেই। বিভিন্ন করণেই আমাদের উৎপাদন হয়েছে কম। সারা পৃথিবীতেই তাই। আমাদের হাতে টাকা থাকার পরও আমরা কিন্তু চাল কিনতে পারিনি। ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের অনেকেই তখন চাল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার পাশের বাড়ির মানুষটিও যে তারজন্য প্রয়োজনীয় চাল কিনতে পারছেন না সেটা আমি দেখেছি। এবং কিছুই করতে পারিনি। তখন রাষ্ট্র বলেছে তার হাতে টাকা আছে কিন্তু বিশ্ববাজারে চাল নেই। আর আমি দেখেছি বাজারে চালের দামের উর্ধ্বগতি।

ফিরে আসি ট্রানজিটের প্রশ্নে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে। তাতে সড়কের পরিমাণ এবং মান বাড়বে। বাড়বে বন্দরের অবকাঠামো। বাড়বে রেল পথ। কিন্তু ফসলি জমি যে কমে যাবে সেটা কেন কেউ বলছে না? বিনিয়োগ করা টাকা কত দিনে উঠে আসবে সেই হিসাব আছে। কিন্তু কি পরিমাণ জমি চাষাবাদ থেকে বাদ পড়বে সেটার কোন হিসাব দেখছি না। ফসলের উৎপাদন কতটুকু কমবে সেটা কি কেউ হিসাব করছে? সেটা পুশিয়ে নেয়া হবে কিভাবে সেটা কি আমরা জানতে চাইতে পারি না?

ট্রানজিট নিয়ে যারা আলোচনাতে বসছেন তাদের ভেতরে আমি কোন ইতিহাসবিদ দেখছি না। দেখছি না কোন আরবান বা রুরাল প্লানারের নাম। পরিবেশ-বিশেষজ্ঞের চিহ্নই নেই সেখানে। শুধু একটা কথার উল্লেখ দেখছি। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার কথা। আমি মনে করি না এত গুরুতর একটা বিষয়ে এইটুকুউল্লেখই যথেষ্ট। আপনাদের কি মনে হয় ?

পাঠ প্রতিক্রিয়া

প্রকাশিত খবর নিয়ে উদ্বেগ…

২৯ মার্চ (সোমবার), ২০১০ ১২:০৯ পুর্বাহ্ন

আজকের ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় এরই ভেতর “রাজউকের ফার নিয়ে বিপাকে ক্ষুদ্র প্লট মালিকেরা” শীরনামের খবরটা দেখেছেন। প্রতিবেদক মোহাম্মদ আবু তালেবের তথ্য অনুযায়ী এরই মধ্যে রাজধানীর ছোট প্লটের মালিকদের ৭০ ভাগ ভবন নির্মান বন্ধ রেখেছেন। এবং তাদের কারো কারো ভেতর চাপা ক্ষোভও নাকি দানা বেধেছে।

খবরটা আমাকে খুব একটা বিচলিত করেনি। তবে একটা ব্যাপার বিচলিত করেছে সেটা হল ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬’ এর বেশ কিছু নিয়ম আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। কেন সেটা একে একে বলি… (সবগুলো হয়তো বলতেই পারব না… বেশিরভাগই হয়তো না বলা থেকে যাবে)

ঢাকা শহরে যারা বেশ লম্বা একটা সময় ধরে আছেন তারা বোধহয় খেয়াল করে থাকবেন ১৯৯৬ এর পর থেকে ঢাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে। এই সময় থেকেই ঢাকার যথেচ্ছা এবং বিপুল নির্মাণযজ্ঞ শুরু। কারণ প্রথমত অবশ্যই চাহিদা। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে পুঁজির প্রথমবারের মতো বেড়ে ওঠা। সাথে সাথে শহরেরই বেড়ে ওঠার প্রবণতা। তৃতীয়ত প্রশাসনিক কারণে অন্য শহরগুলোর গুরুত্ব কমে যাওয়া। …. আরো অনেক কারণের সাথে ১৯৯৬ এর ইমারত নির্মাণ বিধিমালাও। কারণ এই বিধিমালাতেই ভূমির ৭৫ শতাংশে ইমারত নির্মাণের অনুমোদন ছিল। আর যেহেতু ডিভেলপাররা মোটামুটি দাড়িয়ে গেছে ততদিনে পুঁজি এবং সংগঠন নিয়ে, তারা তখন সুযোগ নেয় এই নিয়মের। আর যার ফলস্বরুপ আমাদেরকে আজ দেখতে হচ্ছে ঢাকার এই অপরিকল্পিত বেড়ে ওঠা। সামান্য কিছু সেট ব্যাক ছেড়ে দিয়েই তখন ভবন বা বিল্ডিং বানানো যেত। সেই বিল্ডিং এ যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা আছে কিনা তার কোন নির্দেশনা সেই নিয়মে ছিল না। ছিল না ভবনের সাথে পার্কিং লাগবে কি লাগবে না তার নির্দেশনা এবং বাধ্যবাধকতা। তৈরী করা ভবনে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ করা যাবে কিনা সেই নিয়েও কোন ভাবনা ছিল না এই নিয়মের ভেতরে। হয়তো সেদিন এই নিয়ে ভাবার মতো লোকজনও ছিল না আমাদের দেশে।

সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা জমতে শুরু করেছে আরো কিছু বছর আগে থেকেই। বেসরকারী কিছু ব্যাংক ব্যবসা করতে নেমেছে ইতিমধ্যে। তাদেরকে টিকে থাকতে হলে ঋণ বেচতে হবে। সবমিলিয়ে প্রচুর মানুষ ভবন বানাতে শুরু করল। সাথে সাথে মোটর গাড়ির দামও কমানো হয়, বিশেষত রিকণ্ডশনড গাড়ির, এই সময়ে। তাই মানুষ গাড়িও কিনতে লাগল দেদারছে। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই সবাই দেখতে পারবেন এই সময় রাজধানীকে নিয়ে বড় ধরণের কোন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেনি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠাণই। কারণ অবশ্যই তাদের যোগ্যতা এবং সামর্থের অভাব।

দশ বছরের ভেতরেই প্রচুর নতুন নতুন বিল্ডিং যার বেশির ভাগই আবাসিক তৈরী হয়ে গেল। এটা করতে গিয়ে ভরাট হল অনেক ডোবা, নালা, খাল, লেক। কিছু রাস্তাও তৈরী হল। অবশ্য তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বসানো হল প্রচুর গভীর নলকূপ। ভূগর্ভ থেকে উঠানো হতে থাকল বিপুল পরিমাণ পানি। এদিকে মাটির উপরিতল আর খালি নেই বললেই চলে। ফলে একটা সময় আমরা আবিস্কার করলাম, যে পরিমাণ পানি আমরা মাটির নিচ থেকে তুলে নিচ্ছি সেই পরিমাণ পানি আর মাটির নিচে জমা হচ্ছে না। এত দিন আমাদের সমস্যা ছিল পানি না তুলতে পারা এবং সেই পানি ঠিক ভাবে পরিবহন করতে পারা। কিন্তু এখন আমাদের সমস্য হল মাটির নিচে পানিই না থাকা। কিন্তু মাটির নিচে যে জায়গাতে পানি জমে সেখানে তাহলে থাকছে কি? উত্তর হল… সেই জায়গাটা ফাঁকা থাকছে। ফলে বাড়ছে জমি হঠাৎ করে বসে যাওয়ার আশংকা। সেই আশংকা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে জমির উপর গজিয়ে ওঠা বিপুল সংখ‌্যক ইমারত যাদের ভর যে কত বিপুল তা একবার অনুমান করে দেখুন…. ঢাকাতে ভূমিকম্প হলে এই জমি বসে যাওয়ার ভয়টা ইমারত ভেঙে পড়ার থেকেও অনেক বেশি। কিন্তু কে ভাবে কার কথা। সবাই দেখে সাময়িক লাভ।

প্রতিদিন রাস্তায় এত যানজট হয়। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি। কিন্তু রাস্তার পরিমাণ বাড়ানোর কোন চিন্তা আমরা করি না। বরং চিন্তা করি আরো বেশি বেশি বড় বড় ইমারত বানিয়ে কিভাবে রাস্তার উপর প্রেশার আরো বাড়িয়ে দেয়া যায়। একটা ইস্কুলের সামনে বা একটা বড় শপিং-মলের সামনে কতটা চওড়া রাস্তা দরকার সেটা আমরা ভেবে দেখতেই চাইনা।

খানিকটা আশার কথা আমাদেরকে শুনিয়েছিল ইমারত নির্মাণের ২০০৮ এর বিধিমালা। আমি নিজে একজন নির্মাণ শ্রমিক হওয়ায় জানি অন্তত রাস্তা আর জমি উন্মুক্ত রাখার যে ব্যবস্থাটা এই বিধিমালাতে আছে সেটা বেশ ভাল। যদিও যথেষ্ট নয়। আমাদের ২০০৪ সালের একটা আবাসন নীতিমালা আছে। যেখানে বলা আছে এক একর আবাসিক এলাকাতে সর্বোচ্চ ৩৫০ জন লোকের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে। আমাদের মাটি, পানি এবং সার্বিক পরিবেশ বিবেচনায় সেটা বেশ যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ২০০৮ এর বিধিমালার ‘ফার’ হিসেব করে ইমারত বানালে দেখা যায় আমরা আসলে এক একরে প্রায় ১০০০ মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তার জন্য যে রাস্তার ব্যবস্থা করছি সেটা কিন্তু ঐ ৩৫০ জনেরই। পানি, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন আর বিদ্যুতের কথা না হয় বললামই না।

বাতাসের কথা কি বলব ? আমরা ঢাকার লোকজন তো বোধহয় ভুলেই গেছি বেঁচে থাকার জন্য মানুষের বাতাসও লাগে। হৃদরোগের সমস্যা, হাপানির সমস্যার অন্যতম প্রধাণ কারণ যে আমাদের এই আটোশাটো বিল্ডিংগুলো সেটা আমরা কেউ ভাবতেই চাই না। হয়তো কিছু মূল্যবান জমি খোলা রেখে দিলে আমাদের ওষধ পথ্যে খরচ অনেক কমে যেত।

কিন্তু বেশখানিকটা অপরিকল্পিত ভাবে বেড়ে ওঠা এই শহরের অস্থির মানুষদের মাথায় যে চেপেছে টাকার নেশা, মুনাফার নেশা। যেভাবেই হোক তারা ইমারত বানাবে এই ছোট্ট শহরের ভেতরেই। তার জন্য তারা মৃত্যকেও যে মেনে নিতে বা আগিয়ে আনতে রাজি সেটা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি না জেনে না বুঝে বা নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এমনটা করছে মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হল, ঢাকার মানুষ জেনে শুনেই এই ভয়ঙ্কর মরণ খেলায় নেমেছে। প্রয়োজনে সে সেই পুরোনো আইন ফিরিয়ে আনবে যে আইন তাদেরকে দিয়েছে ভগ্নস্বাস্থ, যানজট, পরিবেশ দূষণ… এইরকম আরো অনেক কিছু….