প্রবচন – ২৫

১.
বিশেষ কোনো একজন ব্যক্তি একটা জায়গায় হেগেছিল, মুতেছিল, সেক্স করেছিল, বাচ্চা পয়দা করেছিল বা মরে গিয়ে পচে গিয়ে পোকামাকড়ের খাবার হয়েছিল ব’লে জায়গাটা পবিত্র হ’য়ে উঠেছিল – এমন আইডিয়ার গূঢ় ব্যাপারটা আজো বুঝে উঠতে পারলাম না, শুধুমাত্র বিপুল সংখ্যক মানুষকে বোকা বানাতে সফল হওয়ার ব্যাপারটা ছাড়া।

২.
যে প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক মতো কাজ করেনি তাকে বিলুপ্ত বা পরিবর্তীত না করলে তারা পরবর্তীতে আরো বড়সড় ক্ষতি ডেকে আনে। যেমনটা আনছে বর্তমানের বেশ কিছু ব্যাংক। যেমনটা এনেছিল বেশ কিছু সরকারী পাটকল, চিনিকল, কাপড়কল বা অন্য ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলো।

৩.
ইয়াসমিনের ধর্ষণ আর হত্যার মামলার বিচারের রায় কর্যকর করা হয় ২০০৪ সালে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৪ সাল। আট বছরের কিছু বেশি সময়। ইয়াসমিনের হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অন্তত ৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সে মৃত্যুর বিচার হয়েছে কিনা জানা হয়নি। ১৯৯৮ সালে খুন হওয়া শাজনীনের হত্যা-মামলার রায় কর্যকর হয়েছে ২০১৭ সালের নভেম্বরে। শাজনীনের বাবা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী। তারপরও বিচার পেতে সময় লেগে গিয়েছে ১৯ বছর। যে বিচার ব্যবস্থায় বিচার পেতে এতটা সময় লাগে তাকে নিয়ে উপহাস না করাটাই তাকে এক ধরণের অবমাননা করা।

এরশাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ সে সেনাপ্রধান হয়েও সরকারী ক্ষমতা দখল করেছিল। আমাদের বিচার ব্যবস্থা এই অপরাধের জন্য এরশাদকে কখনো বিচারের মুখোমুখিও করেনি। ধিক সেই বিচার ব্যবস্থাকে। ধিক সেই বিচার ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা লোকগুলোকে।

আমরা ব’লতে পছন্দ করি যে, যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবন। বাংলাদেশে যেই সরকার গঠন করে সেই লুণ্ঠনকরী হয়ে ওঠে। অথচ ৬০/৭০ জন মন্ত্রী বা ক্ষমতাশালী লোক আর কতটা লুণ্ঠন করতে পারে? যাও বা পারে সে সরকারী কর্মচারীদের বদৌলতে। আমাকে তো পুলিশকে ঘুম দিতে হয়েছে পাসপোর্ট করতে গিয়ে। রাজউকে ঘুষ দিতে হয়েছে ড্রয়িং জমা দিয়ে। একবার ঢাকা বোর্ড থেকে সার্টিফিকেট তুলতে গিয়েও ঘুষ দিতে হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা কয়টা সরকারী কর্মচারীকে বিচারের মুখোমুখি করেছে?

অভিজ্ঞতায় জানি মফস্বলের খুব কম বিচারকই ঘুষের লেনদেন করেন না। বছরের পর বছর ধরে এটা চলে আসছে। আদালত কতজন বিচারককে বিচারের মুখোমুখি করছেন এই বাংলাদেশে?

বিচার পেতে সময় লাগে অনেক। তার উপর অনেক আইনই বৈষম্য সৃষ্টির কারণ। যেমন সম্পত্তি হস্তান্তর আইন। আয়কর আইন। বৈষম্য সৃষ্টিকারী আইন কোনো আইন হতে পারে না। একে অসম্মান করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। একে প্রতিরোধ করাটা আমাদের কর্তব্য। আমাদেরকে বলতেই হবে এইসব আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। এই বিচার ব্যবস্থা অসুস্থ। একে পালটাতে হবে। বিচার পেতে এত সময় লাগতে দেওয়া যাবে না।

বিচারের এই দীর্ঘসূত্রীতা এতদিন শুধু উকিল, মোক্তার আর বিচারকদের বিত্ত-বৈভবই বাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশে দাড়িয়েছে কমই। এই বিচার ব্যবস্থা আর আইনকে অসম্মান না করাটা প্রকারন্তরে নিজেদেরকেই অসম্মান করা।

৪.
মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যে লোকগুলো অমরত্বের প্রলোভন দেখিয়েছিল মানবসমাজকে, তাদের স্মৃতিই বয়ে বেড়ায় অভাগা অনুসারীরা।

প্রবচন – ২৪

১.

এরশাদ অবশ্যই একজন ব্যতিক্রমী স্বৈরাচার, যিনি প্রথা মাফিক আরেক জন স্বৈরাচারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে কেটে পড়তে চাননি। হয়তো আরেক জন স্বৈরাচারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেওয়ার যে ঝুঁকি থাকে সাধারণত তা এড়াতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় নিজের প্রাণটা বাঁচিয়ে নিতে এবং তারপর দেশেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। আর সেজন্যই দরকার পড়েছিলো কোনো না কোনো রাজনীতিকের উপর নির্ভর করা। সে রাজনীতিক রাজনীতিতে তেমন অভিজ্ঞ না হলেই এরশাদের পক্ষে ভাল- এমন ধারণা করাটা বেশ সহজই। শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার পেছনে এরশাদের ভূমিকা কতটা প্রত্যক্ষ জানি না তবে পরোক্ষ প্রভাব কম নয়।

২.

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র-বিমোচনে ভূমিকা রাখে বা রেখেছে – তা যে প্রধাণমন্ত্রী জানেন না তা নয়। তিনি যে এটা নিষিদ্ধ করছেন না – তা থেকেই এটা বোঝা যায়। তবুও রাজনৈতিক কারণে যখন তিনি এটার বিরোধীতা করেন তখন এই ব্যাপারে তাঁর কাছ থেকে আরো একটু বাড়তি ডিটেইল আশা করছি। কারণ আমাদের জানাশোনা অনুযায়ী কিছু ক্ষুদ্রঋণ যেমন কাজ দিয়েছে কিছু তেমন কাজ দেয়ওনি। যেগুলো সামগ্রিক বিচারে নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে সেগুলোকে চিহ্নিত ক’রে সে ব্যাপারে তাঁর পদক্ষেপ কাম্য।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতে সব ধরণের মানুষকে যুক্ত করে নেওয়াটা এই সময়ের উন্নয়ন ভাবনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ যে সহায়ক হয়েছিলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খানিকটা হলেও সেটা আমাদের অর্থমন্ত্রী ঠিকই জানেন। তবু রাজনীতিতে একটু কম পটু হওয়ায় সেই ব্যাপারটা স্বীকার করতে গিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রী তার দলেরই একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রশংসা করে বসেন। একজন সাবেক আমলা এবং স্বৈরাচারের সাবেক অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে খুব বেশি রাজনৈতিক দক্ষতা আশা করা যে যায় না তা আবারো জানলাম। (২২ জানুয়ারি ২০১৭)

৩.

বাংলাদেশে প্রচুর আইন আছে যেগুলো পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। আমি বিল্ডিং সেক্টর নিয়ে এটা নিশ্চিত ক’রেই বলতে পারি। নির্মাণ বিধি এক রকম তো পরিবেশের বিধি আর এক রকম। সিটি-কর্পোরেশনের বিধির সাথে ট্রাফিক আর বিদ্যুত অধিদপ্তরের বিধির অনেক স্থানেই মিল নেই। আগুন নির্বাপণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধি আবার অন্য কথা নিয়ে হাজির হয়। মোটের উপর স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও আমরা সারা দেশের জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ বিল্ডিং কোড বা ইমারত নির্মাণ বিধি পাইনি। আমাদের ইমারত নির্মাণ আইন সেই ১৯৫২ সালে প্রনয়ন করা, যেটা আবার সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। যার রিভিশন দরকার হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। ব্যাপারটা এই সেক্টরে যারা কাজ করছেন তারা যে সংসদ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানাননি তাও নয়। অনেক অনেক বার বলা হয়েছে। অনেকবার খসড়া তৈরী করে সংসদের বিবেচনার জন্য পাঠানোও হয়েছে। যে সব খসড়া তৈরী করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ এবং বিজ্ঞ অনেকে দীর্ঘ সময় খেটেছেনও। একটু খোঁজ নিলেই সেগুলো জানা যাবে। ২০০৬ এর পর ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অফিসিয়ালি প্রিন্ট করা হয়নি। হাউজ বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট প্রতিবছর বিল্ডিং কোড আপডেট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তা গেজেট আকারে আসছে না। কেন আসছে না তাও জানানো হয়না কাউকে।

পৌরসভাগুলোতে নির্মাণ বাড়ছে। তার স্টান্ডার্ড কেমন হবে তা বলা বিধির আইনগত ভিত্তি নেই আজও, কারণ সেই ১৯৫২ সালের ‘বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন এ্যাক্ট’ এর সীমাবদ্ধতা – যা পৌরসভাগুলোতে ইমারত নির্মাণ নিয়ে কোনো ধরণের বিধি এর উপস্থিতির বৈধতা দেয়নি।(পৌরসভাগুলোতে যে বিধিগুলো সাধারণভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে সে বিধিগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই। সত্যি বলতে সেগুলো বিধি নামের প্রহসন। এ বিষয়ে দক্ষ এক ব্যক্তি এ বিধিগুলোকে ‘ব্যাধি-মালা’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন ‘বিধিমালা’র পরিবর্তে।) আমাদের মতো জনবহুল অথচ আয়তনে ছোট একটা দেশের জন্য নির্মাণ প্রসঙ্গে সার্বিক একটা পরিকল্পনা থাকাটা এই সময়ে খুবই দরকারী। সেটা মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে যেমন সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থেও তেমন। ব্যাপারগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে বলে জানতে পারিনি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আছে রাজউকের প্লট আর ফ্ল্যট ব্যবসা নিয়ে। অতীব প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়েও বিধি প্রণয়নের মতো সময় যে তাদের হাতে নেই সে আমরা বুঝে গেছি।

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কিছু লোকের তৈরী করা বিধিগুলো শেষ পর্যন্ত সংসদ থেকে পাস হয়ে গেজেট আকারে প্রকাশ হয়না। কারণ নতুন সেসব বিধিগুলো অনেকের স্বার্থের সাথে মেলে না। বিশেষ ক’রে সেই সমস্ত সংসদ সদস্যদের যাদের সাথে বিল্ডিং ব্যবসার সরাসরি সংযোগ আছে। সংসদ যে এই ব্যাপারে অকার্যকর বা ডিসফাংশনাল হয়ে গিয়েছে দীর্ঘসূত্রীতার কারণে তা বলাটা ভুল হবে না। ব্যবসায়ীরা আইন প্রণয়নের হর্তাকর্তা হয়ে বসলে এমনই হওয়ার কথা। ইস্ট-ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন আমাদের তো ভোলার কথা নয়। আবার হয়তো পুরোটা মনেও নেই আমাদের। তাই সংসদের অর্ধেকের বেশি আমরা ব্যবসায়ী দিয়ে ভরে তুলেছি।

রাজনীতিক সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদের অভাব বোধ করছি বড্ড বেশি আজ। যারা আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলবেন। আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করবেন। প্রণীত আইন কার্যকর করার উপায় নিয়ে কথা বললেন। যারা আইনের সাথে ব্যক্তিপূজা গুলিয়ে ফেলবেন না। নিশ্চিত ভাবেই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াতে ধর্ম আর ব্যক্তিপূজা টেনে আনেন যারা তাদেরকে দক্ষ আইন প্রণেতা বলা যায় না।

৪.

‘ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট’ ব্যাপারটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কথা হচ্ছে বাংলাদেশে। প্রত্রিকার পাতায় খবরও কম আসেনি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ব্যাপারটা নিয়ে কতটা কী ভেবেছে সেটা আমার কাছে ঠিক পরিস্কার নয়। ২০০০ সালের পর থেকে দেশে অবকাঠামো খাতে যতটা বিনিয়োগ করা হয়েছে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা কম নয়। কিন্তু ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্টের সুবিধা নেয়ার জন্য তা বিশেষ সহায়ক নয়। একটা পদ্মা-সেতু তৈরী করতে বছর চারেক লাগতে পারে। তাতে অর্থনীতির অনেক সূচকে উন্নতি আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ একটা তরুণকে আজকের পৃথিবীর জন্য তৈরী ক’রে নিতে তার পেছনে প্রায় বিশ বছরের প্রচেষ্টা দরকার। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা তার দক্ষতার উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

অথচ বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতাবৃদ্ধির পেছনে তুলনামূলকভাবে গত ১৭ বছরে যথেষ্ট বিনিয়োগ করা হয়নি। ১৬/১৭ কোটি মানুষের একটা দেশে অন্তত পাঁচটা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থাকা দরকার। আছে একটা। তাও তার লোকেশন এমন একটা স্থানে যে তার কলেবর বৃদ্ধি করাটা বেশ কঠিন। কোনো কাজের জন্য দক্ষতা অর্জন করতে হ’লে আগে শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা চায়। জানি না নীতি-নির্ধারকেরা এটা নিয়ে কতটা ভেবেছেন। 

তরুণরা যদি কাজ না পায় তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তারা মাদকের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। তার একটা ভাল প্রতিকার হতে পারে ক্রীড়া আর সংস্কৃতি। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট। অথচ অনেকগুলো জেলা র’য়ে গেছে যেখানে ভাল-মানের মাঠ নেই ক্রিকেট খেলার জন্য। আমরা যদি সবগুলো জেলাতে একটা ক’রে ক্রিড়া কমপ্লেক্স তৈরী করতাম- তা বেশ উপকারী হতো। প্রথম অবস্থায় সেখানে প্রচুর অবকাঠামো তৈরীর দরকার নেই। বড়সড়ো খোলা মাঠ (অন্তত আলাদা আলাদা ২/৩টা ক্রিকেট মাঠ আর ১/২টা ফুটবল মাঠ) আর জিম হ’লেই চলবে। তবে মাঠগুলো নিয়মিত মেইনটেনেন্সে থাকতে হবে। গ্রাউন্ড যেন সবসময় খেলার উপযোগী থাকে তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাতে বেশ কিছু ইন্সট্রাকটর আর গ্রাউন্ডসম্যানের চাকরীও হবে। আর ক্রীড়া ক্ষেত্রের উন্নতি তো আশা করা যায়ই। সংস্কৃতি ক্ষেত্রটা নিয়ে ভাবনার অবকাশ তো আরো বেশি। যখন সংস্কৃতিটা আবার ব্যবসার অংশও হয়ে উঠেছে। গান-নাটক-চিত্রকলার স্কুলের পেছনে অনেক আনেক বিনিয়োগ আর মনোযোগ দরকার। দেশের টিভি চ্যানেল আর পাইরেসি নিয়ে নতুন ক’রে না ভাবলেই নয়। আমাদের ছেলেমেয়েদের ক্রিকেট খেলা বা অন্য কোনো খেলা আমাদেরকে দেখতে হবে। টিভিতে সেটা দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাধুলা নিয়ে কী ক’রে টিভি প্রোগ্রাম বানাতে হয় সেটা শেখাতে হবে মিডিয়া স্কুলে। এতদিন সেটা ঠিক মতো হয়নি বলেই আজো আমাদের একটা ভাল স্পোর্টস চ্যানেল নেই।

তরুণদের জানাশোনাতে যেন বৈচিত্র থাকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। তাদের কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। এগুলো করার জন্য প্রথমেই যেটা দরকার তা হলো শিক্ষা আর চিকিৎসা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ। সেটা আমরা করতে পারিনি বলেই আজো আমাদেরকে অনেক ব্যাপারেই বাইরের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ছোটখাটো একটা সেতু তৈরীর জন্যও আমাদের তাই বাইরের ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্য নিতে হয়। ২০০৮ থেকে স্বল্প-পরিসরে জাহাজ রপ্তানি শুরু করলেও জাহাজ ডিজাইন করার মতো দক্ষতা আজো আমাদের নেই। পোশাক তৈরীতে আমাদের দক্ষতা এখনো নিচের দিকে। আমরা পোশাকের ডিজাইন করি না বললেই চলে। একটা ভাল ফ্যাশন স্কুল আর প্রডাক্ট ডিজাইন স্কুল তৈরী করা খুবই দরকারী এখন। এটা করার জন্য যদি কিছু অবকাঠামোগত কাজ বাদ দিতেও হয় আমি তার পক্ষে। যদিও সবগুলো একসাথে করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। করতে চাই কিনা সেটাই বোধহয় আসল বিষয়। আমি এখানে যেটা বলতে চাইছি সেটা হলো অনেকগুলো ব্যাপার আমাদের যথাযত মনোযোগ পাচ্ছে না ব’লে মনে হচ্ছে।

প্রবচন -২৩

১.
যাত্রার পথ দীর্ঘ হলেই যে তা দুর্লঙ্ঘ হয়তা নয়।

২.
মানুষের পক্ষে আমিষ না খাওয়ার একটাই যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। সেটা দারিদ্র। পুরাকালে তার প্রকৃতি ছিলো সামর্থ্যে। অর্থাৎ আমিষ সংগ্রহে ব্যর্থতা। একালেও যে সেটা নেই তা নয়। তবে তার সাথে বাড়তি যোগ হয়েছে বুদ্ধি আর জানা-শোনার দারিদ্র।

বাঙালি বিধবাদেরকে যে এক সময় আমিষ খেতে দেয়া হ’তো নাতার একটা উদ্দেশ্য ছিলো তাদের মৃত্যুর সময়ক্ষণকে নিশ্চিতভাবেই আরো আগিয়ে আনা।

৩.
সম্পর্ক যখন আর পারস্পারিক থাকে নাতখন তা দায় হয়ে দাড়ায়। আর দায় সময়ের ব্যবধানে এক সময় পীড়াদায়ক হয়ে ওঠেই।

৪.
১৯৪৭ এর দেশভাগকে একধরণের গণ-হত্যা বলা যেতে পারে। মিথ্যা দুইটা জাতীয়তার ধারণা তৈরী ক’রে দুই তীরের মানুষদেরকেই হত্যা করা হয়েছে। যেমন শারীরিক ভাবেতেমন সাংস্কৃতিক ভাবেও। সাংস্কৃতিক হত্যার ব্যাপারটা এত সফল যে তা দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক হত্যার কারণ হয়েছে। এমনকি এতটা বছর পরেও তা ক্রিয়াশীল আছে। সীমান্তে আজকের হত্যাকাণ্ডগুলো সব বিচারেই ১৯৪৭ এর গণহত্যার প্রলম্বিত সংস্করণ।

প্রবচন – ২২

১.

পৃথিবীর সবচেয়ে কম দুর্নীতি পরায়ন দেশগুলোর একটা নাকি সুইৎজারল্যান্ড। অথচ এরাই পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতি-গ্রস্ত মানুষগুলোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেদের ব্যাংকগুলো ভ’রে রেখেছে। আর সেই সব ব্যাংকের জোরে তাদের তরতাজা অর্থনীতি। চোরের উপর বাটপারির- এর থেকে বড় উদাহরণ পাওয়া দুষ্কর।

২.

একদা নির্বাণ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানব-জন্ম বেঁচে ছিলো দীর্ঘকাল। কিন্তু এই জগতে যে নিঃশেষিত হয় না কিছুই – তা জানতে পেরিয়ে গেছে আরো দীর্ঘতরকাল। রূপান্তরের ভাবনা নিয়ে যে বেঁচে থাকা তা আসলে এক ধরণের মরতে থাকা, মরে যাওয়া আর এক ধরণের জীবন পাওয়া। নির্বাণ বলে কিছু নেই।

৩.

দেহ-ব্যবসায়ী খেতাবটা এযুগের বাংলাদেশের ডাক্তারদের সাথেই বেশি মানানসই।

৪.

বাংলাদেশের বড়বড় বিল্ডিংগুলোর বেশিরভাগই সরকারি, আধা-সরকারি, মিলিটারি কিমবা কিছু বিজনেস গ্রুপের। এই বিল্ডিংগুলোর ফলকগুলোতে নাম লেখা থাকে যারা বিল্ডিংগুলো উদ্বোধন করেন বা ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করেন তাদের। কখনোই বিল্ডিংগুলো ডিজাইন করেছেন যারা তাদের নাম উল্লেখ থাকে না সেখানে। কালেভদ্রে হয়তো ডিভেলপারের নাম উল্লেখ থাকে।

উন্নয়নের পেছনে যাদের মেধা আর শ্রম মূল নিয়ামক তাদেরকে আমরা এইভাবে প্রতিনিয়ত উপেক্ষা ক’রে চলেছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম ধারণাই পায় না কাদের হাতে এইসব স্থাপনা, ব্রিজ বা রাস্তাগুলো তৈরী হলো। তাদের ভেতর তাই যদি উৎসাহহীন আর মেধাহীনের ভীড়ই বেশি থাকে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

প্রবচন – ২১

১.
দেশপ্রেম একটি সেকেলে ধারণা। যে ধারণা আজকের দিনে কিছু স্বার্থভোগীকে বাড়তি কিছু সুবিধা দেয়া ছাড়া তেমন একটা কাজে আসে না।

২.

আমি এমন একটা সময়ে বাস করি, যে সময়ে আমার অর্জনগুলো সব টাকায় রূপান্তর হয়ে যায়। আর সেই টাকাগুলো আমাকে রাখতে বাধ্য করা হয় যাদের কছে, আমি ব্যাংকের কথা বলছি, তারা প্রতিনিয়ত সেখান থেকে চুরি ক’রে চলেছে।
আমার যুগের ব্যাংকারগুলো সুনিপুণ চোর আর সাংবাদিকগুলো সবচেয়ে বড় মিথ্যেবাদী। কথা ছিলো সাংবাদিকেরা চোরদেরকে চিনিয়ে দেবে। অথচ তাদের থেকে সর্বদা শুনি চোরদের গুণগান।

৩.
গত কয়েক বছরে বই যেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। অবশ্য সব বই নয়। যে বইগুলো প্রশ্ন করে বা প্রশ্ন করতে বলে সেগুলো। কিন্তু বাংলাদেশের যে কমিউনিটি- তা তো কোনো বইয়ের কারণে গ’ড়ে ওঠেনি। বরং এই প্রশ্ন করতে শেখানো বইগুলোই বাংলাদেশের মানুষগুলোকে গ’ড়ে তুলতে পারতো আগামীর জন্য। মুর্খ এই আমরা তাও বুঝতে পারলাম না।

৪.

আজকের নামকরা মিউজিয়ামগুলো ঘুরে ঘুরে আমরা আহা উহু করি আর ভুলে যাই যে, সেখানে প্রদর্শিত বেশিরভাগ জিনিসই আসলে চুরি করা। আমাদের সময়ের নৈতিক মানদণ্ড বুঝতে এটা বেশ সহায়ক।

প্রবচন – ২০

১.

লেখকরা যে সবসময় নতুন কিছু লেখেন তা নয়। শেক্সপিয়রের লেখাতে মৌলিক প্লট কোনো বিচারেই দেড়খানার বেশি নয় ব’লে বলা হয়। তারপরও শেক্সপিয়র গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি প্রচলিত প্লটগুলোকে নিজের মতো ক’রে, নিজের সময়ের মতো ক’রে লিখতে পেরেছিলেন। এই নিজের মতো ক’রে বলতে পারা এই সময়ের লেখক চাই। যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে পুরোনো লেখকদের লেখা পড়েই সময় পার করতে হবে এই সময়ের পাঠকদেরকে। তাতে পাঠকেরা নিশ্চিতভাবেই নিজেদের সময়ের সংকটকে পুরোপুরি জানতে পারবেন না। ফলে হতাশায় ভুগবেন।

যে সময়ে বা যে অঞ্চলে ভাল লেখক তৈরী হয়না তা পরিণামে গুরুত্ব হারায়।

২.

আকাঙ্ক্ষা ভাল না মন্দ – সেটা কোন কার্যকর প্রশ্ন নয়। সঠিক প্রশ্ন হলো, মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাকে কোথায় নিয়ে যায় বা যেতে পারে।

৩.

বাংলাদেশের ডিভেলপমেন্ট এবং তার গতিপ্রকৃতি অনেকটাই রাজনীতি নির্ভর। কোথায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় হবে, কোথায় একটা মেডিকেল কলেজ হবে, কোথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট বসবে, বা নতুন একটা সেনাকুঞ্জ হবে তার সিদ্ধান্ত রাজনীতিকরাই নেন বা তাদেরকেই নিতে হয়। তারা সেসব সিদ্ধান্ত সব সময় যে কোনো সম্ভাব্যতা যাচায়ের পর নেন তা নয়। হয়তো এমন যাচাই করার মতো শিক্ষা-দিক্ষা আমাদের এখনো হয়নি। কিংবা হয়তো আমাদের প্রধান রাজনীতিকরা অন্যের উপর আস্থা রাখতে পারেন না। যে কারণেই হোক না কেন, এই প্রতিষ্ঠাণগুলো যে যথেষ্ট চিন্তা ক’রে গড়ে তোলা হচ্ছে না সেটা তাদের অবস্থানগুলো একবার ম্যাপে বসিয়ে দেখলেই টের পাওয়া যায়। পরিণামে তাদের কাছ থেকে যতটা পাওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়, তারা দিতে পারে তার খুব কমই।

আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লোকেশন আর প্ল্যান দেখতে বসেছিলাম। গুগোল-ম্যাপে। কিছু কিছু ছবিও দেখলাম। প্ল্যানগুলোর ভেতর কোন প্যাটার্ন নেই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অবশ্য সবগুলোকেই গ’ড়ে তোলা হয়েছে শহরের বেশ বাইরে। সে যেমন অর্থনৈতিক কারণে, তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের রাজনীতিকদের ভীতির কারণেও। বছরের পর বছর ধ’রে এইসব বিচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকে যারা বের হচ্ছে তাদের একটা বড় অংশ যে দেশের মূলধারাতে আর মিলতে পারছে না তা আর বিচিত্র কি? যারা পারে তারা ব্যতিক্রম। তাদের সংখ্যাও তাই নিতান্ত নগণ্য।

সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের বেশির ভাগই তাই মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেকেই তাই পালিয়ে যান দেশ থেকে। যারা পালাতে পারেন না তাদের বেশির ভাগই নিজের সাথে, সমাজের সাথে যুধতে যুধতে হ’য়ে ওঠেন সমাজের জন্য সব থেকে ক্ষতিকর মানুষ। আমাদের দেশের সবচেয়ে স্টার ঘুষখোর মানুষগুলোর বেশির ভাগই যে এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ছিলেন তা আমরা জানি। ব্যাপারটার সাথে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এবং এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপর তাদের ডিজাইনের প্রভার নিয়ে পর্যালোচনা করার সময় এসেছে বলে মনে করি।

৪.

ভারতীয়রা/ভারতীয়-বাঙালিরা যেভাবে পদ্মা, তিস্তা বা অন্য নদীগুলোর পানি সরিয়ে নিয়ে নিজেদের ছোট নদীগুলোকে বড় নদী করতে চাচ্ছেন তা কতটা সফল হবে জানি না। কিন্তু বাংলাদেশের নাব্য নদীগুলো যে ওনাদের ভাল লেগেছে তা বুঝতে কষ্ট হয় না। একটা জায়গায় থেকে সে জায়গাকে পাল্টে ফেলার- মানুষের এই চাওয়াটা অদ্ভুত। কোনো জায়গার চরিত্র বদলে গেলে সে জায়গার মানুষেরাও যে বদলে যায়, তা কে না জানে। পদ্মার পানি শুকিয়ে গেলে যেমন পদ্মা-পাড়ের মানুষগুলো বদলে যাবে/যাচ্ছে, হুগলির পানি বাড়লে তার পাড়ের মানুষগুলোও যাবে বদলে। শেষ পর্যন্ত তারা কি পদ্মা পাড়ের মানুষের মতো হয়ে উঠবে? উঠলেই বা সে কত দিনে?

কিন্তু এই যে এক স্থানের মানুষের অন্য স্থানের মানুষের মতো হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা তা নতুন কিছু হয়তো নয়। হাজার হাজার বছর ধ’রে মানুষের মাইগ্রেশনের পেছনে সারভাইভালের সাথে সাথে এই অন্য রকম বা অন্যের মতো হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাও কার্যকর ছিলো বোধকরি। আজকের দিনের মানুষের পক্ষে অতটা স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ নেই ব’লে তারা আগে পাল্টাতে চায় প্রকৃতিকে।

ভারতীয়-বাঙালিরা তাদের পূর্বপাশে বাস করা মানুষদের মতো হয়ে ওঠার এই চেষ্টাটা কত দিন ধ’রে ক’রে যাবে, কে জানে!

প্রবচন – ১৯

১.

নিকট অতীতে ইউরোপের দেশগুলো যখন সম্পদ সঞ্চয় করতে চেয়েছিলো তখন তারা সারা পৃথিবীকেই প্রায় সাম্রাজ্য বানিয়ে ছেড়েছিল, কোনো ধরণের মানবিকতার প্রশ্নকে পরোয়া না ক’রে। খানিকটা সম্পদ সঞ্চয় হ’লে নিজেদের ভেতর বাধিয়ে দিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সেটা দেখেও তারা সন্তুষ্ট হয়নি। সে যুদ্ধ শেষ হ’লে পরে শুরু করেছিল দ্বিতীয় যুদ্ধের প্রস্তুতি। পরিণতিতে ইউরোপের সম্পদের পরিমাণ যায় কমে। যা ইউরোপকে খানিকটা স্থিতিশীল করে আপাতদৃষ্টিতে কয়েক দশকের জন্য। গত দশক দুয়েক ধ’রে ইউরোপের সম্পদ জমেছে বলেই মনে হচ্ছে। এটা কি পৃথিবীর জন্য আশংকার বিষয় হতে পারে? কিমবা যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার জন্য?

যুক্ত এবং স্টেবল ইউরোপ আজকের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার জন্য হুমকি- এটা সত্য। আর তা প্রতিহত করার জন্য রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র যদি আজ জোট বাধে তাতে আমি একদমই অবাক হবো না।

২.

তবলিগ জামাতের লোকেরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ধর্ম নিয়ে কথা বলে। তাতে প্রায় সব মানুষের ব্যাপারে তাদের একটা ধারণা তৈরী হ’য়ে যায়। আগামীর সংকটময় কোনো পরিস্থিতির বিবচনায় এটা খুবই চিন্তার বিষয়।

৩.

পবিত্রতার ধারণা থেকে মানুষ বের হ’তে চাইলেও তা খুব সহজে সম্ভব হবে না তার কারণ আমাদের শহরগুলো থেকে এই ধারণার স্মারকগুলো সরিয়ে ফেলা হয়তো কখনই সম্ভব হবে না। পুরোনো পরিত্যক্ত বিহারগুলো তাদের প্রয়োজন হরিয়েছে অনেক আগেই। অথচ সেখান থেকে আজো আমরা অনুপ্রেরণা খুঁজি – এটা শুধু প্রতীকী নয়, চরম বাস্তবতাও।

৪.

সম্মান ব্যাপারটা এমন যে, এটা যদি অন্য লোকদেরকে দেখানো না যায় তবে তা কার্যকারিতা হারায়।

প্রবচন – ১৮

১.
আমি বলি আমার বাঙালিত্বে কোন ভেজাল নেই। কারণ আমি জানি বাঙালির রক্ত, তার সংস্কৃতি অসংখ্য ভেজালে ভরা। অগণন মিলেমিশেই বাঙালির গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা। তাই সে পুরোনো যত কিছুই ধারণ করুক না কেন, নতুন কিছু আত্মীকরণে পিছপা হয় না কখনোই। ভেজাল আছে ব’লেই বাঙালিত্ব গতিশীল। ভেজাল আছে বলেই বাঙালি এতটা ঋদ্ধ। ভেজালের ফলতই এখানে এত দ্বন্দ্ব, সংঘাত, টানাপোড়েন, মতামতের বাহুল্য। যার বাঙালিত্বে ভেজাল আছে সে এসব ধারণ করবে কি করে? বৈচিত্র ধারণের আকাঙ্ক্ষাই বাঙালিত্বের মূল শর্ত।

২.
১৪০০/১৫০০ বর্গফুটের একটা একতলা পাকা বাড়ি ৬ মাসে বানাতে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের একটা তালিকা –
রাজমিস্ত্রী – ১২ জন (৫মাস)
রডের মিস্ত্রী – ৪ জন (১৫ দিন)
প্লাম্বিং মিস্ত্রী – ২জন (৭ দিন)
ইলেকট্রিক মিস্ত্রী – ৩ জন (৭ দিন)
কাঠ মিস্ত্রী – ৩ জন (১ মাস)
রং মিস্ত্রী – ৪ জন (৭ দিন) অন্যান্য সাহয্যকারী – ৩জন (৭ দিন)

এর সাথে পরিকল্পনাতে জড়িত স্থপতি, প্রকৌশলীদেরকে আপাতত বিবেচনাতে রাখছি না। ২০১৬ সালের আর্থিক মানদণ্ডে এটি বানাতে ন্যুনতম ২০ লক্ষ টাকার মত দরকার পড়ে। এর সাথে জমির দামও আমি আপাতত বিবেচনাতে নিচ্ছি না। হিসেবের সুবিধা বা বোঝার সুবিধার জন্য এই ২০ লক্ষ টাকাকেই প্রামাণ্য হিসেবে রাখছি। এই এক তলা বাড়িটির যিনি মালিক হবেন তিনি ঠিক কত মাসে এই পরিমাণ টাকা আয় করেছেন বা জোগাড় করেছেন বা সঞ্চয় করেছেন সেটাও বিবেচনা করছি না। আমি বিবেচনাতে আনছি শুধু মাত্র এই বাড়িটি বানাতে যে শ্রমিকেরা কাজ করেছে তাদের কর্মঘণ্টা আর পারিশ্রমিককে।

একজন রাজমিস্ত্রীকে আমরা দিনে ৪০০ টাকা করে দিলে (মাসে ২২ দি কাজ ধরে) তার মাসে আয় হবে ৮৮০০ টাকা। এর অর্ধেক যদি সে সঞ্চয় করতে পারে তাহলে মাস শেষে তার হাতে থাকবে ৪৪০০ টাকা। ২০ লক্ষ টাকা তার সঞ্চয় করতে সময় লাগবে ৪৫৪.৫৪ মাস বা ৩৭.৮৭ বছর।

নির্মাণ কাজে যুক্ত অন্যান্য শ্রমিকের আয় দিনে ঐ ৪০০ টাকার কাছাকাছিই। অনেকের আবার এর থেকেও কম। ১৮ বছর বয়সে যদি কেউ শ্রমিকের কাজ শুরু করে (যা প্রায় অসম্ভব) তাহলে তার পক্ষে মোটামুটি ৫৬ বছর বয়সে গিয়ে এমন একটা বাড়ি বানানো সম্ভব হবে। এটা অবশ্যই একটা অনৈতিক পরিস্থিতি। তার উপর বাসস্থানকে যদি আমরা মৌলিক অধিকার ব’লে মনে করি তাহলে তো বটেই।

আমরা যারা বিল্ডিঙের মালিক হচ্ছি তারা অবশ্যই এই শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করছি। বাজার অর্থনীতি বা অন্য যে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে আমরা শ্রমের মূল্য নির্ধরণের যে কথা বলছি তা এক ধরণের প্রতারণার কৌশল মাত্র।

৩.
৬ মাসের ভেতরে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকার কাগুজে আবাসিক ভবন থেকে অন্যান্য ব্যবহার দূর করার যে কথা সরকার বলছে তা কার্যকর করা বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তব কারণেই সম্ভব হবে না। প্রথম কারণ, অন্যান্য ব্যবহারকে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে- এমন ভবনের অভাব। যা প্রকারান্তরে আমাদের দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনাহীনতাকেই সামনে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় কারণ, দীর্ঘদিন ধ’রে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা ভাল বা খারাপ যা-ই হোক, একটা কর্যকারীতা আছে। আছে প্রয়োজনীয়তাও। তাকে এত অল্প সময়ে মুখের কথাতেই পরিবর্তন করা যায় না। তবু সরকার এটা করার কথা বলছে কেন, সেটা একটা ভাবনার বিষয় হতে পারে। নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থতা যার পরিণতি তার পেছনে কেন এত কালক্ষেপণ, এত শ্রম-নিয়োগ? কাগজে-কলমের আবাসিক এলাকাকে পুরোপুরি আবাসিক এলাকাতে পরিণত করা-ই এর গূঢ় উদ্দেশ্য নয়।

৪.
প্রচলিত অধিকাংশ বিধি জন-মানুষের বোধগম্য উপকার দেয় না বলেই মানুষ বারংবার বিধি লঙ্ঘন করে। অথবা লঙ্ঘন করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের খুব কম বিধিতেই সত্যিকারের ন্যায্যতা আছে। আছে সমতার বিধান। অনেক বিধি-ই তৈরী করা হয়েছে অগ্র-পশ্চাত বিবেচনা না করেই, যেগুলো মানলে বরং ক্ষতির পরিমাণই বাড়ে।ব্যক্তি মানুষ এবং রাষ্ট্র উভয়েরই। এত বেশি সংখ্যক মানুষ তাই বিধি ভাঙে যে তাকে আর বিচারের আওতায় আনা যায় না। (উদাহরণ স্বরূপ রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা কিমবা আয়কর বিধিমালার কথা বলা যায়। যদিও এ দুটো আসলে ত্রুটিপূর্ণ এবং সৎ-উদ্দেশ্যহীন অসংখ্য বিধির সামান্য অংশ মাত্র) ফলত রাষ্ট্রের উপর মানুষ আস্থা হারায় আর মানুষের উপর রাষ্ট্র হারায় তার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ পুরো হারিয়ে ফেলেছে- এটা প্রকাশ হয়ে গেলে আর রাষ্ট্রের অস্তিত্বই থাকে না। তখন রাষ্ট্রকে অস্তিত্ব রক্ষার নামে নেমে পড়তে হয় অবদমনের কাজে। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় রাষ্ট্র-গঠনে মূখ্য ভূমিকা নেয়া সাধারণ মানুষেরাই।

প্রবচন-১৭

১. জীবন যে প্রায় অপরিমেয়, সে তার বিশালতার জন্য নয়। বরং তার নগন্যতা, ক্ষুদ্রতাই এর জন্য বেশি দায়ী।

২. আমাদের শুল্কবিধি কোনো ভাবেই সমতা নিশ্চিত করে না। বরং কখনো কখনো অসাম্যের কারণ হ’য়ে দড়ায়। এটা অনৈতিক। অথচ কায়েমি। সুবিধাভোগীরা এটা পাল্টাতে চায় না। আর যারা এর ভুক্তভোগী তারা পরিবর্তন করার সামর্থ্য হারিয়ে বসে আছে।

৩. জটিলতাতে অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়া রীতিমতো কঠিন কাজ।

৪. পুরোনো বস্তু বা বিষয় খুব কম ক্ষেত্রে স্থায়ী চরিত্র অর্জন করতে পারে। বরং নতুনের সাথে মানিয়ে নিতে পারার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোনো বস্তু বা বিষয় ক্ষয়িষ্ণু হ’য়ে ওঠে। ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’- তাই একটি অক্সিমোরনের বেশি কিছু নয়।

প্রবচন – ১৬

১. বাঙালির বিশালতা তার অসংখ্য ক্ষুদ্রতার যোগফলে।

২. মুজিব যতটা সয়ম্ভু তারচেয়ে অনেক বেশি জনতার কণ্ঠস্বর। আর তাই ৭ই মার্চের মুজিব এতটা উজ্জ্বল আর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী মুজিব এতটা বিক্ষিপ্ত।

৩. জ্যাকসন পোলকের প্রতি শ্রদ্ধা, যিনি দ্বিধাহীন ভাবে বলতে পেরেছিলেন, “ফাক পিকাসো”।

৪. প্রতিদিনের ছোট ছোট ব্যর্থতারা আমাদের অভিজ্ঞতাকে একটু একটু ক’রে সমৃদ্ধ করে। আর নায়কোচিত ব্যর্থতারা যোগায় উপহাসের উপাদান।