স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব : ৫

৫.

দ্বন্দ্বমুখর স্তরসমূহের ধারাবাহিকতায় : দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান

‘দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান’ আর ‘উভয়’ পরস্পর সম্পর্কিত। কিন্তু এদের ভেতর একটা পার্থক্য আছে। দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান ব্যবহারের প্রকৃতি আর কাঠামোর সাথে বেশি সম্পর্কিত, যেখানে ‘উভয়’ কোনো একটা উপাদানের সাথে পুরো ব্যাপারটার সম্পর্ককে নির্দেশ করে। ‘উভয়’ দুইটা কার্যকারীতার চেয়ে দুইটা অর্থময়তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান নিয়ে কথা বলার আগে, আমি বহুবিধ-কার্যকরী ভবন নিয়ে বলে নিতে চাই। এই শব্দটা দিয়ে আমি এমন একটা ভবনকে বোঝাচ্ছি যার কর্মসূচি (program) আর গড়ন (form) জটিলতাতে পরিপূর্ণ, তথাপি সামগ্রিক বিচারে প্রভাবশালী (strong) – লি করবুজিয়েরকৃত লা টৌরেটে বা চন্দ্রিগড়ের ন্যায়বিচার প্রাসাদের (Palace of Justice) জটিলতাময় সম্পূর্ণতা এর বিপরীতে তার সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাসাদ বা প্যারিসের আরমি-ডি-স্যালু’র বিবিধত্ব (multiplicities) আর বিন্যস্ততা। দ্বিতীয় পন্থা কর্মসূচীকে বিভিন্ন আন্তঃসংযুক্ত (interlocking-১) বিভাগ কিমবা মাধ্যম দিয়ে যুক্ত (connected) প্যাভিলিয়নে ভাগ ক’রে দেয়। প্রথাবদ্ধ আধুনিক স্থাপত্যের এ এক অতিসাধারণ বৈশিষ্ট্য। মিজ’কৃত শহুরে ইলিনয়েস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে প্যাভিলিয়নগুলোর ধারাল বিযুক্তিকে (incisive separations) এ ধারার সর্বোচ্চ (extreme) কাজ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

মিজ আর জনসনকৃত সিগ্রাম ভবনে দাপ্তরিক কাজ ছাড়া (functions other than offices) বাকি সব বাদ দেওয়া হয়েছে (নিচের তলার পেছনের দিক বাদ দিলে), উপরন্তু একই ধরণের দেয়াল ব্যবহার ক’রে উপরের দিকের তলার পুরকৌশল (ম্যাকানিক্যাল) উপকরণগুলোকে এমনভাবে লুকানো হয়েছে যেন মনে হয় ওখানে অন্য ধরণের কিছু নেই। ইয়ামাসাকিকৃত নিউ-ইয়র্কের বিশাল বিশ্ব-বাণিজ্য কেন্দ্রটির গড়নকে অতিরিক্ত সাদামাটা ক’রে ফেলা হয়েছে। বিশের দশকের প্রতিনিধিত্বশীল গগনচুম্বী-ভবনগুলো ছদ্মবেশ না নিয়ে বরং আলাদাই করে, উপরের তলাগুলোর পুরকৌশল উপকরণ রাখার জায়গাগুলো স্থাপতিক বিচারে আগাগোড়াই অলংকারিক গড়নের। চাড়ুনি-বাড়ির (Lever House) নিচ-তলাতে নানা ধরণের কার্যকারিতার পরিসর থাকার পরও সেগুলো প্রয়োজনের থেকেও বেশি ক’রে আলাদা করা হয়েছে একটা অন্ধকার সংযোজক পরিসরের মাধ্যমে। তুলনামূলকভাবে পি.এস.এফ.এস. একটা ব্যতিক্রমী আধুনিক ভবন যা এর কর্মসূচির বহুবিধতা আর জটিলতার ব্যাপারে একধরণের ইতিবাচক ব্যক্তব্য প্রচার করে। এটি নিচ-তলার একটা দোকান, দোতলার বড়সড়ো ব্যাংকটা, তার উপরের কয়েকটা তলার দাপ্তরিক পরিসর আর একদম উপরের তলার বিশেষ কিছু কক্ষকে একত্রিত করেছে। কার্যকারণ (function) আর পরিমাপের (scale) এই বৈচিত্রসম্ভার (একদম উপরের বিশাল বিজ্ঞাপন-ব্যানার সহ) একটা আটোসাটো সম্পূর্ণতার অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল হয়েছে। এর সামনের দিকের বক্রাকার দেয়াল (curving facade) ভবনের অন্য অংশের আয়তকার বৈশিষ্ট্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা ত্রিশের দশকের একটা বহুল-ব্যবহৃত বিষয় মাত্র নয়, কারণ এর একটা শহুরে কার্যকারণ (urban function) আছে। এর কিনারা ঘিরে পথচারীদের হাঁটার জায়গাটা পরিশিলিত হয়েছে।

বহু-কার্যকরী ভবনগুলো তার চরম সীমাতে পন্টি ভেসচিয়ো (Ponte Vecchio – ২) বা Chenonceaux বা সেন্ট এলিয়ার ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টি প্রকল্পের মতো হ’য়ে ওঠে। প্রত্যেকে এর সম্পূর্ণতার ভেতর জটিল কার্যকারণ (complex functions) সহকারে পরিবর্তনশীলতার বৈপরীত্যময় ক্রমগুলোকে (contrasting scales of movement) ধারণ করে। লি করবুজিয়েরকৃত আলজারিয়ার প্রকল্প, যা একই সাথে মহল-বাড়ি (apartment house – ৩) এবং মহাসড়ক (highway), এবং রাইটের শেষের দিকে করা পিটসবার্গ আর বাগদাদের প্রকল্পের সাথে কানের করা সংযোগকারী-স্থাপত্য (viaduct architecture) আর ফুমিহিকো মাকির করা ‘সংগ্রাহক গড়ন’ (collective form) এর সাথে মিল আছে। এই সবগুলো প্রকল্পের সম্পূর্ণতার ভেতরে অনুপাত (scale), অবস্থানের পরিবর্তন, কাঠামো আর পরিসরের এক জটিল আর বৈপরীত্যে ভরপুর আবস্থান-ক্রম দৃষ্টিগোচর হয়। এই ভবনগুলো একই সাথে ভবন এবং সেতু। বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বাধ (dam) আবার সেতুও (bridge), শিকাগোর লুপ শহরের সীমানাও, আর কানকৃত রাস্তাগুলো ‘ভবন হয়ে উঠতে চায়’।

বহু-কার্যকরী কক্ষ কিমবা বহু-কার্যকরী ভবন দুইয়ের পেছনেই যৌক্তিক কারণ আছে। কোন একটা নির্দষ্ট সময়ে বা আলাদা-আলাদা সময়ে কোনো একটা কক্ষে অনেকগুলো কাজ করা যেতে পারে। কান গ্যালারীকে বেশি পছন্দ করতেন কারণ এটা দিক-নির্দেশক আবার দিক-অনির্দেশকও, একই সাথে সংযোগকারী-বারান্দা (corridor) এবং কক্ষ। সাধারণত ঘরের আয়তন আর গুণমানের কম-বেশি ক’রে তাকে কখনো মূল পরিসর আর কখনো সহায়ক পরিসর, কখনো দিক-নির্দেশক পরিসর আর কখনো দিক-অনির্দেশক পরিসর, কিমবা সুনির্দিষ্ট কোনো নাম না দিয়ে বরং ধরণ-মূলক কোনো নাম দিয়ে তাকে পৃথক ক’রে ফেলা হয়। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রয়োজনকে এভাবে আলাদা করলে তার জটিলতাসমূহে যে পরিবর্তন সূচিত হয় কান তা স্বীকার করেন। যেমনিভাবে তার ট্রেনটন কমিউনিটি সেন্টার প্রকল্পে, এই পরিসরগুলো উনিশ শতক-পূর্ববর্তী সংলগ্ন-কক্ষের আকার-আকৃতির সাথে আরো জটিল কোনো প্রকারে সাদৃশ্যযুক্ত হয়। সুবিধার জন্য সংযোগকারী বারান্দা আর কক্ষকে শুধুমাত্র একটা কাজে ব্যবহার করার ধারণার উদ্ভব আঠার শতকে। ভবনের অভ্যন্তরে সুনির্দিষ্টভাবে স্থায়ী (বিল্ট-ইন) আসবাবপত্রের মাধ্যমে আধুনিক স্থাপত্যধারার বৈশিষ্ট্যগত পৃথককরণ এবং কর্মসূচির কার্যকারীতার বিশেষায়ন এই ধারণার সর্বোচ্চ প্রকাশ নয় কি? বিজড়িত করার মধ্য দিয়ে কান এই ধরণের গোড়া বিশেষায়ন এবং সীমাবদ্ধ কার্যকারণবাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেন। এই ক্ষেত্রে “গড়নের জন্য কার্যকারণের উদ্ভব হয়”।

নমনীয়তা প্রসঙ্গে আধুনিক স্থপতিদের বিবেচনা অনুযায়ী বহু-কার্যকরী কক্ষ সম্ভাব্য অধিকতর-সঠিক সমাধান দেয়। যে কক্ষের কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের বদলে একটা সাধারণ ব্যবহার থাকে, সরানো যায় এমন পার্টিশনের বদলে যেখানে সরানোর উপযোগী আসবাবপত্র থাকে, সে ধরণের কক্ষ কোনো বাস্তবিক নমনীয়তার চেয়ে এক ধরণের ধারণাগত নমনীয়তাকে উর্ধ্বে তুলে ধরে, এবং আমাদের ভবনের জন্য বাড়তি প্রয়োজনীয় কাঠিন্য এবং স্থায়িত্বকে সম্ভব ক’রে তোলে। কার্যকর দ্ব্যর্থকতার উপস্থিতি ব্যবহার উপযোগী নমনীয়তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।

নোট:

১. আন্তঃসংযোগ : interlock এর বাংলা পরিভাষা করলাম। অভিধানে পাচ্ছি ‘পরস্পরের মধ্যে আবদ্ধ করা / একটি তলার মধ্য দিয়ে আর একটি তলাকে আটকানো / উপরে পড়ে বা অন্যভাবে পরস্পর আবদ্ধ হওয়া’। স্থাপত্যে ইন্টারলক যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সেটা বোঝানো এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে একটু কঠিন। একটা শব্দ দিয়ে এটা বোঝানোর চেষ্টাতেই এই নতুন শব্দটা তৈরী করা। আরো ভাল পরিভাষা তৈরী না হওয়া পর্যন্ত এটাই ব্যবহার করছি আপাতত।

২. পন্টি ভেসচিয়ো : ইতালির ফ্লোরেন্সের আর্নো নদীর উপর মধ্যযুগে নির্মিত একটা সেতু যার উপর কয়েক স্তরের দোকান আছে।

৩. মহল-বাড়ি : আবদুশ শাকুর এ্যাপার্টমেন্টের বাংলা হিসেবে ‘মহল’ ব্যবহার কারাটা যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। এ্যাপার্টমেন্ট হাউজকে তাই বলা যায় একগুচ্ছ মহল নিয়ে যে বাড়ি। সমাসবদ্ধ ক’রে মহল-বাড়ি।

স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব : ৪

৪.

দ্বন্দ্বমুখর স্তরসমূহ : স্থাপত্যে “উভয়” এর উপস্থিতি-জনিত বৈশিষ্ট্য

স্থাপত্যের বোধ বা অর্থময়তার দ্বন্দ্বমুখর স্তরসমূহ এবং ব্যবহার যে আপাত-বিরোধী বৈপরীত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে তা সংযোজক অব্যয় ‘তথাপি’ এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেগুলো খানিকটা দ্ব্যর্থক হ’তে পারে। লি করবুজিয়েরের শোধান আবাস (Shodhan House) [১২] দেখতে আটকানো তথাপি খোলামেলা – একটি ঘনক, যা তার কোনাগুলো দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আটকানো, তথাপি এলোমেলোভাবে এর বহির্ভাগে খোলা। ওনার স্যাভয়-বাড়ি (Villa Savoye) [১৩] বাইরে থেকে দেখতে সাদামাটা, কিন্তু ভেতরটা জটিলতাময়। ব্যারিংটন উঠানের [১৪] টিউড’র-ধর্মী পরিলেখ যদিও প্রতিসম তথাপি অপ্রতিসম। তুরিনে অবস্থিত পবিত্র-ধারণায় গড়া গুয়ারিনির খ্রিস্ট-ধর্মীয় মন্দির [১৫] পরিলেখে দ্বৈততা নিয়েও সম্পূর্ণতা ধারণ করে। মিডিলটোন পার্কে অবস্থিত স্যার এডউইন লাইটইয়ানের প্রবেশ গ্যালারী [১৬,১৭] একটি দিক-নির্দেশক পরিসর, তথাপি এটা একটা বিবর্ণ (blank) দেয়ালে গিয়ে শেষ হয়েছে। বোমার্জতে ভিগনোলাকৃত প্যাভিলিয়নের সামনের দেয়ালে দরজা থাকার পরও এটা একটা ফাঁকা দরদালান (portico) । কানের বিল্ডিঙে অমসৃণ কনক্রিটের সাথে মসৃণ গ্রানাইটও থাকে। শহরের কোনো একটা সড়ক পথ হিসেবে দিক-নির্দেশক, তথাপি পরিসর হিসেবে নিশ্চল। ‘তথাপি’ বা ‘তথাপি অর্থযুক্ত’ এই সব বাক্যগুলো বহুবিধ কর্মসূচি (প্রোগ্রাম) আর কাঠামোগত দ্বন্দ্ব-সমৃদ্ধ স্থাপত্যের বিবরণ দেয়। এই প্রথাগত দ্বন্দ্বগুলো যেমন কোনো সৌন্দর্য খোঁজার উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে না, আবার আপাত-বিরোধীভাবে কোনো ধরণের ঝোঁকেরও প্রতিনিধিত্ব করে না।

১২. লি করবুজিয়ের, শোধান আবাস, আহমেদাবাদ

ক্লিন্থ ব্রুকসের মতে ড্যানির শিল্পে ‘উভয় পন্থা’ এরই উপস্থিতি আছে। আবার তিনি বলেন যে, এমনটা আজকের দিনে আমাদের বেশির ভাগই করতে পারি না। আমরা এমন একটা প্রথার দ্বারা শৃঙ্খলিত যা ‘এটা নয়তো ওটা’ কে বেছে নিতে বলে, এবং আমরা এমন একটা মানসিক তৎপরতা-হীনতাতে জর্জরিত – যা মনোভাবের পরিপক্বতা নিয়ে কিছু বলতে বাধা দেয় – যা আমাদেরকে শ্রেয়তর স্বাতন্ত্র্য এবং ‘উভয়’ এর ঐতিহ্যের দ্বারা স্বীকৃত অধিকতর বোধগম্য অবদমিত মনোভাবকে প্রশ্রয় দেওয়ার অবকাশ দিতো। ‘উভয়’ এর ঐতিহ্য প্রথাগত আধুনিক স্থাপত্যকে বিশেষায়িত করেছে : একটি রোদ-নিরোধক (সান স্ক্রিন)  হয়তো আর কিছু নয়; একটা অবলম্বন (সাপোর্ট) খুব কমই বেষ্টনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়; একটা দেয়াল কোনো জানলার ছিদ্র দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হয় না কিন্তু কাঁচ দ্বারা যার ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ বিঘ্নিত; কর্মসূচির (প্রোগ্রামের) কার্যকারিতা অতিরঞ্জিতভাবে নানা বিভাগে কিমবা অসংলগ্ন পৃথক প্যাভিলিয়নে বিন্যস্ত। এমনকি ‘প্রবাহমান পরিসর’ অভ্যন্তরে থেকেই বহিস্থ হয়েছে, বহিস্থ থেকেই অভ্যন্তরস্থ হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে উভয়ই না হ’য়ে। বিন্যস্ততা আর স্পষ্টতার এ ধরণের প্রকাশ জটিলতা আর দ্বন্দ্বমুখর স্থাপত্য, যা কিনা ‘এটা নয়তো ওটা’র পরিবর্তে ‘উভয়’কেই অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চায়, এর পক্ষে অসংগত।

১৩. লি করবুজিয়ের, স্যাভয়-বাড়ি, পয়সি

‘উভয়’ প্রপঞ্চের উৎস যদি হয় দ্বন্দ্ব, এর ভিত্তিভূমি বা বুনিয়াদ তবে অবস্থানক্রম (hierarchy), যা উপাদানসমূহের ভেতর অর্থময়তার বিভিন্ন স্তর সৃষ্টির কারণ হয়, মূল্যবোধের নানা রূপসহ। এটা এমন উপাদান ধারণ করতে পারে যা একই সাথে ভাল এবং কদর্য, বড় এবং ছোট, আবদ্ধ এবং খোলামেলা, ধারাবাহিক এবং সুবিন্যস্ত, গোলাকার এবং বর্গাকার, কাঠামোগত এবং পরিসরিক। যে স্থাপত্য অর্থময়তার নানা স্তরকে ধারণ করে তা দ্ব্যর্থবোধ আর উত্তেজনার জন্ম দেয়।


একমুখী পরিসরের ব্যাসিলিকা এবং সর্বমুখী পরিসরের কেন্দ্র-কেন্দ্রিক খ্রিস্ট-মন্দির পশ্চিমা মন্দির-পরিলেখের পর্যায়ক্রমকে নির্দেশ করে। কিন্তু আর এক ধরণের খ্রিস্ট-মন্দিরের ঐতিহ্যও গড়ে উঠেছিলো যেখানে পরিসরিক, কাঠামোগত, কর্মসূচি-সম্পর্কিত এবং রূপকের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নে ‘উভয়’ এর উপস্থিতি দেখা যায়। ষোড়শ শতকের ধরণবাদী (mannerist) উপবৃত্তাকার পরিলেখ একই সাথে কেন্দ্র-কেন্দ্রিক আর দিক-নির্দেশক। বার্নিনিকৃত সেন্ট এ্যানড্রিয়া-আল-কুইরিনেল এর সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন, দ্ব্যর্থক-ভাবে ক্ষুদ্রতর স্প্যানটি যার মূল দিক-নির্দেশক অক্ষ। নিক’লাস পেভনার দেখাচ্ছেন নিজস্ব-প্রার্থনাস্থলের (chapel) বদলে দেয়াল-লগ্ন-স্তম্ভের (pilasters) সাহায্যে পার্শ্ববর্তী দেয়ালের তির্যক অক্ষের দুই প্রান্তকে কিভাবে সমান দুই ভাগে ভাগ ক’রে দিয়ে ক্ষুদ্রতর অক্ষকে বেদীর (altar) সাথে অধিক সম্পর্কযুক্ত করা যায়। প্রপাগান্ডা-ফাইডে অবস্থিত বোররোমিনিকৃত গৃহ-সংলগ্ন মন্দিরটি পরিলেখ অনুযায়ী একটি দিক-নির্দেশক হলঘর, অথচ এর পার্শ্ববর্তী হাঁটার জায়গাগুলো (bay) এর প্রভাবকে পাল্টে দেয়। একটা প্রশস্ত হাঁটার জায়গা মুখ্য হয়ে ওঠে; স্বল্প পরিসরের একটা হাঁটার জায়গা লম্বা দেয়ালকে মাঝ বরাবর দুই ভাগ ক’রে ফেলে।

ত্বকের দর্শন ইন্দ্রিয় – ১

(যোহানি পালাসমা এর ‘eyes of the skin’ এর অনুবাদ প্রচেষ্টা: পর্ব – ১)
_________________________________________________

‘হাতগুলো দেখতে চায়, আর চোখগুলো চায় আলিঙ্গন করতে।’
-জোহান উল্পগ্যাং ভন গেটে

‘পায়ের পাতাতে থাকে নৃত্যশিল্পীর কান।’
-ফ্রেডরিক নিটসে

‘শরীরকে বোঝা যদি আরো সহজতর হ’তো, তবে আমাদের যে মনন আছে তার কথা হয়তো কেউ ভাবতো না।’
– রিচার্ড রর্টি

‘প্যালেটের (palate) সাথে আপেলের সংযুক্তির উপরই নির্ভর করে আপেলের স্বাদ, শুধুমাত্র ফলের উপর নয়। একই ভাবে, কাব্যিকতা নির্ভর করে কবিতা আর পাঠকের বৈঠকের ভেতর, বইয়ের পাতায় মুদ্রিত শব্দ দিয়ে গড়া বাক্যের ভেতরে নয়। পঠনের সাথে যে উত্তেজনা, যে প্রায় শারীরিক একটা আবেগ আমাদেরকে আচ্ছন্ন ক’রে সেই নান্দনিক কার্যক্রমটার উপস্থিতি থাকতেই হবে।
-জর্জ লুই বোরেস

‘জগতের মুখোমুখি দাড়ানোর অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন চিত্রশিল্পী কি কোনো কিছু প্রকাশ ক’রতে পারতো?’
-মৌরিস মার্লিউ-পন্টি

_____________________________________________

দৃষ্টি ও জ্ঞান
ইউরোপের সংস্কৃতিতে ঐতিহাসিক ভাবেই দৃষ্টিশক্তিকে সেরা ইন্দ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি চিন্তা করা আর দেখার ভেতরে পার্থক্যও করা হয় না। অতীতের গ্রিকরা ভাবতো- শুধুমাত্র যা কিছু দেখা যায় তার-ই নিশ্চয়তা আছে। হেরাক্লিটাসের লেখাতে আছে ‘কানের চেয়ে চোখ ভাল সাক্ষী’। দৃষ্টিশক্তিকে প্লেটো মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহার মনে করতেন। আর নৈতিক কর্মকাণ্ডকে(ethical universals)‘মনের চোখ’ দিয়ে দেখার উপর জোর দিয়েছেন। এ্যারিস্টোটলও একইরকম বোধিকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ধ’রতে পারে ব’লে দৃষ্টিশক্তিকেই ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

গ্রিকদের সময় থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা নিয়ে দর্শনশাস্ত্রে অসংখ্য লেখনী পাওয়া যায় যেখানে স্বচ্ছ-দৃষ্টিশক্তি জ্ঞানের পরিপূরক হ’য়ে উঠেছে আর আলো হ’য়ে উঠেছে সত্যের রূপক। ইতালীয় দার্শনিক এ্যাকুইনাস দেখার ধারণাকে এমনকি অন্যান্য ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধিবৃত্তীয় অনুধাবন-প্রক্রিয়ার উপরও প্রয়োগ করেছেন।

দৃষ্টির ধারণা দর্শন-শাস্ত্রকে কতটা প্রভাবিত ক’রেছে তা পিটার স্লোটারজিক গুছিয়ে লিখেছেন। ‘দর্শন-শাস্ত্রের সাধারণ একক হ’লো চোখ। চোখের একটা বিশেষ ক্ষমতা হ’লো- সে শুধু দেখেই না, তাদেরকে আর কেউ দেখছে কিনা সেটাও দেখে। শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর চেয়ে এই জায়গায় চোখ এগিয়ে যায়। তাই দর্শন-শাস্ত্রের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে চোখের প্রতিক্রিয়া আর ভাষা; কাউকে দেখতে দেখা।’ রেনেসান্স বা পুণর্জাগরণের সময় পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের ভেতর দেখাকে শুরুতে রেখে আর স্পর্শকে শেষে রেখে একটা আনুক্রম তৈরী ক’রে অনুধাবন করা হতো। এই রেনেসান্সীয় পদ্ধতিতে ইন্দ্রিয়কে বিভিন্ন মহাজাগতিক উপাদানের সাথে মিলিয়ে নেওয়া হ’তো: দেখার সাথে আগুন বা আলো, শোনার সাথে বাতাস, গন্ধের সাথে বাষ্প, স্বাদের সাথে পানি আর স্পর্শের সাথে মাটি।
পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনার আবিষ্কার চোখকে দৃশ্যমান পৃথিবীর কেন্দ্রে নিয়ে আসে, সেই সাথে ব্যক্তি-ধারণারও। পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনা নিজেই একটি রূপকে পরিণত হয়, যে রূপক বর্ণনা করার সাথে সাথে ধারণাকেও প্রভাবিত করে।

আমাদের প্রযুক্তি-নির্ভরশীলতার ফলে অনুভূতিগুলো যে আরো সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা হ’য়ে গিয়েছে- সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা আর শোনা এখনকার সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত সামাজিকতা-সহায়ক অনুভূতি। আর অন্য তিনটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাচীন অনুভূতির অবশিষ্টাংশ হিসেবে, যার অল্প কিছু ব্যক্তিগত উপযোগিতা আজও টিকে আছে। সাংস্কৃতিক চলও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদেরকে দমিয়ে রাখে। আমাদের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক আর প্রচণ্ড স্বাস্থ্য-সচেতন সাংস্কৃতিক-রীতি অল্প কিছু অনুভূতি যেমন কোনো খাবারের ঘ্রাণ, ফুলের সৌরভ বা উষ্ঞতা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াগুলোকেই সামষ্টিক সচেতনতা সৃষ্টির অনুমোদন দেয়।

অন্য অনুভূতি গুলোর চেয়ে দৃষ্টিশক্তির প্রাধান্য এবং জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ার উপর এর ধারাবাহিক প্রভাব বেশ কিছু দার্শনিক প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘আধুনিকতা এবং দৃষ্টির কর্তৃত্ব’ শীরোনামের দার্শনিক নিবন্ধের সংকলনে যুক্তি দেওয়া হ’য়েছে যে- একটি দৃষ্টি-কেন্দ্রিক, দৃশ্য-জাত, জ্ঞানের দৃষ্টি-নির্ভর ব্যাখ্যা, সত্য আর বাস্তবতা প্রাচীন গ্রিকদের থেকে শুরু ক’রে আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রাধান্য বিস্তার করছে। দৃষ্টি আর জ্ঞানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক, দৃষ্টি আর অধিবিদ্যা (Ontology), দৃষ্টি আর ক্ষমতা, দৃষ্টি আর নৈতিকতা নিয়ে এই চিন্তা-উদ্দীপক বইটাতে আলোচনা কারা হয়েছে।
জগতের সাথে আমাদের এই দৃশ্য-কেন্দ্রিক সম্পর্কের মডেল এবং আমাদের জ্ঞানের ধারণা, যা কিনা দার্শনিকেরা প্রকাশ করেছেন, তাকে দৃষ্টির প্রচলিত জ্ঞানতত্ত্বীয় ধারণা বলা যায়। স্থাপত্যের শিল্পগুণের বোধ এবং চর্চার সাথে অন্যান্য অনুভূতির সাপেক্ষে দৃষ্টির ভূমিকা আরো গভীরভাবে অবলোকন করাটাও জরুরী। অন্য সকল শিল্পের মতো স্থাপত্য মূলগতভাবেই পরিসর আর সময়ের অভ্যন্তরে মানুষের উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। স্থাপত্য পৃথিবীতে মানুষের অবস্থিতিকে প্রকাশ এবং তাকে সম্পর্কযুক্ত করে। ব্যক্তি এবং জগত সম্পর্কিত দর্শনশাস্ত্রীয় ভাবনাগুলো যেমন- অভ্যন্তরীনতা আর বাহ্যিকতা, সময় আর সময়কাল, জীবন আর মৃত্যু – এসবের সাথে স্থাপত্য দারুনভাবে সম্পৃক্ত। ডেভিড হার্ভে বলেছেন, ‘পরিসর এবং সময়ের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার প্রতি নান্দনিক আর সাংস্কৃতিক চর্চা অদ্ভুত রকম সংবেদনশীল, বিশেষত তা যেহেতু মানুষের অভিজ্ঞতা-জাত পরিসরিক উপস্থাপনা আর শিল্পদ্রব্যের নির্মাণের হাত ধ’রে অনিবার্যভাবেই চলে আসে।’ আমাদেরকে সময় এবং পরিসরের সাথে সম্পর্কিত করা এবং এই ব্যাপারগুলোকে একটা লৌকিক পরিমাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থাপত্য একটি মৌলিক উপকরণ। সীমাহীন পরিসর আর অবিরাম সময়কে ব্যবহার-উপযোগী করার মাধ্য দিয়ে স্থাপত্য মানবজাতির জন্য একে সহনীয়, বাসযোগ্য আর বোধগম্য ক’রে তোলে। সময় আর পরিসরের এই আন্ত-নির্ভরশীলতার ফলস্বরূপ – শিল্প আর স্থাপত্যের উপর বাইরের এবং ভেতরের পরিসরের সম্পর্ক-বোধ, বাস্তবিক এবং আত্মিক উপকরণ এবং ভাবনাগত ও অনুভূতির ব্যাপারে সচেতন এবং অ-সচেতন ঝোঁক কিংবা তাদের পারস্পারিক ভূমিকা আর মিথষ্ক্রিয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

চোখের প্রাধান্যকে উপজীব্য ক’রে দার্শনিক আলোচনা করতে উদ্বুদ্ধ ক’রে ডেভিড মিচেল লেভিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতির দৃষ্টি-কেন্দ্রীকতা বা দৃষ্টির কর্তৃত্বপরায়নতাকে প্রশ্নের সম্মুখিন করাটা যথাযথ।’ আর আমি মনে করি, আজকের পৃথিবীতে প্রাধান্য-বিস্তারী দৃষ্টিগ্রাহ্যতার চরিত্রকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।
দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতা এবং চোখের লঙ্ঘন

১. স্থাপত্যকে চাক্ষুষ শিল্প-মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। – লুইস ব্যুনুয়েল।

২. ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতরে দৃষ্টিকে শ্রেষ্ঠ ব’লে ভাবা হয়, আর দৃষ্টি-শক্তি হারানোকে চরম শারীরিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। – সালভাদর দালি।

আমাদের প্রতিদিনের দেখাকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ক’রে দেখা দরকার- সেই সাথে দরকার আমাদের নিজেদেরকে দূর-দৃষ্টিসম্পন্ন জীব হিসেবে বিশেষভাবে বোঝা।
দৃষ্টির একলা-চলা এবং আগ্রাসী চরিত্র, এবং সেই সাথে ‘পিতৃ-তান্ত্রিকতার যে ভূত’ আমাদের সংস্কৃতির পিছু ধেয়ে চ’লেছে তা নির্দেশ ক’রে লেভিন বলেন –
“দৃষ্টির ভেতর নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা বেশ পরিস্কার। আকড়ে ধরা আর বদ্ধমূল করা (fixate), অনুমোদন দেওয়া (retify) আর সম্পূর্ণ করার একটা দারুণ ঝোঁক আছে দৃষ্টি ব্যাপারটাতে। যে ঝোঁক দমন করতে চায়, নিরাপত্তা দিতে চায়, সাথে সাথে চায় নিয়ন্ত্রণ করতে। ব্যাপারটা এত ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে যে তার ফলে আমাদের সংস্কৃতির উপর এর সুনির্দিষ্ট এবং প্রতিযোগীতাহীন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
আমার মনে হয়, একইভাবে ইদানিংকালের দৈনন্দিন স্থাপত্যের নানা খুঁটিনাটি দিককে অনুধাবন করা যাবে ইন্দ্রিয়-সম্পর্কিত ধারণাসমূহের বিশ্লেষণের মাধ্যমে, আমাদের মুক্ত সংস্কৃতিতে দৃষ্টির প্রতি থাকা পক্ষপাতকে সমালোচনা ক’রে, এবং বিশেষ ক’রে স্থাপত্যের আলোচনার মধ্য দিয়ে। সমকালীন স্থাপত্য ও নগরের অমানবিকতাকে শরীর আর ইন্দ্রিয়গুলোর প্রতি অবহেলা এবং সংবেদজ অঙ্গগুলোর (sensory system) মধ্যবর্তী ভারসাম্যহীনতার পরিণতি হিসেবে ভেবে নেওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজকের প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে/দুনিয়ায় বাড়তে থাকা ব্যবধান, বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতা হয়তো বোধের কোনো ধরণের খুঁটিনাটির সাথে সম্পর্কিত। প্রযুক্তিক বিচারে সবচেয়ে অগ্রসর ক্ষেত্র যেমন হাসপাতাল বা বিমান-বন্দরে যে এমন বিচ্ছিন্নতার উদ্ভব হচ্ছে তা বেশ ভাবার বিষয়। চোখের এই আধিপত্য এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর অবদমন আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র্য এবং বহিরাগত বানিয়ে ফেলতে প্ররোচনা দিচ্ছে। চোখের এই শিল্প নিশ্চিতভাবেই চিত্তাকর্ষক এবং ভাবনা-উদ্রেককারী কাঠামো উৎপাদন করেছে, কিন্তু তা পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ককে সহায়তা/সহজ (facilitate) করেনি। বাস্তবে আধুনিকতাবাদ সাধারণভাবে যে জনপ্রিয় রুচি আর মূল্যবোধের সীমানা ছাড়িয়ে গভীরে ঢুকতে পারেনি তা মূলত এর একমুখী যুক্তি আর দৃষ্টির প্রাধান্যের জন্য। আধুনিকতা-আশ্রয়ী ডিজাইন খুব বেশি হ’লে এই যুক্তি আর দৃষ্টিকে ধারণ করেছে; কিন্তু শরীর আর অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে অন্তর্ভুক্ত করেনি, এমনকি আমাদের স্মৃতি, কল্পনা আর স্বপ্নকেও আশ্রয় দেয়নি।

দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতার সমালোচনায়
পাশ্চাত্যের চিন্তা-ভাবনায় দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতার ঐতিহ্য এবং তার ফলস্বরূপ দর্শক-তত্ত্বীয় যে জ্ঞান তার সমালোচনা পুরোনো দিনের দার্শনিকেরাও করেছেন। যেমন, রেনে ডেকার্তে ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতরে দৃষ্টিকে সবচেয়ে সার্বজনীন আর সম্মানিত ব’লে বিবেচনা করতেন; আর তাই তার বস্তুবাদী দর্শন (অবজেক্টিফাইয়িং) দৃষ্টিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েই গ’ড়ে উঠেছে। তারপরও, তিনি দৃষ্টিকে স্পর্শের সমানও মনে করেছেন, অনুভূতি হিসেবে স্পর্শকে দৃষ্টির তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য এবং তাতে ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে ব’লে বিবেচনা করেছেন।

আপাত প্রতীয়মান দ্বন্দের ক্ষেত্রে চিন্তার স্বাভাবিক পদ্ধতি ব্যবহার ক’রে ফ্রেডরিক নিটসে দৃষ্টি-কেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনার কর্তৃত্বকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিভিন্ন দার্শনিকের ‘চোখকে সময় আর ইতিহাসের বাইরের বিষয়’ ব’লে বিবেচনা করার ব্যাপারটার সমালোচনা করেছেন। তিনি এমনকি ইন্দ্রিয়গুলোর প্রতি বিশ্বাসঘাতী এবং অন্ধভাবে  বিরুদ্ধতাকারী দার্শনিকদেরকে অভিযুক্ত করেছেন। মার্ক স্কেলার স্পষ্ট ভাষায় এই মনোভাবকে শরীর-বিদ্বেষ ব’লে উল্লেখ করেছেন।

পাশ্চাত্যের এই প্রতি-দৃষ্টিকেন্দ্রিক (এন্টি-অকুলারসেন্ট্রিক) ধারণা আর চিন্তার উদ্ভব বিশ শতকের ফরাসী বুদ্ধিবৃত্তিক-সমাজে। আর এটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যাবে মার্টিন জ লিখিত ‘অবনত চোখ : বিশ শতকের ফরাসী ভাবনাতে দৃষ্টির সন্মানহানী’ শিরোনামের বইটাতে। লেখক নানা বৈচিত্রময় ক্ষেত্র যেমন প্রিন্টিং-প্রেসের আবিস্কার, কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা, স্থিরচিত্রধারণ(ফটোগ্রাফি), ভিজ্যুয়াল কাব্য আর সময়ের নতুন অভিজ্ঞতার ভেতরে আধুনিক কালের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশের সূত্র খুঁজেছেন। অপরপক্ষে হেনরি বার্গসন, জর্জ বাটেইলি, জ্যা পল সার্ত্র, মেউরিস মারলেউ-পন্টি, জ্যাক লাকান, লুই এ্যালথ্রুসার, গে ডিবোর্ড, রোল্যান্ড বার্থেজ, জ্যাক দেরিদা, লুসি ইরগারে, ইমানুয়েল লেভিনাস এবং জ্যা-ফ্রান্সিস লয়োটার্ড প্রমুখদের মতো পরবর্তীকালের ভাবনা গ’ড়ে দেয়া বেশ কিছু ফরাসী লেখকদের প্রতি-দৃষ্টিকেন্দ্রিক অবস্থান বিশ্লেষণ করেছেন।

সার্ত্রে দ্বার্থহীনভাবে দৃষ্টির ধারণার বিরোধী হ’য়ে তাকে দৃষ্টিকেন্দ্রিক-ভীতি বলেছেন; ‘দেখা’ বিষয়ে তার রচনাবলীতে ৭০০০ বারের মতো উল্লেখ আছে।…

আত্ম-মগ্ন আর অস্তিত্ববাদী চোখ (The Narcissistic and Nihilistic Eye)
সর্বপ্রথম হাইডেগার দৃষ্টির কর্তৃত্বকে প্রশংসার ধারণা দেন, কিন্তু এটা আধুনিক কালে ধীরে ধীরে অস্তিত্ববাদের দিকে ঝুঁকে যায়। একটি অস্তিত্ববাদী চোখের ব্যাপারে হাইডেগারের মতামত আজকের দিনে বিশেষভাবে চিন্তার উদ্রেগ করে; স্থাপত্য-সম্পর্কিক পত্রিকাগুলোতে নজর কাড়তে পারা গত বিশ বছরের বেশ কিছু স্থাপত্য প্রকল্প আত্ম-মগ্নতা আর অস্তিত্ববাদ দুইকেই প্রকাশ করে।

কর্তৃত্বকারী চোখ সব ধরণের সাংস্কৃতিক উৎপাদনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়, যা সম্ভবত আমাদের সহানুভূতি, সমবেদনা আর বাস্তবের সাথে অংশগ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। আত্ম-মগ্ন চোখ স্থাপত্যকে দেখে শুধুমাত্র আত্ম-প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে, আর একটি বৃদ্ধিবৃত্তিক-শিল্পীত খেলা হিসেবে অবশ্য-প্রয়োজনীয় মানসিক এবং সামাজিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, যেখানে কিনা অস্তিত্ববাদী চোখ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবেদনশীল এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা আর ভিন্নতাকে বাড়িয়ে দেয়। মানুষের শরীর-কেন্দ্রিক এবং বাস্তবতার সমন্বিত অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে অস্তিত্ববাদী স্থাপত্য শরীরকে বিজোড়িত করে না এবং পৃথক করে, উপরন্তু সাংস্কৃতিক বিন্যাসকে পুনর্নির্মানের চেষ্টা না ক’রে সামগ্রিক গুরুত্বায়নের পাঠকে অসম্ভব ক’রে তোলে। …

মৌখিক বনাম চাক্ষুষ পরিসর
Oral versus Visual Space

তবুও দৃষ্টি সবসময় মানুষের উপর কর্তৃত্ব করেনি। প্রকৃতপক্ষে, প্রথমদিকে মনুষের উপর শ্রবণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিলো আর ধীরে ধীরে সেটার জায়গা নিয়েছে দৃষ্টি। প্রত্ন-সাহিত্যে এমন কিছু জনপদের কথা পাওয়া যায় যেখানে আচার-আচরণ আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘ্রাণ, স্বাদ আর স্পর্শের মতো একান্ত অনুভূতিগুলোর সমষ্টিবদ্ধ গুরুত্ব ছিলো।… অনেকগুলো জন-গোষ্ঠীতে সামগ্রিক আর ব্যক্তিগত পরিসর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুভূতিগুলোর ভূমিকা কেমন ছিলো তা নিয়ে এডওয়ার্ড টি হলের বই ‘গোপন পরিমাপ’ (দ্য হিডেন ডাইমেনসন) এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ, যদিও দুঃখজনকভাবে স্থপতিরা এটার কথা ভুলে গেছেন বলেই মনে হয়।

চোখের শক্তি এবং দুর্বলতা

….

প্রকৃতপক্ষে, দৃষ্টির সংশয়হীন কর্তৃত্ব হয়তো খুব প্রাচীন বিষয় নয়, গ্রিকদের চিন্তা এবং আলোকবিদ্যার সাথে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকার পরও।লুসিয়েন ফেভরির মতে –“ ষোড়শ শতকের মানুষেরা দেখার আগে শুনতো এবং গন্ধ শুকতো, তারা বাতাস টেনে নিতো এবং শব্দ খেয়াল করতো (caught sound)। অনেক পরে এসে মানুষ গুরুত্বসহকারে এবং সক্রিয়ভাবে জ্যামিতির সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে নিয়েছে, কেপলার (১৫৭১-১৬৩০) আর Desargues of Lyon (১৫৯৩-১৬৬২) এর প্রভাবে বস্তুর নানা ধরণের গড়নের প্রতি মনোযোগী হয়েছে।

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমফর (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

The hard core of beauty

সৌন্দর্যের চরমতা
১৯৯১

দুই সপ্তাহ আগে আমি রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান শুনছিলাম। অনুষ্ঠানটা ছিল মার্কিন কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামের উপরযার শিরোনাম ছিল “সৌন্দর্যের চরমতা”। সৌন্দর্যের যে একটা চরম সীমা আছে – এই ভাবনাটা আমার ভাল লাগল। সৌন্দর্য আর চরম সীমার- এই সম্পর্কের ব্যাপারটার খানিকটা আভাস আমি খুঁজে পেলাম পরবর্তীতে আমার স্থাপত্য নিয়ে ভাববার সময়। উইলিয়াম যেন বলছিলেন, ” মেশিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু থাকে না।” সাথে সাথেই আমার মনে হলো – পিটার হ্যান্ডকি (Peter Handke) যেন এমনই একটা ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করেন। তার হতাশাটা আমি বুঝতে পারিযখন তিনি বলেন- প্রকৃতিতেই সৌন্দর্যের বাসপরিণত বস্তু যখন আমাদেরকে কোন কিছু নির্দেশ করে নাকিমবা যখন তিনি নিজে থেকে কোন কিছুর অর্থ করতে পারেন না।

বেতারের ঐ অনুষ্ঠান থেকেই তখন আমি জানলাম যেকোন কিছুর নিজস্বতার বাইরে অন্য কোন আইডিয়া নেই – এই বিবেচনাই ধারণ করে উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কবিতা। নিজের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতিগুলোকে বাস্তবিক জগতে (world of things) নিয়ে গিয়ে সেগুলোকে তার নিজের করে নেওয়াই তার শিল্পের লক্ষ্য।

সঞ্চালক বলছিলেন, এই ব্যাপারটা উইলিয়ামের কাজে দৃশ্যত নৈর্ব্যক্তিক এবং অল্প-কথায় অর্থপূর্ণ ভাবে ঘটেআর এই কারণেই তার লেখনীর এতটা আবেগময় প্রভাব।

কথাগুলো আমাকে আকৃষ্ট করল। বলল বিল্ডিং নিয়ে আবেগী হয়ে উঠতে আগ্রহী না হতেতারপরও আবেগকে জাগতে দিলামপ্রকাশিত হতে দিলাম।

সৌন্দর্যের চরমতা : একিভূত/জমাটবদ্ধ উপাদান।

(অসমাপ্ত)

 

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমথর (চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

The body of architecture
স্থাপত্যের অবয়ব
১৯৯৬


জাতীয় জাদুঘরের কিউরেটর আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত আর অপ্রত্যাশিত সব প্রশ্ন করে তিনি আমাকে হতবাক করার চেষ্টা করছিলেন। আমি স্থাপত্য নিয়ে কি ভাবতাম? আমার কাজের কোনদিকগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? এইসবই জানতে চাচ্ছিলেন। সাক্ষাৎকারটা রেকোর্ড হচ্ছিল। আমি আমার মতো ক’রে যতটা পারি বলেছি। কিন্তু সাক্ষাৎকার শেষে আমার নিজের উত্তরে আমি নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধুর সাথে পারে কথা বলি। আকি কাউরিসমাকির সাম্প্রতিক চলচিত্র নিয়ে। চরিত্রের প্রতি পরিচালক যে মনোযোগ আর শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তাতে আমি মুগ্ধ। অভিনেতাদেরকে তিনি কোন কিছুতে আটকে রাখেন না। কোন চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ কারার জন্যও ব্যবহার করেন না। বরং তাদেরকে এমনভাবে আলোকিত করে উপস্থাপন করেন যে আমরা সহজেই তাদের বৈশিষ্ট্য কিমবা গোগনীয়তা বুঝে যাই। কাউরিসমাকির শৈলী তার চলচিত্রে একটা উষ্ঞতার অনুভূতি এনে দেয়। আমার বন্ধুকে তখন বললাম, এখন বুঝতে পারছি সকালের সাক্ষাৎকারে আমার কি বলাটা ঠিক হতো। কাউরিসমাকি যেভাবে চলচিত্র বানান, আমি আসলে সেই ভাবেই বিল্ডিং বানাতে চাই।


যে হোটেলে আমি থাকছিলাম সেটাকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন একজন জনপ্রিয় ফরাসী স্থপতি। ওনার কাজের সাথে আমি আগে পরিচিত ছিলাম না। পুরানো ধাচের কাজ করেন উনি। এই ধরণের কাজের প্রতি আমার আগ্রহ নেই। কিন্তু হোটেলে ঢোকার পরপরই তার তৈরী করা পরিবেশ আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কৃত্রিম আলো হলঘরটাকে যেন মঞ্চের মতো করে আলোকিত করে রেখেছে। কোথাও আলো আছে আবার কোথাও বা অন্ধকার। অভ্যর্থনার জায়গাটা বেশ উজ্জ্বল। দেয়ালের কুলুঙ্গিগুলোতে বিভিন্ন ধরণের পাথর। গ্যালারির দিকে উঠে যাওয়া বড়সড় সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে লোকজন চকচকে সোনালী দেয়ালের পাশে হয়তো একটু দাড়ায়। উপরের দিকের ড্রেস-সার্কেল বক্সে হালকা কিছু খাওয়ার জন্য কেউ কেউ একটু বসে নেয়। অবশ্য এগুলো বেশ ব্যায়বহুল। ‘প্যটার্ন ল্যাংগুয়েজ’ এর লেখক আলেকজান্ডার এটা দেখে নিশ্চয় খুশি হতেন। যে ধরণের পরিসরিক ব্যবস্থাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে তার বর্ণনা আছে এই বইটাতে। হলঘরের বিপরীত দিকের একটা বাক্সে আমি বসেছিলাম, যেন একজন দর্শক যে নিজেকে ডিজানারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবিস্কার করে। নিচের দিকে তাকিয়ে লোকজনের আসা-যাওয়া দেখতে আমার ভালই লাগল। আমি যেন বুঝে উঠতে পারলাম এই স্থপতির সফলতার কারণ ।


হৃদি বলছিল- তার উপর ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের একটা ছোট্ট বাড়ীর বেশ প্রভাব আছে। বাড়ীটা সে অনেক আগে দেখেছিল। ছোট ছোট ঘর আর বেশ নামানো সিলিং ছিল বাড়ীটাতে। ছোট্ট লাইব্রেরিতে অদ্ভুতভাবে আলো আসতো। প্রচুর জড়োয়া স্থাপতিক কারুকাজ করা ছিল। পুরো বাড়ীটা একটা সুষ্পষ্ট আনুভূমিকতা নিয়ে হাজির হতো যেমনটা আগে কখনো দেখেনি। বেশ বয়স্ক একজন মহিলা সেখানে বাস করতেন। আমার মনে হয়েছিল বাড়ীটাতে গিয়ে আমার দেখার কিছু নেই। মেয়েটা যা বোঝাতে চাচ্ছিল তার সাথে আমি আগে থেকেই পরিচিত। বাড়ীর ব্যাপারে সে যে অনুভূতির কথা বলছিল সেটাও আমার জানা।


একটা স্থাপত্য প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়া স্থপতিদের কিছু বিল্ডিং বিচারকদেরকে দেখানো হচ্ছিল।

(আংশিক)

 

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমথর (প্রথম পরিচ্ছেদ)

(পিটার জুমথর এর Thinking Architecture এর অনুবাদ প্রচেষ্টা। আপাতত কিছু লাইন অনুবাদ না ক’রেই রেখে দিচ্ছি। যুতসই অনুবাদ না করতে পারার জন্য। অথবা যেটা খসড়া অনুবাদ করেছি সেটার থেকে ইংরেজীটাই ভাল লাগছে ব’লে। যদি কেউ এই অনুবাদ প্রচেষ্টা পড়ে থাকেন তাদেরকে অনুরোধ করছি সমালোচনা করার জন্য। যে অংশগুলো ইংরেজীতে আছে সেগুলোর অনুবাদে পরামর্শ দেওয়ার জন্য।)

স্থাপত্য নিয়ে ভাবনা
Thinking Architecture


A way of looking at things
দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৮৮

হারানো স্থাপত্যের খোঁজে
In search of the lost architecture

স্থাপত্য নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মানসপটে কিছু ছবি ভেসে ওঠে। যাদের বেশির ভাগই স্থপতি হিসেবে আমার শিক্ষা আর কাজের সাথে সম্পর্কিত। এত বছর ধরে আমার অর্জিত পেশাগত জ্ঞান তারা ধারণ করে। তাদের কারো কারো মধ্যে থাকে আমার ছোটবেলার স্মৃতি। স্থাপত্যকে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই একটা সময় আমি স্থাপত্যের  সংস্পর্শে এসেছি। কখনো কখনো আমি যেন অনুভব করতে পারি হাতে ধরা বিশেষ কোনো দরজার হাতলকে। যে হাতলটা কোনো একটা ধাতু দিয়ে তৈরী চামচের উল্টো দিকের মতো।

আমার এক চাচীর বাগানে ঢোকার দরজাতে ছিল এই হাতলটা। আজো ঐ দরজার হাতল আমার মনে বিচিত্র ধরণের মুড আর গন্ধের কোনো জগতে ঢোকার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে আমার পায়ের নিচের নুড়ির শব্দ। মসৃণ করা ওক কাঠের সিড়িঘরের দৃপ্তি। অন্ধকার করিডোর দিয়ে এগিয়ে বাড়ির একমাত্র আলোকিত ঘর- রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমি যেন শুনতে পাই ভারি মূল-দরজার বন্ধ হওয়ার শব্দ।

স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ে, একমাত্র এই ঘরের সিলিংই যেন সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে যেত না। গাঢ় লাল রঙের ছয়কোণা মেঝের টালি ছিল নিখুত ভাবে লাগানো। এমনকি তার জোড়াগুলোও বোঝা যেতো না। পায়ের নিচে খুব শক্ত কিছুর উপস্থিতি টের পেতাম। আর কাপবোর্ড থেকে পেতাম তেল চিটচিটে একটা গন্ধ।

পুরোনো আর দশটা রান্নাঘরের মতই ছিল এর সবকিছু। চোখে লাগার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। হয়তো এর এই অতি সাধারণত্বের জন্য এর স্মৃতি আমার ভেতরে র’য়ে গেছে। আমার রান্নাঘরের ধারণা তাই এই ঘরটির আবহের সাথে মিলে যায়।

Now I feel like going on and talking about the door handles which came after the handle on my aunt’s garden gate, about the ground and the floors, about the soft asphalt warmed by the sun, about the paving stones covered with chestnut leaves in the autumn, and about all the doors which closed in such different ways, one replete and dignified, another with a thin, cheap clatter, others hard, implacable and intimidating.

আমার মতে, এই ধরণের স্মৃতিতেই থাকে স্থাপত্যের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা। স্থপতি হিসেবে এই সব স্মৃতির ভেতরেই আমি খুঁজে ফিরি স্থাপত্যের আবহ আর প্রতিচ্ছবি।

বিল্ডিং ডিজাইন করার সময় আমি অনবরত আমার পুরোনা ছাড়া-ছাড়া স্মৃতির ভেতর ঘোরাফেরা করি। ভাবতে থাকি স্মৃতির কোনো একটা অবস্থার স্থাপতিক দিক। আমার উপর তার কি প্রভাব পড়েছিল সেটা মনে করতে চেষ্টা করি। সবকিছুরই যেন একটা নির্দিষ্ট জায়গা আর ধরণ ছিল। তাদের স্বাভাবিক উপস্থিতি প্রাণবন্ত ক’রে তুলতো সেই স্থানকে। আমি এই স্মৃতিগুলোর সাহায্য নিতে চেষ্টা করি। যদিও আমি বিশেষ কোনো ধরণ নির্দেশ করতে পারি না, তবু যেন একটা পূর্ণতা আর মায়ার ছোঁয়া পাই। আমার মনে হ’তে থাকে – এমনটা আমি আগে কোথাও দেখেছি। অথচ আমি নিশ্চিত জানি, এর সবই নতুন। অন্যরকমও। পুরোনো কোনো স্থাপতিক কাজের সাথে এর এমন কোনো সংযোগ নেই যা স্মৃতিকাতরতার গোপনীয়তাকে ফাঁস ক’রে দিতে পারে।

ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরী
Made of materials

জোসেফ বয়োস এবং ‘আর্টি পভেরা গ্রুপ’ এর কাজ আমার কাছে যেন অনেককিছু প্রকাশ করতে চায়। তারা যেভাবে কোনো ম্যাটেরিয়ালকে সূক্ষ্ণ এবং বুদ্ধিদিপ্ত ভাবে ব্যবহার করেছে তা আমাকে মুগ্ধ করে। It seems anchored in an ancient, elemental knowledge about man’s use of materials, and at the same time to expose the very essence of these materials which is beyond all culturally conveyed meaning.

আমার কাজে আমি ম্যাটেরিয়ালকে এই ভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করি। যদিও ম্যাটেরিয়াল নিজে কাব্যিক নয়, তবুও স্থাপত্যের কোনো বস্তুতে/কাজে তা কাব্যিক হ’য়ে উঠতে পারে, যদি স্থপতি তাদের জন্য কোনো অর্থপূর্ণ অবস্থা তৈরী করতে সমর্থ হয়।

The sense that I try to install into materials is beyond all rules of compositions, and their tangibility, smell and acoustic qualities are merely elements of the language that we are obliged to use. Sense emerges when I succeed in bringing out the specific meanings of certain materials in my buildings meanings that can only be perceived in just this way in this one building.

এই লক্ষ্যে কাজ ক’রতে হ’লে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে প্রশ্ন ক’রতে হবে- কোনো একটা বিশেষ আর্কিটেকচারাল কনটেক্সটে নির্দিষ্ট কোনো ম্যাটেরিয়াল কী অর্থময়তা তৈরী ক’রতে পারে তা নিয়ে। এই সব প্রশ্নের সুচারু উত্তর ম্যাটেরিয়ালের স্বাভাবিক ব্যবহার এবং তাদের নিজস্ব আবেদন সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্যকে আরো উজ্জ্বল ক’রে তোলে।

এ কাজে আমরা সফল হ’লে স্থাপত্যে ম্যাটেরিয়াল উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত হ’য়ে উঠবে।

বিষয়ের ভেতরে কাজ করা
Work within things

যোহান সেবাসটিয়ান বাখ্ এর সংগীত সম্পর্কে বলা হয়, এর “স্থাপত্য”ই (বাংলাতে সংগীতের আর্কিটেকচারকে সংগীতের কাঠামো বলা যায় কি?) এর সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক। খুব সহজ আর স্পষ্ট (clear and transparent) এর গঠন। তার কম্পোজিশন শোনার সময় এর সূক্ষ্ণ মেলোডিক, হারমোনিক এবং রিদমিক্যাল অংশগুলো আলাদা করা যায়, পুরো কম্পোজিশনের অনুভূতিকে অক্ষুন্ন রেখেই। এর সম্পূর্ণতাই এর অংশগুলো কে ফুটিয়ে তোলে। এর গঠন খুব পরিস্কারভাবে বোঝা যায়। and if we trace the individual threads of the musical fabric it is possible to apprehend the rules that govern the structure of the music.

নির্মাণ এমন একটা শিল্প (আর্ট) যা বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে একটা অর্থপূর্ণ সম্পূর্ণতা তৈরী করে। মানুষের তৈরী করা ইমারতগুলো তাদের নির্মাণ সামর্থের বহিঃপ্রকাশ। আমার মতে, স্থাপত্য নিদর্শনের প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর নির্মাণ কার্য। যথাযত উপাদান সংগ্রহ আর সমন্বিত করার পরই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থাপত্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

I feel respect for the art of joining, the ability of craftsmen and engineers. I am impressed by the knowledge of how to make things, which lies at the bottom of human skill. I try to design buildings that are worthy of this knowledge and merit the challenge to this skill.

খুব গুছিয়ে নির্মিত কোনো কিছু দেখে আমরা যদি বুঝতে পারি, সেটা নির্মাণ ক’রতে কতটা যত্ন আর দক্ষতার দরকার পড়েছিল তাহলে প্রায়সই বলে ফেলি, “এটা করতে ব্যাপক খাটুনি গেছে” (a lot of work went into this.) কাজই যে সাফল্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ- আমাদের এই ধারণা আমাদেরকে শিল্পকর্ম আর স্থাপত্যকর্মের মূল-ভাবনা/অনুধ্যানের শেষ সীমায় পৌছে দেয়। যে উদ্যোগ আর দক্ষতা দিয়ে আমরা তাদেরকে গ’ড়ে তুলি তা কি তাদের নিজস্বতা/চরিত্র তৈরী করে? আমার মনে দাগ কাটা কোনো স্থাপত্যকর্ম কখনো কখনো আমাকে এমনটাই ভাবতে প্ররোচিত করে, যেমনটা করে কোনো গান, সাহিত্য বা চিত্রকর্ম।

ঘুমের নিরবতার জন্য
For the silence of sleep

সংগীত আমার খুব ভাল লাগে। মোজর্ট’র পিয়ানো কনসার্টের ধীর নড়াচড়া, জন কোল্টরেনের ব্যালাড কিমবা কোনো গানে মানুষের গলার স্বর সবই আমাকে আলোড়িত করে।

মানুষের সুর, তাল আর লয় তৈরীর স্বক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে।

কিন্তু সুর, তাল আর লয়ের উল্টো জিনিসও শব্দের জগতে আছে। আছে অনৈক্য আর কেটে যাওয়া ছন্দ। আছে টুকরো টুকরো আর শব্দের গুচ্ছ। আছে একেবারেই বাস্তবিক শব্দ বা  হট্টগোল (noise)। সমসাময়িক সংগীতে এর সবগুলো নিয়েই কাজ হচ্ছে।

সমসাময়িক সংগীতের মত সমসাময়িক স্থাপত্যও এতটা মৌলিক হওয়া উচিৎ। কিন্তু তার একটা সীমা আছে। Although a work of architecture based on disharmony and fragmentation, on broken rhythms, clustering and structural disruptions may be able to convey a message, as soon as we understand its statement our curiosity dies, and all that is left is the question of the building’s practical usefulness.

স্থাপত্যের নিজেরও একটা জগত আছে। জীবনের সাথে এর বিশেষ একটা দৃশ্যমান সম্পর্ক আছে। প্রথম অবস্থায় একে আমি কোনো বক্তব্য বা প্রতীক হিসেবে ভাবি না;  ভাবি একটা মোড়ক বা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে, যাকে ঘিরেই জীবনের বোয়ে চলা; যেন একটা সংবেদনশীল আধার যার ভেতরে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, যায় কাজে মনোযোগ দেওয়া, শোনা যায় ঘুমের নিরবতার সুর।

প্রারম্ভিক প্রতিশ্রুতি / প্রথম অবস্থার অঙ্গিকার
Preliminary promises

কোন নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর স্থাপত্য তার বাস্তব অবস্থান (concrete place) পায়। যে জায়গাতে এটা দাড়িয়ে থাকে। যে জায়গা থেকে স্থাপত্য প্রকাশিত হ’য়ে ওঠে। বাস্তব জগতে এখনো নিজের অবস্থান খুঁজে পায়নি এমন কোনো নির্মিতব্য স্থাপতিক কাজের জন্য তৈরী করা ড্রয়িং ঐ কাজের প্রকাশিত হওয়ার যে প্রচেষ্টা তার প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কোনো বিল্ডিং যে আলোকপ্রভা (aura) নিয়ে হাজির হয়, স্থাপতিক ড্রয়িং তার যতটা সম্ভব কাছাকাছি কিছু প্রকাশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ড্রয়িঙের প্রভাবে আমাদের মনে প্রকৃত বিল্ডিংটার না থাকার হাহাকার বেজে ওঠে। যার ফলে যে কোনো ড্রয়িঙে থাকা অসম্পূর্ণতার ব্যাপারে আমাদের ভেতরে একধরণের সচেতনতা তৈরী হয়। মনে কৌতুহল জাগে ড্রয়িঙের হাজির করা বাস্তবতার প্রতিশ্রুতির প্রতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির যদি আমাদের মনকে নাড়া দেয়ার ক্ষমতা থাকে তাহলে আমাদের মনে জেগে ওঠে তা বানিয়ে ফেলার উদ্দীপনা।

মোড়কবাধা বাস্তুতে থাকা সূক্ষ্ণ ছিদ্র
Chinks in sealed objects

মানুষের হাত দিয়ে গ’ড়ে ওঠে যে বিল্ডিং তা তৈরীর সময় তার ছোট ছোট অংশগুলোকে জোড়া লাগাতে হয়। মোটা দাগে ব’ললে, পরিসমাপ্ত কোনো কিছুর গুণমান নির্ভর করে তাতে থাকা জয়েন্টগুলোর গুণমানের উপর।

ঐতিহ্যগতভাবে ভাস্কর্যে জয়েন্টের ধরণ এবং বিভিন্ন অংশ সংযুক্ত করার ব্যাপারটা যতটা পারা যায় কমিয়ে রাখা হয়, যেন সামগ্রিক গড়নটা ঠিকমত বোঝা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় রিচার্ড সিয়েরা’র স্টিলের তৈরী ভাস্কর্যগুলোর কথা। যেগুলো দেখলে মনে হয় তারা যেন প্রাচীন কালের মতই কোনো একখন্ড কাঠ বা পাথর দিয়ে তৈরী। ১৯৬০ এবং ৭০ এর দশকের শিল্পীদের কাজে সবথেকে সহজ আর স্পষ্টজয়েন্টের ব্যাবহারই দেখা যায়। Beuyes, Merz and others often used loose setting in space, coils, folds and layers when developing a whole from the individual parts.

The direct, seemingly self-evident way in which these objects are put together is interesting. There is no interruption of the overall impression by small parts which have nothing to do with the object’s statement. প্রয়োজনীয় ডিটেইলগুলো আমাদের সামগ্রিক ধারণাটা থেকে আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যায় না।

প্রতিকের উর্ধ্বে
Beyond the symbols

কাজের লোকের কাছে কোনকিছুই ফেলনা নয়। তারা সবকিছুই চালিয়ে দিতে পারে। স্থপতি ভেঞ্চুরি ব’লতেন, “মূলধারার প্রায় সবই সঠিক”। আর আমাদের এই সমসাময়িক সময় যাদের উপর খুব একটা প্রসন্ন নয় তাদের মতে কোনকিছুই আর ঠিকঠাক মত চলছে না। কথাগুলো কখনো পরষ্পর-বিরোধী বাস্তবতার বিপরীত, আবার কখনোবা পরষ্পর-বিরোধী মতামতের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। আমরা দ্বন্দ্বের সাহচর্যে বসবাস ক’রতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। তার যথেষ্ট কারণও আছে। প্রথা ভাঙতে থাকে, সেইসাথে সাংস্কৃতির চরিত্রও। অর্থনীতি আর রাজনীতিজাত অস্থিরতা/গতিময়তা খুব কম লোকই বুঝে উঠতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসে আরো পরে। সবকিছুই অন্যকিছুতে মিশে যায়। গণ-যোগাযোগের হাত ধ’রে গ’ড়ে ওঠে প্রতীকের এক কৃত্রিম জগৎ। যেখানে স্বেচ্ছাচারিতা চলতেই থাকে।

যে অবস্থায় আমাদের নিজস্ব চৌহদ্দির বাইরের যে কোনো বিষয়কে অস্পষ্ট, ঝাপসা অথবা খানিকটা অবাস্তব ব’লে মনে হয় তাকে উত্তর-আধুনিক জীবন বলা যেতে পারে। দুনিয়াটা একগাদা প্রতীক আর তথ্যে ভরপুর। কোনো একজনের পক্ষে এই প্রতীক আর তথ্যগুলো কী ব’লতে চাচ্ছে তার সবটা বোঝা সম্ভব হয় না। কখনো কখনো কেউ হয়তো অন্য কাউকে নির্দেশ করে। প্রকৃত বাস্তবতা থাকে ঘোমটার/পর্দার আড়ালে। কেউই তাকে দেখতে পারে না।

তারপরও আমি মনে করি প্রকৃত বাস্তবতা ব’লে আসলেই কিছু আছে, তা যতই ভঙ্গুর হোক না কেন। মাটি আছে, আছে পানি। সূর্যের আলো আছে। আছে ভূমিতল আর তরুরাজি। মানুষের তৈরী করা কল-কবজা, যন্ত্রপাতি কিমবা বাদ্যযন্ত্রও আছে। which are what they are, which are not mere vehicles for an artistic message, whose presence is self-evident.

When we look at objects or buildings which seem to be at peace within themselves, our perception becomes calm and dulled. The objects we perceive have no message for us, they are simply there. Our perceptive faculties grow quiet, unprejudiced and unacquisitive. They reach beyond signs and symbols, they are open, empty. It is as if we could see something on which we cannot focus our consciousness. Here, in this perceptual vacuum, a memory may surface, a memory which seems to issue from the depths of time. Now our observation of the object embraces a presentiment of the world in all its wholeness, because there is nothing that can be understood.

দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ উপকরণের মধ্যে একধরণের শক্তি আছে। যথেষ্ট সময় ধ’রে তাদের দিকে না তাকালে যা ঠিক ধরা যায় না। এডওয়ার্ড হপার্সের আঁকা চিত্রগুলো যেন আমাদেরকে সেটা মনে করিয়ে দেয়।

পরিসমাপ্ত ল্যান্ডস্কেপ
Completed landscapes

শরীরের ভেতরের টানাপোড়েন
The tension inside the body

স্থপতিদের তৈরী করা সমস্ত ড্রয়িঙের মধ্যে ওয়ার্কিং ড্রয়িংই আমার সবচেয়ে পছন্দের। তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং সুনির্দিষ্ট। কল্পিত বস্তুকে রূপ দেয় যে নির্মাণ-শ্রমিকেরা, তাদের জন্যই তৈরী এই ড্রয়িং। লোকজন চাইলেই এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। প্রজেক্ট ড্রয়িঙের মতো তারা কাউকে সম্মত বা মুগ্ধ করার চেষ্টা করে না। তারা যেন বলে, “এটা (বিল্ডিংটা) এমনই দেখাবে/হবে।”

ওয়ার্কিং ড্রয়িং এ্যানাটমি (শরীর সংস্থান বিদ্যা) ‘র ড্রয়িঙের মত। জোড়া লাগানোর কৌশল, লুকানো জ্যামিতি, ম্যাটেরিয়ালের/বস্তুর ঘর্ষণ, ছেড়ে দেওয়া আর ধ’রে রাখার অভ্যন্তরীন শক্তি/বল, মানুষের তৈরী করা বস্তুতে লীন হওয়া মানুষের কাজের চিহ্নের মতো যে গোপন অন্তর্গত টানাপোড়েনগুলোকে সম্পন্ন স্থাপতিক নির্মাণ লুকিয়ে রাখতে চাই, তা প্রকাশ করে দেয় এই ওয়ার্কিং ড্রয়িংগুলো।

Kassel এর Documenta Exhibition –এ একবার পার কিরকেবি (Per Kirkeby) বাড়ির মত দেখতে ইটের একটা ভাস্কর্য গড়েছিলেন। যে বাড়িতে  ঢোকার মতো কোনো দরজা ছিল না। এর ভেতরটা ছিল অনভিগম্য আর লুকানো। গোপনীয় এই অভ্যন্তরভাগ ভাস্কর্যটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে যোগ করেছিল এক অদৃশ্য রহস্যময় গভীরতা।

আমি মনে করি, একটা বাড়ির লুকানো কাঠামো আর নির্মাণশৈলী এমন ভাবে হওয়া উচিৎ যাতে ক’রে বিল্ডিংটির ভেতরের টানাপোড়েন আর কাঁপুনি তার বহিরঙ্গে কোনো ভাবে প্রকাশ পায়। যেমন ভাবে তৈরী হয় বেহালা। আর আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় সজীব প্রকৃতির (natural body) কথা।

অপ্রত্যাশিত সত্য
Unexpected truth

ছোটবেলায় আমি কবিতাকে খানিকটা অস্পষ্ট রূপক আর সংকেত দিয়ে রাঙানো এক ধরনের মেঘ হিসেবে কল্পনা করতাম। ব্যাপারটা উপভোগ্য হলেও দুনিয়ার বাস্তব চিত্রের সাথে তাকে মেলানো কঠিন। স্থপতি হিসেবে আমি বুঝতে শিখেছি যে,  কবিতার এই অর্বাচিন সংঙ্গার উল্টোটাই বরং সত্যের কাছাকাছি।

(আংশিক)

স্থাপতিক অভিধান-১ (সংগ্রহ ও অনুবাদ)

স্থাপত্য বিষয়ক অনেক বিলেতি শব্দের সরাসরি প্রতিশব্দ বাংলাতে পাইনি। বিলেতিরাও স্থাপত্যের অনেক শব্দ অন্য ভাষা থেকে জোগাড় করেছে। বাংলাতেও হয়তো জোগাড় করতে হবে। তবে বাংলাতে স্থাপত্য বিষয়ে লেখালেখির পরিমান খুবই কম। আর সে কারণে যথাযথ প্রতিশব্দ তৈরীর চেষ্টাও খুব একটা চোখে পড়েনি। বাংলাতে আমরা অনেক কিছুই একাধিক শব্দের সমন্বয়ে বুঝিয়ে দিতে পারি। হয়তো সমাসের ব্যবহার ক’রে আমরা শব্দবন্ধগুলোকে ছোট ক’রে এনে নতুন শব্দ তৈরী ক’রে নিতে পারি। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। নতুন শব্দ তৈরীর জন্য প্রয়োজন নিজ ভাষার শব্দ তৈরীর কৌশলগুলো জানা আর অবশ্য অবশ্যই কল্পনাশক্তি। কেউ যদি কোনো প্রতিশব্দ প্রস্তাব করেন আর তা যদি ব্যবহার উপযোগী আর যথাযথ হয় তবে তা জনপ্রিয় করাও দরকার। অনেক সময় ব্যবহার না করার পরিণতিতে সুন্দর আর মানানসই কোনো প্রতিশব্দও হারিয়ে যেতে পারে। আমি আমার নজরে আসা স্থাপত্য সম্পর্কিত শব্দগুলো এখানে টুকে রাখার চেষ্টা করে যাবো আশা রাখি। কিছু প্রতিশব্দ নিজে তৈরীরও চেষ্টা থাকবে। স্থাপত্য বিষয়ক অনেকগুলো বিলেতি শব্দের প্রচলিত বাংলা-শব্দও ঠিক বাংলা শব্দ নয়, হয়তো আরবি, ফার্সি বা সংস্কৃত। সেগুলোও বিদেশী শব্দই। হয়তো একটু বেশি দিন ধ’রে বাংলাতে ব্যবহার হয়ে আসছে, এই যা। সেগুলোরও বাংলাকরণ করা যায় কিনা ভাবা দরকার।

যদিও স্থাপত্য বিষয়ক শব্দের প্রাধান্য থাকবে এই সংগ্রহে, তবু নতুন কোনো পারিভাষিক শব্দ (পরিভাষার মতো ক’রে পরিশব্দ বলা যায় কি?) পেলেও টুকে রাখার চেষ্টা থাকবে।

aesthetics- নন্দনতত্ত
শিল্পকে অর্থময় এবং বোধগম্য করার তাগিদে দর্শনের যে শাখা শিল্পের স্বরূপ, সৌন্দর্য আর আগ্রহ নিয়ে কাজ করে। (ডি.কে.চিং)

apartment – মহল
এ্যাপার্টমেন্টকে মহল হিসেবে প্রথম উল্লেখ করতে দেখেছি আবদুশ শাকুরের লেখাতে। তখন মনে প’ড়েছে ঘোশেটি বেগমের থাকার জায়গাটার নাম ছিলো মতিঝিল-মহল। সেটা ঠিক এ্যাপার্টমেন্ট ছিলো কিনা জানি না। তবে এটা যে একটা উপযোগী প্রতিশব্দ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

arch – খিলান
বাংলাতে মুসলমান সুলতানেরা যখন বিভিন্ন ধরণের ইমারত বানানো শুরু করেন তখন এই শব্দটার বাংলাতে প্রবেশ। আমার কানে এখনো এটাকে ঠিক বাংলা শব্দের মতো লাগে না।
Model

architecture – স্থাপত্য
robust architecture – জমকালো স্থাপত্য।
লুই কান বা ফ্রাংকো গেরির অনেক কাজকে এই ধরণের স্থাপত্য হিসেবে উদাহরণ দেওয়া যায়। এই ধরণের স্থাপত্যের ফর্ম বা গড়ন বেশ আইকোনিক বা  ভাস্কর্যসম অর্থাৎ যার গড়ন সহজেই অন্য কোনো স্থাপত্য-কর্ম থেকে আলাদা ক’রে চেনা যায়।
weak architecture – অনুগ্র স্থাপত্য (কাজী খালিদ আশরাফ এই বাংলাটা করেছেন)
কেনজো কুমা তার অনেকগুলো স্থাপত্যকে অনুগ্র স্থাপত্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ধরণের স্থাপত্য চোখের উপর বা মনের উপর বাড়তি চাপ দেয় না যেন। খুব চোখে পড়ার মতো ফর্ম বা গড়ন থাকে না বললেই চলে। পরিসরই যেখানে মূখ্য। পরিসর তৈরীর উপকরণ নিজেকে চিৎকার ক’রে নিজের উপস্থিতি জানায় না। যেফ্রি বাওয়ার অনেক কাজও এই ধরণের স্থাপত্যের উদাহরণ হতে পারে। স্থপতি বশিরুল হকের ডিজাইনকৃত ছায়ানট-ভবনটিকে একটি অনুগ্র স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।(রাজীব রহমান)
IMG38428
ছায়নট ভবন-বশিরুল হক
modern architecture – আধুনিক স্থাপত্য; আধুনিকতাবাদি স্থাপত্য
classical architecture – ধ্রুপদি স্থাপত্য

architectonics
কোন শিল্পকর্মের কাঠামো এবং তার মূল-ধারণার সমন্বয় প্রক্রিয়া/ the unifying structure or concept of an artistic work.

archivolt
a decorative molding or band on the face of an arch following the curve of the intrados.

art- শিল্প
চমৎকার, আকর্ষনীয় বা অসাধারণকে গ’ড়ে তোলার জন্য দক্ষতা, নৈপুন্য আর চিন্তাশক্তির সচেতন ব্যবহার। (ডি.কে.চিং)

autonomy of architecture – স্থাপত্যের স্বাতন্ত্র্য (কাজী খালিদ আশরাফ)

basement – পাতালঘর
মাটির নিচের জগতকে পাতালপুরি হিসেবে অনেক আগে থেকেই ব্যবহার করা হয়ে আসছে। সেটাকে ব্যবহার ক’রে এই পাতালঘর শব্দটার তৈরী করা হয়েছে। মুঘলরা বেইজমেন্টকে ব’লতো জামিনদোজ। এটাও একটা বিকল্প হ’তে পারে।

beauty – সৌন্দর্য
কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর এমন কোনো গুণ যা চিত্তকে আনন্দ দেয়, সত্তা আর চেতনাকে তৃপ্ত করে, তা সে রং বা গড়নের ছন্দ থেকেই আসুক বা নৈপুণ্যের উৎকর্ষতা, সততা, মৌলিক বা অন্য কোনো অপরিচিত কিছু থেকে আসুক। (ডি.কে.চিং) ফলে সৌন্দর্য মূলত একটি নির্বাচিত বিষয়। কোনো একটি গড়ন বা রংকে একজন ব্যক্তি সুন্দর ব’লে নির্বাচন করলেও আর একজন নাও করতে পারে। সৌন্দর্য নির্বাচনের ধরণে সমাজের প্রচলিত ঐতিহ্যও নানা ভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

bond – গাথুনি
ইটের যে কোন ধরণের বিন্যাস । পাশাপাশি এবং উপর-নিচে ইট সাজাতে সাধারণত একটা প্রকরণ অনুসরণ করা হয়। তার ফলে দেয়াল বেশ খানিকটা শক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী একটা রূপ পায় এবং দেখতেও সুন্দর লাগে। ইটের এই বিন্যাসের বেশ কিছু ধরণ সহজেই আলাদা করা যায়। যেমন রানিং-বন্ড, ফ্লেমিস-বন্ড, ইংলিশ-বন্ড প্রভৃতি।

brick – ইট
সাধারণ ভাবে কাদামাটি দিয়ে তৈরী দেয়াল গাঁথার উপাদান। নরম কাদামাটিকে ছাচে ঢেলে একে একধরণের আয়াতাকার প্রিজমের রূপ দিয়ে তাকে রোদে শুকিয়ে অতঃপর আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়। পোড়ামাটির এই ইট কাদামাটির তুলনায় অনেক বেশি স্থায়ী। আবার পাথর কেটে তাকে আয়াতার প্রিজমের আকার দিয়েও ইট তৈরী করা যায়। সম্প্রতি সিমেন্ট ব্যবহার ক’রে এক ধরণের ইট তৈরী করা হচ্ছে। এই ইটের আকারও প্রচলিত পোড়ামাটির ইটের সমান, অর্থাৎ ৯.৭৫”X৪.৫”X২.৭৫5″ । পাথর কম পাওয়া যায় এমন স্থানে গ’ড়ে ওঠা প্রায় সব সভ্যতাতেই পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার হয়েছে। ইট পোড়ানোর ব্যাপারটা পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়। সিমেন্ট-ব্রিক বা সিমেন্ট ব্যবহার ক’রে তৈরী করা ইট অধিকতর পরিবেশ বান্ধব হিসেবে মনে করা হচ্ছে। (সিমেন্ট-ব্রিকের একটা যুতসই বাংলা শব্দ তৈরী করা দরকার)

বরেন্দ্রভূমি
সাধারণভাবে উত্তরবঙ্গের লাল-মাটির এলাকাসমূহ। এই এলাকা আবার স্থানীয় বিবেচনায় দুইভাগে ভাগ করা। পুনর্রভবা আর করোতোয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে স্থানীয় মানুষেরা খিয়ার ব’লে উল্লেখ করেন। বগুড়া আর গায়বান্ধার বেশ খানিকটা এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে মহানন্দা এবং আত্রাই নদীর মধ্যবর্তী লাল-মাটির এলাকা গৌড় নামে পরিচিত। মোটামুটি রাজশাহী, মালদহ আর মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু এলাকা নিয়ে এটা গঠিত। হিন্দু-পুরানে বরেন্দ্র-এলাকাকে ঈন্দ্রের বর বা আশির্বাদ-পাওয়া এলাকা ব’লে দাবি করা হয়। লাল মাটির একটা এলাকা যেখানে ফসল ফলে কম তা কিভাবে দেবতার আশির্বাদপুষ্ট হ’তে পারে তা মানতে পারতাম না। পরে জানতে পারলাম উত্তর-বঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যত রাজত্ব এবং তাদের রাজধানী গ’ড়ে উঠেছে তার প্রায় সবই এই লাল মাটির এলাকাতে তৈরী হয়েছে। সেটাই অর্থনৈতিক বিবেচনায় যুক্তিযুক্ত। চাষবাস হবে নদীর তীরবর্তী প্লাবন-ভূমিতে আর তুলনামূলক-স্থায়ী ভবন গ’ড়ে উঠবে কম-উৎপাদনক্ষম লাল মাটিতে। আর দেবতারা তো রাজাদেরকেই অশির্বাদ করবেন। সাধারণের সহায় তো নদী।

camber piece
a board used as centering for a flat arch slightly crowned to allow for settling of the arch. also called camber slip.

cartoon – কার্টুন
সাধারণত ফিয়াস্ক, মোজাইক আর ট্যাপেস্ট্রি গড়ার জন্য তৈরীকৃত পূর্ণ-স্কেলের কোনো ড্রয়িং/নকশা।

centering
a temporary framework for supporting a masonry arch or vault during construction until the work can support itself.

chrysanthemum – চন্দ্রমল্লিকা (র.ঠা.)

circle – বৃত্ত
circular – বৃত্তাকার

city – নগর; নগরী
যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসতি গ’ড়ে ওঠে। নগরের মানুষ সাধারণভাবে প্রাথমিক পণ্যের উৎপাদক নয়, তারা মূলত প্রাথমিক পণ্যের ভোক্তা আর সেসবের প্রক্রিয়াকরণ কাজে জড়িত। শহরও একই ধরণের উদ্দেশ্যে গ’ড়ে ওঠা মানব-বসতি। তবে শহর আর নগরের ভেতরে পার্থক্য ক’রতে গেলে প্রথমেই বলা হয় তুলনামূলক ভাবে শহরের আকার ছোট আর নগরের আকার বড়। এটা নির্ভর করে স্থানভেদে,অঞ্চলভেদে, দেশভেদে। নগর পরিকল্পনাবিদেরা শহর আর নগরকে আলাদা করার জন্য স্থায়ী-বসতির সাংখ্যার ব্যাপারটা টেনে আনেন। ধ’রে নেয়া হয় শহরে স্থায়ী-বসতির সংখ্যা তার মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ। আর নগরের বেশিরভাগ মানুষ নগরের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। এই সংঙ্গার একটা জটিলতা হ’লো, নতুন গ’ড়ে ওঠা নগরে হয়তো বহিরাগত মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে; কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে অনেক মানুষ নগরে স্থায়ী হ’তে শুরু করে। সেখানে নিজের জমি কিনে ঘর-বাড়ি বা মহল (এ্যাপার্টমেন্ট) তৈরী করে নেয়। তাতে নগরী যত পুরাতন হ’তে থাকে তত কি শহরের চরিত্র নিতে থাকবে? যদিও বাস্তবে সেটা হয় কমই। তুলনামূলক বিচারে নগরী শহরের তুলনায় দ্রুত বর্ধনশীলও। অফিস, আদালত, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা আর বিপনিবিতানের মতো অনেক সুবিধাও নগরে বেশি পরিমাণে গ’ড়ে ওঠে। ফলে সে সবসময়ই নতুন মানুষকে আকর্ষণ করতে থাকে। বড়-শহর বা নগরীতে তাই বহিরাগত আর অস্থায়ী মানুষের সংখ্যা বাস্তব কারণে বেশিই হয়।

city planning – নগর পরিকল্পনা
অনেকটা আরবান ডিজাইনের প্রতিশব্দ বলা যায়। তবে সিটি-প্ল্যানিং অনেক বেশি অর্থনৈতিক বিবেচনা ধারণ করে আরবান ডিজাইনের তুলনায়।

comfort – আরাম বা স্বস্তি
thermal comfort – তাপীয় আরাম

common brick – বাংলা ইট 
ভবন তৈরীতে বহুল-ব্যবহৃত দেশীয় একক-উপকরণ। প্রচলিত ইট-ভাটিতে, যেখানে আগুনের তাপ সবসময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না, পোড়ানো হয় ব’লে এই ইটের মাপ একটু কম-বেশি হয়ে থাকে।

conception – ধারণাগত নকশা
বাস্তবে নেই এমন কোনো কিছুর ধারণাগত নকশা বা চিত্র। (ডি.কে.চিং)

critical thinking – তুরীয় চিন্তা

crown – খিলানের সর্বোচ্চ বিন্দু
খিলান, ভল্ট বা এই ধরণের যে কোনো উত্তল কাঠামোর সর্বোচ্চ বিন্দু।

design – ডিজাইন ; নকশা-প্রণয়ন
বাংলাতে সাধারণভাবে অনেকেই নকশা-প্রণয়নকে বুঝিয়ে থাকেন। তবে নকশা-প্রণয়ন শব্দবন্ধটা ডিজাইনের সবটা আমেজ ধরতে পারে না সম্ভবত। সেজন্য প্রতিশব্দ হিসেবে ডিজাইন শব্দটাই ব্যবহার ক’রে থাকেন বেশিরভাগ মানুষ। আমার নিজেরও ডিজাইন ব্যবহারের প্রতি পক্ষপাত আছে যথাযত প্রতিশব্দের বিকল্প না থাকায়।

disclaimer –
১। দায়বর্জনবিবৃতি; ২। দায়-অস্বীকৃতি; ৩। লিখিত ডিসক্লেইমারকে দায়নাটীকা ৪। উচ্চারিত ডিসক্লেইমারকে দায়নাবাণী
প্রস্তাবনাগুলো মন-মাঝি এবং হিমুর।

doctor – চিকিৎসক ; বদ্য/বদ্যি
রোগ-শোকের উপসম করে যারা তাদেরকে বদ্য/বদ্যি বলাটা বেশ পুরানো। চিকিৎসক শব্দটা ভালো হ’লেও এটাকে অন্য কিছুর সাথে জুড়ে দিয়ে ব্যবহার করা কঠিন। যেন কার্ডিওলজিস্ট কে হৃদরোগের চিকিৎসক হিসেবে চিনে নেওয়া যায়। কিন্তু একটা শব্দে সেটা বোঝানো কঠিন। বদ্য/বদ্যি শব্দটা ছোট হওয়ায় এটা হৃদরোগবদ্যি ধরণের শব্দ তৈরীর জন্য বেশি সহায়ক সম্ভবত। একই ভাবে অর্থপেডিস্ট থেকে অস্থিরোগবদ্যি শব্দ তৈরী ক’রে নেওয়া যায়। নিউরোলজিস্ট – স্নায়ুরোগবদ্যি। এ্যানাটমিস্ট – শরীরবদ্যি। ডেন্টিস্ট – দন্তবদ্যি। এখন হৃদরোগবদ্যি শব্দটাকে আরো ছোট ক’রে দন্তবদ্যির মতো হৃদবদ্যি বলা যায় কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে।

door – দরজা ; দুয়ার ;

door frame – দোর- কবাট / কপাট
যে কোনো ধরণের পাল্লাকে কপাট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জানালা কিমবা দরজার। দরজার পাল্লার ক্ষেত্রে দোরকপাট শুনতে খারাপ লাগছে না। তবে জানালার পাল্লা বা উইন্ডো-ফ্রেমের জন্য জানলা-কপাট ঠিক শ্রুতিমধুর হয় না।

draft – ড্রাফ্ট ; খসড়া নকশা
কোনো ডিজাইন বা পরিলেখের প্রাথমিক খসড়া ড্রয়িং বা নকশা, যা সাধারণত মতামত নেওয়ার বা মূল্যায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে আঁকা হয়।

drawing – নকশা

elevation – উন্নতি
north elevation – উত্তর দিকের উন্নতি

engineer – প্রকৌশলী

engineering – প্রকৌশল

environmental design – পরিবেশ-পরিকল্পনা / পরিবেশিক ডিজাইন
স্থাপত্য, প্রকৌশল, নির্মাণ, ভূমিতলের(ল্যান্ডস্কেপ) স্থাপত্য, আরবান ডিজাইন আর নগর পরিকল্পনার সমন্বয়ে /মাধ্যমে দৃশ্যমান পরিবেশের সমন্বয় প্রক্রিয়া। (ডি.কে.চিং)

indoor – অভ্যন্তর; ভিতর; অন্দরি (হিমু)
[সচলায়তনের একটা লেখাতে (নগরী ঢাকা ৩) ইনডোর-গেইমসকে কি বলা যায় তাই নিয়ে কথা হচ্ছিলো। সেখানে হিমু প্রস্তাব করেছেন ইনডোরকে অন্দরি আর আউটডোরকে বাহিরি বলা যায় কিনা। অন্দরি-খেলা, বাহিরি-খেলা। অন্দরি-পরিসর বা শুধুই অন্দরি ও বলা যায়। শব্দগুলো শুনতেও ভালো মনে হয়েছে। আবার নানা ধরণের শব্দের আগেও যোগ ক’রে বলা যায়।]

function – কর্মসূচি

interior design – অভ্যন্তর-ডিজাইন; অন্তঃপরিসরের ডিজাইন
interior space – অন্তঃপুর; অন্তঃপরিসর; অভ্যন্তর

expressionism – অভিব্যক্তিবাদ

extrados –
খিলানের বাইরের দিকের বাঁকা উপরিতল।

facing brick – ফেসিং ইট 
সুনির্বাচিত কাদামাটি থেকে সুনির্দিষ্ট মাপে তৈরী ইট যা সাধারণত দেয়ালের বাইরের দিকে লাগানো হয় (তবে সৌন্দর্যের জন্য দেয়ালের ভেতরেও লাগানো যেতে পারে)। এই ধরণের ইটে পছন্দ মতো রং বা টেক্সচার দেয়া যায়। তুলনামূলকভাবে এই ইটের পানি শোষন-ক্ষমতা কম থাকে।

firmness – দৃঢ়তা

floorমেঝে

geometry – জ্যামিতি

garage – বাহন-বিরাম (আবু এইচ ইমামু্দ্দিন)

habitat – বাস্তু

Harbour master (মার্কিনিরা অবশ্য harbor লেখে)
বন্দরপাল। (হিমুকে প্রথম ব্যবহার করতে দেখেছি)

haunch
খিলানের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে impost পর্যন্ত উভয় দিকে বক্রাকারে নেমে যাওয়া অংশ।

highlighter, marker – রাঙুনি
ব্লাগার হিমুর লেখাতে পেয়েছি প্রথম। রাঙুনি শুনতে ভালো লেগেছে। যুতসইও। তবে হাইলাইট করাকে ঠিক রাঙানো হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কিনা নিশ্চিত নই।

hyperbolaঅধিবৃত্ত
hyperbola-3

iconic – ভাস্কর্যসম

impost –
কোনো স্থাপনার যে সর্বোচ্চ স্তর থেকে খিলানের নির্মাণ শুরু হয়।

impressionism – প্রকাশবাদ

industryকারখানা
ইন্ডাস্ট্রিকে শিল্প না ব’লে কারখানা বলার পক্ষে আমি। শিল্প শব্দটা শুধু আর্টের জন্য থাকলেই ভালো। কটেজ-ইন্ডাস্ট্রিকে কারু-শিল্প হয়তো বলা যায়। হেভি ইন্ডাস্ট্রি – ভারী কারখানা।

interlock  – আন্তঃসংযোগ
স্থাপত্যে বিভিন্ন ধরণের mass বিভিন্নভাবে সংযুক্ত হতে পারে। আন্তঃসংযোগ বা ইন্টারলক একটা বহুল-ব্যবহৃত মাধ্যম। (আন্তঃসংযোগ একটা প্রস্তাবনা। আমার মনে হয় আরো ভাল বাংলা করা যাবে এই শব্দটার)

intrados –
খিলানের ভেতরের দিকের বাঁকা তল।

jellyfishছাতাঝুরি
অনেকে শাপলাপাতা মাছ বলে। হিমু ছাতাঝুরি বা কাঁপনছাতি করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমার ছাতাঝুরি নামটা ভালো লেগেছে।

keystoneপাথরচাবি ; খিলানের মধ্যম ইট/পাথর
খিলান বা আর্চের সর্বোচ্চ বিন্দুতে যে ইট বা পাথরের এককটি বসানো হয়। (আরো ভাল বাংলা খুঁজতে হবে)

kiln – ইটভাটি
যার ভেতরে রোদে শুকানো ইট বিশেষ বিন্যাসে সাজিয়ে আগুনে পোড়ানো হয় যার ফলে ইটে বাড়তি স্থায়িত্ব আসে।

lag
a crosspiece connecting the ribs in a centering. Also called bolster.

landscape architecture – ভূমিতলের স্থাপত্য

lensদৃক
ওয়াইড অ্যাঙ্গল লেন্স – আয়তদৃক; জুমলেন্স – দূরদৃক; ফিশাই লেন্স – মীনদৃক, ম্যাক্রোলেন্স – অণুদৃক (এগুলো হিমুর প্রস্তাবনা); বাইনোকুলার – দ্বিদৃক

leverচাড়ুনি
একটি সরল যন্ত্র। চাড় দিয়ে কোনো ভারি বস্তু তুলতে বা সরাতে ব্যবহৃত হয়।

lime – লাইম
চুন, শামুক ঝিনুকের খোল বা চুনাপাথর (লাইম-স্টোন) কে উচ্চতাপে গলিয়ে এবং পরবর্তীতে তাকে শুকিয়ে তৈরী করা শক্ত উপাদান যা শাদা বা খানিকটা ধূসর রঙের হয়। লাইমে কোনো গন্ধ থাকে না। ক্যালসিয়াম অক্সাইড, কস্টিক-লাইম বা কুইক-লাইম নামেও পরিচিত এটা।

line – রেখা ; লাইন
straight line – সরলরেখা , curve line – বক্ররেখা। (রেখা শব্দটা স্থপতিদের কাছে জনপ্রিয় হবে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এরা সবাই লাইন বলতেই অভ্যস্ত বেশি। জয়নুল আবেদিনের একটা সাক্ষাৎকারে দেখেছি তিনিও লাইন শব্দটা ব্যবহার করছেন। এত দিনের ব্যবহারে লাইন শব্দটাকে বিদেশী শব্দ হিসেবে বাংলাতে অন্তর্ভুক্ত ক’রে নেওয়া যায়। তবে সমস্যা হ’লো straight line কে সরল-লাইন বা curve line কে বক্রলাইন বলাটা ঠিক শ্রুতিমধুর হয় না।)
dotted line, broken – ভাঙাভাঙা রেখা

mannerism – ধরণবাদ

masonry arch – ইটের খিলান

modernism – আধুনিকতাবাদ
স্থাপত্যের আধুনিকতার শুরু ধরা হয় লি কর্বুজিয়েরের ‘লা রচি জেনিরেট’ বিল্ডিঙের নির্মাণ থেকে। এর কিছু পরে ‘ভার্সিউন আর্কিটেকচার’ শিরোনামে ফরাসি ভাষায় যে বইটা লিখেছিলেন সেটাতে আধুনিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য আর আকাঙ্ক্ষাকে বর্ণনা করেছিলেন। মোটামুটি ১৯২৫ এর পর থেকেই আধুনিক স্থাপত্যের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা পৃথিবীতে। আধুনিক স্থাপত্যের প্রতিষ্ঠা আর প্রসারে ওয়ালটার গ্রোপিয়াসের গ’ড়ে তোলা ‘বাউহাস’ স্কুলের অবদান  প্রচুর। Edmund Husserl আধুনিকতাকে ‘পৃথিবীর য়ুরোপিয়োকরণ’ (europianization of the planet) ব’লে বর্ণনা করেছেন।

mortar – মসলা; মর্টার
লাইম অথবা সিমেন্টের সাথে বালি আর পানির মিশ্রণে তৈরী থকথকে (প্লাস্টিক) উপাদান যা গাথুনি করা দেয়ালের ইটগুলোকে সংযুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের রাজমিস্ত্রী বা নির্মাণকর্মীরা সাধারণত একে মসলা ব’লে থাকে। মেঝেতে টালি লাগানোর জন্যও এটা ব্যবহার করা হয়।
সিমেন্টের মসলা : পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, বালি আর পানি মিশিয়ে তৈরী মসলা।
সিমেন্ট-লাইম মসলা : সিমেন্টের মসলার সাথে লাইম যুক্ত ক’রে তৈরী মসলা। লাইম যোগ করার কারণে মসলার থকথকে বৈশিষ্ট্য বা প্লাস্টিসিটি বেড়ে যায়, সেই সাথে পানি-রোধী ক্ষমতাও বাড়ে।
ইপোক্সি মসলা – epoxy mortar : যে মর্টার বা মসলা ইপোক্সি রেইজিন যুক্ত ক’রে তৈরী করা হয়। ইপোক্সি রেইজিন এক ধরণের ক্যাটালিস্ট বা প্রভাবক এবং খুব ভালো মানের আঠা বা সামগ্রিক (aggregate)।

narrative
a spoken or written account of connected event; a story;
ধারাবিবরণী; আখ্যান। city narrative – শহরের আখ্যান; শহরের ধারাবিবরণী। urban narrative – শহরে আখ্যান; নাগরিক আখ্যান।

nuanceপ্রকাশসূক্ষ্মতা
(a subtle difference in or shade of meaning, expression, or sound.)

order  – ক্রমবিন্যাস

outdoor space – বহি-পরিসর; বাহিরি পরিসর
outdoor games – বাহিরি ক্রিড়া; বাহিরি খেলা

parabolaঅধিবৃত্ত
Parabola-2

parking – বাহনবিরাম ; পার্কিং
বাহনবিরাম প্রতিশব্দটার ব্যবহার প্রথম দেখেছি আবু এইচ ইমামুদ্দিনের একটা ড্রয়িং বা নকশাতে। যদিও পার্কিং শব্দটার ব্যবহার বাংলাতে বেশ প্রচলিত, তবুও বাহনবিরাম একটা ভাল বিকল্প হ’তে পারে।

perspective – পরিপ্রেক্ষিত ; পার্সপেকটিভ

plan – পরিলেখ ;
master plan – সামগ্রিক পরিলেখ ; site plan – সাইট ব’লতে সাধারণত বোঝানো যে নির্দিষ্ট জায়গাটাতে কোনো প্রকল্প নির্মাণ করা হবে। স্থল, স্থান বা জায়গা শব্দগুলো দিয়ে সাইট শব্দটিকে যথাযত ভাবে প্রকাশ করা যায় না। সাইট প্লান বলতে প্রকল্প-স্থানের পরিলেখ বোঝানো হয়। আরো কার্যকর শব্দ-বন্ধ দরকার এটার জন্য।
floor plan – মেঝের পরিলেখ ;
roof plan – ছাদের পরিলেখ ;
site plan – সাইট বা জায়গার পরিলেখ ;

plain –  তল; সমতল

plaster – পলস্তরা; আস্তর; প্লাস্টার
জিপসাম অথবা লাইম অথবা সিমেন্ট, পানি আর বালির মিশ্রণে তৈরী শক্ত জমাট পদার্থ যা উপাদানগুলোর মিশ্রণের সময় থকথকে (প্লাস্টিক) অবস্থায় থাকে। কখনো কখনো মিশ্রণের সাথে চুল বা অন্য কোনো আঁশ জাতীয় পদার্থ যোগ করা হয়। উপাদানগুলো নির্দিষ্ট পারিমাণে মিশিয়ে থকথকে অবস্থায় এনে তা দেয়াল বা সিলিঙে (ছাদের নিচের দিক) লাগানো হয়, পরবর্তীতে যা শুকিয়ে গেলে শক্ত আকার ধারণ করে।

plazaচওক
অভিধান মতে চওক হ’লেও এই শব্দটার ব্যবহার চোখে পড়েনি কখনো। সাধারণত শহরের খোলা/উন্মুক্ত কোনো সার্বজনীন পরিসরকে বোঝায়।  ব্লগার ষষ্ঠ পান্ডব বলছেন পুরনো বাংলা লেখাতে প্লাজা অর্থে ‘চবুতরা‘ শব্দের ব্যবহার ছিলো।

police – কোটাল; কোতোয়াল; ঠোলা
মুগল আমলে প্রধান দূর্গ-রক্ষককে কোতোয়াল বলা হ’তো। (কোর্ট – দূর্গ , পাল – রক্ষক ; কোর্টপাল থেকে কোতোয়াল) নগর রক্ষক বা প্রহরীকে কোটাল বলা হ’তো বেশ আগে থেকেই। ঠোলা শব্দটা তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন।

public space – সার্বজনীন পরিসর
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রেল-স্টেশন একটি সার্বজনীন ভবন। এই ভবনের যেসব স্থানে সবার যাতায়াতের সুযোগ আছে যেমন লবি-এলাকা বা টিকেট-কাউন্টার তা একটি সার্বজনীন পরিসর। অথচ স্টেশন-মাস্টারের কমরা সার্বজনীন পরিসর নয়।

public place – সার্বজনীন স্থান
যে স্থান সবার জন্য উন্মুক্ত। যেমন শহরের রাস্তা, বাজার, অফিস-আদালত, বিদ্যালয়, বিভিন্ন ধরণের বন্দর আর টার্মিনাল ইত্যাদি।

rendering – রেন্ডারিং
উপস্থাপনের জন্য তৈরীকৃত বিশেষ ধরণের ড্রয়িং, সাধারণত কোনো ভবন বা অন্তঃপরিসরের পরিপ্রেক্ষিত (perspective) দৃশ্য। এই ধরণের ড্রয়িঙে শৈল্পিকভাবে দেয়াল বা অন্য উপকরণগুলোর ম্যাটেরিয়াল, তার গায়ে পড়া আলো বা তার ছায়াও আঁকা থাকে। ইদানিং রেন্ডারিং শব্দটা কম্পিউটার ব্যবহার ক’রে তৈরীকৃত প্রায়-বাস্তবসম্মত ছবির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরণের তৃ-মাত্রিক সফ্টওয়্যারে প্রথমে কোনো বস্তু বা ভবনের মডেল তৈরী ক’রে পরে তাকে রেন্ডার ক’রে উপস্থাপন-উপযোগী ছবি তৈরী করা হয়।

roof – ছাদ

science – বিজ্ঞান

scale – স্কেল ; নকশার অনুপাত; অনুপাত
সাধারণ অর্থে বাংলাভাষায় স্কেল ব’লতে পরিমাপ বা পাল্লা বোঝায়। তবে স্থাপত্যে scale ব’লতে নকশার অনুপাতকে বোঝানো হয়। নকশাতে ১:১০০ স্কেল লেখা থাকলে বুঝতে হবে নকশাটিতে উল্লেখিত প্রস্তাবিত/বাস্তবিক বস্তুটি ১০০ ফিট লম্বা হ’লে নকশাতে তার আকার ১ ফিট।
ড্রয়িঙে অনেক সময় রৈখিক-স্কেল (graphic scale)ও ব্যবহার করা হয়। যেটা এক ধরণের বার-ড্রয়িং যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বের ব্যাপারটা ড্রয়িঙের মাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।

sculpture – ভাস্কর্য
sculptural – ভাস্কর্যবৎ ; ভাস্কর্যসম ; ভাস্কর্য-সম্পর্কিত

section – ছেদচিত্র , ছেদ
ORTHO_PLAN
cross section : ৯০ ডিগ্রী কোণে কোনো বস্তুর দ্বি-খন্ডিত বা ছেদকৃত অংশের ড্রয়িং বা নকশা।
longitudinal section : কোনো বস্তুর যে দিকটা সবচেয়ে লম্বা সেই বরাবর ছেদকৃত অংশের ড্রয়িং বা নকশা।

shade – শেড ; অবহেলিত ছায়া
কোনো বস্তুর যে দিকটাতে আলো না পড়ার কারণে যে ছায়া পড়ে।

shadow – ছায়া
কোনো একটি অস্বচ্ছ বস্তুতে আলো পড়ার পর তার বিপরীত কোনো তলে যে স্পষ্ট অবয়বের ছায়া পড়ে।

shareভাগ

sketch – খসড়া অঙ্কন ; স্কেচ
ডিটেইল বা খুঁটিনাটি ছাড়া কোনো বস্তু, বিষয় বা ধারণাকে বোঝানোর জন্য দ্রুত আর সহজে যা আঁকা হয়। প্রাথমিক ধারণা বা সমীক্ষা (স্টাডি) তৈরীতে ব্যবহৃত নকশা বা অঙ্কন।

skew arch
an archway having sides or jambs not at right angles with the face of its abutments.
লুই কান তার অনেকগুলো প্রজেক্টে এই ধরণের আর্চ বা খিলান ব্যবহার করেছেন। নিচের ছবিটি সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের। নিচের তলার খিলানটি স্কিউ-খিলানের একটি ভালো উদাহরণ।
8ea2455ea00556c7a1f8432f0a87f45d

স্কিউ আর্চ- সোহরাওয়ার্দি হাসপাতাল, ঢাকা- লুই কান ডিজাইনকৃত

Snapshot –
হঠাৎচিত্র (হিমু) ; ক্ষণচিত্র (স্পর্শ)
ইদানিংকালের বহুল ব্যবহৃত শব্দ। দুটোই হ’তে পারে। তবে যে কোনো একটা জনপ্রিয় হ’লে সাধারণ বিবেচনায় ভালো হবে। দেখা যাক এই দুটো থেকেই একটা জনপ্রিয় হয় না আরো নতুন কিছু আসে।

spaceপরিসর; জায়গা
interior space – অন্তঃপরিসর; outdoor space – বহি-পরিসর ; semi-outdoor space – আধা-অন্তঃপরিসর; আঙ্গণিক পরিসর (হিমু) intermediate space – অন্তরাল। অন্তরালের আদলে অন্দরাল, বাহিরাল এবং অঙ্গণাল এর প্রস্তাবও করেছেন হিমু।

space planning – পরিসর পরিকল্পনা

spring
ভিত্তির যে বিন্দু থেকে খিলান, ভল্ট বা গম্বুজের শুরু।

spandrel /spandril
the triangular-shaped, sometimes ornamented area between the extrados of two adjoining arches or between the left or right extrados of an arch and the rectangular framework surrounding it.

springer
খিলানের নিচের দিকের প্রথম voussoir /the first voussoir resting on the impost of an arch.

Stem cell – নিধিকোষ

study – সমীক্ষা
শিক্ষামূলক অনুশীলের জন্য তৈরীকৃত নকশা বা ড্রয়িং। কোনো জায়গা বা সাইট দেখার পর তার বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ ক’রে নথিভুক্ত করার (ডক্যুমেন্টেশন) উদ্দেশ্যে তৈরীকৃত ড্রয়িং।

sustainable – টেকসই; ভবিষ্যসহ; চলনসই
(বাংলাতে সাস্টেইনেবলের প্রতিশব্দ হিসেবে টেকসই একরকম প্রতিষ্ঠিত হ’য়েই গিয়েছে। তবে এটা ডিউরেবলের প্রতিশব্দ। বিলেতি-শব্দ সাস্টেইনেবল শুধুমাত্র টিকে থাকার ভাবনা ধারণ করে না। হিমু প্রস্তাব করেছেন ভবিষ্যসহ শব্দটা। আমি প্রস্তাব করলাম চলনসই। দুটো শব্দই অর্থানুযায়ী ব্যবহার করা যায় ব’লে মনে করছি। সাস্টেইনেবল পরিকল্পনা চলনসই আর ভবিষ্যসহ দুইই হওয়া প্রয়োজন।)

taste – রুচি
কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা সমাজের দৃষ্টিতে যথাযত বা সুন্দর কিছু নির্বাচনের সূক্ষ্ন বেবেচনা, বিচক্ষণতা বা মূল্যবোধ। (ডি.কে.চিং)

technics – কলাকৌশল
যে কোন কিছুর প্রয়োগ কৌশল।

tectonics – টেকটোনিক্স
নির্মাণ কাজে আকার তৈরী, অলংকরণ করা এবং উপকরণ সংগ্রহের পদ্ধতি। (ডি.কে.চিং)

technology – প্রযুক্তি
ব্যবহারিক বিজ্ঞান : জ্ঞানের যে শাখা প্রকৌশল পদ্ধতি আর উপাদানের নির্মাণ এবং ব্যবহারের নির্দেশ ক’রে তার সাথে জীবন-ব্যবস্থা, সমাজ এবং পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে।

town – শহর;
জন-মানুষের বসতির একটা ধরণকে শহর বলা হয়। মনে করা হয় শহরের আকার গ্রামের থেকে বড় আর নগরের থেকে ছোট। তবে গ্রাম থেকে শহরের একটা বিশেষ পার্থক্য হ’লো শহর সাধারণত প্রাথমিক পণ্য যেমন ধান-চাল, সবজি, তুলা এইসব উৎপাদন করে না। শহর অর্থে এমন একটা বসতিকে বোঝানো হয় যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশ বড় সংখ্যক মানুষ গ্রামে উৎপাদিত প্রাথমিক পণ্যকে মূলত ভোগ (কনজিউম) করে, সে সরাসরিও হ’তে পারে আবার প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমেও হ’তে পারে।

urban design – নগর পরিকল্পনা / আরবান ডিজাইন
স্থাপত্য এবং নগর পরিকল্পনার যে বিষয়গুলো নগরের অবকাঠামো ও পরিসর নিয়ে কাজ করে। (ডি.কে.চিং)

vault –
এক বা একাধিক খিলানকে বর্ধিত করে নির্মিত ছাদ বিশেষ। (এখনো পর্যন্ত ভল্টের কোনো বাংলা পরিভাষা পাইনি)
Impression

voussoir
any of the wedge-shaped units in a masonry arch or volt, having side cuts converging at one of the arch centers.

wall – দেয়াল
load bearing wall – যে দেয়াল ইমারতের কাঠামো গঠন করে।
masonry wall – ইটের তৈরী দেয়াল। এই ধরণের দেয়াল কিছু সীমা পর্যন্ত লোড-বেয়ারিং এবং পার্টশন দুই ধরণেরই হ’তে পারে।
partition wall – একাধিক কোনো পরিসরকে আলাদা করার জন্য যে দেয়াল তৈরী করা হয়। ইদানিং কালে চাহিদা অনুযায়ী প্রায় সব ধরণের নির্মাণ উপকরণ দিয়েই এই ধরণের দেয়াল তৈরী করা যায়।
shear wall – কনক্রিটের যে দেয়াল বিল্ডিঙের লোড বা ওজন ধারণ করে। এটা অনেকটা কলামের মতই কাজ করে ইমারতে। যখন কোনো কলামের লম্বা দিক তার চওড়া দিকের অনুপাতে বেশ বেশি হ’য়ে যায় তখন তাকে শেয়াল-ওয়াল বলা হয়। এই ধরণের দেয়াল বাতাস কিংবা ভূমিকম্পের মতো আনুভূমিক লোডকে প্রতিরোধ করতে বেশ সহায়ক হয়।

water – পানি ; জল
raw water – প্রকৃতিতে পাওয়া যে পানি খাওয়ার উপযোগী করতে শোধনের প্রয়োজন পড়ে।
water treatment – পানিকে খাওয়া বা অন্য কোনো কারখানার কাজে ব্যবহার-উপযোগী করার জন্য শোধনপ্রক্রিয়া।
potable water – মানুষের খাবার উপযোগী পানি ; খাবার পানি। নির্মাণ কাজে সাধারণত  এই পানিই ব্যবহার করা হয়।
water tower : উঁচু জলাধার – মাটি থেকে উঁচুতে স্থাপিত জলাধার যেখানে যান্ত্রিকভাবে পাম্প ক’রে পানি ধারণ করা হয় প্রয়োজনীয় চাপ তৈরীর উদ্দেশ্যে যার ফলে প্রয়োজন অনুসারে সেই পানিকে নিচের স্তরে সুবিধাজনক ভাবে প্রবাহিত করা যায়।
aquifer : ভূ-গর্ভস্থ জলাধার – মাটির নিচের যে বিশেষ স্তরে পানি জমতে পারে।
reservoir : জলাধার – যে কোনো প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম আধার যেখানে পানি জমতে পারে।

window – জানালা

workshop
কর্মশালা; কারুঘর (হিমুর লেখাতে প্রথম দেখেছি);

সর্বশেষ হালনাগাদকরণ : ২৮.০৮.২০২০

আমি ভালোবাসি ‘আরম্ভ’কে

আমি ভালোবাসি ‘আরম্ভ’কে। আমি অবাক হ’য়ে যাই কোনো কিছুর শুরু দেখে। ভাবি, শুরুই এগিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। এ ছাড়া কিছুই হতো না, হতে পারত না। আমি শেখাকে শ্রদ্ধা করি। কারণ এটাই প্রকৃত প্রেরণা। এটা শুধুই দায়িত্ব পালন নয়। এ আমাদের অন্তর্গত। শেখার ইচ্ছা বা বাসনাই অন্যতম সেরা অনুপ্রেরণা-দানকারী। শিক্ষা ব্যবস্থা আমাকে তেমন একটা অনুপ্রাণীত করে না। যতটা করে শিক্ষা। শিক্ষা-ব্যবস্থা সবসময়ই কোনো না কোনো ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়ে যায়। শিক্ষার প্রকৃত সত্তা কোনো ব্যবস্থাই ধারণ করতে পারে না।

আরম্ভ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার মাথায় পুরোনো একটা ভাবনা এসেছে। ঠিক উপলব্ধি নয়, নানা-কিছুর প্রভাবে বস্তু আমার কাছে অবসন্ন আলো হিসেবে ধরা দেয়। যে আলোর নির্গমন আমার ভাল লেগেছিল তাকে আমার দুই ভাই ব’লে মনে হয়। যদিও আমি জানি, দুই ভাই ব’লে আদতে কিছু নেই। এমনকি এক ভাইও। কিন্তু আমি একজনকে হয়ে উঠতে/প্রকাশিত হতে (to be/to express) এবং একজনকে (আমি বলছি না অন্যজনকে) গঠিত হতে দেখেছি (to be/to be)। শেষের জন অনালোকিত আর প্রথমজন আলোকিত। এই আলোকিত প্রথমজনকে উন্মত্ব আগুন হিসেবে ভাবা যেতে পারে, যা কিনা বস্তুর ভেতরে থেকে তাতেই নিজেকে ক্ষয় করে। আমার মতে বস্তু হলো অবসন্ন আলো। পর্বতমালা, পৃথিবী, ঝর্ণারা, বাতাস এবং আমরা সবাই অবসন্ন আলো। এটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। বেঁচে থাকার বাস্তব চালিকাশক্তি হলো এই হয়ে ওঠা/প্রকাশিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমার মনে হয় না আর কিছু আছে।

নিরবতাকে প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমি একটা ডায়াগ্রাম আঁকা শুরু করি। আর আলোর জন্য আর একটা। আলোর দিকে নিরবতার যাত্রাপথে কিমবা নিরবতার দিকে আলোর যাত্রাপথের মাঝে দাড়িয়ে আছে অসংখ্য দরজা। প্রতিটি দরজাই এক একটি একক। আমাদের সবারই এমন একটা দরজা আছে যেখানে আলো আর নিরবতার পরষ্পর পরিচয় হয়। আর এই দুয়ারের যেখানে এই পরিচিতি পর্ব অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেটাই অনুপ্রেরণার স্থল। অনুপ্রেরণা হলো সেই জায়গা যেখানে হয়ে ওঠা/প্রকাশিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবিক হয়ে ওঠে। এটাই সত্তার নির্মাতা। এখানেই শিল্পের বাস, expressive urge  এর কেন্দ্রবিন্দু এবং প্রকাশিত হওয়ার উপায়।

আমার প্রথম করা ডায়াগ্রামটা বা-দিক থেকে ডান-দিকে পড়তে হতো। আমি আপনাদেরকে যেটা দেখাচ্ছি সেটা তার একটা প্রতিবিম্ব, যেন আপনারা এটাকে পুরোপুরি বুঝতে না পারেন। এর ‌আসল উৎস থেকে আরো দারুন কিছু বের করে আনার ইচ্ছা থেকে আমি এমনটা করছি। এর ভেতরে আপনারা আরো সূক্ষ্ন কিছু খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন। আমি কিন্তু আবারো একটা উৎসের খোঁজ করছি, কোনো একটা শুরু’র খোঁজ করছি। আমি স্বভাবগত ভাবেই শুরু’কে আবিস্কার করতে চাই। আমি বিলেতের ইতিহাস পছন্দ করি। আমার সংগ্রহে এর অনেকগুলো খণ্ড (ভলিউম) আছে। কিন্তু আমি কখনো প্রথম খণ্ডের বেশি পড়িনি। তারও প্রথম তিন বা চার অধ্যায়ের বেশি আগাতে পারিনি। আমার উদ্দেশ্য আসলে শূণ্যতম খন্ড (ভলিউম জিরো) কে পড়ে ফেলা। কিন্তু সেটা কখনো লেখা হয়নি। বিদঘুটে মনই শুধু এমন কিছু খুঁজে ফেরে। আমি বলতে চাই, এমন কিছুই মানসিকতা তৈরীর ইঙ্গিত দেয়। আমাদের প্রথম সৌন্দর্যের অনুভূতি (পরম সুন্দর বা খুব সুন্দর নয়) শুধুই সুন্দর। এ মুহূর্ত বা আলোক-প্রভাকে যা-ই বলি না কেন, তা কিন্তু দারুন ছন্দবদ্ধ । এই সৌন্দর্যের আলোক-প্রভার পাদদেশ থেকেই বিস্ময়ের আবির্ভাব। বিস্ময়ের অনুভূতি আমাদেরকে জ্ঞানের দিকে ধাবিত করে বলেই তা এতটা গুরুত্বপূর্ণ। নভচারীরা মহাশূণ্যে গিয়ে পৃথিবীকে যখন একটা নীলাভ গোলাপী মার্বেলের মতো দেখল, আমার বোধ হ’লো কোনো কিছুই জানার (knowing) থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জ্ঞান সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই জানার প্রক্রিয়াটা  ছিলো না। Yet strangely enough Paris or Rome – the wonderful works of men, all of which came from circumstantial conditions – somehow diminish the importance of the mind as compared to the sense of wonder that seems to have prevailed at that time. I do think, however, that a toccata and fugue remained, because of the distance from measure that was kept. অপরিমেয় যতটা আচ্ছন্ন ক’রে রাখে মনকে, পরিমেয় তার সামান্য পরিমাণও না।

(অসমাপ্ত)… কানের লেখার অনুবাদ প্রচেষ্টা…

 

ভূমিকা : রিচার্ড মেয়ার

স্থাপত্য এক ধরণের সামাজিক শিল্প। জীবন যাপনের বিভিন্ন গুণাগুন যার বিবেচনার বিষয়। আমাদের কাজের ধরণের মাধ্যমেই যা আকার পায়। প্রয়োজন আর সামঞ্জস্য বিধানকে (accommodation) ছাপিয়ে ওঠার স্বাভাবিক দক্ষতা তৈরীর মাধ্যমে স্থপতিরা দারুন কিছু করতে পারেন, পরিসর এবং ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে; যা কিনা আমাদের মানবিক বিবেচনাকে কাব্যিকভাবে প্রকাশ ক’রে শৈলীর (স্টাইল) বাহ্যিক গুণাগুণকে ছাড়িয়ে যায়।

ইতিহাসের অনুগামী হয়েও কিমবা দৃষ্টিভঙ্গি আর উদ্ভাবনের মধ্যকার চির-পরিবর্তনশীল সম্পর্ককে বিবেচনাতে নিয়েও, স্থাপত্য শেষ পর্যন্ত একই সাথে সুযোগ (opportunity) এবং দায়িত্ব (responsibility)- দুইই। আমাদের নগরে অভিনব এবং অর্থপূর্ণ (meaningful) স্থান তৈরী করতে হ’লে, আমাদের শুধুমাত্র সাধারণ সামাজিক আর আধ্যাত্মিক প্রেরণা থাকলেই চলবে না, যে ঐতিহ্যের হাত ধ’রে আমাদের সমাজের এগিয়ে চলা, তার প্রতি অনুরাগও থাকতে হবে। আমাদের শহরগুলো প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের সকলেই পরিবর্তনশীল শহুরে প্রকরণের (আরবান প্যাটার্ন) অংশ। আর এই শহুরে প্রকরণ আমাদের কাজ-কারবার, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং ভ্রমণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। সে কারণেই স্থাপত্য এবং আরবান-ডিজাইনকে আমাদের যুগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সাথে মিলিয়ে নেওয়াটা এত প্রয়োজনীয়। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বঞ্চনার সমস্যার সাথে। অপর্যাপ্ত আবাসনব্যবস্থার সাথে। সার্বিক বিবেচনায় কমতে থাকা স্বাধীনতার সাথে। অতীতে শহর গ’ড়ে তোলা এতটা ঝঞ্ঝাটময় ছিল না কখনো। অথচ এখনকার রাজনৈতিক পরিমন্ডল এই ব্যাপারে একেবারেই সচেতন নয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, সবখানেই জনমানুষের মধ্যে এই ব্যাপারে অজ্ঞতা র’য়ে গেছে।

স্থপতি হিসেবে, শহরের অবহেলিত এবং নোংরা অঞ্চলগুলো নিয়ে কাজের চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব। এই অঞ্চলগুলোতে কাজ করার কোনো একটা উপায় আমাদের বের করতেই হবে। অঞ্চলগুলোকে আরো কর্ম-চঞ্চল এবং উন্নত করতে; এবং আরবান ফেব্রিকের ভেতরে আরো গতিশীলতা আনার জন্যে। আমার মনে হয়, আমরা বিভিন্ন ভাবেই এটা করতে পারি। সব পরিস্থিতিই আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে- সে আমরা প্যারিস, লস এঞ্জেলস বা নিউইয়র্ক, যেখানেই ভবন বানাই না কেন। লুই কান বলতেন, শহর হবে এমন যায়গা “যার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোনো একটা বাচ্চা কল্পনা ক’রে নিতে পারবে, ভবিষ্যতে সে কী হ’তে চায়”। আমার তো মনে হয়, এমন শহর গ’ড়ে তোলার কথাই আমাদের ভাবা উচিত। এমন একটা শহরের কথা ভাবুন তো- যেখানকার স্কুল, গ্রন্থাগার, হাসপাতাল, কর্মস্থল এবং বিনোদন আর সাংস্কৃতিক সুবিধাগুলোর সবকয়টি মানুষের জীবনবোধের সর্বোচ্চ অনুভূতি জাগাতে সক্ষম। কিন্তু তেমনটা হ’তে হ’লে, আমাদেরকে অবশ্যই- কানের ভাষ্য মতো সুযোগসুবিধাগুলো (availabilities) কে নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুরুতেই গ’ড়ে তুলতে হবে। শহর তো মিলিত হওয়ার জায়গা। মিলিত হওয়ার সুযোগ তৈরী করার জন্যই তার গুরুত্ব। to the degree that institutions remove themselves from the public, to the degree that they keep people at arm’s length and make themselves inaccessible, the very concept of the res publica dies.

আমাদের মিলিত হওয়ার জায়গাগুলো অবশ্যই এমন অনুপ্রেরণার অনুভূতি ধারণ করবে যা শহুরে (আরবান) ধারণার একবারে গভীরে প্রথিত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর শুধুমাত্র মানুষের কার্যক্রমের ব্যবস্থাই ক’রে দেবে না; মানবিক পদক্ষেপের চরিত্র নির্ধারণকারী কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থাও করবে। যার ফলে এই জায়গাগুলো আমাদের কাছে সহজেই অর্থপূর্ণ এবং আনন্দদায়ক (rewarding) হ’য়ে উঠবে। শহুরে জীবনযাত্রার সাথে প্রবেশগম্যতা (accessibility) এবং সুযোগ-সুবিধা (availability) অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রবেশগম্যতা আমাদের চিন্তাভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর ক’রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গ’ড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। স্থপতি হিসেবে এই ধরণের মূল্যবোধ তৈরীতে উৎসাহ যোগানো আমাদের কর্তব্য। শুরুতে সংযোগকারী স্থাপত্যের (architecture of connections) মাধ্যমে এমনটা করা যায়। যে স্থাপত্য আরবান প্লাজা, রাস্তা আর উদ্যানগুলোকে এক সুতায় গেথে ফেলে, যা কিনা এখনো আরবান ফেব্রিকের বড় অংশ গ’ড়ে তোলে।

সিভিক চিন্তা-ভাবনা গ’ড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব। আরবান পরিসর যতটুকু শেয়ারিঙের বাস্তবসম্মত ধারণা অনুমোদন করে, তা আমাদের এই ভাবনাতে থাকতে হবে। আমি দেখতে চাই, আমাদের পেশা দৃঢভাবে আরবান ফেব্রিকের প্রতি তার চিরায়ত উদ্বেগ/সম্বন্ধ (concern) কে পুনর্ব্যক্ত করুক। যে আরবান ফেব্রিক হবে সমবেত হওয়ার সুতিকাগার এবং জনমানুষের কর্মস্পৃহাতে যোগাবে পুষ্টি। শহুরে জীবনযাত্রার একটা প্রচলিত ধরণ আছে, কিন্তু তা সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার। আমাদের কোনো অবস্থাতেই ভুললে চলবে না যে, এই জীবনযাত্রার ধরণকে বোঝা এবং তাকে আরো উন্নত করে তোলাটা আমাদের উদ্দেশ্য। এমন না যে আমাদেরকে সবসময় শূণ্য থেকে শুরু করতে হবে। কখনো কখনো আমাদের জন্য বর্তমান ফেব্রিকের খানিকটা বদলে ফেলা, তাতে পরিবর্তন আনা কিমবা সেখানে কিছু পুনঃনির্মান করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিভিক পরিসর যুক্তিবোধ আর বাস্তবিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক অবস্থার সমন্বয়েই গড়ে তুলতে হবে।

কেনাকাটা – লুই আই কান

কেনাকাটার জায়গায় কোনো গাড়ীর চলাচল থাকবে না। এইসব জায়গায় মানুষের সাথে মানুষের দেখা হয়। হাঁটতে হাঁটতে নতুন কিছু ঘটে। সেই সাথে অতীত ফিরে আসে। এমনকি অনেক আগের বেচা-কেনার চিন্তা ভাবনাও। আজকের দিনের বিপনী-বিতানগুলো যেন গাড়ী-ঘোড়ার সমুদ্রের ভেতরে একটুকরো দ্বীপ। অথচ তারা হ’তে পারতো মানুষ-জন, গ্লাস, স্কেলেটর, বাগান, গাছপালা আর পণ্যের সমন্বিত কিছু। শুধুই জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে না দেখে, আমরা নিজেরাই মেলার অংশ হ’তে পারতাম।

পণ্যদ্রব্য, উৎসবের আয়োজন মিলেমিশে যাবে গাছ-পালা, গান-বাজনা আর ফ্যাশন-শো এর সাথে। আর আমরা বুঝে নেবো নির্দিষ্ট কোনো সময় কিমবা ঋতুকে। দোকানের সাথে মিলেমিশে যাবে বাগান। পণ্যের পশার থেকেই বোঝা যাবে তারা কিভাবে তৈরী হয়েছে। পায়ে চলা পথ আর চোখের প্রতি সহানুভূতি থেকেই আমরা পেয়ে যাবো আমাদের স্থাপত্যের স্কেল।

কেনা-কাটা করতে করতে হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে বিশ্রাম নেওয়া। দোকানের ছাউনিতে। পার্শ্ববর্তী ক্যাফেতে। বাগানে কারুশিল্পীদের প্রদর্শনীর দিকে তাকাতে তাকাতে। কেনা-কাটা করতে করতে আমরা এগিয়ে যাবো আরো একটু বড় জায়গার দিকে। যেখানে থাকবে নাটক/সিনেমার মঞ্চ, নাচের হল, বোলিং এ্যালে, কনসার্ট-হল, খাওয়াদাওয়া আর জিড়িয়ে নেওয়ার জায়গা, সেই সাথে মজা করার কোনো ব্যবস্থা। যেমন পিন-বল ম্যাশিন, জিউক-বক্স আর শ্যুটিং-গ্যালারী। এই সব আনন্দই শরীরের জন্য উপকারী।