রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৪ সালে লুই আই কানের বক্তৃতা (প্রথম অংশ)

প্রায় এক মাস হবে, অফিসে কাজ করতে করতে দেরী হয়ে গেছে,
যেমনটা আমাদাদের মাঝে মধ্যেই হয়,
তখন আমার এক সহকর্মী আমাকে বললেন,
‍‍‌‌‌”একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনাকে ?
কথাটা আমি অনেক দিন ধরেই ভাবছি…
আচ্ছা, বর্তমান সময়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন ?”

লোকটা হাঙ্গেরিয়ান, সেখান থেকেই এসেছেন
রাশিয়ানরা হাঙ্গেরি অধিগ্রহনের সময়।
কোনো একটা কারণে তার প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, আমি আগ্রহী হ’য়ে উঠি,
যে সব প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না তার উত্তর খোঁজার জন্য।

কিন্তু তখনই নিউ-ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে পড়ছিলাম
ক্যালিফোর্নিয়াতে ঘ’টে যাওয়া বিভন্ন বিষয় নিয়ে।
আমি ক্যালিফোর্নিয়াতে গিয়েছি। গিয়েছি বার্কলি হ’য়ে,
এবং বিপ্লবের ব্যাপ্তি লক্ষ্য করেছি,
আর দেখেছি যন্ত্রের অফুরন্ত সম্ভবনা, এবং আমি অনুভব করেছি,
যেমনটা আমি সম্প্রতি পড়েছি,
কবিরা কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন শব্দ ব্যতিরেকে।

আমি প্রায় দশ মিনিট ব’সে থাকি,
থম মেরে,
এই সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে,
পরিশেষে আমি গ্যাবরকে জিজ্ঞেস করলাম,

“শাদা আলোর ছায়া কেমন?”

গ্যাবর সব সময়ের মতো কথাটা বারবার আওড়াতে থাকে,
“শাদা আলো… শাদা আলো… আমি জানি না।
কিন্তু আমি ব’লি, ”কালো”
আপনারা ভয় পাবেন না। শাদা আলো ব’লে কিছু নেই,
কালো ছায়াও।

আমি মনে করি আমাদের সূর্যের জন্য এটা ভাঙা-গড়ার সময়,
আমাদের সব প্রতিষ্ঠানই ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

আমি যখন বড় হ’য়েছি তখন সূর্যের আলো ছিলো হলুদ,
আর ছায়ারা ছিলো নীল।
কিন্তু আমি পরিস্কারভাবেই শাদা আলো আর কালো ছায়া দেখি।
তবু আশঙ্কার কিছু নেই, কারণ আমি বিশ্বাস করি একদিন দেখা দেবে
সতেজ হলুদ, আর স্নিগ্ধ নীল,
এবং বিপ্লব জন্ম দেবে বিস্মিত হওয়ার এক নতুন ধারণার।
কেবল বিস্ময় থেকেই আসবে আমাদের নতুন প্রতিষ্ঠান…
নিশ্চিত ভাবেই তারা বিশ্লেষণের ফলে জন্মাবে না।

আর আমি বলি, “জানো, গ্যাবর?
আমি যদি ভাবতে পারতাম, স্থাপত্য ছাড়া আমি কি করতে পারতাম?
আমি নতুন রূপকথা লিখতাম,
কারণ রূপকথা থেকেই আসে বিমান, রেলের ইঞ্জিন,
এবং আমাদের অন্তর্গত বোধ…
এর সবই আসে বিস্ময় থেকে।”

একবার হয়েছিলো কি…
প্রিন্সটনে আমাকে পরপর তিনটা বক্তব্য দিতে হ’য়েছিলো।
আমার সে বক্তব্যগুলোর কোন শিরোনাম ছিলো না,
সেক্রেটারি আমাকে বারবার বিরক্ত ক’রে মারছিলেন,
প্রিন্সটন প্রকাশনার জন্য শিরোনাম চেয়ে।
গ্যাবরের সাথে ঐ রাতের কথোপকথনের পর, আমি শিরোনামগুলো পেয়ে যাই।
(শিরোনাম নিয়ে ব্যস্ত লোকের থেকে যারা পুরো ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত
তাদের সাথে পরিচিত হ’তে পারাটা এক দারুন অভিজ্ঞতা!)

গ্যাবর এমনই।
আসলে, সে যেন শব্দার্থের প্রেমে মশগুল
একই অর্থের কোনো ‘শব্দে’র
ফিডিয়াসের কোনো ভাস্কর্যের
এবং একটি শব্দের।
তার বিবেচনায়, শব্দের দুইটা গুণ আছে।
একটা পরিমাপযোগ্য গুণ, প্রতিদিনের ব্যবহারে সে যেমন,
আর দ্বিতীয়টা হ’লো সবকিছু মিলিয়ে তার অস্তিত্ব,
যে গুণ পরিমাপ করা যায় না।

এভাবেই, আমি আমার প্রিন্সটনের বক্তব্যের শিরোনাম পেয়ে যাই।
আমার প্রথম শিরোনাম,
‘স্থাপত্য : শাদা আলো এবং কালো ছায়া।’
দ্বিতীয় শিরোনামটা এমন,
‘স্থাপত্য : মানুষের বোধ’
আর তৃতীয় শিরোনাম,
‘স্থাপত্য : অবিশ্বাস্য যা ।’

অবিশ্বাসের জগতেই বাস করে আশ্চর্য সব বস্তু
যেমন, স্তম্ভের (column) আগমণ
দেয়াল ছাড়াই স্তম্ভ দাড়িয়ে যায়।

দেয়াল মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে।
এর শক্তি আর পুরুত্ব দিয়ে
সে মানুষকে ধ্বংস থেকে বাঁচিয়েছে।
কিন্তু কিছুদিন পরই, বাইরে তাকানোর ইচ্ছা
মানুষকে দিয়ে দেয়ালে একটা ফুটো বানিয়ে নিয়েছে,
এতে দেয়াল বেশ খানিকটা ব্যথা পেয়ে ব’লেছে,
‘তোমরা আমার এ কি করলে?
আমি তোমাদেরকে রক্ষা করেছি, আমি তোমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দিয়েছি-
আর এখন তোমরা আমাতে ছিদ্র করলে!’
তখন মানুষ বলে, ‘কিন্তু আমি বাইরে তাকাব!
আমি বিস্ময়কর বস্তু দেখব,
এবং আমি বাইরের দিকে তাকাতে চাই.’
এবং তারপরও দেয়াল দুঃখ পায়।

পরবর্তীতে, মানুষেরা দেয়ালে শুধু ফুটোই করেনি,
বরং সূক্ষ্ন-দর্শী জানলা (ওপেনিং) বানিয়েছে, দারুন করে পাথর কেটে,
জানলার উপরে লিনটেল বসিয়েছে।
তারপর দেয়াল বেশ ভালো বোধ করেছে।
দেয়াল বানানোর নিয়ম ঠিক হলো
যে নিয়মে দেয়ালে জানলা থাকে।
তারপরই এলো স্তম্ভ,
যে নিজেই একটি নিয়ম,
জানলা বানানো,
এবং না বানানো।
দেয়াল তখন জানলা দিয়ে তৈরী কোনো ছন্দ বাধার কথা ভাবে,
শেষ পর্যন্ত তা আর দেয়াল থাকে না।
থাকে এক সারি স্তম্ভ আর জানলা।
এই বোধ প্রকৃতি থেকেই আসে।

কোনো এক রহস্যময় অনুভূতির ভেতর দিয়ে এর উৎপত্তি
মানুষকে মানুষের সেইসব অন্তর্গত বিস্ময়বোধকে
প্রকাশ করতেই হয়
অভিব্যক্তির মাধ্যমে।
প্রকাশ করার জন্যই মানুষের বেঁচে থাকা
ঘৃণা প্রকাশ করতে… ভালোবাসা প্রকাশ করতে…
প্রকাশ করতে সততা আর যোগ্যতা …
আর যত দুর্বোধ্য বিষয়।
মনই সত্তা,
আর মস্তিষ্ক হলো একটা যন্ত্র, যার সাহায্যে
আমরা আমাদের অসাধারণত্ব আবিস্কার করি, যা থেকে গ’ড়ে ওঠে আমাদের মনোভাব।

পর্বত নিয়ে গোগলের একটা গল্প হতে পারে,
একটা বাচ্চা আর একটা দুষ্ট লোক।
এইভাবেই একে নির্বাচন করা যায়।
প্রকৃতি নির্বচন করে না… সে তার নিয়ম মেনে চলে মাত্র,
ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে সবকিছুর হ’য়ে ওঠা
মানুষ যেখানে নির্বাচন করে।
শিল্প নির্বাচন নির্ভর,
এবং মানুষ যা কিছু করে তা সে শিল্পেও করে।

প্রকৃতি যা কিছু বানায়,
তা বানানোর প্রক্রিয়া লিপিবদ্ধ ক’রে রাখে।
পাথরেই পাথরের ইতিহাস।
মানুষেই মানুষের অতীত।

এই ব্যাপারে আমরা যখন সচেতন হই,
প্রকৃতির নিয়ম নীতির ব্যাপারে আমরা বিবেচনাবান হ’য়ে উঠি।
কেউ কেউ প্রকৃতির নিয়মকে কাজে লাগাতে পারেন
ঘাসের একটা পাতাকে জেনেই।
অন্যদেরকে অনেক- অনেক কিছু শিখতে হয়
প্রয়োজনকে বোঝার জন্য,
প্রকৃতির নিয়মকে আবিস্কার কারার জন্য।

যে আনুপ্রেরণা আমাদেরকে শিখতে প্ররোচিত করে তার জন্ম আমাদের  যাপিত জীবনে।
আমাদের সচেতন বেড়া ওঠার ভেতর দিয়ে
আমরা প্রকৃতিকে বুঝতে পারি, যার হাতে আমাদের গ’ড়ে ওঠা।
আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শুরু
সেই অনুপ্রেরণা থেকে যা আমাদেরকে শিখতে প্ররোচিত করে,
যা আমাদের গ’ড়ে ওঠার সমার্থক।
কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো
শুরুতেই জানাবে/বলবে/ব্যক্ত করবে।
বাঁচার অনুপ্রেরণা যেমন ক’রে
আমাদেরকে ব্যক্ত করতে শেখায়।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠনগুলোর গ’ড়ে ওঠার মূলে আছে
প্রশ্ন করার আগ্রহ,
আমাদের হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া থেকে যার শুরু।

আমি যতদূর জানি
দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে একজন স্থপতি যা করতে পারেন তা হ’লো
তিনি প্রতিটা বিল্ডিংকে এক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবতে পারেন,
কোনোটা সরকারী প্রতিষ্ঠান,
কোনোটা বসবাসের, কোনোটা শিক্ষার,
কিংবা স্বাস্থসেবার বা বিনোদনের।

সাম্প্রতিক কালের স্থাপত্যের বড় দূর্বলতা হ’লো
এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে/প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যগুলোকে সহজে চেনা যায় না,
দেখে মনে হয় কিছু প্রোগ্রামের সমন্বয়ে
একটা বিল্ডিং গ’ড়ে উঠেছে শুধু।

কয়েকটা উদাহরণ দেই
প্রোগ্রাম ব’লতে কি বোঝাচ্ছি সেটা বোঝার জন্য।

ক্লাশ প্রজেক্ট হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে
আমি আমার ক্লাশকে একবার সমস্যা হিসেবে দিলাম মনাস্ট্রি,
আর আমি একজন তীর্থযাত্রীর ভূমিকা নিলাম
যার ভাবনা তীর্থযাত্রীদের সমাজ নিয়ে।
আমি কোথায় শুরু করব?
তীর্থযাত্রীদের সমাজের ধারণা আমি কোথায় পাব?
আমার কোনো প্রোগ্রাম ছিলো না।
পুরো দুই সপ্তাহ আমরা প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা ক’রে শেষ করলাম।
(প্রকৃতি নিজেই যেন তীর্থযাত্রীর সহযাত্রী)

এক ভারতীয় ছাত্রী প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মত দিলো।
সে বলল, ‘আমার মনে হয় এই জায়গাটা দেখে যেন মনে হয়
সব কিছু তৈরী হয়েছে কক্ষ (cell-মঠের একধরণের ক্ষুদ্র কক্ষ) থেকে।
যে কক্ষ থেকেই আসবে চ্যাপেলটার উপস্থিতির কারণ।
কক্ষ থেকেই আসবে আশ্রয়ের ধারণা,
আর কর্মের যুক্তি।’
আর একজন ভারতীয় ছাত্র
(ওদের ভাবনাই সবথেকে ভালো ভাবে জেগে ওঠে)
বলল, ‘ আমি এর সাথে পুরাপুরি সহমত,
তবে আমি আরো খানিকটা যোগ করতে চাই
আমি চাই খাওয়ার ঘর আর চ্যাপেলের কলেবর হবে সমান,
আর চ্যাপেলটা অবশ্যই কক্ষের (cell)  সমান হবে,
এবং আশ্রম হবে খাওয়ার ঘরের (refectory)  সমান।
কেউ কারো থেকে বড় হবে না।’

এরপর ক্লাশে সবথেকে ভালো করল এক বিলেতি ছাত্র।
সে দারুন একটা ডিজাইন জমা দিলো
সেখানে সে আরো একটা এলিমেন্ট যোগ করেছে,
একটা ফায়ারপ্লেস, বাইরের দিকে।
কোনো কারণে, তার মনে হয়েছে আগুনকে বাদ দেওয়া যাবে না,
আগুনের উষ্ঞতা আর প্রতিজ্ঞাকে।
সে আশ্রমকে বসিয়েছে মনাস্ট্রি থেকে আধা মাইল দূরে,
যেন মনাস্ট্রি নিজে একটা নির্জন আশ্রয় পায়,
and that an important arm of the monastery
should be given to the retreat.

পিট্‌সবার্গ থেকে আমরা একজন পাদ্রীকে ডাকলাম
আমাদের সুন্দর চিন্তাভাবনাকে মূল্যায়নের জন্য।
তিনি বেশ হাসিখুশি একজন পাদ্রী এবং চিত্রশিল্পী,
যে স্টুডিওতে উনি বাস করেন সেটা বেশ বড় আর নামকরা,
নিজের মঠের কক্ষে তিনি কালেভদ্রে যান।
তিনি আমাদের প্লানগুলোকে উপহাস করতে লাগলেন,
বিশেষ করে আশ্রমকে
যেটা কেন্দ্র থেকে আধামাইল দূরে অবস্থিত।
তিনি বললেন,
“আমি আমার বিছানাতেই খাবার পেতে বেশি আগ্রহী!”
তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের খুব মন খারাপ হ’লো,
কিন্তু তারপরই আমরা ভাবলাম,
“ধুর… ভদ্রলোক শুধুমাত্র একজন পাদ্রীই –
তিনি খুব বেশি কিছু জানেন না।”

আমরা সমস্যা চিহ্নিত করি,
তারপর দারুণ কিছু সমাধানও বের করি।
আমি আপনাদেরকে বলছি, এটা ছিল সবচেয়ে আনন্দের অনুভূতি
যখন বুঝতে পারলাম, একটা অকার্যকর প্রোগ্রাম থেকে আমাদের সমাধানগুলো আসেনি,
কেউ আমাদেরকে একগাদা স্কয়ারফিট দিয়ে দেয়নি।
আশ্রমের স্বাভাবিক বিবেচনা,
এবং আরো কিছুকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিলো।
আমরা যখন জুরি করি, ফাদার রোল্যান্ড এসেছিলেন,
তিনি দৃঢ়ভাবেই সমর্থন করেন
আমাদের দাড় করানো মনাস্ট্রির স্কিমগুলোকে,
কিন্তু যে প্রোগ্রাম, স্বাভাবিকভাবে দেওয়া হয়েছিলো
তা ছিলো অকার্যকর।
মূল প্রোগ্রামে কোনো নতুনত্বের ধারণা ছিলো না,
ছিলো না বাড়তি কিছু,
কিন্তু এই শিক্ষার্থীরা ছিলো দারুনভাবে আনুপ্রাণীত।
প্রতিটা শিক্ষার্থী ভিন্ন ভিন্ন সমাধান উপস্থাপন করেছে,
যার প্রতিটাতে ছিলো নতুনত্বের বোধ, নতুন উপাদান।
আপনাদেরকে তার সবগুলোর কথা বলা অসম্ভব,
কিন্তু, শুধুমাত্র পুর্নবিবেচনা থেকে যা শুরু হয়েছিলো
তা গিয়ে ঠেকেছে নতুন কোনো শুরুতে,
যা থেকে আজকের দিনের জন্য নতুন কিছুর উদ্ভব হ’তে পারে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো একটা সমস্যা উপস্থিত করেছিলাম,
ছেলেদের জন্য ক্লাব – সময়ের সবচেয়ে অদ্ভুত একটা বিষয়।
ছেলেদের ক্লাব আবার কী?
যে কোনো ভাবেই হোক, পরিসর তৈরী করা প্রয়োজন
আর শিক্ষার্থীদের জন্য,
পরিসরের ভাবনা এক নতুন বোধ তৈরী করে
ক্লাবের আশপাশের জন্য এটা হবে দারুন
মানুষের যাতায়াতকে বাধাগ্রস্ত ক’রতে যদি রাস্তায় কোনো বাধা তৈরী করা হয়,
তার ফলে গজিয়ে উঠবে কিছু উদ্দেশ্যহীন যাতায়াত।
সেটা শেষমেষ কার্যকর হবে না,
আর ক্লান্তিকর ট্রাফিক সমৃদ্ধ রাস্তা যাবে পাল্টে।
মোড়গুলোকে ছোট ছোট প্লাজাতে পরিণত করা হলো,
এবং কোনো না কোনো ভাবে ছেলেদের ক্লাব দেখে মনে হ’লো-
এখানে এটা হ’তে পারে।
শুধুমাত্র সামান্য imposition এর কারণে
যেমন ক’রে
রাস্তা হ’য়ে ওঠে গাড়ি পার্কিঙের জায়গা-
কখনোবা খেলার জায়গা।

ছোট বেলায়
আমরা দোতলার জানলা থেকে ফুটবল ফেলে দিতাম।
আমরা কখনো খেলার মাঠে যেতাম না, সব জায়গাই ছিল আমাদের খেলার জায়গা।
খেলাধুলা ছিল যত্রতত্র, গোছানো কিছু না।

ছেলেদের ক্লাব নিয়ে আমাদের আলোচনার সময়,
এক শিক্ষার্থী বলল,
“ছেলেদের ক্লাব গোলাঘরের মতো।”
অন্য আর একজন খানিকটা বিরক্ত/ঈর্ষান্বিত হ’য়ে-
কারণ সে গোলাঘরের কথা প্রথমে ভাবতে পারেনি,
বলল, ” না না, ক্লাবটা কুড়ে ঘরের মতো।”
(এটা নিশ্চিতভাবেই ভালো মত না।)

গ্যাবর কিন্তু আমাদের সাথে ক্লাশেই ছিল,
নিশ্চুপ হয়েই, কারণ ওকে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি।
এর মধ্যেই আমরা তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছি
ছেলেদের ক্লাব নিয়ে আলোচনা করতে করতে।
আমি গ্যাবরকে প্রশ্ন করলাম,”তোমার কি মনে হয় ? ছেলেদের ক্লাব আসলে কি?”

ও বলল, “আমার মনে হয় ছেলেদের ক্লাব হলো from place.
It is not a to place, but a from place.
It is a place which in spirit must be from where
you go, not to where you go.”

অদ্ভুত, যখন আমরা শাদা আলো আর কালো ছায়ার কথা ভাবি।
কেন এই বিপ্লব?
কারণ, আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই,
আর মানুষের প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে আস্থা হারাই,
বিপ্লব থেকেই অদ্ভুত কিছু আসবে,
আরো সহজ ক’রে বললে, নতুন উপলব্ধি।

বিদ্যালয় কি একটি to (প্রতি) স্থান নাকি from (হতে) স্থান?
এর উত্তর আমি এখনো পাই নি,
কিন্তু এটা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন।
আপনি যখন কোনো বিদ্যালয়ের চিন্তা করেন,
আপনি কি সাতটি সেমিনার কক্ষের কথা বলেন…
নাকি এমন কিছুর কথা বলেন যার পরিসরে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে
যা আমাদেরকে অনুপ্রাণীত করে?
যেখানে কথা বলা যায়,
অথবা কথোপকথনের অনুভূতি পাওয়া যায়?
সেখানে কি ফায়ারপ্লেসের জন্য জায়গা থাকবে?
সেখানে করিডোরের বদলে গ্যালারী থাকবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য গ্যালারীই প্রকৃত শ্রেণীকক্ষ,
যেখানে অন্য কোনো শিক্ষার্থীর সাথে তারা কথা বলতে পারে,
শিক্ষকের যেসব কথা তারা বুঝতে পারেনি সেসব নিয়ে,
একজন শিক্ষার্থী, যার মনোযোগ ভিন্ন,
এবং তারা উভয়েই বুঝতে পারে।

আমি যে মনাস্ট্রির কাজটা করছি
তার ঢোকার জায়গাতে একটা দরজা হবে।
দরজায় সব ধর্মের অলঙ্করণ থাকবে,
এমন কিছু যা এখন শুরু হচ্ছে।
কিন্তু তারা জায়গা দিচ্ছে শুধুমাত্র দরজাতে,
কারণ মনাস্ট্রির পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে।

জীববিদ্যার সল্ক ইনিস্টিটিউটের ক্ষেত্রে,
সল্ক সাহেব আমার অফিসে এসে যখন একটা পরীক্ষাগার বানানোর কথা বললেন
তার প্রোগ্রাম খুব সাদামাটা ছিলো।
তিনি বললেন’ ” পেন্সিলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডেকেল টাওয়ারগুলোতে
সব মিলে মোট কত বর্গফুট জায়গা আছে?”
আমি বললাম, এক লাখ বর্গফুট।

তিনি বললেন, ‘আমি একটা কাজ করতে চাই।
আমি যদি গবেষণাগারটিতে পিকাশোকে আমন্ত্রন করি, তাহলে কেমন হয় ?”
তিনি পরিমাপের সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন,
একটা সামান্য জীবও নিজের মতো হ’তে চায়।
একটা অনুজীব অনুজীবই হতে চায়,
(যে কোনো কারণেই হোক)
আর একটা গোলাপ পোলাপ-ই হতে চায়,
এবং মানুষ হতে চায় মানুষ…
প্রকাশ করতে চায়…
কোনো একটা প্রবণতা (tendency), কোনো একটা ভঙ্গিমা (attitude),
কিছু একটা যা নির্দিষ্ট কোনো কিছুর দিকে তাড়িত করে
কিংবা অন্যকিছু থেকে ফিরিয়ে আনে…
যে সব কারণে এই সব হয় তার ব্যবস্থা করতে চাই।
বিজ্ঞানী সল্ক প্রকাশ করতে চাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে ধরতে পেরেছিলেন।
অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে,
বিজ্ঞানী চান অপরিমেয়’র উপস্থিতি,
যা কিনা একজন শিল্পীর জগৎ।

এটা স্রষ্টার ভাষা।

কী আছে -সেটা খুঁজে বের করে বিজ্ঞান,
কিন্তু শিল্পী যা নেই তাই গড়ে তোলে।

সল্ক ইনিস্টিটিউট এই বিবেচনাতেই আলাদা হয়ে ওঠে
পেনসিলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের  অতিসাধারণ (plain) কোনো বিল্ডিং থেকে
এমন কিছুতে- যা মিলিত হওয়ার সুযোগ খোঁজে
যার পুরোটাই আসলে একটি পরীক্ষাগার।

(অসমাপ্ত)

স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব : ২

২.

‘জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব’ বনাম ‘সরলতা বা স্বচ্ছতা’

গোঢ়া আধুনিক স্থপতিরা জটিলতাকে যথেষ্ট এবং ধারাবাহিকভাবে বুঝতে চান না। ঐতিহ্যকে ভাঙতে গিয়ে তারা একেবারে শুরু থেকে আরম্ভ করেন। আদি এবং অকৃত্রিমকে তারা মুখ্য ক’রে তোলেন। আর সেটা করতে গিয়ে বাদ দিয়ে দেন বৈচিত্র্য আর সূক্ষ্নতাকে। আধুনিক ফাংশনকে নতুন ব’লে দাবি ক’রে তারা যুগান্তকারী বিপ্লবের অংশ হন এবং জটিলতাকে এড়িয়ে যান। পুনর্গঠনকারী হিসেবে তারা বিভিন্ন উপাদানকে আলাদা করার এবং কাউকে কাউকে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেন। নানা প্রয়োজনীয় বিষয় এবং তাদের সন্নিহিত-সহাবস্থানকে এড়িয়ে যান। ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট আধুনিকতাবাদের একজন প্রথম সারির প্রতিনিধি। তিনি প্রকৃতি-বিরোধী চিন্তা-ভাবনা নিয়ে বড় হয়েছেন। একসময় লিখেছেন- ‘আমার কাছে সরলতার লক্ষ্য অনেক বিস্তৃত এবং সুদূর প্রসারী । আমি মনে করি, এই ধরণের বিল্ডিঙের অন্তর্গত ছন্দ আধুনিক বিশ্বের চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করবে এবং তাকে গভীরতা দেবে।’ পিউরিজমের আর একজন সহ-প্রবক্তা লি করবুজিয়ের ‘মহান প্রাথমিক ফর্ম’ এর পক্ষে ওকালতি করেছেন। তার মতে প্রাথমিক ফর্ম নির্দিষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন। কিছু ব্যাতিক্রম বাদ দিলে আধুনিক স্থপতিরা দ্বৈততা বর্জন করেছেন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। গুণগত এবং পরিমাণগত উভয়ভাবেই বেড়েছে সমস্যারা। এই সমস্যারা আবার আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল। আগাস্ট হেক্সচারের মতে, “The movement from a view of life as essentially simple and orderly to a view of life as complex and ironic is what every individual passes through in becoming mature. But certain epochs encourage this development ; in them the paradoxical or dramatic outlook colors the whole intellectual scene… Amid simplicity and order rationalism is born, but rationalism proves inadequate in any period of upheaval. Then equilibrium must be created out of opposites. Such inner peace as men gain must represent a tension among contradictions and uncertainties. … A feeling for paradox allows seemingly dissimilar things to exist side by side, their very incongruity suggesting a kind of truth.”

সরলীকরণের জন্য যৌক্তিকিকরণ (র‍্যাশনালাইজেশন) এখনো চলছে। আর তা চলছে আরো সূক্ষ্নভাবে। এটা মিজ ভান্ডার রো এর বহুল প্রচারিত প্যারাডক্স (আপাত বিরোধী সত্য)”সামান্যতার বাড়াবাড়ি” এর বর্ধিত সংস্করণ। পল রুডল্ফ মিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, “সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।” আসলেই তাই । বিংশ শতাব্দিতে স্থপতিরা কে কোন্ সমস্যার সমাধান করবেন তা তাদের মর্জির উপরই নির্ভর করে। মিজ ভান্ডার রো-এর কথা যদি বলি, তিনি দারুন কিছু বিল্ডিং বানাতে পেরেছেন – শুধুমাত্র বিল্ডিঙের অনেকগুলো বিষয় (এ্যাস্পেক্ট) বাদ দিয়েছেন ব’লে। তিনি যদি আরো কিছু সমস্যার সমাধান করতেন তাহলে তার বিল্ডিংগুলো আরো কম প্রভাববিস্তারী হ’তো।

সামান্যতার বাড়াবাড়ি’র যে মতবাদ তা জটিলতাকে করুণা করে। আর সেটাই বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য/উপাদানকে বাদ দেওয়াকে যুক্তিযুক্ত ক’রে তোলে। ফলে ‘স্থপতিরা যে যে সমস্যার সমাধান করতে চান- তা বেছে নেওয়ার সুযোগ পান’। কিন্তু স্থপতিরা যদি বিশ্বের প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ হন, তাহলে তো এমনটা হবার কথা নয়। সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা কিংবা অঙ্গিকার নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার প্রতি দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা থেকে বাদ দিয়ে স্থাপত্যচর্চা করা যায়। তাতে জীবন তথা সমাজের সাথে স্থাপত্যের খানিকটা দূরত্ব তৈরীর ঝুঁকি বেড়ে যায়। সমাধানের অযোগ্য কোনো সমস্যা সামনে এসে হাজির হলেও স্থপতি তাই তা এড়িয়ে যাবেন না। তাতে স্থাপত্যে জটিলতা বাড়বে। আর সেই জটিলতার কারণে সৃষ্ট চরিত্র তৈরী করবে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য। মিজের চমৎকার প্যাভিলিয়নগুলো স্থাপত্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের আধেয় এবং বক্তব্যই তাদের সীমাবদ্ধতা এবং শক্তি।

প্যাভিলিয়ন আর বাড়ির মধ্যে মিল আছে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বিশেষত জাপানী প্যাভিলিয়ন আর সাম্প্রতিক কালের আবাসিক ভবনগুলোর মধ্যে। বাসগৃহের প্রোগ্রামের ভেতরে আগে থেকেই যেসব জটিলতা আর দ্বন্দ্ব আছে এরা সেগুলোকে উপেক্ষা করেন। পরিসরিক বা প্রযুক্তিক সম্ভাবনার সাথে সাথে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তাও তাদের নজর এড়িয়ে যায়। আরোপিত সরলতা মাত্রাতিরিক্ত সারল্যের কারণ হয়। গ্লাস হাউজের সাথে তুলনা করলে, উইলি হাউজে ফিলিপ জনসন সরলতাকেও অতিক্রম ক’রে যান। বসার ঘরের মতো ব্যক্তিগত ফাংশনকে তিনি সুস্পষ্টভাবেই আলাদা করেন এবং তাকে নীচ তলার একটা উঁচু স্তম্ভের উপরে বিন্যস্ত করেন। এর ফলে উপরের মডিউলার প্যাভিলিয়নের সামাজিক ফাংশন থেকে তা আলাদা হ’য়ে যায়। কিন্তু এখানেও বসবাসের পক্ষে ভবনটি হয়ে ওঠে অতিরিক্ত সাদামাটা – যা কিনা ‘দুইয়ের ভেতর থেকে একটা-কে বেছে নেওয়ার’ বিমূর্ত ধারণার বেশি কিছু নয়। সরলতা কাজ না ক’রলে তা অকপট হবেই। স্পষ্ট সরলিকরণের ফলাফল অনাকর্ষণীয় (ব্লান্ড) স্থাপত্য। সামান্যতা ক্লান্তিকর।

১. উইলি হাউজ, নতুন ক্যানান, জনসন

২. উইলি হাউজের নিচতলার পরিলেখ, নতুন ক্যানান, জনসন

৩. গ্লাস হাউজ, নতুন ক্যানান, জনসন

৪. গ্লাস হাউজের পরিলেখ, নতুন ক্যানান, জনসন

লুইস আই কান বলেছিলেন ‘সরলতার আকাঙ্ক্ষা’র কথা। স্থাপত্যস্থিত জটিলতাকে মেনে নেওয়ার ব্যাপারটা এই সরলতার আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে না। বরং অন্তর্গত জটিলতা যদি বাস্তবানুগ এবং রহস্যময় হয় তাহলে তৃপ্ত হয় মন। যার পরিণতি নান্দনিক সরলতার উদ্ভব। জ্যামিতিক আকারের পরিমিত ও যথাযত পরিবর্তন এবং এর অন্তবর্তী দ্বন্দ্ব আর আকর্ষণী ক্ষমতার সমন্বয়েই সৃষ্টি হয়েছে ডোরিক মন্দিরের (টেম্পল) দৃশ্যমান সারলতার। এরা দৃশ্যত সহজ সরল হ’য়ে উঠেছে সত্যিকারের জটিলতা নিয়ে। পরবর্তী সময়ের মন্দিরগুলো এই জটিলতা হারানোর সাথে সাথে হারিয়ে ফেলেছে তাদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা।

বাস্তবসম্মত সরলীকরণ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার একটি অংশ। জটিলতার ধারণা একে অস্বীকার করে না। বরং এর মাধ্যমেই উদ্ভব হয় মিশ্র বা জটিল স্থাপত্যের। “বিশেষ কোনো প্রয়োজনের খাতিরে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনাকে সাদামাটা ভাবে নেওয়া হয়।” কমপ্লেক্স (জটিল) কোনো শিল্পকর্মের বিশ্লেষণে এ ধরণের সরলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা যায়। সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যের সাথে একে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

যে স্থাপত্য জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব ধারণ করে তা যে সুস্পষ্ট বা কল্পিত-প্রতীকধর্মী হবে এমনও নয়। প্রথম দিকের আধুনিক স্থাপত্যের কপট সরলতার বিপরীতে সম্প্রতি এক ধরণের হটকারী জটিলতার আগমন ঘটেছে। যা কিনা সুস্পষ্ট প্রতিসাম্যতাকে উৎসাহ যোগায়। মিনোরু ইয়ামাসাকি একে ‘প্রশান্ত'(serene) ব’লে অভিহিত করেছেন। এই ধরণের স্থাপত্য একটি নতুন ধরণের ফর্মালিজমের প্রতিনিধিত্ব করলেও তা সরলতার পূর্ববর্তী ধারণার মতোই অভিজ্ঞতা-আশ্রয়ী নয়। এর দুর্বোধ্য মিশ্র-গড়ন (ফর্ম) কোনো জটিল কর্মসূচীকে (ফাংশন) প্রকাশ করে না। এর জড়োয়া অলঙ্করণ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে শিল্প-কারখানাতে তৈরী হয়। কিন্তু তা আগেকার দিনের স্মৃতি খুব অল্পই মনে করিয়ে দিতে পারে। গোথিকদের পাথরের কারুকাজ (tracery) এবং Rococo rocaille ছিলো সামগ্রিক ভাবেই বাস্তবসম্মত। এবং শিল্পীদের কর্মদক্ষতা ছিলো দেখার মতো। শিল্পীদের কাজের ধরণের পার্থক্যের কারণে যে বৈচিত্র্য এতে তৈরী হ’য়েছে তাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই যে জটিলতা যা প্রচুর প্রাণশক্তি আর উদ্দিপনার ভেতর দিয়ে জন্ম নিতো, আজকের দিনে তা প্রায় অসম্ভব। ‘প্রশান্ত’ স্থাপত্যের বিপক্ষে এ কথাগুলো বলাই যায়, যদিও উভয়ের মধ্যে বেশ খানিকটা সাদৃশ্য আছে। প্রাণ-প্রাচুর্যের পরিবর্তে অস্থিরতাই আমাদের শিল্পের বৈশিষ্ট্য, অথচ যার হওয়ার কথা ছিলো শান্ত-সুস্থির।

বিশ শতকের সেরা স্থপতিরা সচরাচর সরলীকরণকে  প্রত্যাখ্যান করেছেন – বরং সামগ্রীকতাতে জটিলতাকে ধারণ করাতে গিয়ে বর্জনের মাধ্যমে সরলতা তৈরীর দিকে ঝুঁকেছেন। আলভার আলতো আর লি কর্বুজিয়ের (যিনি প্রায়ই তার বিতর্কিত বিষয়যুক্ত লেখাগুলো অগ্রাহ্য করেছেন) এই দুই জনের কাজেই এমনটা দেখা যায়। কিন্তু তাদের কাজের জটিল এবং দ্বান্দ্বিক চরিত্র প্রায়শই অবহেলা কিংবা ভুল বোঝার শিকার হয়েছে। বলা যায়, আলতোর ক্রিটিকবৃন্দ তাকে পছন্দ করেছেন মূলত প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি তার সংবেদনশীলতা এবং তার দারুণ ডিটেলিং এর জন্য। সেই সাথে তার সমগ্র কম্পোজিশনকে সচেতনভাবে-সৃষ্ট সুস্পষ্টতা হিসেবে বিবেচনা ক’রেছেন। আলতোর ইমাট্রা চার্চকে আমি সুস্পষ্ট মনে করি না।….  ….  ফর্ম আর ফাংশন (কে যে কাকে অনুসরণ করে?) – এই দুইয়ের ভেতর কে একটু এগিয়ে থাকবে তা নিয়ে আজ আর যদিও বিতর্ক করা হয় না, তার অর্থ এই নয় যে আমরা তাদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে অগ্রাহ্য করতে পারি।

ভোকসেনিশ্কা চার্চ, ইমাট্রার কাছাকাছি, আলতো

(অসমাপ্ত…)

স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব : ১

(রবার্ট ভেঞ্চুরির লেখা ‘কমপ্লেকসিটি এ্যান্ড কন্ট্রাডিকশন ইন আর্কিটেকচার’এর অনুবাদ প্রচেষ্টা)
১. দুর্বোধ্য স্থাপত্য

একটি বিনীত ঘোষণাপত্র

স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব আমার ভাল লাগে। অসামঞ্জস্য আর স্বেচ্ছাচারী দোষে দুষ্ট অনুপোযুক্ত স্থাপত্য কিমবা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত এক্সপ্রেশনিজমের গুরুতর জটিলতার কোনোটাই আমাকে আকৃষ্ট করে না। আমি বরং জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব সমৃদ্ধ স্থাপত্যের কথাই বলি। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য এবং তার দ্ব্যর্থবোধকতার উপর যা নির্ভরশীল। শিল্পের সহজাত বৈশিষ্ট্যও এর অন্তর্গত। দ্বন্দ্ব আর জটিলতার মতো বিষয়গুলো স্থাপত্যের বাইরে সবখানেই প্রশংশিত। সে গণিতের বিভিন্ন সূত্র থেকে শুরু করে জীবনানন্দের কবিতা বা কিবরিয়ার চিত্রকর্ম সর্বত্রই।

ভিট্রুভিয়ানের মতে – প্রয়োজনীয়তা, স্থায়িত্ব এবং সুখানুভূতি – এই তিনের উপস্থিতি স্থাপত্যের মৌলিক শর্ত। এই মতকে বিবেচনায় নিলে স্থাপত্য স্বভাবতই জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব ধারণ করে। বর্তমানের যে কোনো ছোট-খাটো বিল্ডিঙের কার্যকারণ (ফাংশন), তার কাঠামো, যান্ত্রিক উপকরণ এবং অভিব্যক্তি বহুবিধ এবং পরষ্পর সাংঘর্ষিক। সে বিল্ডিংটা কোনো সাদামাটা স্থানের হলেও। এমনটা কিছু দিন আগেও ভাবা যেত না। সাম্প্রতিক কালের নগর ও গ্রামীন পরিকল্পনার নানাবিধ সমস্যাও এর সাথে যুক্ত হচ্ছে। আমি সমস্যাগুলোকে বিবেচনাতে নিয়ে এর অনিশ্চয়তাগুলোকে কাজে লাগাতে চাই। জটিলতা আর দ্বন্দ্বকে ধারণ ক’রে আমি দীর্ঘস্থায়িত্ব আর যৌক্তিকতার স্বপ্ন বুনি।

আধুনিক স্থাপত্যের প্রথাবদ্ধ শুদ্ধতার বাণী আর চলতে পারে না। খাঁটির পরিবর্তে সংকর ; ত্রুটিহীনের বদলে মানানসই; সহজ-সরল না হ’য়ে বরং বিকৃত; সুবিন্যস্ত না হ’য়ে এলোমেলো; নৈব্যক্তিক আর অনুগামী নয় এমন; একঘেয়ে হয়েও আকর্ষণীয়; ডিজাইনকৃত নয় বরং প্রচলিত; অন্তর্গত নয় – উপযোগী; সাদাসিধা নয় – জড়োয়া; নির্দেশক সেই সাথে সংস্কারক; সরাসরি এবং সুস্পষ্ট নয় বরং পরস্পরবিরোধী এবং দ্ব্যর্থবোধক কোনো বস্তু বা বস্তুর অংশ আমি পছন্দ করি। সুস্পষ্ট একতার ভেতরে মিশ্রিত অপরিহার্যতার দিকেই আমার ঝোঁক। আমি অযোক্তিক বক্তব্য ধারণ করি এবং দ্বৈততা দাবি করি।

বক্তব্যের সরলতার চেয়ে তার গভীরতার দিকেই আমি মনোযোগ দিতে চাই। সে গূঢ়ই হোক আর বাহ্য। ‘যে কোনো একটা’ এর বদলে আমি ‘উভয়’কেই বেছে নিতে চাই। সাদা অথবা কালো – এমনটা না হ’য়ে বরং সাদা-কালো দুইই, সেই সাথে কখনো কখনো ধূসর। একটি বাহ্য স্থাপত্য বহুবিধ অর্থ দ্যোতনা করবে। অনেক কিছুর দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে। তার বিভিন্ন পরিসর এবং উপকরণ বহুবিধ ব্যবহার যোগ্যতা নিয়ে আমাদের কাছে হাজির হবে।

যে স্থাপত্য একই সাথে জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব ধারণ করে তার স্পূর্ণতার প্রতি একটা দায় থাকে। সম্পূর্ণতা বা সম্পূর্ণতার আগ্রহের ভেতরেই থাকতে হবে এর প্রকৃত সত্তা। কিছু কিছুকে বাদ দিয়ে একতা তৈরী করাটা সহজ। সবকিছুকে সাথে রেখে সেটা করা বেশ কঠিন। স্থাপত্যকে কঠিন কাজটাই করতে হবে। বাহুল্যকে এড়ানো যাবে না।

(ডিসক্লেইমার : আমার দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কনসেপ্ট নিয়ে যখন একের পর এক খাবি খেয়ে যাচ্ছি, তার একটা পর্যায়ে রবার্ট ভেঞ্চুরির লেখা ‘কমপ্লেকসিটি এ্যান্ড কন্ট্রাডিকশন ইন আর্কিটেকচার’ বইটা আমার হাতে আসে। বইটাকে যদি শুধুমাত্র অসাধারণ বলা হয় তাহলেও খুবই কম বলা হয়। লেখক প্রথমেই বলে নিয়েছেন বইটার বিষয়-বস্তু সহজ নয়। বেশ কিছু পরিচ্ছেদ আমি কম ক’রে হলেও দশ বার পড়েছি। তারপরও সবসময় সঠিক অর্থ করতে পেরেছি বলে মনে করি না। অনেকক্ষেত্রেই মনের মধ্যে একটা ভাব ধরে নিয়েছি কিন্তু তার কোনো বাংলা দাড় করাতে পারিনি।

কখনো কখনো খুব অধীর হয়ে উঠেছি বইটার একটা বাংলা অনুবাদ পাওয়ার জন্য। আমি জানি না তেমনটা আছে কিনা। লি করবুজিয়েরের ‘টুওয়ার্ডস এ্যা নিউ আর্কিটেকচার’ (মূল ফরাসী ‘ভর্সিউন আর্কিটেকচার) থেকে ভেঞ্চুরির এই বই আমাদের সময়ের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে আমার কাছে। তাই আনাড়ি হাতেই খানিকটা শুরু করে দিলাম অনুবাদের কাজ। বন্ধুরা ভুল ধরিয়ে দেবেন আরো সাবলীল কোন শব্দ চয়নের পরামর্শ দেবেন এই আশাতেই ব্লগে প্রকাশ করার সাহস দেখানো।)