কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ৩০

মনে হয় তুমি আছো,
ডাক দিলেই এসে জড়িয়ে ধ’রবে আমাকে
কিংবা হয়তো গলা উচিয়ে ব’লবে শুধু-
‘কী গো!’
আমার মনে হবে সময় স্থির,
আমার ইচ্ছে হবে তোমার জন্য ফুল তুলে আনি
যে ফুল শুধু তোমাকে দেবো ব’লে চাষ করেছিলাম
আজ সেই ফুল ভাসিয়ে দেই্ বৃষ্টির জলে-
বুঝি তুমি নেই কোনো খানে
যে কথা শুধু তোমাকে ব’লবো ব’লে ভেবেছিলাম
তার কিছু লিখে রাখি হেয়ালি মাখিয়ে
হয়তো আর কারো কাজে লাগবে কখনো
কিংবা হয়তো লাগবে না-
এও সেই সব অপচয়িত মুহূর্তগুলোর মতো
নিষ্ফলা হ’য়ে হারিয়ে যাবে অতীতে!
ভাবি তোমাকে একটা চিঠি লিখবো
তারপর ঠিকানা না লিখেই ফেলে আসবো ডাকে
আমার কথাগুলো খুঁজে পাবে না তোমাকে
জানি তুমি যে নেই-
কেউ থাকে না কারো জন্য অনন্তকাল!

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৯

প্রত্যাখ্যানের ভয়ানক চিৎকার
ফিরে আসে বারবার-
স্মৃতির ভাঙাচোরা দুয়ারে,
মাথা কুটে মরে
মিথ্যে প্রতিশ্রুতির বাণী-
জমে ওঠে গ্লানি
হৃদয়ের তলদেশে
অভিমানের আবেশে।
গল্পরা হ’য়ে ওঠে প্রেত
করে ভয়াবহ উৎপাত…
শাদা বেলিফুল
এলো খোলাচুল
চুলের গন্ধে স্মৃতির জট
আঁচল জুড়ে মুগ্ধ পট
ঠোঁটের কোণে কুহকী হাসি
লুকিয়ে বলা ‘ভালোবাসি’
ফিসফিসিয়ে কানের কাছে…
বহু কাল ফেলে পিছে
কোথায় যেন বারবার
বেজে ওঠে হাহাকার…
সময়ের কবাট
অত্যাচারী উৎকট,
ফুলের গন্ধ
জাগিয়ে তোলে কবন্ধ-
কেন?
কোন পুরাতন প্রত্যাখ্যান
আজ করে প্রত্যাঘাত?
অকস্মাৎ!

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৮

যে পথ এতদিন চিনিয়ে দিয়েছে গন্তব্য
তাই যেন আজ গোলক ধাঁধার কাব্য
তোমার কাছে, আমার কাছে…
যে বোধ নিয়ত ভুলিয়েছে অনুপস্থিত সঙ্গ
সেই আজ রাতদুপুরে করে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ
তোমাকে নিয়ে, আমাকে নিয়ে…
যে শহর দিয়েছিলো আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি
সেও কাঁটে সিধ যখন নিশ্চুপ নিষুতি
কোনোখানে আমাদের নেই নিরাপদ গৃহ
অন্ধকারেই কেঁদে চলে নিঃসঙ্গ বিগ্রহ…

কবিতা · নগরী · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৭

প্রচণ্ড আলোর হল্কা উত্তাপে দগ্ধ করেছিলো
সেদিনের স্নিগ্ধ নাগরিক বিকেলটাকে হঠাৎ
অগণিত ক্লান্ত পথিকের পায়েপায়ে দলেছিলো
পরাজিত আর এক দল মানুষরূপী প্রাণী
মেঘে মেঘে যদিও সশব্দে নেচেছিলো বিদ্যুৎ
তপ্ত মাটিতে পড়েনি বর্ষণসুধা এক ফোটাও
নৈমিত্তিক গোধূলি টানেনি কোনো গৃহকোণ
নিয়ম মেনে যখন নেমেছিলো কালো রাত্রি
অতৃপ্ত আত্মায় ভর করেছিলো নিষিদ্ধ যত কল্পনা
আর পঙ্কিলতায় ছাওয়া স্বপ্ন ভেঙেছিলো প্রত্যাশা
ধ্বংসের উল্লাসে মেতেছিলো দ্বৈতাচারী মন
অলক্ষ্যেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড নিভেছিলো নিরুত্তাপে
বারংবার লাঞ্ছিত হৃদয় আবারো উঠেছিলো কেঁপে
নির্দয় সে নগরীর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে…

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৬

ঠিক করেছি তোমার হাত ধরে একদিন মায়াবিনী নদীটার পাড়ে যাবো।
তারপর আর কোনো দিন তোমার কাছে ফিরে আসবো না,
জলে ভাসতে ভাসতে এক পূর্ণিমার রাতে উত্তাল সাগরে গিয়ে পৌঁছাবো;
সেখানে ছাতাঝুরির পিছু নিয়ে যাবো কোনো এক নিঝুম দ্বীপে।
তারপর আর কোনো দিন তোমাকে নিয়ে ভাববো না-
তোমাকে নিয়ে ভাবতে গেলেই শ্রাবণ দিনের কথা মনে আসে,
যখন সকাল বেলা গা হিম করে ঘরের চালে সশব্দে বৃষ্টি নামে।
হতচ্ছাড়া পাখিগুলোর কথা ভাববো না তবুও…
ঠিক করেছি তোমাকে নিয়ে একদিন ইলোরার গুহায় যাবো-
সেখান থেকে বিদিশার নগর খুঁজতে বেরিয়ে গেলে কেমন হয় বলো তো!
তুমি গেলে একদিকে আর আমি ধরলাম তার বিপরীত কোনো পথ-
জানি আমাদের কেউ হারানো সে নগরীর দেখা আর পাবো না।
ঠিক করেছি একদিন আমি কোথাও যাবো না…
অন্তত একটা দিন কাটাবো নিয়ে শুধু তোমার ভাবনা।

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৫

যদি চ’লে যেতে পারি তবে থাকবো কেন?
কতটুকু দিতে পারো তুমি তা তো জেনে গেছি এতদিনে,
আর যতটুকু নিতে পারি নিয়েছি তার সবই।
তার উপর চারপাশের যা কিছু প্রলুব্ধ করছে প্রতিনিয়ত
তার মোহ কেমন ক’রে ছেড়ে দিই!
কিংবা ছাড়বোই বা কেন?
তোমার সঙ্গ এরই ভেতরে একঘেয়ে হ’য়ে উঠেছে-
আমাকে যে কতটা টানে বৈচিত্র্য তা হয়তো তুমি বোঝোনি কখনো-
আর তার দায়ই বা আমি নেব কেন?
আমাকে টানছে সদ্যপরিচিত কোনো সঙ্গী- তার অদ্ভুত অজানা-সঙ্গ,
বহু দূরের এক মায়বী নদীর জল হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রতিক্ষণ,
আমাকে ডাকছে জনহীন নামহীন কোনো এক বালিয়াড়ি-
আমি যাবো তাই চ’লে, সিদ্ধান্ত নিশ্চিত;
আলিঙ্গন করবো এতদিনেও হয়নি চেনা এমন কোনো উত্তেজনা
আমি তাই উৎফুল্ল আজ তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার বাসনায়
তুমি তো জানো আমাদের আর কিছু পাওয়ার নেই
পরস্পরের কাছ থেকে-
আমাদের আর কিছু দেওয়ার নেই পরস্পরকে,
আমাদের এই বর্তমান অতীতের পুনরাবৃত্তি শুধু-
আহ! কি দুর্বিসহ ভেবে দেখো তো একবার!
অথচ চাইলেই আমরা এর সব ছাড়তে পারি-
সামনে প্রশস্ত পথ, প্রয়োজনীয় কড়িও পকেটস্থ
চাইলেই ধরতে পারি নতুন স্বপ্ন-
আবার বুনতে পারি নতুন জাল-
আবার বিধতে পারি নতুন শিকার-
আহা! কি উত্তেজনা! আহা!
এই থেকে যাওয়াতে যেটুকু স্বস্তি আছে, যেটুকু আনন্দ আছে
তার সবই পুরোনো, একঘেয়ে আর চেনাচেনা!
তোমার কি মনে হয় না কখনো,
এমন থেকে যাওয়াতে পরাজয় ছাড়া আর যেন কিছু নেই?
চলো ছড়িয়ে পড়ি, চলো ছেড়ে যাই-
সামনের সমস্ত সুযোগ মুঠো ভ’রে নিই আজকে-
চলো সুখি হ’ই আবার দুইজনে…

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৪

আজও কি তোমার অভিমানের সারাদিন?
জানো! এখানে আজ আকাশটা রোদহীন,
দক্ষিণের গাঢ় জলের সমুদ্র
একটু একটু ক’রে আবারও হ’য়েছে রুদ্র-
উপকূলে তাই বৃষ্টি সবিরাম,
নকশি কাঁথার ভাজে খুঁজি আলসে আরাম!
বুঝি সমাগত বহু কাঙ্ক্ষিত বসন্ত-
শীতের উপদ্রব তবে কি নিঃশেষ এবারের মতো?
সতর্ক পরিযায়ী যত পাখি,
আবারো উত্তর দিকে ফিরবে নাকি!
চারপাশে ধুলো, ঝড় আর এলোমেলো উষ্ঞতা-
থেকে থেকেই অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা
ফেনিয়ে ওঠে আমাদের পুরোনো ছিন্ন পালে।
কে যেন হঠাৎ হাসে অট্টহাসি মনের খেয়ালে!
একি স্মৃতি নাকি দূর-কল্পনা?
কেউ তা কখনো জানবে না, জানতে চাইবে না…
তবুও তোমার অভিমানের আঙিনায়
নতুন ফাল্গুনদিন যেন ঘটনাবিহীন না যায়।

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৩

কোনো কোনো সর্বগ্রাসী একলা থাকার দিনে
পুরোনো কিছু দুঃসহ স্মৃতি ঝেড়ে ফেলা যায়,
গভীর ভাবে জেনে নেওয়া যায় এমন কিছু
যা নিয়ে কখনো জাগেনি প্রশ্ন সচেতন মনে-
যে থাকতে চায় জীবনের দিনরাত্রির ঘনঘটায়
আর যার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ের খুব কাছে পৌঁছার,
তাদের বাস যেন একেবারে বিপরীত জগতে!
এমনতরো বোধের দিনে বোখে যাওয়া যায়;
ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতিও যখন জাগায় প্রগাঢ় স্বস্তি!
আর প্রিয়তম আকাঙ্ক্ষার পুনঃপুনঃ অত্যাচারে
উপসম হয় পুরোনো যত পরাজয়ের শোক;
তখন নিজে নিজেই একটু হেসে নেওয়া যায়-
অতীত ভাগ্যিস অভিজ্ঞতার বেশি কিছু নয়!

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২২

যে আমি স্বপ্ন দেখি, যে আমি মেহন করি
যে তুমি স্বপ্ন ভাঙো, যে তুমি ছলনাময়ী
যে আমি লোভী, প্রতারক, মিথ্যেবাদি
যে তুমি ভঙ্গুর, সদা মনোযোগ-আকাঙ্ক্ষী…
এমন আমরা পলায়নে মুক্তি পারো নাকি!
পাবো না, পাবো না, পাবো না…
পাবে না, পাবে না, পাবে না কখনই…

কবিতা · বিচ্ছিন্ন পঙক্তি

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২১

আবারো প্রয়োজনীয় প্রেম তার ভোল পাল্টে নেবে
খুঁজে নেবে অনাঘ্রাত হৃদয় বর্তমানের চালান থেকে
দক্ষ ব্রীড়াময়ী হাসি দিয়ে পাতবে অব্যর্থ ফাঁদ।
তারপর প্রথমবারের মতো আহত কোনো হৃদয়
নিজেকে সামলে নিয়ে বদলে নেবে পুরোপুরি…
হয়তো চিরতরের জন্য, হয়তো নিজেরই জন্য…
একটু একটু ক’রে শিখে নেবে আদিম যত দক্ষতা
আর শরীর ছেনে গ’ড়ে তুলবে নতুন প্রেম-
ক্লিশে সজ্জায় ডুবে থাকা কোনো অবয়ব দেখে
ক্ষণিক থমকে মুগ্ধতার ভান ক’রে এগিয়ে যাবে।
মিথ্যে সে ভান যদিও ঠিক বুঝবে অভিজ্ঞ চোখ
তবুও তাতেই মজবে চিরঅতৃপ্ত কোনো আত্মা-
যে জেনেছে- প্রেম বড় জটিল এক দক্ষতা,
তার কৌশল যে জেনেছে সে বড় অদ্ভুত জাদুকর
বারবার তাকে নতুন ক’রে সাজাতে হবে পসরা;
শুধু পাল্টে নিতে হবে কোনো রং, কোনো ডিটেইল-
ভুলে যেতে হবে পুরাতন যত সাজানো মায়া।
বলিরেখাগুলো শুধু রাখবে তুলে পরাজয়ের শত চিহ্ন…