বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২৩

কোনো কোনো সর্বগ্রাসী একলা থাকার দিনে
পুরোনো কিছু দুঃসহ স্মৃতি ঝেড়ে ফেলা যায়,
গভীর ভাবে জেনে নেওয়া যায় এমন কিছু
যা নিয়ে কখনো জাগেনি প্রশ্ন সচেতন মনে-
যে থাকতে চায় জীবনের দিনরাত্রির ঘনঘটায়
আর যার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ের খুব কাছে পৌঁছার,
তাদের বাস যেন একেবারে বিপরীত জগতে!
এমনতরো বোধের দিনে বোখে যাওয়া যায়;
ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতিও যখন জাগায় প্রগাঢ় স্বস্তি!
আর প্রিয়তম আকাঙ্ক্ষার পুনঃপুনঃ অত্যাচারে
উপসম হয় পুরোনো যত পরাজয়ের শোক;
তখন নিজে নিজেই একটু হেসে নেওয়া যায়-
অতীত ভাগ্যিস অভিজ্ঞতার বেশি কিছু নয়!

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২২

যে আমি স্বপ্ন দেখি, যে আমি মেহন করি
যে তুমি স্বপ্ন ভাঙো, যে তুমি ছলনাময়ী
যে আমি লোভী, প্রতারক, মিথ্যেবাদি
যে তুমি ভঙ্গুর, সদা মনোযোগ-আকাঙ্ক্ষী…
এমন আমরা পলায়নে মুক্তি পারো নাকি!
পাবো না, পাবো না, পাবো না…
পাবে না, পাবে না, পাবে না কখনই…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২১

আবারো প্রয়োজনীয় প্রেম তার ভোল পাল্টে নেবে
খুঁজে নেবে অনাঘ্রাত হৃদয় বর্তমানের চালান থেকে
দক্ষ ব্রীড়াময়ী হাসি দিয়ে পাতবে অব্যর্থ ফাঁদ।
তারপর প্রথমবারের মতো আহত কোনো হৃদয়
নিজেকে সামলে নিয়ে বদলে নেবে পুরোপুরি…
হয়তো চিরতরের জন্য, হয়তো নিজেরই জন্য…
একটু একটু ক’রে শিখে নেবে আদিম যত দক্ষতা
শরীর ছেনে গ’ড়ে তুলবে নতুন প্রেম-
ক্লিশে সজ্জায় ডুবে থাকা কোনো অবয়ব দেখে
ক্ষণিক থমকে মুগ্ধতার ভান ক’রে এগিয়ে যাবে।
মিথ্যে সে ভান যদিও ঠিক বুঝবে অভিজ্ঞ চোখ
তবুও তাতেই মজবে চিরঅতৃপ্ত কোনো আত্মা-
যে জেনেছে- প্রেম বড় জটিল এক দক্ষতা,
তার কৌশল যে জেনেছে সে বড় অদ্ভুত জাদুকর
বারবার তাকে নতুন ক’রে সাজাতে হবে পসরা;
শুধু পাল্টে নিতে হবে কোনো রং, কোনো ডিটেইল-
ভুলে যেতে হবে পুরাতন যত সাজানো মায়া।
বলিরেখাগুলো শুধু রাখবে তুলে পরাজয়ের যত চিহ্ন…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৯

হয়তো একদিন আমিও ঝিনুক হবো
শক্ত খোলসে লুকিয়ে রাখবো কষ্টে বোনা মুক্তো আমার
অন্তত কিছু দিনের জন্য হ’লেও
তোমাদেরকে পুড়তে হবে তারে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণায়
আমি হয়তো হরিয়ে যাবো কোনো একদিন
মারিয়ানা ট্রান্সের গভীরতম গহ্বরে
আমাকে চূর্ণ করবে অথৈ জলের শক্তি
তখন হয়তো হবো আমি শুধু মুক্তোর স্মৃতি…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৮

আমাকে ভালোবেসেছিলো আকাশ, নিলীমা
আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলো ভাঙনপ্রিয় যমুনার তীর
একবার এক নিঃস্ব যুবক নৌকো বেয়ে এসেছিলো সেখানে
শুনিয়েছিলো নদীর কাছে তার সব হারানোর গল্প
আর গল্প শেষে আমাকে নিয়েছিলো টেনে তার বুকে
আমি সেখানে তন্নতন্ন ক’রে খুঁজেছি হারানো ভালোবাসা
মুহূর্তে মনেও হয়েছিলো পেয়েছি বুঝি –
কিন্তু যার কাছে যা নেই তা সে দেবে কেমন ক’রে!
কেমন ক’রে বুঝি সে পারে দিতে শুধু ক্ষণিকের সঙ্গ?
তার বৈঠায় প্রতিনিয়ত জোয়ারে ভাসার আকাঙ্ক্ষা
আর আমার আলিঙ্গনে তাকে বেঁধে রাখার ছলনা।
পালিয়ে গিয়ে হয়তো জীবন পেয়েছিলো সে-
কেঁদে পার করেছিলাম পুরো একটা দুপুর সেদিন
সে রাতেই আবার ভাঙতে শুরু করে পাড়
তল্পিতল্পা দ্রুত গুছিয়ে পাড়-ভাঙা মানুষের মিছিলে আবার
সেখানে আমার হাত ধ’রেছিলো এক স্বাবলম্বী পুরুষ
পোড়খাওয়া মধ্যবয়স্ক এক নিঃসঙ্গ প্রাণ
আমাকে সুখেই রেখেছিলো সে সংসারে…
একবার তবু অদ্ভুত গোধূলি আকাশ, নিলীমা নয় রক্তিম
কি এক অবুঝ নিয়মে আমারে ক’রে তোলে উতলা অন্তিম!

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৭

হৃদয়েরই নির্দেশে যে পথে একদিন গিয়েছি এগিয়ে
সেই পথেই নিহত হয়েছে আমার কোমল হৃদয়
আমি মারবো তাই, মরবো নিজেকেই কাউকে না জানিয়ে –
মনে কোনো দুর্বোধ্য অপরাধবোধ নিয়ে নয়
নয় কোনো রাগ ক্ষোভ কিংবা ঘৃণার জ্বালা বুকে নিয়ে,
হয়তো দলছুট কোনো উল্কার মতোন অকারণ অনুনয়ে
সময়ের পৌনঃপুনিক আবরুদ্ধ আবর্তনের মতো …
উদ্ধত সে হৃদয় আবার মৃত! ক্ষতবিক্ষত!
আমি জাগাবো আবার প্রাচীন সে হৃদয় – ভালোবেসে –
তাকে নিপূণ হাতে করবো হত্যা পুরোনো অভ্যাসে।

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৫

আমাদের যেসব দিন গিয়েছে চ’লে
তার কিছু রেশ হয়তো থাকবে পড়ে সময়ের কুলে,
তবুও মানুষের জীবন দীর্ঘ –
নিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া নক্ষত্রের ধূলিকণার অর্ঘ্য
গ’ড়ে উঠবে কাঙ্ক্ষিত নতুন সঞ্চয়
আসবে নতুন জোয়ার আমাদের পুরাতন ভাবনায়
তার গতিমুখে হয়তো থাকবে লক্ষ পদধ্বনির ডাক
আবারও সকলে হবো অজানা পথের পথিক,
অনিশ্চয়তাকেই শুধু নিশ্চিত ব’লে জেনে
পথের নতুন সাথীকে সেদিনও নেবো চিনে …
একদিন জানি সেও যাবে চ’লে, হারিয়ে
পৃথিবীর জল হাওয়াদের মতো দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৪

তার মন ছিলো ঠিক যেন
এক বহতা নদীর মতো কুহকী
নদীর জলের মতোই তার সাগরমুখী
নিত্য সন্তরণ
সন্তরণেই সুখ শুধু যার
কিংবা দুকুল ছাপানো প্লাবণ ভরা-বর্ষার
যেন ভেঙেচুরে নতুন ক’রে তোলা
নিজেকেই প্রতিবেলা
হয়তো খানিকটা অচেনাও ক’রে তোলা
সেই অচেনার সাথেই নতুন প্রেম
হৃদয়ে অজানা বিপুল কম্পন
তার সেই গড়ার খেলা
ভাঙার দোলা
ভালোবাসতে বাসতে কবে যে
ভুলতে বসলাম তারে
পড়ে না মনে আজকে
শুধু মনে পড়ে লোনা জলে ডুবিয়ে যুগল পা
তারে পাশে রেখেও একলা
শুনতে চেয়েছি বহুদূরের মাছেদের গান
জানিনি কেন
সেই গানে ছিলো শুধু ভাঙনের সুর
কিবা সকাল কিবা দুপুর …

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৩

ঘর ছেড়ে কখনো কখনো বারান্দায় গিয়ে বসি
আবার ফিরেও আসি –
সেই সাথে ফিরে আসে মনের অস্থিরতাও
পারিনা ব’লতে নিজেকেও –
এই দুঃসময় কেটে যাবে একদিন,
ধৈর্য ধরো রাজীব আর একটুক্ষণ;
অথচ এই কথাগুলোই ব’লতে চাই তোমাকে,
ব’লতে চাই- জানো কী হয়েছে আজকে !
রাস্তার ঐ পাড়ের গাছটাতে বাসা বেধেছে এক জোড়া পাখি,
কেমন বোকা দেখো, যদি ওঠে হাঠাৎ কালবৈশাখী!
ওদের বাসাটা উড়ে যাবে না ঝড়ে?
বলো এমন সময় কেউ এমনটা করে!
কিন্তু তোমাকেও হয়না বলা কিছুই আর…
আমাদের এই বুড়ো নির্দয় পৃথিবীর উপর
বারবার ফিরে আসে ভ্রষ্ট অতীত –
হাসপাতালের মর্গ ভ’রে ওঠে অনাকাঙ্ক্ষীত
মৃত মানুষের ক্ষতবিক্ষত লাশের স্তুপে প্রতিদিন,
একটু একটু ক’রে বিস্তৃত হয় কবরস্থান…
মনে হ’তে থাকে আমিও যেন ঐ দিকেই আগাচ্ছি
প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছি –
পেরিয়ে যাচ্ছি তাদের ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ রেখা,
আমার জন্য অপেক্ষায় আছে ভেজা-ভেজা মাটিতে থাকা
কত না কীট, পোকামাকড় আর অনুজীবের দল-
ওদেরও আছে সংসার, জীবনের জটিল
কোনো না-মেলা হিসাব-নিকাস।
আমাদের আজকের এই দীর্ঘ অবরুদ্ধ আবাস
হয়তো সে সবের কিছুই জানবে না।
যেমনটা তুমি জানো না –
কেমন আছি আমি;
কিংবা যেমনটা আমারও অজানা কেমন আছো তুমি।
সব দুঃসময় কি কখনো ঠিক হয় – হ’তে পারে?
ফেরা কি যায় সব সময় আকাঙ্ক্ষার কৈবর্ত নগরে !
সব কিছু ছেড়ে তার হৃদয়ের কাছে যেতে পারে কয় জনা!
বারান্দায় যাওয়ার দরজাটাও যেন বড্ড অচেনা…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১২

ঠিক যখন মনে হ’য়েছিলো বন্ধুকে আর প্রয়োজন নেই তোমার
মনে হ’য়েছিলো তুমি আছো বেশ বাকিদের নিয়ে-
আমি ভেবে নিয়েছিলাম, আমাকেও থাকতে হবে ভালো,
জীবনের প্রতিটা অণুর সাথে নিজেকে নিতে হবে মিলিয়ে,
তখনই আমাকে এলোমেলো ক’রে দিয়ে এলো তোমার ক্ষুদেবার্তা-
কিছু একটা নিয়ে আমাকে জানিয়েছো শুভেচ্ছা।
যেহেতু ক্ষুদেবার্তা তাই হয়তো জানাওনি কেমন আছো তুমি,
কিমবা কোন‌্ শহরে এখন কাটছে তোমার দিন-রাত্রী,
কেন এসেছে মনে হঠাৎ শুভেচ্ছার ভাষা,
যেই ভাষা আমাদেরকে ছেড়ে গেছে কত না যুগ আগে !
বন্ধু, তুমি কি তবে ভালো নেই এই সময়?
তোমার কি আবারো নিঃসঙ্গ হৃদয়?