বঙ্গানুবাদ · ভাবনায় স্থাপত্য · স্থাপত্য

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমফর (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

The hard core of beauty

সৌন্দর্যের চরমতা
১৯৯১

দুই সপ্তাহ আগে আমি রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান শুনছিলাম। অনুষ্ঠানটা ছিল মার্কিন কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামের উপরযার শিরোনাম ছিল “সৌন্দর্যের চরমতা”। সৌন্দর্যের যে একটা চরম সীমা আছে – এই ভাবনাটা আমার ভাল লাগল। সৌন্দর্য আর চরম সীমার- এই সম্পর্কের ব্যাপারটার খানিকটা আভাস আমি খুঁজে পেলাম পরবর্তীতে আমার স্থাপত্য নিয়ে ভাববার সময়। উইলিয়াম যেন বলছিলেন, ” মেশিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু থাকে না।” সাথে সাথেই আমার মনে হলো – পিটার হ্যান্ডকি (Peter Handke) যেন এমনই একটা ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করেন। তার হতাশাটা আমি বুঝতে পারিযখন তিনি বলেন- প্রকৃতিতেই সৌন্দর্যের বাসপরিণত বস্তু যখন আমাদেরকে কোন কিছু নির্দেশ করে নাকিমবা যখন তিনি নিজে থেকে কোন কিছুর অর্থ করতে পারেন না।

বেতারের ঐ অনুষ্ঠান থেকেই তখন আমি জানলাম যেকোন কিছুর নিজস্বতার বাইরে অন্য কোন আইডিয়া নেই – এই বিবেচনাই ধারণ করে উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কবিতা। নিজের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতিগুলোকে বাস্তবিক জগতে (world of things) নিয়ে গিয়ে সেগুলোকে তার নিজের করে নেওয়াই তার শিল্পের লক্ষ্য।

সঞ্চালক বলছিলেন, এই ব্যাপারটা উইলিয়ামের কাজে দৃশ্যত নৈর্ব্যক্তিক এবং অল্প-কথায় অর্থপূর্ণ ভাবে ঘটেআর এই কারণেই তার লেখনীর এতটা আবেগময় প্রভাব।

কথাগুলো আমাকে আকৃষ্ট করল। বলল বিল্ডিং নিয়ে আবেগী হয়ে উঠতে আগ্রহী না হতেতারপরও আবেগকে জাগতে দিলামপ্রকাশিত হতে দিলাম।

সৌন্দর্যের চরমতা : একিভূত/জমাটবদ্ধ উপাদান।

(অসমাপ্ত)

 

বঙ্গানুবাদ · ভাবনায় স্থাপত্য · স্থাপত্য

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমথর (চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

The body of architecture
স্থাপত্যের অবয়ব
১৯৯৬


জাতীয় জাদুঘরের কিউরেটর আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত আর অপ্রত্যাশিত সব প্রশ্ন করে তিনি আমাকে হতবাক করার চেষ্টা করছিলেন। আমি স্থাপত্য নিয়ে কি ভাবতাম? আমার কাজের কোনদিকগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? এইসবই জানতে চাচ্ছিলেন। সাক্ষাৎকারটা রেকোর্ড হচ্ছিল। আমি আমার মতো ক’রে যতটা পারি বলেছি। কিন্তু সাক্ষাৎকার শেষে আমার নিজের উত্তরে আমি নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধুর সাথে পারে কথা বলি। আকি কাউরিসমাকির সাম্প্রতিক চলচিত্র নিয়ে। চরিত্রের প্রতি পরিচালক যে মনোযোগ আর শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তাতে আমি মুগ্ধ। অভিনেতাদেরকে তিনি কোন কিছুতে আটকে রাখেন না। কোন চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ কারার জন্যও ব্যবহার করেন না। বরং তাদেরকে এমনভাবে আলোকিত করে উপস্থাপন করেন যে আমরা সহজেই তাদের বৈশিষ্ট্য কিমবা গোগনীয়তা বুঝে যাই। কাউরিসমাকির শৈলী তার চলচিত্রে একটা উষ্ঞতার অনুভূতি এনে দেয়। আমার বন্ধুকে তখন বললাম, এখন বুঝতে পারছি সকালের সাক্ষাৎকারে আমার কি বলাটা ঠিক হতো। কাউরিসমাকি যেভাবে চলচিত্র বানান, আমি আসলে সেই ভাবেই বিল্ডিং বানাতে চাই।


যে হোটেলে আমি থাকছিলাম সেটাকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন একজন জনপ্রিয় ফরাসী স্থপতি। ওনার কাজের সাথে আমি আগে পরিচিত ছিলাম না। পুরানো ধাচের কাজ করেন উনি। এই ধরণের কাজের প্রতি আমার আগ্রহ নেই। কিন্তু হোটেলে ঢোকার পরপরই তার তৈরী করা পরিবেশ আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কৃত্রিম আলো হলঘরটাকে যেন মঞ্চের মতো করে আলোকিত করে রেখেছে। কোথাও আলো আছে আবার কোথাও বা অন্ধকার। অভ্যর্থনার জায়গাটা বেশ উজ্জ্বল। দেয়ালের কুলুঙ্গিগুলোতে বিভিন্ন ধরণের পাথর। গ্যালারির দিকে উঠে যাওয়া বড়সড় সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে লোকজন চকচকে সোনালী দেয়ালের পাশে হয়তো একটু দাড়ায়। উপরের দিকের ড্রেস-সার্কেল বক্সে হালকা কিছু খাওয়ার জন্য কেউ কেউ একটু বসে নেয়। অবশ্য এগুলো বেশ ব্যায়বহুল। ‘প্যটার্ন ল্যাংগুয়েজ’ এর লেখক আলেকজান্ডার এটা দেখে নিশ্চয় খুশি হতেন। যে ধরণের পরিসরিক ব্যবস্থাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে তার বর্ণনা আছে এই বইটাতে। হলঘরের বিপরীত দিকের একটা বাক্সে আমি বসেছিলাম, যেন একজন দর্শক যে নিজেকে ডিজানারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবিস্কার করে। নিচের দিকে তাকিয়ে লোকজনের আসা-যাওয়া দেখতে আমার ভালই লাগল। আমি যেন বুঝে উঠতে পারলাম এই স্থপতির সফলতার কারণ ।


হৃদি বলছিল- তার উপর ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের একটা ছোট্ট বাড়ীর বেশ প্রভাব আছে। বাড়ীটা সে অনেক আগে দেখেছিল। ছোট ছোট ঘর আর বেশ নামানো সিলিং ছিল বাড়ীটাতে। ছোট্ট লাইব্রেরিতে অদ্ভুতভাবে আলো আসতো। প্রচুর জড়োয়া স্থাপতিক কারুকাজ করা ছিল। পুরো বাড়ীটা একটা সুষ্পষ্ট আনুভূমিকতা নিয়ে হাজির হতো যেমনটা আগে কখনো দেখেনি। বেশ বয়স্ক একজন মহিলা সেখানে বাস করতেন। আমার মনে হয়েছিল বাড়ীটাতে গিয়ে আমার দেখার কিছু নেই। মেয়েটা যা বোঝাতে চাচ্ছিল তার সাথে আমি আগে থেকেই পরিচিত। বাড়ীর ব্যাপারে সে যে অনুভূতির কথা বলছিল সেটাও আমার জানা।


একটা স্থাপত্য প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়া স্থপতিদের কিছু বিল্ডিং বিচারকদেরকে দেখানো হচ্ছিল।

(আংশিক)

 

বঙ্গানুবাদ · ভাবনায় স্থাপত্য · স্থাপত্য

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমথর (প্রথম পরিচ্ছেদ)

(পিটার জুমথর এর Thinking Architecture এর অনুবাদ প্রচেষ্টা। আপাতত কিছু লাইন অনুবাদ না ক’রেই রেখে দিচ্ছি। যুতসই অনুবাদ না করতে পারার জন্য। অথবা যেটা খসড়া অনুবাদ করেছি সেটার থেকে ইংরেজীটাই ভাল লাগছে ব’লে। যদি কেউ এই অনুবাদ প্রচেষ্টা পড়ে থাকেন তাদেরকে অনুরোধ করছি সমালোচনা করার জন্য। যে অংশগুলো ইংরেজীতে আছে সেগুলোর অনুবাদে পরামর্শ দেওয়ার জন্য।)

স্থাপত্য নিয়ে ভাবনা
Thinking Architecture


A way of looking at things
দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৮৮

হারানো স্থাপত্যের খোঁজে
In search of the lost architecture

স্থাপত্য নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মানসপটে কিছু ছবি ভেসে ওঠে। যাদের বেশির ভাগই স্থপতি হিসেবে আমার শিক্ষা আর কাজের সাথে সম্পর্কিত। এত বছর ধরে আমার অর্জিত পেশাগত জ্ঞান তারা ধারণ করে। তাদের কারো কারো মধ্যে থাকে আমার ছোটবেলার স্মৃতি। স্থাপত্যকে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই একটা সময় আমি স্থাপত্যের  সংস্পর্শে এসেছি। কখনো কখনো আমি যেন অনুভব করতে পারি হাতে ধরা বিশেষ কোনো দরজার হাতলকে। যে হাতলটা কোনো একটা ধাতু দিয়ে তৈরী চামচের উল্টো দিকের মতো।

আমার এক চাচীর বাগানে ঢোকার দরজাতে ছিল এই হাতলটা। আজো ঐ দরজার হাতল আমার মনে বিচিত্র ধরণের মুড আর গন্ধের কোনো জগতে ঢোকার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে আমার পায়ের নিচের নুড়ির শব্দ। মসৃণ করা ওক কাঠের সিড়িঘরের দৃপ্তি। অন্ধকার করিডোর দিয়ে এগিয়ে বাড়ির একমাত্র আলোকিত ঘর- রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমি যেন শুনতে পাই ভারি মূল-দরজার বন্ধ হওয়ার শব্দ।

স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ে, একমাত্র এই ঘরের সিলিংই যেন সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে যেত না। গাঢ় লাল রঙের ছয়কোণা মেঝের টালি ছিল নিখুত ভাবে লাগানো। এমনকি তার জোড়াগুলোও বোঝা যেতো না। পায়ের নিচে খুব শক্ত কিছুর উপস্থিতি টের পেতাম। আর কাপবোর্ড থেকে পেতাম তেল চিটচিটে একটা গন্ধ।

পুরোনো আর দশটা রান্নাঘরের মতই ছিল এর সবকিছু। চোখে লাগার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। হয়তো এর এই অতি সাধারণত্বের জন্য এর স্মৃতি আমার ভেতরে র’য়ে গেছে। আমার রান্নাঘরের ধারণা তাই এই ঘরটির আবহের সাথে মিলে যায়।

Now I feel like going on and talking about the door handles which came after the handle on my aunt’s garden gate, about the ground and the floors, about the soft asphalt warmed by the sun, about the paving stones covered with chestnut leaves in the autumn, and about all the doors which closed in such different ways, one replete and dignified, another with a thin, cheap clatter, others hard, implacable and intimidating.

আমার মতে, এই ধরণের স্মৃতিতেই থাকে স্থাপত্যের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা। স্থপতি হিসেবে এই সব স্মৃতির ভেতরেই আমি খুঁজে ফিরি স্থাপত্যের আবহ আর প্রতিচ্ছবি।

বিল্ডিং ডিজাইন করার সময় আমি অনবরত আমার পুরোনা ছাড়া-ছাড়া স্মৃতির ভেতর ঘোরাফেরা করি। ভাবতে থাকি স্মৃতির কোনো একটা অবস্থার স্থাপতিক দিক। আমার উপর তার কি প্রভাব পড়েছিল সেটা মনে করতে চেষ্টা করি। সবকিছুরই যেন একটা নির্দিষ্ট জায়গা আর ধরণ ছিল। তাদের স্বাভাবিক উপস্থিতি প্রাণবন্ত ক’রে তুলতো সেই স্থানকে। আমি এই স্মৃতিগুলোর সাহায্য নিতে চেষ্টা করি। যদিও আমি বিশেষ কোনো ধরণ নির্দেশ করতে পারি না, তবু যেন একটা পূর্ণতা আর মায়ার ছোঁয়া পাই। আমার মনে হ’তে থাকে – এমনটা আমি আগে কোথাও দেখেছি। অথচ আমি নিশ্চিত জানি, এর সবই নতুন। অন্যরকমও। পুরোনো কোনো স্থাপতিক কাজের সাথে এর এমন কোনো সংযোগ নেই যা স্মৃতিকাতরতার গোপনীয়তাকে ফাঁস ক’রে দিতে পারে।

ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরী
Made of materials

জোসেফ বয়োস এবং ‘আর্টি পভেরা গ্রুপ’ এর কাজ আমার কাছে যেন অনেককিছু প্রকাশ করতে চায়। তারা যেভাবে কোনো ম্যাটেরিয়ালকে সূক্ষ্ণ এবং বুদ্ধিদিপ্ত ভাবে ব্যবহার করেছে তা আমাকে মুগ্ধ করে। It seems anchored in an ancient, elemental knowledge about man’s use of materials, and at the same time to expose the very essence of these materials which is beyond all culturally conveyed meaning.

আমার কাজে আমি ম্যাটেরিয়ালকে এই ভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করি। যদিও ম্যাটেরিয়াল নিজে কাব্যিক নয়, তবুও স্থাপত্যের কোনো বস্তুতে/কাজে তা কাব্যিক হ’য়ে উঠতে পারে, যদি স্থপতি তাদের জন্য কোনো অর্থপূর্ণ অবস্থা তৈরী করতে সমর্থ হয়।

The sense that I try to install into materials is beyond all rules of compositions, and their tangibility, smell and acoustic qualities are merely elements of the language that we are obliged to use. Sense emerges when I succeed in bringing out the specific meanings of certain materials in my buildings meanings that can only be perceived in just this way in this one building.

এই লক্ষ্যে কাজ ক’রতে হ’লে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে প্রশ্ন ক’রতে হবে- কোনো একটা বিশেষ আর্কিটেকচারাল কনটেক্সটে নির্দিষ্ট কোনো ম্যাটেরিয়াল কী অর্থময়তা তৈরী ক’রতে পারে তা নিয়ে। এই সব প্রশ্নের সুচারু উত্তর ম্যাটেরিয়ালের স্বাভাবিক ব্যবহার এবং তাদের নিজস্ব আবেদন সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্যকে আরো উজ্জ্বল ক’রে তোলে।

এ কাজে আমরা সফল হ’লে স্থাপত্যে ম্যাটেরিয়াল উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত হ’য়ে উঠবে।

বিষয়ের ভেতরে কাজ করা
Work within things

যোহান সেবাসটিয়ান বাখ্ এর সংগীত সম্পর্কে বলা হয়, এর “স্থাপত্য”ই (বাংলাতে সংগীতের আর্কিটেকচারকে সংগীতের কাঠামো বলা যায় কি?) এর সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক। খুব সহজ আর স্পষ্ট (clear and transparent) এর গঠন। তার কম্পোজিশন শোনার সময় এর সূক্ষ্ণ মেলোডিক, হারমোনিক এবং রিদমিক্যাল অংশগুলো আলাদা করা যায়, পুরো কম্পোজিশনের অনুভূতিকে অক্ষুন্ন রেখেই। এর সম্পূর্ণতাই এর অংশগুলো কে ফুটিয়ে তোলে। এর গঠন খুব পরিস্কারভাবে বোঝা যায়। and if we trace the individual threads of the musical fabric it is possible to apprehend the rules that govern the structure of the music.

নির্মাণ এমন একটা শিল্প (আর্ট) যা বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে একটা অর্থপূর্ণ সম্পূর্ণতা তৈরী করে। মানুষের তৈরী করা ইমারতগুলো তাদের নির্মাণ সামর্থের বহিঃপ্রকাশ। আমার মতে, স্থাপত্য নিদর্শনের প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর নির্মাণ কার্য। যথাযত উপাদান সংগ্রহ আর সমন্বিত করার পরই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থাপত্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

I feel respect for the art of joining, the ability of craftsmen and engineers. I am impressed by the knowledge of how to make things, which lies at the bottom of human skill. I try to design buildings that are worthy of this knowledge and merit the challenge to this skill.

খুব গুছিয়ে নির্মিত কোনো কিছু দেখে আমরা যদি বুঝতে পারি, সেটা নির্মাণ ক’রতে কতটা যত্ন আর দক্ষতার দরকার পড়েছিল তাহলে প্রায়সই বলে ফেলি, “এটা করতে ব্যাপক খাটুনি গেছে” (a lot of work went into this.) কাজই যে সাফল্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ- আমাদের এই ধারণা আমাদেরকে শিল্পকর্ম আর স্থাপত্যকর্মের মূল-ভাবনা/অনুধ্যানের শেষ সীমায় পৌছে দেয়। যে উদ্যোগ আর দক্ষতা দিয়ে আমরা তাদেরকে গ’ড়ে তুলি তা কি তাদের নিজস্বতা/চরিত্র তৈরী করে? আমার মনে দাগ কাটা কোনো স্থাপত্যকর্ম কখনো কখনো আমাকে এমনটাই ভাবতে প্ররোচিত করে, যেমনটা করে কোনো গান, সাহিত্য বা চিত্রকর্ম।

ঘুমের নিরবতার জন্য
For the silence of sleep

সংগীত আমার খুব ভাল লাগে। মোজর্ট’র পিয়ানো কনসার্টের ধীর নড়াচড়া, জন কোল্টরেনের ব্যালাড কিমবা কোনো গানে মানুষের গলার স্বর সবই আমাকে আলোড়িত করে।

মানুষের সুর, তাল আর লয় তৈরীর স্বক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে।

কিন্তু সুর, তাল আর লয়ের উল্টো জিনিসও শব্দের জগতে আছে। আছে অনৈক্য আর কেটে যাওয়া ছন্দ। আছে টুকরো টুকরো আর শব্দের গুচ্ছ। আছে একেবারেই বাস্তবিক শব্দ বা  হট্টগোল (noise)। সমসাময়িক সংগীতে এর সবগুলো নিয়েই কাজ হচ্ছে।

সমসাময়িক সংগীতের মত সমসাময়িক স্থাপত্যও এতটা মৌলিক হওয়া উচিৎ। কিন্তু তার একটা সীমা আছে। Although a work of architecture based on disharmony and fragmentation, on broken rhythms, clustering and structural disruptions may be able to convey a message, as soon as we understand its statement our curiosity dies, and all that is left is the question of the building’s practical usefulness.

স্থাপত্যের নিজেরও একটা জগত আছে। জীবনের সাথে এর বিশেষ একটা দৃশ্যমান সম্পর্ক আছে। প্রথম অবস্থায় একে আমি কোনো বক্তব্য বা প্রতীক হিসেবে ভাবি না;  ভাবি একটা মোড়ক বা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে, যাকে ঘিরেই জীবনের বোয়ে চলা; যেন একটা সংবেদনশীল আধার যার ভেতরে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, যায় কাজে মনোযোগ দেওয়া, শোনা যায় ঘুমের নিরবতার সুর।

প্রারম্ভিক প্রতিশ্রুতি / প্রথম অবস্থার অঙ্গিকার
Preliminary promises

কোন নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর স্থাপত্য তার বাস্তব অবস্থান (concrete place) পায়। যে জায়গাতে এটা দাড়িয়ে থাকে। যে জায়গা থেকে স্থাপত্য প্রকাশিত হ’য়ে ওঠে। বাস্তব জগতে এখনো নিজের অবস্থান খুঁজে পায়নি এমন কোনো নির্মিতব্য স্থাপতিক কাজের জন্য তৈরী করা ড্রয়িং ঐ কাজের প্রকাশিত হওয়ার যে প্রচেষ্টা তার প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কোনো বিল্ডিং যে আলোকপ্রভা (aura) নিয়ে হাজির হয়, স্থাপতিক ড্রয়িং তার যতটা সম্ভব কাছাকাছি কিছু প্রকাশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ড্রয়িঙের প্রভাবে আমাদের মনে প্রকৃত বিল্ডিংটার না থাকার হাহাকার বেজে ওঠে। যার ফলে যে কোনো ড্রয়িঙে থাকা অসম্পূর্ণতার ব্যাপারে আমাদের ভেতরে একধরণের সচেতনতা তৈরী হয়। মনে কৌতুহল জাগে ড্রয়িঙের হাজির করা বাস্তবতার প্রতিশ্রুতির প্রতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির যদি আমাদের মনকে নাড়া দেয়ার ক্ষমতা থাকে তাহলে আমাদের মনে জেগে ওঠে তা বানিয়ে ফেলার উদ্দীপনা।

মোড়কবাধা বাস্তুতে থাকা সূক্ষ্ণ ছিদ্র
Chinks in sealed objects

মানুষের হাত দিয়ে গ’ড়ে ওঠে যে বিল্ডিং তা তৈরীর সময় তার ছোট ছোট অংশগুলোকে জোড়া লাগাতে হয়। মোটা দাগে ব’ললে, পরিসমাপ্ত কোনো কিছুর গুণমান নির্ভর করে তাতে থাকা জয়েন্টগুলোর গুণমানের উপর।

ঐতিহ্যগতভাবে ভাস্কর্যে জয়েন্টের ধরণ এবং বিভিন্ন অংশ সংযুক্ত করার ব্যাপারটা যতটা পারা যায় কমিয়ে রাখা হয়, যেন সামগ্রিক গড়নটা ঠিকমত বোঝা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় রিচার্ড সিয়েরা’র স্টিলের তৈরী ভাস্কর্যগুলোর কথা। যেগুলো দেখলে মনে হয় তারা যেন প্রাচীন কালের মতই কোনো একখন্ড কাঠ বা পাথর দিয়ে তৈরী। ১৯৬০ এবং ৭০ এর দশকের শিল্পীদের কাজে সবথেকে সহজ আর স্পষ্টজয়েন্টের ব্যাবহারই দেখা যায়। Beuyes, Merz and others often used loose setting in space, coils, folds and layers when developing a whole from the individual parts.

The direct, seemingly self-evident way in which these objects are put together is interesting. There is no interruption of the overall impression by small parts which have nothing to do with the object’s statement. প্রয়োজনীয় ডিটেইলগুলো আমাদের সামগ্রিক ধারণাটা থেকে আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যায় না।

প্রতিকের উর্ধ্বে
Beyond the symbols

কাজের লোকের কাছে কোনকিছুই ফেলনা নয়। তারা সবকিছুই চালিয়ে দিতে পারে। স্থপতি ভেঞ্চুরি ব’লতেন, “মূলধারার প্রায় সবই সঠিক”। আর আমাদের এই সমসাময়িক সময় যাদের উপর খুব একটা প্রসন্ন নয় তাদের মতে কোনকিছুই আর ঠিকঠাক মত চলছে না। কথাগুলো কখনো পরষ্পর-বিরোধী বাস্তবতার বিপরীত, আবার কখনোবা পরষ্পর-বিরোধী মতামতের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। আমরা দ্বন্দ্বের সাহচর্যে বসবাস ক’রতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। তার যথেষ্ট কারণও আছে। প্রথা ভাঙতে থাকে, সেইসাথে সাংস্কৃতির চরিত্রও। অর্থনীতি আর রাজনীতিজাত অস্থিরতা/গতিময়তা খুব কম লোকই বুঝে উঠতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসে আরো পরে। সবকিছুই অন্যকিছুতে মিশে যায়। গণ-যোগাযোগের হাত ধ’রে গ’ড়ে ওঠে প্রতীকের এক কৃত্রিম জগৎ। যেখানে স্বেচ্ছাচারিতা চলতেই থাকে।

যে অবস্থায় আমাদের নিজস্ব চৌহদ্দির বাইরের যে কোনো বিষয়কে অস্পষ্ট, ঝাপসা অথবা খানিকটা অবাস্তব ব’লে মনে হয় তাকে উত্তর-আধুনিক জীবন বলা যেতে পারে। দুনিয়াটা একগাদা প্রতীক আর তথ্যে ভরপুর। কোনো একজনের পক্ষে এই প্রতীক আর তথ্যগুলো কী ব’লতে চাচ্ছে তার সবটা বোঝা সম্ভব হয় না। কখনো কখনো কেউ হয়তো অন্য কাউকে নির্দেশ করে। প্রকৃত বাস্তবতা থাকে ঘোমটার/পর্দার আড়ালে। কেউই তাকে দেখতে পারে না।

তারপরও আমি মনে করি প্রকৃত বাস্তবতা ব’লে আসলেই কিছু আছে, তা যতই ভঙ্গুর হোক না কেন। মাটি আছে, আছে পানি। সূর্যের আলো আছে। আছে ভূমিতল আর তরুরাজি। মানুষের তৈরী করা কল-কবজা, যন্ত্রপাতি কিমবা বাদ্যযন্ত্রও আছে। which are what they are, which are not mere vehicles for an artistic message, whose presence is self-evident.

When we look at objects or buildings which seem to be at peace within themselves, our perception becomes calm and dulled. The objects we perceive have no message for us, they are simply there. Our perceptive faculties grow quiet, unprejudiced and unacquisitive. They reach beyond signs and symbols, they are open, empty. It is as if we could see something on which we cannot focus our consciousness. Here, in this perceptual vacuum, a memory may surface, a memory which seems to issue from the depths of time. Now our observation of the object embraces a presentiment of the world in all its wholeness, because there is nothing that can be understood.

দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ উপকরণের মধ্যে একধরণের শক্তি আছে। যথেষ্ট সময় ধ’রে তাদের দিকে না তাকালে যা ঠিক ধরা যায় না। এডওয়ার্ড হপার্সের আঁকা চিত্রগুলো যেন আমাদেরকে সেটা মনে করিয়ে দেয়।

পরিসমাপ্ত ল্যান্ডস্কেপ
Completed landscapes

শরীরের ভেতরের টানাপোড়েন
The tension inside the body

স্থপতিদের তৈরী করা সমস্ত ড্রয়িঙের মধ্যে ওয়ার্কিং ড্রয়িংই আমার সবচেয়ে পছন্দের। তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং সুনির্দিষ্ট। কল্পিত বস্তুকে রূপ দেয় যে নির্মাণ-শ্রমিকেরা, তাদের জন্যই তৈরী এই ড্রয়িং। লোকজন চাইলেই এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। প্রজেক্ট ড্রয়িঙের মতো তারা কাউকে সম্মত বা মুগ্ধ করার চেষ্টা করে না। তারা যেন বলে, “এটা (বিল্ডিংটা) এমনই দেখাবে/হবে।”

ওয়ার্কিং ড্রয়িং এ্যানাটমি (শরীর সংস্থান বিদ্যা) ‘র ড্রয়িঙের মত। জোড়া লাগানোর কৌশল, লুকানো জ্যামিতি, ম্যাটেরিয়ালের/বস্তুর ঘর্ষণ, ছেড়ে দেওয়া আর ধ’রে রাখার অভ্যন্তরীন শক্তি/বল, মানুষের তৈরী করা বস্তুতে লীন হওয়া মানুষের কাজের চিহ্নের মতো যে গোপন অন্তর্গত টানাপোড়েনগুলোকে সম্পন্ন স্থাপতিক নির্মাণ লুকিয়ে রাখতে চাই, তা প্রকাশ করে দেয় এই ওয়ার্কিং ড্রয়িংগুলো।

Kassel এর Documenta Exhibition –এ একবার পার কিরকেবি (Per Kirkeby) বাড়ির মত দেখতে ইটের একটা ভাস্কর্য গড়েছিলেন। যে বাড়িতে  ঢোকার মতো কোনো দরজা ছিল না। এর ভেতরটা ছিল অনভিগম্য আর লুকানো। গোপনীয় এই অভ্যন্তরভাগ ভাস্কর্যটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে যোগ করেছিল এক অদৃশ্য রহস্যময় গভীরতা।

আমি মনে করি, একটা বাড়ির লুকানো কাঠামো আর নির্মাণশৈলী এমন ভাবে হওয়া উচিৎ যাতে ক’রে বিল্ডিংটির ভেতরের টানাপোড়েন আর কাঁপুনি তার বহিরঙ্গে কোনো ভাবে প্রকাশ পায়। যেমন ভাবে তৈরী হয় বেহালা। আর আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় সজীব প্রকৃতির (natural body) কথা।

অপ্রত্যাশিত সত্য
Unexpected truth

ছোটবেলায় আমি কবিতাকে খানিকটা অস্পষ্ট রূপক আর সংকেত দিয়ে রাঙানো এক ধরনের মেঘ হিসেবে কল্পনা করতাম। ব্যাপারটা উপভোগ্য হলেও দুনিয়ার বাস্তব চিত্রের সাথে তাকে মেলানো কঠিন। স্থপতি হিসেবে আমি বুঝতে শিখেছি যে,  কবিতার এই অর্বাচিন সংঙ্গার উল্টোটাই বরং সত্যের কাছাকাছি।

(আংশিক)