যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৬

অনেকের মতো আমিও নানা ধরণের সমাবেশ নিয়ে চিন্তিত এখন। চার/পাঁচ দিন পরপর একবারের জন্য হ’লেও আমাকে বাজারে যেতে হচ্ছে। সেখানে যতটা ভীড় দেখছি সেটা চিন্তা বাড়াচ্ছেই। বাসার কাছের সুপার মলে যাচ্ছি সেখানেও খুব একটা আলাদা কিছু দেখছি না। সেখানেও অনেক মানুষ।

আমাদের দেশটাই আসলে এমন। আমাদের সব জায়গাতেই মানুষের ভীড় বেশি। সেটা শুধু রাস্তাঘাট, হাসপাতাল কিমবা বাইরের কোনো জায়গাতে তা নয়। বাড়িতেও ভীড় কি কম? আমাদের কত শতাংশ বাসাতে প্রতিটা মানুষের জন্য একটা ক’রে ঘর আছে? ধারণা করি সেটা ২০ শতাংশের বেশি নয়। আমার ধারণা সঠিক তথ্যের কাছাকাছি নাও হ’তে পারে। কিন্তু অনেক বসাতেই যে ৫/৬ ফুট দূরত্ব মেনে মানুষ বাস করারই সুযোগ নেই সেটা বাস্তবতা। ২০১৩/১৪ এর দিকে সম্ভবত ডেইলিস্টারে একটা ফিচার দেখেছিলাম, যেটাতে বলা ছিলো যে একটা ১২০ বর্গফুটের মতো ঘরে ১৩ জন গার্মেন্টসকর্মী থাকেন।

পরিবারের একজন মানুষকে যদি মাঝে মাঝে বাইরে বের হ’তেই হয় (বাজার, ওষুধ কেনা এসব কাজে) তখন তার করোনা-ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। তার মাধ্যমে ছড়াতে পারে পরিবারের অন্যদের ভেতরে। কারণ সাধারণ হিসাবে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার সুযোগই আমাদের দেশের অনেকের নেই। এই অবস্থায় শুধু সাধারণ ছুটি আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ হয়তো পুরোপুরি কাজে দেবে না। আমাদের এটা নিয়ে আরো কিছু বিকল্প ভাবা দরকার।

জানতে পারলাম সুইডেন লকডাউন করেনি তার শহরগুলো। এমনকি রেস্তোরা, স্কুলও বন্ধ করেনি। কেউ কেউ বলছে বিলেতও শুরুতে এমনই আচরণ করেছিল। তার পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। সুইডেনের সামনেও সেটাই অপেক্ষা করছে। আবার হয়তো করছে না। কারণ সুইডেনের লোকজন রাস্তাতে থাকলেও সেখানে দূরত্ব মানছে। কাজের জন্য বের হচ্ছে। বিনোদনের জন্য নয়। আর সরকারী নির্দেশনা মানছে। ওদের সরকার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের বোঝাপড়া আছে। আমাদের এখানে সেটা যে ততটা নয় সেটাও বাস্তবতা। আবার চিকিৎসা ব্যবস্থা আর অর্থনীতিও একটা বড়সড় পার্থক্য গড়ে দেয়। লোক সংখ্যার ঘনত্ব তো বটেই। ওদের লোকসংখ্যার ঘনত্ব আমাদের থেকে অনেক অনেক কম।

আমার ভেতরে যে ইনট্যুশন কাজ করছে তা বলছে, দেশে যে ভাবে সাধারণ ছুটি চলছে তাতে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়তো যাবে না। আমি নিজেও তো এই দেশেরই লোক। এভাবে হয়তো কেউ ১০ দিন চলতে পারবে। কেউ হয়তো দুই মাস। কিন্তু ৪/৫ মাস চ’লতে পারবে ব’লে মনে হয় না। আমাদের আরো কিছু করা দরকার। জানি না তা কী? তবে আমরা যতটা করছি তা এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়… বিশেষ ক’রে বাংলাদেশে… বিশেষ ক’রে আমাদের বর্তমান বাস্তবতায়…

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৩

হয়তো নাগরিক হ’লে ভাবনার থেকে দুর্ভাবনাই বেশি ক’রে গ্রাস করে। কারণ নাগরিক জীবনে নিশ্চয়তার স্বপ্ন যতটা থাকে তার থেকে অনেক বেশি থাকে আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙ্ক্ষা অনেক কিছু অর্জনের, ম্যাটেরিয়ালিস্টিক আর ননম্যাটেরিয়ালিস্টিক উভয়ই। অথচ নাগরিক হিসেবে আমরা যে চার্টার লিখে রাখি তাতে সুযোগের সাম্যতার বিষয়টা বেশ ফুলিয়ে ফাপিয়ে লেখা। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে আমরা জানতে থাকি আমাদের গড়া ব্যবস্থাগুলো বড্ড প্রতিযোগিতামূলক। সবার জন্য সব কিছুর সুযোগ সেখানে নেই। তখনই যোগ্যতার প্রশ্ন চ’লে আসে আমাদের সামনে। যোগ্যতা তৈরীর কারখানা যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে সবার জন্য প্রবেশের সমান সুযোগ আবার নেই। হয়তো কাগজে কলমে আছে। অর্থাৎ অনুশাসনের বইয়ে। আর বাস্তবতা অনেকটাই অন্য রকম গল্পের পসরা নিয়ে হাজির হয়।

আমি, আমরা দেখি মূলত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাকরীর জন্য পথে নেমে আসছে; তাদের নানা দাবি দাওয়া। উদ্যোগতা আর ব্যবসায়ীরা ব’লছেন, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জানাশোনার মান সন্তোষজনক নয়। ব্যবসায়ীরা তাই তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কখনো ভারত, কখনো শ্রীলঙ্কার লোকজন খুঁজে আনছেন। পরিসংখ্যানও ব’লছে গেলো বছর ১০ বিলিয়ন মার্কিন-ডলারের বেশি অর্থ ভারতে রেমিটেন্স হিসেবে গিয়েছে [১][২]। আর আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস ক’রে আসা তরুণেরা কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। সুযোগের সাম্যতা আর যোগ্যতার মুখোমুখি সংঘর্ষ। জানি না কে জিতে আসবে শেষে।

তবে দৃষ্টিসীমায় যতটা দেখতে পারছি, তাতে বুঝি সব কিছু ব্যবসায়ীদের দখলে যাবে। সরকারও আজ বড্ড বেশি ব্যবসায়ী-বান্ধব। সে সারা পৃথিবীতেই। ভোক্তা-বান্ধব ব’লে বোধহয় কোনো শব্দবন্ধই নেই। অথচ ব্যবসায়ী আর কয়টা লোক? ভোক্তাই তো বেশি। রণদা প্রসাদ সাহা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, কিন্তু আমরা বাঙালিরা তাকে ব্যবসায়ী ব’লে মনে রেখেছি কমই। সমাজ হিতৈষী ব’লেই চিনেছি তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানিদের হাতে তাঁর এবং তাঁর ছেলের একসাথে নিহত হওয়ার এতগুলো বছর পরও আমাদের সেই চেনাটা একটুও পাল্টে যায়নি। লোকটা বেশ কিছু স্কুল কলেজ হাসপাতাল গড়েছিলেন ব’লেই হয়তো। আজকের দিনেও অনেকেই এসব গড়ছেন। দেশে আজ শতাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। কতগুলো বেসরকারী হাসপাতাল আর ক্লিনিং আছে তার হয়তো সরকারী পরিসংখ্যান থাকতে পারে নানা মন্ত্রনালয়ের খাতায়; অর্থ-মন্ত্রনালয়ের খাতায় তো অবশ্যই। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে উপকারে আসছে না তা নয়। তবু আমরা এদেরকে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ব’লেই জানছি বা ভাবছি। সরকারও হয়তো ভাবছে। তাই মাঝে মাঝেই ভ্যাট-ট্যাক্সের নানা প্রশ্ন শুনি।

ব্যবাসায়ীরা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে আজ খুব কমই সরকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। সেখানকার শিক্ষার মান যে কমে গিয়েছে বা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার কারিকুলাম যে আগানো হয়নি বা সেখানে ঠিক মতো ক্লাস হয়না – এমন তরো অভিযোগ কম নয়। আমাদের ব্যবসায়ীরা সেটা যে জানেন না তাও নয়। তারা তাদের ব্যবসার সুবিধার জন্য নিশ্চয় কোনো একটা ব্যবস্থা ক’রে নেন। সেটাই ব্যবসার প্রকৃতি। ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য মুনাফা উৎপাদন। অযোগ্য বা কম যোগ্যতার মানুষদেরকে নিয়োগ করেন ব্যবসায়ী শুধু মাত্র তখনই যখন তারা কিনা তাদের উত্তরাধিকারী। সব মিলিয়ে সাধারণ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস ক’রে আসা শিক্ষার্থীগুলোর জন্য কাজের বা চাকুরীর সুযোগ গিয়েছে ক’মে। ওরাই তাই ওদের মতো ক’রে দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হচ্ছে রাস্তায়।

আমাদের যে এতে দায় নেই তাও নয়। গত ৭/৮ বছর ধরেই পাবলিক পরীক্ষাতে প্রশ্ন ফাঁস হ’তে দেখেছি আমরা। প্রতিবাদ করেছি খুব কম লোকই। না-শিখে বা কম-শিখেও ভাল ফল পেতে দেখেছি আমরা বছরের পর বছর। এই ছেলেমেয়েরাই আজ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ ক’রে চাকরীর জন্য, বিশেষত বিসিএস ক্যাডারের চাকরীর জন্য, পথে পথে সময় কাটাচ্ছে। এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমার মথায় একটা কথাই বারবার আসে- অপচয়, ভয়াবহ অপচয়। কয়েক লক্ষ তরুণ এক-দুই হাজার চাকরীর জন্য তাদের জীবন থেকে গড়ে তিন থেকে চার বছর খরচ করছে। ব্যবসায়ীক বা সামাজিক সব হিসাবেই এই অপচয় যে ভয়ঙ্কর পরিণতি টেনে আনবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং আশংকাই বেশি।

অনিশ্চয়তার ভাবনা নিয়েই তাই এই নাগরিক জীবন যাপন। কিমবা নগরে যাপন করা জীবন।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.dailyindustry.news/bangladesh-becomes-4th-largest-remittance-source-india/

২. https://cpd.org.bd/cpd-study-bangladesh-indian-remittance-source/

 

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩২


রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ , আপনি সেই ১৯৮১ সালে লিখেছিলেন,

“কোনো কথা নেই-কেউ বলে না, কোনো কথা নেই-কেউ চলে না,
কোনো কথা নেই-কেউ টলে না, কোনো কথা নেই-কেউ জ্বলে না-
কেউ বলে না, কেউ চলে না, কেউ টলে না, কেউ জ্বলে না।

যেন অন্ধ, চোখ বন্ধ, যেন খঞ্জ, হাত বান্ধা,
ভালোবাসাহীন, বুক ঘৃনাহীন, ভয়াবহ ঋন
ঘাড়ে চাপানো-শুধু হাঁপানো, শুধু ফাঁপানো কথা কপচায়-
জলে হাতড়ায়, শোকে কাতরায় অতিমাত্রায় তবু জ্বলে না।”

আবার যেন তেমন সময় এসেছে। তার উপর এসেছে কথা বলার উপর খড়গ। ৫৭ ধারা। মিথ্যেকে মিথ্যে বলা যাবে না। বিজ্ঞানের কথা প্রচার করা যাবে না। সবাই এখন তাই বড্ড চুপচাপ। কিন্তু স্বভাব দোষে বাঙালিকে কিছু কথা বলতেই হয়। সে কথা তাই কাজের কথা নয় কোনো। বাজে কথাই বেশি। যেটুকু কাজের কথা হচ্ছে তাতে ভুলে ভরা। কারণ খুব সহজ। ভুল ধরিয়ে দেওয়া লোকেরা বেশিরভাগই জীবন নিয়ে পালিয়েছে। আর যারা পালাতে পারেনি তারা কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে।
আমাদের তাই আজকাল কোনো গল্প নেই। কোনো কবিতা নেই। কেউ কেউ হয়তো স্থূল কিছু ছড়া কাটেন কখনো কখনো। শ্রোতারা নিশ্চিত জানেন তার কোনো অর্থ নেই। তাই তা মনে রাখার বা আর একবার শোনার চেষ্টাও নেই। প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের পুথিও বাঙালি বারবার শুনতো। এযুগের ছড়া কেউ শুনতে চায় না। এযুগে কেউ গানও বাধতে চায় না। শেষ কবে আইয়ুব বাচ্চু কোনো নতুন গান বানিয়েছেন আমরা জানি না। গত ৮/১০ বছরে জনপ্রিয় হয়েছে এমন একটা বাংলা-গানের কথা মনে করতে পারি না। গান গেয়ে যারা জীবন নির্বাহ করেন তারা গান ছেড়ে দিতে পারেন-এটা মানা যায় এই পাইরেসির যুগে। কিন্তু শখের বসেও কেউ গান বাধছেন না-এটা মানতে কষ্ট হয়। সঞ্জীব চৌধুরী মরে গেছেন জানি। তবুও। সঞ্জীব দা, এই থমকে থাকা বাতাস আমাদের কারো ভাল লাগছে না… আমরা সবাই যেন মরে গিয়েও বেঁচে আছি।
অথবা আমরা সবাই একসাথে যেন কোনো মরণ-ব্যাধীতে ভুগছি। আমাদের তাই কোনো কথা নেই। আমাদের আজ ডিক্টেশন ছাড়া কথা বলা মানা। ডিক্টেশন ছাড়া কিছু করা মানা। সেসব ডিক্টেশন যে কারা দেয়- সে প্রশ্ন করা মানা। আমাদেরকে খুশি হ’তে বলা হচ্ছে। আমাদেরকে খাজনা দিতে বলা হচ্ছে। আমরা খুশি হচ্ছি, খাজনা দিচ্ছি। আমাদের খাজনার টাকা কোথায় যাচ্ছে তা জানতে চাওয়া যাবে না। আমাদের সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংক থেকে চুরি হয়ে যায়। আমরা তবুও অস্থির হ’তে পারি না। চোর যে এখনো পুরোটা চুরি করেনি!

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২৫

কী যেন বলতে চাই। হয়তো তোমাকেই। কিংবা হয়তো নিজেকেই। মনে হয় বলাটা দরকার। অথচ খঁজে পাই না বা ভেবে বের করতে পারি না কী সেটা। হয়তো খুঁজছি এখনো। অন্যরা হয়তো দ্রুতই খুঁজে পায়। আমার সব কিছুতেই দেরী হ’য়ে যায়।

আচ্ছা, এমন কি হ’তে পারে অন্যরা কিংবা বেশির-ভাগ মানুষই খোঁজার ব্যাপারটাই জানে না। ওরা তাই কেউ কিছু খোঁজে না। ওরা কিছু বলে না। শুধু শব্দ করে। প্রবোধ দেয় নিজেকেই। খুঁজে ফেরার ক্লান্তি জানতে হয় না ব’লে এক ধরণের সুখ নিয়ে ঘুমাতে যায়। আমার ঘুমে হয়তো সেই ধরণের সুখ নেই। 

কিন্তু ঘুম নিয়ে বা সুখ নিয়ে যে কথা বলতে চাই না তা জানি। অথচ এরাই চ’লে এলো কথায়। আরো অনেক কিছু, আরো অনেকে চলে আসে। আসে না শুধু সেই সব অব্যক্তরা যাদেরকে নিয়ে ভাবি নিশিদিন।

ভাবনা থাকলে তা তো প্রকাশ হ’য়ে যাওয়ার কথা। ভাবনার নিজের তাড়নাতেই। তাড়না আছে তা বুঝি, তবু অব্যক্ত দিন পার করি। হয়তো ভয়ে, হয়তো সংশয়ে। খানিকটা পূর্ব-অভিজ্ঞতার ফলে। যখন দেখেছি আমাদের ভাবনাগুলো আমাদেরকে কাছে টানেনি, বরং দূরত্ব বাড়িয়েছে। কখনোবা বিবাদ টেনে এনেছে।

এমন নয় যে আমরা ভাবনাজীবী। নিজেদের টিকে থাকার জন্য আমাদের ভাবনাগুলোকে তাই জিতিয়ে আনতে হবে এমনও নয়। তবু এই কৌতুককর ভাবনাগুলোই আমাদেরকে মুক ক’রে দেয় কখনো কখনো। আমাদের আর বলা হ’য়ে ওঠে না হৃদয়ের কথাগুলো। অথচ কথাগুলো যেন বলা যায় তার জন্য কত কত সংগোপন প্রকোষ্ঠ তৈরীর চেষ্টা ক’রে গেছি আমরা হাজার হাজার বছর ধ’রে। সকলে না জানুক, অন্তত কেউ যেন জানতে পারে। কিন্তু জাগতিক প্রকোষ্ঠগুলোর তৈরী যদিওবা শেষ হয়, তত দিনে আমাদের মনের প্রকোষ্ঠ থেকে কথাগুলো হারিয়ে যায়।

আমি/আমরা এক সময় ক্লান্ত শরীরে ঘুমাতে যাই। সে ঘুমে এক ধরণের শান্তি আছে ঠিকই। আবার তাতে এক ধরণের অব্যক্ত যন্ত্রণা যে নেই তাও নয়। 

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২৪

নতুন প্রতিভাবান লেখক দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ এই নয় যে আমরা প্রতিভার সংকটে ভুগছি। এর কারণ হলো লেখক যেন তৈরী না হয় তার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সৃষ্টিশীল কার্যক্রম প্রায় সবই বন্ধ ক’রে বা দমিয়ে রাখা হয়েছে। নাটক, সিনেমা, উপন্যাস, কবিতা সবই সরকার চাইলে নিষিদ্ধ করতে পারেন। করেনও। তার উপর এমন সব আইন ক’রে রাখা হয়েছে যে, বিভিন্ন ধরণের অনুভূতিতে আঘাত করার অযুহাত দেখিয়ে লেখককে কারাবন্দী করা যায়।

লেখকরা তো এই সমাজ থেকেই আসেন। সমাজ তাদের মর্মে মর্মে খুব গভীর ক’রে একটা জিনিস আজ শিখিয়ে দিচ্ছে। তা হলো, বোবার কোনো শত্রু নেই।

কথাটাতে খানিকটা বাস্তবতা থাকতে পারে। কিন্তু এতে সবটা বলা নেই। বলা নেই যে বোবার কোনো বন্ধুও নেই। আর বন্ধু ছাড়া মানুষ শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন মানুষ। বিচ্ছিন্ন মানুষ বড্ড দুর্বল। সে যদি কোনো সমাজ গ’ড়েও তোলে তা খুব পলকা হতে বাধ্য। আর বোবার সমাজে যেহেতু কথা থাকে না তাই নতুন ভাবনাও থাকে না। নতুন ভাবনা যদি না থাকে তবে প্রচেষ্টা, উদ্যম এসব যায় কমে। তাতে সমাজ স্থবির হ’য়ে পড়ে। সমাজ এগিয়ে যাওয়ার রসদ-শূন্য হ’য়ে পড়ে। পরিণতিতে বোবা-মানুষে গড়া সমাজ নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।

সক্রিয় নতুন লেখক দরকার আরো একটা কারণে। যারা নতুন ঘটনাগুলো নিয়ে লিখতে পারবেন। সেগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারবেন এই সময়ের মতো ক’রে। আবার পুরনো ঘটনাগুলোকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে হাজির করতে পারবেন। বা পুরনোকে প্রশ্ন করতে পারবেন। পুরনোকে প্রশ্নের মুখে দাড় না করানোটাও এক ধরণের বোবা থাকা। যার পরিণতিতে মানুষ পেছনে হটতে থাকে। সক্রিয় লেখক আমাদেরকে এটা মনে করিয়ে দেবেন। হতাশার কথা এমনটা ঘটতে দেখছি কম আজ-কাল।

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২২

কয়েকদিন আগে আমার এক বন্ধু ওর নিজের মতো হ’তে না পারার জন্য আক্ষেপ করছিলেন। খানিকটা বোধহয় হতাশ হ’য়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হচ্ছিলেন। বলছিলেন জড়িয়ে যাওয়ার কথা, তলিয়ে যাওয়ার কথা। যেমনটা আমরা প্রায় সবাই-ই যাচ্ছি। কিন্তু তা নিয়ে আমাদের তেমন একটা শঙ্কা নেই। যেমনটা আছে আমার ঐ বন্ধুর। কেন আছে- কে জানে? রবীন্দ্রনাথ কি জানতেন? যদি না জানতেন তাহলে এই কথাগুলো লিখলেন কেন ?

এ কী কৌতুক নিত্য-নূতন
ওগো কৌতুকময়ী!
যে দিকে পান্থ চাহে চলিবারে
চলিতে দিতেছ কই?
গ্রামের যে পথ ধায় গৃহপানে,
চাষিগণ ফিরে দিবা-অবসানে,
গোঠে ধায় গোরুবধু জল আনে 
শতবার যাতায়াতে-
একদা প্রথম প্রভাতবেলায়
সে পথে বাহির হইনু হেলায়,
মনে ছিল দিন কাজে ও খেলায়
কাটায়ে ফিরিব রাতে।
পদে পদে তুমি ভুলাইলে দিক,
কোথা যাব আজি নাহি পাই ঠিক,
ক্লান্তহৃদয় ভ্রান্ত পথিক
এসেছি নূতন দেশে।
কখনো উদার গিরির শিখরে
কভু বেদনার তমোগহ্বরে
চিনি না যে পথ সে পথের ‘পরে
চলেছি পাগলবেশে।”

কি জানি রবীন্দ্রনাথও হারিয়ে যাওয়ার ভয় পেয়েছিলেন কিনা। তবে কোনো কৌতুকময়ী যে পথ ভোলানোর তালে আছে সেটা ঠিক বুঝেছিলেন। সে কৌতুক যে নিত্য নতুন তাও আমাদের জানিয়ে গেছেন। আর তাই যে কৌতুকে রবীন্দ্রনাথ পদে পদে দিক ভুলেছিলেন, সেই কৌতুকে আমরা হয়তো নাও ভুলতে পারি। আবার ভুলতেও পারি। বরং ভোলাটাই স্বাভাবিক। আমাদের হারিয়ে যাওয়াটা তাই যেন এক-রকম অনিবার্য। কিংবা তাও নয়। যার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই সে হারিয়ে যাবে কোথায় ?

কাফকা বলেছিলেন, স্বাধীন হওয়ার কারণে তিনি হারিয়ে গেছেন। স্বাধীন হওয়ার পরিণতিতে এই যে হারিয়ে যাওয়া, কেমন সে হারিয়ে যাওয়া? তখনো কি কোনো অচেনা পথে পাগলবেশে ঘুরে ফিরতে হয়? নাকি পাগলেরাই শুধু ঘুরেফেরে? নাকি ঘুরতে ঘুরতেই মানুষ পাগল হয়? পাগল হ’য়ে যাওয়া কি এক ধরণের হারিয়ে যাওয়া নয়? মানুষ কি শেষ পর্যন্ত হারাতে পারে? মনে পড়ে, শহীদুল জহিরের কথা। যিনি লিখেছিলেন, “মানুষ কি কখনো পাগল হয়, অথবা পাগল না হ’য়ে কি মানুষ পারে?” মানুষকে পাগল হতেই হয়। অন্তত কখনো কখনো তো বটেই। তখন তাকে ঘুরতে হয় যত অচেনা পথে। মিলতে হয়, মিলাতে হয় নিজেকে অজানার সাথে। পরিণতিতে নিজেকে হারাতে হয়। যে কারণে আমরা, আমার বন্ধু সবাই হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজেদেরকে।

কিন্তু কতটা অনিবার্য এই হারিয়ে যাওয়া? অন্তত যখন আমরা প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু গ্রহণ করছি আমাদের চারপাশ থেকে। রাস্তা থেকে। দোকান থেকে। টেলিভিশন থেকে। ইউ-টিউব থেকে। সোশাল-মিড়িয়া থেকে। বন্ধুর কাছ থেকে। খবর থেকে। প্রপাগান্ডা থেকে। সাহিত্য থেকে। চুটকি থেকে। বিজ্ঞাপন থেকে। সম্ভব প্রায় সব কিছু থেকে। তাতে যতটা ঋদ্ধ হচ্ছি তার থেকে অনেক বেশি হচ্ছি প্রভাবিত। এদের দূরপণেয় প্রভাব আমাদেরকে যেন ক’রে তুলছে অন্য কেউ। তাতে আমাদের সমর্থনও থাকছে। আমরা ভাবছি এভাবেই সুখি হ’তে হয়। তাই দৌড়ে মরছি। ক্লান্ত হচ্ছি। তাই হয়তো একটু বিশ্রাম দরকার। দরকার নিজেকে, নিজের ভাবনাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটু অবসর। কারণ এই ভাবনাগুলোই যে আমাকে/আমাদেরকে একক ক’রে তোলে। ভাবনা আছে তো আমি আছি। ভাবনা নেই তো আমি নেই।

আবারো সেই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই ধার ক’রতে হচ্ছে।  ব’লতে হচ্ছে…

এ কী কৌতুক নিত্যনূতন
ওগো কৌতুকময়ী!
আমি যাহা-কিছু চাহি বলিবারে
বলিতে দিতেছ কই।
অন্তরমাঝে বসি অহরহ
মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,
মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ
মিশায়ে আপন সুরে।
কি বলিতে চাই সব ভুলে যাই,
তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,
সংগীতস্রোতে কূল নাহি পাই-
কোথা ভেসে যাই দূরে।”

রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে কি কম পাল্টে দিয়েছেন? বা দিচ্ছেন? আমার তো মনে হয়, যে একক লোকটা আমাদের/আমার গ’ড়ে ওঠাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু তার প্রভাব/লেখা যতটা পাল্টে দিয়েছে আমাদেরকে তার থেকে অনেক বেশি দিয়েছে/দেয় অনুপ্রেরণা- নিজেকে আবিস্কারের। যে অবিস্কারের পথ কখনো হয় না শেষ। প্রতিনিয়ত প্রভাবিত হওয়ার হাত থেকেও তাই আমাদের মুক্তি নেই। আমাদের গ’ড়ে ওঠা, হারিয়ে যাওয়া, নিজেকে হারিয়ে খোঁজা তাই চলতেই থাকে…

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২১

প্রতিদিন কার্বন পোড়াচ্ছি। পোড়ানোর ক্ষতি জেনে এবং স্বীকার করেই। জানি শক্তির রূপান্তর পরিবেশের ক্ষতি করেই। তবুও শক্তির রূপান্তর না ক’রে পারি না। ক্ষতির চেয়ে দৃশ্যত উপকার বেশি পাই ব’লে। এই বাড়তি উপকারের লোভেই ভুলে থাকি বা থাকতে চাই নিজের করা ক্ষতিকর কাজগুলো।

আমরা অনেকেই বলতে পছন্দ করি যে, আমরা জেনে শুনে কারো ক্ষতি করি না। এই কথাটা সত্যি হ’লে আমরা হ’য়ে যাই জ্ঞানহীন বা বেকুব বা মুর্খ। কারণ আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের ক্ষতি করছি। অন্য প্রাণী হত্যা করছি। পরিবেশের ক্ষতি করছি। নদীতে বাধ দিচ্ছি। পানিপ্রবাহের পথ পালটে দিচ্ছি। এর ক্ষতিকর দিকগুলো না জেনে দিচ্ছি কি? যদি না জেনেই দিয়ে থাকি তাহলে আমাদের অজ্ঞতাকে প্রকাশ করছি না কেন? অজ্ঞতা দিয়ে অপকর্ম ঢাকার কৌশলটা দারুন সফল আমাদের এই ধরিত্রী-জীবনে।

জীবিকার জন্য বিল্ডিং ডিজাইন করে যাচ্ছি প্রতিদিন। সেইসব বিল্ডিঙের বেশির ভাগই আমার চাওয়ার মতো হয় না। সেখানে আমার কোনো কথা থাকে না বললেই চলে। তবে সমাজের কথা, সময়ের কথা কিছুটা নিশ্চয় থাকে। সেই সব কথাদের কেউ কেউ যখন খুব নির্লজ্জ্ব হ’য়ে ওঠে তখন তাদেরকে লুকানোর চেষ্টা করি মাত্র। পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকা দুইটা বিল্ডিঙের মাঝে যে কোনো সম্পর্ক নেই সেটা আমরা জানি। নগ্ন ভাবেই জানি। অথচ সেটা লুকাতে চাই সৌন্দর্যের ছলনায়। আমাদের সমাজে আজ সামাজিকতা আছে কিন্তু কমিউনিটি নেই। আমাদের বিল্ডিঙেও তাই। সেখানে মানুষ আছে। কিন্তু মানুষের সহাবস্থান নেই। আমাদের কাজে সেই সহাবস্থান তৈরীর চেষ্টাও নেই। বরং আছে দূরত্ব তৈরীর চেষ্টা। আমাদের বিল্ডিং দিয়ে আমরা আমাদের জৌলুস প্রকাশ করি। কিন্তু লুকাতে চাই সেই জৌলুস তৈরীর উপায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি লুকানো যায়?

হয়তো যায় … হয়তো যায় না… তবে ডিস্টার্বড এর Façade গানটা শুনতে থাকি। মুগ্ধতা নিয়ে। বারবার… আউড়াতে থাকি…

For how long will you try?
How long until you walk away?
Your façade can’t disguise The fact that you’re in misery…

ঠিক যেন আমার করা বিল্ডিংগুলোর মতো। আমি শত চেষ্টা করেও আমার ব্যর্থতাগুলো যেন লুকাতে পারি না এদের শরীর থেকে। এরা কেউ যেন বাসস্থান নয়, যেন এক একটা কারাগার। এরা কারো জন্য ইনিস্টিটিউট হ’য়ে ওঠে না। হ’য়ে ওঠে না নীড়। বুঝি এ আমারই ব্যর্থতা। কিন্তু তাকে স্বীকার করা হ’য়ে ওঠে না। বরং দোষ চাপাই অন্যের ঘাড়ে। বলি, সব দোষ ক্লাইন্টের। বলি, ওরাই তো এমনটা চায়। এ যে আমার হেরে যাওয়া মন বলিয়ে নেয় তা নয়। এর মধ্যে সত্যও কম নেই। কিন্তু এর মধ্যে যে আমার যথেষ্ট সংগ্রাম নেই তাও তো সত্য।

এই সত্য যখন জানি, তখন কেমন ক’রে বলি – আমি কারো ক্ষতি করছি না? পরের প্রজন্ম তো ঠিকই বলবে, ওদের পৃথিবীটা নষ্ট ক’রে এসেছি আমি, আমরা। তখন কি কিছু বলার থাকবে? নাকি সেদিনও অজ্ঞতার আড়ালে গিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নেব?

 

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২০

এই যে সময়ের স্রোতে মিশে যাওয়া জীবন, তাতে কি আলাদা কোনো তরঙ্গ ওঠে? তার কোনো কোনো ঢেউকে কি আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়? যদি না যায়, সেই জীবনকে কি জীবন বলা যাবে? অর্থাৎ যে জীবন মহাস্রোতে হারিয়ে যায় তার কি কোনো গুরুত্ব থাকে? নাকি যে জীবন সময়ের স্রোতে নতুনতর কোনো তরঙ্গ তুলতে পারে না- সে বিস্মৃত হবেই? বিস্মৃতির ভয় মানুষকে কতটা তাড়িয়ে বেড়ায়? সম্ভোগের আকাঙ্ক্ষা যতটা তাড়িয়ে মারে তার তুলনায় কতটা?

তাড়নাহীন জীবন সুস্থিরতা ধারণ করলেও সুখি হয় কি? সে কি কখনো স্বস্তি পায় যদি সেই জীবনকে প্রকাশ করতে না পারে? যে জীবন মুখরিত হওয়ার সুযোগ পায় না, তা কি প্রকাশমুখ হয়? প্রকাশমুখ জীবন সময়কে ধারণ করে নাকি সময়ই ভর করে মুখরিত সময়ের প্রকাশে? কেমন হবে তার প্রকাশ মাধ্যম? ভাষা? ছবি? সুর? সংগীত? চলচিত্র? স্লোগান? মিছিল? ঝগড়া? তর্ক? হাতাহাতি? গোলাগুলি? সংঘর্ষ? ষড়যন্ত্র? সহানুভূতি? লেনদেন? ব্রান্ড? চাকচিক্য? ফ্যাশন? রং? মেলোডি ? অভিব্যক্তি? …

যা-ই হোক না কেন, জীবনকে প্রকাশিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেই হবে। নতুবা সে জীবনকে চিনে নেওয়া যাবে না। আর এই প্রকাশিত হওয়ার পথে সময়ের সাথে তার সখ্যতা যদি গ’ড়ে না ওঠে সে প্রকাশ সর্বাঙ্গিন হবে না। হয়তো সঠিকও হবে না। একটা সময়ের মানুষ যদি অন্য সময়ের সুরেই গেয়ে যায় শুধু নতুন সময় ব’লে আদতে কিছু থাকবে না। পুরোনো ধাচে নতুন ছবি যতই আঁকা হোক সে ছবি শেষ পর্যন্ত পুরোনো ছবিই। শুধু বক্তব্যে নতুনত্ব আনলেই হবে না, পালটাতে হবে তার ভাষাও। ভাষাকে আটকে রাখা যাবে না। যাবে না তাকে সীমাবদ্ধ করা। আর তাই তুলতে হবে নতুন তর্ক। করতে হবে ঝগড়া। চাই নতুন অস্ত্র। পুরোনো হাতাহাতি গোলাগুলিতে আজ আর সভ্যতার চিহ্ন খুঁজে পাই না। পাই শুধু বর্বরতার ঝনঝনানি। চাই নতুন ঝঙ্কার। চাই নতুন তরঙ্গ। চাই নতুন জীবন।

অন্যের জীবন যাপন করে আর সুখ কই?

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ১৯

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। সেই কথাটাকে আরো একটু বাড়িয়ে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন – কিন্তু বাঙালির উপর বিশ্বাস রাখা ভয়াবহ। এমতাস্থায় অন্য কোনো জাতির মানুষের উপর বিশ্বাস রাখার পরিণতি কি হতে পারে তাই ভাবি। অন্য জাতির মানুষেরা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য? ইউরোপিয়রা? যারা নাকি দীর্ঘ সময় ধ’রে পৃথিবীটাকে শাসন করেছে। শাসনের নামে অগণিত মানুষ হত্যা করেছে। হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। মানুষের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি করেছে। কাউকে বলেছে নিগ্রো। কাউকে বা বলেছে ইন্ডিয়ান। আফ্রিকান… যদিও আসলে প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ লুন্ঠন আর নিজেদের আরাম-আয়েস নিশ্চিত করা। নিশ্চিত করা নিজেদের ভবিষ্যৎকে। সেই ইউরোপিয়দের উপর বিশ্বাস রাখা কি ঠিক হবে? ররীন্দ্রনাথ এ ব্যাপারে কিছু ব’লে গেছেন কিনা জানি না। তবে কখনো তাদের উপর বিশ্বাস রেখে তাদের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধী গ্রহণ করেন। আবার কখনো বিশ্বাস হারিয়ে তা বর্জনও করেন।

নিজেদের সুবিধা নিশ্চিতকল্পে ইউরোপিয়রা যে ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলে সেই ব্যবস্থাই বহাল রাখেন নেহেরু, জিন্নাহ, ম্যান্ডেলারা। মুজিবও তাই করেন। গান্ধিও শেষপর্যন্ত একজন আস্থাবান হিন্দু। নেহেরুর ধর্মে তেমন একটা আস্থা ছিল না বলেই ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ বইটাতে লিখেছেন। কিন্তু ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ব্যবস্থা আর আর্য শাস্ত্রের সংস্কার থেকে কি খুব বেশি বেরুতে পেরেছেন? ম্যান্ডেলা একজন ক্যাথলিক খ্রিস্টান। খ্রিস্টীয় পুজিতন্ত্রেই আস্থা রাখেন শেষ পর্যন্ত। আর মুজিব আস্থা রাখেন মুসলমানিত্বে। এই সব মানুষেরা কতটুকু আস্থা রেখেছিলেন মানুষের উপর- জানি না। তবে ব্যবস্থার উপর যে আস্থা রেখেছিলেন সেটা নিশ্চিত। আবার ব্যবস্থা থেকে প্রতারিতও হয়েছেন। তাই প্রতিবাদ করেছেন। পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন ব্যবস্থাতে। কতটা পেরেছেন সেটা অন্য প্রশ্ন।

এদিকে আমার এক সহকর্মীর অগাধ বিশ্বাস তার স্ত্রীর উপর। বিয়ের আগে তারা তিন মাস লিভ-টুগেদার করেছেন। তার আগে বারো বছর ধ’রে করেছেন প্রেম। সহকর্মী দাবি করেন তিনি তার স্ত্রীর সবকিছু জানেন। আবার তার স্ত্রীও নাকি তার সবকিছু জানেন। তারা নাকি আগে থেকেই বুঝে যেতে পারেন পরস্পরের পরবর্তী ক্রিয়াকান্ড। আমি সন্দেহ প্রকাশ করেছি স্বাভাবিক ভাবেই। তিনি দাবি করেছেন, বিশ্বাস ছিলো ব’লেই বারো বছর প্রেম করতে পেরেছেন। বিশ্বাস ছিলো ব’লেই বিয়ের আগে লিভ-টুগেদার করেছেন। আমি প্রশ্ন করেছিলাম লিভ-টুগেদার করার সময় তাদের বিয়ে করার দরকার পড়ল কেন? তাদের লিভ-টুগেদারে কি সমাজ আপত্তি জানিয়েছিল? তিনি বলেন সমাজ বা তার পরিবার নাকি কিছু বলেনি। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনা। জিজ্ঞেস করা সোভন হবে না ভেবে। তবু ভাবনা আসে – তারপরও তারা বিয়ে করলেন কেন? তাদের কারো ভেতরে কি বিশ্বাস কমতে শুরু করেছিল? নাকি ব্যক্তি-মানুষের থেকে সমাজের উপর বা ব্যবস্থার উপর মানুষের বিশ্বাসটা ভিত্তি পায় বেশি?

এক সময়ের দস্যু-দেশ জাপান রাতারাতি তাদের চরিত্র পালটে ফেলে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষেরা তা বিশ্বাসও ক’রে বসে। ভুলে যেতে চায় অতীত। কেন মানুষ এতটা বিস্মৃতিপ্রবণ? কেন মানুষ এতটা বিশ্বাসপ্রবণ? বিশ্বাসে বস্তু, ঋণ, সহযোগীতা, প্রযুক্তি – এইসব পাওয়া যায় ব’লে? কিন্তু এই মানুষেরা কি আসলেই পালটে যায়? এই সব মানুষের হাজার হাজার বছরের পুরনো চরিত্র কি আবার ফিরে আসতে পারে? ভাবতে ভয় হয়। যদিও জানি মানুষের থেকে স্বজাতি হত্যায় পারঙ্গম আর কোনো প্রাণীর নাম খুঁজে পাওয়া ভার। আবার সেই মানুষেই বিশ্বাস রাখার সবক সবখানে।

নাকি এই মানুষেরা অন্য মানুষ? যে মানুষে বিশ্বাস রাখা যায়? প্রাণী মানুষ থেকে এই মানুষদেরকে আলাদা করার উপায় কি?

আমার পিতা কখনোই ব্যবসায়ীদের উপর বিশ্বাস রাখেন না। বা রাখতে পারেন না। অনেকবার প্রতারিত হওয়ার দরুনই বোধহয়। আমাকেও তাই পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীদের উপর আস্থা না রাখার জন্য। সেই পিতাকে যখন প্রশ্ন রাখি, ব্যবসায়ী মোহাম্মদের উপর বিশ্বাস রাখা নিয়ে- তখন তেড়ে আসেন। আমিও পালিয়ে বাঁচি। শেষ পর্যন্ত বণিকের উপর আস্থা রাখা আর হয় না। যেমন হয়না ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির উপর আস্থা রাখা। মেনে নেই রাষ্ট্রনীতিকদের উপপাদ্য – বণিকের শাসনই সব থেকে ভয়াবহ। এই বণিকদের থেকে কেমন ক’রে আলাদা করি মানুষদেরকে? কেমন ক’রে?

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ১৮

কোনো এক দূর দেশে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখা মানুষে ছেয়ে গেছে আমার চারপাশ। কোন সে দূর দেশ- তার উত্তর একেক জনের কাছে একেকটা। কারণও বহুবিধ। কারো পছন্দ শীতের দেশ। কারোবা পছন্দ এমন দেশ যেখানে ধুলো-বালি আর কাদার ছড়াছড়ি নেই। কেউ কেউ খোঁজে স্রেফ অপারটিউনিটি। এইখানে তাদের আর ভাল লাগে না। কিমবা এই জীবনে তারা সন্তুষ্ট নয়। সন্তুষ্টির জন্য যতটা সম্মৃদ্ধির দরকার তার ছিটেফোটাও এখানে জোগাড় করা যায় না ব’লে। তাই এই মানুষগুলো ছুটতে থাকে। আমি এক রকম বাধ্য হ’য়েই দেখতে থাকি তাদের অস্থির ছোটাছুটি।

আমার এক বন্ধুকে দেখেছি সরকারী চাকরীর জন্য হাপিত্যেস করতে। সেই বন্ধু প্রথম সুযোগেই ছাড়লেন দেশ। অবশ্য সরকারী চাকরীটা নাকি এখনো ছাড়েননি। বাংলাদেশে এই সব ব্যবস্থা করা নাকি কোনো ব্যাপারই না। তবুও দেশটা আমার বন্ধু আর বন্ধু পত্নীকে ধ’রে রাখতে পারলো না। সরকারী চাকরীটা থাকলে নাকি ভাল। না থাকলেও কিছু যায় আসে না। ছুটিতে দেশে বেড়াতে আসলে এমনটাই বলেন তিনি।

দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করেছি এমন এক কলিগ, হঠাৎ ক’রেই চ’লে গেলেন দক্ষিণ গোলার্ধে। নিজের ইচ্ছা আর ভাইয়ের সহায়তায়। খুবই ধার্মিক এই মানুষটির ব্যাপারে আমার কৌতুহল ছিলো বেশ। আমাদের ইদানিং কালের ডিজাইন দেখে মাঝেমাঝে তার আপত্তির কথা জানাতেন। আমাদের কাজে নাকি প্রাইভেসিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আমি সেটা অকপটে স্বীকার ক’রে নিতাম। ফ্লাট বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা যে আমরা সচেতন ভাবেই করি সেটা তাকে বলতাম। প্রাইভেসি ব’লতে আমাদের বিবেচনাতে ভিজ্যুয়াল প্রাইভেসি তার গুরুত্ব হারিয়েছে সাউন্ড প্রাইভেসির কাছে-এটা শুনে আশ্চর্য হয়েছিলেন। সেই কলিগকে দেশ ছাড়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার ছেলে যদি ভিন-দেশে বড় হ’য়ে তার ধর্মকে অস্বীকার করে সেটা মানতে পারবেন কিনা। তিনি কিছু বলেন নি।

তখন তাকে আমার বাবার এক পুরোনো কলিগের কথা বলেছিলাম। যিনি দেশ ছেড়েছিলেন আমার একেবারে ছেলেবেলায়। আমার বাবার মতে অনেকের থেকে প্রতিভাবান ছিলেন তিনি। সেই তিনিই কিনা প্রায় বিশ বছর পর দেশে ফিরে এলেন। কারণ তার ছোট মেয়েটা নাকি কোনো এক আফ্রিকান-এ্যামেরিকানের সাথে একসাথে থাকা শুরু করেছে। এটা শুনে আমার কলিগ যে খানিকটা চিন্তিত হয়েছিলেন সেটা বুঝেছিলাম। পরে, নাহ… আমার ছেলে এমন কিছু করবে না, এই ব’লে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

আবার কাউকে কাউকে দেখি দেশ ছাড়লেও দেশের মায়া ছাড়তে পারেন না। বিদেশে গিয়ে টাকা জমাতে থাকেন। দেশে দ্রুত ফেরার স্বপ্ন নিয়ে। এক বন্ধুর কথা শুনি, তিনি খুব দরকারী কিছু না হ’লে নাকি কিছু কেনেন না। কী হবে কিনে? কয়েক দিন পর তো দেশেই ফিরে যেতে হবে এই ভাবনাতে। যদিও দেশে ফেরা যে কঠিন সেটা বলতে ভোলেন না। এই মানুষগুলোই বোধহয় সব থেকে কষ্টে থাকেন। সন্তানের একটা নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাদেরকে আটকে রাখে । নিজেদের জীবন আর তাদের যাপন করা হ’য়ে ওঠে না। অথবা এমন জীবনই তারা চান। যে জীবনে নিরাপত্তার আশ্বাস আছে, আছে স্বচ্ছলতা আর দেশে ফিরতে না পারার আক্ষেপ।

আর এক দলকে দেখি যারা শুধু ঘুরছে। যতটা পারছে উপভোগ করছে। সমস্ত পৃথিবীটাই যেন তাদের কাছে দেশ। ঘুরছে, দেখছে, শিখছে। আশার কথা, দিন দিন যেন এই দলটা ভারী হচ্ছে। এর বিপরীত একটা দলের সাথেও আমি পরিচিত। তারা পালাতে চান। যে কোনো খানে। যত দ্রুত সম্ভব। এরাও ঘুরছে। তবে উপভোগ করছে কিনা বুঝে উঠতে পারি না।