যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৬

অনেকের মতো আমিও নানা ধরণের সমাবেশ নিয়ে চিন্তিত এখন। চার/পাঁচ দিন পরপর একবারের জন্য হ’লেও আমাকে বাজারে যেতে হচ্ছে। সেখানে যতটা ভীড় দেখছি সেটা চিন্তা বাড়াচ্ছেই। বাসার কাছের সুপার মলে যাচ্ছি সেখানেও খুব একটা আলাদা কিছু দেখছি না। সেখানেও অনেক মানুষ।

আমাদের দেশটাই আসলে এমন। আমাদের সব জায়গাতেই মানুষের ভীড় বেশি। সেটা শুধু রাস্তাঘাট, হাসপাতাল কিমবা বাইরের কোনো জায়গাতে তা নয়। বাড়িতেও ভীড় কি কম? আমাদের কত শতাংশ বাসাতে প্রতিটা মানুষের জন্য একটা ক’রে ঘর আছে? ধারণা করি সেটা ২০ শতাংশের বেশি নয়। আমার ধারণা সঠিক তথ্যের কাছাকাছি নাও হ’তে পারে। কিন্তু অনেক বসাতেই যে ৫/৬ ফুট দূরত্ব মেনে মানুষ বাস করারই সুযোগ নেই সেটা বাস্তবতা। ২০১৩/১৪ এর দিকে সম্ভবত ডেইলিস্টারে একটা ফিচার দেখেছিলাম, যেটাতে বলা ছিলো যে একটা ১২০ বর্গফুটের মতো ঘরে ১৩ জন গার্মেন্টসকর্মী থাকেন।

পরিবারের একজন মানুষকে যদি মাঝে মাঝে বাইরে বের হ’তেই হয় (বাজার, ওষুধ কেনা এসব কাজে) তখন তার করোনা-ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। তার মাধ্যমে ছড়াতে পারে পরিবারের অন্যদের ভেতরে। কারণ সাধারণ হিসাবে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার সুযোগই আমাদের দেশের অনেকের নেই। এই অবস্থায় শুধু সাধারণ ছুটি আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ হয়তো পুরোপুরি কাজে দেবে না। আমাদের এটা নিয়ে আরো কিছু বিকল্প ভাবা দরকার।

জানতে পারলাম সুইডেন লকডাউন করেনি তার শহরগুলো। এমনকি রেস্তোরা, স্কুলও বন্ধ করেনি। কেউ কেউ বলছে বিলেতও শুরুতে এমনই আচরণ করেছিল। তার পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। সুইডেনের সামনেও সেটাই অপেক্ষা করছে। আবার হয়তো করছে না। কারণ সুইডেনের লোকজন রাস্তাতে থাকলেও সেখানে দূরত্ব মানছে। কাজের জন্য বের হচ্ছে। বিনোদনের জন্য নয়। আর সরকারী নির্দেশনা মানছে। ওদের সরকার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের বোঝাপড়া আছে। আমাদের এখানে সেটা যে ততটা নয় সেটাও বাস্তবতা। আবার চিকিৎসা ব্যবস্থা আর অর্থনীতিও একটা বড়সড় পার্থক্য গড়ে দেয়। লোক সংখ্যার ঘনত্ব তো বটেই। ওদের লোকসংখ্যার ঘনত্ব আমাদের থেকে অনেক অনেক কম।

আমার ভেতরে যে ইনট্যুশন কাজ করছে তা বলছে, দেশে যে ভাবে সাধারণ ছুটি চলছে তাতে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়তো যাবে না। আমি নিজেও তো এই দেশেরই লোক। এভাবে হয়তো কেউ ১০ দিন চলতে পারবে। কেউ হয়তো দুই মাস। কিন্তু ৪/৫ মাস চ’লতে পারবে ব’লে মনে হয় না। আমাদের আরো কিছু করা দরকার। জানি না তা কী? তবে আমরা যতটা করছি তা এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়… বিশেষ ক’রে বাংলাদেশে… বিশেষ ক’রে আমাদের বর্তমান বাস্তবতায়…

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৪

ঠিকঠাক পঞ্জিকার হিসাব মেলালে দেখা যেতো –
তার বয়স চল্লিশের ঘরে পড়েনি তখনো,
গভীর কালো চোখের দিকে চেয়ে থেকে আমরা বুঝেছি
চালশে রোগ এখনো জেঁকে বসেনি ওখানে।
যদিও জানি জীবনের ক্রুরতা কম জানেনি শরীর,
কিংবা শত ঝঞ্ঝায় টিকে যাওয়া সতর্ক করোটি ।
নাগরিক-জীবনের সমৃদ্ধির প্রতিযোগীতায় নেমেছিলো সে
সেই যে পাঠশালায় যাওয়ার প্রথম দিনটা থেকেই।
সেখান থেকে লোকটার আজ অব্দি মুক্তি নেই-
শরীরের ক্লান্তি তবু সপে দেওয়া যায় খনিকের মদিরায়।
আর দৈনন্দিন জীবন নিয়ত স্মৃতির ক্লান্তি ব’য়ে বেড়ায়,
সে বছর কুড়ি আগের দুঃসহ উত্তেজনারই হোক
আর তিন বছর আগের দরকারি কোনো বিকিকিনি
অথবা একেবারেই গতকালের অফিসের ব্যস্ততা-
এলোমেলো রাস্তার পারাপার – সংসারের টানাপোড়েন…
আরো দীর্ঘায়িত হ’তে থাকে দীর্ঘ সে জীবন।
আর আমরা হিসাবের খাতা নিয়ে পড়ে থাকি,
জটাধারী বৃদ্ধের মুখের দিকে চেয়ে ভুলে থেকে
আওড়াতে পারি শুধু- ‘আহা বৃদ্ধ শিশু!’
জীবনের যত হতাশা, প্রতারণা আর পিছিয়ে আসা নিয়েই
দিনে দিনে এগিয়েছে সে- দাঁড়িয়েছে ভাঙনের মুখোমুখি!
চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে কতবার কতটুকু জানিনি আমরা।
শুধু প্রতিরোধের গল্পগুলো ভাষা পেয়ে জানিয়েছে
কতটা ক্ষুদ্র হ’তে পারে এই হিসাবের পথচলা …

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৩

হয়তো নাগরিক হ’লে ভাবনার থেকে দুর্ভাবনাই বেশি ক’রে গ্রাস করে। কারণ নাগরিক জীবনে নিশ্চয়তার স্বপ্ন যতটা থাকে তার থেকে অনেক বেশি থাকে আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙ্ক্ষা অনেক কিছু অর্জনের, ম্যাটেরিয়ালিস্টিক আর ননম্যাটেরিয়ালিস্টিক উভয়ই। অথচ নাগরিক হিসেবে আমরা যে চার্টার লিখে রাখি তাতে সুযোগের সাম্যতার বিষয়টা বেশ ফুলিয়ে ফাপিয়ে লেখা। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে আমরা জানতে থাকি আমাদের গড়া ব্যবস্থাগুলো বড্ড প্রতিযোগিতামূলক। সবার জন্য সব কিছুর সুযোগ সেখানে নেই। তখনই যোগ্যতার প্রশ্ন চ’লে আসে আমাদের সামনে। যোগ্যতা তৈরীর কারখানা যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে সবার জন্য প্রবেশের সমান সুযোগ আবার নেই। হয়তো কাগজে কলমে আছে। অর্থাৎ অনুশাসনের বইয়ে। আর বাস্তবতা অনেকটাই অন্য রকম গল্পের পসরা নিয়ে হাজির হয়।

আমি, আমরা দেখি মূলত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাকরীর জন্য পথে নেমে আসছে; তাদের নানা দাবি দাওয়া। উদ্যোগতা আর ব্যবসায়ীরা ব’লছেন, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জানাশোনার মান সন্তোষজনক নয়। ব্যবসায়ীরা তাই তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কখনো ভারত, কখনো শ্রীলঙ্কার লোকজন খুঁজে আনছেন। পরিসংখ্যানও ব’লছে গেলো বছর ১০ বিলিয়ন মার্কিন-ডলারের বেশি অর্থ ভারতে রেমিটেন্স হিসেবে গিয়েছে [১][২]। আর আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস ক’রে আসা তরুণেরা কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। সুযোগের সাম্যতা আর যোগ্যতার মুখোমুখি সংঘর্ষ। জানি না কে জিতে আসবে শেষে।

তবে দৃষ্টিসীমায় যতটা দেখতে পারছি, তাতে বুঝি সব কিছু ব্যবসায়ীদের দখলে যাবে। সরকারও আজ বড্ড বেশি ব্যবসায়ী-বান্ধব। সে সারা পৃথিবীতেই। ভোক্তা-বান্ধব ব’লে বোধহয় কোনো শব্দবন্ধই নেই। অথচ ব্যবসায়ী আর কয়টা লোক? ভোক্তাই তো বেশি। রণদা প্রসাদ সাহা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, কিন্তু আমরা বাঙালিরা তাকে ব্যবসায়ী ব’লে মনে রেখেছি কমই। সমাজ হিতৈষী ব’লেই চিনেছি তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানিদের হাতে তাঁর এবং তাঁর ছেলের একসাথে নিহত হওয়ার এতগুলো বছর পরও আমাদের সেই চেনাটা একটুও পাল্টে যায়নি। লোকটা বেশ কিছু স্কুল কলেজ হাসপাতাল গড়েছিলেন ব’লেই হয়তো। আজকের দিনেও অনেকেই এসব গড়ছেন। দেশে আজ শতাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। কতগুলো বেসরকারী হাসপাতাল আর ক্লিনিং আছে তার হয়তো সরকারী পরিসংখ্যান থাকতে পারে নানা মন্ত্রনালয়ের খাতায়; অর্থ-মন্ত্রনালয়ের খাতায় তো অবশ্যই। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে উপকারে আসছে না তা নয়। তবু আমরা এদেরকে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ব’লেই জানছি বা ভাবছি। সরকারও হয়তো ভাবছে। তাই মাঝে মাঝেই ভ্যাট-ট্যাক্সের নানা প্রশ্ন শুনি।

ব্যবাসায়ীরা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে আজ খুব কমই সরকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। সেখানকার শিক্ষার মান যে কমে গিয়েছে বা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার কারিকুলাম যে আগানো হয়নি বা সেখানে ঠিক মতো ক্লাস হয়না – এমন তরো অভিযোগ কম নয়। আমাদের ব্যবসায়ীরা সেটা যে জানেন না তাও নয়। তারা তাদের ব্যবসার সুবিধার জন্য নিশ্চয় কোনো একটা ব্যবস্থা ক’রে নেন। সেটাই ব্যবসার প্রকৃতি। ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য মুনাফা উৎপাদন। অযোগ্য বা কম যোগ্যতার মানুষদেরকে নিয়োগ করেন ব্যবসায়ী শুধু মাত্র তখনই যখন তারা কিনা তাদের উত্তরাধিকারী। সব মিলিয়ে সাধারণ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস ক’রে আসা শিক্ষার্থীগুলোর জন্য কাজের বা চাকুরীর সুযোগ গিয়েছে ক’মে। ওরাই তাই ওদের মতো ক’রে দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হচ্ছে রাস্তায়।

আমাদের যে এতে দায় নেই তাও নয়। গত ৭/৮ বছর ধরেই পাবলিক পরীক্ষাতে প্রশ্ন ফাঁস হ’তে দেখেছি আমরা। প্রতিবাদ করেছি খুব কম লোকই। না-শিখে বা কম-শিখেও ভাল ফল পেতে দেখেছি আমরা বছরের পর বছর। এই ছেলেমেয়েরাই আজ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ ক’রে চাকরীর জন্য, বিশেষত বিসিএস ক্যাডারের চাকরীর জন্য, পথে পথে সময় কাটাচ্ছে। এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমার মথায় একটা কথাই বারবার আসে- অপচয়, ভয়াবহ অপচয়। কয়েক লক্ষ তরুণ এক-দুই হাজার চাকরীর জন্য তাদের জীবন থেকে গড়ে তিন থেকে চার বছর খরচ করছে। ব্যবসায়ীক বা সামাজিক সব হিসাবেই এই অপচয় যে ভয়ঙ্কর পরিণতি টেনে আনবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং আশংকাই বেশি।

অনিশ্চয়তার ভাবনা নিয়েই তাই এই নাগরিক জীবন যাপন। কিমবা নগরে যাপন করা জীবন।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.dailyindustry.news/bangladesh-becomes-4th-largest-remittance-source-india/

২. https://cpd.org.bd/cpd-study-bangladesh-indian-remittance-source/

 

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩২


রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ , আপনি সেই ১৯৮১ সালে লিখেছিলেন,

“কোনো কথা নেই-কেউ বলে না, কোনো কথা নেই-কেউ চলে না,
কোনো কথা নেই-কেউ টলে না, কোনো কথা নেই-কেউ জ্বলে না-
কেউ বলে না, কেউ চলে না, কেউ টলে না, কেউ জ্বলে না।

যেন অন্ধ, চোখ বন্ধ, যেন খঞ্জ, হাত বান্ধা,
ভালোবাসাহীন, বুক ঘৃনাহীন, ভয়াবহ ঋন
ঘাড়ে চাপানো-শুধু হাঁপানো, শুধু ফাঁপানো কথা কপচায়-
জলে হাতড়ায়, শোকে কাতরায় অতিমাত্রায় তবু জ্বলে না।”

আবার যেন তেমন সময় এসেছে। তার উপর এসেছে কথা বলার উপর খড়গ। ৫৭ ধারা। মিথ্যেকে মিথ্যে বলা যাবে না। বিজ্ঞানের কথা প্রচার করা যাবে না। সবাই এখন তাই বড্ড চুপচাপ। কিন্তু স্বভাব দোষে বাঙালিকে কিছু কথা বলতেই হয়। সে কথা তাই কাজের কথা নয় কোনো। বাজে কথাই বেশি। যেটুকু কাজের কথা হচ্ছে তাতে ভুলে ভরা। কারণ খুব সহজ। ভুল ধরিয়ে দেওয়া লোকেরা বেশিরভাগই জীবন নিয়ে পালিয়েছে। আর যারা পালাতে পারেনি তারা কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে।
আমাদের তাই আজকাল কোনো গল্প নেই। কোনো কবিতা নেই। কেউ কেউ হয়তো স্থূল কিছু ছড়া কাটেন কখনো কখনো। শ্রোতারা নিশ্চিত জানেন তার কোনো অর্থ নেই। তাই তা মনে রাখার বা আর একবার শোনার চেষ্টাও নেই। প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের পুথিও বাঙালি বারবার শুনতো। এযুগের ছড়া কেউ শুনতে চায় না। এযুগে কেউ গানও বাধতে চায় না। শেষ কবে আইয়ুব বাচ্চু কোনো নতুন গান বানিয়েছেন আমরা জানি না। গত ৮/১০ বছরে জনপ্রিয় হয়েছে এমন একটা বাংলা-গানের কথা মনে করতে পারি না। গান গেয়ে যারা জীবন নির্বাহ করেন তারা গান ছেড়ে দিতে পারেন-এটা মানা যায় এই পাইরেসির যুগে। কিন্তু শখের বসেও কেউ গান বাধছেন না-এটা মানতে কষ্ট হয়। সঞ্জীব চৌধুরী মরে গেছেন জানি। তবুও। সঞ্জীব দা, এই থমকে থাকা বাতাস আমাদের কারো ভাল লাগছে না… আমরা সবাই যেন মরে গিয়েও বেঁচে আছি।
অথবা আমরা সবাই একসাথে যেন কোনো মরণ-ব্যাধীতে ভুগছি। আমাদের তাই কোনো কথা নেই। আমাদের আজ ডিক্টেশন ছাড়া কথা বলা মানা। ডিক্টেশন ছাড়া কিছু করা মানা। সেসব ডিক্টেশন যে কারা দেয়- সে প্রশ্ন করা মানা। আমাদেরকে খুশি হ’তে বলা হচ্ছে। আমাদেরকে খাজনা দিতে বলা হচ্ছে। আমরা খুশি হচ্ছি, খাজনা দিচ্ছি। আমাদের খাজনার টাকা কোথায় যাচ্ছে তা জানতে চাওয়া যাবে না। আমাদের সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংক থেকে চুরি হয়ে যায়। আমরা তবুও অস্থির হ’তে পারি না। চোর যে এখনো পুরোটা চুরি করেনি!

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩১

আমাদের মাঝে কেউ কেউ স্বভাবে বেশ আদিম,
যারা বড্ড অল্পেই সন্তুষ্টি খুঁজি।
কিন্তু আধুনিক কালের শিক্ষা থাকায় জানি –
আদিমকাল কতটা অনিশ্চিত প্রকৃতির ছিলো।
জানি, অল্পের জীবন প্রাণীর জীবন হ’লেও ঠিক মানব-জীবন নয়;
মানব-জীবন তাই ঠিক আদিম জীবন নয়।
এ জীবনে চাহিদা থাকতে হয়,
থাকতে হয় আকাঙ্ক্ষার প্রাচুর্য,
আর নিয়তিকে অস্বীকার করার সাহস।
অথচ আদিম স্বভাবের মানুষগুলোর এসব নেই বললেই চলে,
ওরা যেন জানে,
একালের জীবনটাও কতটা অনিশ্চয়তার,
হয়তো বা সেই আদি কালের চেয়েও বেশি।
সব শিকারীর ভাগ্যে জোটে না শিকার প্রতিদিন,
দক্ষতা শিকারের নিশ্চয়তা দেয়নি কখনো-
তা যেমন আদিকালে, ঠিক যেন এখনো।

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩০

সন্ধ্যে হ’লেই সুইচ টিপে বাতি জ্বেলে দিই,
ঝলমলে সে বাতি জ্বলে ক্লান্তিহীন।
ঘড়ির কাটা হয়তো এগিয়ে যায়,
শহরের রজনী তবু হয় না গভীর।
ক্লান্ত হ’লে এলিয়ে দিই শরীর,
তন্দ্রা এলেও চোখ নিদ্রাবিহীন।
সকাল যে কখন ডেকে আনে সূর্যকে-
জানে শুধু কেরানী আবহাওয়াবিদ।
সূর্য-স্নানের স্বাদ ভুলে গেছে শরীর,
স্মৃতি আছে কেবল নিয়ন্ত্রিত উষ্ঞতার।
তারুণ্য স্বাস্থ্যে আর সাজে নিয়েছে আশ্রয়,
অশিতিপর বৃদ্ধ হয়েছে সকল হৃদয়।
প্রেমিকা দেখা করতে আসবে ব’ললে,
কিছুটা সময় কেটে যায় রেস্তোরাতে-
তবু অপেক্ষা করে না কোনো প্রেমিক-মন,
বিষন্ন প্রতীক্ষার প্রহর নিয়েছে যে নির্বাসন।
প্রেমের পর্ব শেষ ক’রে ঘরে ফিরি,
সন্ধ্যে হ’লেই সুইচ টিপে বাতি জ্বালাই …

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২৯

জীবনগুলো অন্যরকম-
সে মানুষগুলো জৈবিক দৃষ্টিতে যতই একরকম হোক।
মানুষের গল্পগুলো তাদের জীবনেরই গল্প;
গল্পগুলো তাই অন্যরকম-
কারো গল্প ভীরুতার, কারো গল্প বীরত্বের,
কারো বা গল্পের মাঝে শুধু বীরপূজার ছড়াছড়ি।
অথচ যাকে নিয়ে বীরপূজা- খোঁজ নিলে দেখা যায়,
কতটা নিঃসঙ্গ সে একান্ত নিজের কাছে-
কতটা ভীরু প্রিয় মানুষের বুকের কাছে।
যে লোকটা সারাদিন বোনে কথার মালা,
ফেনিয়ে তোলে সীমাহীন হাসির গমক-
সেই লোকটাই গভীর রাতে নিজের সাথে মেহন করে,
সেই লোকটাই বুকের ভাজে পুশে রাখে হাজার দুঃখ।
আমাদের হৃদয়গুলো নিজেদের কাছেই অপরিচিত-
যদিও অনেক দিনের চেনা হাড়-মজ্জায় তার বাস।
সময়ের বিবরে হাড়-মজ্জায় ক্ষয় ধরে যখন
হৃদয়গুলো, জীবনগুলোও পালটে যেতে থাকে-;
আমাদের জীবনের জয়গুলো উপহাস করে চুপিচুপি,
কখনো বা হ’য়ে ওঠে বড্ড প্রতিশোধ-পরায়ন।
ক্লান্ত বিকেলে পরাজয়গুলোই স্বস্তি দেয় বেশি-
এক জীবনেই একাধিক জীবন যাপন!
কত সাজ, কত জৌলুশ করেছি ধারণ
আর কারো জীবন থেকে ছিনিয়ে নিয়ে-
পরিনামে এসবের তলানিতেই হারিয়ে গেছি নিজে।
এই জীবনটা আর এক রকম-
পালিয়ে বেড়ায় নিজের থেকেই;
অথচ অভ্যস্ত সে অন্যকে তাড়িয়ে বেড়ানোয়।
দুই বেলাতেই ছুটতে হয়-
সাগর কুলে ভাসতে হয়…
সাগর পেরুলেই অন্য জমিন;
সেখানে অন্যরকম আর এক জীবন।
সেই জীবনের ভীরুতা এই জীবনের সাথে মিলবে না,
এই জীবনের গল্পগুলো ঐ জীবনকে ছোঁবে না।

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২৮

এই মনে হয় সবকিছু ঘুরছে, চলছে…
এই মনে হয় টলটলা জল, বয়ে যাচ্ছে নদী।
অথচ একটু কাছে গেলেই দেখি আটকানো সব,
চলবে যে সে উপায় নেই কারো – পথ বন্ধ।
নদীর পাড় ধ’রে খানিকটা আগালেই দেখা যায় বাধ-
আহত স্রোতেরা এক আকাশ-ভরা অভিমান নিয়ে স্তব্ধ হ’য়ে আছে,
দক্ষিণা বাতাসে মাঝে মাঝে একটু কেঁপে-কেঁপে ওঠে শুধু-
বদ্ধ জলের সেই কাঁপুনি দেখে আমাদের টলটলা ব’লে ভুল হয়।
আমরা সেই আবদ্ধ জলের কাছে যাই,
যাওয়া হয় না যেখানে যাওয়ার কথা ছিলো নদীটার,
যেখানটা আজ বড্ড ঊষর, বড্ড ধূসর-
কোনো নদীর আজ আর সমুদ্রে যাওয়া হয় না,
পৃথিবীর একদল মানুষ আজ সমুদ্র দখল ক’রে নিয়েছে।
আর তাই নিয়ে ওদের মাঝে কত কাটাকাটি!
আর সেসব নিয়েই আমাদের যত মাথা-ব্যথা-
এই বুঝি চালের, নুনের, পেয়াজের দাম বাড়লো?!
এই বুঝি দাম কমলো আমাদের শ্রমের!
বিষন্ন এক অস্থিরতা গ্রাস করতে থাকে আমাদের…
বদ্ধ নদীগুলোর কথা মনে পড়ে,
মনে হয় ওদের মতোই আটকে গেছি যেন আমরা-
সহজ স্বপ্ন ব’লে আমাদের আর কিছু নেই আজ,
জীবন জড়িয়ে গেছে যুদ্ধবাজের জালে,
কাঙ্ক্ষিত সমস্ত সরলতা কিনে নিয়েছে ব্যবসাবাজ,
আমাদের আনন্দগুলো বড্ড লোক-দেখানো, বড্ড কৃত্রিম …
আনন্দগুলো হারিয়ে গেছে আমাদেরই গড়া গোলক ধাঁধায়-
যেখানে যাই সেখানেই বিনোদন খুঁজে মরি তাই।
খোঁজা হয় না ঘর, খোঁজা হয় না সুখ,
হয়না খোঁজা প্রিয় মানুষের মুখ।
সেও যে হারিয়ে যায়নি, বিকিয়ে যায়নি-
তাই বা বলি কেমন ক’রে?
আমাদের সব জীবনই যে বিকিয়ে গেছে,
তলিয়ে গেছে ছলনার মায়াবী দীর্ঘ ছায়ায়-
মুক্ত মানুষ হওয়া হবে না কখনো আর,
শত চেষ্টায়ও আর মিলবে না সহজ জীবন।

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২৭

হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে একদিন নিঃসঙ্গ নদীটার তীরে ঠিক পৌঁছে যাবো।
নদীটার পানি কমতে কমতে কমতে সব স্রোত হারিয়ে ব’সে আছে,
অনেক জায়গায় একেবারে শুকিয়েও গেছে।
আর তাই নদীটাকে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে গাঙচিলের বেলা যায়-
এদিকে নিবর নদীটা আকুল হ’য়ে চেয়ে থাকে।
এবারের শীতটা বেশ জাঁকিয়ে ব’সেছে, তবু অতিথী-পাখির দেখা নেই।
পাখিগুলোর দেশে ভয়ানক কিছু হয়েছে নিশ্চয়,
কিন্তু সে বার্তা অভাগা নদীটার কানে এসে পৌঁছায় না।
মনের ভেতর খুটখুট করে – কী যেন একটা ঠিক নেই।
আমি হাঁটতে থাকি, হাঁটতে থাকি, হাঁটতে থাকি …
হয়তো নদীটার কাছে, হয়তো বাড়িটার কাছে পৌঁছাতে পারলে
সব ঠিক হ’য়ে যেতো।
নিঃসঙ্গ নদীটার কাছে আমাকে তাই একদিন পৌঁছতে হবে-
আমি জানি, একদিন আমি একা একাই ওখানে পৌঁছে যাবো।

কবিতা · যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ২৬

বলা ভালো-
এই শহরটা যেন কাকের বাসরঘর।
মানুষগুলো আমরা যেন আমন্ত্রিত অতিথি
কাক-বর আর কাক-কনের বিয়েতে।
বর আর কনেকে এক ঝলক দেখে নিয়ে,
বাহ! বেশ মানিয়েছে তো –
ব’লতে পারলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ।
এরপর পেট-পূজাটা হ’য়ে গেলে
আর চিন্তা কি!
ভাড়া করা ঠিকানাতে
দায়িত্ব মাফিক ফিরে আসা,
হয়তো একটু সঙ্গিকে ভালোবাসা।
আহা আমাদের ভালোবাসা!
সেও আজ আর দশটা দাফতরিক কাজের মতোই,
শর্ত দিয়ে ঠাসা।
তো নিয়ম মেনে
ভালোবাসার কাজটা হ’য়ে গেলে পর-
নতুন কাক-বউ আর কাক-স্বামীর
কথা ভাবতে ভাবতে আমরা এই শহরের প্রাণীগুলো
ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাবো।
কেউ কেউ হয়তো স্বপ্ন দেখবো,
সুখ স্বপ্ন-
দুঃস্বপ্ন-
ছাড়া ছাড়া জাল-স্বপ্ন…
স্বপ্নগুলো আমাদের শহুরে জীবনের মতোই
বড্ড দুমড়ানো মোচড়ানো –
বড্ড করুণ।
আমাদের গতানুগতিক জীবনের মাঝে
তবু ওরাই যা একটু ব্যতিক্রম।
পরদিন সকালবেলা কাক-বউয়ের অত্যাচারে
আবার সেই দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে যাওয়া।