যাপিত জীবন-১৭

আনুষ্ঠানিক স্থাপত্য পাঠ থেকে শিখেছিলাম, শুরু করতে নাকি সবাই-ই পারে – শেষ করতে পারাটাই যোগ্যতা। যে যোগ্যতায় কমতি আমার মধ্যে বরাবরই আছে। সে কাজের ব্যাপারেই হোক আর অকাজের ব্যাপারে। স্কুলের দৌড় প্রতিযোগীতা আমার কোনো দিনই শেষ করা হ’তো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আমার কোনো প্রজেক্টই শেষ করতে পারিনি। লালন বা অন্য কেউ যখন আমার লেখা নিয়ে কিছু বলে, আমার লেখাগুলো শেষ করছি না কেন- সেব্যাপারে তাতে কিছু না কিছু থাকেই। আমি যে লেখা বা অনুবাদগুলো শেষ করতে চাই না তাও নয়। তবুও শেষ করা হ’য়ে ওঠে না। বরং মনে হয় এত দ্রুত ওদের শেষ টানার কিছু নেই।

মাঝে মাঝে লেখাগুলোও আমার কৈফিয়ত চেয়ে বসে। সুরাইয়া হায়দার, যে তার অস্থিরতার সময়ও তার স্বামীর দিকে খেয়াল রাখেন তিনি কৈফিয়ত চান। তার অফিসের প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার ঘটনাটা শেষ করছি না কেন, সে ব্যাপারে প্রশ্ন করেন কখনো। আমি তাকে মনে মনে ব’লি শেষ করব আর কি। ব’লি ঘটনাতে আরো খানিকটা টুইস্ট আনা যায় কিনা সেটা ভাবছি। ভাবছি ঘটনাটা লেখকের বর্ণনায় লিখব নাকি আপনার বর্ণনায় সেটা ভাবছি। এই করতে করতে মাঝে মাঝে আমি সুরাইয়া হায়দারের সাথে বেশ লম্বা একটা আড্ডা দিয়ে দেই। তাতে আর যাই হোক গল্পটা আর শেষ করা হ’য়ে ওঠে না।

ফারিয়া আর হাসিবের জীবনের টানাপোড়েনগুলো গল্প হ’য়ে উঠতে চেয়েও যেন হ’য়ে ওঠে না। কখনো ওরা সুখী হয় কখনো হয়না। কখনো মনে হয় ওদের সুখবোধের ভেতরে থেকে যাওয়া দুঃখবোধগুলো আমি ঠিক ধরতে পারছি না। ওদের ঘটনার সম্ভব্য তিনটি পরিণতির যে কোনোটি নিয়েই গল্পটা শেষ করা যায় হয়তো। কিন্তু আমি যে চেয়েছি সবগুলো পরিণতি নিয়েই আলাদা আলাদা তিনটা গল্প হবে। প্রতিটিতে ঘটনায় প্রধান কিছু মিল থাকবে, কিন্তু পারিপার্শিক আর পরিণতিতে থাকবে ভিন্নতা। তার জন্য ক্যারেকটারাইজেশনে ভিন্নতা আসবে কি আসবে না সেটা নিয়ে আমার ভাবনা তার পরিণতি পায় না। তারা তাই খসড়াতেই থেকে যায়।

এদিকে নন্দিতার সাথে সিদ্দিক সাহেবের সখ্যতা গ’ড়ে ওঠার কথা সেই কবে থেকে। অথচ কত ঘটনার ফাঁকে তাদের দেখাই হ’য়ে ওঠে না। যখন দেখা হয় তখন তারা কিভাবে পরষ্পরের দিকে আগাবে সেটা আর চিত্রিত হ’য়ে ওঠে না। নন্দিতার আকুতি আমাকে যে পীড়া দেয় না তাও কিন্তু নয়। তবুও সিদ্দিক সাহেবকে আমি বসিয়ে রাখি অনেক অনেক দিন।

ভাল লাগা কিছু ইংরেজী লেখার একটা তালিকা করেছিলাম অনেকদিন আগে, অনুবাদ করবো ব’লে। কিন্তু ইংরেজীর উপর বিরক্ত হ’য়ে একসময় উঠে যাই। তখন সরদার ফজলুল করিমের কথা মনে পড়ে। তাঁর উপর মুগ্ধতা আরো বাড়তে থাকে। আর কমতে থাকে নিজের অনুবাদের উপরে আস্থা। মনে হয় এ আর আমাকে দিয়ে হবে না। আবার কখনো মনে হয়- যা বুঝি তাই বাংলাতে লিখে ফেলি না কেন। তখন দেখি অনেক কিছুই ঠিক মতো বুঝি না। পড়ার পর একটা ভাব তৈরী হয় বটে, তাদের অনেকেই অনির্বচনীয় হয়ে ওঠে তখন।

কোনো কোনো মাঝ রাতে এই সব অসমাপ্তরা ঘিরে ধরে। মুখোমুখি দাঁড়ায়। আমি ভাবতে থাকি, কে বেশি পীড়ন করে মানুষকে? অসংখ্য খুত নিয়ে শেষ করা কোনো কাজ, নাকি যে কাজগুলো কখনো শেষ করা কিংবা শুরু করাই হয়নি তারা?

যাপিত জীবন – ১৬

অনেক সময়ই ব্যস্ততার কারণে আমরা কিছু কাজ গুরুত্বহীন ভেবে বাদ দিয়ে দেই। অথবা কিছু কাজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে ওঠায় অন্য কোনো কোনো কাজ করা হয়ে ওঠে না। সে কাজগুলোকে বাজে কাজ ব’লে চালিয়ে দিতে চাই। অথচ এই বাজে কাজগুলোই হয়তো আমাদের চরিত্র তৈরী ক’রে দিচ্ছিলো। আমাদেরকে অন্যভাবে ভাবার ফুরসত ক’রে দিচ্ছিলো। রবীন্দ্রনাথ কাজের কথা আর বাজে কথার কথা বলেছিলেন। আজকের দিনে মানুষ কথাকে খুব একটা আমলেই নিতে চায় না। কাজই যেন মুখ্য সবখানে। সে কাজের কাজই হোক কিংবা বাজে কাজ। কাজ চললেই হলো।

কথা প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধু সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, কাজ চললেই সন্তুষ্টি আসে কিনা । আমি নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছি। কারণ সন্তুষ্টি নিয়ে ভাবার সময় কই আমাদের? তার জন্য তো দরকার অবসর। অবসর তো আমাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে সেই কবেই। তবুও সন্তুষ্টির প্রশ্ন ওঠে। সন্তুষ্টির অন্যতম শর্ত হ’য়ে উঠেছে সৌন্দর্য। নাকি সৌন্দর্যের প্রকাশ? আবার ফর্সা, চোখা, ঝলমলে বা ডাসা না হ’তে পারলে নাকি সৌন্দর্যের প্রাথমিক শর্তই পুরণ হয় না। তাই আমাদেরকে দ্বারস্থ হ’তে হয় প্রসাধনের, অলংকারের। কেউ কেউ আরো কয়েক কাঠি আগিয়ে হয়তো প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে নেন। ফলে আমরা হারিয়ে যেতে বসেছি সৌন্দর্যের আবরণে। এই হারিয়ে যাওয়াতে সন্তুষ্টি আসে কিনা জানি না। তবে অবগুন্ঠনের প্রদর্শন অন্যদেরকে যে আনন্দ দিচ্ছে এটা নিশ্চিত টের পাই।

দীর্ঘ একটা দ্বন্দ্বমুখর সময় পার করেছি একদা। সেটা বিল্ডিং প্রসঙ্গে। তার কাঠামোর ধরণ প্রকাশ করবো কি করবো না – সেটা নিয়ে। স্থাপত্যের আধুনিকতাবাদ এই দ্বন্দ্বটা তৈরী করেছিলো। বুনো-সৌন্দর্য প্রকাশ করার পরামর্শ দিয়েছিলো। কিন্তু বুনো-সৌন্দর্যের কথা সভ্য মানুষের মুখে প্রথম থেকেই মেকি মেকি লাগতো। যতই তা মুগ্ধতা ছড়াক না কেন। মনে হ’তো ব্যক্তি মানুষের চাওয়ার গুরুত্ব থাকছে না। আবার সবকিছু কেমন যেন সরলতার আড়ালে ঢেকে যাচ্ছে। অনেক কিছু বাদও পড়ে যাচ্ছে। তাতে যে সরল-সৌন্দর্য প্রকাশ পাচ্ছে তা বেশ দাম্ভিক। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই ধরণের সারল্যের প্রকাশ আমাকে মুগ্ধ করলেও স্বস্তি দেয়নি। বরং সামষ্টিকতার কাছেই পেয়েছি স্বস্তি/সন্তুষ্টির পাঠ। কিন্তু তার সমন্বয় করতে গিয়ে ঠিকই প্রসাধনের দরকার পড়ে।

বুনো বা অপরিশিলিত অবস্থা শেষ পর্যন্ত সামাজিক অসন্তুষ্টির কারণ হ’য়ে দাঁড়ায়। তাই সমাজের সন্তুষ্টির স্বার্থে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত প্রকাশ করতে হয় নিজেদের সন্তুষ্টিকে। হোক না সে প্রকাশ সাজানো, অবগুন্ঠনে মোড়া। হোক সে মিথ্যে। জেনে শুনেই আমরা সে মিথ্যেতে আস্থা রেখে চলি। যুগ যুগ ধ’রে মেনে চলি সংস্কার। হারিয়ে ফেলি নিজেকে। আর তাই আমাদের থাকে না কোনো নিজস্বতা। আজকের ভোগবাদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এর সুযোগ নিতে একটুও দেরি করে না। প্রসাধনের ব্যবসা তাই আজ খুব রমরমা।

তাই আর যাকেই গুরুত্বহীন ভাবি না কেন, এটার গুরুত্ব বুঝতে আমাদের কষ্ট হয়না।

যাপিত জীবন- ১৪

মনে পড়ে একবার পিতার কোনো এক নির্দেশ মানতে রাজি হচ্ছি না। কী বা কেন -তা আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, আমার কথার প্রত্যুত্তরে তিনি যখন বললেন – এতে এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হ’য়ে যাবে না; তখন আমি বলেছি – মহাভারত তো অশুদ্ধই, এর আবার নতুন ক’রে শুদ্ধাশুদ্ধির প্রশ্ন আসে কিভাবে? আমার কথায় পিতার মুখে আর কোনো কথা সরে না। তিনি অপলক তাকিয়ে থাকেন। সেই দৃষ্টিতে থাকা বিচলন আজও আমি চাক্ষুষ করি।

আমার ইসলামে বিশ্বাসী পিতা মহাভারতের গল্পটা বেশ জানতেন, তবে সে জানাটা যে বই পড়ে নয় তা জেনেছি। তবুও পুত্রের অমন অর্বাচিনতা তিনি মানতে পারেন না। তার মধ্যে কোনো একটা শঙ্কা কাজ করতে থাকে। কী সেই শঙ্কা? তার দ্বিতীয় পুত্র সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে কিনা? নাকি তাঁর অভিজ্ঞ চোখ পুত্রের অবিশ্বাসের শুরুটা দেখে ফেলেন নিমেষেই? আমার কাছে আজও এর নিশ্চিত উত্তর নেই।

যদিও বিশ্বাসের ভূগোল পেরিয়ে আসাটা সহজ ছিল না, তবুও সময় কিন্তু ততটা বৈরী নয়। আমার এই স্খলন অন্য কোনো সময়ে হ’লে আমার অস্তিত্ব বিপন্ন হ’তো নিশ্চিত। সেই নিশ্চিত অনিশ্চয়তার আশঙ্কা আমার পিতাকে আচ্ছন্ন ক’রে থাকলে তার ভেতর অস্বভাবিকতার কিছু নেই। পিতৃত্ব এমনই ভয়ঙ্কর আচ্ছন্নকারী। আর তাই যে বিশ্বাস-ভঙ্গের একমাত্র পুরস্কার সমাজচ্যুতি, পিতা তা আটকে রাখতে চান। সে পিতা আইনের প্রতি আস্থাশীল একজন মানুষ হওয়ার পরও।

যাপিত জীবন- ১৩

আমার এক বন্ধু বিয়ের পর থেকে আমাদেরকে খুব একটা সময় দেন না বা দিতে পারেন না। নিতান্ত বন্ধু ব’লে তার উপরে আমরা রুষ্ঠও হতে পারি না। বন্ধু-পত্নীর উপরে তো না-ই। একে বন্ধুর প্রিয়তম পত্নী তার উপর আবার সুন্দরী। আমাদের সমস্ত বিরাগ তাই গিয়ে পড়ে বিয়ে ব্যবস্থাটার উপর। বন্ধুকে সেটা জানাতে আমরা কসুর করি না। প্রথম প্রথম বন্ধু কিছু বলতেন না, হয়তো কখনো সামান্য হাসতেন। তবে ইদানিং কিছু কিছু মন্তব্য করা শুরু করেছেন।

তার মতে এগুলো নাকি আমাদের বিরুদ্ধে তার এক ধরণের নির্দোষ ষড়যন্ত্র। যেন আমরা দ্রুত বিয়ের পিড়িতে বসি। বিয়ের পর থেকে নাকি জগতটাকে তিনি আগের থেকে অনেক বেশি বুঝতে পারেন। আমরা সন্দহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। বন্ধু হয়তো সেটা ধ’রে ফেলেন।

“শোন বন্ধু- গত ঈদে বউ আমার একখানা গহনার আবদার করেছে। তো একমাত্র বউ, না করি কি ক’রে? আবার ঈদের বাজার হ্যাঁও করা কি ঠিক হবে? তখন আমাকে কি করতে হয় জানো?” আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি। বন্ধু বলে চলেন, “গহনার চলতি ফ্যাশন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করতে হয়। মাঝে মাঝে এমন কি বলতেও হয় যে – ‘ভেনাসের অঙ্গে কি অলঙ্কার মানায়?’  তখন আমাদের ভেতর থেকে কেউ একজন ব’লে বসেন – কিন্তু আধুনিক মেয়েরা কি শেষ পর্যন্ত ভেনাস হতে রাজি হয়?

বন্ধুর সহজ উত্তর-‘হয় না। তবে অনেকেই দ্বিধায় পড়েন। তখন স্বামী দেবতার পক্ষে নতুন কোনো ছিনালী আবিস্কার করার সময় জুটে যায়।’ আমরা আতকে উঠি- পুরুষ হ’য়ে ছিনালী !!

বন্ধুবর মিটিমিটি হাসেন। আমরা রাগে কিটমিট করতে থাকি। মুখে যা না তা বলতে থাকি। হঠাৎ থামতে হয়। বন্ধুর মুঠোফোনে ডাক এসেছে। ঘরের ডাক। ওপাশে ঘরণী। বন্ধু উঠে দাড়ান। যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেন – আজ পেপার পড়োনি ?

বলি, পড়েছি তো। কিন্তু কেন বল তো?

ঐ যে আয়করের ব্যাপারটা। আমরাও জানি মন্ত্রী-এমপিরা, সরকারী কর্মচারীরা, খুব সম্ভবত আর্মীরাও তাদের বেতনের উপর আয়কর দেন না। আমরা সেটা মেনেও নিয়েছি। তাদেরও যে খুব একটা দেওয়ার ইচ্ছা আছে তা না। ভোটের আগে নমিনেশন কিনতে, চাকরীতে পদন্নতি পেতে তো কম দিতে হয়নি। আবার কেন? তারপরও অর্থমন্ত্রীকে সংসদে এই ছিনালীটা করতে হয়। নিজের অযোগ্যতা গোপন ক’রে খানিকটা বাহবা পাওয়ার জন্য। কিন্তু মন্ত্রী বুঝেন না এতে তার অযোগ্যতা আরো ফাস হয়ে পড়ে। কারণ বাহবা পাওয়ার জন্য তিনি যা প্রস্তাব করেন তা কর্যকর করার মতো ‘মাল’ তিনি নন।’

কিন্তু বন্ধু তোমার মুখে রাজনীতির কথা !! বিয়ের পরে তুমি তো এমনটা কখনো করোনি !!’ – অবাক হ’য়ে বলতেই হলো।

বন্ধু ঘড়ি দেখলেন। পরিচিত হাসিটা আর একবার দিয়ে বললেন – ‘বিয়ের সময় কিছু গহনা তো স্ত্রীকে দিয়েছিলাম। আরো দেয়ার ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, আবার দেয়ার সামর্থ যে প্রায় নেই, সেটা আমার থেকে স্ত্রী কম জানেন তা নয়। তবু তিনি চান, আর আমি হয়তো নিতান্ত নিরুপায় হয়ে বলেই ফেলি- ডার্লিং আগামী ঈদে কানের সাথে গলারটাও বানিয়ে দেব। ঠিক আমাদের অর্থমন্ত্রীর মতো। তিনিও জানেন আমিও জানি কোনোটাই সম্ভব হবে না। রাষ্ট্র বা সংসার কোনোটাই এর জন্য আটকে থাকবে না। থাকে না।’

(নোট : ২৯.৯.১১ এ লেখা একটা খসড়া এটা… অনেকদিন পার হ’য়ে যাওয়ার পরও যখন আর লেখাটা পুরা করা হ’য়ে উঠলো না… তখন মনে হয় লেখাটা আরো কিছু দিন আটকে রাখলে তা সময় উপযোগীতা হারাবে… তাই প্রকাশ করেই দিলাম…)

যাপিত জীবন -১২

পিতার সমস্তটা নিংড়ে নেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টার দিনে একবার লিখেছিলাম…

এই ঊষরতা
এই অনাকাঙ্খিত উষ্ঞতা
আর দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা
যতটা বিচলিত করে আমাকে
তা কাটিয়ে দিতে পারতো
একটু তুমুল বৃষ্টি।
অথচ আমার অপেক্ষার ব্যস্ততা
বাড়তেই থাকে,
আমি অস্থির হয়ে উঠি –
ঐ প্রৌঢ় আড়িয়াল খাঁ’র মতো।
এই ভাবেই গড়াতে থাকে সময়।
হঠাৎ কখনো …
হয়তো রাস্তায় আমি,
আমাকে প্লাবিত ক’রে
যখন প্রতিক্ষার বৃষ্টি নামে,
ব’লে উঠি আচম্বিতে_
বৃষ্টি নামার আর সময় পেলো না?”

নির্মমভাবে শেষের লাইনটা মাঝে মাঝে বলতেই হয়। অপেক্ষার ব্যস্ততার দিন ধুয়ে মুছে গেছে সেই কবেই! তবুও। এখন বরং সামান্যতম স্থিরতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আকাশের দিকে তাকাই কখনো কখনো। বুঝে নিতে চাই মেঘ জমছে কিনা। করিতকর্মা মেঘেরা কখন জমে, কখন গলে- তার সামান্যই জানা হয় শেষ পর্যন্ত। যদি না …

অপরিপাটি স্বভাবের দোষে যে জীবনে জমে না কিছুই- শুধু স্মৃতি ছাড়া, তা হাতড়েও দেখি প্রায় শূণ্য হাত। সেই কবে স্কুলের এক সহপাঠী একবার বাড়ি ফেরার পথে আমার ছাতাটা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়েছিলো। তার খানিকটা আজো মনে করতে পারি। তড়িঘড়ি পালানোর পথে ওর আছাড় খাওয়ার (পড়ে যাওয়ার) দৃশ্যটা বেশ মুখোরোচক ছিল কয়েকদিন। আহ! হ্যাংলা মেয়েটার ফিচেল হাসির খানিকটা কি আজো মনে পড়ে? কি জানি!! শুধু মনে পড়ে… আমার ঐ ছাতা ছিন্তাইকারী বন্ধুই আমাকে প্রথম বলেছিলো, মেয়েরা বেশিদিন হ্যাংলা থাকে না। আজকাল বৃষ্টি হ’লে যদি কখনো আটকে যাই, খানিকটা সময় মেলে … হ্যাংলা মেয়েটার কথা কি মনে পড়ে?

সৈয়দ মুজতবা আলী একবার এক মিশরীয়কে বুঝিয়েছিলেন কেন বাঙালি বৃষ্টি নিয়ে এত আকুলিবিকুলি করে। আমি মিশরীয় না হওয়ায় ব্যাপারটা আজো বুঝে উঠতে পারিনি। সেটা বোঝার দ্বিতীয় একটা অনুষঙ্গও যে দরকার হয়- সেটার অভাবও একটা কারণ হ’তে পারে। কি জানি সেটাই প্রধান কারণ কিনা !!

এক সহকর্মীর সাথে আজ খানিক্ষণ দাড়িয়ে ছিলাম। ছোট্ট একটা ছাউনির নিচে। দুজনেরই তাড়া আছে। কিন্তু বাইরে বৃষ্টি। প্রতীক্ষার বৃষ্টি। চায়ের দোকানের গাদাগাদি তাকে যেন আরো কুহকিনী ক’রে তুলছে। সহকর্মী তার কোনো এক বৃষ্টিতে ভেজার গল্প করছিলেন। ঠিন তখনই ফোন আসে … কাছাকাছি ঘেষে থাকা আমি স্পষ্টই শুনতে পাই- তুমি চ’লে আসোতো… তোমার হাত ধ’রে ভিজবো। সহকর্মী এই তুমুল বৃষ্টিতেই পা বাড়িয়ে দিলেন কারো হাত ধরবেন ব’লে। আমি অপেক্ষা করতে থাকি ….

অথবা মনে করতে থাকি… কোনো এক বর্ষার দিনে এক যুবতী বন্ধু তার সমস্ত হৃদ্যতা নিয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়েছিল আমাকে… কোন বর্ষায় সেটা? কোন বর্ষায় !!

 

যাপিত জীবন – ১১

স্বর্গে গিয়েও তো দেখতে হবে সেই স্রষ্টার সৃষ্টিই। মানুষের সৃষ্টি দেখার সুযোগ এই নশ্বর মানব জীবন ছাড়া আর পাওয়া যাবে না। বড্ড অকিঞ্চিতকর যে মানবজীবন সেও যে কতটা আপরিমেয় হ’তে পারে তা বোঝার সুযোগ কি আর কোনো ভাবে পাওয়া যাবে? অথচ মানুষকে প্রতিনিয়ত দেখছি সেই স্রষ্টার সৃষ্টির পেছনেই ছুটতে। তাতে মুগ্ধ হ’তে। আমার কেন জানি সন্দেহ হয়। এই মুগ্ধ হওয়াটা নিঃস্বার্থ কিনা। মনে হয় স্রষ্টার সৃষ্টির পেছনে মানুষের এই নিয়ত পরিভ্রমণ তাকে আরো বেশি মানুষের সৃষ্টিতে নিয়ে আসার জন্য। কারণ মানুষের সবকিছু তার নিজের জন্যই। সে যখন প্রকৃতি রক্ষার কথা বলে, সেটাও বলে তার নিজের প্রয়োজন ব’লেই। প্রকৃতির মুখ চেয়ে নয়। জেনেসিসে মানুষ বলেছিল, সে প্রকৃতির অধিশ্বর হবে। এটা না ব’লে তার উপায়ও ছিলো না। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই সেটা দরকার ছিলো। সেজন্যই তাকে ভাল ক’রে দেখতে হয়েছে, জানতে হয়েছে প্রকৃতিকে। তাতেই খানিকটা জয় করা গেছে প্রকৃতিকে।। তারপরও তাহলে প্রকৃতির কাছে যাওয়ার এত তাড়না কেন দেখি মানুষের ভেতরে? মানুষের তাড়না অসীম ব’লে? নাকি মানুষ তার এতএত সৃষ্টিতেও শেষ পর্যন্ত তৃপ্তি, স্বস্তি পায় না ব’লে? কি জানি… কিন্তু তাই ব’লে স্বস্তি না পাওয়া মানুষেরা অন্যের মোহ ভাঙতে উঠে-পড়ে লাগবে কেন? কেন বারবার বলতে থাকবে- চলেন/চল বান্দরবানে যাই। দারুণ জায়গা। এই সব দারুণ জায়গা তাদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনে কেমন ক’রে? বরং এমন কি হওয়ার কথা নয়, তার/তাদের ভাল লাগার সাথে বাস্তবতার ব্যাপক ফারাক দেখে তার/তাদের আরো মন খারাপ হ’য়ে যাওয়ার কথা?

যাপিত জীবন – ১০

কত ভাবে যে ভালো থাকার কথা বলি !! কত জনকেই না বলি !! যদিও আসলে মিথ্যে ক’রেই বলি। না ব’লে উপায় কি? ভালো যে নেই – সেটা কেমন ক’রে ব’লি? ভালো না-থাকাটা যে দুর্বলতা। সেই দুর্বলতা কেমন ক’রে স্বীকার করি? তা জানানো যায়- তেমন প্রিয় মানুষই বা কই? চারপাশে কতশত পরিচিত মুখ দেখি। কিন্তু যার অভাবে শত ফাল্গুন বিফল হবে, কোথায় সেই অপরিচিতা?

অপরিচিতা, আমাকে ক্ষমা ক’রো। তোমাকে চিনে নেওয়া কোনদিনই হবে না আমার। হবে না নেওয়া অমৃতের স্বাদ। অথচ সেই অমৃতের তরে কি অপার পিপাসা আমার, তুমি তা জানবে না। অপরিচিতা, সেই কি ভাল? কি জানি… অন্তত তোমার আগামী ফাল্গুনগুলো তো আমার কারণে ব্যর্থ হবে না !!

যাপিত জীবন-৯

“ষাটের দশকের কবিতা অবক্ষয়, বিকার, যৌনতা, স্থূলতা, নৈরাজ্য, আত্মগ্লানি, ব্যক্তিক দ্বিধা, পাপ এবং পচনে স্পষ্টভাবেই নিজেকে চিহ্নিত করেছে। রাজনৈতিক অব্যবস্থা, সামাজিক অসন্তোষ এবং সর্বোপরি রোগাক্রান্তসনাতন চিন্তা বা বোধ অতিক্রম করার দুঃসাহসে দীপ্ত কিছু তরুণের আপাত ব্যর্থতা এই দশকের প্রারম্ভেরও কিছু আগে থেকেই ক্রমশ প্রবলভাবে সংক্রামিত কোরে চলেছিল সমাজজীবন। এবং এরই ক্ষতচিহ্ন ধারন কোরে বেরিয়ে আসে ষাট দশকের একদল উষ্ঞ তরুণ। ” -রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ।

ষাটের দশককে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, বেঁচে থাকলে একুশ শতকের প্রথম দশককে কি অন্যভাবে বর্ণনা দিতেন? এই দশকেও রাজনৈতিক অব্যবস্থা, সামাজিক অসন্তোষ আর রোগাক্রান্ত সনাতন চিন্তার প্রাদুর্ভাব আছে। বেশ ঘটা ক’রেই আছে। ষাটের দশকে অবশ্য মানুষের ভেতরে গণতন্ত্রের জন্য আকাঙ্ক্ষা ছিলো। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস হ’তে চেয়েছিল। আজ গণতন্ত্র আছে। কিন্তু জনগণ ক্ষমতার উৎস হয়নি। ক্ষমতার উৎস হওয়ার যে প্রাথমিক শর্ত অর্থাৎ একত্রিত হওয়া সেটা যে গণতন্ত্রে হ’য়ে ওঠে না সেটা আজ আমরা বুঝে গেছি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ সবসময়ই বিভক্ত থাকে। থাকতে তাকে হয়ই। রাজনৈতিক ভাবে। সাংস্কৃতিক ভাবে। আঞ্চল ভেদে। আর্থিক দিক দিয়ে। ধর্মীয় ভাবে…। তা না হ’লে নির্বাচন-কেন্দ্রিক যে গণতন্ত্র, তা যে অপ্রয়োজনীয় হ’য়ে ওঠে। আর তাই প্রচলিত গণতান্ত্রিক সমাজে/রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতা বা শক্তি সর্বদাই খণ্ডিত। সে শুধুমাত্র শক্তিশালী হ’য়ে ওঠে বিপ্লবের/বিদ্রোহের সময়। কিন্তু তারপর?

জনগণ ক্ষমতার উৎস – এই তত্ত্ব আজ আর প্রাকটিক্যালি চলে না। দুঃখজনকভাবে সাধারণ জনতা সেটা আইনগতভাবে প্রকাশ করারও অধিকার রাখে না। কারণ তাতে যে রাষ্ট্রকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাড়াতে হয়। রাষ্ট্র, যে স্বভাবতই কর্তৃত্বপরায়ন, সে তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই তাই এমন সব আইন ক’রে রাখে যা অনেক সময় জনগণের জন্যই কল্যাণকর হয় না। রাষ্ট্রীয় আইন তাই দূর্বলের রক্ষাকবচ না হ’য়ে হ’য়ে ওঠে কর্তৃত্ব প্রকাশের হাতিয়ার। রাষ্ট্র বা সরকার তার কর্তৃত্ব জাহির করে জনগণের উপরেই এবং তাকেই আবার জন-কল্যাণমুখি ব’লে প্রচার করে। সুবিধাভোগীরা উৎসাহী হয়ে প্রচারের পুরোভাগে চলে আসে। বিভক্ত জনগণ প্রচারণায় প্রতারিত হয় বারবার।

কিন্তু ষাটের দশকের কিছু উষ্ঞ তরুণ বোধহয় ততটা প্রতারিত হয়নি। তারা তাদের ব্যর্থতার গ্লানি প্রকাশ করতে পেরেছিল। এই দশকের তরুণেরা পারবে কিনা কে জানে? সেদিন গণতন্ত্রের জন্য আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজ নাকি আছে প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু সেটা যে কি তার সঙ্গা কে দেবে? নাকি শেষ পর্যন্ত এটাও সেই ধর্মের মতো একটা ক্লাসিক ফ্যালাসি হয়েই থাকবে? যে ধর্ম মানুষকে সর্বদা সত্য বলতে বলে সে নিজেই শোনায় যত বানোয়াট অসম্ভব গল্প। জনগণ যে গণতন্ত্র চেয়ে নিজেকে শক্তিশালী দেখতে চাই, তা আসলে তাকে ক’রে তোলে আরো দুর্বল।

যাপিত জীবন – ৮

বোধকরি তথাকথিত সেই মহান সংবিধান দিয়েই শুরু। তার কোন্ কোন্ সব পরিবর্তন-পরিমার্জন নাকি বৈধ নয়। হালের ট্রুথ কমিশনও বৈধতা পায় না হযতো বা সেই জোয়ারেই। একদিন যাকে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ হিসেবে গ্লোরিফাই করা হয়েছে আজ তাকেই এখতিয়ার বহির্ভুত ব’লে অপদস্ত করার উল্লাস। আহ!! কি উল্লাস!!

কত সহজে একযুগের মানুষকে, তাদের নায়ককে, তাদের কার্যকলাপকে আমরা মূল্যায়ন ক’রে ফেলি!! সময়ের অতিমূল্যায়ন আর সুবিধাবাদের অবমূল্যায়নের জাতাকলে মিশে যায় সবকিছু্ !!

গত দশকে জানা ফতোয়ার অবৈধতার বাণী পালটে গেল । আগামী দশকের আগেই কি আবার পালটে যেতে পারবে এই নতুন পরিবর্তিত বাণী? কি জানি… ফতোয়া আর ভার্ডিক্ট- মুখোমুখি, প্রতিদ্বন্দি… নাকি আপোসকামী দুই প্রতিষ্ঠাণের যাক্সট্রাপজিশন?

হয়তো, আপোসের আত্মবাসে এসব অনিবার্যই। ভাল-লাগা, নৈতিকতাও তাই নিতান্তই অপেক্ষিক। একবার বুদ্ধদেব বসুর কোনো একটা লেখায় পড়েছিলাম…

“আমারে করিতে মুগ্ধ যে-সুস্নিগ্ধ সুষমায় আপনারে সাজাতে সর্বদা,
তোমার সে-সৌন্দর্যরে ভালোবাসি (তোমারে তো নয়!)”

যাপিত জীবন – ৭

কত ঘটনাই না ঘটে! অথবা মানুষেরা কত ঘটনাই না ঘটায়। কিংবা মানুষ কিছুই ঘটায় না। ঘটনার ভেতর দিয়েই তাদেরকে যেতে হয়। আর সেই যাতায়াতেই কখনো বা ঘ’টে যায় এমন কিছু যার নিয়ন্ত্রণ না থাকে মানুষের হাতে না থাকে ঘটনার ঘনঘটায়। তা না হ’লে আড়িয়ল বিলে কেন এত মানুষ? অথবা কেন সেখানে মানুষের এত অনুপস্থিতি? মানুষ থাকে কোথায়? মানুষের থাকে কী? কী এত মহামূল্য তার? কি জানি…

মাঝে মাঝে খবর দেখি। টিভির পর্দায়। হয়তো শুধুই দেখি। বিনোদিত হইও খানিকটা। সেই টানে তাই আবার দেখি। নতুন কোনো খবর। বিকারহীন, অবিচলিত মনে বিনোদনের খোঁজে… কিন্তু এই সব আদিম দখল বেদখলের খবর কত আর বিনোদন দিতে পারে? অনেক দিনের গড়াপেটায় আমি/আমরা যে অদিম গন্ধে আর মুগ্ধ হই না। কি জানি, হয়তো হই। তাই খবরের থেকে খবর-পাঠিকার চিবুকেই অকৃষ্ট হ’য়ে পুলক খুঁজি। দিন কয়েক পরে ঠিকই হারিয়ে যবে হজা-মজা বিলের খবর। কিন্তু নতুন খবরপাঠিকার চালান ফুরোবে না। বিনোদন ফুরোবে না…

আবার, ফুরোবে যে না সেই নিশ্চয়তাই বা কে দিতে পারে? যে জীবনের মোক্ষ শুধু বেঁচে থাকা কতটুকু নিশ্চয়তা সে জানতে পারে?