নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা ১২

কেন গড়ে ওঠে শহর?
কে গড়ে তোলে শহর?
কে বা কি গড়ে দেয় শহরের মূল কাঠামো আর অবয়ব?

প্রশ্নগুলো বহু শতাব্দি প্রাচীন। তবে উত্তরগুলো আর আগের মতো ক’রে দেওয়ার উপায় নেই। ইতিহাসের পুরাতন শহরগুলো গড়ে ওঠার কারণ ছিলো নানাবিধ। প্রাচীন মিশরের থিবস, মেমফিস কিংবা আলেকজান্ড্রিয়ার বড় শহর হ’য়ে ওঠার কারণ একই ছিলো না। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা কিংবা মহেনজোদারো শহরগুলোর গড়ে ওঠা আর বিলুপ্তির কারণও বেশ ইউনিক বা অনন্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত। বল্লাল সেনের আর প্রতাপাদিত্বের শহরও বলে ভিন্ন ভিন্ন গল্প, একই বাংলার অংশ হ’য়েও।

একসময় সংকর-ধাতু ব্রোঞ্জের উপর নির্ভর ক’রে মানুষ বেশ কার্যকর অস্ত্রশস্ত্র বানাতে শুরু করে। একই সময়ে চাষাবাদের কাঠের উপকরণে ধাতুর প্রলেপ যুক্ত হ’তে শুরু করে। তাতে মাটি খোড়া সহজতর হয়। ফলে ফসলের উৎপাদন যায় বেড়ে। বাড়তে থাকে মানুষের আবাদ আর আবাস দুইই। ততদিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ প্ল্যান্ট ডমেস্টিকেশন বা গাছের গৃহপালিত-করণে বেশ সফল হ’য়েও উঠেছে। মনে রাখা দরকার আবাদ শুরুর আগে স্থায়ী আবাস তৈরী করা মানুষের পক্ষে একরকম অসম্ভবই ছিলো। আবাদ শুরু করার আগে মানুষকে নিতে হ’য়েছে হাজার হাজার বছরের প্রস্তুতি আর পর্যবেক্ষণজাত সিদ্ধান্ত। মানুষ দেখেছে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের উপর মানুষের বেঁচে থাকাটা কতটা নির্ভর করে। কিন্তু যেসব গাছ থেকে শর্করা পাওয়া যায় তারা বড্ড অদ্ভুত। কিছু ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের বীজ আর মাটির নিচে হওয়া আলুতে একে পাওয়া যায় বেশ ভালো পরিমাণে। বাংলাদেশের সিলেট, ভারতের আসাম কিংবা চীনের ইউনানের মানুষেরা এক ধরণের ঘাসের সন্ধান পায় মোটামুটি হাজার বিশেক বছর আগে। নাম দেয় ধান। বিজ্ঞানীরা বলেন সেই সময় ধানের শীষে ২/৩ টার মতো ধান হ’তো। সেই ধানগাছকে দীর্ঘ সময় ধ’রে সিলেকটিভ ব্রিডিং ক’রে ক’রে মানুষের তাকে আবাদযোগ্য ক’রে তোলার পরেই সম্ভব হয়েছে এই সব অঞ্চলে চাষবাসের গোড়াপত্তন করার। কাছাকাছি সময়ে মধ্য-এশিয়া আর য়ুরোপের মানুষেরা যব আর গমকে বাগে এনেছিলো। উত্তর আমেরিকার মানুষেরা ভুট্টা বা কর্ন আর দক্ষিণ আমেরিকার মানুষেরা নানা ধরণের আলুকে চাষযোগ্য ক’রে তুলেছিলো ইতিহাসের নানা পর্যায়ে। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে এই ধান, গম, যব, ভুট্টা আর আলুই শর্করা জাতীয় খাদ্যের মূল উৎস।

আর একটা খুব দরকারী জিনিস ছিলো লবণ। উষ্ঞ রক্তের প্রাণী হওয়ায় লবণ ছাড়া মানুষের পক্ষে শরীর গরম রাখা সম্ভব হয় না। সে লবণ নানা ধরণের হ’তে পারে। হ’তে পারে খনিজ লবণ, হ’তে পারে সমুদ্রের পানি থেকে পাওয়া লবণ কিংবা অন্য কোনো উষ্ঞ-রক্তের প্রাণীর রক্ত আর মাংসে থাকা লবণ। ফলে আবাদ আর আবাস এমন জায়গাতে গড়ে তুলতে হ’তো যেখানে লবণের নিশ্চয়তাও পাওয়া যায়। ফলে শুধু নদী থাকলেই বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হ’তো না মানুষের পক্ষে। বসতি গড়ে তোলার জন্য চাই নেভিগেবল বা নৌকা-চলার-উপযোগী নদী। যে নদীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় লবণ সারাবছর আনা-নেওয়া করা যেতো। মানুষের গৃহপালিত বেশির ভাগ প্রাণীর জন্যও লবণের এই ব্যাপারটা সত্য। লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গরু-ছাগল-মুরগী কাউকেই হয়তো গৃহপালিত করা যেতো না। গরু ঠিক কতটা বুদ্ধিমান প্রাণী জানি না, তবে লবণ যোগাড় করার পরিশ্রমসাধ্য কাজটা যে মানুষের ঘাড়ে সেই প্রাচীন কালেই তারা চাপিয়ে দিয়েছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাতে তাদের বেশ কিছু স্বাধীনতা স্যাক্রিফাইস করতে হ’লেও গড়পড়তা গরুদের দৈনন্দিন জীবন যে সহজতর হয়েছিলো তা মানতেই হবে, এমনকি গরুদেরকেও।

এখন বলা যায় যে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আমরা মোটামুটি জানি। যেসব মানুষ শর্করা আর লবণের উৎস নিশ্চত করতে পেরেছে তারাই প্রথমে গড়ে তোলে আবাস, পরবর্তীতে গ্রাম; আরো আরো পরবর্তীতে শহর। কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই তাদের সবাই নয়। ইতিহাসের সব গ্রাম শহরে রূপান্তরিত হয়নি। বা সব গ্রামের মানুষ তাদের গ্রামকে শহর বানিয়ে ফেলেনি বা ফেলতে চায়নি বা হয়তো পারেওনি। এখানে এসেই উত্তরটা আবার যেন একটু ধোঁয়াটে হ’য়ে ওঠে। যদি জানা যায় কেন গড়ে ওঠে শহর তাহ’লে হয়তো সেই ধোঁয়ার খানিকটা সরিয়ে দেওয়া যায়।

সহজ ক’রে ব’লতে গেলে ব’লতে হয়, শহর গড়ে ওঠে বাড়তি কিছু সুবিধা তৈরীর জন্য, বাড়তি কিছু নিশ্চয়তা গড়ে তোলার জন্য, বাড়তি কিছু সেবা পাওয়ার জন্য; যে সুবিধা, নিশ্চয়তা কিংবা সেবা শুধু বসতি বা গ্রাম থেকে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না কারণ অল্প মানুষের বসতি কিংবা আয়োজন দিয়ে এমনতরো সুবিধা, নিশ্চয়তা কিংবা সেবাকে টেকসই বা ভবিষ্যসহ করা যায় না। অনেকগুলো বসতির মানুষ মিলে তাই গড়ে তুলতে হয় কোনো একটা শহর। শহর তাই মূলগত ভাবে সেবা আর সুযোগের উৎপাদক। সেই সাথে তার চারপাশের গ্রামগুলোতে উৎপাদিত প্রাথমিক পণ্যের বড়সড় ভোক্তা। সেই অর্থে গ্রামের প্রয়োজনেই শহরের গোড়াপত্তন। আবার গ্রামের প্রয়োজনেই শহরের রূপান্তর।

যে ধরণের প্রয়োজন মেটানোর তাগিতে কোনো শহর গড়ে ওঠে তার চরিত্রে বা বৈশিষ্ট্যে সেসব প্রয়োজনের বেশ কিছু ছাপ তাই থেকে যায়। আবার শহর বা শহরের মানুষের কোনো কিছু ভোগ করার ধরণও এক্ষেত্রে কম ভূমিকা রাখে না। শহরের মানুষের প্রধান খাবার কি, পোশাকের ধরণ কেমন, বাড়িঘরের উপকরণ কেমন (মাটি, কাঠ, বাঁশ, ইট, পাথর ইত্যাদি) তা মোটামুটি নির্দিষ্ট করে দেয় শহরকে ঘিরে রাখা গ্রামগুলোই; তাদের সরবরাহ করা উৎপাদিত পণ্যগুলোর মাধ্যমে।

বহু শতাব্দির ব্যবধানে হয়তো আস্তে আস্তে কিছু কিছু শহরের ভেতরে যোগাযোগ গড়ে উঠতে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিই সম্ভবত মূল ভূমিকা রেখেছিলো তাতে। বড়সড় নৌকা বা জাহাজ কিংবা চাকা-বসানো গাড়ি আবিষ্কার করার পর মানুষের পক্ষে আরো দূরের দূরত্বে যোগাযোগ করা সহজ হয়। কিন্তু শুধু প্রয়োজনের নিরিখে হয়তো এই নতুন উপযোগকে বহুল ব্যবহার করার যৌক্তিকতা পাওয়া যাবে না। সে যৌক্তিকতা তৈরীর জন্য চাই নতুন কোনো ভাবনা, নতুন কোনো আইডিয়া। প্রয়োজন নতুন কিছু টুল বা আয়ুধ- ধর্ম, ভাষা, সাম্রাজ্য ইত্যাদি।

আমাদের আজকের দৃশ্যমান সবগুলো শহরের পেছনে এই পুরাতন ভাবনাগুলো তো ক্রিয়াশীল আছেই, সেই সাথে যোগ হ’য়েছে আরো হাজারো ভাবনা, হাজারো চাহিদা। আর তাই আজকের শহর অতীতের যে কোনো সময়ের বেশিরভাগ শহরের চেয়ে জটিল; অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিশৃঙ্খল আর অধিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। ফলত অনেকটাই দুর্বোধ্য।

এই প্রেক্ষাপটে উপরের প্রশ্নগুলো ঢাকার জন্য ক’রলে কেমন হয়?
কেন গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর?
কে গড়ে তুলেছে রাজধানী ঢাকা?
কি দিয়ে গড়া ঢাকা শহরের অবয়ব?

খুব সংক্ষেপে এই প্রশ্নগুলোর সর্বজন গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়া যাবে না ব’ললেই চলে। কিন্তু তাই ব’লে প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়াটাও ঠিক হবে না হয়তো, যদি সামনের দিকে আগাতে চাই। উত্তরগুলো হয়তো একই রকম হবে না সব/সবার পরিপ্রেক্ষিত থেকে। কিছু বিতর্ক, কিছু সন্দেহ, কিছু মন-গড়া রোম্যান্টিসিজম থেকেই যাবে। রাজনীতিকের উত্তরের সাথে প্রকৌশলী আর পরিকল্পকের উত্তর মিলবে না। নাগরিকের উত্তরের সাথে মিলবে না শাসকের উত্তর। ব্যবসায়ীর উত্তরের সাথে ভোক্তার উত্তর। উৎপাদকের সাথে মধ্যসত্ত্বভোগীর উত্তরও আলাদাই হবে। আলাদা হবে ঐতিহাসিক আর অর্থনীতিকের উত্তরও। কিন্তু সবার উত্তর নিয়েই গড়ে ওঠে কোনো একটা শহরের সামগ্রিক বয়ান বা ন্যারেটিভ। আজকের দিনের শহরগুলো অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা হ’য়ে ওঠে তার এই বয়ানের পার্থক্যের জন্যই মূলত।

তার কারণও মোটামুটি জানা। সবকিছুর অতিপ্রমিতকরণ। তাতে গঠনপ্রক্রিয়া দ্রুত করা গেলেও বৈচিত্র্যের প্রশ্নে বেশ বড়সড় একটা ছাড় দিতেই হয়েছে। আবার জাহাজীকরণে কন্টেইনারের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে স্থানীয় নির্মাণ-উপকরণ ব’লে আর যেন কিছু থাকলো না। আজ সহজেই ইটালির মার্বেল দিয়ে ঢাকার ভবনের মেঝে সাজানো যায়। ঢাকায় সেলাই করা কাপড় পৃথিবীর সবখানে সহজেই পারা যায়। ভারতে উৎপাদিত টিকা নিতে পারে এখন সব মহাদেশের মানুষ। এক কন্টেইনারাইজেশনই সংকুচিত ক’রে এনেছে পৃথিবীর শহরগুলোর হাজারো বৈচিত্র্যের সুযোগ, যা কিনা পণ্য যোগাযোগের মাত্র একটা মাধ্যম। যখন একসাথে আরো অনেকগুলো মাধ্যমকে বিবেচনা করা হবে তখন দেখা যাবে একুশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো যেন খুব কাছাকাছি লয়ে কথা বলে, হয়তো সকলে মিলে একই কথাও বলে। সমস্ত মানুষের  স্বার্থগুলো, ভাবনাগুলো যেন সব এক হ’য়ে গিয়েছে একুশ শতকের শহরে এসে। আবার হয়তো যায়ওনি, খুব খেয়াল করলে তা হয়তো বোঝা যায়… ডেভিলস রাইট দেয়ার রাইট দেয়ার ইন দ্য ডিটেইলস… (Fink এর লুকিং ঠু ক্লোজলি থেকে… https://www.youtube.com/watch?v=qoWRs7lXtYE)

তাই শেষ বিচারে প্রতিটা শহরই আলাদা। প্রতিটা শহরের শব্দ আলাদা। প্রতিটা শহরের আকাঙ্ক্ষা আলাদা। প্রতিটা শহরকে তাই একই ভাবে পাঠ করা যায় না। যায় না তার অতীতের কারণে। যায় না শহরের মানুষগুলোর কারণে। যায় না মানুষগুলোর বসবাসের ধরণের বৈচিত্র্যের কারণে। মানুষের বসবাসের ধরণের দৃশ্যমান বৈচিত্র্য শহরের আবাসিক ভবনগুলোর চেহারা গড়ে দেয় অনেকটাই। অনেকেই তাই ব’লতে চান, আবাসিক ভবনগুলোই গড়ে দেয় শহরের অবয়ব। কেউ কেউ অবশ্য শহরের রাস্তাগুলোর কথা প্রথমে বলেন। হয়তো শহরের অবয়ব গড়তে এই দুইয়ের ভূমিকাই সবার আগে আসে। কিন্তু শহর তো সভ্যতার উপযাত আর সভ্যতার জন্য চাই খানিকটা হ’লেও রাখঢাক কিংবা পোশাক। সভ্যতার সবকিছু তো আর প্রকাশ করা যায় না; তার অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতে হয়। একটা ভালো শহর জানে তার কতটা লুকিয়ে রাখতে হবে আর কতটা প্রকাশ করতে হবে আগন্তুকের কাছে।

শহরের তাই ভেতরের কাঠামো আর পোশাকী অবয়বে পার্থক্য অনিবার্য। শহরের আগন্তুকের কাছে সেটা সবসময় ধরা না পড়লেও শহরের নিয়মিত বাসিন্দাদের চোখে তা ধরা পড়তে বাধ্য। আগন্তুক হয়তো দেখে পরিস্কার রাস্তা। শহরবাসী জানে রাস্তা পরিস্কারের কাজ করা গরীব আর নোংরা মানুষগুলোর কথা। আগন্তুক হয়তো দেখে কোনো একটা উদ্যানের গাছ না কাটার জন্য একদল শহরবাসী আন্দোলন করছে। আর শহরবাসীরা জানে তারা নিজেদের বাড়ির সামনের সব গাছ কেটে ফেলেছে এতদিনে, তাই উদ্যানটার গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখা তাদের জন্য কতটা দরকারী। আগন্তুক দেখে প্রতিটা ভবনের চারপাশে উঁচুউঁচু দেওয়াল, ফলে নিরাপদ শহর। শহরবাসী জানে এক ভবনের বাসিন্দা পাশের ভবনের বাসিন্দাকে কতটা অবিশ্বাস করে।

দিন শেষে শহরের কিছুই কি আর গোপন থাকে? অন্তত যে বা যারা প্রতিনিয়ত গড়ে চলেছে তাদের নিজেদের শহরটাকে? সব কিছু প্রকাশ হ’য়ে গেলে কি আর সভ্যতা থাকে?

নোট : সচলায়তনের জন্য লেখা। এখানে সংরক্ষণ করলাম। কিছু টাইপো ঠিক করে। লিংকটাও রেখে দিলাম।
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/58004

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা ১২

পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতে না পারলে তার পরিণতিতে সমাজে ক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে ব’লে লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক করেছিলেন। (১) এই পর্যাপ্ত ব্যাপারটা খুব নির্দিষ্ট ক’রে যে বলা যাবে তা হয়তো নয়। সমাজ, শহর, অর্থনীতি ভেদে এই পর্যাপ্ততার ব্যাপারটা ওঠানামা করে এবং করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ ধারাবাহিক ভাবেই বাড়ছে গত কয়েক দশক ধ’রে। তার পরিণতিতে দেশে ভালো মানের আবাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনও বাড়ছে। দেশে ভবন নির্মাণের গড় গুণগত মান যে বাড়ছে তাতে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সুউচ্চ ভবন আমাদের কাছে বেশ পরিচিত হ’য়ে উঠতে শুরু করেছে। এমনকি সেটা ঢাকা শহরের বাইরেও।

সম্প্রতি সরকারী উদ্যোগে নতুন যে সব আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা হচ্ছে তার অনেকগুলোর উচ্চতাই দশ তলার বেশি। এই আবাসন ব্যবস্থাগুলোর কিছু সরকারী কর্মচারীদের জন্য, ফলে বিক্রির জন্য নয়। অনেকগুলো জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে করছে, যেগুলো বিক্রির জন্য। সামরিক আর আধাসামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ক’রে গ’ড়ে তোলা আবাসিক সুবিধাগুলোর অনেকগুলোই ১৪/১৫ তলার কাছাকাছি উচ্চতার।

ঢাকা আর চট্টগ্রামে এখন যে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮) চালু আছে তাতে রাস্তা যদি তুলনামূলক প্রশস্ত হয় তবে তার পাশের জমিতে মোটামুটি ১৪ তলার আবাসিক ভবন তৈরীর অনুমতি পাওয়া যায়, যদি না জমির আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিমাণের কম হয়। আবার একটু উল্টো ক’রে ব’ললে যেহেতু এ্যাপার্টমেন্ট ভবনের (এ-২ টাইপ ভবন) জন্য সর্বোচ্চ ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) ৬.৫ নির্ধারণ করা আছে, আর সে ক্ষেত্রে নিচতলা আর জামিনদোজ (বেইজমেন্ট) ব্যতীত অন্যান্য তলার জন্য জমির সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ জায়গা সীমাবদ্ধ করা আছে সেহেতু ১৪ তলার উপরে আবাসিক ভবন তৈরীর সুযোগ গিয়েছে কমে। যদিও চাইলে ভূমি-ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে আরো উঁচু আবাসিক ভবন তৈরীর অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা করতে ডিভেলপারদেরকে দেখা যায় না বললেই চলে। তার একটা কারণ অর্থনৈতিক আর একটা কারণ সিভিল-এ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া উচ্চতার সীমা, সেটা খুব কম ক্ষেত্রেই ১৫০ ফুটের বেশি হয়। ফলে ঢাকার বা চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনের উচ্চতা ১৪ তলার ভেতরে সীমাবদ্ধ হ’য়ে পড়ছে; বাস্তব বিবেচনায়।

ওয়াল্ডএ্যাটলাস.কম এর অক্টোবর ০৪, ২০২০ এর একটা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে জনঘনত্বের দিক দিয়ে পৃথিবীর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা বর্তমানে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে। (২) এই প্রতিবেদনের মতে ঢাকাতে প্রতিবর্গকিলোমিটারে ২৯০৬৯ জন মানুষের বাস। আবার ওয়াল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিঙ্গাপুর সিটিতে প্রতিবর্গকিলোমিটারে বাস করে ৮৩৫৮ জন মানুষ। আর উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে জন-ঘনত্বের বিবেচনায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৫৫ তম। (৩) সেখানে প্রতিবর্গকিলোমিটারে বাস করে ১৬৬৬১ জন মানুষ।

জন-ঘনত্বের সাথে শহরের ভবনগুলোর উচ্চতার একটা সম্পর্ক নিশ্চয় থাকে। সেটা শুধু ছবি দেখে হয়তো নিশ্চিত করা যাবে না। তার জন্য যথাযত সমীক্ষা হওয়া দরকার। শুধু ছবি দেখে যেটা বলা যায় তা হ’লো সিঙ্গাপুর-সিটি বা হংকং এর সাপেক্ষে ঢাকা বা চট্টগ্রামের ভবনের উচ্চতা বেশ কম। যেহেতু অধিক উঁচু ভবনের নির্মাণ-খরচ মাঝারি-উঁচু ভবনের তুলনায় কম সেহেতু আশা করা যায় ঢাকা বা চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনের নির্মাণ-খরচ সিঙ্গাপুর কিংবা হংকং এর সুউচ্চ আবাসিক ভবনের অনুপাতে কম।

কিন্তু নির্মাণ-খরচ কম হ’লেই যে সেটা এ্যাফোর্ডেবল হবে তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ তার সাথে অনেক সামাজিক আর অর্থনৈতিক সূচক জড়িত। গড় হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় কম হ’লে তাদের পক্ষে অনেক কম-দামী জিনিসও কেনা সম্ভব নাও হ’তে পারে। প্রাপ্ত তথ্য ব’লছে সিঙ্গাপুরের ৯০ শতাংশের বেশি লোকজনের এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা আছে। ঢাকার জন্য এমন তথ্য বা পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া কঠিন। অল্প কিছু নমুনা যোগাড় করার চেষ্টা করেছি। কিছু বিল্ডিং পেয়েছি যার মালিক কোনো একক ব্যক্তি। নিজে একটা এ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। বাকিগুলো ভাড়া দেন। কিছু বিল্ডিং পেয়েছি যার মালিকানা কয়েকজন আত্মীয়ের মধ্যে ভাগ করা। কেউ কেউ নিজেই থাকেন, কেউ কেউ ভাড়া দেন। বেশ কিছু বিল্ডিং ডিভেলপারের বানানো। তার কিছু এ্যাপার্টমেন্টের মালিক ল্যান্ডওনার। বাকিগুলো যারা কিনেছেন তারা কেউ একটা কিনেছেন কেউ বা একাধিক। অনেকেই এ্যাপার্টমেন্ট কিনে ভাড়া দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেই থাকছেন। ব্যক্তিগতভাবে ধানমন্ডি, মোহম্মদপুর, শ্যামলী আর মিরপুরের মোট ২২টা আবাসিক বিল্ডিঙের সমীক্ষা করে তার ৭২% এ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছি যেগুলো ভাড়া নেওয়া। এই নমুনা সমীক্ষাকে স্ট্যানডার্ড হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবু বলা যায় যে ঢাকাতে নিজেদের মালিকানায় থাকার জায়গার সংস্থান আছে এমন মানুষের সংখ্যা ঢাকার মোট জনসংখ্যার ৪০% এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম।

বাসগৃহের মালিকানার সাথে শহরের জন-ঘনত্ব আর লিভিং-স্ট্যানডার্ডের বেশ সম্পর্ক আছে। শহরের জন-ঘনত্বের সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নিবিড়ভাবে জড়িত। সামান্য কিছু তুলনামূলক তথ্য সংগ্রহ ক’রে আর তা হিসাব ক’রে পেয়েছি যে ধানমন্ডি আর গুলশানের জন-ঘনত্ব মিরপুর আর মোহম্মদপুর থেকে অনেক কম। অথচ ধানমন্ডি আর গুলশানের বিল্ডিংগুলোর গড় উচ্চতা বেশি। সুনির্দিষ্ট উপাত্ত তৈরী না ক’রেও বলা যায় যে জন-প্রতি অনেক বেশি বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করে গুলশান, ধানমন্ডি আর উত্তরার বাসিন্দারা মিরপুর, মোহম্মদপুর কিংবা করাইল বস্তির বাসিন্দাদের অনুপাতে।

বাংলাদেশের একজন মানুষের মোটামুটি মানের আধুনিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করার জন্য ঠিক কত বর্গফুট জায়গা দরকার তার কোনো সরকারী উপাত্ত কিংবা দিকনির্দেশনা দেই। জাতীয় আবাসন নীতিমালাতে এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তাভাবনাও নেই। এই ২০২০ এ দেশের মানুষ-প্রতি কত বর্গফুট জায়গা তার থাকার জন্য স্থায়ী অবকাঠামোতে আছে তার কোনো তথ্য-উপাত্তও এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। ফলে আমাদের হাতে থাকা জন-ঘনত্বের পরিসংখ্যানটা শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার উপযোগী নয়।

আবার কোনো একটা স্থানের জন-ঘনত্বের সাথে সেই স্থানের প্রাকৃতিক কিছু বৈশিষ্টও সম্পর্কিত। ঐতিহাসিক ভাবেই ঢাকা এবং তার আশপাশের কিছু এলাকার জন-ঘনত্ব বেশি। সীমানা আরো একটু প্রসারিত ক’রে দেখলে দেখা যায় বাংলা ব-দ্বীপ অঞ্চলে মানুষের জন-ঘনত্ব তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বেশিরভাগ সময়ই বেশি ছিলো। এই তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে প্রাকৃতিক ভাবেই এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা অধিক সংখ্যক মানুষের বসতিকে ধারণ করতে পারে। তবে এই অধিক-সংখ্যক ব্যাপারটার নিশ্চয় একটা সীমা আছে। ঠিক কত সংখ্যক মানুষকে আজকের পরিস্থিতিকে ঢাকা শহরে স্বাস্থকর উপায়ে বসবাস করানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করা দরকার। সেটা না ক’রে শুধু বাজারের চাহিদার উপর নির্ভর ক’রে এই শহরের বাসযোগ্যতার মান বাড়ানো নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব হওয়ার সুযোগ বেশ সীমিত।

ঢাকার অধিক জন-ঘনত্বের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। এবং দরিদ্র মানুষই মূলত অল্পপরিসরে আটোসাটো পরিবেশে বসবাস করে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নতি জন-ঘনত্ব কমিয়ে আনার একটা কার্যকর উপায় হ’তে পারে।

টিকা ও সূত্র:

১. if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation. লি কর্বুজিয়ের

২. https://www.worldatlas.com/articles/the-world-s-most-densely-populated-cities.html

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_cities_proper_by_population_density

পুনশ্চ:
১. এ্যাফোর্ডেবল এর প্রচলিত বাংলা যদিও সাশ্রয়ী তবুও এটা সঠিক কিনা বলা শক্ত। কিনতে পারার সক্ষমতা শুধু মাত্র কম মূল্যমানের উপর নির্ভর করে না।
২. সচলায়তনের জন্য লেখা। এখানে সংরক্ষণ করলাম
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57909

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা-৯

ইউএন হ্যাবিটেট বা জাতিসংঘ বসতি টেকসই প্রতিবেশ পরিকল্পনার (sustainable neighbourhood planning) উদ্দেশ্যে নতুন যে কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে সেখানে নিচের পাঁচটি নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ঘোষণা করছে-

১. রাস্তা আর রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা : রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ থাকা দরকার। সেই সাথে প্রতি বর্গকিলোমিটারের জন্য কমপক্ষে ১৮ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা থাকতে হবে।

২. অধিক জনঘনত্ব: প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ১৫,০০০ মানুষ। সেই হিসাবে প্রতি হেক্টরে ১৫০ জন বা প্রতি একরে ৬১ জন।

৩. জমির মিশ্র-ব্যবহার: যে কোনো প্রতিবেশে মেঝের (floor area) মোট পরিমাণের অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থকরী কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা উচিৎ।

৪. সামাজিক সংমিশ্রণ (মিক্সের বাংলা হিসেবে সংযোগও হ’তে পারে এক্ষেত্রে): প্রতিটা প্রতিবেশে বিভিন্ন দাম আর মেয়াদের বাসার সংস্থান থাকতে হবে যেন তা নানা আয়সীমার মানুষকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে পারে। আবাসনের জন্য থাকা মোট মেঝের অন্তত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ নিম্নআয়ের মনুষের আবাসনের জন্য (লো-কস্ট হাউজিং) রাখা উচিত। আর বিশেষ কোনো মেয়াদী-নমুনাই (টাইপ) পুরো প্রকল্পের অর্ধেক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

৫. জমির নির্দিষ্ট ব্যবহারের সীমা: একটা জায়গা বা প্রতিবেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য গ’ড়ে না তোলার জন্য; কোনো একটা উদ্দেশ্য (ফাংশন) সমাধার জন্য তৈরী করা ব্লক যেন কোনো প্রতিবেশের মোট জায়গার ১০ শতাংশের বেশি জায়গা নিয়ে না নেয়।

যেহেতু সারা পৃথিবী জুড়েই নগরীর চৌহদ্দি বাড়ছে, বলা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট মনুষ্য জনসংখ্যার অর্থেকই নগরে বাস করবে, সেই হেতু ভবিষ্যতের নগরীকে কিভাবে টেকসই হিসেবে গ’ড়ে তোলা যায় সেটা এই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জাতিসংঘ বসতি এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে তারা এই বিষয়ে অনেক ধরণের গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেছে। টেকসই প্রতিবেশ বা পাড়া নিয়ে তাদের কিছু আলোচনার সাথে ঢাকার বর্তমান আর ভবিষ্যতের বেড়ে ওঠার ধরণ/ধরণগুলোকে মিলিয়ে দেখার একটা চেষ্টা এই লেখাটা।

নেইবারহুড ব’লতে পাড়া, মহল্লা বা প্রতিবেশ যা-ই বলি না কেন নগরের চরিত্র তৈরীতে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটা সময় নারিন্দা আর গ্যান্ডারিয়া মহল্লাগুলোর চরিত্র বেশ আলাদা ক’রেই সনাক্ত করতে পারতেন এর অধিবাসীরা। এখনো হয়তো মিরপুর আর ধানমন্ডির বৈশিষ্ট্যগুলোও বেশ মোটাদাগেই সনাক্ত করা যায়। এই মোটাদাগের একটা বিষয় হ’লো এই জায়গাগুলোর রাস্তাগুলো। তুলনামূলকভাবে যেমন ধানমন্ডির রাস্তাকে প্রশস্ত বলা যায়, ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেখানকার রাস্তাগুলোতে ফুটপাথের উপস্থিতি আছে, কোনো কোনো জায়গাতে রাস্তার সাথেই বড় বড় গাছের সমাবেশ আছে। আর মিরপুরের আবাসিক প্লটগুলোর সংলগ্ন রাস্তার প্রশস্ততা ২০ ফুট থেকে ২৫ ফুটের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। ফলে সেসব রাস্তাতে ফুটপাথ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেইও। অথচ মিরপুরের রাস্তাতেই পায়ে হাঁটা মানুষের ভীড় থাকে বেশি।

আবাসিক এলাকার ধরণের সাথে তাই এর রাস্তার প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভরশীল। আবাসিক প্লটের আকার আর সেখানে বাস করা অধিকাংশ মানুষের আয়সীমার উপর নির্ভর করে কোনো এলাকার আবাসনের ধরণ। যাদের আয়ের সীমা উপরের দিকে তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকে। নিম্ন-আয়ের মানুষের প্রবণতা থাকে গন-পরিবহন (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) ব্যবহারের দিকে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন আয়-সীমার মানুষের বসতি নিয়ে গ’ড়ে তোলা পাড়াগুলোর রাস্তার ধরণে আর পরিমাণে ভিন্নতা থাকাবেই। জাতিসংঘ বসতি যে অন্তত ৩০ শতাংশ জমি রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য বরাদ্দ রাখতে বলছে তা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই। কিছু পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে বর্তমানে ঢাকা শহরের মোট জমির ৯ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আর ৬ শতাংশ জায়গা পাকা বা পেভমেন্টের (চিপা-গলিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত) জন্য আছে।(১) জাপানের টোকিওতে শহরের মোট জমির ১৬ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আছে। মোটামুটি ভাবে বলা হয় বেশ কিছু উন্নত শহরে রাস্তার পরিমাণ শহরের মোট জমির ২৫ শতাংশের কাছাকাছি।

অর্থাৎ জাতিসংঘ বসতি রাস্তার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে নিতে পরামর্শ দিচ্ছে। ঢাকার মতো একটা পুরোনো শহরে সেটা করা সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে দেখার মতো। তবে শহরের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে যে দিকগুলোতে সেখানে রাস্তার পরিমাণ বৃদ্ধির একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। উত্তরা থার্ড-ফেইজ বা পূর্বাচলে রাস্তার পরিমাণ ২৫ শতাংশের কাছাকাছি ব’লেই দাবি করা হয়। রাজউক ব’লছে পূর্বাচলের মোট জমির ২৫.৯ শতাংশ রাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।(২) এটা থেকে ধ’রে নেওয়া যায় এই এলাকাগুলো মোটামুটিভাবে উঠতি মধ্যবিত্ত্ব আর উচ্চবিত্ত্বের মানুষের আবাসন আর কাজের জায়গার প্রয়োজনকে মাথায় রেখেই করা হয়েছে।

শহরের জন-ঘনত্বের ব্যাপারে জাতিসংঘ বসতি যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫০০০ মানুষের থাকার কথা বলছে সেটাও হয়তো ঢাকাতে নিশ্চিত করা যাবে না। এখনই ঢাকাতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩০০০ এর উপরে মানুষ বাস করছে। দিন দিন সেই ঘনত্ব আরো বাড়ছে। আর বাড়ছে ব’লেই কমছে পড়ে থাকা জমির পরিমাণ। যেমন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বা আফতাব নগরের ফাঁকা প্লটগুলোতে প্রতিদিনই তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। আবার গুলশান বা ধানমন্ডির দোতলা আর ছয়তলা ভবনগুলোর বেশির ভাগ এরই ভেতরে ১৪ তলা হ’তে শুরু করেছে। যে গতিতে এই ভবনগুলোর সংখ্যা বাড়ছে তার সাথে আনুপাতিক হারে বাড়ছে ঢাকার জন-ঘনত্ব। ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান জন-ঘনত্ব নিকট ভবিষ্যতে ঠিক কতটা টেকসই কিংবা বাসযোগ্য হবে সেটা এই মুহূর্তে বলা শক্ত। তবে ঢাকার জন-ঘনত্বের সাপেক্ষে এর ভবনগুলোর গড়পড়তা উচ্চতা যে বেশ কম, পৃথিবীর অন্য বড় শহরগুলোর অনুপাতে, তা নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। এ থেকে বলা যায় ঢাকার মানুষের জনপ্রতি ব্যবহৃত জায়গা বা বর্গফুটের পরিমান খুবই কম। দ্বিতীয়ত ভবনগুলো যেহেতু উচ্চতায় বেশি নয় সেহেতু তারা বেশ গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। দুই কারণেই ঢাকার বাতাসের গুণগত মান কমছে। আবাসিক ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ঢুকতে পারছে না। সব মিলিয়ে ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলো, সে এর উচ্চবিত্ত্বের আবাসিক এলাকাগুলোও, বসবাসের পক্ষে যথেষ্ট স্বাস্থকর থাকছে না। রেম কুলহাস কিছুদিন আগে মানুষের এত ঘন-বসতিপূর্ণ শহর তৈরীর আগ্রহকে সমালোচনা করেছেন, এই করোনা-মহামারিকে বিবেচনাতে নিয়ে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে শহরে বসবাসের কথা ব’লে তাদেরকে একধরণের অস্বাস্থকর পরিবেশে টেনে আনা হচ্ছে ব’লে মনে করছেন তিনি।

আবার পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে নগরের সংখ্যা আর আয়তন বৃদ্ধি করা ছাড়া এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে ব’লেও মনে হয় না। মনে রাখা দরকার এখন মূলত বয়স্ক মানুষের সংখ্যাই বাড়তির দিকে। আর বয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজন বাড়তি চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার সংস্থান শহর ছাড়া করা সম্ভব নয়। ফলে শহর বা নগরের সংখ্যা বৃদ্ধিও একটি বাস্তবতা। এই অবস্থাতে শুধুমাত্র ঢাকাকে আয়তনে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়ে আগালে খুব কার্যকর ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। ২০/২৫ বছর পরও ঢাকাকে টেকসই একটা শহর হিসেবে দেখতে চাইলে প্রয়োজন এখনই বেশ কিছু মাঝারি আকারের শহরকে বড় শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া। আমরা সুযোগ পেলেই বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি। সেটা সম্ভবত সঠিক সমাধান নয় এই ক্ষেত্রে। ১৬ থেকে ২০ কোটির দিকে যেতে থাকা জনগোষ্ঠির নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজন বহু-কেন্দ্রীকরণ।  অর্থাৎ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ নগর বা কেন্দ্র তৈরী করা। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ঠিক কতগুলো বড় নগর তৈরী করা প্রয়োজন তা নিয়ে সমীক্ষা হওয়া উচিত। সচেতন ভাবে না হ’লেও সরকার হয়তো সেই দিকে যাচ্ছে ব’লে মনে হচ্ছে যদিও খানিকটা। যেমন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট আর খুলনাতে চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর উদ্যোগ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি নতুন এমবিবিএস করা ডাক্তাররা শুধুমাত্র উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ঢাকাতে থাকতে বাধ্য হন। কারণ ঢাকার বাইরে এ ধরণের কোনো সুযোগ দেশে নেই।

ঘূর্ণিঘড় সিডর আর আয়লার পর উপকূলীয় এলাকা থেকে অনেক মানুষকে কাজের খোঁজে ঢাকাতে চ’লে আসতে দেখেছি। ঢাকা এই মানুষগুলোর জন্য তখন কতটা প্রস্তুত ছিলো বলা কঠিন। কিন্তু আমাদের যদি আরো কিছু বড় শহর থাকতো তবে হয়তো দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে ঢাকার উপরে জন-ঘনত্ব বৃদ্ধির চাপটা একটু কম পড়তো। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথেও এর সম্পর্ক আছে।

এবার আসি জমির মিশ্র ব্যবহার প্রসঙ্গে। ঐতিহ্যগত ভাবেই আমাদের বাঙালিদের জীবনাচরণে মিশ্র-ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এবং তা বেশ বেশি ভাবেই আছে। গ্রামের চাষী-বাড়িতে, কুমার-বাড়িতে একটা উঠান আগে থাকতই। পানাম নগর কিংবা পুরোনো ঢাকার আগের বাড়িগুলোর অনেকগুলোই উঠানের উপকারিতা মেনে তৈরী হয়েছিলো। রূপলাল হাউজে এখনো কিছু উঠান দেখা যায়। এই উঠান মিশ্র-ব্যবহারের সংস্কৃতির উদাহরণ। আমাদের পুরোনো বাড়িগুলোতে, সে গ্রামের দোচালা বা চারচালা ঘরগুলোতেও, প্রশস্ত বারান্দা থাকতো। এই বারান্দাগুলোতে দিনের নানা সময়ে নানা ধরণের কাজ করা হ’তো। ফলে ভারী আর জড়োয়া ফার্নিচার সেখানে রাখা হ’তো না বললেই চলে। তাতে সহজেই প্রয়োজন অনুযায়ী পরিসরের চরিত্রকে পাল্টে নেওয়া যেতো। দুপুরে যেখানে ব’সে বাড়ির লোকজন পাটি পেতে খেয়ে নিতে পারে সেখানেই হয়তো বিকালে আড্ডা বসে। বা বর্ষার সময় কাঁথা পাতা আর সেলাই করার আয়োজন হয়। ফসলের মাড়াই আর প্রক্রিয়াকরণের নানা কাজ উঠানে করা হতো। ফলে আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে মিশ্র-ব্যবহারের পরিচয় আছেই। এখন এটাকে শহরের সাথে সম্পৃক্ত ক’রে নেওয়া যায় কিভাবে সেটা ভেবে দেখতে হবে।

আবাসন, নাগরিক সুবিধা (সার্ভিস) আর পেশাগত কাজের জায়গাগুলোকে কিভাবে বিন্যস্ত করা যায় সেটা নিয়ে নতুন ক’রে ভাবার সময় এসেছে। ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সময় কালে পৃথিবীব্যাপী শহরের বৃদ্ধি আর পরিকল্পনাতে যে ভাবনাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তাতে মিশ্র-ব্যবহারকে এড়ানোর প্রবণতা ছিলো প্রচণ্ডভাবে। তখনকার নতুন প্রযুক্তিগুলো একরকম বাধ্য করেছিলো সেটা করতে। ফলে অফিস পাড়া, কারখানা এলাকা, পার্ক, বাজার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আর আবাসনের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এতদিন। তাতে ব্যবহার অনুযায়ী গ’ড়ে ওঠা এক ধরণের জায়গা থেকে আর এক ধরণের জায়গাতে মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন বেড়েছে। তাতে বেড়েছে রাস্তা আর গাড়ির প্রয়োজনীয়তাও। ফলস্বরূপ অটো-মোবাইল কারখানার চাহিদা বেড়েছে। অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। সেই সাথে দূষণ আর যানজটের যন্ত্রণা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। শহর পরিকল্পনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা অনেকেই তাই এখন মনে করছেন অফিস পাড়া, কারখানা কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা এমনতরো স্পষ্ট ভাগ না ক’রে মিশ্র-উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। তাতে মানুষের সময় আর অর্থেরও সাশ্রয় করা সম্ভব।

পুরাতন ঢাকাতে এখনো অনেক ভবন আছে যার নিচতলাতে ব্যবসার জয়গা আর উপরে মানুষের আবাস। কোথাও কোথাও হয়তো কারখানাও আছে। তবে সেই কারখানাগুলো নিরাপত্তার প্রশ্নে কতটা যুক্তিসংগত সেটা বিশ্লেষণ করে দেখার সময় এসেছে। মিরপুর আর মোহম্মদপুরের অনেক আবাসিক ভবনের নিচের তলাতে এ্যাম্ব্রয়ডারির ম্যাশিন দেখা যায়। এটা কতটা ঝঁকিপূর্ণ জানি না, তবে মিশ্র-ব্যবহার হিসেবে বেশ কর্যকর ব’লে মনে হয়েছে। জমির মিশ্র-ব্যবহার ভবন কেন্দ্রিক হ’তে হবে এমনও নয়। একটা বড় জমি বা ব্লক কেন্দ্রিকও হ’তে পারে। একটা বড়সড় ব্লকের জন্য প্রয়োজনীয় হাসপাতাল সুবিধা, স্কুল, বাজার আর খানিকটা অফিস এরিয়া সমন্বিত ক’রে গ’ড়ে তোলা গেলে সামগ্রিক হিসাবে শহরের মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে হাউজিং বা আবাসন পরিকল্পনার তৃতীয় ফেইজে সুপার-ব্লক কেন্দ্রিক এই ধরণের মিশ্র-ব্যবহারের কিছু চেষ্টা নেওয়া হয়েছিলো, যেগুলো নাগরিক সুবিধার বিচারে খুব উপযোগী হয়েছিলো। ফলে জমির মিশ্র-ব্যবহার যে শহর পরিকল্পনাতে উপকার দিতে পারে সেটা এখন মোটামুটি জানা। কিন্তু প্রশ্ন হ’লো ঢাকা তথা বাংলাদেশে আমরা সেটা বিবেচনা করছি বা করেছি কিনা।

ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান বা উত্তরার পরিকল্পনাতে জমির মিশ্র ব্যবহারকে বিবেচনা করা হয়নি ব’ললেই চলে। কিন্তু সময়ের সাপেক্ষে প্রশস্ত রাস্তাগুলোর পাশে মিশ্র-ব্যবহারের চাহিদা তৈরী হয়েছে। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই তা গ’ড়ে নিয়েছে। রাজউক বা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে কখনো নিরব থেকেছে, কখনো অসুবিধার সৃষ্টি করেছে আবার কখনো প্লটের ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য বিধি তৈরী করেছে, আবার সেই বিধি ব্যবহার করে নানা ধরণের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকার প্রায় সমস্ত এলাকাতেই জমির মিশ্র-ব্যবহার গ’ড়ে উঠেছে। এমনকি ডিওএইচএসগুলোও এখন আবাসিক আর অফিস এলাকার মিশ্রণ।

প্রয়োজন এই মিশ্রণের প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী দিনের শহর পরিকল্পনা করা, সে যেমন ঢাকার বর্ধিত অংশে তেমনই দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোরও যে গুলোর নতুন কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেই সাথে বর্তমানের শহরে যে নিত্য-পরিবর্তন তাতে দিক-নির্দেশনা দেওয়া।

সামাজিক সংমিশ্রণ ছাড়া কোনো শহরই সাস্টেইনেবল বা টেকসই হতে পারে না। করাইল আর মহাখালির বস্তি ছাড়া গুলশানের আবাসিক এলাকা এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারবে না। এই বস্তিগুলো তুলে দিলে শুগশানের আবাসিক ভবনগুলোর পরিচালন ব্যায় অনেক বেড়ে যাবে। আবার কাছের বাড্ডা আর রামপুরার মতো মধ্যবিত্ত্বের এলাকাগুলো না থাকলে গুলশানের অফিস পাড়াতে পরিণত হওয়ার সুযোগও যেতো কমে। শহরের কোনো এলাকার চরিত্র গঠন আর পরিবর্তনে এরকম নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ভূমিকা এড়াবার নয়। আর যে শহর পরিবর্তিত হ’তে থাকে না তা এক সময় গুরুত্ব হারাতে থাকে।

শেষ যে কথাটা বলা হয়েছে সেটা হ’লো ব্যবহার মিশ্র করতে গিয়ে আবার যেত কোনো একটা বিশেষ ফাংশনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে না ফেলা হয়, যেমনটা ঢাকার গুলশানের ক্ষেত্রে হয়েছে। আবাসিক এলাকা হিসেবে গ’ড়ে তোলা গুলশান-বনানীকে এখন ঢাকার নতুন বিজনেস-ডিস্ট্রিক্ট বা বড়বাজার হিসেবেই মনে করেন অনেকে। একসময় মতিঝিলকে যা মনে করা হ’তো।

প্রতিবেশ বা পাড়া তৈরীতে তাই অন্য ব্যবহারগুলো যেন মূল ব্যবহারের ১০ শতাংশকে পেরিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে ব’লছে জাতিসংঘ বসতি।    

তথ্যসূত্র :
১) http://article.sciencepublishinggroup.com/html/10.11648.j.ijtet.20160201.11.html

২) http://www.rajukdhaka.gov.bd/rajuk/projectsHome?type=purbachal

নোট:
১. বাঁকা হরফের লেখা গুলো ইংরেজি থেকে অনুবাদকৃত।
২. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৩
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57799

নগরী · স্থাপত্য

City of Dhaka – 8

‘I feel comfortable in this city of Dhaka.’ For me this statement carries both  truth and lie simultaneously. In deed I do not feel any compassion amid this spaceless place. Yet I can’t think of any other place in this little country that can offer me any kind of practical comfort or easiness to survival issues for people like us who had to leave their native towns or villages only to find work. Today I live here only to live by. I like to feel comfortable here only with a notion to stay tacit about my immensely uncomfortable dissatisfaction propagated by this city-life. I must agree that this city has a great talent to delude (ভুলিয়ে রাখা) its citizens about their own desire, despair or discomfort and so on.  I forget to remember I don’t belong here. I forget to remember once I used to have desires other than living.

The city is so successful in deluding on certain matters  that the constant presence of the lack of the public avail-abilities, which are very much needed for a city to function at its minimum level, makes us disheartened in every possible way and we have developed a notion to indulge this heinous  phenomenon. The reality of this unavailability of modern day amenities in the city seems to be so unreal to its citizen that the imagined absurdity overwhelmingly succumb our thought process and keep us away from the actual reality. And we become the victims of a massive conundrum, namely the Dhaka city. We are ransacked so much in the very core of ourselves by this conundrum that we are just mass people, no matter how massive in number, without any massive desire. The city we are building is not a creation out our desires.

In this city we walk only to reach destinations. We can hardly collect memories of walking through its spaces, though we all have to walk a lot. And at the end of the day we get a physical feeling of numbness which helps us erase the memory of our walking. The corridors of the work-place, the footpaths, the market isles all are too tiring and too monotonous and so they continuously generate fatigue. We  learn to see without watching the details of the corner. At the corners we hardly meet our friends, rather we only look out, so that we don’t get hurt. Only digital tracking system knows two or more friends passed the same corner of the city at the same time. And we only get that information on the social media after our leave.

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা-৭

মাঝে মাঝেই ঢাকা শহরের গতি থেমে যায়। রাস্তায় প্রচুর গাড়ীর থেমে যেতে হয়, থেমে থাকতে হয়। যখন গাড়ীগুলো চলে তখনও যে দরকারী গতিতে চ’লতে পারে সেটাও সবসময় নয়। এর নানা কারণ আমরা বলতে পারি। তবে এক-কথায় যদি ব’লতে হয় তা হ’লো, শহরের যাতায়াতের ব্যাপারটা নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা করা হয়নি।

অবশ্য শুধু যাতায়াতের কথা ব’ললে ঠিক বলা হয় না। এত বড় একটা শহর, অথচ তাকে নিয়ে কোনো সামগ্রিক ভৌত-পরিকল্পনা করা হ’য়েছে এটা বলা যাবে না। সামগ্রিক ভৌত-পরিকল্পনার কথা আদতে ভাবা হ’য়েছে নীতিনির্ধারণী মহলে- তাও বলা যাবে না। তবু যে চ’লছে শহরটা, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হ’লেও তা নিশ্চিত। দুষ্টু লোকেরা কেউ কেউ মাঝে মাঝে বলার চেষ্টা করেন, এভাবেও আর চলবে না বেশি দিন। শহরেরও প্রতিরোধ করার একটা সীমা আছে। সেই সীমা ছাড়াতে আর বিশেষ বাকি নেই। আর আশাবাদীরা কেউ কেউ বলেন, সব শহরেরই কিছু কিছু সমস্যা থাকে, কোনো কোনো বিশেষ সময় এবং পরিস্থিতিতে তারা হয়তো প্রকট হ’য়ে ওঠে, তবে চেষ্টা ক’রলে সেই সমস্যাগুলোকে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। একটা প্রাণবন্ত শহরের জন্য এর নাগরিকদের মধ্যে এই সমস্যাদেরকে সহনীয় পর্যায়ের মধ্যে রাখার আকাঙ্ক্ষা থাকাটা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এখন ঢাকা শহরের মানুষদের মধ্যে এই আকাঙ্ক্ষাটা সামাজিকভাবে আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। অনেক ব্যক্তির ভেতরে আলাদা ক’রে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে তারা যদি সঙ্ঘবদ্ধ হ’য়ে সামাজিক আকার না নিতে পারে তবে তা কার্যকরী হ’য়ে ওঠে না এই ২১ শতকের বাস্তবতায়।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়- ঢাকার মানুষদের ভেতরে এই সামাজিক আকাঙ্ক্ষাটা কার্যকর নয়। আর নয় ব’লেই ঢাকার মানুষগুলোর পরস্পরের উপর আস্থা নেই। নেই ব’লেই তারা শহরের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কখনো কখনো অথোরিটির লোকজন সামান্য কিছু খোঁজখরব ক’রে কোনো একটা বিধান জারি করে মাত্র। সেই সব বিধান মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না, সে খোঁজ কেউ করে না। তবে কখনো কখনো বিধানগুলোর অপব্যবহার যে হয় তা টের পাওয়া যায়। আর একবার অপব্যবহার শুরু হ’লে তা আরো অপব্যবহারের কারণ হ’য়ে ওঠে। ভাল পুলিশী ব্যবস্থা করতে পারলে এ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে কিনা বলা শক্ত। আবার বেরিয়ে আসাটা উপকারী হবে এমন দাবি করাও কঠিন। তবে ভাল পুলিশী ব্যবস্থা থাকুক বা না থাকুক, বর্তমান বিধির ব্যাপারে ঢাকার অধিবসীদের যে সম্মতি নেই সেটা মেনে নিতেই হবে। সম্মতি নেই বলেই তারা বিধি মানতে চান না অথবা বিধি-ব্যবস্থা তাদের স্বার্থের সাথে সাংর্ঘিক।

কখনো সুচিন্তিতভাবে ঢাকাকে গ’ড়ে তোলার চেষ্টা হয়নি ব’লেই ঢাকাতে অনেক কিছুই নেই। এমন অনেক কিছু যা একটা বড় শহরের জন্য খুবই দরকারী। যেমন সমাবেশের জন্য খোলা বড় কোনো জায়গা বা চাতাল কিমবা বড়সড় একটা খোলা মাঠ। ফলে মানুষের যাতায়াতের বিঘ্ন না ঘটিয়ে দরকারী সমাবেশ করা যায় না। মানুষ যদি কখনো কোনো ব্যাপারে প্রতিবাদ জানাতে চায়, তো রাস্তা বন্ধ না ক’রে আর উপায় থাকে না। আর সমাজ-ব্যবস্থা, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, বিশ্ব-পরিস্থিতি, উৎপাদন সম্পর্ক, প্রযুক্তি আর সভ্যতার অভিজ্ঞতা সবসময়ই পরিবর্তনশীল ব’লে- এদেরকে ধারণ করে যে নগর-কাঠামো তাও সদা পরিবর্তনশীল। কিন্তু পুরোনো-প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা তাদের অবস্থান সহজে ছেড়ে দিতে রাজি থাকে কমই। আর তাই মতভেদ একটি নাগরিক বাস্তবতা। নগরের প্রয়োজনেই নাগরিকদের মতভেদগুলো অন্য নাগরিকদের জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সে ব্যবস্থা থাকলে মতভেদগুলো অসহনীয়ভাবে পুঞ্জিভূত হ’য়ে ওঠার দরকার পড়ে না। হঠাৎ কখনো পুঞ্জিভূত হ’য়ে উঠলেও তা সবাই মিলে মোকাবেলা করাও যায় যদি মতভেদগুলো নিয়ে মুখোমুখি বসার বা অলোচনা করার মতো জায়গা থাকে, ব্যবস্থা থাকে, একটা অভ্যাস বা সংস্কৃতি থাকে। অজকের দিনে ইলেকট্রোনিক মিডিয়া হয়তো একটা ব্যবস্থা। তবে তা যে সর্বদা কার্যকরী সে দাবি করা বোকামি হবে, কারণ সবাই এটা ব্যবহার করার সুযোগ সবসময় পায় না।

নগরের বেড়ে ওঠার জন্য প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি আর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব প্রতিষ্ঠানের ধরণও নানাবিধ। সেসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও প্রতিনিয়ত চ’লতে থাকে ভাঙাগড়া। আর তা না চ’ললেই দিনে দিনে তার কার্যকারীতা কমতে থাকে। কোনো নগরে যখন অকার্যকরী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন সে নগরের বাস-যোগ্যতা কমতে থাকে। নাগরিকদেরই মূলত খেয়াল রাখতে হয় তাই প্রতিষ্ঠানগুলো দিকে। আর এই খেয়াল রাখার সবচেয়ে সহজ আর কার্যকরী উপায় হ’লো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে নাগরিকদের সদা-অংশগ্রহন। সেটা থেকেই নাগরিকেরা জানতে পারবেন তাদেরই পরিশ্রম, মেধা আর অর্থে গ’ড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে কিনা। তাদেরকে নিয়ে নতুন ক’রে ভাবা দরকার কিনা। প্রতিষ্ঠানে নাগরিকদের এই অংশগ্রহন নিশ্চিত করার জন্যও দরকার জায়গার। সে প্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দির ভেতরে তো বটেই, কখনো কখনো বাইরেও।

আবার নগর কখনই একটা একক ইউনিট হিসেবে গ’ড়ে ওঠে না। ঢাকাও ওঠেনি। এর মিরপুর, গুলশান, আজিমপুর, গ্যান্ডারিয়া, উত্তরা সবই আলাদা আলাদা একক ইউনিট। এসব ইউনিটগুলো আরো ছোট ছোট অনেকগুলো সাব-ইউনিটের সমাবেশ। অথচ এই ইউনিটগুলোর একক সামাজিক ইউনিট হ’য়ে ওঠার জন্য যে ধরণের অবকাঠামো দরকার তা গ’ড়ে তোলা হয়নি বললেই চলে। হয় যে নি, তা ঐ ভৌত-পরিকল্পনার অভাবের কারণেই। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, সেটা ঢাকার আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামগুলো নিয়ে। একটা মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকাতে, আর একটা মিরপুর আবাসিক এলাকাতে। দুইটার কোনোটার সাথেই নগরের সাধারণ মানুষের খেলার বা অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠ নেই। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যে একটা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অনুশীলনে যাবে – তারা একদিন ঐ চারপাশে গ্যালারী-ঘেরা মাঠে নিজেরা খেলতে নামবে আর সারা দেশ না হলেও অন্তত সারা শহরের মানুষ ওদেরকে দেখতে চাইবে- সে সুযোগ নেই। আর নেই ব’লেই তাদের মনে তৈরী হয়না ভাল খেলোয়ার হ’য়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।

এই যে নগরের ভেতরে প্রতিবাদ জানানোর জায়গা না থাকা, আকাঙ্ক্ষা জাগানোর মতো মাঠ না থাকার ব্যাপারটা- এগুলো এই নগরের মানুষদেরকেই খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। এবং এই জায়গাগুলো গ’ড়েও তুলতে হবে। সে নাগরিকদের অংশগ্রহন আর সম্মতিতেই।

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা-৬

নগরী হিসেবে ঢাকার আয়তন বাড়ছে। বাড়ছে বেশ দ্রুতই। আর সেটা প্রায় সব দিকেই। আজ শুধুই চোখ বুলানোর মতো ক’রে ঢাকার উত্তর আর পূর্ব দিকের বেড়ে ওঠার ছবি দেখবো। ছবিগুলো গুগল ম্যাপ থেকে নেয়া। ইট ভাটাগুলোর ছবি নেয়া অক্টবরের ১০ তারিখে। ঢাকা, পূর্বাচল আর উত্তরা থার্ড-ফেইজের ছবিগুলো নেয়া অক্টবরের ২১ তারিখে। অর্থাৎ আজই। সকল ছবির উপরের দিকটি উত্তর দিক।

শুরুতেই প্রথম ছবিটা দেখে নিই। এতে পূর্বাচল, জলসিড়ি আবাসন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা আর উত্তরা থার্ড-ফেইজের অবস্থান এবং বেড়ে ওঠা বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে।

Expanding Dhaka 01
ঢাকার উত্তর আর পূর্ব দিকের স্যাটেলাইট ভিউ : ২১.১০.১৭ তারিখে নেয়া

উত্তরা থর্ড-ফেইজ একটি মিশ্র-ডিভেলপমেন্ট এরিয়া। অর্থাৎ এখানকার প্লটগুলো বিভিন্ন ধারণের ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে। সরকারীভাবে বা রাজউকের উদ্যোগে বেশ বড় আকারে হাউজিং প্রকল্প করা হচ্ছে এখানে। একটা ব্লকের এ্যাপার্টমেন্ট-বিল্ডিংগুলোর অনেকগুলোরই নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। যদিও এই হাউজিংকে সাপোর্ট দেয়ার মতো প্রকল্পগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি এখনো। অনেকগুলো প্লট রাখা হয়েছে ইন্সটিটিউশনাল। কিছু কিছু বরাদ্দ দিয়েও দেয়া হয়েছে। যেমন বিজিএমইএ। তাদেরকে ১১০ কাঠার একটা প্লট দেয়া হয়েছে। তারা সেখানে নির্মাণ কাজও শুরু করেছে। যদিও রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প সংশ্লিষ্ট স্থপতির নাম সেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে না। ধারণা করা যায় আবারো অবৈধ উপায়ে বিজিএমইএ কোনো বিল্ডিং নির্মাণ করছে। রাজউক হয়তো দেখেও দেখছে না।

এবার একটু চোখ দিই পূর্বাচলের দিকে। নিসন্দেহে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শহর-উন্নয়ন প্রকল্প। বেশিরভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে এই প্রকল্পের একটা অদ্ভুত ব্যতিক্রম হলো, এটা কোনো নিচু এলাকাতে বালি-ভরাট ক’রে গড়ে তোলা হচ্ছে না। এই এলাকাটা প্রাকৃতিকভাবেই উঁচু জায়গা ছিলো। উন্নয়নের জন্য বরং বিভিন্ন স্থানের মাটি কেটে নিচু ক’রে পুরো এলাকাটাকে সমান করা হচ্ছে। এই এলাকাটার ভেতরে একটা গ্যাসক্ষেত্রও আছে। তুরাগ নদীর বেশ কয়েকটা শাখা-প্রশাখা এর ভেতর দিয়ে চলে গিয়েছে। ব্যাপারটাকে প্রকল্পে কিভাবে বিবেচনা করা করেছে সেটা আমরা পরের কোনো একটা ব্লো-আপে দেখবো।

বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পটি নতুন নয়। বেশ কয়েক দশক ধ’রেই বেসরকারী উদ্যোগে একটু একটু ক’রে বেড়ে উঠছে এলাকাটি। মূলত নিচু জায়গা বালি-ভরাট ক’রেই এটি করা হয়েছে। সরকার বা রাজউকের এটাতে সাই আছে বলেই জানা যায়। এমনকি তুরাগের একটা শাখাকে যে পুরাপুরি ভরাট করে ফেলা হয়েছে – সে ব্যাপারেও কোনো আপত্তির কথা জানা যায় না। মূলত আবাসিক এলাকা হিসেবে বলা হলেও দিনে দিনে এটা মিশ্র আচরণ নিতে শুরু করেছে। অনেকগুলো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে এখানে। আধুনিক হাসপাতাল, কনভেনশন সেন্টার, গ্রামীনফোন সেন্টারের মতো অফিস বিল্ডিং গড়ে উঠেছে এরই ভেতর। চাহিদা থাকায় এর পেরিফেরিতে গড়ে উঠেছে এই সময়ের সবচেয়ে বড় বিপনিকেন্দ্র, যমুনা ফিউচার পার্ক। বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারও এই আবাসিক এলাকাটির পেরিফেরিতে চালু হয়ে গিয়েছে। সে চাহিদার কারণেই মূলত।

বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী জলসিড়ি আবাসন প্রকল্পটি ২০১০ সালে সরকারকর্তৃক গৃহীত ড্যাপে উল্লখিত নিম্নভূমি বা জলাভূমি এলাকাতে অবস্থিত। সরকার তবুও এটা অনুমোদন দিতে আগ্রহী ব’লেই জানা যাচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকা মারফত। এটি পুরোপুরি আবাসন প্রকল্প হবে না শেষ পর্যন্ত আরো একটি মিশ্র উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে- সেব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারিনি এখনো পর্যন্ত।

Purbachal 21.10.17
পূর্বচল আবাসিক এলাকার ২১.১০.১৭ তারিখের স্যাটেলাইট ভিউ

পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পটি মূল ঢাকার সাথে এখনো পর্যন্ত একটি মাত্র ৩০০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে সংযুক্ত। যে রাস্তাটা আবার পুরোপুরি প্রকল্পটির একেবার মাঝ বরাবর দিয়ে না গেলেও প্রকল্পটিকে যে দুইটি ভাগে ভাগ ক’রে ফেলছে সেটা সুস্পষ্ট। প্রকল্পটির পূর্বদিক দিয়ে ঢাকা-সিটি-বাইপাস চলে গিয়েছে। তবে সেটিও প্রকল্পের সীমানা নয়। বাইপাসটির আরো পূর্বদিকেও প্রকল্পটি বিস্তৃত। প্রথম দিকে একে আবাসিক প্রকল্প হিসেবে বলা হলেও এখন এটাকে একটা মিশ্র-ডিভেলপমেন্ট হিসেবেই গড়ে তোলা হচ্ছে। সরকার ১৪২ তলা বাণিজ্যিক ভবন তৈরী করার কথা বলছে এই প্রকল্পে। যদিও এখনো পর্যন্ত তার সাইট নির্দিষ্ট ক’রে জনসাধারণকে সরকার বা রাজউক কারো পক্ষ থেকেই বলা হয়নি। জাতীয় ক্রিড়া-কমপ্লেক্সের জন্য বেশ খানিকটা জায়গা রাখা হয়েছিল যেখানে সেখানে এখন বড়সড় একটা স্টেডিয়াম করার পরিকল্পনা করছে সরকার। তাতে ক্রিড়া-কমপ্লেক্সের যে মূল আইডিয়া ছিলো তা ব্যাহত হবে নিশ্চত ভাবেই।

কোনো ধরণের মেট্রো-রেল দিয়ে প্রকল্পটি এখনকার ঢাকা শহরের সাথে সংযুক্ত হবে কিনা তার কোনো নির্দেশনা ম্যাপ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না এখনো। প্রকল্পের বিজ্ঞাপনেও এমন কিছুর উল্লেখ দেখা যায়নি। এত বড় একটি প্রকল্পের সাথে বর্তমানের ঢাকা নগরীর যোগাযোগের ব্যাপারটা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরী করতে পারে ব’লে মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। পূর্বাচল সংলগ্ন অন্য দুইটি বড় আবাসিক প্রকল্প, বসুন্ধরা এবং জলসিড়ির সাথে এই প্রকল্পের সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থাটা কেমন হবে সেটাও ম্যাপ দেখে বোঝার বিশেষ সুযোগ নেই। আন্তঃনগর সংযোগের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।

Bridges in Purbachal 21.10.17 A
পূর্বাচল আবাসিক এলাকার একটি ব্লো-আপ ভিউ : ২১.১০.১৭ তারিখে নেওয়া

রাস্তার প্যাটার্ন দেখলে প্রথমেই যেটা মনে আসে সেটা হলো, এখানে এগজিস্টিং যে নদী বা খালগুলো আছে সেটা মাথায় নিয়ে প্রকল্প ডিজাইন করা হয়নি। রাস্তাগুলো বেশির ভাগই সরলরেখার। অল্প যে সামান্য কয়েকটা রাস্তা আকাবাঁকা করা হয়েছে তা ভূমিরূপ অনুযায়ী করা হয়নি। হয়েছে একেবারেই খামখেয়ালি ভাবে। একটা বিষয় না বললেই নয়, তা হলো প্রকল্পে সেতুর সংখ্যা। খুব অল্প একটা জায়গার ভেতরে এত বেশি সংখ্যক সেতু তৈরীর কারণটা বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। আবার সেতুগুলোর জায়গাতে নদী বা খালের প্রস্থও কমিয়ে আনা হয়েছে। এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ আছে ব’লে মনে করি। এত বেশি সংখ্যক সেতুর কারণে প্রকল্পের খরচ যে বেড়ে গিয়েছে সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আবার প্রকল্পের গুণমান বেড়েছে বলে মনে হয় না। তার উপর নদী বা খালের পাড় ঘেসে রাস্তা তৈরী করা হয়নি এখানে। এতে নদী দখলের যে প্রবণতা আমাদের দেশে দেখা যায় তার সুযোগ রয়েই গেলো।

(রবার্ট ভেঞ্চুরি, ডেনিস স্কট ব্রাউন আর স্টিভেন ইজেনার মিলে ১৯৭২ সালে  ‘লার্নিং ফ্রম লাস ভেগাস- শিরোনামে একটা বই লিখেছিলেন। পূর্বাচল প্রকল্পটি নিয়ে এমন একটা বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম আমি।)

Uttara 3rd Phase 21.10.17
উত্তরা থার্ড-ফেইজের স্যাটেলাইট ভিউ: ২১.১০.১৭ তারিখে নেয়া

এটি সরকারের একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। বিশেষত এর এ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পগুলো। একসাথে এতগুলো এ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে একটা কমপ্লেক্স এর আগে বাংলাদেশে করা হয়নি। বা করা সম্ভব হয়নি। সরকারী বা বেসরকারী কোনো মাধ্যমেই এর আগে এত বড়-স্কেলে আবাসন বা এ্যাপার্টমেন্ট-প্রকল্পের চেষ্টাও করা হয়নি। প্রকল্পটির সাফল্য বা ব্যর্থতা আমাদেরকে অনেক কিছু শেখাবে বলে আশা করা যায়।

uttra_3rd phase
উত্তরা থার্ড-ফেইজের লে-আউট প্ল্যান : রাজউক থেকে সরবরাহকৃত

এই ম্যাপটি রাজউক থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে। এই ম্যাপ অনুযায়ী প্রকল্পটি সোনারগাঁও-জনপথ সড়ক দিয়ে পূর্ববর্তী ফেইজের সাথে যুক্ত। আর বেড়িবাধের রাস্তার সাথে দুইটি পয়েন্টে যুক্ত হবে। প্রস্তাবিত এ্যাভিনিউ-২ দিয়ে কোনো ভাবে প্রকল্পটিকে মিরপুরের সাথে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। তবে মিরপুর ডিওএইচএস আর ক্যান্টনমেন্টের মাঝ দিয়ে সেটা কিভাবে করা হবে তার কোনো দিক নির্দেশনা এখানে নেই। বেড়িবাধের রাস্তাটি এখনো পর্যন্ত দুই-লেইন-বিশিষ্ট এবং ঢাকা-আশুলিয়া মাহাসড়কের সাথে গাবতলীর সংযোগ সড়ক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। ফলে রাস্তাটিতে ভারী-গাড়ীর সংখ্যাই বেশি থাকে। প্রকল্পটির সাথে বেড়িবাধের এই রাস্তার সংযোগের ব্যাপারটি নিয়ে রাজউকের ভাবনা আছে বলেই জানি। তবে তা কেমন নিশ্চিত নই এখনো পর্যন্ত। ২১০ ফুট প্রশস্ত বর্ধিত সোনারগাঁও-জনপথের উত্তরপাড়ে মেট্রো-রেলের স্টেশন করার পরিকল্পনা আছে। যার কাজ ইতিমধ্যে শুরুও হয়েছে। অর্থাৎ উত্তরা থার্ড-ফেইজের মেট্রো-রেল ব্যাবহারকারীদের অধিকাংশকেই ২১০ ফুট চওড়া সোনারগাঁও-জনপথ সড়কটি পার হ’য়ে মেট্রো-স্টেশনে যেতে হবে।

ঢাকাকে আয়তনে বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মানাধীন এই সব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্মাণ উপকরণের যোগান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যান্য উপকরণের পাশাপাশি পোড়া-মাটির ইট বাংলাদেশের একটি প্রধাণ নির্মাণ-উপকরণ। উন্নয়ন প্রকল্পের যত কাছ থেকে এই উপকরণগুলো যোগাড় করা যায়, প্রকল্প-ব্যয় কমিয়ে আনতে তা ততটা সহায়ক হয়। আর তাই ঢাকা নগরীর চারপাশেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটের ভাটা। যার বেশির ভাগই নদীর পাড়ে কিমবা নিচু-এলাকা ব’লে চিহ্নিত জায়গাতে অবস্থিত। এইসব ইট ভাটার চিমনি থেকে বের হওয়া ধোয়াগুলো শহরের বাতাসের দূষণের অন্যতম কারণ। নিচে গুগল-আর্থ থেকে নেয়া ঢাকার আশপাশের কয়েকটি স্যাটেলাইট ভিউ দেখা যাক –

West side of Dhaka- Just passing Gabtoliআমিনবাজারে ঢাকা-সাভার মহাসড়কের দুই ধারের স্যাটেলাইট ভিউ : ১০.১০.১৭ তারিখে নেয়া

 এই ছবিটি ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের। গাবতলী পেরিয়ে আমিনবাজার পৌছাতেই রাস্তার দুই পাশের নিচু এলাকাতে এই ভাবেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটের ভাটা। শহর গড়ে তোলার জন্য আমাদের ইটের প্রয়োজন অনেক। কিন্তু এই ভাবে প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিকে নষ্ট ক’রে আমরা হয়তো সস্তায় ইট পেয়ে যাচ্ছি। তাতে আমাদের নির্মাণ-খরচ কমিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে বটে, কিন্তু সার্বিক ক্ষতির হিসাব করা হচ্ছে না ব’লেই তা যে খুব কম তা কিন্তু নয়।

Gazipur
গাজীপুর থেকে চন্দ্রা যাওয়ার পথের দুই পাশ : বংশি নদী সংলগ্ন : ১০.১০.১৭ তারিখে নেয়া

 উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে গাজীপুর থেকে চন্দ্রা হয়ে টাঙ্গাইল যাওয়ার পথে বংশি নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে শতাধিক ইটের ভাটা। ইট-ভাটাগুলো গড়ে উঠেছে সবচেয়ে উর্বর জমিতে। একেবারে নদীর পাড়ের পলি-জমা মাটিতে। অথচ নদীর পাড়ের এই জায়গাই হতে পারতো আবাসিক এলাকার জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত। চাষাবাদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

periphery of Narayanganj
বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরীর মিলন স্থানের স্যাটেলাইট ভিউ : ১০.১০.১৭ তারিখে নেয়া

 উপরের চিত্রটি ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের। নারায়নগঞ্জ শহরের কাছাকাছি এবং ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে। এই ইটের ভাটাগুলো থেকেই ইট তৈরী ক’রে সেগুলোকে খানিকটা নৌপথ বেয়ে, খানিকটা সড়কপথ ধ’রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে উপরের ঐসব উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সাইটে। নিচের ছবিটি ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গাতে ঢোকার মুখে লঞ্চ থেকে মাস তিনেক আগে তোলা।

IMG_20170724_061219
ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গার দুই পাড়ের চিত্র

 পূর্বাচল সংলগ্ন শীতলক্ষা নদীর দুইধারও এমনটা হওয়ার দিকেই যাচ্ছে। নিচের ছবিটি তারই প্রমাণ।

bank of shitalakshya-21.10.17
শীতলক্ষার দুই পাড়ে গড়ে ওঠা ইট ভাটার স্যাটেলাইট ভিউ : ২১.১০.১৭ তারিখে নেয়া

পূর্বাচল, জলসিড়ি আর বসুন্ধারা এলাকার প্লটগুলোতে যখন পুরোদমে নির্মাণ কাজ শুরু হবে তখন শীতলক্ষার পাড়ের চিত্র যে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে সেটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

উপরের ছবিগুলো থেকে আমরা খুব সহজেই কিছু প্যাটার্ন আবিস্কার ক’রে নিতে পারবো। কয়েকটা বলি-

১. উন্নয়ন প্রকল্পে এগজিস্টিং ভূমিরূপ পরিবর্তন করার প্রবণতা লক্ষণীয়
২. প্রকল্পগুলোর সবই প্লট-কেন্দ্রিক
৩. পাশ্ববর্তী উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে সমন্বয়হীনতা প্রকটভাবে লক্ষণীয়
৪. মিশ্র-ব্যবহার উন্নয়ন প্রকল্প (প্রকল্পে ভূমি ব্যবহারের ধরণ বহুবিধ)
৫. উন্নয়ন প্রকল্পের আশপাশের এলাকার উপর প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর প্রভাব দৃশ্যমান
৬. প্রকল্পের রাস্তাগুলো তথা জোনিঙের ব্যাপারে ভূমি-রূপের বিবেচনা অনুপস্থিত
৭. প্রকল্প-ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য ডিজাইনে বিবেচনা নেই
৮. সবগুলো প্রকল্পেই কনটেক্সটের গুরুত্ব উপেক্ষিত

নগরী · স্থাপত্য

নগরী ঢাকা-৫

ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম। … সিএনজি অটোরিকশা একটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। যেটি কিনতে দাম পড়ে ৫ লক্ষ টাকার মতো। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন ক’রে রাস্তায় নামাতে গেলে এই ২০১৭ সালে সব মিলিয়ে খরচ পড়ে যায় ১৯ লক্ষের মতো টাকা। তাও সেই অটোরিকশাটি নতুন গাড়ি হয় না সাধারণত। পুরনো নষ্ট হ’য়ে যাওয়া কোনো মিশুক বা সিএনজি-অটোরিকশার নাম্বার ঘুষের বিনিময়ে নবায়ন করা হয়। এখন যে লোকটা ১৯ লক্ষ টাকার মতো বিনিয়োগ করলো ২০১৭ সালে একটা অটোরিকশার পেছনে তা সে তুলে নিতে পারবে কত বছরে এবং কিভাবে- সেটা একটা প্রশ্ন বটে।

হাইওয়েতে বিভিন্ন বাস কম্পানি প্রতিদিনই প্রায় কোনো না কোনো নতুন বাস নামাচ্ছে। ভাল ব্যবসাও করছে। এতে সাধারণ মানুষ ভাল সেবাও পাচ্ছে। অথচ এমনটা ঢাকা বা চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীন বাস যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘটছে না। এর পেছনের কারণটা মূলত অর্থনৈতিকই। সরকারী প্রতিষ্ঠানের ঘুষ আর রাজনৈতিক কিমবা স্থানীয় মাফিয়ার চাঁদাবাজির কারণে নতুন কোনো গণপরিবহনের নিবন্ধন নিতে খরচ প’ড়ে যায় গাড়ির প্রকৃত মূল্যের থেকে অনেক বেশি। যে কারণে ভাল মানের গাড়ি, যার দাম একটু বেশি পড়ে, তা শহরের গণপরিবহনে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা গিয়েছে কমে।

রাস্তায় লেইন মেনে চলাচলের রেওয়াজ আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। তার জন্য কোনো পুলিশি ব্যবস্থাও নেই। ফলে অহরহ লেইন পরিবর্তনের পরিণতিতে বেশিরভাগ গাড়িই অল্প কিছু দিনের ভেতরেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। কারো বা ভিউয়িং-মিরর খুলে প’ড়ে যায়। কারো বা বাম্পার ভেঙে যায় রাস্তায় নামার প্রথম দিনই। জানালার গ্লাস ভাঙা থাকার ব্যাপারটা এতটাই ক্লিশে হয়ে উঠেছে যে এটা নিয়ে কেউ সামান্য বিচলিত বোধও করে না। অথচ ফিটনেসের খড়গ ঠিকই আছে। অর্থাৎ পুলিশ মাঝে মাঝেই এইসব ক্ষতবিক্ষত গাড়িগুলোকে জরিমানার মুখোমুখি হ’তে বাধ্য করে। তাতে গাড়ির পরিচালন খরচ যায় বেড়ে। যে পুলিশের কাজ সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা তারাই শেষে তাদের ব্যর্থতাকে উপজিব্য ক’রে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়। কারণ তাদের জন্য এক ধরণের বাধ্যবাধকতা থাকে মাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক কেইস বা মামলা দেওয়ার। তারা সেটা দেয়ও। আর বাড়তি হিসেবে মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়ে ঘুষ নেয়া তো আছেই। সেটা পাবলিক এবং প্রাইভেট দুই ধরণের গাড়ির জন্যই।

আর কোলাটেরাল ড্যামেজের হিসাবটা খুব সহজ নয়। বিভিন্ন ধরণের হরতালের প্রচলন আর ব্যবহার আমাদের দেশে কম নয়। তাতে প্রথমেই সরাসরি ক্ষতির শিকার হয় গণপরিবহন খাতই। আবার ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরণের গুণ্ডা বাহিনী আছে। আমাকেই অনেকবার বাস থেকে নেমে যেতে হয়েছে এইধরণের গুণ্ডাদের কারণে। কখনো তেজগাঁও, কখনো মিরপুর, আবার কখনো বা ঢাকা কলেজের সামনে। ভাড়া নিয়ে হয়তো শিক্ষার্থীদের সাথে গ্যাঞ্জাম হয়েছে, তার কারণে তারা বাস থামিয়ে সাধারণ যাত্রীদেরকে নামিয়ে দিয়ে বাস ভাঙতে শুরু করেছে- এমনটা আমি অন্তত ৬ বার দেখেছি। আর ড্রাইভার আর কন্ডাকটরদেরকে মারধরের ঘটনা তো অহরহই ঘটে।

শহরের গনপরিবহন ব্যবস্থার ভেতর ক্রিয়াশীল রয়েছে এই ধরণের নানা অরাজকতা। আমি অবশ্যই সবগুলোর কথা বলতে পারিনি। এই নৈরাজ্যগুলোর কারণে গণপরিবহনের খরচ যায় বেড়ে। এইসব বাড়তি খরচগুলো শেষ পর্যন্ত যাত্রীদেরকেই বহন করতে হয়। ঢাকাতে শুধুমাত্র অফিসে যাতায়াতের জন্যই অনেককে মাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। যদি কখনো একটু বাড়তি বৃষ্টি বা শহরে বিদেশী সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান টাইপের কেউ আসেন তবে সেদিন খরচ যায় আরো বেড়ে। এর উপর যদি মাসে অন্তত ৩ বার বাজার বা শপিং বা কোনো বিনোদনের উদ্দেশ্যে কোথাও যাওয়া পড়ে তাহলে আরো ১৫০০ টাকা বাড়তি যোগ করা যায় যাতায়াত খরচ হিসাবে। জনপ্রতি মাসে শহরের ভেতরে যাতায়াত বাবদ প্রায় ৬ হাজার টাকা খরচ করেন এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু সেই যাতায়াত অভিজ্ঞতাকে এক কথায় দুর্বিষহ বলাটা ভুল হবে না। অথচ আর সামান্য আড়তি খরচ করলেই একটা ব্যক্তিগত গাড়ি পোষা যায়। মানুষ সেদিকেই ঝুঁকছে। মানুষ লোন ক’রে, টাকা জমিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি কিনছে। তাই দেখে অর্থমন্ত্রী হয়তো ভাবছেন দেশের অর্থনীতি তরতর ক’রে এগিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য তিনি এটা ঠিকই আইডেন্টিফাই করছেন যে অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী যে পরিমাণ টাকা বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে না। আমি যেটা মনে করি সেটা হলো, কাগজ-কলমে থাকা অর্থনৈতিক হিসাবের বাড়তি টাকাটা যে কোথায় খরচ হ’য়ে যাচ্ছে তা বুঝতে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন।

একটা ভাল এবং কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরী করতে হ’লে তাই শুধু নগর-পরিকল্পনাবিদদের দেওয়া প্রয়োজনীয় গাড়ির হিসাবের সংখ্যা আর তাদের রুট বিবেচনা করলেই হবে না। এর আর্থিক অব্যবস্থাপনার দিকটিও ঠিকঠাক করতে হবে।

বঙ্গানুবাদ · স্থাপত্য

স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব : ৫

৫.

দ্বন্দ্বমুখর স্তরসমূহের ধারাবাহিকতায় : দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান

‘দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান’ আর ‘উভয়’ পরস্পর সম্পর্কিত। কিন্তু এদের ভেতর একটা পার্থক্য আছে। দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান ব্যবহারের প্রকৃতি আর কাঠামোর সাথে বেশি সম্পর্কিত, যেখানে ‘উভয়’ কোনো একটা উপাদানের সাথে পুরো ব্যাপারটার সম্পর্ককে নির্দেশ করে। ‘উভয়’ দুইটা কার্যকারীতার চেয়ে দুইটা অর্থময়তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু দ্বৈত-কার্যকরী উপাদান নিয়ে কথা বলার আগে, আমি বহুবিধ-কার্যকরী ভবন নিয়ে বলে নিতে চাই। এই শব্দটা দিয়ে আমি এমন একটা ভবনকে বোঝাচ্ছি যার কর্মসূচি (program) আর গড়ন (form) জটিলতাতে পরিপূর্ণ, তথাপি সামগ্রিক বিচারে প্রভাবশালী (strong) – লি করবুজিয়েরকৃত লা টৌরেটে বা চন্দ্রিগড়ের ন্যায়বিচার প্রাসাদের (Palace of Justice) জটিলতাময় সম্পূর্ণতা এর বিপরীতে তার সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাসাদ বা প্যারিসের আরমি-ডি-স্যালু’র বিবিধত্ব (multiplicities) আর বিন্যস্ততা। দ্বিতীয় পন্থা কর্মসূচীকে বিভিন্ন আন্তঃসংযুক্ত (interlocking-১) বিভাগ কিমবা মাধ্যম দিয়ে যুক্ত (connected) প্যাভিলিয়নে ভাগ ক’রে দেয়। প্রথাবদ্ধ আধুনিক স্থাপত্যের এ এক অতিসাধারণ বৈশিষ্ট্য। মিজ’কৃত শহুরে ইলিনয়েস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে প্যাভিলিয়নগুলোর ধারাল বিযুক্তিকে (incisive separations) এ ধারার সর্বোচ্চ (extreme) কাজ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

মিজ আর জনসনকৃত সিগ্রাম ভবনে দাপ্তরিক কাজ ছাড়া (functions other than offices) বাকি সব বাদ দেওয়া হয়েছে (নিচের তলার পেছনের দিক বাদ দিলে), উপরন্তু একই ধরণের দেয়াল ব্যবহার ক’রে উপরের দিকের তলার পুরকৌশল (ম্যাকানিক্যাল) উপকরণগুলোকে এমনভাবে লুকানো হয়েছে যেন মনে হয় ওখানে অন্য ধরণের কিছু নেই। ইয়ামাসাকিকৃত নিউ-ইয়র্কের বিশাল বিশ্ব-বাণিজ্য কেন্দ্রটির গড়নকে অতিরিক্ত সাদামাটা ক’রে ফেলা হয়েছে। বিশের দশকের প্রতিনিধিত্বশীল গগনচুম্বী-ভবনগুলো ছদ্মবেশ না নিয়ে বরং আলাদাই করে, উপরের তলাগুলোর পুরকৌশল উপকরণ রাখার জায়গাগুলো স্থাপতিক বিচারে আগাগোড়াই অলংকারিক গড়নের। চাড়ুনি-বাড়ির (Lever House) নিচ-তলাতে নানা ধরণের কার্যকারিতার পরিসর থাকার পরও সেগুলো প্রয়োজনের থেকেও বেশি ক’রে আলাদা করা হয়েছে একটা অন্ধকার সংযোজক পরিসরের মাধ্যমে। তুলনামূলকভাবে পি.এস.এফ.এস. একটা ব্যতিক্রমী আধুনিক ভবন যা এর কর্মসূচির বহুবিধতা আর জটিলতার ব্যাপারে একধরণের ইতিবাচক ব্যক্তব্য প্রচার করে। এটি নিচ-তলার একটা দোকান, দোতলার বড়সড়ো ব্যাংকটা, তার উপরের কয়েকটা তলার দাপ্তরিক পরিসর আর একদম উপরের তলার বিশেষ কিছু কক্ষকে একত্রিত করেছে। কার্যকারণ (function) আর পরিমাপের (scale) এই বৈচিত্রসম্ভার (একদম উপরের বিশাল বিজ্ঞাপন-ব্যানার সহ) একটা আটোসাটো সম্পূর্ণতার অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল হয়েছে। এর সামনের দিকের বক্রাকার দেয়াল (curving facade) ভবনের অন্য অংশের আয়তকার বৈশিষ্ট্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা ত্রিশের দশকের একটা বহুল-ব্যবহৃত বিষয় মাত্র নয়, কারণ এর একটা শহুরে কার্যকারণ (urban function) আছে। এর কিনারা ঘিরে পথচারীদের হাঁটার জায়গাটা পরিশিলিত হয়েছে।

বহু-কার্যকরী ভবনগুলো তার চরম সীমাতে পন্টি ভেসচিয়ো (Ponte Vecchio – ২) বা Chenonceaux বা সেন্ট এলিয়ার ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টি প্রকল্পের মতো হ’য়ে ওঠে। প্রত্যেকে এর সম্পূর্ণতার ভেতর জটিল কার্যকারণ (complex functions) সহকারে পরিবর্তনশীলতার বৈপরীত্যময় ক্রমগুলোকে (contrasting scales of movement) ধারণ করে। লি করবুজিয়েরকৃত আলজারিয়ার প্রকল্প, যা একই সাথে মহল-বাড়ি (apartment house – ৩) এবং মহাসড়ক (highway), এবং রাইটের শেষের দিকে করা পিটসবার্গ আর বাগদাদের প্রকল্পের সাথে কানের করা সংযোগকারী-স্থাপত্য (viaduct architecture) আর ফুমিহিকো মাকির করা ‘সংগ্রাহক গড়ন’ (collective form) এর সাথে মিল আছে। এই সবগুলো প্রকল্পের সম্পূর্ণতার ভেতরে অনুপাত (scale), অবস্থানের পরিবর্তন, কাঠামো আর পরিসরের এক জটিল আর বৈপরীত্যে ভরপুর আবস্থান-ক্রম দৃষ্টিগোচর হয়। এই ভবনগুলো একই সাথে ভবন এবং সেতু। বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বাধ (dam) আবার সেতুও (bridge), শিকাগোর লুপ শহরের সীমানাও, আর কানকৃত রাস্তাগুলো ‘ভবন হয়ে উঠতে চায়’।

বহু-কার্যকরী কক্ষ কিমবা বহু-কার্যকরী ভবন দুইয়ের পেছনেই যৌক্তিক কারণ আছে। কোন একটা নির্দষ্ট সময়ে বা আলাদা-আলাদা সময়ে কোনো একটা কক্ষে অনেকগুলো কাজ করা যেতে পারে। কান গ্যালারীকে বেশি পছন্দ করতেন কারণ এটা দিক-নির্দেশক আবার দিক-অনির্দেশকও, একই সাথে সংযোগকারী-বারান্দা (corridor) এবং কক্ষ। সাধারণত ঘরের আয়তন আর গুণমানের কম-বেশি ক’রে তাকে কখনো মূল পরিসর আর কখনো সহায়ক পরিসর, কখনো দিক-নির্দেশক পরিসর আর কখনো দিক-অনির্দেশক পরিসর, কিমবা সুনির্দিষ্ট কোনো নাম না দিয়ে বরং ধরণ-মূলক কোনো নাম দিয়ে তাকে পৃথক ক’রে ফেলা হয়। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রয়োজনকে এভাবে আলাদা করলে তার জটিলতাসমূহে যে পরিবর্তন সূচিত হয় কান তা স্বীকার করেন। যেমনিভাবে তার ট্রেনটন কমিউনিটি সেন্টার প্রকল্পে, এই পরিসরগুলো উনিশ শতক-পূর্ববর্তী সংলগ্ন-কক্ষের আকার-আকৃতির সাথে আরো জটিল কোনো প্রকারে সাদৃশ্যযুক্ত হয়। সুবিধার জন্য সংযোগকারী বারান্দা আর কক্ষকে শুধুমাত্র একটা কাজে ব্যবহার করার ধারণার উদ্ভব আঠার শতকে। ভবনের অভ্যন্তরে সুনির্দিষ্টভাবে স্থায়ী (বিল্ট-ইন) আসবাবপত্রের মাধ্যমে আধুনিক স্থাপত্যধারার বৈশিষ্ট্যগত পৃথককরণ এবং কর্মসূচির কার্যকারীতার বিশেষায়ন এই ধারণার সর্বোচ্চ প্রকাশ নয় কি? বিজড়িত করার মধ্য দিয়ে কান এই ধরণের গোড়া বিশেষায়ন এবং সীমাবদ্ধ কার্যকারণবাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেন। এই ক্ষেত্রে “গড়নের জন্য কার্যকারণের উদ্ভব হয়”।

নমনীয়তা প্রসঙ্গে আধুনিক স্থপতিদের বিবেচনা অনুযায়ী বহু-কার্যকরী কক্ষ সম্ভাব্য অধিকতর-সঠিক সমাধান দেয়। যে কক্ষের কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের বদলে একটা সাধারণ ব্যবহার থাকে, সরানো যায় এমন পার্টিশনের বদলে যেখানে সরানোর উপযোগী আসবাবপত্র থাকে, সে ধরণের কক্ষ কোনো বাস্তবিক নমনীয়তার চেয়ে এক ধরণের ধারণাগত নমনীয়তাকে উর্ধ্বে তুলে ধরে, এবং আমাদের ভবনের জন্য বাড়তি প্রয়োজনীয় কাঠিন্য এবং স্থায়িত্বকে সম্ভব ক’রে তোলে। কার্যকর দ্ব্যর্থকতার উপস্থিতি ব্যবহার উপযোগী নমনীয়তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।

নোট:

১. আন্তঃসংযোগ : interlock এর বাংলা পরিভাষা করলাম। অভিধানে পাচ্ছি ‘পরস্পরের মধ্যে আবদ্ধ করা / একটি তলার মধ্য দিয়ে আর একটি তলাকে আটকানো / উপরে পড়ে বা অন্যভাবে পরস্পর আবদ্ধ হওয়া’। স্থাপত্যে ইন্টারলক যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সেটা বোঝানো এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে একটু কঠিন। একটা শব্দ দিয়ে এটা বোঝানোর চেষ্টাতেই এই নতুন শব্দটা তৈরী করা। আরো ভাল পরিভাষা তৈরী না হওয়া পর্যন্ত এটাই ব্যবহার করছি আপাতত।

২. পন্টি ভেসচিয়ো : ইতালির ফ্লোরেন্সের আর্নো নদীর উপর মধ্যযুগে নির্মিত একটা সেতু যার উপর কয়েক স্তরের দোকান আছে।

৩. মহল-বাড়ি : আবদুশ শাকুর এ্যাপার্টমেন্টের বাংলা হিসেবে ‘মহল’ ব্যবহার কারাটা যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। এ্যাপার্টমেন্ট হাউজকে তাই বলা যায় একগুচ্ছ মহল নিয়ে যে বাড়ি। সমাসবদ্ধ ক’রে মহল-বাড়ি।

বঙ্গানুবাদ · স্থাপত্য

স্থাপত্যস্থিত জটিলতা এবং দ্বন্দ্ব : ৪

৪.

দ্বন্দ্বমুখর স্তরসমূহ : স্থাপত্যে “উভয়” এর উপস্থিতি-জনিত বৈশিষ্ট্য

স্থাপত্যের বোধ বা অর্থময়তার দ্বন্দ্বমুখর স্তরসমূহ এবং ব্যবহার যে আপাত-বিরোধী বৈপরীত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে তা সংযোজক অব্যয় ‘তথাপি’ এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেগুলো খানিকটা দ্ব্যর্থক হ’তে পারে। লি করবুজিয়েরের শোধান আবাস (Shodhan House) [১২] দেখতে আটকানো তথাপি খোলামেলা – একটি ঘনক, যা তার কোনাগুলো দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আটকানো, তথাপি এলোমেলোভাবে এর বহির্ভাগে খোলা। ওনার স্যাভয়-বাড়ি (Villa Savoye) [১৩] বাইরে থেকে দেখতে সাদামাটা, কিন্তু ভেতরটা জটিলতাময়। ব্যারিংটন উঠানের [১৪] টিউড’র-ধর্মী পরিলেখ যদিও প্রতিসম তথাপি অপ্রতিসম। তুরিনে অবস্থিত পবিত্র-ধারণায় গড়া গুয়ারিনির খ্রিস্ট-ধর্মীয় মন্দির [১৫] পরিলেখে দ্বৈততা নিয়েও সম্পূর্ণতা ধারণ করে। মিডিলটোন পার্কে অবস্থিত স্যার এডউইন লাইটইয়ানের প্রবেশ গ্যালারী [১৬,১৭] একটি দিক-নির্দেশক পরিসর, তথাপি এটা একটা বিবর্ণ (blank) দেয়ালে গিয়ে শেষ হয়েছে। বোমার্জতে ভিগনোলাকৃত প্যাভিলিয়নের সামনের দেয়ালে দরজা থাকার পরও এটা একটা ফাঁকা দরদালান (portico) । কানের বিল্ডিঙে অমসৃণ কনক্রিটের সাথে মসৃণ গ্রানাইটও থাকে। শহরের কোনো একটা সড়ক পথ হিসেবে দিক-নির্দেশক, তথাপি পরিসর হিসেবে নিশ্চল। ‘তথাপি’ বা ‘তথাপি অর্থযুক্ত’ এই সব বাক্যগুলো বহুবিধ কর্মসূচি (প্রোগ্রাম) আর কাঠামোগত দ্বন্দ্ব-সমৃদ্ধ স্থাপত্যের বিবরণ দেয়। এই প্রথাগত দ্বন্দ্বগুলো যেমন কোনো সৌন্দর্য খোঁজার উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে না, আবার আপাত-বিরোধীভাবে কোনো ধরণের ঝোঁকেরও প্রতিনিধিত্ব করে না।

১২. লি করবুজিয়ের, শোধান আবাস, আহমেদাবাদ

ক্লিন্থ ব্রুকসের মতে ড্যানির শিল্পে ‘উভয় পন্থা’ এরই উপস্থিতি আছে। আবার তিনি বলেন যে, এমনটা আজকের দিনে আমাদের বেশির ভাগই করতে পারি না। আমরা এমন একটা প্রথার দ্বারা শৃঙ্খলিত যা ‘এটা নয়তো ওটা’ কে বেছে নিতে বলে, এবং আমরা এমন একটা মানসিক তৎপরতা-হীনতাতে জর্জরিত – যা মনোভাবের পরিপক্বতা নিয়ে কিছু বলতে বাধা দেয় – যা আমাদেরকে শ্রেয়তর স্বাতন্ত্র্য এবং ‘উভয়’ এর ঐতিহ্যের দ্বারা স্বীকৃত অধিকতর বোধগম্য অবদমিত মনোভাবকে প্রশ্রয় দেওয়ার অবকাশ দিতো। ‘উভয়’ এর ঐতিহ্য প্রথাগত আধুনিক স্থাপত্যকে বিশেষায়িত করেছে : একটি রোদ-নিরোধক (সান স্ক্রিন)  হয়তো আর কিছু নয়; একটা অবলম্বন (সাপোর্ট) খুব কমই বেষ্টনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়; একটা দেয়াল কোনো জানলার ছিদ্র দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হয় না কিন্তু কাঁচ দ্বারা যার ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ বিঘ্নিত; কর্মসূচির (প্রোগ্রামের) কার্যকারিতা অতিরঞ্জিতভাবে নানা বিভাগে কিমবা অসংলগ্ন পৃথক প্যাভিলিয়নে বিন্যস্ত। এমনকি ‘প্রবাহমান পরিসর’ অভ্যন্তরে থেকেই বহিস্থ হয়েছে, বহিস্থ থেকেই অভ্যন্তরস্থ হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে উভয়ই না হ’য়ে। বিন্যস্ততা আর স্পষ্টতার এ ধরণের প্রকাশ জটিলতা আর দ্বন্দ্বমুখর স্থাপত্য, যা কিনা ‘এটা নয়তো ওটা’র পরিবর্তে ‘উভয়’কেই অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চায়, এর পক্ষে অসংগত।

১৩. লি করবুজিয়ের, স্যাভয়-বাড়ি, পয়সি

‘উভয়’ প্রপঞ্চের উৎস যদি হয় দ্বন্দ্ব, এর ভিত্তিভূমি বা বুনিয়াদ তবে অবস্থানক্রম (hierarchy), যা উপাদানসমূহের ভেতর অর্থময়তার বিভিন্ন স্তর সৃষ্টির কারণ হয়, মূল্যবোধের নানা রূপসহ। এটা এমন উপাদান ধারণ করতে পারে যা একই সাথে ভাল এবং কদর্য, বড় এবং ছোট, আবদ্ধ এবং খোলামেলা, ধারাবাহিক এবং সুবিন্যস্ত, গোলাকার এবং বর্গাকার, কাঠামোগত এবং পরিসরিক। যে স্থাপত্য অর্থময়তার নানা স্তরকে ধারণ করে তা দ্ব্যর্থবোধ আর উত্তেজনার জন্ম দেয়।


একমুখী পরিসরের ব্যাসিলিকা এবং সর্বমুখী পরিসরের কেন্দ্র-কেন্দ্রিক খ্রিস্ট-মন্দির পশ্চিমা মন্দির-পরিলেখের পর্যায়ক্রমকে নির্দেশ করে। কিন্তু আর এক ধরণের খ্রিস্ট-মন্দিরের ঐতিহ্যও গড়ে উঠেছিলো যেখানে পরিসরিক, কাঠামোগত, কর্মসূচি-সম্পর্কিত এবং রূপকের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নে ‘উভয়’ এর উপস্থিতি দেখা যায়। ষোড়শ শতকের ধরণবাদী (mannerist) উপবৃত্তাকার পরিলেখ একই সাথে কেন্দ্র-কেন্দ্রিক আর দিক-নির্দেশক। বার্নিনিকৃত সেন্ট এ্যানড্রিয়া-আল-কুইরিনেল এর সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন, দ্ব্যর্থক-ভাবে ক্ষুদ্রতর স্প্যানটি যার মূল দিক-নির্দেশক অক্ষ। নিক’লাস পেভনার দেখাচ্ছেন নিজস্ব-প্রার্থনাস্থলের (chapel) বদলে দেয়াল-লগ্ন-স্তম্ভের (pilasters) সাহায্যে পার্শ্ববর্তী দেয়ালের তির্যক অক্ষের দুই প্রান্তকে কিভাবে সমান দুই ভাগে ভাগ ক’রে দিয়ে ক্ষুদ্রতর অক্ষকে বেদীর (altar) সাথে অধিক সম্পর্কযুক্ত করা যায়। প্রপাগান্ডা-ফাইডে অবস্থিত বোররোমিনিকৃত গৃহ-সংলগ্ন মন্দিরটি পরিলেখ অনুযায়ী একটি দিক-নির্দেশক হলঘর, অথচ এর পার্শ্ববর্তী হাঁটার জায়গাগুলো (bay) এর প্রভাবকে পাল্টে দেয়। একটা প্রশস্ত হাঁটার জায়গা মুখ্য হয়ে ওঠে; স্বল্প পরিসরের একটা হাঁটার জায়গা লম্বা দেয়ালকে মাঝ বরাবর দুই ভাগ ক’রে ফেলে।

স্থাপত্য

স্থাপত্য পেশা : ২০১৭ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বাংলাদেশের চাষীরা একবার  উৎপাদিত ফসলের হিস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। তার নাম দেওয়া হয়েছিল তেভাগা আন্দোলন। বর্গা-চাষীর উৎপাদনের তিন ভাগের একভাগ ভূমি-মালিকদের দিয়ে দেওয়ার সে আন্দোলন কখনই সফল হয়নি এই দেশে। ভুমি-মালিকেরা নানা ছল-চাতুরী ক’রে উৎপাদনের অর্ধেকই নিয়ে নেয় আজো। আমি চাষী নই, ভূমি-মালিকও নই। তাই কোনটা যে নৈতিক বিচারে ঠিক হবে, তা নিশ্চিত ক’রে বলা আমার পক্ষে বেশ শক্ত।

তবে স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে আমার খানিকটা অভিজ্ঞতা আছে। নিয়ম আনুযায়ী বিল্ডিং কনসালটেন্সির শতকরা ১০ ভাগ রাজস্ব হিসাবে সরকারকে দিয়ে দেওয়ার কথা। পেশাজীবী সংগঠনের একটা বাৎসরিক চাঁদা আছে। আবার রাজউক, সিডিএ আর কয়েকটা পৌরসভাতে রেজিস্ট্রেশনের জন্যও চাঁদা দিতে হয়। সে কোনো ড্রয়িং জমা দিতে না পারলেও। কারণ রেজিস্ট্রেশন না থাকলে ড্রয়িং জমা দেওয়া যায় না। আবার একবার রেজিস্ট্রেশন করলে প্রতিবছরই তার জন্য ফি জমা দিতে হয়। আগের মূসক বাড়িয়ে এখন ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। সেই মূসক দেয়ার কথা ক্লাইন্ট বা বিল্ডিঙের মালিকের। কিন্তু সেই মূসক স্থাপত্য-পরামর্শকের অফিস থেকে দিতে গেলে ভ্যাট চালান করতে হয়। যেটা করতে কিনা ১২০০০/- টাকার মতো খরচ হয় এই ২০১৭ সালে। ভোক্তার মূসক সরকারের কোষাগারে যাওয়ার মাঝে পরামর্শক অফিসের কাছ থেকে প্রতিবছর কেন এই বাড়তি টাকাটা যাবে সেটা আমি বুঝি না। এর সাথে আছে অফিসের ট্রেড-লাইসেন্সের ফি। বছর দুয়েক আগে কোনো প্রকার নোটিস না দিয়েই সরকার বা অর্থমন্ত্রী (কোনটা যে সঠিক জানি না) সেটা বাৎসরিক ২৫০০/- টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৫০০/- টাকা করেছেন। যদিও এই টাকা নিজে জমা দিতে গেলে অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হয়। সময়ও নষ্ট হয়। তাতে কাজ করা কিমবা কাজ জোগাড় করা- দুইয়ের জন্যই সময় কমে যায়। শেষে অফিসের আয়টা যায় কমে। তাই এইসব রেজিস্ট্রেশনের ভারটা একজন দালালের (আর্থিক পরামর্শক বললে তারা খুশি হন) উপর ছেড়ে দিতে হয়। তাতে আরো কিছু বাড়তি খরচ হয়। রাজউক টাইপের প্রতিষ্ঠানগুলোর আরার অনেক উপ-প্রতিষ্ঠান আছে। স্থপতিদের নামের তালিকা কম্পিউটারে তুলে রাখার জন্যও আছে এমন একটি উপ-প্রতিষ্ঠান। কখনো কখনো তাদেরকেও ঘুষ দিতে হয়। তালিকাভূক্ত থাকার জন্য। যদিও এমন তালিকাভূক্তির কোনো নিয়ম নেই। তারা এটা চালু করেছে নিজেদের সুবিধার জন্য। আর বেড়েছে স্থপতিদের নাজেহাল করার সুযোগ।

এরপর আছে আয়কর। স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে স্থপতি ইন্সটিটিউটে বিধি-মতো নিবন্ধিত হ’লেই আয়করের রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান করা আছে বাংলাদেশের আয়কর আইনে। এবং সর্বনিম্ন আয়কর দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু মোটামুটি হিসাবে মাসে ৩২০০০/- টাকার মতো আয় হ’লে সর্বনিম্ন আয়কর বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাংলাদেশের কোনো স্থাপত্য পরামর্শক অফিসই আজ অব্দি এই পরিমাণ টাকা প্রারম্ভিক বেতন হিসেবে দেয় না। বছর দুই-তিন কাজ করার পর ভাল কাজ করতে পারেন এমন কেউ কেউ এই পরিমাণ টাকা বেতন হিসেবে পেতে পারেন। সে আয়করের আবার অনুপাত আছে অনেক ধরণের। একটা সীমার পর বাড়তি টাকার উপর কখনো ১০%, কখনো ১৫% আবার কখনো আরো বেশি। আমাদের অর্থমন্ত্রী এই নিয়মে কোনো পরিবর্তন করতে চান না। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে স্থপতিদের আয় অনেক ভাল; তারপরও তারা নাকি আয়কর দিতে চান না।

এরপর আছে বিভিন্ন ধরণের ব্যাংক মাসুল। বেতন বা কনসালটেন্সি থেকে আয় হওয়া টাকাটা ব্যাংকেই যায় সাধারণত। ব্যাংক এ্যাকাউন্টের সার্ভিস চার্জ আছে। এটিএম চার্জ আছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং চার্জ আছে। আরো আছে সরকারের আবগারি শুল্ক। আমার এক ব্যাংকার বন্ধু সেদিন বললেন, ব্যাংক এ্যাকাউন্টে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকলেই আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হয়, সে বছরের যে কোনো সময়ে একবার থাকলেও। তাকে আমার কাজের ধরণটা বললাম। বললাম, আমি হয়তো একটা কাজের জন্য ক্লাইন্টের কাছ থেকে একবারে ৫ লাখ টাকা নিলাম। সেই টাকা আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, প্লাম্বিং ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আর ড্রাফটসম্যানদের দিলাম এ্যাকাউন্টস-পে চেকের মাধ্যমে অথবা সরাসরি ওনাদের এ্যাকাউন্টগুলোতে। আমার ব্যাংকার বন্ধু বললেন, সবগুলো এ্যাকাউন্ট থেকেই আবাগারি শুল্ক কাটা হবে। আমার এ্যাকাউন্ট থেকে ৫ লাখ টাকার উপর, আর বাকিদের এ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ দেওয়া হয় তার উপর। কখনো বিপদে প’ড়ে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি হয়তো। টাকাটা ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন হয়েছে। সে টাকার উপরও কাটা হয়েছে আবগারি শুল্ক। আহা ব্যাংকিং ব্যবস্থা !! একই টাকার উপর যে কতবার কর বা সার্ভিস চার্জ কেটে নেওয়া হচ্ছে কে জানে! অথচ আমানতের উপর সুদের হার কমছে দিনকে দিন।

এরপর আছে যে কোনো পণ্য কিনতে গেলে তার জন্য নির্ধারিত কর, মূসক (ভ্যাট) ইত্যাদি। এখন যেটাকে ঢালাও ভাবে ১৫% করার চেষ্টা করছেন অর্থমন্ত্রী। গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিলও এর আওতার ভেতর। কিন্তু সব পণ্যের উপর যে সমান ট্যাক্স-ভ্যাট তা কিন্তু না। একটা মোটর সাইকেল বা গাড়ি কিনতে যান, ট্যাক্স-ভ্যাট কোন ক্ষেত্রেই ১০০% এর নিচে নয়। ইলেকট্রনিক পণ্যের ভ্যাট যে কখন কত কে বলবে? অথচ খুব কম ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় ওয়ারেন্টির সুবিধা। ইলেকট্রনিক পণ্যে কেন ওয়ারেন্টি সুবিধা বাধ্যতামূলক নয় তা একদমই বুঝিনা। বিশেষত এখানে স্বার্থটা কার সেটা।

সহজ বিবেচনায় যেটা বুঝি তা হলো, আমার মতো কম আয়ের পেশাজীবীদের আয়ের অর্ধেকের বেশিই বিভিন্ন ধরণের ট্যাক্সের নাম ক’রে সরকার নিয়ে নেওয়ার বিধান করে রেখেছেন। আয়ের ঠিক কতটা ট্যাক্স হিসেবে সরকারের পক্ষে নিয়ে নেওয়াটা নৈতিক সেটা ভাবি। যদিও সে ভাবনা আসলে কোনো ফলদায়ক ভাবনা নয়। শেষ পর্যন্ত মাথায় যেটা আসে তা হ’লো, ট্যাক্স ফাঁকি দিতে হবে। বেঁচে থাকতে হ’লে, টিকে থাকতে হ’লে। অর্থমন্ত্রী শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বা সেসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের স্বার্থই দেখেন। আমার মতো লোকজনের করের টাকা দিয়ে খেলাপি ঋণের টাকার হিসাব ব্যালান্স করেন। একজন সাবেক আমলা এমনটা করতেই পারেন। তার উপর যদি হন অর্থ বিষয়ে অভিজ্ঞ আমলা।

কিন্তু শ্রমিকের উৎপাদনের ঠিক কত ভাগ শেষ পর্যন্ত শ্রমিক পাবে সে আলোচনা কেউ করে না। দেশের সব রাজনীতিক যেন মরে গেছে। অথবা একজন অভিজ্ঞ আমলার হিসাবের মার-প্যাচে জড়িয়ে গেছে।

আমরা এমন এক পেশাজীবী যারা জড়িয়ে গেছি আরো বেশি। দেশে বিল্ডিং করার জন্য সার্বিক কোনো আইন নেই। ঢাকা আর চট্টগ্রাম সিটি-কর্পোরেশনের জন্য একটা বিধিমালা আছে। মানা হয় যার কমই। আমাদেরকে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  আর বিল্ডিঙের মালিকেরা এমন একটা লুপ-হোল বা ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে (প্রায় ৯৮%) আমাদেরকে দুইটা ডিজাইন করতে হয়। একটা রাজউক বা সিডিএ তে জমা দেওয়ার জন্য আর একটা নির্মাণ কাজের জন্য। খুলনা আর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে বিল্ডিং বানানোর বিধি ১৯৯৩ এর বিএনবিসি অনুযায়ী হওয়ার কথা। কিন্তু ৯৩ এর বিএনবিসিতে যেহেতু সবকিছু যথাযত ভাবে বলা নেই তাই এই শহরগুলোর বেশ কিছু নির্মাণ-বিধি নির্ভর করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপর। সারা দেশের আর কোনো জায়গায় বিল্ডিং বানানোর জন্য আইনত কোন বিধি নেই। পৌরসভাগুলো কখনো মেয়রের খেয়াল-খুশি মতো বিল্ডিং বানানোর অনুমতি দেয়, যা দেয়ার আইনগত কোন ভিত্তি এখনো বাংলাদেশে নেই। পৌরসভার মেয়র বিল্ডিং বুঝবেন এমনটা আশা করাই তো ভুল। একই ঘটনা জেলা-প্রশাসকের ক্ষেত্রেও। পৌর-এলাকাতে বিশেষ কিছু বিল্ডিং অনুমোদন করেন জেলা-প্রশাসক, নিশ্চিত ভাবেই যার এই বিষয়ে দক্ষতা নেই। এই ব্যাপারগুলো থেকেই তো সন্দেহ হওয়ার কথা- কোথাও ঘাপলা আছে। আদালত কত কত রুল জারি করেন। পৌরসভার মেয়রের কিমবা জেলা-প্রশাসকের বিল্ডিং বানানোর অনুমোদন দেয়াটা যে কেন বেআইনি নয় তা জানতে কথনো রুল জারি করতে দেখলাম না আমরা।

তার উপর উন্নয়ন কর্পোরেশনের বিধি একরকম, ফায়ার সার্ভিসের বিধি একরকম, সিটি কর্পোরেশনের বিধি একরকম, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিধি একরকম, ট্রাফিক বিধি একরকম। আবার বিধিগুলো মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব যাদের তারা টাকা খেয়ে বছরের পর বছর না দেখার ভান ক’রে চলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় এই সেক্টরে সমন্বয়ের অভাব কতটা। অথচ সমন্বয়টা খুব দরাকারি হয়ে পড়েছে এখন। সেটা স্থপতি আর ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থে নয়। টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনেই। অনেক সময়ই মানুষ ১০ তলা বিল্ডিঙের নকশা করিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু একবারে পুরোটা বানাতে পারে না। হয়তো বানায় ৪ তলা। বাকি ৬ তলা হয়তো বানাবে ১০ বছর পর। এতে বিল্ডিঙের উপরের ৬ তলার লাইফ-স্প্যান যে ১০ বছর কমে গেলো সেটা কেউ বিবেচনা করতে চায় না। ব্যাংকিং সেক্টর এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টেরের উপর যে মানুষের আস্থা কমে গিয়েছে সেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয় না। অথবা এই যে বিল্ডিঙের লাইফ-স্প্যান বিভিন্ন ভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে, আর্থিক কারণ দেখিয়ে, তাতেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাভ বেশি।

ফলত সবচেয়ে নাজুক পেশাজীবীদের একটা তালিকা করলে বাংলাদেশে স্থপতিরা উপরের দিকেই থাকবেন। অথচ একটা ভাল ভৌত-পরিকল্পনা না থাকলে একটা দেশের অর্থনৈতিক-পরিকল্পনা বেশিদূর আগাতে পারে না। কিছু অতিরিক্ত চালু অর্থমন্ত্রী/অর্থ-ব্যবস্থাপক নানা গোজামিল দিয়ে হয়তো কিছু হিসাব দেখাতে পারেন। সে হিসাব শুধুই পরিসংখ্যান। পণ্ডিত লোকেরা ঠিকই বলেন, মিথ্যা তিন রকম। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা আর পরিসংখ্যান। 

তেভাগা অন্দোলন পরিণতি পায়নি, যোগ্য রাজনৈতিক কর্মীর অভাবে। বাংলাদেশের স্থপতিদের তো কোন আন্দোলনই নেই। তারা অনেক আগেই হেরে গেছেন। কেউ কেউ নিজের মতো ক’রে যুদ্ধ ক’রে যাচ্ছেন হয়তো। কিন্তু তার সার্বিক ফল দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি এখনো। কয়েক বছর পরপরই উপকূলীয় এলাকাতে সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাসে অনেক জান-মালের ক্ষতি হয়। আমাদের এ অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। তারপরও এই এলাকাতে টেকসই বিল্ডিং বা অবকাঠামো বানানোর ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেই। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার বা নগর পরিকল্পনাকারীদের সম্পৃক্ত ক’রে অবকাঠামো তৈরী বা উন্নয়নের কোন সার্বিক প্রচেষ্টা নেই। তার প্রতিফলন হ’লো, বিল্ডিং বানানো নিয়ে একটা সার্বিক আইনের অনুপস্থিতি। দেশে বর্তমানে বিল্ডিং নিয়ে যেটুকু আইন আছে তার অনেকটা বিভিন্নভাবে অপরাধে ইন্ধন যুগিয়ে চলেছে বছরের পর বছর। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো এই অবস্থার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।