নগরী ঢাকা – ৪

দুইটা বিষয় নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে গত কয়েক দিন ধ’রে। বিমান-বন্দর সড়কে ৩ কোটি টাকা খরচ ক’রে বনসাই রোপণ আর সর্বোচ্চ আদালতের সামনে থেকে কোন এক মূর্তি বা ভাস্কর্য সরানো। ব্যাপার দুইটাকে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়। সেটা হলো, নগর কোন না কোন ভাবে তার নাগরিকদের ইচ্ছা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর সামর্থ্যের প্রকাশ করেই।

১.
প্রশ্ন আসতে পারে বনসাই কিভাবে ঢাকা নগরীর মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে পারে। হয়তো সহজ চিন্তায় সেটা ধরা যাবে না, কিন্তু প্রতিফলক যে হয়ে উঠতে চাচ্ছে তা তো আর অস্বীকার করার সুযোগ থাকছে না। বিমান-বন্দরগামী সড়ক দেখে অনেকেই বলছেন, এটা যেন মরুভূমি হ’য়ে উঠেছে। আগের ২০-২৫ বছরের পুরোনো গাছ এক বারে কেটে ফেললে এমনটা লাগতেই পারে। তার উপর যদি কিম্ভুত-দর্শন গাছ দিয়ে কথিত সোভা-বর্ধনের চেষ্টা করা হয়, তো সেটা মরুভূমির মতো লাগুক বা না লাগুক নিজেদের পরিচিত কিছুর মতো যে লাগছে না তা বলা যায়।

তার উপর মরুভূমির উপর আমাদের ভালোবাসাও বোধহয় বাড়ছে। সে মধ্য-প্রাচ্যে আমাদের নানা কারণে যাতায়াত বাড়ার জন্য কিনা, জানি না। তবে আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যে আমাদের শহরটাকে/শহরগুলোকে খানিকটা মলিন আর ধূসর করে দিচ্ছে তা নিশ্চিত। আর নিজের কর্মকাণ্ডকে কে না ভালোবাসে? গাছগুলো কাটার পর কেউ কেউ মিনমিন ক’রে জানতে চেয়েছিল, কেন কাটা হচ্ছে গাছগুলো। বলা হলো, ফুটপাথ চওড়া করা হবে। সেদিন কেউ আমরা জোর গলায় জানতে চাইলাম না, তার জন্য গাছগুলো কাটা জরুরী কেন। কারণ জোরটা আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। নিজেদের বাসাগুলো/বিল্ডিংগুলো বানাতে গিয়ে আমরা ঘুষটুষ দিয়ে যা-ও বা একটা নকশা পাস করিয়ে আনি রাজউক থেকে, শেষ পর্যন্ত সেটা মেনে বানাই খুব কম জনই। নিয়ম অনুযায়ী ঠিক যতটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে বিল্ডিং বানানোর কথা, তা আমরা আর মানি না। ফলে আমাদের বিল্ডিংগুলো আয়তনে বড় হচ্ছে বটে, কিন্তু আমাদের এলাকা থেকে উঠে যাচ্ছে গাছ – মাটিতে পানির স্তর যাচ্ছে নেমে। আমাদের শহরের মরুকরণের শুরু প্রায় আমাদের প্রতিটা বাড়ি থেকেই।

হ্যা, আমাদের টাকা বাড়ছে। অর্থনীতির পরিসংখ্যান তাই বলে। কিন্তু আমাদের বিল্ডিংগুলো সেই সাথে এ-ও বলে যে টাকাগুলোর একটা বড় অংশ চুরি করা বা কাউকে না কাউকে ফাঁকি দেওয়া। আর তাই অন্যের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক অবিশ্বাস। নিজে চোর ব’লে অন্যকেও চোর ভাবছি। নিজের চুরি করা বা কর ফাঁকি দেয়া টাকা/সম্পদকে অন্যের অগোচরে নিয়ে যেতে আমাদের তাই চেষ্টার অন্ত নেই। আমাদের বিল্ডিঙে তাই উঁচু উঁচু নিরেট প্রাচীর। বিমান-বন্দরগামী সড়কেও তাই। ‘বিউটিফিকেশন’ এর নামে সেই সব দেয়ালে হয়তো লাগানো হবে ভিনদেশী টালি। কি জানি, মহাখালির রাস্তায় যেমন ক’রে টয়লেটের টালি লাগানো হয়েছে তেমন কিছু লাগানো হবে কিনা? আমাদের টাকা বাড়লেও, সে টাকার পরিমাণ যে খুব বেশি না তা এই টয়লেটের টালিগুলোই বলে দেয়। নতুন ধনী হতে থাকা মানুষের রুচি তৈরী হতে সময় লাগেই।

তারপরও, বনসাই যে কখনো একটা রাস্তার দুই ধারে খোলা আকাশের নিচে লাগানো যেতে পারে সেই চিন্তাটা যিনি বা যারা করেছেন তাদের একটু তারিফ না করলেই নয়। কারণ বনসাই প্রচলিতভাবে অন্তঃ-পরিসরেই লাগানো হয়। এর পরিচর্যাও বেশ কঠিন এবং ব্যয়-সাপেক্ষ। ফলে এই চিন্তাটা যারা করেছেন, হয় তারা অনেক বেশি জানেন অথবা তাদের জানা-শোনাতে বড় ধরণের ঘাপলা আছে। নতুবা এই লোকগুলো অতিরিক্ত ধড়িবাজ, যারা জানে এই প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে প্রচুর টাকা এদিক-ওদিক করা যাবে। দুঃখজনক ভাবে এই লোকগুলোও এই নগরীর অংশ। এদের কাজের বিরুদ্ধে যে কেউ কথা বলবে, তেমন লোক আমাদের নগরে আজ আর নেই বললেই চলে। হঠাৎ কেউ ব’লে বসলেও তাদের বলাটা এতটাই মৃদু হয় যে, সে বলাটা একরকম না-বলারই নামান্তর হয়ে দাড়ায়। কয়েক দিন আগে দেখলাম কাজী খালিদ আশরাফ লিখেছেন এটা নিয়ে। কেউ গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না।

 

২.
আদালতের সামনের কথিত ভাস্কর্য নিয়ে বেশি কিছু বলাটা সাহসের পরিচায়ক। কিন্তু আজকের আমাদেরকে আর যা-ই হোক ঠিক সাহসী ভাবতেই ভয় পাই আমি। বলা হয়েছিল, এটা নাকি কোন এক গ্রীক দেবীর মূর্তি। আমরা কেউই সাহস ক’রে বলিনি যে আমরা গ্রীক জাতি নই। তার উপর দেব-দেবীরা সময়ের সাথে সাথে গুরুত্বে বাড়ে কমে। মানুষের সভ্যতা অনেক দিন ধরেই মানবমুখী হওয়ার চেষ্টায় আছে। সর্বোচ্চ আদালতের সামনে প্রাচীন দেবীর মূর্তি/ভাস্কর্য স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা এযুগের মানুষ কি ভাবে করতে পারেন জানি না। কিন্তু ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা যে করছেন- সেটা বাস্তবতা।

আমাদের ভাস্করও বেশ। দেবীর পোশাক বদলে দিয়েই কাজ শেষ করতে চান। আমাদের শিল্প-সমালোচকেরা এ নিয়ে কিছু বলেছেন কি? দুঃখজনকভাবে তেমন কিছু আমার চোখে পড়েনি। অর্থাৎ কেউ কিছু বললেও তা গুরুত্ব পায় নি আমাদের কাছে সাধারণ বিচারে। অথচ অসুন্দরকে নির্দেশ করাটা জরুরী ছিলো। এটা স্থাপনের পরপরই প্রতিবাদ আসা উচিত ছিল শিল্পী সমাজের কাছ থেকে। বলা দরকার ছিলো, এ জিনিস আমাদেরকে ‘রিপ্রেজেন্ট’ করার যোগ্য হয়নি। আদালতকে তো নয়ই। যে কোন ধরণের শিল্পগুণ বিচারেই এটি একটি কুৎসিত বর্জ্যের থেকে বেশি কিছু হয়নি। বিশেষ কোন বক্তব্য ধারণ করে এটা- এমন কথা এর নির্মাণকারীও বলতে পারেননি, ইনিয়ে-বিনিয়ে হলেও।

কিন্তু এই কাজটা আমাদের করা হয়নি। তেতুল হুজুরা একে অশালীন বলেছেন। সেটা ঠিক বলা কিনা, জানি না। উপরন্তু তাদের বলাটা এই শহরের বাইরে থেকে। অর্থাৎ শহরের নিয়ন্ত্রণ যে এই শহরের মানুষের হাতে পুরোটা আছে সে দাবীও আর করা যাচ্ছে না।

… এই দুটো ঘটনা তাই নাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতারই স্মারক। আমরা কেউ কেউ হাপিত্যেশ করতে পারি শুধু। কিন্তু এটাই যে আমাদের কার্যকর ‘ইমেজ’ তা অস্বীকার করতে পারি না। বরং অস্বীকার করলেই তা সময় পেরিয়ে হ’য়ে উঠবে আরো বেশি ক্ষতিকর, নগর এবং নাগরিক দুইয়ের জন্যই।

ত্বকের দর্শন ইন্দ্রিয় – ১

(যোহানি পালাসমা এর ‘eyes of the skin’ এর অনুবাদ প্রচেষ্টা: পর্ব – ১)
_________________________________________________

‘হাতগুলো দেখতে চায়, আর চোখগুলো চায় আলিঙ্গন করতে।’
-জোহান উল্পগ্যাং ভন গেটে

‘পায়ের পাতাতে থাকে নৃত্যশিল্পীর কান।’
-ফ্রেডরিক নিটসে

‘শরীরকে বোঝা যদি আরো সহজতর হ’তো, তবে আমাদের যে মনন আছে তার কথা হয়তো কেউ ভাবতো না।’
– রিচার্ড রর্টি

‘প্যালেটের (palate) সাথে আপেলের সংযুক্তির উপরই নির্ভর করে আপেলের স্বাদ, শুধুমাত্র ফলের উপর নয়। একই ভাবে, কাব্যিকতা নির্ভর করে কবিতা আর পাঠকের বৈঠকের ভেতর, বইয়ের পাতায় মুদ্রিত শব্দ দিয়ে গড়া বাক্যের ভেতরে নয়। পঠনের সাথে যে উত্তেজনা, যে প্রায় শারীরিক একটা আবেগ আমাদেরকে আচ্ছন্ন ক’রে সেই নান্দনিক কার্যক্রমটার উপস্থিতি থাকতেই হবে।
-জর্জ লুই বোরেস

‘জগতের মুখোমুখি দাড়ানোর অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন চিত্রশিল্পী কি কোনো কিছু প্রকাশ ক’রতে পারতো?’
-মৌরিস মার্লিউ-পন্টি

_____________________________________________

দৃষ্টি ও জ্ঞান
ইউরোপের সংস্কৃতিতে ঐতিহাসিক ভাবেই দৃষ্টিশক্তিকে সেরা ইন্দ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি চিন্তা করা আর দেখার ভেতরে পার্থক্যও করা হয় না। অতীতের গ্রিকরা ভাবতো- শুধুমাত্র যা কিছু দেখা যায় তার-ই নিশ্চয়তা আছে। হেরাক্লিটাসের লেখাতে আছে ‘কানের চেয়ে চোখ ভাল সাক্ষী’। দৃষ্টিশক্তিকে প্লেটো মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহার মনে করতেন। আর নৈতিক কর্মকাণ্ডকে(ethical universals)‘মনের চোখ’ দিয়ে দেখার উপর জোর দিয়েছেন। এ্যারিস্টোটলও একইরকম বোধিকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ধ’রতে পারে ব’লে দৃষ্টিশক্তিকেই ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

গ্রিকদের সময় থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা নিয়ে দর্শনশাস্ত্রে অসংখ্য লেখনী পাওয়া যায় যেখানে স্বচ্ছ-দৃষ্টিশক্তি জ্ঞানের পরিপূরক হ’য়ে উঠেছে আর আলো হ’য়ে উঠেছে সত্যের রূপক। ইতালীয় দার্শনিক এ্যাকুইনাস দেখার ধারণাকে এমনকি অন্যান্য ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধিবৃত্তীয় অনুধাবন-প্রক্রিয়ার উপরও প্রয়োগ করেছেন।

দৃষ্টির ধারণা দর্শন-শাস্ত্রকে কতটা প্রভাবিত ক’রেছে তা পিটার স্লোটারজিক গুছিয়ে লিখেছেন। ‘দর্শন-শাস্ত্রের সাধারণ একক হ’লো চোখ। চোখের একটা বিশেষ ক্ষমতা হ’লো- সে শুধু দেখেই না, তাদেরকে আর কেউ দেখছে কিনা সেটাও দেখে। শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর চেয়ে এই জায়গায় চোখ এগিয়ে যায়। তাই দর্শন-শাস্ত্রের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে চোখের প্রতিক্রিয়া আর ভাষা; কাউকে দেখতে দেখা।’ রেনেসান্স বা পুণর্জাগরণের সময় পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের ভেতর দেখাকে শুরুতে রেখে আর স্পর্শকে শেষে রেখে একটা আনুক্রম তৈরী ক’রে অনুধাবন করা হতো। এই রেনেসান্সীয় পদ্ধতিতে ইন্দ্রিয়কে বিভিন্ন মহাজাগতিক উপাদানের সাথে মিলিয়ে নেওয়া হ’তো: দেখার সাথে আগুন বা আলো, শোনার সাথে বাতাস, গন্ধের সাথে বাষ্প, স্বাদের সাথে পানি আর স্পর্শের সাথে মাটি।
পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনার আবিষ্কার চোখকে দৃশ্যমান পৃথিবীর কেন্দ্রে নিয়ে আসে, সেই সাথে ব্যক্তি-ধারণারও। পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর উপস্থাপনা নিজেই একটি রূপকে পরিণত হয়, যে রূপক বর্ণনা করার সাথে সাথে ধারণাকেও প্রভাবিত করে।

আমাদের প্রযুক্তি-নির্ভরশীলতার ফলে অনুভূতিগুলো যে আরো সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা হ’য়ে গিয়েছে- সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা আর শোনা এখনকার সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত সামাজিকতা-সহায়ক অনুভূতি। আর অন্য তিনটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাচীন অনুভূতির অবশিষ্টাংশ হিসেবে, যার অল্প কিছু ব্যক্তিগত উপযোগিতা আজও টিকে আছে। সাংস্কৃতিক চলও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদেরকে দমিয়ে রাখে। আমাদের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক আর প্রচণ্ড স্বাস্থ্য-সচেতন সাংস্কৃতিক-রীতি অল্প কিছু অনুভূতি যেমন কোনো খাবারের ঘ্রাণ, ফুলের সৌরভ বা উষ্ঞতা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াগুলোকেই সামষ্টিক সচেতনতা সৃষ্টির অনুমোদন দেয়।

অন্য অনুভূতি গুলোর চেয়ে দৃষ্টিশক্তির প্রাধান্য এবং জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ার উপর এর ধারাবাহিক প্রভাব বেশ কিছু দার্শনিক প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘আধুনিকতা এবং দৃষ্টির কর্তৃত্ব’ শীরোনামের দার্শনিক নিবন্ধের সংকলনে যুক্তি দেওয়া হ’য়েছে যে- একটি দৃষ্টি-কেন্দ্রিক, দৃশ্য-জাত, জ্ঞানের দৃষ্টি-নির্ভর ব্যাখ্যা, সত্য আর বাস্তবতা প্রাচীন গ্রিকদের থেকে শুরু ক’রে আজকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রাধান্য বিস্তার করছে। দৃষ্টি আর জ্ঞানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক, দৃষ্টি আর অধিবিদ্যা (Ontology), দৃষ্টি আর ক্ষমতা, দৃষ্টি আর নৈতিকতা নিয়ে এই চিন্তা-উদ্দীপক বইটাতে আলোচনা কারা হয়েছে।
জগতের সাথে আমাদের এই দৃশ্য-কেন্দ্রিক সম্পর্কের মডেল এবং আমাদের জ্ঞানের ধারণা, যা কিনা দার্শনিকেরা প্রকাশ করেছেন, তাকে দৃষ্টির প্রচলিত জ্ঞানতত্ত্বীয় ধারণা বলা যায়। স্থাপত্যের শিল্পগুণের বোধ এবং চর্চার সাথে অন্যান্য অনুভূতির সাপেক্ষে দৃষ্টির ভূমিকা আরো গভীরভাবে অবলোকন করাটাও জরুরী। অন্য সকল শিল্পের মতো স্থাপত্য মূলগতভাবেই পরিসর আর সময়ের অভ্যন্তরে মানুষের উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। স্থাপত্য পৃথিবীতে মানুষের অবস্থিতিকে প্রকাশ এবং তাকে সম্পর্কযুক্ত করে। ব্যক্তি এবং জগত সম্পর্কিত দর্শনশাস্ত্রীয় ভাবনাগুলো যেমন- অভ্যন্তরীনতা আর বাহ্যিকতা, সময় আর সময়কাল, জীবন আর মৃত্যু – এসবের সাথে স্থাপত্য দারুনভাবে সম্পৃক্ত। ডেভিড হার্ভে বলেছেন, ‘পরিসর এবং সময়ের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার প্রতি নান্দনিক আর সাংস্কৃতিক চর্চা অদ্ভুত রকম সংবেদনশীল, বিশেষত তা যেহেতু মানুষের অভিজ্ঞতা-জাত পরিসরিক উপস্থাপনা আর শিল্পদ্রব্যের নির্মাণের হাত ধ’রে অনিবার্যভাবেই চলে আসে।’ আমাদেরকে সময় এবং পরিসরের সাথে সম্পর্কিত করা এবং এই ব্যাপারগুলোকে একটা লৌকিক পরিমাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থাপত্য একটি মৌলিক উপকরণ। সীমাহীন পরিসর আর অবিরাম সময়কে ব্যবহার-উপযোগী করার মাধ্য দিয়ে স্থাপত্য মানবজাতির জন্য একে সহনীয়, বাসযোগ্য আর বোধগম্য ক’রে তোলে। সময় আর পরিসরের এই আন্ত-নির্ভরশীলতার ফলস্বরূপ – শিল্প আর স্থাপত্যের উপর বাইরের এবং ভেতরের পরিসরের সম্পর্ক-বোধ, বাস্তবিক এবং আত্মিক উপকরণ এবং ভাবনাগত ও অনুভূতির ব্যাপারে সচেতন এবং অ-সচেতন ঝোঁক কিংবা তাদের পারস্পারিক ভূমিকা আর মিথষ্ক্রিয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

চোখের প্রাধান্যকে উপজীব্য ক’রে দার্শনিক আলোচনা করতে উদ্বুদ্ধ ক’রে ডেভিড মিচেল লেভিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতির দৃষ্টি-কেন্দ্রীকতা বা দৃষ্টির কর্তৃত্বপরায়নতাকে প্রশ্নের সম্মুখিন করাটা যথাযথ।’ আর আমি মনে করি, আজকের পৃথিবীতে প্রাধান্য-বিস্তারী দৃষ্টিগ্রাহ্যতার চরিত্রকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।
দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতা এবং চোখের লঙ্ঘন

১. স্থাপত্যকে চাক্ষুষ শিল্প-মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। – লুইস ব্যুনুয়েল।

২. ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতরে দৃষ্টিকে শ্রেষ্ঠ ব’লে ভাবা হয়, আর দৃষ্টি-শক্তি হারানোকে চরম শারীরিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। – সালভাদর দালি।

আমাদের প্রতিদিনের দেখাকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ক’রে দেখা দরকার- সেই সাথে দরকার আমাদের নিজেদেরকে দূর-দৃষ্টিসম্পন্ন জীব হিসেবে বিশেষভাবে বোঝা।
দৃষ্টির একলা-চলা এবং আগ্রাসী চরিত্র, এবং সেই সাথে ‘পিতৃ-তান্ত্রিকতার যে ভূত’ আমাদের সংস্কৃতির পিছু ধেয়ে চ’লেছে তা নির্দেশ ক’রে লেভিন বলেন –
“দৃষ্টির ভেতর নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা বেশ পরিস্কার। আকড়ে ধরা আর বদ্ধমূল করা (fixate), অনুমোদন দেওয়া (retify) আর সম্পূর্ণ করার একটা দারুণ ঝোঁক আছে দৃষ্টি ব্যাপারটাতে। যে ঝোঁক দমন করতে চায়, নিরাপত্তা দিতে চায়, সাথে সাথে চায় নিয়ন্ত্রণ করতে। ব্যাপারটা এত ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে যে তার ফলে আমাদের সংস্কৃতির উপর এর সুনির্দিষ্ট এবং প্রতিযোগীতাহীন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
আমার মনে হয়, একইভাবে ইদানিংকালের দৈনন্দিন স্থাপত্যের নানা খুঁটিনাটি দিককে অনুধাবন করা যাবে ইন্দ্রিয়-সম্পর্কিত ধারণাসমূহের বিশ্লেষণের মাধ্যমে, আমাদের মুক্ত সংস্কৃতিতে দৃষ্টির প্রতি থাকা পক্ষপাতকে সমালোচনা ক’রে, এবং বিশেষ ক’রে স্থাপত্যের আলোচনার মধ্য দিয়ে। সমকালীন স্থাপত্য ও নগরের অমানবিকতাকে শরীর আর ইন্দ্রিয়গুলোর প্রতি অবহেলা এবং সংবেদজ অঙ্গগুলোর (sensory system) মধ্যবর্তী ভারসাম্যহীনতার পরিণতি হিসেবে ভেবে নেওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজকের প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে/দুনিয়ায় বাড়তে থাকা ব্যবধান, বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতা হয়তো বোধের কোনো ধরণের খুঁটিনাটির সাথে সম্পর্কিত। প্রযুক্তিক বিচারে সবচেয়ে অগ্রসর ক্ষেত্র যেমন হাসপাতাল বা বিমান-বন্দরে যে এমন বিচ্ছিন্নতার উদ্ভব হচ্ছে তা বেশ ভাবার বিষয়। চোখের এই আধিপত্য এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোর অবদমন আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র্য এবং বহিরাগত বানিয়ে ফেলতে প্ররোচনা দিচ্ছে। চোখের এই শিল্প নিশ্চিতভাবেই চিত্তাকর্ষক এবং ভাবনা-উদ্রেককারী কাঠামো উৎপাদন করেছে, কিন্তু তা পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ককে সহায়তা/সহজ (facilitate) করেনি। বাস্তবে আধুনিকতাবাদ সাধারণভাবে যে জনপ্রিয় রুচি আর মূল্যবোধের সীমানা ছাড়িয়ে গভীরে ঢুকতে পারেনি তা মূলত এর একমুখী যুক্তি আর দৃষ্টির প্রাধান্যের জন্য। আধুনিকতা-আশ্রয়ী ডিজাইন খুব বেশি হ’লে এই যুক্তি আর দৃষ্টিকে ধারণ করেছে; কিন্তু শরীর আর অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে অন্তর্ভুক্ত করেনি, এমনকি আমাদের স্মৃতি, কল্পনা আর স্বপ্নকেও আশ্রয় দেয়নি।

দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতার সমালোচনায়
পাশ্চাত্যের চিন্তা-ভাবনায় দৃষ্টি-কেন্দ্রিকতার ঐতিহ্য এবং তার ফলস্বরূপ দর্শক-তত্ত্বীয় যে জ্ঞান তার সমালোচনা পুরোনো দিনের দার্শনিকেরাও করেছেন। যেমন, রেনে ডেকার্তে ইন্দ্রিয়গুলোর ভেতরে দৃষ্টিকে সবচেয়ে সার্বজনীন আর সম্মানিত ব’লে বিবেচনা করতেন; আর তাই তার বস্তুবাদী দর্শন (অবজেক্টিফাইয়িং) দৃষ্টিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েই গ’ড়ে উঠেছে। তারপরও, তিনি দৃষ্টিকে স্পর্শের সমানও মনে করেছেন, অনুভূতি হিসেবে স্পর্শকে দৃষ্টির তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য এবং তাতে ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে ব’লে বিবেচনা করেছেন।

আপাত প্রতীয়মান দ্বন্দের ক্ষেত্রে চিন্তার স্বাভাবিক পদ্ধতি ব্যবহার ক’রে ফ্রেডরিক নিটসে দৃষ্টি-কেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনার কর্তৃত্বকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিভিন্ন দার্শনিকের ‘চোখকে সময় আর ইতিহাসের বাইরের বিষয়’ ব’লে বিবেচনা করার ব্যাপারটার সমালোচনা করেছেন। তিনি এমনকি ইন্দ্রিয়গুলোর প্রতি বিশ্বাসঘাতী এবং অন্ধভাবে  বিরুদ্ধতাকারী দার্শনিকদেরকে অভিযুক্ত করেছেন। মার্ক স্কেলার স্পষ্ট ভাষায় এই মনোভাবকে শরীর-বিদ্বেষ ব’লে উল্লেখ করেছেন।

পাশ্চাত্যের এই প্রতি-দৃষ্টিকেন্দ্রিক (এন্টি-অকুলারসেন্ট্রিক) ধারণা আর চিন্তার উদ্ভব বিশ শতকের ফরাসী বুদ্ধিবৃত্তিক-সমাজে। আর এটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যাবে মার্টিন জ লিখিত ‘অবনত চোখ : বিশ শতকের ফরাসী ভাবনাতে দৃষ্টির সন্মানহানী’ শিরোনামের বইটাতে। লেখক নানা বৈচিত্রময় ক্ষেত্র যেমন প্রিন্টিং-প্রেসের আবিস্কার, কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা, স্থিরচিত্রধারণ(ফটোগ্রাফি), ভিজ্যুয়াল কাব্য আর সময়ের নতুন অভিজ্ঞতার ভেতরে আধুনিক কালের দৃষ্টি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশের সূত্র খুঁজেছেন। অপরপক্ষে হেনরি বার্গসন, জর্জ বাটেইলি, জ্যা পল সার্ত্র, মেউরিস মারলেউ-পন্টি, জ্যাক লাকান, লুই এ্যালথ্রুসার, গে ডিবোর্ড, রোল্যান্ড বার্থেজ, জ্যাক দেরিদা, লুসি ইরগারে, ইমানুয়েল লেভিনাস এবং জ্যা-ফ্রান্সিস লয়োটার্ড প্রমুখদের মতো পরবর্তীকালের ভাবনা গ’ড়ে দেয়া বেশ কিছু ফরাসী লেখকদের প্রতি-দৃষ্টিকেন্দ্রিক অবস্থান বিশ্লেষণ করেছেন।

সার্ত্রে দ্বার্থহীনভাবে দৃষ্টির ধারণার বিরোধী হ’য়ে তাকে দৃষ্টিকেন্দ্রিক-ভীতি বলেছেন; ‘দেখা’ বিষয়ে তার রচনাবলীতে ৭০০০ বারের মতো উল্লেখ আছে।…

আত্ম-মগ্ন আর অস্তিত্ববাদী চোখ (The Narcissistic and Nihilistic Eye)
সর্বপ্রথম হাইডেগার দৃষ্টির কর্তৃত্বকে প্রশংসার ধারণা দেন, কিন্তু এটা আধুনিক কালে ধীরে ধীরে অস্তিত্ববাদের দিকে ঝুঁকে যায়। একটি অস্তিত্ববাদী চোখের ব্যাপারে হাইডেগারের মতামত আজকের দিনে বিশেষভাবে চিন্তার উদ্রেগ করে; স্থাপত্য-সম্পর্কিক পত্রিকাগুলোতে নজর কাড়তে পারা গত বিশ বছরের বেশ কিছু স্থাপত্য প্রকল্প আত্ম-মগ্নতা আর অস্তিত্ববাদ দুইকেই প্রকাশ করে।

কর্তৃত্বকারী চোখ সব ধরণের সাংস্কৃতিক উৎপাদনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়, যা সম্ভবত আমাদের সহানুভূতি, সমবেদনা আর বাস্তবের সাথে অংশগ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। আত্ম-মগ্ন চোখ স্থাপত্যকে দেখে শুধুমাত্র আত্ম-প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে, আর একটি বৃদ্ধিবৃত্তিক-শিল্পীত খেলা হিসেবে অবশ্য-প্রয়োজনীয় মানসিক এবং সামাজিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, যেখানে কিনা অস্তিত্ববাদী চোখ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবেদনশীল এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা আর ভিন্নতাকে বাড়িয়ে দেয়। মানুষের শরীর-কেন্দ্রিক এবং বাস্তবতার সমন্বিত অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে অস্তিত্ববাদী স্থাপত্য শরীরকে বিজোড়িত করে না এবং পৃথক করে, উপরন্তু সাংস্কৃতিক বিন্যাসকে পুনর্নির্মানের চেষ্টা না ক’রে সামগ্রিক গুরুত্বায়নের পাঠকে অসম্ভব ক’রে তোলে। …

মৌখিক বনাম চাক্ষুষ পরিসর
Oral versus Visual Space

তবুও দৃষ্টি সবসময় মানুষের উপর কর্তৃত্ব করেনি। প্রকৃতপক্ষে, প্রথমদিকে মনুষের উপর শ্রবণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিলো আর ধীরে ধীরে সেটার জায়গা নিয়েছে দৃষ্টি। প্রত্ন-সাহিত্যে এমন কিছু জনপদের কথা পাওয়া যায় যেখানে আচার-আচরণ আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘ্রাণ, স্বাদ আর স্পর্শের মতো একান্ত অনুভূতিগুলোর সমষ্টিবদ্ধ গুরুত্ব ছিলো।… অনেকগুলো জন-গোষ্ঠীতে সামগ্রিক আর ব্যক্তিগত পরিসর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুভূতিগুলোর ভূমিকা কেমন ছিলো তা নিয়ে এডওয়ার্ড টি হলের বই ‘গোপন পরিমাপ’ (দ্য হিডেন ডাইমেনসন) এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ, যদিও দুঃখজনকভাবে স্থপতিরা এটার কথা ভুলে গেছেন বলেই মনে হয়।

চোখের শক্তি এবং দুর্বলতা

….

প্রকৃতপক্ষে, দৃষ্টির সংশয়হীন কর্তৃত্ব হয়তো খুব প্রাচীন বিষয় নয়, গ্রিকদের চিন্তা এবং আলোকবিদ্যার সাথে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকার পরও।লুসিয়েন ফেভরির মতে –“ ষোড়শ শতকের মানুষেরা দেখার আগে শুনতো এবং গন্ধ শুকতো, তারা বাতাস টেনে নিতো এবং শব্দ খেয়াল করতো (caught sound)। অনেক পরে এসে মানুষ গুরুত্বসহকারে এবং সক্রিয়ভাবে জ্যামিতির সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে নিয়েছে, কেপলার (১৫৭১-১৬৩০) আর Desargues of Lyon (১৫৯৩-১৬৬২) এর প্রভাবে বস্তুর নানা ধরণের গড়নের প্রতি মনোযোগী হয়েছে।

জানালা

গুরুত্বের বিচারে কে বেশি এগিয়ে যাবে? দরজা না জানালা? এই প্রশ্ন আমার অনেক দিনের। তবু সঠিক উত্তরটা জানি- এই দাবি করতে পারি না। অথচ এই দুইয়ের সাথেই আমার পরিচিতি দীর্ঘ দিনের। অনেকটা সময় ধ’রে এদের সাথে আমার পরিচয় ছিলো নিছক অসচেতন ভাবে। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই অসচেতনভাবে গ’ড়ে ওঠা সেই পরিচিতি একধরণের স্মৃতি বৈ অন্য কিছু নয়। অর্থাৎ আজকের আমার উপর সেই সব অসচেতন স্মৃতিগুলোর বাস্তব প্রভাব বেশ কম। কিন্তু স্মৃতিখন্ডগুলোর ভেতর দরজার থেকে জানালার উপস্থিতি যে বেশি তা নিশ্চিত ক’রেই বলতে পারি।

কোন দরজা কতবার কতভাবে পেরিয়ে গিয়েছি তার স্মরণ রাখার চেষ্টা খুব কমই করেছি। তাই মনেও করতে পারিনা খুব। কোন জানালা কতবার খুলেছি, বন্ধ করেছি- তাও মনে রাখিনি। তবুও বিভিন্ন জানালার পাশে দাড়িয়ে থাকার বা জানালা দিয়ে দূর কিমবা দূরতরকে দেখার চেষ্টাটা বেশ মনে পড়ে। তার জন্য তেমন চেষ্টাও করতে হয় না। কেন? এই প্রশ্নের ভেতর দিয়ে কখনো কখনো যেন গুরুত্বের ব্যাপারটার একটা সূক্ষ্ণ আঁচ করতে পারি।

এদের সাথে আমার দ্বিতীয় ধাপের পরিচিতিটা বেশ আনুষ্ঠানিক। সে পরিচিতির কিছুটা অনেকের কথার লেশ ধ’রে, বেশ খানিকটা আবার অদ্ভুত কিছু মানুষের লেখার রেশ ধ’রে, কিছু পরিমাণে র‍্যান্ডম স্থিরচিত্রের মাধ্যমে আর অবশ্য অবশ্যই অনেক অনেক ড্রয়িঙের রেখার পরশে। এ পরিচিতি বেশ সচেতন- বেশ গোছানো। কখনো কখনো হয়তো কাঙ্ক্ষিতভাবে এলোমেলো ক’রে গোছানো। আর তাই আমার বাস্তবতাতে এই পরিচিতির উপস্থিতি প্রতিনিয়ত প্রকট।

ফলে এই দুইয়ের ভেতরে সেখানে দ্বন্দ্বের চেয়ে সহাবস্থান বেশি। কিন্তু কে বেশি মনোযোগ নিয়ে নেয়? কে বেশি মনোযোগ দাবি করে? সে মীমাংসা আজো করতে পারিনি। সচেতন ভাবেও।

আর তাই অবচেতনের কাছেই ফিরে যেতে হয়। সেখানে জানালার বড্ড বাড়াবাড়ি। সেখানে জানালা যেন আকাঙ্ক্ষার কারিগর। যেন অজানা কোন কিছুর প্রেরণা।

নগরী ঢাকা – ৩

নগরের একটা আকর্ষণ আছে। তাই সে মানুষকে টানে। ব্যর্থ মানুষ। স্বপ্নাতুর মানুষ। নিস্ব মানুষ। সম্পদশালী মানুষ। হতাশ মানুষ। আশাবাদী মানুষ। সবাইকেই টানে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কাজ দিয়ে। থাকার জায়গা দিয়ে। আনন্দ দিয়ে। বিনোদন দিয়ে। স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। সম্ভাবনার রঙিন ফানুস উড়িয়ে।

আবার মানুষও তার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ চায়। খুব তীব্রভাবেই চায়। সহস্র বছর ধ’রে সে চেয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠা। গড়তে চেয়েছে এমন কিছু যা টিকে থাকবে তার জীবনকে ছাপিয়ে। অথচ যার সমস্ত গায়ে থাকা চায় তার স্মৃতি, তার অভিজ্ঞতা। তার আবিস্কার দিয়ে, তার যত আয়োজন দিয়ে, তার শত কল্পনা দিয়ে তাই মানুষ গড়ে যায় শহর-নগরী।

নগরীর গড়ে তোলা তাই কখনো শেষ হয় না। প্রতি যুগের মানুষ একটু একটু করে পরিবর্তন আনে পুরোনো নগরীর অবয়বে। ধুলো ঝেড়ে, আলো জ্বেলে, অনেকটা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে তাকে ক’রে তোলে সময়োপযোগী। কখনো কখনো যে একেবারে আনকোরা কোনো নগরী গড়ে তুলতে চায়নি মানুষ তাও নয়। অন্তত বিশ শতকের বেশ কিছু উজ্জ্বল মানুষ বেশ ঘটা ক’রেই চেয়েছিলেন। সময়টা যে ছিল কারখানা বিপ্লবের। তাই দূষণ ছিল যত্রতত্র। শব্দ মানেই যেন ক্যাওয়াস। ধুলো আর ধোয়া তো আছেই । সেই সাথে রাসায়নিক বর্জ্যেরও কমতি নেই। অনেকেই তাই সবকিছু মিলিয়ে নগর তৈরীর পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। চেয়েছিল কারখানা থেকে দূরে গিয়ে তার কল্লোলিনী তীলোত্তমা গড়ে তুলতে।

কিন্তু শুধু কয়েক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তো আর নগর গড়া যায় না। বিশ শতকের মানুষের পক্ষেও তাই সফলভাবে আনকোরা নগর আর গড়া সম্ভব হয়নি। হয়নি লি কর্বুজিয়েরের পক্ষেও। ইবেনিজার হাওয়ার্ড, ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট, লি কর্বুজিয়েরদের দুর্বিনিত অদম্য ইচ্ছের ব্যর্থতা আজ আমাদের সামনে হাজির হয় নতুন কোনো স্বপ্নের আকর হ’য়ে। আমরা যেন নগর গড়ার নতুন হাতিয়ারে সমৃদ্ধ হ’য়ে উঠি। নতুন উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে যাই আমাদের পুরনো জীর্ণ নগরীর সংস্কারে। বিশ শতকের ব্যর্থতারও যেমন সংস্কার দরকার আজ, তেমনি দরকার তারও আগের সাফল্যেরও। আজ সেটা করা না গেলে তা হয়ে ওঠবে একুশ শতকের এক উল্ল্যেখযোগ্য ব্যর্থতা।

নগরী ঢাকা – ১

লুই কান বলেছিলেন, “শহর সবসময় অপরিকল্পিত ভাবেই গড়ে ওঠে – তবে আমরা একটা শহরকে নগরে রূপান্তরিত করতে পারি।” এর মানে কিন্তু এই নয় যে অপরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে ওঠে না। অপরিকল্পিতভাবেও নগর গড়ে উঠতে পারে। তবে তা শেষ পর্যন্ত ঠিক কতটা বাসযোগ্য থাকে সেটাই প্রশ্ন।

ঢাকা এমনই একটা নগরী যা ঠিক পরিকল্পনা ক’রে গড়ে ওঠেনি। এর ছোট ছোট কোনো পাড়া, মহল্লা কিংবা এলাকা হয়তো কখনো কখনো অল্প-স্বল্প কিছু পরিকল্পনার ছোঁয়া পেয়েছিল এই যা। আর তাই ঢাকা নগরীর নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র বা ইমেজ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ঢাকা একটা দেশের রাজধানী। অর্থাৎ মূল প্রশাসনিক শহর। আবার প্রধান সামরিক ঘাঁটিও।আজকের ঢাকা নগরীর একেবারে মাঝখানের বিশাল জায়গা জুড়ে আছে প্রকাণ্ড এক ক্যান্টনমেন্ট। অনেকগুলো সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ঢাকা একটা শিক্ষা-নগরীও। দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রায় সবগুলোই ঢাকাতে তৈরী করা হয়েছে। এরপরও ঢাকাই ১৬ কোটি-মানুষ নিয়ে গড়া বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর। শিল্প-শহরও বটে। ফলে ঢাকাতে প্রতিনিয়তই অগণিত মানুষের আনাগোনা। যা ঢাকা শহরকে পরিণত করেছে ঢাকা নগরীতে।

কারণ নগরের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেখানে থাকতে হবে প্রচুর বহিরাগত আর অপরিচিত মানুষ। শুধু স্থায়ী মানুষের বসতি দিয়ে নগর তৈরী হয় না। হয়তো একটা বড় শহর গড়ে তোলা যেতে পারে মাত্র।(১)

আর অপরিচিত মানুষের মধ্যে একধরণের অবিশ্বাস কাজ করেই। পরিচিত বা নিজের গণ্ডির ভেতরের কাউকে ঠকানোর চিন্তা মানুষের মধ্যে কমই আসে। কাছের মানুষের কোনো বিপদে মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই তার পাশে গিয়ে দাড়ায়। কিন্তু একজন অপরিচিত মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগে বেশিরভাগ মানুষই অন্তত একবার হ’লেও ভাবে। তারপর অনেকেই পিছিয়ে আসে। যে কারণে নগরীর মানুষেরা এত একা। এত এত মানুষের ভীড়েও।

শহরকে নগরে রূপান্তর করার কাজটা তাই খুব সহজ নয়। যেমন সহজ নয় নগরীর মানুষকে বুঝে ওঠা। আবার এই বুঝে ওঠার কাজটা ঠিকমত করতে না পারলে বাসযোগ্য নগরী তৈরী করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ঢাকা হয়তো অ-বাসযোগ্য নগরীর বিভিন্ন তালিকার প্রথম দিকেই থাকে। তবুও বাস্তবতা হলো- আড়াই থেকে তিন কোটির মতো মানুষ এই নগরীতে থাকছে এই মুহূর্তে। সেই সাথে প্রতিনিয়ত আরো মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঢাকার লোকসংখ্যা তাই বাড়ছে। বাড়ছে খুব দ্রুত। এতটা দ্রুত আর কোনো শহরের লোকসংখ্যা বেড়েছে কিনা তা বলা শক্ত। যা ঢাকাকে নিয়ে পরিকল্পনা করাটাকে করে তুলছে আরো দুরুহ।

নগরীর বাসযোগ্যতার প্রশ্নে তার নিরাপত্তাই বোধকরি মূল বিষয়। আর সাধরণভাবে নিরাপত্তা ব’লতে রাস্তাঘাটের নিরাপত্তাকেই বোঝানো হয়। যে নগরীর রাস্তাঘাট নিরাপদ সে নগরী হ’য়ে ওঠে প্রাণবন্ত। মানুষ তাকে উৎসবের নগরী বানিয়ে ফেলতে চায়। কারণ উৎসবই পারে মানুষকে আরো মানুষের কাছে টানতে। নগরীর এও একধরণের চাহিদা। নগরে তাই মিছিল ওঠে। র‍্যালি হয়। যা কিনা এক ধরণের যাত্রাই। অথচ নগরীর মানুষেরা তো প্রতিদিনই যাতায়াত করছে। একটু আয়োজন ক’রে যাতায়াত করাটাই তাই হয়ে ওঠে নগরীর মূল উৎসব। রাস্তা হয়ে ওঠে উৎসবের মাঠ।

নগরীর রাস্তা আর ফুটপাথ তাই শুধু গাড়ি-ঘোড়া, মানুষ আর মালামাল আনা-নেওয়ার একটা মাধ্যম শুধু নয়। এ আরো অনেক বেশি কিছু। একটা নগর কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নের উত্তরে লুই কান তাই বলেছিলেন, “একটা শিশু নগরীর একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যেন ভেবে নিতে পারে সে বড় হয়ে কি হতে চায়”।

কিন্তু আমাদের ঢাকা নগরীর রাস্তাগুলো কি এমন? কতটা নিরাপদ এর রাস্তাগুলো? মানুষের জন্য ? বাচ্চাদের জন্য? আগন্তুকদের জন্য? প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বেশিরভাগের কাছে একই রকম। সেটা হলো ঢাকার রাস্তা খুব একটা নিরাপদ নয়। যখন তখনই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ছিনতাইয়ের শিকার হতে পারে যে কেউ যে কোনো সময়। নারীদের জন্যও স্বস্তিদায়ক নয় ঢাকার রাস্তাঘাট। রাতের রাস্তা তো কারো জন্যই নয়।

তবুও ঢাকা বড় হচ্ছে। ঢাকাতে চলছে প্রচুর ভাঙা-গড়ার কাজ।

১) Great cities are not like towns, only larger. They are not like suburbs, only denser. They differ from towns and suburbs in basic ways, and one of these is that cities are, by definition, full of strangers. To any one person, strangers are far more common in big cities than acquaintances. More common not just in places of public assembly, but more common at a man’s own doorsteps. Even residents who live near each other are strangers, and must be, because of the sheer number of people in small geographical compass. –জেন য্যাকবস

সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম।
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/54646

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমফর (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

The hard core of beauty

সৌন্দর্যের চরমতা
১৯৯১

দুই সপ্তাহ আগে আমি রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান শুনছিলাম। অনুষ্ঠানটা ছিল মার্কিন কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামের উপরযার শিরোনাম ছিল “সৌন্দর্যের চরমতা”। সৌন্দর্যের যে একটা চরম সীমা আছে – এই ভাবনাটা আমার ভাল লাগল। সৌন্দর্য আর চরম সীমার- এই সম্পর্কের ব্যাপারটার খানিকটা আভাস আমি খুঁজে পেলাম পরবর্তীতে আমার স্থাপত্য নিয়ে ভাববার সময়। উইলিয়াম যেন বলছিলেন, ” মেশিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু থাকে না।” সাথে সাথেই আমার মনে হলো – পিটার হ্যান্ডকি (Peter Handke) যেন এমনই একটা ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করেন। তার হতাশাটা আমি বুঝতে পারিযখন তিনি বলেন- প্রকৃতিতেই সৌন্দর্যের বাসপরিণত বস্তু যখন আমাদেরকে কোন কিছু নির্দেশ করে নাকিমবা যখন তিনি নিজে থেকে কোন কিছুর অর্থ করতে পারেন না।

বেতারের ঐ অনুষ্ঠান থেকেই তখন আমি জানলাম যেকোন কিছুর নিজস্বতার বাইরে অন্য কোন আইডিয়া নেই – এই বিবেচনাই ধারণ করে উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কবিতা। নিজের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতিগুলোকে বাস্তবিক জগতে (world of things) নিয়ে গিয়ে সেগুলোকে তার নিজের করে নেওয়াই তার শিল্পের লক্ষ্য।

সঞ্চালক বলছিলেন, এই ব্যাপারটা উইলিয়ামের কাজে দৃশ্যত নৈর্ব্যক্তিক এবং অল্প-কথায় অর্থপূর্ণ ভাবে ঘটেআর এই কারণেই তার লেখনীর এতটা আবেগময় প্রভাব।

কথাগুলো আমাকে আকৃষ্ট করল। বলল বিল্ডিং নিয়ে আবেগী হয়ে উঠতে আগ্রহী না হতেতারপরও আবেগকে জাগতে দিলামপ্রকাশিত হতে দিলাম।

সৌন্দর্যের চরমতা : একিভূত/জমাটবদ্ধ উপাদান।

(অসমাপ্ত)

 

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমথর (চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

The body of architecture
স্থাপত্যের অবয়ব
১৯৯৬


জাতীয় জাদুঘরের কিউরেটর আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত আর অপ্রত্যাশিত সব প্রশ্ন করে তিনি আমাকে হতবাক করার চেষ্টা করছিলেন। আমি স্থাপত্য নিয়ে কি ভাবতাম? আমার কাজের কোনদিকগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? এইসবই জানতে চাচ্ছিলেন। সাক্ষাৎকারটা রেকোর্ড হচ্ছিল। আমি আমার মতো ক’রে যতটা পারি বলেছি। কিন্তু সাক্ষাৎকার শেষে আমার নিজের উত্তরে আমি নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধুর সাথে পারে কথা বলি। আকি কাউরিসমাকির সাম্প্রতিক চলচিত্র নিয়ে। চরিত্রের প্রতি পরিচালক যে মনোযোগ আর শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তাতে আমি মুগ্ধ। অভিনেতাদেরকে তিনি কোন কিছুতে আটকে রাখেন না। কোন চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ কারার জন্যও ব্যবহার করেন না। বরং তাদেরকে এমনভাবে আলোকিত করে উপস্থাপন করেন যে আমরা সহজেই তাদের বৈশিষ্ট্য কিমবা গোগনীয়তা বুঝে যাই। কাউরিসমাকির শৈলী তার চলচিত্রে একটা উষ্ঞতার অনুভূতি এনে দেয়। আমার বন্ধুকে তখন বললাম, এখন বুঝতে পারছি সকালের সাক্ষাৎকারে আমার কি বলাটা ঠিক হতো। কাউরিসমাকি যেভাবে চলচিত্র বানান, আমি আসলে সেই ভাবেই বিল্ডিং বানাতে চাই।


যে হোটেলে আমি থাকছিলাম সেটাকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন একজন জনপ্রিয় ফরাসী স্থপতি। ওনার কাজের সাথে আমি আগে পরিচিত ছিলাম না। পুরানো ধাচের কাজ করেন উনি। এই ধরণের কাজের প্রতি আমার আগ্রহ নেই। কিন্তু হোটেলে ঢোকার পরপরই তার তৈরী করা পরিবেশ আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কৃত্রিম আলো হলঘরটাকে যেন মঞ্চের মতো করে আলোকিত করে রেখেছে। কোথাও আলো আছে আবার কোথাও বা অন্ধকার। অভ্যর্থনার জায়গাটা বেশ উজ্জ্বল। দেয়ালের কুলুঙ্গিগুলোতে বিভিন্ন ধরণের পাথর। গ্যালারির দিকে উঠে যাওয়া বড়সড় সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে লোকজন চকচকে সোনালী দেয়ালের পাশে হয়তো একটু দাড়ায়। উপরের দিকের ড্রেস-সার্কেল বক্সে হালকা কিছু খাওয়ার জন্য কেউ কেউ একটু বসে নেয়। অবশ্য এগুলো বেশ ব্যায়বহুল। ‘প্যটার্ন ল্যাংগুয়েজ’ এর লেখক আলেকজান্ডার এটা দেখে নিশ্চয় খুশি হতেন। যে ধরণের পরিসরিক ব্যবস্থাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে তার বর্ণনা আছে এই বইটাতে। হলঘরের বিপরীত দিকের একটা বাক্সে আমি বসেছিলাম, যেন একজন দর্শক যে নিজেকে ডিজানারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবিস্কার করে। নিচের দিকে তাকিয়ে লোকজনের আসা-যাওয়া দেখতে আমার ভালই লাগল। আমি যেন বুঝে উঠতে পারলাম এই স্থপতির সফলতার কারণ ।


হৃদি বলছিল- তার উপর ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের একটা ছোট্ট বাড়ীর বেশ প্রভাব আছে। বাড়ীটা সে অনেক আগে দেখেছিল। ছোট ছোট ঘর আর বেশ নামানো সিলিং ছিল বাড়ীটাতে। ছোট্ট লাইব্রেরিতে অদ্ভুতভাবে আলো আসতো। প্রচুর জড়োয়া স্থাপতিক কারুকাজ করা ছিল। পুরো বাড়ীটা একটা সুষ্পষ্ট আনুভূমিকতা নিয়ে হাজির হতো যেমনটা আগে কখনো দেখেনি। বেশ বয়স্ক একজন মহিলা সেখানে বাস করতেন। আমার মনে হয়েছিল বাড়ীটাতে গিয়ে আমার দেখার কিছু নেই। মেয়েটা যা বোঝাতে চাচ্ছিল তার সাথে আমি আগে থেকেই পরিচিত। বাড়ীর ব্যাপারে সে যে অনুভূতির কথা বলছিল সেটাও আমার জানা।


একটা স্থাপত্য প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়া স্থপতিদের কিছু বিল্ডিং বিচারকদেরকে দেখানো হচ্ছিল।

(আংশিক)

 

door…

The door is very important as it stands between spaces as both visual and physical means. So it must tell us something. Something subtle with our memories. Not just our individual memories. Memories that lay deep inside our society. Society that propagates the decision of inclusion and exclusion, sometimes even rejection. It’s some kind of filtration. Even the door can play a part in it. Thus it becomes part of the society. And by being part of the society it holds the authority to welcome or not. Though protection is also offered it is not the only thing to ensure that. Then it is in need of being a part of a system. System that developed and maintained by the society which can vary according to places. So varies the part it plays in a system. A system which is very earthly. So, I think, door represents the reality rather than the paranormal.

ভাবনায় স্থাপত্য – পিটার জুমথর (প্রথম পরিচ্ছেদ)

(পিটার জুমথর এর Thinking Architecture এর অনুবাদ প্রচেষ্টা। আপাতত কিছু লাইন অনুবাদ না ক’রেই রেখে দিচ্ছি। যুতসই অনুবাদ না করতে পারার জন্য। অথবা যেটা খসড়া অনুবাদ করেছি সেটার থেকে ইংরেজীটাই ভাল লাগছে ব’লে। যদি কেউ এই অনুবাদ প্রচেষ্টা পড়ে থাকেন তাদেরকে অনুরোধ করছি সমালোচনা করার জন্য। যে অংশগুলো ইংরেজীতে আছে সেগুলোর অনুবাদে পরামর্শ দেওয়ার জন্য।)

স্থাপত্য নিয়ে ভাবনা
Thinking Architecture


A way of looking at things
দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৮৮

হারানো স্থাপত্যের খোঁজে
In search of the lost architecture

স্থাপত্য নিয়ে ভাবতে গেলে আমার মানসপটে কিছু ছবি ভেসে ওঠে। যাদের বেশির ভাগই স্থপতি হিসেবে আমার শিক্ষা আর কাজের সাথে সম্পর্কিত। এত বছর ধরে আমার অর্জিত পেশাগত জ্ঞান তারা ধারণ করে। তাদের কারো কারো মধ্যে থাকে আমার ছোটবেলার স্মৃতি। স্থাপত্যকে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই একটা সময় আমি স্থাপত্যের  সংস্পর্শে এসেছি। কখনো কখনো আমি যেন অনুভব করতে পারি হাতে ধরা বিশেষ কোনো দরজার হাতলকে। যে হাতলটা কোনো একটা ধাতু দিয়ে তৈরী চামচের উল্টো দিকের মতো।

আমার এক চাচীর বাগানে ঢোকার দরজাতে ছিল এই হাতলটা। আজো ঐ দরজার হাতল আমার মনে বিচিত্র ধরণের মুড আর গন্ধের কোনো জগতে ঢোকার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে আমার পায়ের নিচের নুড়ির শব্দ। মসৃণ করা ওক কাঠের সিড়িঘরের দৃপ্তি। অন্ধকার করিডোর দিয়ে এগিয়ে বাড়ির একমাত্র আলোকিত ঘর- রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমি যেন শুনতে পাই ভারি মূল-দরজার বন্ধ হওয়ার শব্দ।

স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ে, একমাত্র এই ঘরের সিলিংই যেন সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে যেত না। গাঢ় লাল রঙের ছয়কোণা মেঝের টালি ছিল নিখুত ভাবে লাগানো। এমনকি তার জোড়াগুলোও বোঝা যেতো না। পায়ের নিচে খুব শক্ত কিছুর উপস্থিতি টের পেতাম। আর কাপবোর্ড থেকে পেতাম তেল চিটচিটে একটা গন্ধ।

পুরোনো আর দশটা রান্নাঘরের মতই ছিল এর সবকিছু। চোখে লাগার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। হয়তো এর এই অতি সাধারণত্বের জন্য এর স্মৃতি আমার ভেতরে র’য়ে গেছে। আমার রান্নাঘরের ধারণা তাই এই ঘরটির আবহের সাথে মিলে যায়।

Now I feel like going on and talking about the door handles which came after the handle on my aunt’s garden gate, about the ground and the floors, about the soft asphalt warmed by the sun, about the paving stones covered with chestnut leaves in the autumn, and about all the doors which closed in such different ways, one replete and dignified, another with a thin, cheap clatter, others hard, implacable and intimidating.

আমার মতে, এই ধরণের স্মৃতিতেই থাকে স্থাপত্যের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা। স্থপতি হিসেবে এই সব স্মৃতির ভেতরেই আমি খুঁজে ফিরি স্থাপত্যের আবহ আর প্রতিচ্ছবি।

বিল্ডিং ডিজাইন করার সময় আমি অনবরত আমার পুরোনা ছাড়া-ছাড়া স্মৃতির ভেতর ঘোরাফেরা করি। ভাবতে থাকি স্মৃতির কোনো একটা অবস্থার স্থাপতিক দিক। আমার উপর তার কি প্রভাব পড়েছিল সেটা মনে করতে চেষ্টা করি। সবকিছুরই যেন একটা নির্দিষ্ট জায়গা আর ধরণ ছিল। তাদের স্বাভাবিক উপস্থিতি প্রাণবন্ত ক’রে তুলতো সেই স্থানকে। আমি এই স্মৃতিগুলোর সাহায্য নিতে চেষ্টা করি। যদিও আমি বিশেষ কোনো ধরণ নির্দেশ করতে পারি না, তবু যেন একটা পূর্ণতা আর মায়ার ছোঁয়া পাই। আমার মনে হ’তে থাকে – এমনটা আমি আগে কোথাও দেখেছি। অথচ আমি নিশ্চিত জানি, এর সবই নতুন। অন্যরকমও। পুরোনো কোনো স্থাপতিক কাজের সাথে এর এমন কোনো সংযোগ নেই যা স্মৃতিকাতরতার গোপনীয়তাকে ফাঁস ক’রে দিতে পারে।

ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরী
Made of materials

জোসেফ বয়োস এবং ‘আর্টি পভেরা গ্রুপ’ এর কাজ আমার কাছে যেন অনেককিছু প্রকাশ করতে চায়। তারা যেভাবে কোনো ম্যাটেরিয়ালকে সূক্ষ্ণ এবং বুদ্ধিদিপ্ত ভাবে ব্যবহার করেছে তা আমাকে মুগ্ধ করে। It seems anchored in an ancient, elemental knowledge about man’s use of materials, and at the same time to expose the very essence of these materials which is beyond all culturally conveyed meaning.

আমার কাজে আমি ম্যাটেরিয়ালকে এই ভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করি। যদিও ম্যাটেরিয়াল নিজে কাব্যিক নয়, তবুও স্থাপত্যের কোনো বস্তুতে/কাজে তা কাব্যিক হ’য়ে উঠতে পারে, যদি স্থপতি তাদের জন্য কোনো অর্থপূর্ণ অবস্থা তৈরী করতে সমর্থ হয়।

The sense that I try to install into materials is beyond all rules of compositions, and their tangibility, smell and acoustic qualities are merely elements of the language that we are obliged to use. Sense emerges when I succeed in bringing out the specific meanings of certain materials in my buildings meanings that can only be perceived in just this way in this one building.

এই লক্ষ্যে কাজ ক’রতে হ’লে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে প্রশ্ন ক’রতে হবে- কোনো একটা বিশেষ আর্কিটেকচারাল কনটেক্সটে নির্দিষ্ট কোনো ম্যাটেরিয়াল কী অর্থময়তা তৈরী ক’রতে পারে তা নিয়ে। এই সব প্রশ্নের সুচারু উত্তর ম্যাটেরিয়ালের স্বাভাবিক ব্যবহার এবং তাদের নিজস্ব আবেদন সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্যকে আরো উজ্জ্বল ক’রে তোলে।

এ কাজে আমরা সফল হ’লে স্থাপত্যে ম্যাটেরিয়াল উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত হ’য়ে উঠবে।

বিষয়ের ভেতরে কাজ করা
Work within things

যোহান সেবাসটিয়ান বাখ্ এর সংগীত সম্পর্কে বলা হয়, এর “স্থাপত্য”ই (বাংলাতে সংগীতের আর্কিটেকচারকে সংগীতের কাঠামো বলা যায় কি?) এর সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক। খুব সহজ আর স্পষ্ট (clear and transparent) এর গঠন। তার কম্পোজিশন শোনার সময় এর সূক্ষ্ণ মেলোডিক, হারমোনিক এবং রিদমিক্যাল অংশগুলো আলাদা করা যায়, পুরো কম্পোজিশনের অনুভূতিকে অক্ষুন্ন রেখেই। এর সম্পূর্ণতাই এর অংশগুলো কে ফুটিয়ে তোলে। এর গঠন খুব পরিস্কারভাবে বোঝা যায়। and if we trace the individual threads of the musical fabric it is possible to apprehend the rules that govern the structure of the music.

নির্মাণ এমন একটা শিল্প (আর্ট) যা বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে একটা অর্থপূর্ণ সম্পূর্ণতা তৈরী করে। মানুষের তৈরী করা ইমারতগুলো তাদের নির্মাণ সামর্থের বহিঃপ্রকাশ। আমার মতে, স্থাপত্য নিদর্শনের প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর নির্মাণ কার্য। যথাযত উপাদান সংগ্রহ আর সমন্বিত করার পরই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থাপত্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

I feel respect for the art of joining, the ability of craftsmen and engineers. I am impressed by the knowledge of how to make things, which lies at the bottom of human skill. I try to design buildings that are worthy of this knowledge and merit the challenge to this skill.

খুব গুছিয়ে নির্মিত কোনো কিছু দেখে আমরা যদি বুঝতে পারি, সেটা নির্মাণ ক’রতে কতটা যত্ন আর দক্ষতার দরকার পড়েছিল তাহলে প্রায়সই বলে ফেলি, “এটা করতে ব্যাপক খাটুনি গেছে” (a lot of work went into this.) কাজই যে সাফল্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ- আমাদের এই ধারণা আমাদেরকে শিল্পকর্ম আর স্থাপত্যকর্মের মূল-ভাবনা/অনুধ্যানের শেষ সীমায় পৌছে দেয়। যে উদ্যোগ আর দক্ষতা দিয়ে আমরা তাদেরকে গ’ড়ে তুলি তা কি তাদের নিজস্বতা/চরিত্র তৈরী করে? আমার মনে দাগ কাটা কোনো স্থাপত্যকর্ম কখনো কখনো আমাকে এমনটাই ভাবতে প্ররোচিত করে, যেমনটা করে কোনো গান, সাহিত্য বা চিত্রকর্ম।

ঘুমের নিরবতার জন্য
For the silence of sleep

সংগীত আমার খুব ভাল লাগে। মোজর্ট’র পিয়ানো কনসার্টের ধীর নড়াচড়া, জন কোল্টরেনের ব্যালাড কিমবা কোনো গানে মানুষের গলার স্বর সবই আমাকে আলোড়িত করে।

মানুষের সুর, তাল আর লয় তৈরীর স্বক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে।

কিন্তু সুর, তাল আর লয়ের উল্টো জিনিসও শব্দের জগতে আছে। আছে অনৈক্য আর কেটে যাওয়া ছন্দ। আছে টুকরো টুকরো আর শব্দের গুচ্ছ। আছে একেবারেই বাস্তবিক শব্দ বা  হট্টগোল (noise)। সমসাময়িক সংগীতে এর সবগুলো নিয়েই কাজ হচ্ছে।

সমসাময়িক সংগীতের মত সমসাময়িক স্থাপত্যও এতটা মৌলিক হওয়া উচিৎ। কিন্তু তার একটা সীমা আছে। Although a work of architecture based on disharmony and fragmentation, on broken rhythms, clustering and structural disruptions may be able to convey a message, as soon as we understand its statement our curiosity dies, and all that is left is the question of the building’s practical usefulness.

স্থাপত্যের নিজেরও একটা জগত আছে। জীবনের সাথে এর বিশেষ একটা দৃশ্যমান সম্পর্ক আছে। প্রথম অবস্থায় একে আমি কোনো বক্তব্য বা প্রতীক হিসেবে ভাবি না;  ভাবি একটা মোড়ক বা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে, যাকে ঘিরেই জীবনের বোয়ে চলা; যেন একটা সংবেদনশীল আধার যার ভেতরে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, যায় কাজে মনোযোগ দেওয়া, শোনা যায় ঘুমের নিরবতার সুর।

প্রারম্ভিক প্রতিশ্রুতি / প্রথম অবস্থার অঙ্গিকার
Preliminary promises

কোন নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর স্থাপত্য তার বাস্তব অবস্থান (concrete place) পায়। যে জায়গাতে এটা দাড়িয়ে থাকে। যে জায়গা থেকে স্থাপত্য প্রকাশিত হ’য়ে ওঠে। বাস্তব জগতে এখনো নিজের অবস্থান খুঁজে পায়নি এমন কোনো নির্মিতব্য স্থাপতিক কাজের জন্য তৈরী করা ড্রয়িং ঐ কাজের প্রকাশিত হওয়ার যে প্রচেষ্টা তার প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কোনো বিল্ডিং যে আলোকপ্রভা (aura) নিয়ে হাজির হয়, স্থাপতিক ড্রয়িং তার যতটা সম্ভব কাছাকাছি কিছু প্রকাশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ড্রয়িঙের প্রভাবে আমাদের মনে প্রকৃত বিল্ডিংটার না থাকার হাহাকার বেজে ওঠে। যার ফলে যে কোনো ড্রয়িঙে থাকা অসম্পূর্ণতার ব্যাপারে আমাদের ভেতরে একধরণের সচেতনতা তৈরী হয়। মনে কৌতুহল জাগে ড্রয়িঙের হাজির করা বাস্তবতার প্রতিশ্রুতির প্রতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির যদি আমাদের মনকে নাড়া দেয়ার ক্ষমতা থাকে তাহলে আমাদের মনে জেগে ওঠে তা বানিয়ে ফেলার উদ্দীপনা।

মোড়কবাধা বাস্তুতে থাকা সূক্ষ্ণ ছিদ্র
Chinks in sealed objects

মানুষের হাত দিয়ে গ’ড়ে ওঠে যে বিল্ডিং তা তৈরীর সময় তার ছোট ছোট অংশগুলোকে জোড়া লাগাতে হয়। মোটা দাগে ব’ললে, পরিসমাপ্ত কোনো কিছুর গুণমান নির্ভর করে তাতে থাকা জয়েন্টগুলোর গুণমানের উপর।

ঐতিহ্যগতভাবে ভাস্কর্যে জয়েন্টের ধরণ এবং বিভিন্ন অংশ সংযুক্ত করার ব্যাপারটা যতটা পারা যায় কমিয়ে রাখা হয়, যেন সামগ্রিক গড়নটা ঠিকমত বোঝা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় রিচার্ড সিয়েরা’র স্টিলের তৈরী ভাস্কর্যগুলোর কথা। যেগুলো দেখলে মনে হয় তারা যেন প্রাচীন কালের মতই কোনো একখন্ড কাঠ বা পাথর দিয়ে তৈরী। ১৯৬০ এবং ৭০ এর দশকের শিল্পীদের কাজে সবথেকে সহজ আর স্পষ্টজয়েন্টের ব্যাবহারই দেখা যায়। Beuyes, Merz and others often used loose setting in space, coils, folds and layers when developing a whole from the individual parts.

The direct, seemingly self-evident way in which these objects are put together is interesting. There is no interruption of the overall impression by small parts which have nothing to do with the object’s statement. প্রয়োজনীয় ডিটেইলগুলো আমাদের সামগ্রিক ধারণাটা থেকে আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যায় না।

প্রতিকের উর্ধ্বে
Beyond the symbols

কাজের লোকের কাছে কোনকিছুই ফেলনা নয়। তারা সবকিছুই চালিয়ে দিতে পারে। স্থপতি ভেঞ্চুরি ব’লতেন, “মূলধারার প্রায় সবই সঠিক”। আর আমাদের এই সমসাময়িক সময় যাদের উপর খুব একটা প্রসন্ন নয় তাদের মতে কোনকিছুই আর ঠিকঠাক মত চলছে না। কথাগুলো কখনো পরষ্পর-বিরোধী বাস্তবতার বিপরীত, আবার কখনোবা পরষ্পর-বিরোধী মতামতের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। আমরা দ্বন্দ্বের সাহচর্যে বসবাস ক’রতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। তার যথেষ্ট কারণও আছে। প্রথা ভাঙতে থাকে, সেইসাথে সাংস্কৃতির চরিত্রও। অর্থনীতি আর রাজনীতিজাত অস্থিরতা/গতিময়তা খুব কম লোকই বুঝে উঠতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসে আরো পরে। সবকিছুই অন্যকিছুতে মিশে যায়। গণ-যোগাযোগের হাত ধ’রে গ’ড়ে ওঠে প্রতীকের এক কৃত্রিম জগৎ। যেখানে স্বেচ্ছাচারিতা চলতেই থাকে।

যে অবস্থায় আমাদের নিজস্ব চৌহদ্দির বাইরের যে কোনো বিষয়কে অস্পষ্ট, ঝাপসা অথবা খানিকটা অবাস্তব ব’লে মনে হয় তাকে উত্তর-আধুনিক জীবন বলা যেতে পারে। দুনিয়াটা একগাদা প্রতীক আর তথ্যে ভরপুর। কোনো একজনের পক্ষে এই প্রতীক আর তথ্যগুলো কী ব’লতে চাচ্ছে তার সবটা বোঝা সম্ভব হয় না। কখনো কখনো কেউ হয়তো অন্য কাউকে নির্দেশ করে। প্রকৃত বাস্তবতা থাকে ঘোমটার/পর্দার আড়ালে। কেউই তাকে দেখতে পারে না।

তারপরও আমি মনে করি প্রকৃত বাস্তবতা ব’লে আসলেই কিছু আছে, তা যতই ভঙ্গুর হোক না কেন। মাটি আছে, আছে পানি। সূর্যের আলো আছে। আছে ভূমিতল আর তরুরাজি। মানুষের তৈরী করা কল-কবজা, যন্ত্রপাতি কিমবা বাদ্যযন্ত্রও আছে। which are what they are, which are not mere vehicles for an artistic message, whose presence is self-evident.

When we look at objects or buildings which seem to be at peace within themselves, our perception becomes calm and dulled. The objects we perceive have no message for us, they are simply there. Our perceptive faculties grow quiet, unprejudiced and unacquisitive. They reach beyond signs and symbols, they are open, empty. It is as if we could see something on which we cannot focus our consciousness. Here, in this perceptual vacuum, a memory may surface, a memory which seems to issue from the depths of time. Now our observation of the object embraces a presentiment of the world in all its wholeness, because there is nothing that can be understood.

দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ উপকরণের মধ্যে একধরণের শক্তি আছে। যথেষ্ট সময় ধ’রে তাদের দিকে না তাকালে যা ঠিক ধরা যায় না। এডওয়ার্ড হপার্সের আঁকা চিত্রগুলো যেন আমাদেরকে সেটা মনে করিয়ে দেয়।

পরিসমাপ্ত ল্যান্ডস্কেপ
Completed landscapes

শরীরের ভেতরের টানাপোড়েন
The tension inside the body

স্থপতিদের তৈরী করা সমস্ত ড্রয়িঙের মধ্যে ওয়ার্কিং ড্রয়িংই আমার সবচেয়ে পছন্দের। তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং সুনির্দিষ্ট। কল্পিত বস্তুকে রূপ দেয় যে নির্মাণ-শ্রমিকেরা, তাদের জন্যই তৈরী এই ড্রয়িং। লোকজন চাইলেই এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। প্রজেক্ট ড্রয়িঙের মতো তারা কাউকে সম্মত বা মুগ্ধ করার চেষ্টা করে না। তারা যেন বলে, “এটা (বিল্ডিংটা) এমনই দেখাবে/হবে।”

ওয়ার্কিং ড্রয়িং এ্যানাটমি (শরীর সংস্থান বিদ্যা) ‘র ড্রয়িঙের মত। জোড়া লাগানোর কৌশল, লুকানো জ্যামিতি, ম্যাটেরিয়ালের/বস্তুর ঘর্ষণ, ছেড়ে দেওয়া আর ধ’রে রাখার অভ্যন্তরীন শক্তি/বল, মানুষের তৈরী করা বস্তুতে লীন হওয়া মানুষের কাজের চিহ্নের মতো যে গোপন অন্তর্গত টানাপোড়েনগুলোকে সম্পন্ন স্থাপতিক নির্মাণ লুকিয়ে রাখতে চাই, তা প্রকাশ করে দেয় এই ওয়ার্কিং ড্রয়িংগুলো।

Kassel এর Documenta Exhibition –এ একবার পার কিরকেবি (Per Kirkeby) বাড়ির মত দেখতে ইটের একটা ভাস্কর্য গড়েছিলেন। যে বাড়িতে  ঢোকার মতো কোনো দরজা ছিল না। এর ভেতরটা ছিল অনভিগম্য আর লুকানো। গোপনীয় এই অভ্যন্তরভাগ ভাস্কর্যটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে যোগ করেছিল এক অদৃশ্য রহস্যময় গভীরতা।

আমি মনে করি, একটা বাড়ির লুকানো কাঠামো আর নির্মাণশৈলী এমন ভাবে হওয়া উচিৎ যাতে ক’রে বিল্ডিংটির ভেতরের টানাপোড়েন আর কাঁপুনি তার বহিরঙ্গে কোনো ভাবে প্রকাশ পায়। যেমন ভাবে তৈরী হয় বেহালা। আর আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় সজীব প্রকৃতির (natural body) কথা।

অপ্রত্যাশিত সত্য
Unexpected truth

ছোটবেলায় আমি কবিতাকে খানিকটা অস্পষ্ট রূপক আর সংকেত দিয়ে রাঙানো এক ধরনের মেঘ হিসেবে কল্পনা করতাম। ব্যাপারটা উপভোগ্য হলেও দুনিয়ার বাস্তব চিত্রের সাথে তাকে মেলানো কঠিন। স্থপতি হিসেবে আমি বুঝতে শিখেছি যে,  কবিতার এই অর্বাচিন সংঙ্গার উল্টোটাই বরং সত্যের কাছাকাছি।

(আংশিক)

২০১৩ তে এসে স্থাপত্য-পেশা ভাবনা

ঘটনার ঘনঘটার কমতি নেই। সময়টাও নির্বচনের খুব কাছাকাছি। কি জানি তাই কিনা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও কাদের মোল্লার লঘু সাজা দেন আদালত। মানতে কষ্ট হয়। কেমন যেন অসহায় বোধ করতে থাকি ভেতরে ভতরে। হতাশা ঘিরে ধ’রতে থাকে। দ্রুতই জেনে যাই আমি একাই শুধু হতাশ নই। জানি, সমবেত হতাশা প্রকাশ পাবেই। শুধু তার ধরণ কেমন হবে ভাবতে পারছিলাম না। এখন জানি, সবাই আমার মতো এমন সংকটে পড়েনি সেদিন। সহজ স্বতস্ফূর্ত ভাবেই মানুষ তাদের হতাশা ব্যক্ত করেছে। আমি তাদের দলে ঢিড়ে যাই। আমি আবার আশাবাদী হয়ে উঠি।

এই আশাবাদের উচ্ছ্বাসে ভুলে গিয়েছিলাম অনেক কিছু। এমনকি নিজের পেশার কথাও। বছর দেড়েক ধরেই বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা অন্যরকম হ’তে চলেছে। কিন্তু সেটা যে কী তা খুব স্পষ্ট নয়- অন্তত আমার কাছে। সিনিয়র অনেককেই দেখেছি পেশা নিয়ে চিন্তিত হ’তে। গত কয়েক বছরের তুলনায় তাদের অনেকেরই কাজ নাকি কমে গেছে। ডিভেলপারদের ব্যবসাও কমতির দিকে।

ইদানিং পত্রিকাতে রিপোর্ট আসছে ঢাকার গ্রোথ-রেট যে কমে যাচ্ছে সেটা নিয়ে। ঢাকার থেকে চট্টগ্রাম এখন দ্রুত বর্ধনশীল শহর। অন্য ছোট-বড় শহরগুলোর ব্যাপারে তেমন খবর এসে পৌছায় না হাতে। খুলনাতে স্থপতিদের কাজের সুযোগ বাড়ছিল বলেই দেখে এসেছি ২০০৮ পর্যন্ত। সেখানে ডিভেলপারদের ব্যবসার সুযোগও বাড়ছে বলে শুনি কখনো কখনো। সামষ্টিক অর্থনীতির পরিসংখ্যানগুলো তো বলে দেশে উন্নয়ন কাজের পরিধী বাড়ছে। তারপরও আমার চারপাশের ডিভেলপার আর স্থপতিদের হতাশা চোখ এড়াবার নয়। আমার মনে হয় না, শুধুই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমনটা হচ্ছে। আমি কয়েকটা কারণ নোটিশ করছি। সেগুলোই হয়তো সব নয়। তবুও যেগুলো আমার নজরে পড়ছে সেগুলোকে একটু সাজিয়ে দেখি একে একে…

১. আমাদের স্থাপত্য পেশা চর্চাটা অনেকটাই ঢাকা নগর কেন্দ্রিক। মোটামুটি ভাবে দেশে স্থাপত্য চর্চার আশি থেকে নব্বই ভাগ অফিসই ঢাকাতে। চট্টগ্রাম, খুলনা আর সিলেটের খুব অল্প কিছু অফিসের কথা আমি জানি। ঢাকার বাইরে স্থপতিরা কাজ করছেন এমনটা খুব একটা আমি দেখি না। জেলা শহরগুলোতে ১৯৯১ সালের পর থেকে বেশ কিছু বড় বড় নির্মাণ কাজ হয়েছে। যার প্রায় সবগুলোই সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তরের স্থপতিরা করেছেন। এবং এর অনেকগুলোই প্রটো-টাইপ ধরণের। আমার বলতে দ্বিধা নেই আমাদের স্থাপত্য অধিদপ্তরের স্থপতিদের এই সব প্রটো-টাইপ ধরণের কাজের কারণেই আমাদের ছোট শহরগুলো বিশেষত্বহীন হয়ে গেছে। সব জেলার পোস্টঅফিস, আদালত ভবন, সার্কিট হাউজ, নতুন হওয়া কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরা যদি একই রকম হয়, তাহলে একটা শহরকে অন্য কোনো শহর থেকে আলাদা করা কঠিন হ’য়ে উঠবেই। হয়েছেও সেটাই। স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা আমাদের শহরগুলো আর ধারণ করছে না। এর জন্য আমি মূলত স্থাপত্য অধিদপ্তরকেই দায়ী করব।( যদিও জানি এর পেছনে অনেক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ আছে) যার নিদারুন ফল স্বরূপ অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন, যখন দেখছেন ঢাকা আর আগের মতো কাজের হাতছানি দিয়ে স্থপতিদেরকে ডাকছে না।

২. বাংলাদেশে স্থপতিদের একটি পেশাজীবী সংগঠন আছে। তার মোট সদস্য সংখ্যা ২২০০ এর বেশি বলে জানি। যদিও সবাই পূর্ণ সদস্য নন। কার্যকরী সদস্য যে ঠিক কতজন সেটা জানি না। এই সংগঠনটির কার্যক্রমে আমি যারপরনাই হতাশ। বাংলাদেশের আর কোনো পেশাজীবী সংগঠন এতটা দূর্বল কিনা আমার জানা নেই। বাংলাদেশে এখন, এই ২০১৩ সালে মাত্র দুইটি শহর আছে যেখানে বিল্ডিঙের ডিজাইনের অনুমোদন নেওয়ার জন্য স্থপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। আমাদের বিল্ডিং কোড শুধুমাত্র চারটি শহরের জন্য আইনত প্রযোজ্য। আমাদের পেশাজীবী সংগঠন তাদের কাজের এখতিয়ার বাড়ানোর জন্য ঠিক কতটুকু চেষ্টা করেছে সেটা আমি জানি না। তবে তারা যে এই ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছে সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

৩. আমরা অনেকেই ওয়ার্ক ইথিক মানি না। অন্যের করা ডিজাইনে সাইন করেন অনেক সিনিয়র স্থপতি। রাজউক বলছে গত ১৫ মাসে তারা ৪০০০ ড্রয়িং পাস করেছেন, যার প্রায় ২৫০০ ড্রয়িঙে সাইন দিয়েছেন মোট ৩৯ জন স্থপতি। আইএবি বলছে বাকি ১৫০০ এর মত প্রজেক্ট করার মতো যোগ্যতা আছে আরো ১৫০০ জন রেজিস্টার্ড স্থপতির। তো পনের মাসে একজন স্থপতি যদি মাত্র একটি কাজ করেন তাহলে পেশা নিয়ে শংকিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ তাদের থাকেই। আইএবি বা সিডিএ কেউই আমাদেরকে চট্টগ্রামের চিত্র জানায় না। তবে ইদানিং আমার বেশ কিছু বন্ধুকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা টাকার বিনিময়ে নকশাতে সাইন করার জন্য খোঁজ করেছেন বলে জানি। যে ৩৯ জন স্থপতি ১৫ মাসে ২৫০০ প্রজেক্ট পাস করিয়েছেন তারা যে কাজগুলো নিজেরা করেননি সেটা বোঝার জন্য শার্লক হোমস হ’তে হয় না। আমি জানি না তারা এটা করে প্রচুর অর্থ আয় করেন কিনা। আমার মতো যারা নতুন পেশায় ঢুকেছেন তারা যে এদের কারণে বিপদে পড়ছেন সেটা সর্বাংশে সত্য।

৪. স্থপতিরা এখানে শুধু বিল্ডিং আর ইন্টেরিয়র নিয়েই ব্যস্ত। অবকাঠামো পরিকল্পনার আরো যত সেক্টর রয়ে গেছে সেটা আমরা এক্সপ্লোর ক’রে দেখছি না। ধানমন্ডি লেক আর হাতির ঝিলের কাজ এর ব্যতিক্রম। যে স্থপতিরা ইন্টেরিয়র করছেন বেশি, তারা কেউ ফার্নিচার ডিজাইনে খুব ভাল কিছু করছেন বলে জানি না। ফার্নিচারের কোনো পেটেন্ট আমাদের কোনো স্থপতি করেছেন ব’লে শুনিনি।

৫. অর্থনীতি বড় হচ্ছে বেশ দ্রুত আমাদের দেশে। এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও আমাদেরকে অবাক ক’রে দেয় না। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগ লাভসহ তুলে আনতে হ’লে তা ব্যস্ত শহরের বাইরে হওয়াটাই সুবিধাজনক। শহরের জমির অধিক দাম আর শ্রমিকের বাড়তি মজুরি তার প্রধান কারণ। গত কয়েক বছরে তেমনটাই হচ্ছে ব’লে আমার ধারণা। বড় বড় ইন্ড্রাস্টি এখন ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরের বাইরে গ’ড়ে উঠছে। ফলে চট্টগ্রামের না হলেও ঢাকার বড় হওয়ার প্রবণতা যাচ্ছে কমে। এতে ডিভেলপাররা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কমছে ঢাকার স্থপতিদের কাজ। তবে ঢাকা যেহেতু অর্থ লেনদেনের প্রধান কেন্দ্র এবং বাংলাদেশের প্রধান শহর, সেহেতু তার ব্যবসায়ীক এবং প্রসাশনিক গুরুত্ব কিন্তু কমছে না। বরং বাড়ছে। তাতে আরো বেশি অফিস বিল্ডিং, কনভেনশন সেন্টার, আধুনিক হাসপাতাল, গবেষণা কেন্দ্র, জাদুঘর, আর্কাইভ ইত্যাদি বিল্ডিঙের প্রয়োজন বাড়ছে। যে বিল্ডিংগুলো আবার আট বছরের কম অভিজ্ঞ স্থপতিরা সাইন করার যোগ্যতা রাখেন না। আমি এটাকে সমর্থনই করি। কিন্তু এই কাজগুলো যেহেতু বড় কলেবরের হয়ে থাকে তাই ছোট অফিসগুলো এই ধরণের কাজ ঠিকমত করে উঠতে পারে না। ফলে ছোট অফিসগুলোর ঢাকাতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

৬. স্থাপত্য পেশা আগের যেকোনো সময়ের থেকে কঠিন হয়ে উঠছে আমাদের দেশে। কারণ দিন দিন বিল্ডিঙের জটিলতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্থপতিদেরকে প্রথম বারের মত কোনো বিশেষ ধরণের প্রজেক্ট ক’রতে হচ্ছে। অভিজ্ঞতার অভাবে অনেকেই ক্লাইন্টদেরকে সঠিক সার্ভিস দিতে পারছেন না। আবার বিদেশী কারো সাহায্য নেয়ার সংস্কৃতিও এখানে গড়ে ওঠেনি। অর্থনৈতিক কারণটাই মূখ্য ব’লে আমার ধারণা। বাংলাদেশের স্থপতিরা ক্লাইন্টদের কাছ থেকে যে পদ্ধতিতে পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন সেটা পৃথিবীতে খুব একটা দেখা যায় না। আবার সেই টাকার বিপরীতে ১০ শতাংশ ট্যাক্স আর ১৫ শতাংশ ভ্যাট (যদি আমার ভুল না হয়ে থাকে) দিতে গিয়ে অনেকেই নাজেহাল হয়ে যান।

অসমাপ্ত….