স্বাধীনতার ধারণা

স্বাধীনতার ধারণা – ছয়

১.
ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বপ্ন ঠিক কবে থেকে মানুষ দেখতে শুরু করেছে –বলতে পারি না। তবে ফরাসী বিপ্লবের সময় থেকে এই ধরণের স্বাধীনতার একটা রূপরেখা পাওয়া যেতে থাকে। পারিবারিক পেশাগত ঐতিহ্য থেকে তখন অনেকেই বেরিয়ে আসতে থাকে । অবশ্য তার পেছনে আরো অনেক অর্থনৈতিক এবং উৎপাদন সম্পর্কিত কারণও আছে। এরও আগে ইংল্যান্ডে ঘটে যাওয়া শিল্প বিপ্লবের ফলে অনেকের পক্ষেই আর পুরাতন পারিবারিক পেশা/ব্যবসায় ধরে রাখা লাভজনক/সম্ভবপর হচ্ছিল না। তাই যেমন দরকার পড়ছিল পেশা পরিবর্তনের তেমনি সুযোগও তৈরী হচ্ছিল ধীরে ধীরে। সাথে সাথে বাড়ছিল এই সব পোড়খাওয়া মানুষদেরকে ব্যবহার করার সুযোগও। সুবিধাবাদী একদল মানুষ সেই কাজে লেগে যায় সাথে সাথেই। সাধারণ মানুষের সাথে শাসক/সুবিধাবাদী গোষ্ঠির টানাপোড়েনও নতুন মাত্রা পেতে থাকে। গড়ে উঠতে থাকে ট্রেড ইউনিয়ন/ পেশাজীবী সংগঠন। কিন্তু শস্যের মাঝে ভুত শুধু্ এই বাংলাদেশেরই তৈরী হয়না। নিজের পেশা বেছে নেওয়ার যে সুখ স্বপ্ন মানুষ দেখতে শুরু করেছিল তা তাকে দাড় করিয়ে দেয় এক চরম অনিশ্চয়তার সীমানায়। তার পেশা/চাকরীর নিয়ন্ত্রণ পুরাপুরি চলে যায় পরিচালক/উদ্যোগতা শ্রেণীর হাতে। আগে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে খুব একটা স্বাধীনতা না থাকলেও খানিকটা গণতন্ত্রের/মতামত প্রদানের অবকাশ থাকত। নতুন ব্যবস্থায় সেটাও আর অবশিষ্ট থাকল না।

২.
‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ এর শ্যামাঙ্গকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল তার কাজ। সার্বিক বিচারে তার নিজেকেই। টেরাকোটা শিল্পী হওয়ার সুযোগ সে আর তার বাকি জীবনে পায়নি। এই রকম শ্যামাঙ্গ সেদিনের বাংলাতে কত/কতশত জন ছিলো কে জানে? আজকের দিনেও আমরা মাঝে মাঝে পুরাতন কোনো টেরাকোটার সন্ধান পেয়ে নেচে উঠি। আহ্লাদিত হই। কিন্তু কোনো শিল্পীর নাম জানতে পারিনা। জানতে পারিনা কোনো শ্যামঙ্গ কোথাও কোনো নতুন স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছিলেন/পেরেছিলেন কিনা। নতুন পাওয়া পুরাতন টেরাকোটা ততধিক পুরাতন কোনো কাজের রিপিটেশনই হয় কেন বারবার? নাকি আমাদের অনভিজ্ঞ চোখ ধরতেই পারে না সেদিনের স্বপ্ন ? কিন্তু শ্যামাঙ্গ, কুমারায়নরা তো দেখি বারবার হারিয়েই যায়। নিজেদের সময়েও যেমন, অন্যদের সময় থেকেও তেমনই।

স্বাধীনতার ধারণা

স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – পাঁচ

১৯০৮ সালে করাচিতে মুসলিম লীগের দ্বিতীয় অধিবেশন হয়। সেখানে বাংলার প্রতিনিধি ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। সেখানে তিনি একটা প্রস্তাব দেন। সেটা হল… ” মুসলমান ছাত্রদের জন্য প্রভূত অসুবিধা সৃষ্টি করছে বিধায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে অনুরোধ করা হোক যে, তারা যেন বাংলার স্কুলগুলোতে মাতৃভাষার বাধ্যতামূলক পরীক্ষার যে ব্যবস্থা রয়েছে তা রহিত করেন”

প্রস্তাবটি খুবই অভিনব। প্রথম যখন আমি প্রস্তাবটির কথা শুনি আমার বিশ্বাস করতে বেশ সময় লেগেছিল। বিশ্বাস হওয়ার পরও যা মনে হয়েছিল তা হল… মুসলিম লীগের প্রতিনিধিরা তো এই ধরণের প্রস্তাব করতেই পারে। ওদের কথা এতটা গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু পরে যখন কারণটা জানতে পারলাম তখন আর এই ধরণের চিন্তা স্থায়ী হয়নি। ‘The Mussalman’ পত্রিকার সম্পাদক এই প্রসঙ্গে লিখছেন, ” The bengali books, we may observe, are full of references to hindu mythology and as such there can hardly be anything in them of interest to the mussalman”

বাংলা বইয়ে মুসলামদের অনুপস্থির কারণে এবং হিন্দু পুরাণের পুন পুন ব্যবহারের কারণে সেদিনের অনেক মুসলমানই যে বাংলা বই পড়তে উৎসাহিত হননি সেটা বুঝতে আর বেশি কিছুর দরকার পড়ছে না। কিন্তু এই ভাবেই কি চলতে থাকবে ? মুসলমানদের জন্য কি বাংলা পাঠ্য বই লেখা হবে না ? কি জানি হয়েছিল কিনা। তবে ১৯২৬ এ এসেও স্যার আবদুর রহিমকে ম্যাট্রিকুলেশন স্তর পর্যন্ত বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে দেখা গেছে।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম বৈশিষ্ট্যের অভাব থাকার কারণে মুসলমানরা তাদের জন্য চেয়েছে একটা আলাদা সাহিত্যিক প্লাটফর্ম। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল। যার নাম মুসলিম লীগ। এবং একটা পর্যায়ে তারা ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছে। অংশ হয়েছে এমন একটা মানচিত্রের যেখানে তাদের ভাষায় হিন্দু পুরাণের উপস্থিতি থাকবে না বা যে বাংলাতে সংস্কৃতের প্রভাব থাকবে কম।

বাস্তবে হয়তো সেটাই হতে চলেছিল। ১৯৪৭ এর পর বাংলাকে পরিবর্তনের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। বা চেষ্টা করা হয়েছে তাকে মুসলিম উপযোগী করে তোলার। কিন্তু কিভাবে? প্রচুর আরবি-ফার্সি শব্দ বাংলাতে ব্যবহার করে? বাংলার ব্যাকরণ পালটে ফেলে। আবুল মনসুর আহমদের মত অনেকেই সেই চেষ্টাও করেছেন।

কিন্তু সাধারণ মানুষ অথবা ভাষা নিজেই যে চেয়েছিল নিজের মত করেই টিকে থাকতে। যেখানে না থাকবে সংস্কৃতের ব্যপক প্রভাব। না থাকবে উর্দু-আরবি-ফার্সির প্রভাব। কম বেশি সবার উপস্থিতি থাকতে পারে। কিন্তু তা ভাষার স্বাভাবিক গতিকে নষ্ট করবে না। আর তাই ভাষার নিজেরই প্রয়োজন পড়েছে নতুন একটা মানচিত্রের। ১৯৭১ এ সে সেটা পেয়েছে।

হুমায়ুন আজাদ যতই মনে করুন না কেন ১৯৪৭ এর সংশোধন হল ১৯৭১। বাস্তবতা হল ৭১ হল অতীতের ধারাবাহিকতা। এবং এই ধারাবাহিকতা থেমে যাওয়ার নয়। সে কিন্তু বহমান। হয়তো আগামী কাল তা আরো স্পষ্ট হয়ে আমাদের দৃষ্টি গোচর হবে।

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

স্বাধীনতার ধারণা

স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – চার

স্বাধীনতাকে কি শুধু রাজনৈতিক ভাবে বিবেচনা করা যায় বা করা সম্ভব? বোধ হয় না। আবুল মনসুর আহমদের রাষ্ট্রিক বনাম কৃষ্টিক স্বাধীনতা থেকে খানিকটা তুলে দিচ্ছি….

“মার্কিনীরা রাজনৈতীক স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। কিন্তু ভাষিক ও সাহিত্যিক স্বাধীনতা লাভ করিতে তাদের আরো দেড়শ বছর লাগিয়াছিল। এ সব ব্যাপারে স্বকীয়তার আবশ্যকতা উপলব্ধি করিতেই তাদের প্রায় একশ বছর লাগিয়াছিল।….রাজনৈতিক যুদ্ধে জিতার চেয়ে কৃষ্টিক যুদ্ধে জিতা আরো বেশি কঠিন। রাজনৈতিক পরাধীনতাটা দৈহিক ও দৃশ্যমান। কিন্তু কৃষ্টিক পরাধীনতাটা মানসিক ও অদৃশ্য। দীর্ঘদিনের পরাধীনতা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেমন অভ্যাসে পরিণত হয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ততটা হয় না। কৃষ্টিক-ভাষিক-সাহিত্যিক পরাধীনতাটা যেমন একটা এলিটিযমের পোশাকী ভব্যতায় বিস্ফোরণটা যত সহজে গণ-ভিত্তিক হইতে পারে কৃষ্টিক চেতনাটা তেমন গণ-ভিত্তিক হইতে পারে না। এই কারণে আমাদের দেশের বর্তমান লেখক-সাহিত্যিকরা কলিকাতার ভাষা-কৃষ্টির মোকাবিলায় যেমন হীনমন্যতায় ভুগিতেছেন, পুরা ঊনিশ শতকের মার্কিন সাহিত্যিকরা তেমনি হীনমন্যতায় ভুগিতেছিলেন লন্ডনের ভাষা-সাহিত্যের মোকাবিলায়।”

এখান থেকে অন্তত একটা তথ্য আমরা পাচ্ছি। সেটা হল, একটা সময় আমাদের দেশের সাহিত্যিকরা ঠিক আমাদের সাধারণ মানুষের ভাষায় সাহিত্য তৈরীতে খানিকটা হলেও সন্দিহান ছিলেন। অথবা ভাবতেন আমাদের ভাষা নয় ভারতীয় বাঙালিদের বাংলাই উৎকৃষ্ট। আর তাই সাহিত্যের জন্য অধিক যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এই বোধ বেশিদিন টিকতে পারেনি এই ব-দ্বীপে। হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানীদের কিছু প্রচেষ্টা এই এগিয়ে যাওয়াতে ভূমিকা রেখেছিল। যাহোক আমরা বেরিয়ে এসেছি আবুল মনসুর আহমদের বলা হীনমন্যতা থেকে।

কিন্তু তার পর কি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না? আমরা কি ততটা এগিয়েছি যতটা যাওয়ার কথা ছিল? নাকি পিছিয়ে গেছি। আসুন দেখি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কি বলছেন…

“বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। কিন্তু আবার হয়ও নি। মধ্যবিত্ত প্রায়-উন্মত্ত ইংরেজী শিখতে। কোম্পানীর শাসনামলে যা দেখা যেতো, আজো তাই দেখা যাচ্ছে। সর্বত্র ইংরেজী শিখবার উন্মাদনা। পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজী শিক্ষার অধিকারের দাবিতে প্রবল আন্দোলন হয়েছে। সেখানে যুক্তি হচ্ছে – ইংরেজী কম জানার দরুন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীরা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, পিছিয়ে পড়ছে। তদুপরি হিন্দী সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিহত করবার অজুহাতটাও রয়েছে। বাংলাদেশে অবশ্য শুরুর স্তর থেকেই ইংরেজী পড়ানো হয়। ইংরেজী শিক্ষার ব্যাপারে এখানেও সেই একই অত্যুগ্র আগ্রাহ। কৌতুকের ব্যাপার এই যে, বৃটিশ শাসনামলে ইংরেজী ভাষার যে আধিপত্য ছিল সেটা আবার ফিরে আসছে। জাতীয় স্বাধীনতা এসেছে কি আসেনি এই ঘটনা তার একটি দ্যোতক বটে। যেমন ভারতে তেমনি বাংলাদেশে।”

এই কথাগুলো যেন আবুল মনসুর আহমদের কথার থেকেও স্পষ্ট। অথচ একটা কথা বলা হচ্ছে ১৯৭৪ সালে। তাও স্মৃতিচারণে। যে স্মৃতিটা আরো আগের কোন এক সময়ের। আর পরের কথাটা বলা হচ্ছে ২০০০ সালে এসে। অবশ্য দুই ক্ষেত্রে চিহ্নিত শত্রু কিন্তু দুই জন।

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

স্বাধীনতার ধারণা

স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – তিন

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় জাতীয়তাই স্বাধীনতার অন্যতম প্রেরণাদারকারী। কারণ কোন একটা দলবদ্ধ মানুষের সম্প্রদায় যদি নিজেদেরকে আলাদা করে সনাক্ত করতেই না পারে তাহলে তাদের স্বাধীন হওয়ার বা স্ব-পরিচালিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই যদি হয় তাহলে তো বাঙালির স্বাধীন হওয়ার প্রেরণা অনেক আগে থেকেই বর্তমান… হাজার বছরের বাঙালি বা এই ধরণের কিছু কথা নিশ্চয় প্রায় হাজার বছর ধরেই প্রচলিত ( কেউ কেউ যদি বলে বসেন… এই ব-দ্বীপের বাসিন্দারা খুব বেশি দিন নিজেদেরকে বাঙালি বলা শুরু করেনি, বেশি হলে সাড়ে চারশ বছর… তাহলে কথাটা নাহয় সাড়ে চারশ বছর ধরেই প্রচলিত… বাঙালি অংকে সবসময়ই একটু কাচা বলে এটাকে মাফ করে দেয়া যায়)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বাঙালীর জাতীয়তাবাদ’ বইয়ের অবতরণিকা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করি….” দাস ব্যবস্থার অধিনে যারা থাকে তাদের মধ্যে তিন ধরণের মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে বলে ভি আই লেনিন একদা উল্লেখ করেছিলেন। ইংরেজ শাসনের অধীন অবস্থায় বাঙালীর জীবনে ওই তিনটি মনোভাবই দেখা গেছে। একদল ছিল যারা অসচেতন, যারা জানতো না যে তারা পরাধীন। এরাই ছিল প্রকৃত দাস। এদের সংখ্যাই ছিল সর্বাধিক, বলাই বাহুল্য। আরেক দল ছিল যারা নিজেদের অবস্থানকে সজ্ঞানে মেনে নিয়েছে, এবং নিজেদের পরাধীনতাকে উপভোগ করেছে; এরা হল চাটুকার ও পরগাছা। এরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। এদেরই একাংশের মধ্যে ক্রমে জাতীয়তাবাদের অনুভব জেগে উঠেছে। এরা চাকরি, জনপ্রতিনিধিত্ব, সুযোগ-সুবিধার বৃদ্ধি এবং বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে নানা রকমের আন্দোলন গড়ে তুলেছে। একেবারে অচেতন দাস এবং আপোসে-আন্দোলনকারী এই যে দুই দল এদের বাইরে তৃতীয় একটি দলও ছিল, তুলনায় যেটি ক্ষুদ্র। এই ধারণার মানুষেরা পরাধীনতাকে পরাধীনতা বলেই চিনেছে, তবে ওই বাস্তবতাকে মেনে নেয়নি। ঘাড়ের জোয়ালটাকে তারা ফেলে দেবে ভেবেছে। এই তৃতীয় ধারায় আবার দুই পক্ষ ছিল। উভয়েই স্বাধীনতা চেয়েছে। কিন্তু একপক্ষ চেয়েছে কেবল স্বাধীনতাই, তার বেশি নয়; তারা সাম্রাজ্যবাদকে হটাবে,তবে স্বদেশী সামন্তবাদকে রেখে দেবে। আর অন্যপক্ষ, যাদেরকে বলা যায় বামপন্থী, তারা কেবল স্বাধীনতায় সন্তুষ্ট থাকতে চাই নি, মুক্তিও চেয়েছে, অর্থাৎ সামাজিক বিপ্লবই ছিল তাঁদের চুড়ান্ত লক্ষ্য।”

এখান থেকে আসলে স্বাধীনতার ধারণাটা খুব একটা পরিস্কার হচ্ছে না। বরং আরো জটিলতা ধারণ করছে। কারণ যে খুব অল্প কিছু মানুষ স্বাধীনতা পেতে চাই তাদের চাওয়ার ভেতর পরিমাণগত তারতম্য আছে। আছে উদ্দেশ্যের ভিন্নতা। স্বাধীনতা অর্জনের উপায়ও তাই বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রকম।

যে ভাবছে সাম্রাজ্যবাদকে হটাতে পারলেই সব কিছু হাসিল সে তো ‘৪৭ এ প্রতারিত হলই শেষপর্যন্ত। তারপরও স্বাধীনতার সাথে এই সাম্রাজ্যবাদকে হটানোর ধারণাটাই কিন্তু সবচেয়ে সফল। সে সময় নিলেও ( কখনো ১৯০ বছর আবার কখনো চব্বিশ বছর… আগের গুলোর কথা নাহয় ভুলে থাকলাম আপাতত…) তার উদ্দেশ্য কিন্তু সে হাসিল করেছে একাধিকবার। তার পরিণতির কথা নিয়ে আলোচনা হয়তো পরে করা যাবে…..

আর বামপন্থী বা অন্যপক্ষ যারা কিনা প্রকৃত মুক্তির জন্য ভেবেছিল বলে বলা হল তাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে খুব একটা সাক্সেসফুল যে না সেটা একরকম বলাই যায়। তাহলে ‘ওই বাস্তবতা মেনে নেয়নি’ এবং ‘কেবল স্বাধীনতায় সন্তুষ্ট থাকতে চাই নি’ যারা তারা তারা কি চরমভাবে পরাজিত এবং নিশ্বেষিত? নাকি কেউ কেউ যেমন বলে থাকেন বিপ্লব সাধিত হওয়ার পর একজন চরম বিপ্লবীও কট্টরপন্থী হয়ে যায়… তেমন হয়ে গেছেন। যেটাই হয়ে থাকুক না কেন দুই দিক দিয়েই যে পরাজয় দেখতে পাচ্ছি।

যাহোক উভয়েই কিন্তু জাতীয়তাবাদী, তবে স্বাধীনতাকামী হয়েও আসলে স্বাধীন হতে পারেনা …

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

স্বাধীনতার ধারণা

স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – দুই

কোন মানুষটা স্বাধীন ? কোন মানুষটা বা স্বাধীন নয় ? আমি পরাধীন শব্দটা ব্যবহার করছি না। একটু অতীতে যাই, দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা। প্রায় ২৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৭০ এর দিকে যুক্তরাজ্যে শিল্পবিপ্লবের শুরু বলে ধরা হয়। তো তখন থেকে সমাজে প্রচলিত বেশকিছু সম্পর্ক পরিবর্তীত হতে শুরু করে। তার একটা হল ভূ-স্বামী এবং চাষীর সম্পর্ক। কারণ বাস্তবে ভূ-স্বামীর সংখ্যা থাকে কম। অথচ ওরাই থাকে কর্তৃত্বে এবং চাষীরা তার নির্ভরশীল। এই চাষীরা কোন মৌসুমে কি উৎপাদন করবে, কিভাবে করবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন এখতিয়ার তাদের থাকত না। এই কর্তৃত্ব এবং নির্ভরশীলতার ভেতর কোন প্রচ্ছন্ন স্বাধীনতা বা পরাধীনতার বোধ কাজ করত কিনা সেটা ধারণা করা আমার পক্ষে অসম্ভব।

আবদুল মমিন চৌধুরী “প্রাচীন বাংলার ভূমিব্যবস্থা” তে বলছেন … বহু প্রাচীনকালে বাংলাদেশের ভূমির স্বত্বাধীকারী কে ছিলেন- রাজা না প্রজাসাধারণ তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে মৌর্য আমলে যে সুষ্ঠু রাজশাসন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল তা থেকে মনে হয় যে তৎকালীন বাংলার ভূমির স্বত্বাধীকারী ছিলেন রাজা।… এক্ষেত্রে প্রমাণস্বরূপ তিনি মহাস্থানগড়ে পাওয়া লিপির কথা বলছেন। আবার দেবখড়েগের আশরাফপুর লিপি থেকে তথ্য হাজির করছেন যে মহিলারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করতে পারতেন। …. অন্যএক জায়গাতে বলছেন,”তবে ভূমির মালিকানা যারই থাকুক না কেন উৎপাদিত শস্যের ছয় ভাগের এক ভাগ রাজাকে দিয়ে দিতে হত সেই প্রমাণ পাওয়া যায়।”

১৭৯৩ সালের মার্চে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ঘোষণাতে কর্নওয়ালিস বলছেন, ” এখন থেকে সমস্ত জমিদার, চৌধুরী, তালুকদারগণ জমির একমাত্র মালিক বলে বিবেচিত হবেন। এখন মালিক হিসেবে তার জমি বিক্রি করতে পারবেন, দান করতে পারবেন, বন্ধক রাখতে পারবেন। এর জন্য সরকারের সম্মতি নিতে হবে না। আর দশবর্ষীয় বন্দোবস্তে যার উপর যত সরকারী খাজনা আরোপ করা হয়েছে তার আর পরিবর্তন হবে না। এই চিরস্থির খাজনা ও বন্দোবস্ত কোন ভবিষ্যৎ সরকারও পরিবর্তন করতে পারবে না।”_proclamation articles 1-6, regulation 1, 1793.
এবার আসুন রমেশচন্দ্র দত্তের কথায়। তিনি দ্যা ইকোনোমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া আন্ডার আর্লি ব্রিটিশ রুল বইয়ে বলছেন… ভারতবর্ষে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হচ্ছিল, বড় বড় যুদ্ধ চালানো হচ্ছিল এবং শাসনকার্যও পরিচালিত হচ্ছিল ভারতের জনসাধারণের অর্থে, এর জন্য ব্রিটিশ জাতি একটি কপর্দকও খরচ করে নাই। বিহার এবং বাংলাদেশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হতেই এই সকল যুদ্ধ এবং শাসনকার্যের জন্য সকল ব্যায় নির্বাহ করা হচ্ছিল।

মাহবুব আহমেদ “বাংলাদেশের ভূমিবিন্যাস ব্যবস্থা” প্রবন্ধে বলছেন, ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ইংরেজগণ যে জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি করেন তার ঐতিহাসিক গোড়াপত্তন মুর্শিদকুলি খানের ‘জমা’ প্রথা ও সুজা-আল-দীনের ‘সুমার’ প্রথায় করেছিল।

বাংলাদেশের মানুষরা বিশেষত চাষীরা পরাধীন হয় প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ১৭৯৩ সালেই। কিন্তু সেদিনের আগে থেকেই তো তাদের এমনটা হওয়ার কথা। অন্তত মুর্শিদকুলি খানের সময় তো বটেই। কিন্তু তা হচ্ছে না কারণ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে যে খাজনা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় তার আকার। এবং এই সময় থেকেই বাংলাদেশের মানুষ বা চাষীরা (সংখ্যাগরিষ্ঠ) তাদের জমিতে কি উৎপাদন করবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার হারাচ্ছে। ফলত পরাধীনতার অনুভূতি লাভ করছে।
শুরুতে উল্লেখ করা শিল্পবিপ্লবের আগে যুক্তরাজ্য বা ইংল্যাণ্ডেও ভূ-স্বমীদের অধীনস্তদেরকে এই ধরণের একটা পরাধীনতার বোধ নিয়েই চলতে হয়েছে কয়েক শতাব্দী। শিল্পবিপ্লব এই অধীনস্তদের অনককেই সুযোগ দিল এক নতুন ধরণের স্বাধীনতার। নিজের কাজ নিজে নির্বাচন করার স্বাধীনতা। কিন্তু কয়েকদশক যেতেই তারা বুঝতে পারল এই স্বাধীনতা তাদেরকে কতটা অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার ভেতর ফেলে দিয়েছে। এবং এরই ফলস্বরূপ বিশ্বে হাজির হয়েছে স্বল্প মজুরীতে শ্রমিক পেষণ এবং গণদারিদ্র। সেটাকে একধরণের মানবিক বিপর্যয় বা এক নতুন ধরণের পরাধীনতা কি বলা যাবে না ? হ্যা মানুষ বলেছেও তাই। আর তাই মানবিকতার ম্যানিফেস্ট নিয়ে সে তৈরী করেছে আর একটি বিপ্লব।

(নোট : আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)

স্বাধীনতার ধারণা

স্বাধীনতার ধারণা : পর্ব – এক

শুরুটা করেছিলাম শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তুমি” কবিতা দিয়ে। অনেক দিন পর্যন্ত ভাবতাম স্বাধীনতা মানে বুঝি এইসবই। পরবর্তীতে যখন “তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা” পড়লাম কেমন যেন খটকা লাগল। রবিঠাকুরের অজর কবিতার কথা না হয় বাদ দিলাম। পিতার জায়নামাজের উদার জমিন বা মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন অথবা নিদের পক্ষে বাগানের ঘর, কোকিলের গান, বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা পাওয়ার জন্য শাহাজাদপুরের জোয়ান কৃষক, জেলেপাড়ার সাহসী লোকটা, মেঘনার দক্ষ মাঝি বা ঢাকার রিকশাওয়া অধীর প্রতীক্ষা করবে কেন ? দুইটা ব্যাপার যেন দুই রকম। অনেক পরে বুঝতে পেরেছি যে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য সেদিনের বা হাজার বছরের খাণ্ডবদাহন তা আসলে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। মানুষের নয়। অথচ স্বাধীনতা তুমির প্রতিটি স্বাধীনতা যেন কোন ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু কেন ? হয়তো এই সব ব্যক্তিমানুষই এক হয়ে রাষ্ট্র গঠন করে, তাই…

তাই রাষ্ট্রের বা দেশের স্বাধীনতার ধারণাটার কথা দিয়েই শুরু করছি এই সিরিজ। কিন্তু ধারণাটা করবে কে ? রাষ্ট্রের নাগরিক যারা তারা ? নাকি অন্যকেউ ? আর একটা স্বাধীন দেশ কতটা ব্যক্তি স্বাধীনতা অনুমোদন করে বা করতে পারে ?

ইতিহাসের যে সময়টুকুতে আমরা নিজেদেরকে পরাধীন ভেবেছি সেই সময়টাতে আসলে আমাদের সম্পদের উপর আমাদের কর্তৃত্ব ছিল না। আমরা কি উৎপাদন করব, কিভাবে করব, কতটুকু করব, কার জন্য করব সেটাও নির্ভর করত বিদেশীদের সিদ্ধান্তের উপর খানিকটা বা অনেকটাই। আর এই সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দেয়া হত আমাদের উপর। বিদেশীরা এই কাজটা যে সবসময় নিজহাতে করত তা কিন্তু না। সেটা করার জন্য তারা তৈরী করেছিল বিশাল কর্মচারী, চাকরবাকর, দালাল, জমিদার, খাজনাদার ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে গঠিত এক বিশাল প্রশাসন যন্ত্র। যার উদ্দেশ্য ছিল খুব পরিস্কার। এই দেশে উৎপাদিত সম্পদ কুক্ষিগত করা। কাজটা পাঠান ও মোগলরা করেছে, পরে ইংরেজরা করেছে এবং আরো পরে করেছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা।

পাঠান আর মোগলরা অবশ্য এই সম্পদ এই উপমহাদেশের বাইরে নিয়ে যায়নি। তবে ইংরেজরা নিয়ে গিয়েছে। ফলস্বরূপ তারা যে পরিমাণ ধনী হয়েছে আমরা তার বিপরীত অনুপাতে হয়েছি নিঃস্ব। ইংরেজরা আমাদের সম্পদ নিয়ে গিয়ে নিজেদের দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে আর আমরা হয়ে পড়েছি সেই শিল্পজাত পণ্যের ক্রেতায়। তারপরও স্বাধীন ক্রেতা নয়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল বিবেচ্য বিয়য় ছিল সম্পদের এই মালিকানার প্রশ্নটিই। কোম্পানি শাসন আর ব্রিটেনের রাণীর শাসনের সময় যা ঘটেছিল, স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রেও তাইই ঘটেছিল।

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি গরীব অনুন্নত দেশ। কিন্তু তার যে সম্পদের অভাব আছে এটা কিন্তু আমরা মনে করি না। তারপরও আমাদের দেশ বা আমরা কেন গরীব থাকছি? উত্তরটা খুব সহজ। আমাদের সম্পদের উপর আমাদের মালিকানা নেই বা থাকছে না। সম্পদ এখনো পাচার হচ্ছে। কথিত পরাধীনতার সময় থেকে হয়তো বেশি পরিমাণেই হচ্ছে। দেশের খরচে আমরা যারা শিক্ষিত হই তাদের বেশিরভাগেরই প্রথম স্বপ্ন থাকে বিদেশ যাওয়ার। আমরা যাইও। পরবর্তী স্বপ্ন থাকে দেশে থেকেই কোন বিদেশী কম্পানিতে চাকরী করার। আমরা সেটাও করি খুবই নিষ্ঠার সাথে। আর যারা সরকারী চাকুরী করেন তারা যে সেটা কতটা নিষ্ঠার সাথে করেন বা করছেন সেটা নিয়ে আমাদের ভেতর সবসময়ই প্রশ্ন ছিল, আছে (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে)। ফলস্বরূপ দেশের খরচে যে দক্ষতা তৈরি করছি আমরা তা দেশের কোন কাজে লাগছে না। কাজে লাগছে বিদেশীদের সম্পদ উৎপাদন এবং বৃদ্ধিতে। এই ব্যাপারটা বুঝতে আমাদেরকে একটু কষ্ট করতে হলেও দেশের খনিজ সম্পদের ব্যাপারটা বুঝতে কিন্তু এত কষ্ট করতে হয় না। সেটার কর্তৃত্ব খুব সাদামাটাভাবেই বিদেশীদের। আমাদের দেশের খনিজ সম্পদ আমরা বিদেশীদের কাছ থেকেই কিনে নেই।

যুদ্ধ জয় দিয়ে আমরা দেশের স্বাধীনতা এনেছি ঠিকই। কিন্তু নিজেদের সম্পদের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি আজো। দুঃখের বিষয় হল আমাদের রাজনীতিবিদরা বা আমরা যারা নিজেদেরকে শিক্ষিত বলে দাবি করি তারা কেউই আজও নিজেদের সম্পদের উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট নই। বরং প্রতি নিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি তাতে বিদেশীদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার। এটা যে একধরণের পরাধীনতা- তা বুঝে করছি নাকি না বুঝে করছি সেটা কে বলতে পারে ?

(আমারব্লগের জন্য লেখা… এখানে সংরক্ষণ করলাম…)