বিভাগবিহীন

নগরী ঢাকা ১০

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া আজকের দিনের বড়সড় কোনো নগরীকেই আর বেশি দিন টিকিয়ে রাখা (সাস্টেইনেবল) বা নিদেনপক্ষে কার্যকর রাখা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন আর তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার এক নগর থেকে আর এক নগরের মাঝে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য, দরকার নগরের অভ্যন্তরে নাগরিকদের এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য দরকার নগরীর জ্বালানী (এ্যানার্জি) চাহিদা মেটানোর জন্য। নগরে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য। নাগরিকদের প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার জন্য। এমনকি এখনকার শহরগুলোর পার্ক, জলাশয় বা প্রাকৃতিক পরিবেশও প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল-পার্ক কিমবা ঢাকার হাতির-ঝিলের কথা বলা যায়। কারণ এই জায়গাগুলোর স্বাভাবিক বাস্তু-সংস্থান (ইকো-সিস্টেম) অনেক আগেই বিঘ্নিত ক’রে ফেলা হয়েছে, কিমবা এই জায়গাগুলোকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই প্রাকৃতিক ভাবে জায়গাগুলো সেরকম নয়।

কিন্তু আধুনিক কালের প্রযুক্তি ব্যাপারটা যেন প্রেমিকার হৃদয়াবেগের থেকেও বেশি দ্রুত পরিবর্তনশীল। মান্ধাত্তার আমলের প্রযুক্তি ঠিক কতটা উপযোগী ছিলো জানি না। তবে সেসব প্রাযুক্তিক উপকরণগুলো বহুদিন টিকতো ব’লে একধরণের প্রচার আছে। টিকে থাকাটাই সাস্টেইন করা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে সূক্ষ্ণ (সফিস্টিকেটেড অর্থে) প্রযুক্তি-পণ্য বা আয়ুধ (টুল) দীর্ঘস্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। ফলে এই ধরণের পণ্যগুলো দ্রুত বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের উৎসে পরিণত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের তাই বেশ কিছু হ্যাপাও আছে। পরিত্যক্ত প্রযুক্তির ভার বহনের ক্ষমতাও আজকের দিনের শহরগুলোর তাই না থাকলেই নয়, অন্তত খানিকটা হলেও। সেক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার-প্রযুক্তি সহায়ক হ’তে পারে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের আর একটা বড়সড় জটিলতা হ’লো এটা চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, তা কিনে ফেলার পরও। (এটা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন আমার বাবা যিনি এখনো মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারেন না।) প্রযুক্তি-পণ্য ব্যবহারের জন্য অনেক সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। আবার দক্ষতাও এমন একটা জিনিস যা সবাইকে সমান ভাবে ধরা দেয় না। তবে আজকের দিনের শহরকে মোটামুটি কর্মক্ষম রাখার জন্য যে প্রযুক্তিগুলোর দরকার পড়ে তার ব্যবহার-প্রণালী শহরের সব নাগরিকের না জানলেও চলে। কিন্তু যাদেরকে এই ব্যাপারগুলো জানতেই হবে তাদের সংখ্যা আর দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শহরে গ’ড়ে তুলতে হয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বা ইনিস্টিটিউট।

এই একুশ শতকের কোনো একটা শহর বা নগরে যে পরিমাণ মানুষ গাদাগাদি হ’য়ে বসবাস করে প্রাকৃতিক (অর্গানিক অর্থে) ভাবে সেভাবে বসবাস করা যায় না। বিলেতিরা যখন ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশ ছেড়ে চ’লে গেলো তখন এই দেশের মানুষের গড় আয়ু ২৭/২৮ বছরের কাছাকাছি ছিলো। যদিও নারীপ্রতি সন্তান নেওয়ার হার এখনকার থেকে কয়েকগুণ বেশি ছিলো, তবুও দেশের মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিলো বেশ কম। তার একটা বড় কারণ এই নিম্ন গড় আয়ুর ব্যাপারটা। আবার প্রেক্ষিত আয়ুস্কাল কম থাকায় মানুষজনকে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরী আর বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্নে কম বয়সে সংসার শুরু করা ছাড়া বিকল্প ছিলো না, যার সামাজিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশ আর ঢাকার মানুষের গড় আয়ু বেশ বেড়েছে। ঢাকার জন-ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে এর নাগরিকদের আয়ুস্কাল বৃদ্ধির বড় ভূমিকা আছে। আবার নাগরিকদের এই আয়ুস্কাল বৃদ্ধিতে শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানের দারুন কিছু কার্যক্রমের ভূমিকাও আছে। অদ্ভুত ভাবে ঢাকাতে এখন নারী-প্রতি সন্তান নেওয়ার হার দেশের সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি।

মোটাদাগে ব’লতে গেলে কারখানা বিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন) পর থেকে শহরের অবকাঠামো খাতে নানা ধরণের পরিবর্তন আনা গেছে ব’লেই আজকের দিনের শহরগুলোতে এতএত মানুষ এতটা ঘনবসতিতেও বেঁচে থেকে বসবাস করতে পারছে। আর সেই পরিবর্তনগুলো সম্ভব হয়েছিলো নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিস্কার আর তার ব্যববহার নিশ্চিত করতে পারার কারণেই। এক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে বিশ শতক পরবর্তী শহরের কাঠামোতে। নাগরিক জীবনে তো বটেই।

অর্থাৎ নগরীকে কার্যক্ষম রাখার জন্য আজকের দিনে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। আর সেই প্রযুক্তিকে সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন যথাযত প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। সিটি-কর্পোরেশন, ওয়াসা, পানি-উন্নয়ন বোর্ড, ডেসা, ডেসকো, পল্লী-বিদ্যুৎ, রাজউক, কেডিএ, সিডিএ, সিভিল-এ্যাভিয়েশন, মেট্রো সার্ভিস, সড়ক কর্পোরেশন ইত্যাকার নানা প্রতিষ্ঠান। আবার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করবে যে মানুষগুলো তাদের দক্ষতা তৈরীর জন্য প্রয়োজন নানা ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। এ এক বিপুল যজ্ঞ।

আজকের ঢাকা নগরীর জন্ম ১৯৪৭ এর আগে নয়, বাস্তবতার নিরিখে। ১৯৪৭ সালের পরে নানা স্থান থেকে যেভাবে ঢাকাতে মানুষ জড়ো হ’তে শুরু করে তার কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি ঢাকার ছিলো না, প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায়। ফলে ঢাকার বিভিন্ন বসতি কেন্দ্রগুলো বর্ধিত গ্রাম বা নিদেনপক্ষে ছোট শহরের চরিত্র নিয়ে বড় হ’তে থাকে পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত। বাজার, বিদ্যালয়, মসজিদ-মাদ্রাসা আর কিছু রাস্তাঘাট ছাড়া আর কোনো নাগরিক সুবিধা এইসব কেন্দ্রগুলোতে অনেক দিন পর্যন্ত গ’ড়ে ওঠেনি ব’ললেই চলে। এমন একটা শহরেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন মানুষের আগমন ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। কেন যে যায়নি তা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো (বিশ্ববিদ্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) খুব বেশি সমীক্ষাও হয়তো করেনি, অন্তত সাধারণের কাছে প্রকাশ যে করেনি তা বলা যায়। আর করেনি ব’লেই এই নগরীতে মানুষের আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি ব’লেই শহরের অনেক অবকাঠামো নিয়ে ন্যুনতম পরিকল্পনাও সাজানো যায়নি। জানি না দক্ষ মানুষের অভাব ছিলো কিনা। তবে নাগরিকদের ভেতরে এই শহরকে গ’ড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি ছিলো প্রকট। এখনো যে নেই তাও বলা যাবে না।

আশার কথা এই যে ঢাকার কাছে এর নাগরিকদের চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে যে কিছুকিছু সুবিধা বা সার্ভিস যদি গ’ড়ে তোলা না যায় তবে এই শহরের বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো এটা বুঝতে শুরু করেছে তাদের কাছে দুইটার বেশি বিকল্প আছে ব’লে মনে হয় না। হয় এই শহরের অনেকগুলো বর্তমান-সুবিধাকে উন্নত করতে হবে, কিছুকিছু নতুন ক’রে গ’ড়তেও হবে অথবা এই শহর থেকে পালাতে হবে। আমার চেনাজানা অনেকেই যে পালিয়ে গেছেন তা ব’লতে দ্বিধা নেই। আবার অনেককে দেখেছি উন্নত কোনো নগরের উন্নত কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন দক্ষতা শিখে এসেছেন। এখন চেষ্টা করছেন সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে সাহায্য করা যায় কিনা।

কিন্তু বুনিয়াদি একটা নগরকে আগামীর জন্য গ’ড়ে উঠতে সাহায্য করাটাও সহজ নয়। তাতে অনেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান/প্রথা/নায়কদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হয়। কিছু দিন আগে দেখলাম স্থপতি মোহম্মদ মাসুম ঢাকার শিশু-পার্কের পরিলেখ নিয়ে দারুন একটা প্রশ্ন করেছেন। শাহবাগের শিশু-পার্কটি যে জায়গাতে গ’ড়ে তোলা হ’য়েছে সেখানেই ছিলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মঞ্চ। যে স্থপতি শিশুপার্কের পরিলেখটি তৈরী করেছেন তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য-শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোধা ব্যক্তিদের একজন। অথচ তিনি তার করা সেই পরিলেখে ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চিহ্ন (সিম্বল) কে একদম এড়িয়ে গেছেন। এটা সচেতন ভাবে করা কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন। যদি সচেতন ভাবে করা হ’য়ে থাকে তবে তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন কিনা। আর যদি সচেতন ভাবে না করে থাকেন তবে শিক্ষক বা মেন্টর হিসেবে তার ভূমিকাকে যতটা সম্মান করা হয় ততটা সম্মান তার প্রাপ্য কিনা।

কখনো কখনো একজন মানুষও প্রতিষ্ঠান হ’য়ে উঠতে পারেন। শহরই তাদেরকে সেই সুযোগ ক’রে দেয়। কিন্তু তেমন প্রতিষ্ঠানকেও প্রশ্ন করতে হবে নির্দ্বিধায় যদি সামনের দিকে আগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে। সম্প্রতি অনেকগুলো পত্রিকাকে দেখলাম ঢাকা-ওয়াসার গত এক যুগ/দশকের কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরণের প্রতিবেদন ছাপাতে। ঢাকার নাগরিকেরা তথা সরকার এই সময়কালে এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে কম খরচ করেনি। অথচ সেই অনুপাতে শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থার উন্নতি খুবই হতাশার। অবশ্যই এখানে দায় আছে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মানুষগুলোর। কিন্তু সাথে এই প্রশ্নও তুলতে হবে কেন আমরা ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তুলতে পারছি না। কি কি কাজ করলে তেমনটা করা সম্ভব হবে।

এই কাজগুলোর একটা নিশ্চিত ক’রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। শুধু নালা বা ড্রেন তৈরী আর মাঝেমাঝে সেগুলোকে সংস্কার করে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আর করা যাবে না। তার একটা বড় কারণ ঢাকার পুকুর আর জলাধারগুলোর পরিমাণ অনেক কমে যাওয়া। পুরোনো খালগুলো দখল বা সংকীর্ণ হ’য়ে যাওয়া। তার উপর ঢাকাতে আচ্ছাদিত স্থানের পরিমাণ গিয়েছে বেড়ে। ফলে বৃষ্টির পানি শোষণ করার মতো উন্মুক্ত জমিও গিয়েছে কমে। এই কারণে নালার উপর বাড়ছে অতিরিক্ত পানির চাপ। আবার নালার আয়তন বাড়ানোর উপায়ও একরকম নেই বললেই চলে। একারণেই প্রযুক্তির প্রসঙ্গ চ’লে আসছে। যান্ত্রিক পাম্প ব্যবহার ক’রে দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্প বসানোও হয়েছে। তবে সেগুলোকে সর্বোক্ষণ কর্মক্ষম রাখার মতো দক্ষ লোকবল রাখা হ’য়েছে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয় যান্ত্রিক পাম্পের ধারণক্ষমতা, যতটা পানি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃষ্টির ফলে জমে ততটা পানি কাঙ্ক্ষিত সময়ের ভেতরে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাম্পগুলোর আছে কিনা। দুঃখজনক ভাবে সবক্ষেত্রে শুধু পাম্প বা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান করা যাবে না। কখনো কখনো রিটেনশন পুকুরের দরকার প’ড়তে পারে। যেটা নিশ্চিত করতে শহর নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা করাটা খুবই দরকারী। যেটা করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান।

নিশ্চিত ভাবেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংকট আছে বাংলাদেশে। কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রামের মতো দ্রুত-বর্ধনশীল দুইটা বড়সড় নগরী থাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ঠিকই আছে। এই দুইটা নগর যদি কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরীতে এগিয়ে আসতে পারে তবে তা উপকারী হ’তে পারে দেশের মাঝারি মানের অন্য শহরগুলোর জন্যও।

এবার আসি যাতায়াত ব্যবস্থাতে প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। এখনো পুরান-ঢাকাতে ঘোড়ায়-টানা গাড়ি চ’লতে দেখা যায়। এটাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার আছে বটে, তবে সে প্রযুক্তি এর ভেতরেই প্রাচীন হ’য়ে গেছে। নগরের চৌহদ্দিও বেড়েছে। তাই সাইকেল-রিকশা আর ঘোড়ায়-টানা গাড়ির মতো বাহন দিয়ে আর কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই বাহনগুলো যে গন-পরিবহন হিসেবে শহরের কিছুকিছু এলাকাতে এখনো দারুন ভাবে কার্যকর সেটা খেয়াল রাখা দরকার। এই বাহনগুলোকে যান্ত্রিক বাহন দিয়ে প্রতিস্থাপনের সময় এসেছে। শুধুমাত্র সময়ের প্রভাবেই এরা প্রতিস্থাপিত হ’য়ে যাবে এটা ভাবা বোকামি হবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনি দিকনির্দেশনা। প্রয়োজন সার্বিক পরিকল্পিত প্রস্তুতি।

১৯৩৬ কিমবা ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে প্রথম সাইকেল-রিকশা আনা হয়। এর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ আমরা তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনিনি। মাত্র কয়েক বছর হ’লো তাতে যান্ত্রিক মোটর যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেও চীন থেকে আনা কিছু ব্যাটারি-পাওয়ারড রিকশা রাস্তাতে চ’লতে শুরু করার পর থেকে। আইনে বৈদ্যুতিন বাহনের অনুমতি এখনো নেই বিধায় এই রিকশাগুলোকে এখনো অননুমদিতই থাকতে হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যাতায়াত ব্যবস্থা বৈদ্যুতিন হওয়ার দিকেই আগাচ্ছে। সাধারণত শুরুতেই কোনো বিষয়ের আইনি কাঠামোটা দাড় করিয়ে নিতে পারলে তার প্রযুক্তি আত্মিকরণে তা সহায়ক হয়।

ঢাকার জন্য যে একটা কার্যকর মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা দরকার সেটা এর নাগরিকেরা বহুদিন ধরেই টের পাচ্ছেন। দেরীতে হ’লেও কিছু কাজ শুরু হ’য়েছে। কিন্তু এর সমস্ত প্রযুক্তিই আমাদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সমস্ত ডিজাইন করিয়ে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। যেহেতু এমন প্রযুক্তি আমাদের নিজেদের আবিস্কার করা নয় সেহেতু শুরুতে আমদানি করা ছাড়া উপায়ও নেই খুব একটা। তবে দীর্ঘ-মেয়াদে চিন্তা করলে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসা সম্ভব ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতরেই। শুরু করা যেতে পারে কোচগুলোর নির্মাণ দিয়ে। ধীরে ধীরে অন্য ব্যাপারগুলোও। সেটা লাভজনক না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কারণ চাহিদা বাড়ছেই। আর এটা শুধু ঢাকাতেই আটকে থাকবে না। অন্য বড় শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। আর যেহেতু এটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় সেহেতু এটাকে কেন্দ্র ক’রে অনেক ধরণের প্রতিষ্ঠানই দাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও লাভবান হ’তে পারে এ থেকে।

টীকা:
১. রিটেনশন পুকুরের বাংলা হিসেবে ধারক-পুকুর লিখতে পারতাম হয়তো। রিটেনশন-পুকুর যেহেতু পানি শোষণ আর ধারণ একই সাথে করে তাই শুধু ধারক-পুকুরে সন্তুষ্ট হ’তে পারিনি। শোষণ আর ধারণকে যুক্ত ক’রে কোনো শব্দ বানাতে পারলে বোধ হয় ভালো হ’তো।
২. মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট : দ্রুত আর বহুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। জানি না কিভাবে ছোট ক’রে আনা যায়।
৩. ডিজাইন শব্দটাকে এখন আর নকশা-প্রণয়ন বলার পক্ষপাতি নই আমি। এটাকে চেয়ারের মতো গৃহীত বিদেশী শব্দ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
৪. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৪
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57828


বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৫

বাংলাদেশে বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হার
বাংলাদেশের ঠিক কত শতাংশ মানুষের একটা বাসা বা এ্যাপর্টমেন্টের মালিকানা আছে তার কোনো হিসাব ইন্টারনেট ঘেটে পেলাম না। আমাদের ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ এর যে সাইটটি (http://www.nha.gov.bd/) আছে সেখানেও এই ধরণের কোনো পরিসংখ্যান ০৫ মে ২০২০ এও নেই।

পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে গৃহ-মালিকানার শতকরা-হার কেমন সেটার কিছু পরিসংখ্যান সহজেই পাওয়া গেলো। কোনো কোনো দেশের তালিকা একেবারে হাল নাগাদ করা নেই যদিও।

বিভিন্ন দেশের বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হারের তালিকা (১)

house ownership rate-05.05.20.xlsx

তালিকা থেকে জানতে পারছি গৃহ-মালিকানার দিক থেকে সবার উপরে থাকা দেশটার নাম রোমেইনিয়া বা রুমানিয়া। সিঙ্গাপুর আছে তালিকার তিন নম্বরে। তাদের মোট জন-সংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগের বাস-গৃহের উপর মালিকানা আছে। তালিকাতে কিছু বিষয় উল্লেখ করা নেই। যেমন মালিকানার ধরণ কেমন। সিঙ্গাপুরের ৯১ ভাগ মানুষের কি এ্যাপার্টমেন্ট কেনার মতো টাকা আছে? একটা দেশের তো অন্তত ২০ ভাগ মানুষ থাকেই যাদের বয়স ২০ বছরের কম। তারাও কিভাবে গৃহের মালিক ব’নে যাচ্ছে তালিকার উপরের দিকে থাকা দেশগুলোতে? এর উত্তর আসলে পরিসংখ্যান নেওয়ার ধরণে। কোনো ব্যক্তির নামে যাদি একটি এ্যাপার্টমেন্ট থাকে তবে তার পরিবারের অন্য যে সকল সদস্য তার উপর নির্ভরশীল তারাও আসলে সেই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক। অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তির মতো। স্বামী-স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে সকলকেই এই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার মালিকানাটি কত বছরের জন্য সেটাও বিবেচনার বিষয়। হয়তো জমির মালিক সরকারই থাকছে। তবে এ্যাপার্টমেন্টটির মালিকানা অনেক ক্ষেত্রেই ৯৯ বছরের জন্য।

তালিকাতে দক্ষিণ-এশিয়ার কোনো দেশের নাম নেই। এটার একটা কারণ হ’তে পারে এই ব্যাপারে এই দেশগুলোতে পরিসংখ্যানের অভাব। তবে উইকিপিডিয়া ব’লছে ভারতে গৃহ-মালিকানার হার ২০১১ সালে ছিলো ৮৬.৬ শতাংশ। তাদের তালিকাতে ভারতের অবস্থান ১০ নম্বরে। আর চীনের অবস্থান ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ৫ নম্বরে। উইকিপিডিয়ার তালিকাটিও দেখে নেওয়া যাক।

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

২০১৬ সালের (৩) একটা গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে সে বছর বাংলাদেশে ২,৮০,০০০ (দুই লক্ষ আশি হাজার) মানুষ গৃহহীন ছিলো। অর্থাৎ এই লোকগুলো পথে-ঘাটে বা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটিয়েছে। এই তথ্য থেকেও ধারণা করা যায় না দেশের ঠিক কত ভাগ মানুষের গৃহের উপর মালিকানা আছে বা ঠিক কত ভাগ মানুষ বাসা ভাড়া ক’রে থাকে। ভাড়া ক’রে থাকা বাসাগুলোর গুণগত মান কেমন বা সেখানে বসবাসের ধরণ (লিভিং স্ট্যান্ডার্ড) কেমন সেটাও জানা যায় না; জানা যায় না মাথাপিছু কত বর্গফুট জায়গা বাংলাদেশের নাগরিকেরা গড় হিসেবে থাকার জন্য ব্যবহার করছেন।

১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ‘হাউজিং পলিসি’ তৈরীর ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিউ-ডি-জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলনে ‘পরিবেশ এবং উন্নয়ন’ প্রসঙ্গে আরো একটা ঘোষণা আসে। তার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে একটি জাতীয় গৃহায়ন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল হাউজিং পলিসি) অনুমোদন করা হয়। ১৯৯৯ সালে তাতে কিছু সংশোধনী আনা হয়। আর ২০১৬ সালে এটাকে পুর্নমূল্যায়ন করা হয়। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মোস্তফা সুরাইয়া আক্তার এবং আশরাফি বিনতে আকরাম তালিকাবদ্ধ করেছেন নিচের মতো ক’রে : (৪)

Bangladesh national housing pollicy key points.xlsx

এখান থেকেও ধারণা করা যায় না যে বাসা বা বাসস্থানের মালিকানা নিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবনা কী রকম। যদিও আমাদের দেশের সংবিধানের ১৫ তম অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ তে ‘মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা’ প্রসঙ্গে বলা আছে যে – (৫)

১৫৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার৷

অর্থাৎ সাংবিধানিক ভাবে নাগরিকদের বাস-গৃহের মালিকানা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নেই। রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলার চেষ্টা করবে যেখানে নাগরিকদের জন্য আশ্রয় বা বাস-গৃহের সংস্থান হয়। সেই সংস্থান মালিকানা-নির্ভর হবে না ভাড়া-নির্ভর হবে সেই ধরণের প্রস্তাবণা আসলে সংবিধানের কাজও নয়। সেটা হাউজিং পলিসির কাজ। জাতীয় হাউজিং পলিসি এই ব্যাপারে খুব ভেবেছে ব’লে মনে হয় না। হয়তো তার পেছনে দেশের অর্থনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। কারণ সম্পদের মালিকানার উপরে খুব বেশি ট্যাক্স বা কর ধার্য করা যায় না, যতটা যায় দেনদেনের উপর। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের বাৎসরিক খাজনার পারিমাণ আর এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া থেকে আয়ের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্সের অনুপাত হিসাব করলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হবে।

উপরের দেশ-ভিত্তিক বাসগৃহের মালিকানার দুইটি তালিকা দেখে আমরা বুঝতে পারি যে বাস-গৃহের মালিকানার হারের সাথে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক তেমন একটা নেই। বাজার-অর্থনীতি কিংবা সমাজতান্ত্রিক-অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকদের জন্য বাসগৃহের মালিকানার ব্যবস্থা করা যায় যদি ‘হাউজিং পলিসি’ তে সেটা চাওয়া হয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা।

যদিও ঐতিহ্যগত ভাবে দেখা যায় বাংলাদেশে ভূমি-হীনের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার আনুপাতে বেশ বেশি। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের আগে জমির মালিকানা মূলত জমিদারের হাতেই ছিলো। রায়ত বা চাষীরা যেসব জমিতে থাকতো বা চাষ করতো তার মালিক তারা ছিলো না। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের পর থেকে জমিদারেরা চাইলেই যে কোনো রায়তকে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতো না, যেটা কিনা তার আগে পারতো। এবং হরহামেশাই তারা সেটা করতো। ফলে বিলেতিদের চাপিয়ে দেওয়া আইনি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে সবসময়ই গৃহহীনের সংখ্যা কম ছিলো না। আবার গৃহহীন এই মানুষগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখার একটা ব্যবস্থা বা সিস্টেম হয়তো দাড় করিয়ে ফেলেছে। যার কারণে এটা নিয়ে সমাজে বা রাষ্ট্রে বিশেষ আন্দোলনও নেই। আর আন্দোলন নেই ব’লেই আমাদের হাউজিং পলিসিতে এটা নিয়ে কোনো টু-শব্দটি নেই। যদিও বাস-গৃহের গুণগত মান বৃদ্ধির তাগিদ আছে। কিন্তু সেটা হয়তো শুধু শহুরে এলাকার জন্য। দেশের দক্ষিণের বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটা নিরাপদ আবাসন কিভাবে এবং কত বছরে গ’ড়ে তোলা যায় তার কোনো দিক-নির্দেশনা সেখানে নেই। আবাসনের নিরাপত্তার সাথে যে  গৃহ-মালিকানার সম্পর্ক আছে সেটাকে পুরোপুরিই অবহেলা ক’রে যাওয়া হয়েছে।

এই অবহেলার পরিণাম হয়তো টের পাওয়া যাবে বিশেষ কোনো সংকটের সময়ে। এই যেমন ২০২০ এর কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেকেই বাস-গৃহে আটকে আছে প্রায় দেড় মাস ধ’রে। আরো বেশ কিছু দিন যে আটকে থকতে হবে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। অনেকেই বাসা-ভাড়ার টাকাটা যোগাড় করতে পারছেন না। পৃথিবীর নানা দেশে বাড়ি-ভাড়ার টাকা মৌকুফের কথা জানতে পারছি। কোনো কোনো দেশ এই সময়ে বাসা-ভাড়া দেওয়ার জন্য বিনা-সুদে ঋণ দিচ্ছে তার নাগরিকদেরকে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষের যদি নিজের বাস-গৃহের উপর মালিকানা থাকতো তবে এই ধরণের বড় অর্থনৈতিক সংকট হয়তো এড়ানো যেতো।

লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক ক’রে বলেছিলেন, ‘if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation.’ জানামতে বাংলাদেশে কখনো আবাসনের চাহিদা নিয়ে অশান্তি বা আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তার পেছনে হয়তো আমাদের পুরোনো ইতিহাসের বেশ খানিকটা ভূমিকা আছে। বাস-গৃহের মালিকানা যে একটা চাহিদা হ’তে পারে সেটা কখনোই আমাদের জনসাধারণের মনে কিংবা মননে আসেনি, এমনকি কর্বুজিয়েরও মালিকানার কথা বলেননি, ব’লেছেন পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থার কথা শুধু। আমাদের অর্থনীতি এখনো এতটা পোক্ত জমিনের উপর দাড়াতে পারেনি যে তা আমাদেরকে একটা মান-সম্মত ও স্থায়ী (স্ট্যান্ডার্ড) গৃহের নিশ্চয়তা দিতে পারে; সে মালিকানা-ভিত্তিক বা ভাড়া-ভিত্তিক যেটাই হোক না কেন। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের নিবন্ধনের জন্য যে ট্যাক্সটা সরকারকে দিতে হয় সেটা থেকে পরিস্কার বোঝা যায় যে, আমাদের অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলো কয়েক দশক ধ’রেই মনে ক’রে এসেছেন যে বাস-গৃহের মালিকানা একটি লাগজারি বিষয়, এটি কোনো মৌলিক প্রয়োজন নয়।

কিন্তু ভবিষ্যতেও কি এমনই চলতে থাকবে? কাজী খালিদ আশরাফ, সাইফুল হক, মাসুদুল ইসলাম সাম্য, রুবাইয়া নাসরিন, ফারহাত আফজাল, হাসান এম রাকিব আর মারিয়া কিপ্তি মিলে এ ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা তুলে ধরেছেন ইংরেজি দৈনিক দ্যডেইলিস্টারে গত বছরের শুরুর দিকে । ‘দ্যা ফিউচার অব হাউজিং ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে।(৬) এখানেও বাসগৃহের মালিকানার বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সূত্র:
(১) – https://tradingeconomics.com/country-list/home-ownership-rate

(২) – https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_by_home_ownership_rate

(৩) – Molla, M. A.-M. (2016). PM: 280,000 homeless people in the country.Dhaka : Dhaka Tribune .Statistics and Informatics Division (SID). (2014). Census of Slum Areas and FloatingPopulation 2014. Dhaka: Bangladesh Bureau of Statistics( BBS)

(৪) 283-286

(৫) http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-957/section-29367.html

(৬)- https://www.thedailystar.net/supplements/28th-anniversary-supplements/avoiding-urban-nightmare-time-get-planning-right/news/the-future-housing-bangladesh-1704259
The future of housing in Bangladesh _ The Daily Star_KKA

বিভাগবিহীন

যাপিত জীবন – ৩৫

একুশ শতকের বাংলাদেশে আমাদের যে জীবন-যাপন সেখানে অসন্তোষের কারণের উপস্থিতি কম নয়। যদিও তার প্রকাশ নেই বললেই চলে। এই ক’দিন আগে পর্যন্তও আমাদের সিনেমার সেরা নায়কের কোনো স্ক্যান্ডাল ছিলো না। আমরা ধ’রেই নিতাম তার জীবনটা বড্ড সাজানো গোছানো, আর তাই সেখানে কোনো অসন্তোষ নেই। কিন্তু যে জীবনে অসন্তোষ নেই সে জীবন কি শিল্পীর জীবন হ’তে পারে? কিমবা সন্তুষ্ট জীবন নিয়ে যার বাস তার পক্ষে কি শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব? আমার মনে হয় না। সেই ভাবনা আরো পাঁকা-পোক্ত হয় যখন বাংলাদেশের সিনেমা দেখতে বসি। পুনরাবৃত্তি আর জলো মেলো-ড্রামা। না আছে শিল্প, না আছে শিল্পী। স্বীকার করি আমাদের দর্শকদের তরফ থেকেও এদের থেকে তেমন কোনো চাহিদা নেই।

কিন্তু চাহিদার কথা বলছি কেন? সে কথা তো বলবে ব্যবসায়ীরা। হয়তো আমাদেরই ভুল। এখানে আজকের পরিস্থিতিতে সিনেমা আর কোনো শিল্প মাধ্যম নয়। এটা একটা বিনোদন কেন্দ্রিক ব্যবসা মাত্র। ব্যবসাতে বিনিয়োগ থাকে, মুনাফার হিসাব থাকে। শিল্প নিয়ে ব্যবসা করা গেলেও মুনাফাই তার সব নয়। কারণ শিল্প সৃষ্টির তাগিদটা শুধু মুনাফার ভাবনা থেকে এলে হয় না। সেখানে জীবনের কিংবা কোনো আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন খানিকটা হ’লেও থাকতে হয়। অবশ্য সব ধরণের জীবন কিনা তা বলা শক্ত। শুধু ভোগীর জীবন নিয়ে কি শিল্প হয়? অথবা এমন জীবন যেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু নেই? শিল্প নিজেই কি জীবনের পক্ষে খানিকটা হ’লেও অতিরিক্ত কিছু নয়?

কেমন ক’রে মানুষ তার জীবনের অস্তুষ্টির প্রকাশ ঘটায়? এর কতটা স্বতস্ফূর্ত আর কতটাই বা পরিকল্পিত? প্রকাশটা দরকারী কিনা? সমাজের জন্য, জীবনের জন্য, শিল্পের জন্য তথা আনন্দের জন্য? কিন্তু জীবনে তো আনন্দ নেই ব’ললেই চলে। আছে শুধু সময় কাটানোর বাহানা। তার জন্য কত না আয়োজন! কত না প্রচেষ্টা! তাতে সময় কাটছে বটে; কিন্তু যখন ভাবতে বসি কেমন গেলো সময়টা তখন সময়ের হিসাবের বেশি কিছু মাথায় আসে না। সময়টা পার করাটাই কি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য তবে?! আর পাশের মানুষটার থেকে লুকিয়ে রাখা জীবনের স্বপ্নহীনতাকে?

বিভাগবিহীন

প্রবচন – ২৬

১.
যে সমাজের আইন নিজেই অপরাধী বা ক্রিমিনাল সেখানে হয় সবাই অপরাধী নয়তো সবাই নির্দোষ। অপরাধী আইন হ’লো সেই আইন যে আইন সাধারণ মানুষকে অপরাধ-কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হ’তে বাধ্য করে। সেই আইন যে বিচার নিশ্চিত করে তো না-ই উপরন্তু বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। যার সুবিধাভোগী মূলত তারা যারা একে বিক্রি ক’রে জীবিকা উপার্জন করে।

২.
এক খ্রিস্টান-হুজুর একবার ব’লেছিলো, যে আইনে সাম্যতার বিধান নেই তা কোনো আইনই নয়। লোকটা হয় প্রচণ্ড ধড়িবাজ, নয়তো আইন আর সাম্যতা বিষয়ে কোনো ধরণের বাস্তব জ্ঞানই রাখে না।
আইন সবসময়ই সময়, সমাজ আর পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল একটি বিষয়। আর সে করণেই আইন একেক সময় একেক জনের স্বার্থ রক্ষা ক’রে চলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আর ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষা ক’রেই তাকে টিকে থাকতে হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনের এই টিকে থাকার ব্যাপারটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এর সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাই পালন করে। কারণ এরাই এর সার্বোক্ষণিক সুবিধাভোগী। আর ক্ষমতাবানেরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী একে ব্যবহার ক’রে নেয়।
আর লোকটা ধড়িবাজ এই অর্থে যে, সে প্রচার করতে চায় সমাজের প্রচলিত আইনে সাম্যতা নিশ্চিত হয়নি; এটা শুধুমাত্র নিশ্চিত করা যায় স্রষ্টার তৈরী করা আইন দিয়ে। খ্রিস্টান-হুজুরটির আগ্রহ শুধু মাত্র নিজে যে ব্যবস্থাটির সুবিধাভোগী তাকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। সেই উদ্দেশ্যেই চটকদার সরল বক্তব্য পেশ করা।

৩.
সঙ্গ-সুখের কোনো পরিণতি নেই। আছে শুধু সময়-ক্ষেপন।

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৪

পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশের আবাসিক পরিকাঠামোতে সুউচ্চ বা হাই-রাইজ ভবনের ব্যবহার খুবই কম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের মতো কয়েকটি বড়-শহর যেখানে জমির দাম যথাযত কারণ ছাড়াই হুহু ক’রে বেড়ে যাওয়ায় সে সব শহরে সুউচ্চ ভবনের চাহিদা বেড়েছে। তৈরীও হচ্ছে বেশ কিছু। খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বগুড়া আর সিলেটেও বেশ কিছু সুউচ্চ ভবন গ’ড়ে উঠেছে, সেও ব্যবসায়িক চাহিদার কারণেই। তবে সুউচ্চ আবাসিক ভবনের সংখ্যা এসব শহরের জন-ঘনত্বের অনুপাতে বেশ কম। আর কম ব’লেই শহরের আয়তন বাড়ছে। বাড়ছে অতিরিক্ত গাদাগাদি ক’রে বাস করার পরিবেশ। তাতে আলো-বাতাসের পরিমাণ যাচ্ছে কমে। ফলস্বরূপ শহরের মানুষের স্বাস্থ ঝুঁকি বাড়ছে।

আবার কৃষি আর প্রাকৃতিক জমির পরিমাণও যাচ্ছে কমে। নদীর পাড় দখল হচ্ছে। বনভূমি উজাড় ক’রে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতি, শিল্প-এলাকা, বন্দর। এসবের সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে ইকো-সিস্টেমের উপর। বিলেতিরা অনেক বন্য-প্রাণী বিলুপ্ত ক’রে দিয়ে গিয়েছে আমাদের দেশ থেকে। যেমন নীলগাই, তিন প্রজাতির গন্ডার, চিতাবাঘ; বিলেতিদের হত্যার বাসনা পূরণের নিমিত্তে। নদীর অনেক মাছ আর প্রাণীর সংখ্যাও দিনদিন কমে আসছে। এসবের একটা সমাধান হ’তে পারে সুউচ্চ আবাসিক ভবনের ব্যবহার। অর্থাৎ মানুষের বসবাসের জায়গার ফুটপ্রিন্ট (যতটা জমির উপর বিল্ডিং করা হয়) যতটা সম্ভব কমিয়ে এনে সেই জমির বেশ কিছুটা আবার প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

কিন্তু শহরের আবাসিক ভবনের ফেবরিকটা এক-দুই তলাবিশিষ্ট ভবন থেকে পাল্টে দশ বা ততধিক তলাবিশিষ্ট ভবনে পাল্টে ফেলাটা সহজ নয়। আবার লো-রাইজ বা কম-উচ্চতার আবাসিক  ভবন ভেঙে সেখানেই বহুতল ভবন বানিয়ে নিলে তার পরিণতি যে কেমন হ’তে পারে তা আমরা এখনকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে জানতে পারি। একসময়ের মোটামুটিভাবে দোতলা আবাসিক ভবনের একটা আবাসিক এলাকা সময়ের ব্যবধানে হ’য়ে যেতে থাকে ছয় তলা বিশিষ্ট। ঢাকার জন্য ২০০৮ এ নতুন বিল্ডিং-বিধি চালু হওয়ায় এখন তার অনেকগুলো রাস্তাতেই পনের তলা-বিশিষ্ট ভবন গ’ড়ে উঠছে। আর সেসব ভবনগুলো শহরের অন্যান্য বিষয়গুলোর সাথে বিবেচনা না ক’রে তৈরী করার কারণে সেসব এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ সেখানে বাস করা মানুষের মনে স্বস্তি আনতে পারছে না। অথচ আবাসের স্থান বা গৃহেই স্বস্তি খুঁজেছে মানুষ বছরের পর বছর ধরে।

মোটা দাগে ব’লতে গেলে, যেভাবে আমরা আমাদের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলছি তার ভেতরে বেশ কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ত্রুটিগুলোকে সমাধানের চেষ্টা কারার আগে তাকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার যাকে ত্রুটি বলছি তা হয়তো ঠিক ত্রুটিও নয়, হয়তো বৈশিষ্ট্য মাত্র। আগে হয়তো ৯টা প্লটে ৯টা পরিবার থাকতো। বর্তমানে হয়তো একটা ৫ কাঠার প্লটেই ৯টা পরিবারের থাকার ব্যবস্থা তৈরী করছি আমরা। অথচ এই ৯টা পরিবারের জন্য কমন কোনো কমিউনিটি-স্পেস বিল্ডিঙের ভেতরে বা বাইরে গড়ে তুলছি না আমরা। হয়তো ঠিক মতো হিসাবও করতে পারছি না কতটা জায়গা দরকার এই ৯টা পরিবারের জন্য কমিউনিটি-স্পেস হিসেবে। আবার কতগুলো পরিবারের জন্য একটা কমন কমিউনিটি-স্পেস কার্যকরভাবে উপযোগী হ’তে পারে তা নিয়েও আমাদের গবেষণা নেই।  নির্দিষ্টি কিছু সংখ্যক পরিবারের পক্ষে পরষ্পরের জন্য প্রয়োজনীয় কমিউনিটি-স্পেস কতটা লাগবে তার হিসাব করাটা জরুরী। এই কমিউনিটি-স্পেস হিসাব করতে গেলে সেই পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পেশাগত কাজের ধরণ, যাতায়াতের প্রকৃতি, জীবনযাপনের রুচি আর সামর্থ, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক পরিচয়, বর্তমান সময় আর আধুনিক-প্রযুক্তির ব্যবহার – সর্বোপরি আবাসনের প্রকৃতির সবগুলো বিষয় বিবেচনাতে নিতে হবে। মনে রাখা দরকার যে এ কাজটা খুব সহজ নয়। এবং কাজটা কোনো একক মানুষের কাজও নয়।

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৩

একটা দেশের সার্বিক বাসস্থানের পরিকল্পনার সাথে তার অর্থনীতি আর উৎপাদন ব্যবস্থার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কয়েকদিন আগে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগ ক’রে অনেকেই বিপদে পড়েছেন। (১) তার একটা বড় কারণ সেখানকার আবাসন ব্যবস্থা। বলা হ’য়েছিল ইথিওপিয়ার পোশাক-শ্রমিকদেরকে ন্যুনতম ২৬ মার্কিন-ডলার বেতন দিলেই হবে। যে সময় এটা প্রচার করা হয়েছিল সেই সময় ইথিওপিয়াতে এমন একজন শ্রমিককে তার আবাসনের পেছনে মাসে ১৫/১৬ মার্কিন-ডলারের সমপরিমাণ খরচ করলেই চলতো। কিন্তু নানা দেশ থেকে বড় আকারের বিনিয়োগ আসার পর ইথিওপিয়াতে যখন অনেকগুলো বৃহদায়তন কারখানার নির্মাণ শেষ হ’লো তখন দেখা গেলো কারখানাতে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিকের অর্থনৈতিক অঞ্চলের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা নেই। ফলে হয় শ্রমিকদেরকে অনেক দূর থেকে এসে কাজ করতে হবে নয়তো শ্রমিকদের জন্য দ্রুত আবাসন ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে কারাখানাতে আসার যাতায়াত খরচ আর সময় দুইই বেশ বেশি। তার উপর যোগাযোগ ব্যবস্থাও যথেষ্ট উন্নত নয়। সমাধান হিসেবে চীনা বিনিয়োগকারিরা শ্রমিকদের জন্য আবাসন অবকাঠামো দ্রুত তৈরীর উদ্যোগ নিয়ে ফেললো। ফল-স্বরূপ মাসের আবাসন খরচ ১৫/১৬ মার্কিন-ডলার থেকে বেড়ে ৫২ মার্কিন-ডলারে গিয়ে দাড়ালো।

যে শ্রমিকের মাসে আবাসনের পেছনে ৫২ মার্কিন-ডলার খরচ করতে হয় তাকে মাসে ২৬ মার্কিন-ডলার বেতন দেওয়া যায় না। পুরো কাঠামোটাই সাস্টেইনেবল হয় না।

বাংলাদেশের পোশাক-শ্রমিকদের আবাসন নিয়ে তেমন একটা ভাবা হ’য়েছে ব’লে আমার মনে হয় না। ইদানিং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান যদিও এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, তবে সেগুলো সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ যে নয় তা এক রকম নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। শুরুতেই বাংলাদেশের সফল দুইটা রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের ২০১৩ এবং ২০১৮ এর তুলনামূলক উপগ্রহ-চিত্র দেখে নিই, খানিকটা ধারণা পাওয়ার জন্য।

Shavar EPZ 2013
সাভার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা – ২০১৩

সাভারের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ২০১৩ সালের চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে এর খুব নিকটেই নানা আয়সীমার মানুষের থাকার ব্যবস্থা ছিলো। যার ফলে শ্রমিকের ন্যুনতম মজুরির ব্যাপারটাও সম্ভবপর হয়েছিল। ২০১৮ সালে এই এলাকার আবাসনের চিত্র বেশ একটু পরিবর্তীত হ’য়েছে। রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকাকে ঘিরে বহুতল আবাসন এলাকার ঘনত্ব বেড়েছে। আশেপাশে আরো কিছু কারখানা নির্মাণ হওয়ায় শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। তবে আশপাশের গ্রামগুলো এখনো কম মজুরির শ্রমিক সরবরাহ ক’রে চলেছে। সেটা নিচের চিত্র থেকে খানিকটা বোঝা যাবে।

Shavar EPZ 2018
সাভার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা – ২০১৮

এই এলাকাতে বা এর খুব নিকটে আরো একটি রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গ’ড়ে তুললে সেখানে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক এর আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করার সুযোগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। চট্টগ্রামের রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকার জন্যও মোটামুটিভাবে একই কথা বলা যায়।

Chattogram EPZ 2013
চট্টগ্রাম রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল – ২০১৩

২০১৩ এর চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বেশ নিকটেই নিম্ন-আয়ের শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা আছে। এবং এই ব্যবস্থার জন্য কারখানা-বিনিয়োগকারীদেরকে কোনো উদ্যোগ নিতে হয়নি। ফলে শ্রমিকের কম মজুরির ব্যাপারটা খানিকটা হ’লেও সাস্টেইনেবল হ’য়েছে। আর সেজন্যই ২০১৮ এর শেষে এসেও চিত্রটা মোটামুটি একই রকম আছে।

Chattogram EPZ 2018
চট্টগ্রাম রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল – ২০১৮

যদিও রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের চিত্র খুব একটা পাল্টায়নি, তবে আশেপাশের আবাসিক এলাকার ভবন-ঘনত্ব বেড়েছে। বন্দর-সুবিধা বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। এই এলাকার উত্তরে অবস্থিত হালিশহরের জন-ঘনত্ব দিনদিন বাড়ছে। তাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি শ্রমিকের চালান পেতে এখনো পর্যন্ত বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। আর হয়নি ব’লেই শ্রমিকদের আবাসন নিয়ে বাংলাদেশকে ইথিওপিয়ার মতো বিপদে পড়তে হয়নি এখনো পর্যন্ত।

(চট্টগ্রামের পতেঙ্গা-শৈকত সংলগ্ন ইপিজেডের পশ্চিম পাশের ভূমিরূপের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সাগরের পানির উচ্চতা যে বাড়ছে তা এই জায়গার ২০১৩ আর ২০১৮ এর উপগ্রহ-চিত্র থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে।  সাড়ে ৫ বছর সময়ের ব্যবধানে অনেকটা জায়গা সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছে।  ইপিজেডকে রক্ষা করার জন্য নতুন বাধ তৈরী করা ছাড়া বিশেষ একটা বিকল্পও ছিলো না খুব সম্ভবত। এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ আছে)

এই সুযোগে ইথিওপিয়ার নতুন রপ্তানি-নির্ভর কারখানা-অঞ্চলের উপগ্রহ-চিত্রও একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে।

Ethiopian EPZ 2019
ইথিওপিয়ার বিদেশী বিনিয়োগ অঞ্চল – ২০১৯

গুগল-আর্থ ব’লছে উপরের চিত্রটি ২০১৯ এর মার্চ মাসের। কারখানা-অঞ্চলটি ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার বেশ নিকটে হ’লেও কারখানা-এলাকার গা ঘেষেই তেমন কোনো আবাসিক এলাকা দেখা যাচ্ছে না, যেমনটা বাংলাদেশের দুইটা রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আর এজন্যই এখানে শ্রমিকদের আবাসনের পেছনেও বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত ব্যবস্থার পেছনেও নতুন ক’রে খরচ করতে হচ্ছে। আলোচনাটা শুধুমাত্র আবাসন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নিমিত্তে শ্রমিকের দক্ষতার প্রশ্নটা আপাতত মুলতবি রাখছি।

উপরের উদাহরণ থেকে অন্তত একটা বিষয় বেশ বোঝা যায়। আর সেটা হ’লো কারখানার উৎপাদন খরচ কম রাখতে পারার পেছনে আবাসন ব্যবস্থার ধরণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আর এ কারণেই কারখানা কিমবা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জায়গা নির্বাচন এবং তার পরিমাণ নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

সাভার এবং চট্টগ্রামের রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের আশেপাশের আবাসন ব্যবস্থাকে একটা সফল (খানিকটা হ’লেও) কেস-স্ট্যাডি হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। যদিও এই আবাসন ব্যবস্থা সেই অর্থে পরিকল্পিত নয়। কিন্তু নতুন কারখানা-অঞ্চল আর তার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ক’রতে গেছে এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বুঝে নেওয়াটা সহায়ক হ’তে পারে। কিছু বৈশিষ্ট্য এমন হ’তে পারে –

– কারখানা অঞ্চলটি একটি মূল-সড়কের সাথে যুক্ত।
– করখানা অঞ্চলটি আকারে অনেক বড় নয়। ফলে মোটামুটি ১৫ থেকে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে না।
– আশপাশের গ্রাম বা উপশহর এলাকা থেকেই প্রয়োজনীয় শ্রমিকের বড় অংশের সংস্থান হয়।
– একটি বড় শহর থেকে কারখানা অঞ্চলটি খুব বেশি দূরত্বে নয়। ফলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়েছে।

দেশে নতুন ক’রে যে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গ’ড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হ’চ্ছে সেখানে আবাসনের ব্যাপারটা কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে সেটা জানতে পারিনি এখনো। সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া-শিল্পের জন্য যে অঞ্চলটি গ’ড়ে তোলা হয়েছে সেখানে নানা ধরণের সমস্যা এরই ভেতরে শুরু হয়েছে ব’লে খবরে আসতে শুরু করেছে। উপগ্রহ-চিত্র থেকেই ধরতে পারা যায় যে এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিক পাওয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ার সম্ভাবনা বেশ বেশি।

Hemayetpur Leather Industry Zone 2019
সাভারের হেমায়েতপুর চামড়া শিল্প/কারখানা অঞ্চল – ২০১৯

হেমায়েতপুরের এই জায়গাটাতে আরো কিছু কারখানা আগে থেকে থাকলেও এর আশপাশের আবাসিক এলাকা এতবড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সাপোর্ট দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। আর এই এলাকাতে আগে থেকে বাস ক’রে আসা মানুষগুলো মূলত কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিলো। ট্যানারির কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা দক্ষ শ্রমিকদেরকে এই অঞ্চলের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা করাটা এখন খুবই জরুরি হ’য়ে পড়েছে। তাদের জন্য কী ধরণের আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা যায় সেটা নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা উচিত। আমার মনে হয় না কাজটা খুব সহজ হবে। যদিও মূল-সড়ক থেকে এটা খুব দূরে অবস্থিত নয় তার পরও।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরেরসরাই এবং ফেনীর কিছুটা এলাকা নিয়ে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল গ’ড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে যে পরিমাণ লোক কাজ করবে ব’লে বলা হচ্ছে তার ১০ শতাংশ মানুষও ঐ এলাকার আশেপাশে বাস করে না। তার উপর যারা কাছাকাছি বাস করছে তাদের দক্ষতা  নতুন কারখানাগুলোর জন্য পয়োজনীয় দক্ষতার সমকক্ষও নয়। ফলে এখানে একেবারে নতুন ক’রে আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতেই হবে। তার ধরণ বা প্রকৃতি যে আমাদের দেশের আগের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে ধার করা যাবে তা মনে হয় না। হেমায়েতপুরের ট্যানারি-কারখানা অঞ্চল থেকে এই ধরণের পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। আর সেটা খুব দ্রুতই শুরু করা দরকার ব’লে মনে করি।

সূত্র :
১. https://www.prothomalo.com/economy/article/1608205/%E0%A6%87%E0%A6%A5%E0%A6%BF%E0%A6%93%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%80

বিভাগবিহীন

প্রবচন – ২৬

বিডিনিউজ২৪.কমে প্রকাশিত একটি খবর,
“ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগে ২৬ বছর আগের এক মামলায় বর্তমানে বিলুপ্ত পলিক্যাম ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের পরিচালক আবদুর রবকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।”

এরপরও যদি কেউ মনে করেন যে, আমাদের বিচারবিভাগের কার্যক্রম জনৈক সিনেমা-ভাড় দিলদারকে হার মানাতে পারেনি, তবে বলতেই হবে – তুই বেটা কমিডি-ব্ল্যাঙ্ক।

খবরসূত্র: https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1590501.bdnews

 

 

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০২

২০১২ সালের এক হিসাব মতে (১) ৩২৫ বর্গকিলোমিটারের ঢাকা শহরে প্রতি বর্গ-কিলোমিটারে মোটামুটি ৪৫০০০ জন মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান থেকে ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকার জন-ঘনত্ব বের করা একরকম অসম্ভব। কারণ শহরের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে বিভিন্ন ধরণের সেনানিবাস, দুইটি বিমান-বন্দর, অফিস-পাড়া, আদালত পাড়া, অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি বিভিন্ন ধরণের শিল্প ও বাণিজ্য এলাকা। এই সব এলাকাগুলোতে যারা কাজ করতে যায় তাদের বেশির ভাগই শহরের আবসিক এলাকাতে বসবাস করে। কেউ কেউ হয়তো দিনের কাজ শেষ ক’রে পার্শ্ববর্তী শহর যেমন নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ বা সাভারে চ’লে যায়। প্রতিদিন যত সংখ্যক মানুষ ঢাকা শহরে কাজ করতে আসে তা হিসাবে নিলে ঢাকা শহরের জন-ঘনত্ব আরো বেশি হবে। আবার এই বিবেচনায় বলা যায় জন-ঘনত্ব ব্যাপারটা দিন এবং রাতের সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল।

ঢাকা শহরের কি পরিমাণ জায়গা আবাসিক এলাকা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সেটা বের করা গেলে আবাসিক এলাকার জন-ঘনত্ব বের করা যাবে। অথবা আমরা একটা বিপরীত পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি। আগের পোস্টের উত্তরা ১৩ নাম্বার সেক্টরটি একটু হিসাব ক’রে দেখা যাক। আমরা সেক্টরটির একটি ডায়াগ্রাম বা পরিলেখ তৈরী করেছি। সেখানে বিভিন্ন আকারের মোট ৮৮৪ টি আবাসিক প্লট আছে। প্রতিটি প্লটে ৭ তলা বিল্ডিং এবং প্রতিটি তলাতে একটি ক’রে আবাসিক ইউনিট ধ’রলে মোট ইউনিটের সংখ্যা দাড়ায় ৫৩০৪টি। প্রতিটি ইউনিটে ৪ জন ক’রে মানুষ হিসাব ক’রলে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে মোট বসবাস করছে ২১,২১৬ জন।(যদিও অনেকগুলো প্লটের প্রতিতলায় একের অধিক মহল বা এ্যাপার্টমেন্ট আছে। আমরা হিসাবের সুবিধার জন্য এখানে একটি ক’রে ধ’রে নিয়ে হিসাব করছি। আবার তিনটি শোবার-ঘরের একটি মহলে অনেক ক্ষেত্রেই ৫ জন ক’রে বাস করে ব’লে হিসাব করা হয়।)

Uttara Sector 13 LAYOUT
উত্তরা সেক্টর ১৩ এর লে-আউট পরিলেখ

১৩ নম্বর সেক্টরের তিন দিকের রাস্তার পুরোটা, মাঝের মাঠ এবং পার্ক, ভেতরের সমস্ত রাস্তা এবং উত্তর দিকের বাণিজ্যিক প্লটগুলো সহ মোট জমির পরিমাণ ৫৫৭৪ কাঠা। সেই হিসাবে এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করছে ৬,১২,০৫২.২৯ জন। ছয় লক্ষ বারো হাজার বায়ান্ন জন। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য রকমের বড়।

হাউজিঙের জন্য বাংলাদেশে একটি বিধিমালা আছে। বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি-উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪ নামে। ২০১৫ সালে এই বিধিমালাতে বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই বিধি মোতাবেক বেসরকারী-আবাসন প্রকল্পের প্রতি একরে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ বাস করার অনুমোদন নেই। উপরের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে প্রতি একরে ২৩০.২৮ জন মানুষ বসবাস করছে। অর্থাৎ বিধি মোতাবেক এখানে আরো বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার সুযোগ আছে। সেই সুযোগ নিতে চাইলে প্লটগুলোর লে-আউট যে পাল্টাতে হবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ প্লটগুলোর লে-আউট এমনভাবে করা হয়েছে যেখানে ৭ বা ৮ তলার বেশি উঁচু ভবন বানানো অর্থনৈতিক বিবেচনায় লাভজনক নয়।

এই ধরণের প্লট-কেন্দ্রিক আবাসিক প্রকল্পে মানুষের শরীরের পক্ষে সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকছে না। কিভাবে সেটার ব্যবস্থা করা যায় সেটা নিয়ে শহর পরিকল্পনা আর ভবন পরিকল্পনার সাথে জড়িত পেশাজীবীদেরকে ভাবতে হবে। এই সব ক্ষেত্রের একাডেমিতেও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আর ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ঘন-বসতির শহরগুলোতে বর্তমানের ছোট ছোট কিছু প্লট একত্রিত ক’রে বড় আকারের প্লট তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার বিলম্ব না ক’রেই। কারণ ছোট প্লট সব বিচারেই সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন সুউচ্চ আবাসিক ভবন তৈরী হচ্ছে এবং সে সব ভবন পরিবেশ-বান্ধবও। আমাদের দেশেও সেটার চাহিদা আছে। কারণ পরিবেশ বান্ধব ভবনের বাসিন্দাদের চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে ঢাকার বা চট্টগ্রামের আলো-বাতাসহীন ভবনের বাসিন্দাদের থেকে কম হয়। আবাসিক ভবনগুলো পরিবেশ-বান্ধব হওয়াটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এই ভবনগুলোর ব্যবহারকারী আক্ষরিক অর্থেই সব বয়সের, সব পেশার মানুষ। আর অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক মানুষের আবাসিক ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতে হ’লে ভবনগুলোকে আকাশমুখী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন আমাদের হাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ প্রচুর। কিন্তু উত্তরার সেক্টর-১৩ এর মতো হাউজিং-পরিকল্পনা নানা ভাবে আমাদের হাতে থাকা সমসাময়িক নির্মাণ-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধ’রে এই সব ভবনে বাস করা মানুষের শরীরে বাড়ছে দুরারোগ্য আর স্থায়ী নানা অসুখ। আথচ মানুষের ঘর বা আবাসিক স্থান বানানোর মূলে যে ভাবনাগুলো ছিলো তার একটা হ’লো বেচে থাকার ভাবনা এবং তা সুস্থভাবে।

সুউচ্চ আবাসিক ভবনের সবকিছুই যে আমাদেরকে সুবিধা দেয় তাও নয়। যেমন তার নির্মাণ খরচ আপাতভাবে বেশি। এমন ভবন ডিজাইন এবং নির্মাণ করার মতো দক্ষ লোকেরও ঘাটতি আছে দেশে। এই ধরণের ভবনে বাস করা মানুষগুলোর ভেতরে সামাজিক সম্পর্ক কিভাবে গ’ড়ে উঠবে সে সম্পর্কে আমাদের বোধগম্য ধারণা খুব বেশি নেই, যেহুতু সুউচ্চ আবাসিক ভবনে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি দিনের নয়। আবার এই কিছু দিন আগেও ১০ তলা ভবনকেই আমরা সুউচ্চ ব’লে মনে করতাম। উপরন্তু সুউচ্চ ভবনের ব্যবহারগত (অপারেশন) খরচ বেশি। আবার আমাদের বেশিরভাগই প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে অর্থাৎ গাছপালা আর পশুপাখির সাথে, এমনকি পোষা হ’লেও, থাকতে স‌্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমাদের সাধারণ ধারণায় নেই যে সুউচ্চ ভবনে এগুলোর সবই ব্যবস্থা করা যায়। হয়তো কিছু বছর আগেও যেতো না। কিন্তু এখন যায়। পৃথিবীর নানা দেশেই স্থপতিরা এমনসব সুবিধাসহ আবাসিক ভবন ডিজাইন করছেন। স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশেও এমন কিছু ভবন তৈরী হয়েছে। তবে সেগুলোর খবর আমাদের সবার কাছে পৌছেনি বললেই চলে।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.newgeography.com/content/003004-evolving-urban-form-dhaka

বিভাগবিহীন

আমার আসন্ন-নির্বাচন ভাবনা-২০১৮

যেহেতু সামনে নির্বাচন আসছে, সেটা নিয়ে আমাদের কিছু ভাবনা থাকা দরকার। কিন্তু ভাবতে চাইলেই কি ভাবা যায়? আমি তো পারছি না। মোটামুটি আগামী ৭০/৮০ দিনের মধ্যে হয়তো নির্বাচন হবে। কিন্তু আমরা এখনো জানি না এই নির্বাচনে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের প্রকৃতি কেমন হবে। এমনিতেই আমাদের নির্বাচন-ব্যবস্থাটাতে স্পষ্টতার অভাব আছে। আমরা কখনই জানি না আমাদের প্রধান-মন্ত্রী পদের জন্য কে কে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য যোগ্য ব্যক্তিরা দলীয় মনোনয়নের আওতায় আছেন কিনা তাও নির্বাচনের আগে জানা হয়না আমাদের। অনেকক্ষেত্রে একেবারে শেষ মুহূর্তে জানা যায় স্থানীয় সংসদীয়-আসনে কে বা কারা মনোনয়ন পেয়েছেন।

এই ধরণের একটা প্রাক্টিস দাড়িয়ে গিয়েছে দেশে। আমার কাছে এমন নির্বাচনকে এক ধরণের জুয়া খেলা ব’লে মনে হয়। আমি ভোট দিতে যাওয়ার আগে কী কী বিষয় বিবেচনা করবো তা কখনোই বুঝে উঠতে পারি না। সংসদ-নির্বাচনে প্রতিটা ভোটারকে মোটা দাগে দুইটা বিষয় ভাবতেই হয়, আর তা হলো এলাকার স্বার্থ আর দেশের স্বার্থ। একজন মানুষ যিনি কিনা এলাকার স্বার্থ বেশ ভাল বুঝতে পারেন, তিনি হয়তো দেশের সামগ্রিক স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে নাও অনুধাবন করতে পারেন। মনে রাখা দরকার মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। অতীতের নির্বাচনগুলোত দাড়ানো এবং জিতে আসা মানুষগুলোর ভেতরেও যেমন নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ছিলো, আগামীর নির্বাচনগুলোতে দাড়ানো এবং জিতে আসা মানুষগুলোর ভেতরেও তেমনটা থাকবেই। ভোটার হিসেবে আমাদের কাজ হওয়ার কথা- সময়ের প্রয়োজন-বিবেচনায় এই মানুষগুলোকে নির্বাচন করার সময় আমাদের জানা-শোনা আর বিবেচনাকে ব্যবহার করা, অন্তত আমি এমনটাই বুঝি।

কিন্তু আমার মনে হয় না আমরা ভোটাররা বিবেচনা করার মতো সময় এবং সুযোগ পাচ্ছি। এই দেখি, কোনো রাজনৈতিক দল ঢালাওভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। আমি বুঝি না তারা কেমন তরো রাজনৈতিক দল। আবার এই দেখি, সংসদের সব দলের লোকই সরকারে। তাহ’লে আমার বা আমাদের নির্বাচন করার প্রয়োজনই বা থাকলো কোথায়? হ্যা, আমার বিবেচনার সাথে অনেকের বিবেচনা নাও মিলতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের বিবেচনাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়াটাই তো গণতন্ত্র, যদি না আমার জানাতে ভুল থাকে। আমি পরিষ্কার ক’রে ব’লতে চাই, সব দল মিলে সরকার গঠিত হোক এটা আমি চাই না। আমি/আমরা নির্বাচনের সময় অনেক বিকল্প থেকে একজনকে বা একটা দলকে বেছে নিই বা একজনের উপর আমাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আস্থা রাখি। অনেকগুলো দল মিলে যখন জোট তৈরী করে সেটা আমার বিবেচনায় এক ধরণের রাজনৈতিক প্রতারণা। আমি যে এই ধরণের প্রতারণার শিকার হ’তে চাই না তা দ্বিধাহীনভাবে ব’লতে পারি।

এখন যারা সরকারে আছেন তারা যে পরবর্তী নির্বাচনের প্রচারণার জন্য তাদের উন্নয়ন কার্যক্রমকে হাইলাইট করবেন – সেটা বেশ বোধগম্য। তবে নির্বাচনের সময় আমাদের মতো ভোটারদের মনে যে শুধু এই ভাবনাগুলোই কাজ করে তা কিন্তু নয়। কী কী কাজ হয়েছে তার থেকে আরো কী কী কাজ করা যেতে পারে সেই বিবেচনাটা অনেক বেশি মুখ্য হ’য়ে ওঠে নির্বাচনের আগে আগে। তখন সরকারে থাকা পুরোনো লোকগুলোকে মূল্যায়নের প্রশ্ন চ’লে আসে। আমাদের কোন কোন সংসদ-সদস্য বা মন্ত্রী তাদের দায়িত্ব মোটামুটি সন্তোষজনকভাবে পালন করেছেন আর কে কে করেননি সেটার একটা তালিকা আমাদের মনে ঠিক তৈরী হ’য়ে যায়। অনেকে হয়তো গত ৫ বছরের চাহিদার বিবেচনায় মোটামুটি উতরে গেছেন। কিন্তু আমাদেরকে ভাবতে হবে আগামী ৫ বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কে কে যোগ্য হ’য়ে উঠতে পারেন। নির্বাচন ব্যাপারটাই ভবিষ্যৎ-মুখী।

আমার বারবার ২০০১ সালের নির্বচনের কথা মনে পড়ে। সে নির্বাচনের আগের সরকারের অনেক সাফল্য ছিলো। মোটা দাগে দেশের বেশির ভাগ মানুষ সেটা বুঝেছিলোও ব’লে আমি মনে করি। তবুও সেই সরকার পুনর্নিবাচিত হয়নি কেন সেটা নিয়ে আমি বেশ ভেবেছি। আমি শুধু দুইটা কারণ খুঁজে পাই। প্রথমটা হলো, নির্বাচন নিয়ে এই যে জোট বাধার ব্যাপারটা। আমরা সাধারণ ভোটারা যে প্রতারিত হ’য়েছি সেবছর তা মোট ভোটের হিসাব দেখলেই টের পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয়টি হলো- জয়নাল হাজারী, ডা. ইকবাল এবং শামীম ওসমান। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে তার ব্যর্থ এবং অযোগ্য লোকগুলোকে চিহ্নিত করাটা খুবই প্রয়োজনীয়, যদি তারা আগামী দিনের সরকার গঠন করতে চান। জনৈক শাহজাহান খান নিশ্চিত ভাবেই বর্তমান সরকারের এমন একজন ব্যক্তি যাকে নিয়ে সন্দেহ করা যায়। এই ধরণের ব্যক্তিরা যদি আবারো মনোনয়ন পেয়ে যায় তবে আমাদের মতো সাধারণ ভোটারদের জন্য তা এক ধরণের উপহাস হ’য়ে দাড়ায়। জানি না আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের এমন ভাবনাগুলো ঠিক বুঝতে পারেন কিনা।

সবগুলো রাজনৈতিক দলের কাছেই চাই, তারা যেন তাদের অতীতকে মূল্যায়ন করেন। আর দেশকে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনাগুলো যেন আমাদের কাছে পরিষ্কার ক’রে প্রকাশ করেন। নির্বাচনের আগে আমাদেরও অনেক কিছু ভাবার আছে। সে ভাবনার জন্য যে সময়টুকু দরকার তা যেন আমরা পাই সেটা নিশ্চিত করাটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের ভেতরে পড়ে। আগামী নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ এবং তা প্রকাশ করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাজ-কারবার বেশ হতাশার। আমরা এখনো জানি না আগামী নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ কবে, অথচ এই সংসদের শেষ অধিবেশনও হ’য়ে গিয়েছে। কবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটা যদি যথেষ্ট সময়ের আগে আমরা জানতে না পারি তবে আমাদের পক্ষে সঠিক লোক নির্বাচন করাটা খুব কঠিন হ’য়ে পড়ে।

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০১

আমরা অনেকেই মনে করি মানুষের জন্য বাসস্থান একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে সেটার উল্লেখও আছে। যেহেতু সংবিধান একটি রাষ্ট্রীয় বিষয়, অর্থাৎ রাষ্ট্র থাকলে তার জন্য একটা সংবিধানের দরকার পড়ে, সেহেতু সংবিধানে উল্লেখ থাকা বিষয়গুলোর ব্যাপারে রাষ্ট্রের কিমবা রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু ভূমিকা আছে ব’লে ধ’রে নেওয়া যায়। ভূমিকাটা কেমন হবে সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রকৃতি আর সামর্থের উপর।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে ‘বাজার অর্থনীতি’ বেশ প্রভাব বিস্তার ক’রে আছে। ফলে এখানকার আবাসন প্রকল্পগুলোতেও বাজার অর্থনীতির মূলনীতিগুলো কার্যকর। তার সাথে আছে মানুষের জীবনযাত্রার ধরণের সম্পর্ক। শহুরে-জীবনযাত্রা আর গ্রামীন-জীবনযাত্রার ভেতরে এখানে বিস্তর ব্যবধান আছে। শহুরে-জীবনযাত্রাও কম বৈচিত্রময় নয়। বরং বলা যায়, শহুরে-মানুষের আয়ের সীমাটাতে অনেক কম-বেশি আছে ব’লে তাদের জীবনের প্রয়োজনগুলোর ধরণও নানাবিধ রূপ নিয়েছে। শহরের উচ্চ-আয়ের মানুষের বসতির চাহিদার সাথে এর নিম্ন-আয় আর মধ্য-আয়ের মানুষের চাহিদার হের-ফের অনেক বেশি হওয়াই দুরস্তু। বাজার অর্থনীতি উচ্চ-আয়ের মানুষদেরকে এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা সুবিধাও দেয়। আবার প্রান্তিক মানুষেরা যে একেবারে কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না তা হয়তো বলা যাবে না। তবে তাদেরকে আরো একটু গোছানো ব্যবস্থা দেওয়া গেলে তা সার্বিকভাবে অর্থনীতির জন্য সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

অবশ্য গোছানো ব্যাপারটাই যেন বাংলাদেশে নেই। এদেশে কোনো একটা শহর নেই যাকে গোছানো বা ডিজাইনকৃত বলা যায়। শহরের কোনো কোনো অংশে যদিওবা খানিকটা পরিকল্পনার ছোঁয়া দেখা যায় কিন্তু তা যে সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ নয় তা দ্বিধাহীন ভাবেই বলা যায়। এই ধরণের একটা পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো একটু ডিটেইলে জানা দরকার যদি আমরা আসলেই আমাদের শহরগুলোকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে চাই। বড় দাগে দুটো কারণ সহজেই সনাক্ত করা যায়। প্রথমটা হ’লো দেশে শহরকে নিয়ে পরিকল্পনা করার মতো দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকা, আর দ্বিতীয়টা হ’লো শহর-পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে যে শহরের বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তিতে বাড়তি মূল্য-সংযোজন (ভ্যালু এ্যাড) করা যায় সে ব্যাপারে আমাদের সিংহভাগ নাগরিকের সামগ্রিক ধারণা না থাকা।

বাংলাদেশের প্রায় সব শহরেই জমির দাম বাড়ছে। সবগুলো শহরেই নতুন নতুন অনেক বিল্ডিং তৈরী হচ্ছে। সে যেমন সরকারী উদ্যোগে, আবার বেসরকারী উদ্যোগেও। সরকারী বিল্ডিংগুলো তৈরীর পেছনে রাজনৈতিক ভূমিকা বড্ড বেশি। অনেক সময় হয়তো বাড়তি প্রয়োজন মেটানোর জন্য পুরনো কোনো সরকারী বিল্ডিঙকে বর্ধিত করা হচ্ছে। তাতে শহরে নতুন কাজের সুযোগ বাড়ছে। তার উপর আরবান সুযোগের সহজ-লভ্যতাও দিনদিন মানুষকে শহরের দিকে টেনে আনছে। সাথেসাথে প্রাকৃতিক পরিবর্তন/বিবর্তনের ফলেও বাড়ছে গ্রাম থেকে শহরে আসা অভিবাসীর সংখ্যা। সব মিলিয়ে শহর বড় হচ্ছে যেমন আয়তনে-কলেবরে, একই সাথে জনসংখ্যার বিচারেও। আর শহরের দিকে ধেয়ে আসা এই মানুষের ঢল বাড়িয়ে দিচ্ছে শহরের আবাসন-অবকাঠামোর চাহিদা। চাহিদার ব্যাপারটা আমরা বেশ প্রকটভাবেই বুঝতে পারছি। তবে সেই চাহিদাকে মেটানোর পদ্ধতি নিয়ে আমাদের খাটুনির পরিমাণ একরকম নগন্যই। এর জন্য এর সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের যেমন দায় আছে তেমনি দায় আছে দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের। দেশের মানুষের সামাজিক-সংস্কৃতির ভূমিকা আর সম্পদের প্রকৃতি বুঝে ব্যবস্থা নিতে না পারার অযোগ্যতাও এক্ষেত্রে কম দায়ী নয়।

যেহেতু আমাদের সবগুলো শহর অপরিকল্পিতভাবে (অর্গানিক ওয়ে) গ’ড়ে আর বেড়ে উঠেছে তাই এদের রাস্তার নেটওয়ার্ক খুবই এলোমেলো। ফলে শহরের সার্বিক জমির পরিমাণের অনুপাতে যতটা রাস্তা আছে সেগুলো যতটা কার্যকর হওয়ার কথা তা কখনোই হ’তে পারে না। আঁকাবাকা রাস্তাতে যাতায়াতকে চাইলেও খুব একটা গতিশীলও করা যায় না। আবার পারিবারিক সদস্যদের প্রতি আস্থাহীনতা আর অবিশ্বাসের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ’রে আমরা আমাদের জমিগুলোকে খণ্ডিত ক’রে চ’লেছি। তাতে যেমন আমাদের জমিগুলোর আকার দিনদিন ছোট হ’চ্ছে, সেই সাথে তাদের চেহারা হ’য়ে প’ড়ছে এলোমেলো। ফলে আমাদের শহরের জমিগুলোর সম্ভবনা যাচ্ছে কমে। তাতে নির্মাণ খরচও যাচ্ছে বেড়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মালিকানার জমিগুলো আমাদের আবাসনের ন্যুনতম চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা হারাচ্ছে। তাতে জমিগুলোর প্রকৃত মূল্যমান তো কমে যাচ্ছেই, বাড়তি মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা আর থাকছে না বললেই চলে।

ঐতিহাসিকভাবেই বঙ্গেয় ব-দ্বীপটাতে জন-মানুষের ঘনত্ব বেশি ছিলো। ১৯৭১ এর পর থেকে সেই ঘনত্ব-বৃদ্ধির হার আরো বেড়েছে। বলা হয় ১৯৯১ এর পর তা আরো দ্রুততর হ’তে থাকে। তার প্রভাব প’ড়তে শুরু ক’রেছে আমাদের বেশির ভাগ শহরেই। শহরগুলো বাড়ছে তাই। এই বৃদ্ধিটা যতটা উর্ধ্বমুখি/আকাশমুখি হওয়া দরকার ছিলো ততটা যে হয়নি তা বলাই যায়। ঢাকা আর চট্টগ্রাম শহরের অনেকগুলো জায়গাতে আমরা মোটামুটি ১০ তলা আবাসিক বিল্ডিঙে আভ্যস্ত হ’য়ে উঠছি। কোথাও কোথাও বা ১৪/১৫ তলা। কিন্তু তার উপরে আর যাওয়া হচ্ছে না। যাওয়া যে হচ্ছে না বা যাওয়া যে যাচ্ছে না তার একটা বড় কারণ পরিকল্পনাহীনতা। ঘন-বসতিপূর্ণ শহরগুলোতে আবাসনের জন্য আরো উপরে ওঠার ব্যবস্থা যদি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান কোনো উপায়ে না করা যায় তবে শহর আনুভূমিক ভাবেই বাড়তে থাকবে। আর কমতে থাকবে শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিমাণ। মানুষ শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক প্রাণীই। বেঁচে থাকার জন্য অনেকগুলো প্রাকৃতিক উপাদান তার লাগবেই। আর তাই আজকের দিনে বড্ড বেশি প্রয়োজন হ’য়ে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে শহর গ’ড়ে তোলা। সেই শহরকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই এবং চলনসই করতে হ’লে তাতে অধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আর তার আর্থিক ব্যবস্থাপনার দিকটা নিয়ে আমাদের নতুন ক’রে না ভাবলেই নয়।

আমাদের জমিগুলোর মূল্যমান কিভাবে নির্ধারিত হচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবা দরকার। কিভাবে তার ব্যবহার উপযোগীতা বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। আর ব্যবহার উপযোগীতা বাড়াতে না পারলে তার সম্পদ-মূল্য আসলে বাড়বে না। অনুপযোগী বা অব্যবহৃত সম্পদ আর্থিক-বিবেচনায় মূল্যহীন। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন, শহরের কোনো একটা জায়গাতে হয়তো একটা জমি আছে অথচ সেখানে যাওযা যায় না; সেই জমির আসলে কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। আবার একই পরিমাণ জমিতে যদি ১০’ বা ২০’ বা ৩০’ বা ১০০’ প্রশস্ততার রাস্তা থাকে তাহলে তার মূল্য নির্ধারণ হয় আলাদাভাবে। অর্থাৎ জমির ব্যবহার উপযোগীতা আর যোগাযোগ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা আমাদের জমির মূল্যমান বাড়িয়ে ফেলতে পারি। এই কাজটাই যদি শহরের বেশিরভাগ জমির ক্ষেত্রে করা যায় তাহ’লে শহরকেই আমরা বাড়তি গুরুত্বপূর্ণ ক’রে তুলতে পারি। আর যে দেশে যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ শহর থাকে সেই দেশ তত সম্পদশালী হ’তে থাকে। আমরা আমাদের বাংলাদেশকে শুধুমাত্র কিছু সুচিন্তিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরো অনেকবেশি সমৃদ্ধশালী ক’রে তুলতে পারি। আর এই পরিকল্পনাগুলো শুরু করা যেতে পারে আমাদের আবাসন প্রকল্পগুলো থেকেই।

আমাদের পুরোনো আবাসিক প্রকল্পগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া দরকার। সেখানে কোন কোন ব্যাপারগুলো আমাদের জন্য সহায়ক হয়েছে, কোনগুলো হয়নি তা চিহ্নিত করা দরকার। শুরু করা যেতে পারে ছোট ছোট কোনো এলাকা ধ’রে। ছোট কোনো শহরকে নিয়েও। শুরু করছি আপাতত উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টর দিয়ে। নিচের ছবিটি গুগল-আর্থ থেকে ২৩-১০-২০১৮ তারিখে নেওয়া।

উত্তরা সেক্টর ১৩
ঢাকার উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর- গুগল আর্থ থেকে নেওয়া

পুরো সেক্টরটির চারপাশ দিয়ে ১০০’ এর অধিক প্রশস্ততার রাস্তা আছে। ভেতরের রাস্তাগুলো ২৫ থেকে ৩০ ফুট ক’রে প্রশস্ত। বেশিরভাগ প্লটের আকার ৩ কাঠার। সেই প্লটগুলোতেই এখনকার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি। তার আগে কোনো একটা চাঙ্ক একটু ব্লো-আপ ক’রে দেখে নিই-

উত্তরা সেক্টর ১৩-২
উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি ব্লক বা চাঙ্ক

মাঝ খানের হাউজিং চাঙ্কটিতে মোট ৪২টি প্লট আছে। ৫ টি প্লটে এখনো নির্মাণকাজ শেষ করা হয়নি। তারপরও এটা থেকে মোটামুটি বোঝা যায় বেশিরভাগ বিল্ডিংই ৬ কিমবা ৭ তলা বিশিষ্ট। আর বিল্ডিংগুলো অনেকটাই গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিটি বিল্ডিঙের জন্য ন্যুনতম যতটুকু সেট-ব্যাক জায়গা নির্ধারণ ক’রে দিয়েছিলো তা এখানে মানা হয়নি বললেই চলে। এটা থেকে প্রকল্পের পরিকল্পনার দীনতা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আর যেটা বোঝা যায় তা হ’লো, ইমারত-বিধি না মানার ব্যাপারে আমাদের আপাত পরিকল্পিত-এলাকার প্লটের মালিকদের মধ্যে এক ধরণের ঐক্যমত্য আছে। অথবা এই এলাকার ইমারত-চাহিদার সাথে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া বিধির পরিস্কার বিরোধ রয়েছে। আর অবশ্য অবশ্যই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা প্রকটভাবে প্রকাশ হ’য়ে পড়ছে।

এবার একটু পরিকল্পনাগত দিকে নজর দিই। এই ধরণের ৩ কাঠা জমির মাপ ৩৬’ গুণন ৬০’ হ’য়ে থাকে। ৩০’ প্রশস্ত একটি রাস্তা দুই পাশের মোট ৪২টি প্লটকে সার্ভিস দিচ্ছে। আবাসিক-জমি এবং সংলগ্ন-রাস্তার জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণের অনুপাত ৪:১। আপাতত সেই রাস্তার সাথে সংযুক্ত বড় রাস্তাকে বিবেচনার বাইরে রাখছি। এই হিসাবে একটা চাঙ্কের মোট এরিয়ার শতকরা ২০ ভাগ রাস্তা। এই ধরণের একটি চাঙ্কের আবাসিক  বিল্ডিংগুলোর ভেতরে কার্যত কোনো সামাজিক যোগাযোগ নেই। এটি পরিকল্পনার একটি ভয়াবহ ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা। দ্বিতীয়ত এই ধরণের প্লট-কেন্দ্রিক পরিকল্পার ফল স্বরূপ বিল্ডিঙের উচ্চতা সীমাবদ্ধ হ’য়ে পড়েছে। এই ধরণের প্লটে ৭ তলার উপরে বিল্ডিং বানানো প্রকৌশল আর আর্থিক দুই বিচারেই সুবিধাজনক নয়। চাহিদা আর মূল্যের টানাটানি, কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি না থাকা, ভূমিমালিকদের সম্পদ-পরিকল্পনার অদক্ষতা ইত্যাদি নানা কারণে এটি যথেষ্ট বাসযোগ্যও থাকছে না।

এরকম ২০টি চাঙ্ক বা ব্লকের সাথে ২টি বিশেষ চাঙ্ক মিলে গঠিত হ’য়েছে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরটি। সেক্টরটির মাঝখানে একটি পার্ক এবং একটি খেলার মাঠ আছে, যা কিনা এই সেক্টরটিকে বিশেষ সুবিধাভোগী ক’রেছে। যেমন পাশের ১৪ নম্বর সেক্টরেই এমন ধরণের কোনো সুবিধা নেই। আর সেখানকার চাঙ্কগুলোও এমন ধরণের লম্বাটে প্যাটার্নের (লিনিয়ার টাইপ)। যে কারণে একটা চাঙ্ক থেকে আর একটা চাঙ্কে হেঁটে যেতে হ’লে বেশ খানিকটা বাড়তি দূরত্ব পেরুতে হয়। এটা থেকে বোঝা যায় প্রকল্পটি পরিকল্পনার সময় প্রকল্পটির ভেতরে পায়ে হাঁটার ব্যাপারটা বিবেচনা করা হয়নি। আরো একটা সূক্ষ্ন বিষয় আছে। সেটা হ’লো, ২০০৮ এর বিধিমালা অনুযায়ী এখানে ৭ তলা বা তারো বেশি উঁচু বিল্ডিং বানানোর অনুমতি দেয়া যায়। অথচ এখানকার ৩ কাঠার প্লটে নিয়ম মেনে ৫টির বেশি পার্কিঙের ব্যবস্থা করা যায় না। আর এই ধরণের একটা ব্যবস্থা ভূমিমালিকদেরকে বিধির বাইরে গিয়ে ইমারত বর্ধিত ক’রতে প্ররোচিত করছে।

নিচের ছবিটি চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকার। এখানেও মোটামুটিভাবে উত্তরার প্যাটার্নটিই অনুসরণ করা হয়েছে। উত্তরার ক্ষেত্রে সবগুলো প্লটের জন্য একই ধরণের অরিয়েন্টেশন বা অভিমুখ (মূলত উত্তর-দক্ষিণ মুখী) বজায় রাখার চেষ্টা আছে। চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকার জন্য সেই অর্থে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিমুখ নেই প্লটগুলোর জন্য। উপর থেকে দেখা গুগল-আর্থের এই ছবি থেকে মনে হ’তেই পারে যে সর্বোচ্চ ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার জন্য এমনটা করা হয়েছে। চট্টগ্রামে বাতাসের গতিমুখ ঠিক দেশের বেশির ভাগ এলাকার মতো দক্ষিণা-প্রকৃতির নয়। ফলে এখানকার বিল্ডিংগুলোর অভিমুখ নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করার অবকাশ আছে। সুগন্ধা আবাসিক এলাকার এই পরিলেখ থেকে আর যেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয়না তা হলো, এই নগরীর অধিবাসীদের কিমবা ডিভেলপারদের আর অবশ্যই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক খালগুলোর প্রতি কোনো ধরণের আগ্রহ নেই। প্রাকৃতিক খালগুলোর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে তারা সবাই যেন অক্ষম।

Shughandha Residential Area. Chattogram
চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকা- গুগল আর্থ থেকে

মোটামুটিভাবে দেশে এই ধরণের একটা প্রটোটাইপ দাড়িয়ে গিয়েছে হাউজিঙের পরিকল্পনাতে। বেসরকারী উদ্যোগেও যেসব হাউজিং হচ্ছে গত দুই/তিন দশক ধ’রে তা খানিকটা এই ধরণেরই। এই ধরণটা আমাদের আবাসন ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ ক’রে ফেলেছে নানা ভাবে। বিল্ডিঙের উচ্চতা বাড়ানো যাচ্ছে না, ফলে সম্পদের মূল্যমান বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রাকৃতিক পরিবেশ নাজুক হ’য়ে প’ড়ছে। আবাসন প্রকল্পে দীর্ঘদিন বাস ক’রেও এখানকার মানুষদের ভেতর কমিউনিটি গ’ড়ে উঠছে না। অথচ আবাসন পরিকল্পনার প্রধান একটা চাহিদাই হ’লো তাতে ভালো একটি কমিউনিটি গ’ড়ে তোলা।