বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ২০

বিগত বছরের শেষ দিকে তার সাথে হ’য়েছিলো দেখা
পথের প্রান্তে অবেলার অচেনা আলোকে আচমকা…
তারপর কিছুদিন বাস্তবতা, স্বাভাবিক প্রত্যাশাহীনতা।
কোনো এক শরতের গোধূলির রহস্য মুখে মেখে
আবার সে এসেছিলো একবার আমাদের চেনা মেঠোপথে
জোনাকির ভীড়ে তাদেরই দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো নিমেষমাত্র!
অথচ জীবন ডেকেছিলো আমাদেরকে অন্যত্র-
হৃদয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও আমরা ফিরে এসেছি সেদিন
যে যার জীবনে… সে সব স্মৃতি আজ বড্ড প্রাচীন,
তবুও মন প্রতারক, হৃদয় হৃদয়-হন্তারক !

Sponsored Post Learn from the experts: Create a successful blog with our brand new courseThe WordPress.com Blog

WordPress.com is excited to announce our newest offering: a course just for beginning bloggers where you’ll learn everything you need to know about blogging from the most trusted experts in the industry. We have helped millions of blogs get up and running, we know what works, and we want you to to know everything we know. This course provides all the fundamental skills and inspiration you need to get your blog started, an interactive community forum, and content updated annually.

কি কথা যায় বলা তাকে

কি কথা যায় বলা তাকে!
যে আসে মুহূর্তের ঝড়ের মতোন চারপাশে নামিয়ে অদ্ভুত আঁধার,
কিংবা হঠাৎ প্লাবনের মতো ভাসিয়ে আদিগন্ত চরাচর-
জানে কি তা প্রাচীন শিলাবাসী কোনো জীবাশ্ব?
কেমন ক’রে তারে করা যায় প্রতিস্পর্শ!
প্রথম আবেগে ছুঁয়ে দিয়ে যে অবশ ক’রে দেয় শরীর,
তার নরম পালকের মতো হাতে যদি লাগে আমার নখের আচড়!
তারে কেমন ক’রে বুকের কাছে টানি?
কেমন ক’রে ব’লি তারে, এই নাও আমার হুদয়খানি-
তোমারই আগমনের ব্যাকুলতায় আমার কেটেছে সমস্ত অতীত?
তারে কি বলা যায় হঠাৎ-
বিগত ঝড়ের ঝঞ্ঝায় এখনো যেটুকু টিকে আছে সঞ্চয়-
তাতে বড় অনিশ্চিত আগামী। মনে নিত্য ভয়-
সংশয় হারাবার নিজেকেই নিজের কাছ থেকে,
যাকে তিলেতিলে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে বিগত মারীতে, শোকে;
খড়কুটোর সাথে ভেসে পেরুতে হয়েছে কতগুলো জলোচ্ছ্বাস,
রুক্ষ জীবনের স্মৃতি কেড়ে নিয়েছে যার সবটুকু বিশ্বাস…
তার সবটা অনুভূতির কথা কি জানানো যায় তারে,
যে আসে শুধু ক্ষণিকের তরে?
বাকিটা জীবনের সমান পরিমাণ সময় নিয়ে হাতে
কেউ কি আসে কখনো হৃদয়ের সমস্তটা নিয়ে আদর নিতে- দিতে?
ইত্যবসরে কতটা গল্প যায় করা তাকে?

নগরী ঢাকা ১০

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া আজকের দিনের বড়সড় কোনো নগরীকেই আর বেশি দিন টিকিয়ে রাখা (সাস্টেইনেবল) বা নিদেনপক্ষে কার্যকর রাখা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন আর তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার এক নগর থেকে আর এক নগরের মাঝে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য, দরকার নগরের অভ্যন্তরে নাগরিকদের এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য দরকার নগরীর জ্বালানী (এ্যানার্জি) চাহিদা মেটানোর জন্য। নগরে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য। নাগরিকদের প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার জন্য। এমনকি এখনকার শহরগুলোর পার্ক, জলাশয় বা প্রাকৃতিক পরিবেশও প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল-পার্ক কিমবা ঢাকার হাতির-ঝিলের কথা বলা যায়। কারণ এই জায়গাগুলোর স্বাভাবিক বাস্তু-সংস্থান (ইকো-সিস্টেম) অনেক আগেই বিঘ্নিত ক’রে ফেলা হয়েছে, কিমবা এই জায়গাগুলোকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই প্রাকৃতিক ভাবে জায়গাগুলো সেরকম নয়।

কিন্তু আধুনিক কালের প্রযুক্তি ব্যাপারটা যেন প্রেমিকার হৃদয়াবেগের থেকেও বেশি দ্রুত পরিবর্তনশীল। মান্ধাত্তার আমলের প্রযুক্তি ঠিক কতটা উপযোগী ছিলো জানি না। তবে সেসব প্রাযুক্তিক উপকরণগুলো বহুদিন টিকতো ব’লে একধরণের প্রচার আছে। টিকে থাকাটাই সাস্টেইন করা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে সূক্ষ্ণ (সফিস্টিকেটেড অর্থে) প্রযুক্তি-পণ্য বা আয়ুধ (টুল) দীর্ঘস্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। ফলে এই ধরণের পণ্যগুলো দ্রুত বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের উৎসে পরিণত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের তাই বেশ কিছু হ্যাপাও আছে। পরিত্যক্ত প্রযুক্তির ভার বহনের ক্ষমতাও আজকের দিনের শহরগুলোর তাই না থাকলেই নয়, অন্তত খানিকটা হলেও। সেক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার-প্রযুক্তি সহায়ক হ’তে পারে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের আর একটা বড়সড় জটিলতা হ’লো এটা চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, তা কিনে ফেলার পরও। (এটা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন আমার বাবা যিনি এখনো মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারেন না।) প্রযুক্তি-পণ্য ব্যবহারের জন্য অনেক সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। আবার দক্ষতাও এমন একটা জিনিস যা সবাইকে সমান ভাবে ধরা দেয় না। তবে আজকের দিনের শহরকে মোটামুটি কর্মক্ষম রাখার জন্য যে প্রযুক্তিগুলোর দরকার পড়ে তার ব্যবহার-প্রণালী শহরের সব নাগরিকের না জানলেও চলে। কিন্তু যাদেরকে এই ব্যাপারগুলো জানতেই হবে তাদের সংখ্যা আর দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শহরে গ’ড়ে তুলতে হয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বা ইনিস্টিটিউট।

এই একুশ শতকের কোনো একটা শহর বা নগরে যে পরিমাণ মানুষ গাদাগাদি হ’য়ে বসবাস করে প্রাকৃতিক (অর্গানিক অর্থে) ভাবে সেভাবে বসবাস করা যায় না। বিলেতিরা যখন ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশ ছেড়ে চ’লে গেলো তখন এই দেশের মানুষের গড় আয়ু ২৭/২৮ বছরের কাছাকাছি ছিলো। যদিও নারীপ্রতি সন্তান নেওয়ার হার এখনকার থেকে কয়েকগুণ বেশি ছিলো, তবুও দেশের মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিলো বেশ কম। তার একটা বড় কারণ এই নিম্ন গড় আয়ুর ব্যাপারটা। আবার প্রেক্ষিত আয়ুস্কাল কম থাকায় মানুষজনকে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরী আর বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্নে কম বয়সে সংসার শুরু করা ছাড়া বিকল্প ছিলো না, যার সামাজিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশ আর ঢাকার মানুষের গড় আয়ু বেশ বেড়েছে। ঢাকার জন-ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে এর নাগরিকদের আয়ুস্কাল বৃদ্ধির বড় ভূমিকা আছে। আবার নাগরিকদের এই আয়ুস্কাল বৃদ্ধিতে শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানের দারুন কিছু কার্যক্রমের ভূমিকাও আছে। অদ্ভুত ভাবে ঢাকাতে এখন নারী-প্রতি সন্তান নেওয়ার হার দেশের সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি।

মোটাদাগে ব’লতে গেলে কারখানা বিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন) পর থেকে শহরের অবকাঠামো খাতে নানা ধরণের পরিবর্তন আনা গেছে ব’লেই আজকের দিনের শহরগুলোতে এতএত মানুষ এতটা ঘনবসতিতেও বেঁচে থেকে বসবাস করতে পারছে। আর সেই পরিবর্তনগুলো সম্ভব হয়েছিলো নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিস্কার আর তার ব্যববহার নিশ্চিত করতে পারার কারণেই। এক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে বিশ শতক পরবর্তী শহরের কাঠামোতে। নাগরিক জীবনে তো বটেই।

অর্থাৎ নগরীকে কার্যক্ষম রাখার জন্য আজকের দিনে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। আর সেই প্রযুক্তিকে সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন যথাযত প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। সিটি-কর্পোরেশন, ওয়াসা, পানি-উন্নয়ন বোর্ড, ডেসা, ডেসকো, পল্লী-বিদ্যুৎ, রাজউক, কেডিএ, সিডিএ, সিভিল-এ্যাভিয়েশন, মেট্রো সার্ভিস, সড়ক কর্পোরেশন ইত্যাকার নানা প্রতিষ্ঠান। আবার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করবে যে মানুষগুলো তাদের দক্ষতা তৈরীর জন্য প্রয়োজন নানা ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। এ এক বিপুল যজ্ঞ।

আজকের ঢাকা নগরীর জন্ম ১৯৪৭ এর আগে নয়, বাস্তবতার নিরিখে। ১৯৪৭ সালের পরে নানা স্থান থেকে যেভাবে ঢাকাতে মানুষ জড়ো হ’তে শুরু করে তার কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি ঢাকার ছিলো না, প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায়। ফলে ঢাকার বিভিন্ন বসতি কেন্দ্রগুলো বর্ধিত গ্রাম বা নিদেনপক্ষে ছোট শহরের চরিত্র নিয়ে বড় হ’তে থাকে পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত। বাজার, বিদ্যালয়, মসজিদ-মাদ্রাসা আর কিছু রাস্তাঘাট ছাড়া আর কোনো নাগরিক সুবিধা এইসব কেন্দ্রগুলোতে অনেক দিন পর্যন্ত গ’ড়ে ওঠেনি ব’ললেই চলে। এমন একটা শহরেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন মানুষের আগমন ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। কেন যে যায়নি তা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো (বিশ্ববিদ্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) খুব বেশি সমীক্ষাও হয়তো করেনি, অন্তত সাধারণের কাছে প্রকাশ যে করেনি তা বলা যায়। আর করেনি ব’লেই এই নগরীতে মানুষের আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি ব’লেই শহরের অনেক অবকাঠামো নিয়ে ন্যুনতম পরিকল্পনাও সাজানো যায়নি। জানি না দক্ষ মানুষের অভাব ছিলো কিনা। তবে নাগরিকদের ভেতরে এই শহরকে গ’ড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি ছিলো প্রকট। এখনো যে নেই তাও বলা যাবে না।

আশার কথা এই যে ঢাকার কাছে এর নাগরিকদের চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে যে কিছুকিছু সুবিধা বা সার্ভিস যদি গ’ড়ে তোলা না যায় তবে এই শহরের বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো এটা বুঝতে শুরু করেছে তাদের কাছে দুইটার বেশি বিকল্প আছে ব’লে মনে হয় না। হয় এই শহরের অনেকগুলো বর্তমান-সুবিধাকে উন্নত করতে হবে, কিছুকিছু নতুন ক’রে গ’ড়তেও হবে অথবা এই শহর থেকে পালাতে হবে। আমার চেনাজানা অনেকেই যে পালিয়ে গেছেন তা ব’লতে দ্বিধা নেই। আবার অনেককে দেখেছি উন্নত কোনো নগরের উন্নত কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন দক্ষতা শিখে এসেছেন। এখন চেষ্টা করছেন সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে সাহায্য করা যায় কিনা।

কিন্তু বুনিয়াদি একটা নগরকে আগামীর জন্য গ’ড়ে উঠতে সাহায্য করাটাও সহজ নয়। তাতে অনেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান/প্রথা/নায়কদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হয়। কিছু দিন আগে দেখলাম স্থপতি মোহম্মদ মাসুম ঢাকার শিশু-পার্কের পরিলেখ নিয়ে দারুন একটা প্রশ্ন করেছেন। শাহবাগের শিশু-পার্কটি যে জায়গাতে গ’ড়ে তোলা হ’য়েছে সেখানেই ছিলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মঞ্চ। যে স্থপতি শিশুপার্কের পরিলেখটি তৈরী করেছেন তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য-শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোধা ব্যক্তিদের একজন। অথচ তিনি তার করা সেই পরিলেখে ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চিহ্ন (সিম্বল) কে একদম এড়িয়ে গেছেন। এটা সচেতন ভাবে করা কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন। যদি সচেতন ভাবে করা হ’য়ে থাকে তবে তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন কিনা। আর যদি সচেতন ভাবে না করে থাকেন তবে শিক্ষক বা মেন্টর হিসেবে তার ভূমিকাকে যতটা সম্মান করা হয় ততটা সম্মান তার প্রাপ্য কিনা।

কখনো কখনো একজন মানুষও প্রতিষ্ঠান হ’য়ে উঠতে পারেন। শহরই তাদেরকে সেই সুযোগ ক’রে দেয়। কিন্তু তেমন প্রতিষ্ঠানকেও প্রশ্ন করতে হবে নির্দ্বিধায় যদি সামনের দিকে আগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে। সম্প্রতি অনেকগুলো পত্রিকাকে দেখলাম ঢাকা-ওয়াসার গত এক যুগ/দশকের কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরণের প্রতিবেদন ছাপাতে। ঢাকার নাগরিকেরা তথা সরকার এই সময়কালে এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে কম খরচ করেনি। অথচ সেই অনুপাতে শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থার উন্নতি খুবই হতাশার। অবশ্যই এখানে দায় আছে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মানুষগুলোর। কিন্তু সাথে এই প্রশ্নও তুলতে হবে কেন আমরা ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তুলতে পারছি না। কি কি কাজ করলে তেমনটা করা সম্ভব হবে।

এই কাজগুলোর একটা নিশ্চিত ক’রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। শুধু নালা বা ড্রেন তৈরী আর মাঝেমাঝে সেগুলোকে সংস্কার করে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আর করা যাবে না। তার একটা বড় কারণ ঢাকার পুকুর আর জলাধারগুলোর পরিমাণ অনেক কমে যাওয়া। পুরোনো খালগুলো দখল বা সংকীর্ণ হ’য়ে যাওয়া। তার উপর ঢাকাতে আচ্ছাদিত স্থানের পরিমাণ গিয়েছে বেড়ে। ফলে বৃষ্টির পানি শোষণ করার মতো উন্মুক্ত জমিও গিয়েছে কমে। এই কারণে নালার উপর বাড়ছে অতিরিক্ত পানির চাপ। আবার নালার আয়তন বাড়ানোর উপায়ও একরকম নেই বললেই চলে। একারণেই প্রযুক্তির প্রসঙ্গ চ’লে আসছে। যান্ত্রিক পাম্প ব্যবহার ক’রে দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্প বসানোও হয়েছে। তবে সেগুলোকে সর্বোক্ষণ কর্মক্ষম রাখার মতো দক্ষ লোকবল রাখা হ’য়েছে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয় যান্ত্রিক পাম্পের ধারণক্ষমতা, যতটা পানি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃষ্টির ফলে জমে ততটা পানি কাঙ্ক্ষিত সময়ের ভেতরে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাম্পগুলোর আছে কিনা। দুঃখজনক ভাবে সবক্ষেত্রে শুধু পাম্প বা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান করা যাবে না। কখনো কখনো রিটেনশন পুকুরের দরকার প’ড়তে পারে। যেটা নিশ্চিত করতে শহর নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা করাটা খুবই দরকারী। যেটা করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান।

নিশ্চিত ভাবেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংকট আছে বাংলাদেশে। কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রামের মতো দ্রুত-বর্ধনশীল দুইটা বড়সড় নগরী থাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ঠিকই আছে। এই দুইটা নগর যদি কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরীতে এগিয়ে আসতে পারে তবে তা উপকারী হ’তে পারে দেশের মাঝারি মানের অন্য শহরগুলোর জন্যও।

এবার আসি যাতায়াত ব্যবস্থাতে প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। এখনো পুরান-ঢাকাতে ঘোড়ায়-টানা গাড়ি চ’লতে দেখা যায়। এটাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার আছে বটে, তবে সে প্রযুক্তি এর ভেতরেই প্রাচীন হ’য়ে গেছে। নগরের চৌহদ্দিও বেড়েছে। তাই সাইকেল-রিকশা আর ঘোড়ায়-টানা গাড়ির মতো বাহন দিয়ে আর কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই বাহনগুলো যে গন-পরিবহন হিসেবে শহরের কিছুকিছু এলাকাতে এখনো দারুন ভাবে কার্যকর সেটা খেয়াল রাখা দরকার। এই বাহনগুলোকে যান্ত্রিক বাহন দিয়ে প্রতিস্থাপনের সময় এসেছে। শুধুমাত্র সময়ের প্রভাবেই এরা প্রতিস্থাপিত হ’য়ে যাবে এটা ভাবা বোকামি হবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনি দিকনির্দেশনা। প্রয়োজন সার্বিক পরিকল্পিত প্রস্তুতি।

১৯৩৬ কিমবা ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে প্রথম সাইকেল-রিকশা আনা হয়। এর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ আমরা তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনিনি। মাত্র কয়েক বছর হ’লো তাতে যান্ত্রিক মোটর যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেও চীন থেকে আনা কিছু ব্যাটারি-পাওয়ারড রিকশা রাস্তাতে চ’লতে শুরু করার পর থেকে। আইনে বৈদ্যুতিন বাহনের অনুমতি এখনো নেই বিধায় এই রিকশাগুলোকে এখনো অননুমদিতই থাকতে হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যাতায়াত ব্যবস্থা বৈদ্যুতিন হওয়ার দিকেই আগাচ্ছে। সাধারণত শুরুতেই কোনো বিষয়ের আইনি কাঠামোটা দাড় করিয়ে নিতে পারলে তার প্রযুক্তি আত্মিকরণে তা সহায়ক হয়।

ঢাকার জন্য যে একটা কার্যকর মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা দরকার সেটা এর নাগরিকেরা বহুদিন ধরেই টের পাচ্ছেন। দেরীতে হ’লেও কিছু কাজ শুরু হ’য়েছে। কিন্তু এর সমস্ত প্রযুক্তিই আমাদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সমস্ত ডিজাইন করিয়ে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। যেহেতু এমন প্রযুক্তি আমাদের নিজেদের আবিস্কার করা নয় সেহেতু শুরুতে আমদানি করা ছাড়া উপায়ও নেই খুব একটা। তবে দীর্ঘ-মেয়াদে চিন্তা করলে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসা সম্ভব ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতরেই। শুরু করা যেতে পারে কোচগুলোর নির্মাণ দিয়ে। ধীরে ধীরে অন্য ব্যাপারগুলোও। সেটা লাভজনক না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কারণ চাহিদা বাড়ছেই। আর এটা শুধু ঢাকাতেই আটকে থাকবে না। অন্য বড় শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। আর যেহেতু এটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় সেহেতু এটাকে কেন্দ্র ক’রে অনেক ধরণের প্রতিষ্ঠানই দাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও লাভবান হ’তে পারে এ থেকে।

টীকা:
১. রিটেনশন পুকুরের বাংলা হিসেবে ধারক-পুকুর লিখতে পারতাম হয়তো। রিটেনশন-পুকুর যেহেতু পানি শোষণ আর ধারণ একই সাথে করে তাই শুধু ধারক-পুকুরে সন্তুষ্ট হ’তে পারিনি। শোষণ আর ধারণকে যুক্ত ক’রে কোনো শব্দ বানাতে পারলে বোধ হয় ভালো হ’তো।
২. মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট : দ্রুত আর বহুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। জানি না কিভাবে ছোট ক’রে আনা যায়।
৩. ডিজাইন শব্দটাকে এখন আর নকশা-প্রণয়ন বলার পক্ষপাতি নই আমি। এটাকে চেয়ারের মতো গৃহীত বিদেশী শব্দ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
৪. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৪
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57828


বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৯

হয়তো একদিন আমিও ঝিনুক হবো
শক্ত খোলসে লুকিয়ে রাখবো কষ্টে বোনা মুক্তো আমার
অন্তত কিছু দিনের জন্য হ’লেও
তোমাদেরকে পুড়তে হবে তারে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণায়
আমি হয়তো হরিয়ে যাবো কোনো একদিন
মারিয়ানা ট্রান্সের গভীরতম গহ্বরে
আমাকে চূর্ণ করবে অথৈ জলের শক্তি
তখন হয়তো হবো আমি শুধু মুক্তোর স্মৃতি…

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৮

আমাকে ভালোবেসেছিলো আকাশ, নিলীমা
আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলো ভাঙনপ্রিয় যমুনার তীর
একবার এক নিঃস্ব যুবক নৌকো বেয়ে এসেছিলো সেখানে
শুনিয়েছিলো নদীর কাছে তার সব হারানোর গল্প
আর গল্প শেষে আমাকে নিয়েছিলো টেনে তার বুকে
আমি সেখানে তন্নতন্ন ক’রে খুঁজেছি হারানো ভালোবাসা
মুহূর্তে মনেও হয়েছিলো পেয়েছি বুঝি –
কিন্তু যার কাছে যা নেই তা সে দেবে কেমন ক’রে!
কেমন ক’রে বুঝি সে পারে দিতে শুধু ক্ষণিকের সঙ্গ?
তার বৈঠায় প্রতিনিয়ত জোয়ারে ভাসার আকাঙ্ক্ষা
আর আমার আলিঙ্গনে তাকে বেঁধে রাখার ছলনা।
পালিয়ে গিয়ে হয়তো জীবন পেয়েছিলো সে-
কেঁদে পার করেছিলাম পুরো একটা দুপুর সেদিন
সে রাতেই আবার ভাঙতে শুরু করে পাড়
তল্পিতল্পা দ্রুত গুছিয়ে পাড়-ভাঙা মানুষের মিছিলে আবার
সেখানে আমার হাত ধ’রেছিলো এক স্বাবলম্বী পুরুষ
পোড়খাওয়া মধ্যবয়স্ক এক নিঃসঙ্গ প্রাণ
আমাকে সুখেই রেখেছিলো সে সংসারে…
একবার তবু অদ্ভুত গোধূলি আকাশ, নিলীমা নয় রক্তিম
কি এক অবুঝ নিয়মে আমারে ক’রে তোলে উতলা অন্তিম!

নগরী ঢাকা-৯

ইউএন হ্যাবিটেট বা জাতিসংঘ বসতি টেকসই প্রতিবেশ পরিকল্পনার (sustainable neighbourhood planning) উদ্দেশ্যে নতুন যে কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে সেখানে নিচের পাঁচটি নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ঘোষণা করছে-

১. রাস্তা আর রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা : রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ থাকা দরকার। সেই সাথে প্রতি বর্গকিলোমিটারের জন্য কমপক্ষে ১৮ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা থাকতে হবে।

২. অধিক জনঘনত্ব: প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ১৫,০০০ মানুষ। সেই হিসাবে প্রতি হেক্টরে ১৫০ জন বা প্রতি একরে ৬১ জন।

৩. জমির মিশ্র-ব্যবহার: যে কোনো প্রতিবেশে মেঝের (floor area) মোট পরিমাণের অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থকরী কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা উচিৎ।

৪. সামাজিক সংমিশ্রণ (মিক্সের বাংলা হিসেবে সংযোগও হ’তে পারে এক্ষেত্রে): প্রতিটা প্রতিবেশে বিভিন্ন দাম আর মেয়াদের বাসার সংস্থান থাকতে হবে যেন তা নানা আয়সীমার মানুষকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে পারে। আবাসনের জন্য থাকা মোট মেঝের অন্তত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ নিম্নআয়ের মনুষের আবাসনের জন্য (লো-কস্ট হাউজিং) রাখা উচিত। আর বিশেষ কোনো মেয়াদী-নমুনাই (টাইপ) পুরো প্রকল্পের অর্ধেক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

৫. জমির নির্দিষ্ট ব্যবহারের সীমা: একটা জায়গা বা প্রতিবেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য গ’ড়ে না তোলার জন্য; কোনো একটা উদ্দেশ্য (ফাংশন) সমাধার জন্য তৈরী করা ব্লক যেন কোনো প্রতিবেশের মোট জায়গার ১০ শতাংশের বেশি জায়গা নিয়ে না নেয়।

যেহেতু সারা পৃথিবী জুড়েই নগরীর চৌহদ্দি বাড়ছে, বলা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট মনুষ্য জনসংখ্যার অর্থেকই নগরে বাস করবে, সেই হেতু ভবিষ্যতের নগরীকে কিভাবে টেকসই হিসেবে গ’ড়ে তোলা যায় সেটা এই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জাতিসংঘ বসতি এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে তারা এই বিষয়ে অনেক ধরণের গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেছে। টেকসই প্রতিবেশ বা পাড়া নিয়ে তাদের কিছু আলোচনার সাথে ঢাকার বর্তমান আর ভবিষ্যতের বেড়ে ওঠার ধরণ/ধরণগুলোকে মিলিয়ে দেখার একটা চেষ্টা এই লেখাটা।

নেইবারহুড ব’লতে পাড়া, মহল্লা বা প্রতিবেশ যা-ই বলি না কেন নগরের চরিত্র তৈরীতে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটা সময় নারিন্দা আর গ্যান্ডারিয়া মহল্লাগুলোর চরিত্র বেশ আলাদা ক’রেই সনাক্ত করতে পারতেন এর অধিবাসীরা। এখনো হয়তো মিরপুর আর ধানমন্ডির বৈশিষ্ট্যগুলোও বেশ মোটাদাগেই সনাক্ত করা যায়। এই মোটাদাগের একটা বিষয় হ’লো এই জায়গাগুলোর রাস্তাগুলো। তুলনামূলকভাবে যেমন ধানমন্ডির রাস্তাকে প্রশস্ত বলা যায়, ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেখানকার রাস্তাগুলোতে ফুটপাথের উপস্থিতি আছে, কোনো কোনো জায়গাতে রাস্তার সাথেই বড় বড় গাছের সমাবেশ আছে। আর মিরপুরের আবাসিক প্লটগুলোর সংলগ্ন রাস্তার প্রশস্ততা ২০ ফুট থেকে ২৫ ফুটের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। ফলে সেসব রাস্তাতে ফুটপাথ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেইও। অথচ মিরপুরের রাস্তাতেই পায়ে হাঁটা মানুষের ভীড় থাকে বেশি।

আবাসিক এলাকার ধরণের সাথে তাই এর রাস্তার প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভরশীল। আবাসিক প্লটের আকার আর সেখানে বাস করা অধিকাংশ মানুষের আয়সীমার উপর নির্ভর করে কোনো এলাকার আবাসনের ধরণ। যাদের আয়ের সীমা উপরের দিকে তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকে। নিম্ন-আয়ের মানুষের প্রবণতা থাকে গন-পরিবহন (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) ব্যবহারের দিকে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন আয়-সীমার মানুষের বসতি নিয়ে গ’ড়ে তোলা পাড়াগুলোর রাস্তার ধরণে আর পরিমাণে ভিন্নতা থাকাবেই। জাতিসংঘ বসতি যে অন্তত ৩০ শতাংশ জমি রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য বরাদ্দ রাখতে বলছে তা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই। কিছু পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে বর্তমানে ঢাকা শহরের মোট জমির ৯ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আর ৬ শতাংশ জায়গা পাকা বা পেভমেন্টের (চিপা-গলিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত) জন্য আছে।(১) জাপানের টোকিওতে শহরের মোট জমির ১৬ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আছে। মোটামুটি ভাবে বলা হয় বেশ কিছু উন্নত শহরে রাস্তার পরিমাণ শহরের মোট জমির ২৫ শতাংশের কাছাকাছি।

অর্থাৎ জাতিসংঘ বসতি রাস্তার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে নিতে পরামর্শ দিচ্ছে। ঢাকার মতো একটা পুরোনো শহরে সেটা করা সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে দেখার মতো। তবে শহরের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে যে দিকগুলোতে সেখানে রাস্তার পরিমাণ বৃদ্ধির একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। উত্তরা থার্ড-ফেইজ বা পূর্বাচলে রাস্তার পরিমাণ ২৫ শতাংশের কাছাকাছি ব’লেই দাবি করা হয়। রাজউক ব’লছে পূর্বাচলের মোট জমির ২৫.৯ শতাংশ রাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।(২) এটা থেকে ধ’রে নেওয়া যায় এই এলাকাগুলো মোটামুটিভাবে উঠতি মধ্যবিত্ত্ব আর উচ্চবিত্ত্বের মানুষের আবাসন আর কাজের জায়গার প্রয়োজনকে মাথায় রেখেই করা হয়েছে।

শহরের জন-ঘনত্বের ব্যাপারে জাতিসংঘ বসতি যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫০০০ মানুষের থাকার কথা বলছে সেটাও হয়তো ঢাকাতে নিশ্চিত করা যাবে না। এখনই ঢাকাতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩০০০ এর উপরে মানুষ বাস করছে। দিন দিন সেই ঘনত্ব আরো বাড়ছে। আর বাড়ছে ব’লেই কমছে পড়ে থাকা জমির পরিমাণ। যেমন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বা আফতাব নগরের ফাঁকা প্লটগুলোতে প্রতিদিনই তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। আবার গুলশান বা ধানমন্ডির দোতলা আর ছয়তলা ভবনগুলোর বেশির ভাগ এরই ভেতরে ১৪ তলা হ’তে শুরু করেছে। যে গতিতে এই ভবনগুলোর সংখ্যা বাড়ছে তার সাথে আনুপাতিক হারে বাড়ছে ঢাকার জন-ঘনত্ব। ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান জন-ঘনত্ব নিকট ভবিষ্যতে ঠিক কতটা টেকসই কিংবা বাসযোগ্য হবে সেটা এই মুহূর্তে বলা শক্ত। তবে ঢাকার জন-ঘনত্বের সাপেক্ষে এর ভবনগুলোর গড়পড়তা উচ্চতা যে বেশ কম, পৃথিবীর অন্য বড় শহরগুলোর অনুপাতে, তা নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। এ থেকে বলা যায় ঢাকার মানুষের জনপ্রতি ব্যবহৃত জায়গা বা বর্গফুটের পরিমান খুবই কম। দ্বিতীয়ত ভবনগুলো যেহেতু উচ্চতায় বেশি নয় সেহেতু তারা বেশ গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। দুই কারণেই ঢাকার বাতাসের গুণগত মান কমছে। আবাসিক ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ঢুকতে পারছে না। সব মিলিয়ে ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলো, সে এর উচ্চবিত্ত্বের আবাসিক এলাকাগুলোও, বসবাসের পক্ষে যথেষ্ট স্বাস্থকর থাকছে না। রেম কুলহাস কিছুদিন আগে মানুষের এত ঘন-বসতিপূর্ণ শহর তৈরীর আগ্রহকে সমালোচনা করেছেন, এই করোনা-মহামারিকে বিবেচনাতে নিয়ে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে শহরে বসবাসের কথা ব’লে তাদেরকে একধরণের অস্বাস্থকর পরিবেশে টেনে আনা হচ্ছে ব’লে মনে করছেন তিনি।

আবার পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে নগরের সংখ্যা আর আয়তন বৃদ্ধি করা ছাড়া এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে ব’লেও মনে হয় না। মনে রাখা দরকার এখন মূলত বয়স্ক মানুষের সংখ্যাই বাড়তির দিকে। আর বয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজন বাড়তি চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার সংস্থান শহর ছাড়া করা সম্ভব নয়। ফলে শহর বা নগরের সংখ্যা বৃদ্ধিও একটি বাস্তবতা। এই অবস্থাতে শুধুমাত্র ঢাকাকে আয়তনে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়ে আগালে খুব কার্যকর ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। ২০/২৫ বছর পরও ঢাকাকে টেকসই একটা শহর হিসেবে দেখতে চাইলে প্রয়োজন এখনই বেশ কিছু মাঝারি আকারের শহরকে বড় শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া। আমরা সুযোগ পেলেই বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি। সেটা সম্ভবত সঠিক সমাধান নয় এই ক্ষেত্রে। ১৬ থেকে ২০ কোটির দিকে যেতে থাকা জনগোষ্ঠির নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজন বহু-কেন্দ্রীকরণ।  অর্থাৎ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ নগর বা কেন্দ্র তৈরী করা। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ঠিক কতগুলো বড় নগর তৈরী করা প্রয়োজন তা নিয়ে সমীক্ষা হওয়া উচিত। সচেতন ভাবে না হ’লেও সরকার হয়তো সেই দিকে যাচ্ছে ব’লে মনে হচ্ছে যদিও খানিকটা। যেমন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট আর খুলনাতে চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর উদ্যোগ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি নতুন এমবিবিএস করা ডাক্তাররা শুধুমাত্র উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ঢাকাতে থাকতে বাধ্য হন। কারণ ঢাকার বাইরে এ ধরণের কোনো সুযোগ দেশে নেই।

ঘূর্ণিঘড় সিডর আর আয়লার পর উপকূলীয় এলাকা থেকে অনেক মানুষকে কাজের খোঁজে ঢাকাতে চ’লে আসতে দেখেছি। ঢাকা এই মানুষগুলোর জন্য তখন কতটা প্রস্তুত ছিলো বলা কঠিন। কিন্তু আমাদের যদি আরো কিছু বড় শহর থাকতো তবে হয়তো দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে ঢাকার উপরে জন-ঘনত্ব বৃদ্ধির চাপটা একটু কম পড়তো। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথেও এর সম্পর্ক আছে।

এবার আসি জমির মিশ্র ব্যবহার প্রসঙ্গে। ঐতিহ্যগত ভাবেই আমাদের বাঙালিদের জীবনাচরণে মিশ্র-ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এবং তা বেশ বেশি ভাবেই আছে। গ্রামের চাষী-বাড়িতে, কুমার-বাড়িতে একটা উঠান আগে থাকতই। পানাম নগর কিংবা পুরোনো ঢাকার আগের বাড়িগুলোর অনেকগুলোই উঠানের উপকারিতা মেনে তৈরী হয়েছিলো। রূপলাল হাউজে এখনো কিছু উঠান দেখা যায়। এই উঠান মিশ্র-ব্যবহারের সংস্কৃতির উদাহরণ। আমাদের পুরোনো বাড়িগুলোতে, সে গ্রামের দোচালা বা চারচালা ঘরগুলোতেও, প্রশস্ত বারান্দা থাকতো। এই বারান্দাগুলোতে দিনের নানা সময়ে নানা ধরণের কাজ করা হ’তো। ফলে ভারী আর জড়োয়া ফার্নিচার সেখানে রাখা হ’তো না বললেই চলে। তাতে সহজেই প্রয়োজন অনুযায়ী পরিসরের চরিত্রকে পাল্টে নেওয়া যেতো। দুপুরে যেখানে ব’সে বাড়ির লোকজন পাটি পেতে খেয়ে নিতে পারে সেখানেই হয়তো বিকালে আড্ডা বসে। বা বর্ষার সময় কাঁথা পাতা আর সেলাই করার আয়োজন হয়। ফসলের মাড়াই আর প্রক্রিয়াকরণের নানা কাজ উঠানে করা হতো। ফলে আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে মিশ্র-ব্যবহারের পরিচয় আছেই। এখন এটাকে শহরের সাথে সম্পৃক্ত ক’রে নেওয়া যায় কিভাবে সেটা ভেবে দেখতে হবে।

আবাসন, নাগরিক সুবিধা (সার্ভিস) আর পেশাগত কাজের জায়গাগুলোকে কিভাবে বিন্যস্ত করা যায় সেটা নিয়ে নতুন ক’রে ভাবার সময় এসেছে। ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সময় কালে পৃথিবীব্যাপী শহরের বৃদ্ধি আর পরিকল্পনাতে যে ভাবনাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তাতে মিশ্র-ব্যবহারকে এড়ানোর প্রবণতা ছিলো প্রচণ্ডভাবে। তখনকার নতুন প্রযুক্তিগুলো একরকম বাধ্য করেছিলো সেটা করতে। ফলে অফিস পাড়া, কারখানা এলাকা, পার্ক, বাজার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আর আবাসনের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এতদিন। তাতে ব্যবহার অনুযায়ী গ’ড়ে ওঠা এক ধরণের জায়গা থেকে আর এক ধরণের জায়গাতে মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন বেড়েছে। তাতে বেড়েছে রাস্তা আর গাড়ির প্রয়োজনীয়তাও। ফলস্বরূপ অটো-মোবাইল কারখানার চাহিদা বেড়েছে। অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। সেই সাথে দূষণ আর যানজটের যন্ত্রণা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। শহর পরিকল্পনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা অনেকেই তাই এখন মনে করছেন অফিস পাড়া, কারখানা কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা এমনতরো স্পষ্ট ভাগ না ক’রে মিশ্র-উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। তাতে মানুষের সময় আর অর্থেরও সাশ্রয় করা সম্ভব।

পুরাতন ঢাকাতে এখনো অনেক ভবন আছে যার নিচতলাতে ব্যবসার জয়গা আর উপরে মানুষের আবাস। কোথাও কোথাও হয়তো কারখানাও আছে। তবে সেই কারখানাগুলো নিরাপত্তার প্রশ্নে কতটা যুক্তিসংগত সেটা বিশ্লেষণ করে দেখার সময় এসেছে। মিরপুর আর মোহম্মদপুরের অনেক আবাসিক ভবনের নিচের তলাতে এ্যাম্ব্রয়ডারির ম্যাশিন দেখা যায়। এটা কতটা ঝঁকিপূর্ণ জানি না, তবে মিশ্র-ব্যবহার হিসেবে বেশ কর্যকর ব’লে মনে হয়েছে। জমির মিশ্র-ব্যবহার ভবন কেন্দ্রিক হ’তে হবে এমনও নয়। একটা বড় জমি বা ব্লক কেন্দ্রিকও হ’তে পারে। একটা বড়সড় ব্লকের জন্য প্রয়োজনীয় হাসপাতাল সুবিধা, স্কুল, বাজার আর খানিকটা অফিস এরিয়া সমন্বিত ক’রে গ’ড়ে তোলা গেলে সামগ্রিক হিসাবে শহরের মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে হাউজিং বা আবাসন পরিকল্পনার তৃতীয় ফেইজে সুপার-ব্লক কেন্দ্রিক এই ধরণের মিশ্র-ব্যবহারের কিছু চেষ্টা নেওয়া হয়েছিলো, যেগুলো নাগরিক সুবিধার বিচারে খুব উপযোগী হয়েছিলো। ফলে জমির মিশ্র-ব্যবহার যে শহর পরিকল্পনাতে উপকার দিতে পারে সেটা এখন মোটামুটি জানা। কিন্তু প্রশ্ন হ’লো ঢাকা তথা বাংলাদেশে আমরা সেটা বিবেচনা করছি বা করেছি কিনা।

ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান বা উত্তরার পরিকল্পনাতে জমির মিশ্র ব্যবহারকে বিবেচনা করা হয়নি ব’ললেই চলে। কিন্তু সময়ের সাপেক্ষে প্রশস্ত রাস্তাগুলোর পাশে মিশ্র-ব্যবহারের চাহিদা তৈরী হয়েছে। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই তা গ’ড়ে নিয়েছে। রাজউক বা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে কখনো নিরব থেকেছে, কখনো অসুবিধার সৃষ্টি করেছে আবার কখনো প্লটের ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য বিধি তৈরী করেছে, আবার সেই বিধি ব্যবহার করে নানা ধরণের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকার প্রায় সমস্ত এলাকাতেই জমির মিশ্র-ব্যবহার গ’ড়ে উঠেছে। এমনকি ডিওএইচএসগুলোও এখন আবাসিক আর অফিস এলাকার মিশ্রণ।

প্রয়োজন এই মিশ্রণের প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী দিনের শহর পরিকল্পনা করা, সে যেমন ঢাকার বর্ধিত অংশে তেমনই দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোরও যে গুলোর নতুন কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেই সাথে বর্তমানের শহরে যে নিত্য-পরিবর্তন তাতে দিক-নির্দেশনা দেওয়া।

সামাজিক সংমিশ্রণ ছাড়া কোনো শহরই সাস্টেইনেবল বা টেকসই হতে পারে না। করাইল আর মহাখালির বস্তি ছাড়া গুলশানের আবাসিক এলাকা এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারবে না। এই বস্তিগুলো তুলে দিলে শুগশানের আবাসিক ভবনগুলোর পরিচালন ব্যায় অনেক বেড়ে যাবে। আবার কাছের বাড্ডা আর রামপুরার মতো মধ্যবিত্ত্বের এলাকাগুলো না থাকলে গুলশানের অফিস পাড়াতে পরিণত হওয়ার সুযোগও যেতো কমে। শহরের কোনো এলাকার চরিত্র গঠন আর পরিবর্তনে এরকম নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ভূমিকা এড়াবার নয়। আর যে শহর পরিবর্তিত হ’তে থাকে না তা এক সময় গুরুত্ব হারাতে থাকে।

শেষ যে কথাটা বলা হয়েছে সেটা হ’লো ব্যবহার মিশ্র করতে গিয়ে আবার যেত কোনো একটা বিশেষ ফাংশনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে না ফেলা হয়, যেমনটা ঢাকার গুলশানের ক্ষেত্রে হয়েছে। আবাসিক এলাকা হিসেবে গ’ড়ে তোলা গুলশান-বনানীকে এখন ঢাকার নতুন বিজনেস-ডিস্ট্রিক্ট বা বড়বাজার হিসেবেই মনে করেন অনেকে। একসময় মতিঝিলকে যা মনে করা হ’তো।

প্রতিবেশ বা পাড়া তৈরীতে তাই অন্য ব্যবহারগুলো যেন মূল ব্যবহারের ১০ শতাংশকে পেরিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে ব’লছে জাতিসংঘ বসতি।    

তথ্যসূত্র :
১) http://article.sciencepublishinggroup.com/html/10.11648.j.ijtet.20160201.11.html

২) http://www.rajukdhaka.gov.bd/rajuk/projectsHome?type=purbachal

নোট:
১. বাঁকা হরফের লেখা গুলো ইংরেজি থেকে অনুবাদকৃত।
২. সচলায়তনের জন্য লেখা। লিংকটা এখানে রেখে দিলাম। তবে সচলায়তনের সিরিয়াল বা ক্রম -৩
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57799

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৭

হৃদয়েরই নির্দেশে যে পথে একদিন গিয়েছি এগিয়ে
সেই পথেই নিহত হয়েছে আমার কোমল হৃদয়
আমি মারবো তাই, মরবো নিজেকেই কাউকে না জানিয়ে –
মনে কোনো দুর্বোধ্য অপরাধবোধ নিয়ে নয়
নয় কোনো রাগ ক্ষোভ কিংবা ঘৃণার জ্বালা বুকে নিয়ে,
হয়তো দলছুট কোনো উল্কার মতোন অকারণ অনুনয়ে
সময়ের পৌনঃপুনিক আবরুদ্ধ আবর্তনের মতো …
উদ্ধত সে হৃদয় আবার মৃত! ক্ষতবিক্ষত!
আমি জাগাবো আবার প্রাচীন সে হৃদয় – ভালোবেসে –
তাকে নিপূণ হাতে করবো হত্যা পুরোনো অভ্যাসে।

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৫

বাংলাদেশে বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হার
বাংলাদেশের ঠিক কত শতাংশ মানুষের একটা বাসা বা এ্যাপর্টমেন্টের মালিকানা আছে তার কোনো হিসাব ইন্টারনেট ঘেটে পেলাম না। আমাদের ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ এর যে সাইটটি (http://www.nha.gov.bd/) আছে সেখানেও এই ধরণের কোনো পরিসংখ্যান ০৫ মে ২০২০ এও নেই।

পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে গৃহ-মালিকানার শতকরা-হার কেমন সেটার কিছু পরিসংখ্যান সহজেই পাওয়া গেলো। কোনো কোনো দেশের তালিকা একেবারে হাল নাগাদ করা নেই যদিও।

বিভিন্ন দেশের বাসা/এ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার শতকরা হারের তালিকা (১)

house ownership rate-05.05.20.xlsx

তালিকা থেকে জানতে পারছি গৃহ-মালিকানার দিক থেকে সবার উপরে থাকা দেশটার নাম রোমেইনিয়া বা রুমানিয়া। সিঙ্গাপুর আছে তালিকার তিন নম্বরে। তাদের মোট জন-সংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগের বাস-গৃহের উপর মালিকানা আছে। তালিকাতে কিছু বিষয় উল্লেখ করা নেই। যেমন মালিকানার ধরণ কেমন। সিঙ্গাপুরের ৯১ ভাগ মানুষের কি এ্যাপার্টমেন্ট কেনার মতো টাকা আছে? একটা দেশের তো অন্তত ২০ ভাগ মানুষ থাকেই যাদের বয়স ২০ বছরের কম। তারাও কিভাবে গৃহের মালিক ব’নে যাচ্ছে তালিকার উপরের দিকে থাকা দেশগুলোতে? এর উত্তর আসলে পরিসংখ্যান নেওয়ার ধরণে। কোনো ব্যক্তির নামে যাদি একটি এ্যাপার্টমেন্ট থাকে তবে তার পরিবারের অন্য যে সকল সদস্য তার উপর নির্ভরশীল তারাও আসলে সেই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক। অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তির মতো। স্বামী-স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে সকলকেই এই এ্যাপার্টমেন্টটির মালিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার মালিকানাটি কত বছরের জন্য সেটাও বিবেচনার বিষয়। হয়তো জমির মালিক সরকারই থাকছে। তবে এ্যাপার্টমেন্টটির মালিকানা অনেক ক্ষেত্রেই ৯৯ বছরের জন্য।

তালিকাতে দক্ষিণ-এশিয়ার কোনো দেশের নাম নেই। এটার একটা কারণ হ’তে পারে এই ব্যাপারে এই দেশগুলোতে পরিসংখ্যানের অভাব। তবে উইকিপিডিয়া ব’লছে ভারতে গৃহ-মালিকানার হার ২০১১ সালে ছিলো ৮৬.৬ শতাংশ। তাদের তালিকাতে ভারতের অবস্থান ১০ নম্বরে। আর চীনের অবস্থান ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ৫ নম্বরে। উইকিপিডিয়ার তালিকাটিও দেখে নেওয়া যাক।

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

List of countries by home ownership rate - Wikipedia

২০১৬ সালের (৩) একটা গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে সে বছর বাংলাদেশে ২,৮০,০০০ (দুই লক্ষ আশি হাজার) মানুষ গৃহহীন ছিলো। অর্থাৎ এই লোকগুলো পথে-ঘাটে বা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটিয়েছে। এই তথ্য থেকেও ধারণা করা যায় না দেশের ঠিক কত ভাগ মানুষের গৃহের উপর মালিকানা আছে বা ঠিক কত ভাগ মানুষ বাসা ভাড়া ক’রে থাকে। ভাড়া ক’রে থাকা বাসাগুলোর গুণগত মান কেমন বা সেখানে বসবাসের ধরণ (লিভিং স্ট্যান্ডার্ড) কেমন সেটাও জানা যায় না; জানা যায় না মাথাপিছু কত বর্গফুট জায়গা বাংলাদেশের নাগরিকেরা গড় হিসেবে থাকার জন্য ব্যবহার করছেন।

১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ‘হাউজিং পলিসি’ তৈরীর ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিউ-ডি-জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলনে ‘পরিবেশ এবং উন্নয়ন’ প্রসঙ্গে আরো একটা ঘোষণা আসে। তার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে একটি জাতীয় গৃহায়ন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল হাউজিং পলিসি) অনুমোদন করা হয়। ১৯৯৯ সালে তাতে কিছু সংশোধনী আনা হয়। আর ২০১৬ সালে এটাকে পুর্নমূল্যায়ন করা হয়। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মোস্তফা সুরাইয়া আক্তার এবং আশরাফি বিনতে আকরাম তালিকাবদ্ধ করেছেন নিচের মতো ক’রে : (৪)

Bangladesh national housing pollicy key points.xlsx

এখান থেকেও ধারণা করা যায় না যে বাসা বা বাসস্থানের মালিকানা নিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবনা কী রকম। যদিও আমাদের দেশের সংবিধানের ১৫ তম অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ তে ‘মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা’ প্রসঙ্গে বলা আছে যে – (৫)

১৫৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার৷

অর্থাৎ সাংবিধানিক ভাবে নাগরিকদের বাস-গৃহের মালিকানা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নেই। রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলার চেষ্টা করবে যেখানে নাগরিকদের জন্য আশ্রয় বা বাস-গৃহের সংস্থান হয়। সেই সংস্থান মালিকানা-নির্ভর হবে না ভাড়া-নির্ভর হবে সেই ধরণের প্রস্তাবণা আসলে সংবিধানের কাজও নয়। সেটা হাউজিং পলিসির কাজ। জাতীয় হাউজিং পলিসি এই ব্যাপারে খুব ভেবেছে ব’লে মনে হয় না। হয়তো তার পেছনে দেশের অর্থনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। কারণ সম্পদের মালিকানার উপরে খুব বেশি ট্যাক্স বা কর ধার্য করা যায় না, যতটা যায় দেনদেনের উপর। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের বাৎসরিক খাজনার পারিমাণ আর এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া থেকে আয়ের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্সের অনুপাত হিসাব করলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হবে।

উপরের দেশ-ভিত্তিক বাসগৃহের মালিকানার দুইটি তালিকা দেখে আমরা বুঝতে পারি যে বাস-গৃহের মালিকানার হারের সাথে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক তেমন একটা নেই। বাজার-অর্থনীতি কিংবা সমাজতান্ত্রিক-অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকদের জন্য বাসগৃহের মালিকানার ব্যবস্থা করা যায় যদি ‘হাউজিং পলিসি’ তে সেটা চাওয়া হয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা।

যদিও ঐতিহ্যগত ভাবে দেখা যায় বাংলাদেশে ভূমি-হীনের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার আনুপাতে বেশ বেশি। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের আগে জমির মালিকানা মূলত জমিদারের হাতেই ছিলো। রায়ত বা চাষীরা যেসব জমিতে থাকতো বা চাষ করতো তার মালিক তারা ছিলো না। ১৮৮৫ এর প্রজাসত্ত্ব আইনের পর থেকে জমিদারেরা চাইলেই যে কোনো রায়তকে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতো না, যেটা কিনা তার আগে পারতো। এবং হরহামেশাই তারা সেটা করতো। ফলে বিলেতিদের চাপিয়ে দেওয়া আইনি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে সবসময়ই গৃহহীনের সংখ্যা কম ছিলো না। আবার গৃহহীন এই মানুষগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখার একটা ব্যবস্থা বা সিস্টেম হয়তো দাড় করিয়ে ফেলেছে। যার কারণে এটা নিয়ে সমাজে বা রাষ্ট্রে বিশেষ আন্দোলনও নেই। আর আন্দোলন নেই ব’লেই আমাদের হাউজিং পলিসিতে এটা নিয়ে কোনো টু-শব্দটি নেই। যদিও বাস-গৃহের গুণগত মান বৃদ্ধির তাগিদ আছে। কিন্তু সেটা হয়তো শুধু শহুরে এলাকার জন্য। দেশের দক্ষিণের বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটা নিরাপদ আবাসন কিভাবে এবং কত বছরে গ’ড়ে তোলা যায় তার কোনো দিক-নির্দেশনা সেখানে নেই। আবাসনের নিরাপত্তার সাথে যে  গৃহ-মালিকানার সম্পর্ক আছে সেটাকে পুরোপুরিই অবহেলা ক’রে যাওয়া হয়েছে।

এই অবহেলার পরিণাম হয়তো টের পাওয়া যাবে বিশেষ কোনো সংকটের সময়ে। এই যেমন ২০২০ এর কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেকেই বাস-গৃহে আটকে আছে প্রায় দেড় মাস ধ’রে। আরো বেশ কিছু দিন যে আটকে থকতে হবে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। অনেকেই বাসা-ভাড়ার টাকাটা যোগাড় করতে পারছেন না। পৃথিবীর নানা দেশে বাড়ি-ভাড়ার টাকা মৌকুফের কথা জানতে পারছি। কোনো কোনো দেশ এই সময়ে বাসা-ভাড়া দেওয়ার জন্য বিনা-সুদে ঋণ দিচ্ছে তার নাগরিকদেরকে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষের যদি নিজের বাস-গৃহের উপর মালিকানা থাকতো তবে এই ধরণের বড় অর্থনৈতিক সংকট হয়তো এড়ানো যেতো।

লি কর্বুজিয়ের একবার সতর্ক ক’রে বলেছিলেন, ‘if society would fail to produce and provide adequate housing to its members, there would be social unrest and agitation.’ জানামতে বাংলাদেশে কখনো আবাসনের চাহিদা নিয়ে অশান্তি বা আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তার পেছনে হয়তো আমাদের পুরোনো ইতিহাসের বেশ খানিকটা ভূমিকা আছে। বাস-গৃহের মালিকানা যে একটা চাহিদা হ’তে পারে সেটা কখনোই আমাদের জনসাধারণের মনে কিংবা মননে আসেনি, এমনকি কর্বুজিয়েরও মালিকানার কথা বলেননি, ব’লেছেন পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থার কথা শুধু। আমাদের অর্থনীতি এখনো এতটা পোক্ত জমিনের উপর দাড়াতে পারেনি যে তা আমাদেরকে একটা মান-সম্মত ও স্থায়ী (স্ট্যান্ডার্ড) গৃহের নিশ্চয়তা দিতে পারে; সে মালিকানা-ভিত্তিক বা ভাড়া-ভিত্তিক যেটাই হোক না কেন। জমি বা এ্যাপার্টমেন্টের নিবন্ধনের জন্য যে ট্যাক্সটা সরকারকে দিতে হয় সেটা থেকে পরিস্কার বোঝা যায় যে, আমাদের অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলো কয়েক দশক ধ’রেই মনে ক’রে এসেছেন যে বাস-গৃহের মালিকানা একটি লাগজারি বিষয়, এটি কোনো মৌলিক প্রয়োজন নয়।

কিন্তু ভবিষ্যতেও কি এমনই চলতে থাকবে? কাজী খালিদ আশরাফ, সাইফুল হক, মাসুদুল ইসলাম সাম্য, রুবাইয়া নাসরিন, ফারহাত আফজাল, হাসান এম রাকিব আর মারিয়া কিপ্তি মিলে এ ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা তুলে ধরেছেন ইংরেজি দৈনিক দ্যডেইলিস্টারে গত বছরের শুরুর দিকে । ‘দ্যা ফিউচার অব হাউজিং ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে।(৬) এখানেও বাসগৃহের মালিকানার বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সূত্র:
(১) – https://tradingeconomics.com/country-list/home-ownership-rate

(২) – https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_by_home_ownership_rate

(৩) – Molla, M. A.-M. (2016). PM: 280,000 homeless people in the country.Dhaka : Dhaka Tribune .Statistics and Informatics Division (SID). (2014). Census of Slum Areas and FloatingPopulation 2014. Dhaka: Bangladesh Bureau of Statistics( BBS)

(৪) 283-286

(৫) http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-957/section-29367.html

(৬)- https://www.thedailystar.net/supplements/28th-anniversary-supplements/avoiding-urban-nightmare-time-get-planning-right/news/the-future-housing-bangladesh-1704259
The future of housing in Bangladesh _ The Daily Star_KKA

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৬

কে যেন দুর্বোধ্য ভাষায় কথা ব’লে চলে
মনের কোনো গভীর অতলে,
কে গো তুমি মেয়ে?
কেন মাঝে মাঝে ওঠো গেয়ে
গুনগুনিয়ে বাতাসের তালে !
কেন ভিজিয়েছো বুক লোনা জলে
গোধূলির আঁধারে লুকিয়ে নিজেকে একা-
তাতে কি মুছে যায় ব্যথা?

বিচ্ছিন্ন পঙক্তি ১৫

আমাদের যেসব দিন গিয়েছে চ’লে
তার কিছু রেশ হয়তো থাকবে পড়ে সময়ের কুলে,
তবুও মানুষের জীবন দীর্ঘ –
নিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া নক্ষত্রের ধূলিকণার অর্ঘ্য
গ’ড়ে উঠবে কাঙ্ক্ষিত নতুন সঞ্চয়
আসবে নতুন জোয়ার আমাদের পুরাতন ভাবনায়
তার গতিমুখে হয়তো থাকবে লক্ষ পদধ্বনির ডাক
আবারও সকলে হবো অজানা পথের পথিক,
অনিশ্চয়তাকেই শুধু নিশ্চিত ব’লে জেনে
পথের নতুন সাথীকে সেদিনও নেবো চিনে …
একদিন জানি সেও যাবে চ’লে, হারিয়ে
পৃথিবীর জল হাওয়াদের মতো দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।