বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৪

পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশের আবাসিক পরিকাঠামোতে সুউচ্চ বা হাই-রাইজ ভবনের ব্যবহার খুবই কম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের মতো কয়েকটি বড়-শহর যেখানে জমির দাম যথাযত কারণ ছাড়াই হুহু ক’রে বেড়ে যাওয়ায় সে সব শহরে সুউচ্চ ভবনের চাহিদা বেড়েছে। তৈরীও হচ্ছে বেশ কিছু। খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বগুড়া আর সিলেটেও বেশ কিছু সুউচ্চ ভবন গ’ড়ে উঠেছে, সেও ব্যবসায়িক চাহিদার কারণেই। তবে সুউচ্চ আবাসিক ভবনের সংখ্যা এসব শহরের জন-ঘনত্বের অনুপাতে বেশ কম। আর কম ব’লেই শহরের আয়তন বাড়ছে। বাড়ছে অতিরিক্ত গাদাগাদি ক’রে বাস করার পরিবেশ। তাতে আলো-বাতাসের পরিমাণ যাচ্ছে কমে। ফলস্বরূপ শহরের মানুষের স্বাস্থ ঝুঁকি বাড়ছে।

আবার কৃষি আর প্রাকৃতিক জমির পরিমাণও যাচ্ছে কমে। নদীর পাড় দখল হচ্ছে। বনভূমি উজাড় ক’রে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতি, শিল্প-এলাকা, বন্দর। এসবের সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে ইকো-সিস্টেমের উপর। বিলেতিরা অনেক বন্য-প্রাণী বিলুপ্ত ক’রে দিয়ে গিয়েছে আমাদের দেশ থেকে। যেমন নীলগাই, তিন প্রজাতির গন্ডার, চিতাবাঘ; বিলেতিদের হত্যার বাসনা পূরণের নিমিত্তে। নদীর অনেক মাছ আর প্রাণীর সংখ্যাও দিনদিন কমে আসছে। এসবের একটা সমাধান হ’তে পারে সুউচ্চ আবাসিক ভবনের ব্যবহার। অর্থাৎ মানুষের বসবাসের জায়গার ফুটপ্রিন্ট (যতটা জমির উপর বিল্ডিং করা হয়) যতটা সম্ভব কমিয়ে এনে সেই জমির বেশ কিছুটা আবার প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়া।

কিন্তু শহরের আবাসিক ভবনের ফেবরিকটা এক-দুই তলাবিশিষ্ট ভবন থেকে পাল্টে দশ বা ততধিক তলাবিশিষ্ট ভবনে পাল্টে ফেলাটা সহজ নয়। আবার লো-রাইজ বা কম-উচ্চতার আবাসিক  ভবন ভেঙে সেখানেই বহুতল ভবন বানিয়ে নিলে তার পরিণতি যে কেমন হ’তে পারে তা আমরা এখনকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে জানতে পারি। একসময়ের মোটামুটিভাবে দোতলা আবাসিক ভবনের একটা আবাসিক এলাকা সময়ের ব্যবধানে হ’য়ে যেতে থাকে ছয় তলা বিশিষ্ট। ঢাকার জন্য ২০০৮ এ নতুন বিল্ডিং-বিধি চালু হওয়ায় এখন তার অনেকগুলো রাস্তাতেই পনের তলা-বিশিষ্ট ভবন গ’ড়ে উঠছে। আর সেসব ভবনগুলো শহরের অন্যান্য বিষয়গুলোর সাথে বিবেচনা না ক’রে তৈরী করার কারণে সেসব এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ সেখানে বাস করা মানুষের মনে স্বস্তি আনতে পারছে না। অথচ আবাসের স্থান বা গৃহেই স্বস্তি খুঁজেছে মানুষ বছরের পর বছর ধরে।

মোটা দাগে ব’লতে গেলে, যেভাবে আমরা আমাদের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলছি তার ভেতরে বেশ কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ত্রুটিগুলোকে সমাধানের চেষ্টা কারার আগে তাকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার যাকে ত্রুটি বলছি তা হয়তো ঠিক ত্রুটিও নয়, হয়তো বৈশিষ্ট্য মাত্র। আগে হয়তো ৯টা প্লটে ৯টা পরিবার থাকতো। বর্তমানে হয়তো একটা ৫ কাঠার প্লটেই ৯টা পরিবারের থাকার ব্যবস্থা তৈরী করছি আমরা। অথচ এই ৯টা পরিবারের জন্য কমন কোনো কমিউনিটি-স্পেস বিল্ডিঙের ভেতরে বা বাইরে গড়ে তুলছি না আমরা। হয়তো ঠিক মতো হিসাবও করতে পারছি না কতটা জায়গা দরকার এই ৯টা পরিবারের জন্য কমিউনিটি-স্পেস হিসেবে। আবার কতগুলো পরিবারের জন্য একটা কমন কমিউনিটি-স্পেস কার্যকরভাবে উপযোগী হ’তে পারে তা নিয়েও আমাদের গবেষণা নেই।  নির্দিষ্টি কিছু সংখ্যক পরিবারের পক্ষে পরষ্পরের জন্য প্রয়োজনীয় কমিউনিটি-স্পেস কতটা লাগবে তার হিসাব করাটা জরুরী। এই কমিউনিটি-স্পেস হিসাব করতে গেলে সেই পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পেশাগত কাজের ধরণ, যাতায়াতের প্রকৃতি, জীবনযাপনের রুচি আর সামর্থ, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক পরিচয়, বর্তমান সময় আর আধুনিক-প্রযুক্তির ব্যবহার – সর্বোপরি আবাসনের প্রকৃতির সবগুলো বিষয় বিবেচনাতে নিতে হবে। মনে রাখা দরকার যে এ কাজটা খুব সহজ নয়। এবং কাজটা কোনো একক মানুষের কাজও নয়।

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০৩

একটা দেশের সার্বিক বাসস্থানের পরিকল্পনার সাথে তার অর্থনীতি আর উৎপাদন ব্যবস্থার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কয়েকদিন আগে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগ ক’রে অনেকেই বিপদে পড়েছেন। (১) তার একটা বড় কারণ সেখানকার আবাসন ব্যবস্থা। বলা হ’য়েছিল ইথিওপিয়ার পোশাক-শ্রমিকদেরকে ন্যুনতম ২৬ মার্কিন-ডলার বেতন দিলেই হবে। যে সময় এটা প্রচার করা হয়েছিল সেই সময় ইথিওপিয়াতে এমন একজন শ্রমিককে তার আবাসনের পেছনে মাসে ১৫/১৬ মার্কিন-ডলারের সমপরিমাণ খরচ করলেই চলতো। কিন্তু নানা দেশ থেকে বড় আকারের বিনিয়োগ আসার পর ইথিওপিয়াতে যখন অনেকগুলো বৃহদায়তন কারখানার নির্মাণ শেষ হ’লো তখন দেখা গেলো কারখানাতে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিকের অর্থনৈতিক অঞ্চলের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা নেই। ফলে হয় শ্রমিকদেরকে অনেক দূর থেকে এসে কাজ করতে হবে নয়তো শ্রমিকদের জন্য দ্রুত আবাসন ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে কারাখানাতে আসার যাতায়াত খরচ আর সময় দুইই বেশ বেশি। তার উপর যোগাযোগ ব্যবস্থাও যথেষ্ট উন্নত নয়। সমাধান হিসেবে চীনা বিনিয়োগকারিরা শ্রমিকদের জন্য আবাসন অবকাঠামো দ্রুত তৈরীর উদ্যোগ নিয়ে ফেললো। ফল-স্বরূপ মাসের আবাসন খরচ ১৫/১৬ মার্কিন-ডলার থেকে বেড়ে ৫২ মার্কিন-ডলারে গিয়ে দাড়ালো।

যে শ্রমিকের মাসে আবাসনের পেছনে ৫২ মার্কিন-ডলার খরচ করতে হয় তাকে মাসে ২৬ মার্কিন-ডলার বেতন দেওয়া যায় না। পুরো কাঠামোটাই সাস্টেইনেবল হয় না।

বাংলাদেশের পোশাক-শ্রমিকদের আবাসন নিয়ে তেমন একটা ভাবা হ’য়েছে ব’লে আমার মনে হয় না। ইদানিং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান যদিও এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, তবে সেগুলো সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ যে নয় তা এক রকম নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। শুরুতেই বাংলাদেশের সফল দুইটা রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের ২০১৩ এবং ২০১৮ এর তুলনামূলক উপগ্রহ-চিত্র দেখে নিই, খানিকটা ধারণা পাওয়ার জন্য।

Shavar EPZ 2013
সাভার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা – ২০১৩

সাভারের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ২০১৩ সালের চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে এর খুব নিকটেই নানা আয়সীমার মানুষের থাকার ব্যবস্থা ছিলো। যার ফলে শ্রমিকের ন্যুনতম মজুরির ব্যাপারটাও সম্ভবপর হয়েছিল। ২০১৮ সালে এই এলাকার আবাসনের চিত্র বেশ একটু পরিবর্তীত হ’য়েছে। রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকাকে ঘিরে বহুতল আবাসন এলাকার ঘনত্ব বেড়েছে। আশেপাশে আরো কিছু কারখানা নির্মাণ হওয়ায় শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। তবে আশপাশের গ্রামগুলো এখনো কম মজুরির শ্রমিক সরবরাহ ক’রে চলেছে। সেটা নিচের চিত্র থেকে খানিকটা বোঝা যাবে।

Shavar EPZ 2018
সাভার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা – ২০১৮

এই এলাকাতে বা এর খুব নিকটে আরো একটি রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গ’ড়ে তুললে সেখানে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক এর আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করার সুযোগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। চট্টগ্রামের রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকার জন্যও মোটামুটিভাবে একই কথা বলা যায়।

Chattogram EPZ 2013
চট্টগ্রাম রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল – ২০১৩

২০১৩ এর চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বেশ নিকটেই নিম্ন-আয়ের শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা আছে। এবং এই ব্যবস্থার জন্য কারখানা-বিনিয়োগকারীদেরকে কোনো উদ্যোগ নিতে হয়নি। ফলে শ্রমিকের কম মজুরির ব্যাপারটা খানিকটা হ’লেও সাস্টেইনেবল হ’য়েছে। আর সেজন্যই ২০১৮ এর শেষে এসেও চিত্রটা মোটামুটি একই রকম আছে।

Chattogram EPZ 2018
চট্টগ্রাম রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল – ২০১৮

যদিও রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের চিত্র খুব একটা পাল্টায়নি, তবে আশেপাশের আবাসিক এলাকার ভবন-ঘনত্ব বেড়েছে। বন্দর-সুবিধা বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। এই এলাকার উত্তরে অবস্থিত হালিশহরের জন-ঘনত্ব দিনদিন বাড়ছে। তাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি শ্রমিকের চালান পেতে এখনো পর্যন্ত বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। আর হয়নি ব’লেই শ্রমিকদের আবাসন নিয়ে বাংলাদেশকে ইথিওপিয়ার মতো বিপদে পড়তে হয়নি এখনো পর্যন্ত।

(চট্টগ্রামের পতেঙ্গা-শৈকত সংলগ্ন ইপিজেডের পশ্চিম পাশের ভূমিরূপের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সাগরের পানির উচ্চতা যে বাড়ছে তা এই জায়গার ২০১৩ আর ২০১৮ এর উপগ্রহ-চিত্র থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে।  সাড়ে ৫ বছর সময়ের ব্যবধানে অনেকটা জায়গা সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছে।  ইপিজেডকে রক্ষা করার জন্য নতুন বাধ তৈরী করা ছাড়া বিশেষ একটা বিকল্পও ছিলো না খুব সম্ভবত। এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ আছে)

এই সুযোগে ইথিওপিয়ার নতুন রপ্তানি-নির্ভর কারখানা-অঞ্চলের উপগ্রহ-চিত্রও একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে।

Ethiopian EPZ 2019
ইথিওপিয়ার বিদেশী বিনিয়োগ অঞ্চল – ২০১৯

গুগল-আর্থ ব’লছে উপরের চিত্রটি ২০১৯ এর মার্চ মাসের। কারখানা-অঞ্চলটি ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার বেশ নিকটে হ’লেও কারখানা-এলাকার গা ঘেষেই তেমন কোনো আবাসিক এলাকা দেখা যাচ্ছে না, যেমনটা বাংলাদেশের দুইটা রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আর এজন্যই এখানে শ্রমিকদের আবাসনের পেছনেও বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত ব্যবস্থার পেছনেও নতুন ক’রে খরচ করতে হচ্ছে। আলোচনাটা শুধুমাত্র আবাসন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নিমিত্তে শ্রমিকের দক্ষতার প্রশ্নটা আপাতত মুলতবি রাখছি।

উপরের উদাহরণ থেকে অন্তত একটা বিষয় বেশ বোঝা যায়। আর সেটা হ’লো কারখানার উৎপাদন খরচ কম রাখতে পারার পেছনে আবাসন ব্যবস্থার ধরণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আর এ কারণেই কারখানা কিমবা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জায়গা নির্বাচন এবং তার পরিমাণ নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

সাভার এবং চট্টগ্রামের রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের আশেপাশের আবাসন ব্যবস্থাকে একটা সফল (খানিকটা হ’লেও) কেস-স্ট্যাডি হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। যদিও এই আবাসন ব্যবস্থা সেই অর্থে পরিকল্পিত নয়। কিন্তু নতুন কারখানা-অঞ্চল আর তার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ক’রতে গেছে এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বুঝে নেওয়াটা সহায়ক হ’তে পারে। কিছু বৈশিষ্ট্য এমন হ’তে পারে –

– কারখানা অঞ্চলটি একটি মূল-সড়কের সাথে যুক্ত।
– করখানা অঞ্চলটি আকারে অনেক বড় নয়। ফলে মোটামুটি ১৫ থেকে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে না।
– আশপাশের গ্রাম বা উপশহর এলাকা থেকেই প্রয়োজনীয় শ্রমিকের বড় অংশের সংস্থান হয়।
– একটি বড় শহর থেকে কারখানা অঞ্চলটি খুব বেশি দূরত্বে নয়। ফলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়েছে।

দেশে নতুন ক’রে যে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গ’ড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হ’চ্ছে সেখানে আবাসনের ব্যাপারটা কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে সেটা জানতে পারিনি এখনো। সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া-শিল্পের জন্য যে অঞ্চলটি গ’ড়ে তোলা হয়েছে সেখানে নানা ধরণের সমস্যা এরই ভেতরে শুরু হয়েছে ব’লে খবরে আসতে শুরু করেছে। উপগ্রহ-চিত্র থেকেই ধরতে পারা যায় যে এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিক পাওয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ার সম্ভাবনা বেশ বেশি।

Hemayetpur Leather Industry Zone 2019
সাভারের হেমায়েতপুর চামড়া শিল্প/কারখানা অঞ্চল – ২০১৯

হেমায়েতপুরের এই জায়গাটাতে আরো কিছু কারখানা আগে থেকে থাকলেও এর আশপাশের আবাসিক এলাকা এতবড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সাপোর্ট দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। আর এই এলাকাতে আগে থেকে বাস ক’রে আসা মানুষগুলো মূলত কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিলো। ট্যানারির কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা দক্ষ শ্রমিকদেরকে এই অঞ্চলের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা করাটা এখন খুবই জরুরি হ’য়ে পড়েছে। তাদের জন্য কী ধরণের আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা যায় সেটা নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা উচিত। আমার মনে হয় না কাজটা খুব সহজ হবে। যদিও মূল-সড়ক থেকে এটা খুব দূরে অবস্থিত নয় তার পরও।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরেরসরাই এবং ফেনীর কিছুটা এলাকা নিয়ে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল গ’ড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে যে পরিমাণ লোক কাজ করবে ব’লে বলা হচ্ছে তার ১০ শতাংশ মানুষও ঐ এলাকার আশেপাশে বাস করে না। তার উপর যারা কাছাকাছি বাস করছে তাদের দক্ষতা  নতুন কারখানাগুলোর জন্য পয়োজনীয় দক্ষতার সমকক্ষও নয়। ফলে এখানে একেবারে নতুন ক’রে আবাসন ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতেই হবে। তার ধরণ বা প্রকৃতি যে আমাদের দেশের আগের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে ধার করা যাবে তা মনে হয় না। হেমায়েতপুরের ট্যানারি-কারখানা অঞ্চল থেকে এই ধরণের পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। আর সেটা খুব দ্রুতই শুরু করা দরকার ব’লে মনে করি।

সূত্র :
১. https://www.prothomalo.com/economy/article/1608205/%E0%A6%87%E0%A6%A5%E0%A6%BF%E0%A6%93%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%80

বিভাগবিহীন

প্রবচন – ২৬

বিডিনিউজ২৪.কমে প্রকাশিত একটি খবর,
“ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগে ২৬ বছর আগের এক মামলায় বর্তমানে বিলুপ্ত পলিক্যাম ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের পরিচালক আবদুর রবকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।”

এরপরও যদি কেউ মনে করেন যে, আমাদের বিচারবিভাগের কার্যক্রম জনৈক সিনেমা-ভাড় দিলদারকে হার মানাতে পারেনি, তবে বলতেই হবে – তুই বেটা কমিডি-ব্ল্যাঙ্ক।

খবরসূত্র: https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1590501.bdnews

 

 

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০২

২০১২ সালের এক হিসাব মতে (১) ৩২৫ বর্গকিলোমিটারের ঢাকা শহরে প্রতি বর্গ-কিলোমিটারে মোটামুটি ৪৫০০০ জন মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান থেকে ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকার জন-ঘনত্ব বের করা একরকম অসম্ভব। কারণ শহরের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে বিভিন্ন ধরণের সেনানিবাস, দুইটি বিমান-বন্দর, অফিস-পাড়া, আদালত পাড়া, অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি বিভিন্ন ধরণের শিল্প ও বাণিজ্য এলাকা। এই সব এলাকাগুলোতে যারা কাজ করতে যায় তাদের বেশির ভাগই শহরের আবসিক এলাকাতে বসবাস করে। কেউ কেউ হয়তো দিনের কাজ শেষ ক’রে পার্শ্ববর্তী শহর যেমন নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ বা সাভারে চ’লে যায়। প্রতিদিন যত সংখ্যক মানুষ ঢাকা শহরে কাজ করতে আসে তা হিসাবে নিলে ঢাকা শহরের জন-ঘনত্ব আরো বেশি হবে। আবার এই বিবেচনায় বলা যায় জন-ঘনত্ব ব্যাপারটা দিন এবং রাতের সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল।

ঢাকা শহরের কি পরিমাণ জায়গা আবাসিক এলাকা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সেটা বের করা গেলে আবাসিক এলাকার জন-ঘনত্ব বের করা যাবে। অথবা আমরা একটা বিপরীত পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি। আগের পোস্টের উত্তরা ১৩ নাম্বার সেক্টরটি একটু হিসাব ক’রে দেখা যাক। আমরা সেক্টরটির একটি ডায়াগ্রাম বা পরিলেখ তৈরী করেছি। সেখানে বিভিন্ন আকারের মোট ৮৮৪ টি আবাসিক প্লট আছে। প্রতিটি প্লটে ৭ তলা বিল্ডিং এবং প্রতিটি তলাতে একটি ক’রে আবাসিক ইউনিট ধ’রলে মোট ইউনিটের সংখ্যা দাড়ায় ৫৩০৪টি। প্রতিটি ইউনিটে ৪ জন ক’রে মানুষ হিসাব ক’রলে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে মোট বসবাস করছে ২১,২১৬ জন।(যদিও অনেকগুলো প্লটের প্রতিতলায় একের অধিক মহল বা এ্যাপার্টমেন্ট আছে। আমরা হিসাবের সুবিধার জন্য এখানে একটি ক’রে ধ’রে নিয়ে হিসাব করছি। আবার তিনটি শোবার-ঘরের একটি মহলে অনেক ক্ষেত্রেই ৫ জন ক’রে বাস করে ব’লে হিসাব করা হয়।)

Uttara Sector 13 LAYOUT
উত্তরা সেক্টর ১৩ এর লে-আউট পরিলেখ

১৩ নম্বর সেক্টরের তিন দিকের রাস্তার পুরোটা, মাঝের মাঠ এবং পার্ক, ভেতরের সমস্ত রাস্তা এবং উত্তর দিকের বাণিজ্যিক প্লটগুলো সহ মোট জমির পরিমাণ ৫৫৭৪ কাঠা। সেই হিসাবে এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করছে ৬,১২,০৫২.২৯ জন। ছয় লক্ষ বারো হাজার বায়ান্ন জন। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য রকমের বড়।

হাউজিঙের জন্য বাংলাদেশে একটি বিধিমালা আছে। বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি-উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪ নামে। ২০১৫ সালে এই বিধিমালাতে বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই বিধি মোতাবেক বেসরকারী-আবাসন প্রকল্পের প্রতি একরে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ বাস করার অনুমোদন নেই। উপরের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে প্রতি একরে ২৩০.২৮ জন মানুষ বসবাস করছে। অর্থাৎ বিধি মোতাবেক এখানে আরো বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার সুযোগ আছে। সেই সুযোগ নিতে চাইলে প্লটগুলোর লে-আউট যে পাল্টাতে হবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ প্লটগুলোর লে-আউট এমনভাবে করা হয়েছে যেখানে ৭ বা ৮ তলার বেশি উঁচু ভবন বানানো অর্থনৈতিক বিবেচনায় লাভজনক নয়।

এই ধরণের প্লট-কেন্দ্রিক আবাসিক প্রকল্পে মানুষের শরীরের পক্ষে সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকছে না। কিভাবে সেটার ব্যবস্থা করা যায় সেটা নিয়ে শহর পরিকল্পনা আর ভবন পরিকল্পনার সাথে জড়িত পেশাজীবীদেরকে ভাবতে হবে। এই সব ক্ষেত্রের একাডেমিতেও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আর ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ঘন-বসতির শহরগুলোতে বর্তমানের ছোট ছোট কিছু প্লট একত্রিত ক’রে বড় আকারের প্লট তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার বিলম্ব না ক’রেই। কারণ ছোট প্লট সব বিচারেই সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন সুউচ্চ আবাসিক ভবন তৈরী হচ্ছে এবং সে সব ভবন পরিবেশ-বান্ধবও। আমাদের দেশেও সেটার চাহিদা আছে। কারণ পরিবেশ বান্ধব ভবনের বাসিন্দাদের চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে ঢাকার বা চট্টগ্রামের আলো-বাতাসহীন ভবনের বাসিন্দাদের থেকে কম হয়। আবাসিক ভবনগুলো পরিবেশ-বান্ধব হওয়াটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এই ভবনগুলোর ব্যবহারকারী আক্ষরিক অর্থেই সব বয়সের, সব পেশার মানুষ। আর অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক মানুষের আবাসিক ব্যবস্থা গ’ড়ে তুলতে হ’লে ভবনগুলোকে আকাশমুখী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন আমাদের হাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ প্রচুর। কিন্তু উত্তরার সেক্টর-১৩ এর মতো হাউজিং-পরিকল্পনা নানা ভাবে আমাদের হাতে থাকা সমসাময়িক নির্মাণ-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধ’রে এই সব ভবনে বাস করা মানুষের শরীরে বাড়ছে দুরারোগ্য আর স্থায়ী নানা অসুখ। আথচ মানুষের ঘর বা আবাসিক স্থান বানানোর মূলে যে ভাবনাগুলো ছিলো তার একটা হ’লো বেচে থাকার ভাবনা এবং তা সুস্থভাবে।

সুউচ্চ আবাসিক ভবনের সবকিছুই যে আমাদেরকে সুবিধা দেয় তাও নয়। যেমন তার নির্মাণ খরচ আপাতভাবে বেশি। এমন ভবন ডিজাইন এবং নির্মাণ করার মতো দক্ষ লোকেরও ঘাটতি আছে দেশে। এই ধরণের ভবনে বাস করা মানুষগুলোর ভেতরে সামাজিক সম্পর্ক কিভাবে গ’ড়ে উঠবে সে সম্পর্কে আমাদের বোধগম্য ধারণা খুব বেশি নেই, যেহুতু সুউচ্চ আবাসিক ভবনে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি দিনের নয়। আবার এই কিছু দিন আগেও ১০ তলা ভবনকেই আমরা সুউচ্চ ব’লে মনে করতাম। উপরন্তু সুউচ্চ ভবনের ব্যবহারগত (অপারেশন) খরচ বেশি। আবার আমাদের বেশিরভাগই প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে অর্থাৎ গাছপালা আর পশুপাখির সাথে, এমনকি পোষা হ’লেও, থাকতে স‌্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমাদের সাধারণ ধারণায় নেই যে সুউচ্চ ভবনে এগুলোর সবই ব্যবস্থা করা যায়। হয়তো কিছু বছর আগেও যেতো না। কিন্তু এখন যায়। পৃথিবীর নানা দেশেই স্থপতিরা এমনসব সুবিধাসহ আবাসিক ভবন ডিজাইন করছেন। স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশেও এমন কিছু ভবন তৈরী হয়েছে। তবে সেগুলোর খবর আমাদের সবার কাছে পৌছেনি বললেই চলে।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.newgeography.com/content/003004-evolving-urban-form-dhaka

বিভাগবিহীন

আমার আসন্ন-নির্বাচন ভাবনা-২০১৮

যেহেতু সামনে নির্বাচন আসছে, সেটা নিয়ে আমাদের কিছু ভাবনা থাকা দরকার। কিন্তু ভাবতে চাইলেই কি ভাবা যায়? আমি তো পারছি না। মোটামুটি আগামী ৭০/৮০ দিনের মধ্যে হয়তো নির্বাচন হবে। কিন্তু আমরা এখনো জানি না এই নির্বাচনে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের প্রকৃতি কেমন হবে। এমনিতেই আমাদের নির্বাচন-ব্যবস্থাটাতে স্পষ্টতার অভাব আছে। আমরা কখনই জানি না আমাদের প্রধান-মন্ত্রী পদের জন্য কে কে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য যোগ্য ব্যক্তিরা দলীয় মনোনয়নের আওতায় আছেন কিনা তাও নির্বাচনের আগে জানা হয়না আমাদের। অনেকক্ষেত্রে একেবারে শেষ মুহূর্তে জানা যায় স্থানীয় সংসদীয়-আসনে কে বা কারা মনোনয়ন পেয়েছেন।

এই ধরণের একটা প্রাক্টিস দাড়িয়ে গিয়েছে দেশে। আমার কাছে এমন নির্বাচনকে এক ধরণের জুয়া খেলা ব’লে মনে হয়। আমি ভোট দিতে যাওয়ার আগে কী কী বিষয় বিবেচনা করবো তা কখনোই বুঝে উঠতে পারি না। সংসদ-নির্বাচনে প্রতিটা ভোটারকে মোটা দাগে দুইটা বিষয় ভাবতেই হয়, আর তা হলো এলাকার স্বার্থ আর দেশের স্বার্থ। একজন মানুষ যিনি কিনা এলাকার স্বার্থ বেশ ভাল বুঝতে পারেন, তিনি হয়তো দেশের সামগ্রিক স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে নাও অনুধাবন করতে পারেন। মনে রাখা দরকার মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। অতীতের নির্বাচনগুলোত দাড়ানো এবং জিতে আসা মানুষগুলোর ভেতরেও যেমন নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ছিলো, আগামীর নির্বাচনগুলোতে দাড়ানো এবং জিতে আসা মানুষগুলোর ভেতরেও তেমনটা থাকবেই। ভোটার হিসেবে আমাদের কাজ হওয়ার কথা- সময়ের প্রয়োজন-বিবেচনায় এই মানুষগুলোকে নির্বাচন করার সময় আমাদের জানা-শোনা আর বিবেচনাকে ব্যবহার করা, অন্তত আমি এমনটাই বুঝি।

কিন্তু আমার মনে হয় না আমরা ভোটাররা বিবেচনা করার মতো সময় এবং সুযোগ পাচ্ছি। এই দেখি, কোনো রাজনৈতিক দল ঢালাওভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। আমি বুঝি না তারা কেমন তরো রাজনৈতিক দল। আবার এই দেখি, সংসদের সব দলের লোকই সরকারে। তাহ’লে আমার বা আমাদের নির্বাচন করার প্রয়োজনই বা থাকলো কোথায়? হ্যা, আমার বিবেচনার সাথে অনেকের বিবেচনা নাও মিলতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের বিবেচনাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়াটাই তো গণতন্ত্র, যদি না আমার জানাতে ভুল থাকে। আমি পরিষ্কার ক’রে ব’লতে চাই, সব দল মিলে সরকার গঠিত হোক এটা আমি চাই না। আমি/আমরা নির্বাচনের সময় অনেক বিকল্প থেকে একজনকে বা একটা দলকে বেছে নিই বা একজনের উপর আমাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আস্থা রাখি। অনেকগুলো দল মিলে যখন জোট তৈরী করে সেটা আমার বিবেচনায় এক ধরণের রাজনৈতিক প্রতারণা। আমি যে এই ধরণের প্রতারণার শিকার হ’তে চাই না তা দ্বিধাহীনভাবে ব’লতে পারি।

এখন যারা সরকারে আছেন তারা যে পরবর্তী নির্বাচনের প্রচারণার জন্য তাদের উন্নয়ন কার্যক্রমকে হাইলাইট করবেন – সেটা বেশ বোধগম্য। তবে নির্বাচনের সময় আমাদের মতো ভোটারদের মনে যে শুধু এই ভাবনাগুলোই কাজ করে তা কিন্তু নয়। কী কী কাজ হয়েছে তার থেকে আরো কী কী কাজ করা যেতে পারে সেই বিবেচনাটা অনেক বেশি মুখ্য হ’য়ে ওঠে নির্বাচনের আগে আগে। তখন সরকারে থাকা পুরোনো লোকগুলোকে মূল্যায়নের প্রশ্ন চ’লে আসে। আমাদের কোন কোন সংসদ-সদস্য বা মন্ত্রী তাদের দায়িত্ব মোটামুটি সন্তোষজনকভাবে পালন করেছেন আর কে কে করেননি সেটার একটা তালিকা আমাদের মনে ঠিক তৈরী হ’য়ে যায়। অনেকে হয়তো গত ৫ বছরের চাহিদার বিবেচনায় মোটামুটি উতরে গেছেন। কিন্তু আমাদেরকে ভাবতে হবে আগামী ৫ বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কে কে যোগ্য হ’য়ে উঠতে পারেন। নির্বাচন ব্যাপারটাই ভবিষ্যৎ-মুখী।

আমার বারবার ২০০১ সালের নির্বচনের কথা মনে পড়ে। সে নির্বাচনের আগের সরকারের অনেক সাফল্য ছিলো। মোটা দাগে দেশের বেশির ভাগ মানুষ সেটা বুঝেছিলোও ব’লে আমি মনে করি। তবুও সেই সরকার পুনর্নিবাচিত হয়নি কেন সেটা নিয়ে আমি বেশ ভেবেছি। আমি শুধু দুইটা কারণ খুঁজে পাই। প্রথমটা হলো, নির্বাচন নিয়ে এই যে জোট বাধার ব্যাপারটা। আমরা সাধারণ ভোটারা যে প্রতারিত হ’য়েছি সেবছর তা মোট ভোটের হিসাব দেখলেই টের পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয়টি হলো- জয়নাল হাজারী, ডা. ইকবাল এবং শামীম ওসমান। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে তার ব্যর্থ এবং অযোগ্য লোকগুলোকে চিহ্নিত করাটা খুবই প্রয়োজনীয়, যদি তারা আগামী দিনের সরকার গঠন করতে চান। জনৈক শাহজাহান খান নিশ্চিত ভাবেই বর্তমান সরকারের এমন একজন ব্যক্তি যাকে নিয়ে সন্দেহ করা যায়। এই ধরণের ব্যক্তিরা যদি আবারো মনোনয়ন পেয়ে যায় তবে আমাদের মতো সাধারণ ভোটারদের জন্য তা এক ধরণের উপহাস হ’য়ে দাড়ায়। জানি না আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের এমন ভাবনাগুলো ঠিক বুঝতে পারেন কিনা।

সবগুলো রাজনৈতিক দলের কাছেই চাই, তারা যেন তাদের অতীতকে মূল্যায়ন করেন। আর দেশকে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনাগুলো যেন আমাদের কাছে পরিষ্কার ক’রে প্রকাশ করেন। নির্বাচনের আগে আমাদেরও অনেক কিছু ভাবার আছে। সে ভাবনার জন্য যে সময়টুকু দরকার তা যেন আমরা পাই সেটা নিশ্চিত করাটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের ভেতরে পড়ে। আগামী নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ এবং তা প্রকাশ করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাজ-কারবার বেশ হতাশার। আমরা এখনো জানি না আগামী নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ কবে, অথচ এই সংসদের শেষ অধিবেশনও হ’য়ে গিয়েছে। কবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটা যদি যথেষ্ট সময়ের আগে আমরা জানতে না পারি তবে আমাদের পক্ষে সঠিক লোক নির্বাচন করাটা খুব কঠিন হ’য়ে পড়ে।

বিভাগবিহীন

বাংলাদেশে বাসস্থান পরিকল্পনা – ০১

আমরা অনেকেই মনে করি মানুষের জন্য বাসস্থান একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে সেটার উল্লেখও আছে। যেহেতু সংবিধান একটি রাষ্ট্রীয় বিষয়, অর্থাৎ রাষ্ট্র থাকলে তার জন্য একটা সংবিধানের দরকার পড়ে, সেহেতু সংবিধানে উল্লেখ থাকা বিষয়গুলোর ব্যাপারে রাষ্ট্রের কিমবা রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু ভূমিকা আছে ব’লে ধ’রে নেওয়া যায়। ভূমিকাটা কেমন হবে সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রকৃতি আর সামর্থের উপর।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে ‘বাজার অর্থনীতি’ বেশ প্রভাব বিস্তার ক’রে আছে। ফলে এখানকার আবাসন প্রকল্পগুলোতেও বাজার অর্থনীতির মূলনীতিগুলো কার্যকর। তার সাথে আছে মানুষের জীবনযাত্রার ধরণের সম্পর্ক। শহুরে-জীবনযাত্রা আর গ্রামীন-জীবনযাত্রার ভেতরে এখানে বিস্তর ব্যবধান আছে। শহুরে-জীবনযাত্রাও কম বৈচিত্রময় নয়। বরং বলা যায়, শহুরে-মানুষের আয়ের সীমাটাতে অনেক কম-বেশি আছে ব’লে তাদের জীবনের প্রয়োজনগুলোর ধরণও নানাবিধ রূপ নিয়েছে। শহরের উচ্চ-আয়ের মানুষের বসতির চাহিদার সাথে এর নিম্ন-আয় আর মধ্য-আয়ের মানুষের চাহিদার হের-ফের অনেক বেশি হওয়াই দুরস্তু। বাজার অর্থনীতি উচ্চ-আয়ের মানুষদেরকে এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা সুবিধাও দেয়। আবার প্রান্তিক মানুষেরা যে একেবারে কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না তা হয়তো বলা যাবে না। তবে তাদেরকে আরো একটু গোছানো ব্যবস্থা দেওয়া গেলে তা সার্বিকভাবে অর্থনীতির জন্য সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

অবশ্য গোছানো ব্যাপারটাই যেন বাংলাদেশে নেই। এদেশে কোনো একটা শহর নেই যাকে গোছানো বা ডিজাইনকৃত বলা যায়। শহরের কোনো কোনো অংশে যদিওবা খানিকটা পরিকল্পনার ছোঁয়া দেখা যায় কিন্তু তা যে সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ নয় তা দ্বিধাহীন ভাবেই বলা যায়। এই ধরণের একটা পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো একটু ডিটেইলে জানা দরকার যদি আমরা আসলেই আমাদের শহরগুলোকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে চাই। বড় দাগে দুটো কারণ সহজেই সনাক্ত করা যায়। প্রথমটা হ’লো দেশে শহরকে নিয়ে পরিকল্পনা করার মতো দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকা, আর দ্বিতীয়টা হ’লো শহর-পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে যে শহরের বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তিতে বাড়তি মূল্য-সংযোজন (ভ্যালু এ্যাড) করা যায় সে ব্যাপারে আমাদের সিংহভাগ নাগরিকের সামগ্রিক ধারণা না থাকা।

বাংলাদেশের প্রায় সব শহরেই জমির দাম বাড়ছে। সবগুলো শহরেই নতুন নতুন অনেক বিল্ডিং তৈরী হচ্ছে। সে যেমন সরকারী উদ্যোগে, আবার বেসরকারী উদ্যোগেও। সরকারী বিল্ডিংগুলো তৈরীর পেছনে রাজনৈতিক ভূমিকা বড্ড বেশি। অনেক সময় হয়তো বাড়তি প্রয়োজন মেটানোর জন্য পুরনো কোনো সরকারী বিল্ডিঙকে বর্ধিত করা হচ্ছে। তাতে শহরে নতুন কাজের সুযোগ বাড়ছে। তার উপর আরবান সুযোগের সহজ-লভ্যতাও দিনদিন মানুষকে শহরের দিকে টেনে আনছে। সাথেসাথে প্রাকৃতিক পরিবর্তন/বিবর্তনের ফলেও বাড়ছে গ্রাম থেকে শহরে আসা অভিবাসীর সংখ্যা। সব মিলিয়ে শহর বড় হচ্ছে যেমন আয়তনে-কলেবরে, একই সাথে জনসংখ্যার বিচারেও। আর শহরের দিকে ধেয়ে আসা এই মানুষের ঢল বাড়িয়ে দিচ্ছে শহরের আবাসন-অবকাঠামোর চাহিদা। চাহিদার ব্যাপারটা আমরা বেশ প্রকটভাবেই বুঝতে পারছি। তবে সেই চাহিদাকে মেটানোর পদ্ধতি নিয়ে আমাদের খাটুনির পরিমাণ একরকম নগন্যই। এর জন্য এর সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের যেমন দায় আছে তেমনি দায় আছে দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের। দেশের মানুষের সামাজিক-সংস্কৃতির ভূমিকা আর সম্পদের প্রকৃতি বুঝে ব্যবস্থা নিতে না পারার অযোগ্যতাও এক্ষেত্রে কম দায়ী নয়।

যেহেতু আমাদের সবগুলো শহর অপরিকল্পিতভাবে (অর্গানিক ওয়ে) গ’ড়ে আর বেড়ে উঠেছে তাই এদের রাস্তার নেটওয়ার্ক খুবই এলোমেলো। ফলে শহরের সার্বিক জমির পরিমাণের অনুপাতে যতটা রাস্তা আছে সেগুলো যতটা কার্যকর হওয়ার কথা তা কখনোই হ’তে পারে না। আঁকাবাকা রাস্তাতে যাতায়াতকে চাইলেও খুব একটা গতিশীলও করা যায় না। আবার পারিবারিক সদস্যদের প্রতি আস্থাহীনতা আর অবিশ্বাসের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ’রে আমরা আমাদের জমিগুলোকে খণ্ডিত ক’রে চ’লেছি। তাতে যেমন আমাদের জমিগুলোর আকার দিনদিন ছোট হ’চ্ছে, সেই সাথে তাদের চেহারা হ’য়ে প’ড়ছে এলোমেলো। ফলে আমাদের শহরের জমিগুলোর সম্ভবনা যাচ্ছে কমে। তাতে নির্মাণ খরচও যাচ্ছে বেড়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মালিকানার জমিগুলো আমাদের আবাসনের ন্যুনতম চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা হারাচ্ছে। তাতে জমিগুলোর প্রকৃত মূল্যমান তো কমে যাচ্ছেই, বাড়তি মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা আর থাকছে না বললেই চলে।

ঐতিহাসিকভাবেই বঙ্গেয় ব-দ্বীপটাতে জন-মানুষের ঘনত্ব বেশি ছিলো। ১৯৭১ এর পর থেকে সেই ঘনত্ব-বৃদ্ধির হার আরো বেড়েছে। বলা হয় ১৯৯১ এর পর তা আরো দ্রুততর হ’তে থাকে। তার প্রভাব প’ড়তে শুরু ক’রেছে আমাদের বেশির ভাগ শহরেই। শহরগুলো বাড়ছে তাই। এই বৃদ্ধিটা যতটা উর্ধ্বমুখি/আকাশমুখি হওয়া দরকার ছিলো ততটা যে হয়নি তা বলাই যায়। ঢাকা আর চট্টগ্রাম শহরের অনেকগুলো জায়গাতে আমরা মোটামুটি ১০ তলা আবাসিক বিল্ডিঙে আভ্যস্ত হ’য়ে উঠছি। কোথাও কোথাও বা ১৪/১৫ তলা। কিন্তু তার উপরে আর যাওয়া হচ্ছে না। যাওয়া যে হচ্ছে না বা যাওয়া যে যাচ্ছে না তার একটা বড় কারণ পরিকল্পনাহীনতা। ঘন-বসতিপূর্ণ শহরগুলোতে আবাসনের জন্য আরো উপরে ওঠার ব্যবস্থা যদি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান কোনো উপায়ে না করা যায় তবে শহর আনুভূমিক ভাবেই বাড়তে থাকবে। আর কমতে থাকবে শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিমাণ। মানুষ শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক প্রাণীই। বেঁচে থাকার জন্য অনেকগুলো প্রাকৃতিক উপাদান তার লাগবেই। আর তাই আজকের দিনে বড্ড বেশি প্রয়োজন হ’য়ে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে শহর গ’ড়ে তোলা। সেই শহরকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই এবং চলনসই করতে হ’লে তাতে অধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আর তার আর্থিক ব্যবস্থাপনার দিকটা নিয়ে আমাদের নতুন ক’রে না ভাবলেই নয়।

আমাদের জমিগুলোর মূল্যমান কিভাবে নির্ধারিত হচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবা দরকার। কিভাবে তার ব্যবহার উপযোগীতা বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। আর ব্যবহার উপযোগীতা বাড়াতে না পারলে তার সম্পদ-মূল্য আসলে বাড়বে না। অনুপযোগী বা অব্যবহৃত সম্পদ আর্থিক-বিবেচনায় মূল্যহীন। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন, শহরের কোনো একটা জায়গাতে হয়তো একটা জমি আছে অথচ সেখানে যাওযা যায় না; সেই জমির আসলে কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। আবার একই পরিমাণ জমিতে যদি ১০’ বা ২০’ বা ৩০’ বা ১০০’ প্রশস্ততার রাস্তা থাকে তাহলে তার মূল্য নির্ধারণ হয় আলাদাভাবে। অর্থাৎ জমির ব্যবহার উপযোগীতা আর যোগাযোগ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা আমাদের জমির মূল্যমান বাড়িয়ে ফেলতে পারি। এই কাজটাই যদি শহরের বেশিরভাগ জমির ক্ষেত্রে করা যায় তাহ’লে শহরকেই আমরা বাড়তি গুরুত্বপূর্ণ ক’রে তুলতে পারি। আর যে দেশে যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ শহর থাকে সেই দেশ তত সম্পদশালী হ’তে থাকে। আমরা আমাদের বাংলাদেশকে শুধুমাত্র কিছু সুচিন্তিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরো অনেকবেশি সমৃদ্ধশালী ক’রে তুলতে পারি। আর এই পরিকল্পনাগুলো শুরু করা যেতে পারে আমাদের আবাসন প্রকল্পগুলো থেকেই।

আমাদের পুরোনো আবাসিক প্রকল্পগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া দরকার। সেখানে কোন কোন ব্যাপারগুলো আমাদের জন্য সহায়ক হয়েছে, কোনগুলো হয়নি তা চিহ্নিত করা দরকার। শুরু করা যেতে পারে ছোট ছোট কোনো এলাকা ধ’রে। ছোট কোনো শহরকে নিয়েও। শুরু করছি আপাতত উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টর দিয়ে। নিচের ছবিটি গুগল-আর্থ থেকে ২৩-১০-২০১৮ তারিখে নেওয়া।

উত্তরা সেক্টর ১৩
ঢাকার উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর- গুগল আর্থ থেকে নেওয়া

পুরো সেক্টরটির চারপাশ দিয়ে ১০০’ এর অধিক প্রশস্ততার রাস্তা আছে। ভেতরের রাস্তাগুলো ২৫ থেকে ৩০ ফুট ক’রে প্রশস্ত। বেশিরভাগ প্লটের আকার ৩ কাঠার। সেই প্লটগুলোতেই এখনকার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি। তার আগে কোনো একটা চাঙ্ক একটু ব্লো-আপ ক’রে দেখে নিই-

উত্তরা সেক্টর ১৩-২
উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি ব্লক বা চাঙ্ক

মাঝ খানের হাউজিং চাঙ্কটিতে মোট ৪২টি প্লট আছে। ৫ টি প্লটে এখনো নির্মাণকাজ শেষ করা হয়নি। তারপরও এটা থেকে মোটামুটি বোঝা যায় বেশিরভাগ বিল্ডিংই ৬ কিমবা ৭ তলা বিশিষ্ট। আর বিল্ডিংগুলো অনেকটাই গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিটি বিল্ডিঙের জন্য ন্যুনতম যতটুকু সেট-ব্যাক জায়গা নির্ধারণ ক’রে দিয়েছিলো তা এখানে মানা হয়নি বললেই চলে। এটা থেকে প্রকল্পের পরিকল্পনার দীনতা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আর যেটা বোঝা যায় তা হ’লো, ইমারত-বিধি না মানার ব্যাপারে আমাদের আপাত পরিকল্পিত-এলাকার প্লটের মালিকদের মধ্যে এক ধরণের ঐক্যমত্য আছে। অথবা এই এলাকার ইমারত-চাহিদার সাথে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া বিধির পরিস্কার বিরোধ রয়েছে। আর অবশ্য অবশ্যই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা প্রকটভাবে প্রকাশ হ’য়ে পড়ছে।

এবার একটু পরিকল্পনাগত দিকে নজর দিই। এই ধরণের ৩ কাঠা জমির মাপ ৩৬’ গুণন ৬০’ হ’য়ে থাকে। ৩০’ প্রশস্ত একটি রাস্তা দুই পাশের মোট ৪২টি প্লটকে সার্ভিস দিচ্ছে। আবাসিক-জমি এবং সংলগ্ন-রাস্তার জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণের অনুপাত ৪:১। আপাতত সেই রাস্তার সাথে সংযুক্ত বড় রাস্তাকে বিবেচনার বাইরে রাখছি। এই হিসাবে একটা চাঙ্কের মোট এরিয়ার শতকরা ২০ ভাগ রাস্তা। এই ধরণের একটি চাঙ্কের আবাসিক  বিল্ডিংগুলোর ভেতরে কার্যত কোনো সামাজিক যোগাযোগ নেই। এটি পরিকল্পনার একটি ভয়াবহ ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা। দ্বিতীয়ত এই ধরণের প্লট-কেন্দ্রিক পরিকল্পার ফল স্বরূপ বিল্ডিঙের উচ্চতা সীমাবদ্ধ হ’য়ে পড়েছে। এই ধরণের প্লটে ৭ তলার উপরে বিল্ডিং বানানো প্রকৌশল আর আর্থিক দুই বিচারেই সুবিধাজনক নয়। চাহিদা আর মূল্যের টানাটানি, কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি না থাকা, ভূমিমালিকদের সম্পদ-পরিকল্পনার অদক্ষতা ইত্যাদি নানা কারণে এটি যথেষ্ট বাসযোগ্যও থাকছে না।

এরকম ২০টি চাঙ্ক বা ব্লকের সাথে ২টি বিশেষ চাঙ্ক মিলে গঠিত হ’য়েছে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরটি। সেক্টরটির মাঝখানে একটি পার্ক এবং একটি খেলার মাঠ আছে, যা কিনা এই সেক্টরটিকে বিশেষ সুবিধাভোগী ক’রেছে। যেমন পাশের ১৪ নম্বর সেক্টরেই এমন ধরণের কোনো সুবিধা নেই। আর সেখানকার চাঙ্কগুলোও এমন ধরণের লম্বাটে প্যাটার্নের (লিনিয়ার টাইপ)। যে কারণে একটা চাঙ্ক থেকে আর একটা চাঙ্কে হেঁটে যেতে হ’লে বেশ খানিকটা বাড়তি দূরত্ব পেরুতে হয়। এটা থেকে বোঝা যায় প্রকল্পটি পরিকল্পনার সময় প্রকল্পটির ভেতরে পায়ে হাঁটার ব্যাপারটা বিবেচনা করা হয়নি। আরো একটা সূক্ষ্ন বিষয় আছে। সেটা হ’লো, ২০০৮ এর বিধিমালা অনুযায়ী এখানে ৭ তলা বা তারো বেশি উঁচু বিল্ডিং বানানোর অনুমতি দেয়া যায়। অথচ এখানকার ৩ কাঠার প্লটে নিয়ম মেনে ৫টির বেশি পার্কিঙের ব্যবস্থা করা যায় না। আর এই ধরণের একটা ব্যবস্থা ভূমিমালিকদেরকে বিধির বাইরে গিয়ে ইমারত বর্ধিত ক’রতে প্ররোচিত করছে।

নিচের ছবিটি চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকার। এখানেও মোটামুটিভাবে উত্তরার প্যাটার্নটিই অনুসরণ করা হয়েছে। উত্তরার ক্ষেত্রে সবগুলো প্লটের জন্য একই ধরণের অরিয়েন্টেশন বা অভিমুখ (মূলত উত্তর-দক্ষিণ মুখী) বজায় রাখার চেষ্টা আছে। চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকার জন্য সেই অর্থে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিমুখ নেই প্লটগুলোর জন্য। উপর থেকে দেখা গুগল-আর্থের এই ছবি থেকে মনে হ’তেই পারে যে সর্বোচ্চ ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার জন্য এমনটা করা হয়েছে। চট্টগ্রামে বাতাসের গতিমুখ ঠিক দেশের বেশির ভাগ এলাকার মতো দক্ষিণা-প্রকৃতির নয়। ফলে এখানকার বিল্ডিংগুলোর অভিমুখ নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করার অবকাশ আছে। সুগন্ধা আবাসিক এলাকার এই পরিলেখ থেকে আর যেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয়না তা হলো, এই নগরীর অধিবাসীদের কিমবা ডিভেলপারদের আর অবশ্যই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক খালগুলোর প্রতি কোনো ধরণের আগ্রহ নেই। প্রাকৃতিক খালগুলোর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে তারা সবাই যেন অক্ষম।

Shughandha Residential Area. Chattogram
চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকা- গুগল আর্থ থেকে

মোটামুটিভাবে দেশে এই ধরণের একটা প্রটোটাইপ দাড়িয়ে গিয়েছে হাউজিঙের পরিকল্পনাতে। বেসরকারী উদ্যোগেও যেসব হাউজিং হচ্ছে গত দুই/তিন দশক ধ’রে তা খানিকটা এই ধরণেরই। এই ধরণটা আমাদের আবাসন ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ ক’রে ফেলেছে নানা ভাবে। বিল্ডিঙের উচ্চতা বাড়ানো যাচ্ছে না, ফলে সম্পদের মূল্যমান বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রাকৃতিক পরিবেশ নাজুক হ’য়ে প’ড়ছে। আবাসন প্রকল্পে দীর্ঘদিন বাস ক’রেও এখানকার মানুষদের ভেতর কমিউনিটি গ’ড়ে উঠছে না। অথচ আবাসন পরিকল্পনার প্রধান একটা চাহিদাই হ’লো তাতে ভালো একটি কমিউনিটি গ’ড়ে তোলা।

নগরী · স্থাপত্য

City of Dhaka – 8

‘I feel comfortable in this city of Dhaka.’ For me this statement carries both  truth and lie simultaneously. In deed I do not feel any compassion amid this spaceless place. Yet I can’t think of any other place in this little country that can offer me any kind of practical comfort or easiness to survival issues for people like us who had to leave their native towns or villages only to find work. Today I live here only to live by. I like to feel comfortable here only with a notion to stay tacit about my immensely uncomfortable dissatisfaction propagated by this city-life. I must agree that this city has a great talent to delude (ভুলিয়ে রাখা) its citizens about their own desire, despair or discomfort and so on.  I forget to remember I don’t belong here. I forget to remember once I used to have desires other than living.

The city is so successful in deluding on certain matters  that the constant presence of the lack of the public avail-abilities, which are very much needed for a city to function at its minimum level, makes us disheartened in every possible way and we have developed a notion to indulge this heinous  phenomenon. The reality of this unavailability of modern day amenities in the city seems to be so unreal to its citizen that the imagined absurdity overwhelmingly succumb our thought process and keep us away from the actual reality. And we become the victims of a massive conundrum, namely the Dhaka city. We are ransacked so much in the very core of ourselves by this conundrum that we are just mass people, no matter how massive in number, without any massive desire. The city we are building is not a creation out our desires.

In this city we walk only to reach destinations. We can hardly collect memories of walking through its spaces, though we all have to walk a lot. And at the end of the day we get a physical feeling of numbness which helps us erase the memory of our walking. The corridors of the work-place, the footpaths, the market isles all are too tiring and too monotonous and so they continuously generate fatigue. We  learn to see without watching the details of the corner. At the corners we hardly meet our friends, rather we only look out, so that we don’t get hurt. Only digital tracking system knows two or more friends passed the same corner of the city at the same time. And we only get that information on the social media after our leave.

বিভাগবিহীন

২০১৮ তে সড়ক সম্পর্কে

শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহের উপরে রাস্তায়। মূলত চাওয়া সড়কে নিরাপত্তা। চাওয়াটা আমাদের অনেকেরই। আমাদের যাদেরকে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়। শহরের ভেতরে এবং বাইরেও। অথচ আমরা অনেক দিন ধ’রেই জানি আমাদের সড়ক নিরাপদ নয়। কেন নয় তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। সব কারণ খুঁজে বের ক’রতে হয়তো কয়েক মাসের স্ট্যাডি আর সার্ভের দরকার প’ড়বে। তবে আমরা যারা নিয়মিত রাস্তায় যাতায়াত করি তারা অভিজ্ঞতা আর কমন-সেন্স থেকে বেশ কিছু কারণ বলতে পারি। যেমন,

১. মান-সম্পন্ন/দক্ষ চালকের অপ্রতুলতা আছে দেশে। ডেইলি স্টার বলছে ঢাকাতে ৩৫ লাখের বেশি নিবন্ধিত গাড়ি আছে। তার বিপরীতে নিবন্ধন-ধারী চালক আছে ২৬ লাখের কিছু বেশি। অবার প্রচুর সংখ্যক গাড়ি নিবন্ধনের বাইরেও রয়ে গিয়েছে।

২. পাবলিক ট্রান্সপোর্টের গাড়িগুলোর অনেকগুলোর ফিটনেস নেই, ফিটনেস-সার্টিফিকেটের কথা বলছি না। এই ব্যাপারটা কিছুক্ষণ রাস্তায় দাড়িয়ে থাকলেই টের পাওয়া যায়। তার জন্য এমনকি গাড়িগুলোকে কোনো ফিটনেস টেস্টের মুখোমুখি করারও দরকার পড়ে না। গাড়ির সবগুলো ভিউয়িং-আয়না আছে, জানলার সবগুলো কাঁচ অক্ষত আছে, সবগুলো ইন্ডিকেটর (নির্দেশক) বাতি জ্বলতে পারে এমন বাস ঢাকাতে দেখতে পাওয়া বিরল ঘটনা। বরং রাংচটা আর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ঝুলে আছে এমন বাসের সাংখ্যাই বেশি ঢাকার কিংবা চট্টগ্রামের রাস্তাতে।

৩. নগরীতে পর্যাপ্ত পাবলিক-ট্রান্সপোর্ট নেই। যে পরিমাণ মানুষ ঢাকার রাস্তায় যাতায়াত করে তার কোনো হিসাব আছে ব’লে মনে হয় না। থাকলেও তার ভিত্তিতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সংখ্যা নির্ণয় ক’রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কখনোই। সরকারের গত বিশ/ত্রিশ বছরের উন্নয়ন ভাবনাতেও এর উপস্থিতি ছিলো ব’লে মনে হয় না। বাসগুলোতে মানুষের গাদাগাদি ক’রে যাতায়াত করতে দেখলেই বোঝা যায় প্রয়োজনের তুলনায় কত কম পাবলিক-ট্রান্সপোর্ট সুবিধা এই ঢাকাতে আছে।

৪. পাবলিক-ট্রান্সপোর্টগুলোর ভেতর অসুস্থ প্রতিযোগীতা বেড়েই চ’লেছে। একই রুটে একাধিক কোম্পানির রুট-পারমিট থাকায় এটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে অনেক দিনই। তার উপর গাড়িগুলোর ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কোম্পানির উপর খুব কম ক্ষেত্রেই। গাড়ির মালিকেরা সকালে দুই/তিন জনকে গাড়ির দায়িত্ব দিয়ে ব’লে দেন দিন শেষে এত টাকা তাদেরকে দিতে হবে আর বাকিটা তাদের। এই ব্যবস্থাতে অসুস্থ প্রতিযোগীতা তৈরী হবেই। এমনকি একই কোম্পানির গাড়ির ভেতরেও প্রতিযোগীতা দেখা যায়। সেটা এই ধরণের ব্যবস্থাপনার জন্যই।

৫. পাবলিক-ট্রান্সপোর্টে নানা ধরণের চাঁদাবাজি আর মাফিয়ার উপস্থিতি আছে। যারা পাবলিক-ট্রান্সপোর্টের চালক আর হেলপারদের সাথে সামান্য কথা-বার্তা বলেন, তারা সবাইই খানিকটা এটা সম্পর্কে জানেন। ঢাকার বাসগুলোর মালিকানা মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের, পুলিশের আর আর্মির। পত্রিকার খবরও অনেকটা তাই বলছে।

৬. গাড়ির নিবন্ধন নিতে ঘুষ দিতে হয় বিআরটিএ তে। ফিটনেস সনদ নিতে ঘুষ দিতে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা দিতে গেলে ঘুষ দিতে হয়। তার উপর পুরো শহরের জন্য পরীক্ষা দেওয়ার জায়গার কমতি আছে। ফলে ঘুষ না দিয়ে ওগুলো করতে গেলে সময়ের অপচয় হয় প্রচুর। কোনো দিন হয়তো এক হাজার গাড়ি ফিটনেস সনদ নিতে এলো, অথচ দিনে ফিটনেস সনদ দেওয়ার সক্ষমতা হয়তো আছে অর্ধেকেরও কম। ফলাফল ঘুষের লেনদেন। কিংবা হয়তো এগুলো সাজিয়েই ঘুষের বন্দোবস্ত করা হয়।

৭. ড্রাইভিং শেখার স্কুলের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। যাও বা আছে তাদের বেতন-কাঠামো শহরের বা দেশের গড়পড়তা জনসাধারণের সার্বিক আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ড্রাইভিং শেখার স্কুলগুলোতে গাড়ি চালানোর জন্য জায়গাও আছে খুব কম ক্ষেত্রেই।

৮. নিজে ড্রাইভিং পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখেছি পরীক্ষা দিতে আসা অষ্টম শ্রেণী পাস করা অনেকে ঠিক মতো পড়তেই পারে না। ড্রাইভিঙের সনদের জন্য যে লিখিত পরীক্ষা হয় তার অনেক কিছুই তারা পড়তে পারছে না। লিখতে পারা তো আরো পরের কথা। স্কুল লেভেলের শিক্ষার মান নিয়ে এখানে বাড়তি কথা না বলাই ঠিক হবে সম্ভবত।

৯. যেহেতু দেশে গাড়ির উৎপাদন হয় না তাই অনেক সময়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। ফলে কোনো গাড়িতে ছোটখাটো কোনো সমস্যা দেখা দিলে অনেকসময়ই তা ঠিকঠাক করার উপায় থাকে না। বা তা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। বিআরটিসির দোতলা ভলভো বাসগুলোর ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছে। বেসরকারী বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের টাকাটা ওঠার আগে তাদের গাড়িগুলো ছোটখাট কিছু ত্রুটির জন্য ডাম্প করবেন এমনটা আশা করা বাতুলতা।

১০. ঢাকা শহরের রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। বেশির ভাগ রাস্তাই ভাঙাচোরা। যেগুলো ভাঙাচোরা নয় ব’লে মনে হয় সেখানকার ম্যানহোলগুলো হয় রাস্তার লেভেল থেকে উঁচু নয় নিচু। সড়কের স্পিড-ব্রেকারগুলোর উচ্চতা কখনই বাজারের গাড়িগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক’রে নির্ধারণ করা হয়না। তার উপর শহরে খুব কম রাস্তা আছে যেখানে বৃষ্টির পানির ড্রেনেজ ব্যবস্থা যথাযত। এমন রাস্তায় গাড়ির ফিটনেস ধ’রে রাখাও কঠিন।

১১. বাংলাদেশের রাস্তায় বিভিন্ন গতির গাড়ি চলার অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ সেগুলোর সমন্বয়ের জন্য তেমন কোনো ট্রাফিক প্ল্যানিং নেই। রাস্তার লেইনগুলো কেমন হওয়া দরকার তা নিয়ে ট্রাফিকের কোনো ভাবনা নেই। প্রয়োগ তো নেইই।

১২. ঢাকাতে গাড়ির ডিজাইন পরিবর্তনের হার খুব বেশি। প্রেট্রোল চালিত গাড়িকে সিএনজি চালিত করাটাকে আমরা হয়তো গণনাতেই নিতে চাই না। অথচ গাড়ি-ডিজাইনের সময় ডিজাইনার কিন্তু এই গ্যাস সিলিন্ডারটির ভরের ব্যাপারটা বিবেচনা করেননি। লেগুনাগুলোর কথা না বললেই নয়। এই গাড়িগুলো মানুষ পরিবহনের জন্য তৈরীই নয়। নগরীতে চলাচল করা বাসগুলোর বেশির ভাগ তাদের মূল চ্যাসিস থেকে লম্বা, আর সেগুলো স্থানীয়ভাবে করা। এই বাসগুলো ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন।

১৩. পর্যাপ্ত ফুটপাথ না থাকায় পথচারীদেরকে বেশির ভাগ সময়ই মোটরযানের পাশাপাশি হাঁটতে হয়। যা সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ। ফুটপাথ যেটুকু আছে তার একটা বড় অংশ বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়ীরা দখল ক’রে নিয়েছেন। আবার মোটরসাইকেল চালকেরা যখন তখনই ফুটপাথে উঠে পড়েন। অনেক পথচারী আবার ফুটপাথের সাথে থাকা ফুট-ওভারব্রিজগুলো একদমই ব্যবহার করতে চান না।

১৪. সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যেসব অথরিটির উপর তাদের অযোগ্যতা আর অবহেলার সীমা-পরিসীমা নেই। উপরন্তু এই অরাজকতাকে পুঁজি ক’রেই তারা দিনের পর দিন অবৈধ উপায়ে অর্থ বানিয়ে চ’লেছেন।

এ রকম আরো নানা কারণে রাজধানী ঢাকা এবং সারা দেশের রাস্তা নিরাপদ নয়। নয় সেটা অনেকদিন ধ’রেই। এবং এই ব্যবস্থা হঠাৎ ক’রে তৈরী হয়নি। রাজনীতি আর আমলাতন্ত্র এর জন্য পুরাপুরিই দায়ী। অথচ তাদেরকে সেটা বলারও যো নেই। বলতে গেলেই তারা আমাদের বিরুদ্ধে ‘sedition’ বা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তোলেন। তাদের দৃষ্টিতে আমরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হ’য়ে উঠি। অথচ এই অব্যবস্থাপনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করাটাই রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক হ’তে পারতো। প্রশ্নগুলো থেকে আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে পারতাম। এই প্রশ্ন করার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই হয়তো এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কাজ করতে পারেন এমন বেশ কিছু দক্ষ মানুষও আমরা গ’ড়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু আমরা তা পারিনি। ফলে সড়কের এই সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান আছে ব’লেই আজ আমরা সাধারণভাবে ভাবতে পারছি না।

দায়টা আমাদের। আবার আমাদের নয়ও। কারণ আমরা জন-সাধারণ। কাগজে-কলমে আমরা ক্ষমতার মালিক হ’তে পারি, আবার তা প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা যে আমাদের নেই তাও সেই কাগজে-কলমেই লেখা আছে। অর্থাৎ পাওয়ার অব এ্যাটর্নি আমরা সরকারের উপর দিয়ে রেখেছি। সেই হিসাবে দায়টা সরকারের। আমাদের দায়টা প্রশ্ন তোলার। সরকারকে আমরা যে দায়িত্ব দিয়েছি তারা তা পালন করছে কিনা তা নিয়ে। এই লেখাটা সেই প্রশ্ন তোলারই একটা উপায় মাত্র। আমি প্রশ্ন তুলছি সরকারের প্রতি। সরকারের ব্যর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে সরকার-প্রধান কী ব্যবস্থা নেন সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি। নিশ্চিত ভাবেই সড়ক-মন্ত্রণালয় দীর্ঘ সময় ধ’রে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযত ভাবে পালন করেনি। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক-ব্যবস্থাপনার আইনগুলো যুগোপোযোগীও করা হয়নি। যে আইনগুলো আছে তার যথেষ্ট প্রয়োগও করা হয়নি। সমন্বয়হীনতা যে একধরণের অযোগ্যতা তা বলতেই হবে। আমাদের সড়ক মন্ত্রণালয়ের সে অযোগ্যতার কমতি নেই। দেদারসে গাড়ি নিবন্ধন দিয়ে চ’লেছে মন্ত্রণালয়, অথচ প্রশিক্ষিত চালক তৈরী করা হ’চ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখেনি। এই অযোগ্যতার ক্ষমা থাকতে পারে না।

The Great Debaters (2007), আমার খুব প্রিয় একটা মুভি । সেটাতে একটা ডায়ালগ আছে। When the law itself is the criminal we have a duty to resist it. ‘আইন নিজেই যখন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যায় তখন তাকে প্রতিরোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হ’য়ে দাঁড়ায়।’ শিক্ষার্থীরা আমাকে সেটাই আবার শিখিয়ে দিলো। অসংখ্য ধন্যবাদ তাদেরকে। তবে নিজের জন্য হতাশার যা তা হলো, আমার এবং আমাদের অনেকের ভেতর থেকেই এই রেজিস্ট করার সক্ষমতাটা মরে গেছে অনেক দিন হলো। আমরা শুধু অপেক্ষা করি, কবে আসবে আগামী। জেনে গেছি, এই আমলাতন্ত্র এই রাজনীতি আমাদের শহরের রাস্তাগুলোতে আগামী আনবে না। আক্রোশ জাগে দিনেদিনে…

যাপিত জীবন

যাপিত জীবন – ৩৩

হয়তো নাগরিক হ’লে ভাবনার থেকে দুর্ভাবনাই বেশি ক’রে গ্রাস করে। কারণ নাগরিক জীবনে নিশ্চয়তার স্বপ্ন যতটা থাকে তার থেকে অনেক বেশি থাকে আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙ্ক্ষা অনেক কিছু অর্জনের, ম্যাটেরিয়ালিস্টিক আর ননম্যাটেরিয়ালিস্টিক উভয়ই। অথচ নাগরিক হিসেবে আমরা যে চার্টার লিখে রাখি তাতে সুযোগের সাম্যতার বিষয়টা বেশ ফুলিয়ে ফাপিয়ে লেখা। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে আমরা জানতে থাকি আমাদের গড়া ব্যবস্থাগুলো বড্ড প্রতিযোগিতামূলক। সবার জন্য সব কিছুর সুযোগ সেখানে নেই। তখনই যোগ্যতার প্রশ্ন চ’লে আসে আমাদের সামনে। যোগ্যতা তৈরীর কারখানা যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে সবার জন্য প্রবেশের সমান সুযোগ আবার নেই। হয়তো কাগজে কলমে আছে। অর্থাৎ অনুশাসনের বইয়ে। আর বাস্তবতা অনেকটাই অন্য রকম গল্পের পসরা নিয়ে হাজির হয়।

আমি, আমরা দেখি মূলত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাকরীর জন্য পথে নেমে আসছে; তাদের নানা দাবি দাওয়া। উদ্যোগতা আর ব্যবসায়ীরা ব’লছেন, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জানাশোনার মান সন্তোষজনক নয়। ব্যবসায়ীরা তাই তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কখনো ভারত, কখনো শ্রীলঙ্কার লোকজন খুঁজে আনছেন। পরিসংখ্যানও ব’লছে গেলো বছর ১০ বিলিয়ন মার্কিন-ডলারের বেশি অর্থ ভারতে রেমিটেন্স হিসেবে গিয়েছে [১][২]। আর আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস ক’রে আসা তরুণেরা কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। সুযোগের সাম্যতা আর যোগ্যতার মুখোমুখি সংঘর্ষ। জানি না কে জিতে আসবে শেষে।

তবে দৃষ্টিসীমায় যতটা দেখতে পারছি, তাতে বুঝি সব কিছু ব্যবসায়ীদের দখলে যাবে। সরকারও আজ বড্ড বেশি ব্যবসায়ী-বান্ধব। সে সারা পৃথিবীতেই। ভোক্তা-বান্ধব ব’লে বোধহয় কোনো শব্দবন্ধই নেই। অথচ ব্যবসায়ী আর কয়টা লোক? ভোক্তাই তো বেশি। রণদা প্রসাদ সাহা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, কিন্তু আমরা বাঙালিরা তাকে ব্যবসায়ী ব’লে মনে রেখেছি কমই। সমাজ হিতৈষী ব’লেই চিনেছি তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানিদের হাতে তাঁর এবং তাঁর ছেলের একসাথে নিহত হওয়ার এতগুলো বছর পরও আমাদের সেই চেনাটা একটুও পাল্টে যায়নি। লোকটা বেশ কিছু স্কুল কলেজ হাসপাতাল গড়েছিলেন ব’লেই হয়তো। আজকের দিনেও অনেকেই এসব গড়ছেন। দেশে আজ শতাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। কতগুলো বেসরকারী হাসপাতাল আর ক্লিনিং আছে তার হয়তো সরকারী পরিসংখ্যান থাকতে পারে নানা মন্ত্রনালয়ের খাতায়; অর্থ-মন্ত্রনালয়ের খাতায় তো অবশ্যই। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে উপকারে আসছে না তা নয়। তবু আমরা এদেরকে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ব’লেই জানছি বা ভাবছি। সরকারও হয়তো ভাবছে। তাই মাঝে মাঝেই ভ্যাট-ট্যাক্সের নানা প্রশ্ন শুনি।

ব্যবাসায়ীরা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে আজ খুব কমই সরকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। সেখানকার শিক্ষার মান যে কমে গিয়েছে বা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার কারিকুলাম যে আগানো হয়নি বা সেখানে ঠিক মতো ক্লাস হয়না – এমন তরো অভিযোগ কম নয়। আমাদের ব্যবসায়ীরা সেটা যে জানেন না তাও নয়। তারা তাদের ব্যবসার সুবিধার জন্য নিশ্চয় কোনো একটা ব্যবস্থা ক’রে নেন। সেটাই ব্যবসার প্রকৃতি। ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য মুনাফা উৎপাদন। অযোগ্য বা কম যোগ্যতার মানুষদেরকে নিয়োগ করেন ব্যবসায়ী শুধু মাত্র তখনই যখন তারা কিনা তাদের উত্তরাধিকারী। সব মিলিয়ে সাধারণ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস ক’রে আসা শিক্ষার্থীগুলোর জন্য কাজের বা চাকুরীর সুযোগ গিয়েছে ক’মে। ওরাই তাই ওদের মতো ক’রে দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হচ্ছে রাস্তায়।

আমাদের যে এতে দায় নেই তাও নয়। গত ৭/৮ বছর ধরেই পাবলিক পরীক্ষাতে প্রশ্ন ফাঁস হ’তে দেখেছি আমরা। প্রতিবাদ করেছি খুব কম লোকই। না-শিখে বা কম-শিখেও ভাল ফল পেতে দেখেছি আমরা বছরের পর বছর। এই ছেলেমেয়েরাই আজ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ ক’রে চাকরীর জন্য, বিশেষত বিসিএস ক্যাডারের চাকরীর জন্য, পথে পথে সময় কাটাচ্ছে। এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমার মথায় একটা কথাই বারবার আসে- অপচয়, ভয়াবহ অপচয়। কয়েক লক্ষ তরুণ এক-দুই হাজার চাকরীর জন্য তাদের জীবন থেকে গড়ে তিন থেকে চার বছর খরচ করছে। ব্যবসায়ীক বা সামাজিক সব হিসাবেই এই অপচয় যে ভয়ঙ্কর পরিণতি টেনে আনবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং আশংকাই বেশি।

অনিশ্চয়তার ভাবনা নিয়েই তাই এই নাগরিক জীবন যাপন। কিমবা নগরে যাপন করা জীবন।

তথ্যসূত্র:
১. http://www.dailyindustry.news/bangladesh-becomes-4th-largest-remittance-source-india/

২. https://cpd.org.bd/cpd-study-bangladesh-indian-remittance-source/

 

নগরী

নগরী ঢাকা – ২

ঢাকাতে বিভিন্ন সময়ে সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে বেশ কিছু আবাসিক এলাকা ডিভেলপ করা হয়েছে। যেমন ধানমন্ডি , গুলশান, নিকেতন , পল্লবী, বনশ্রী , বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বা বিভিন্ন ডিওএইচএস। সবগুলোই প্লট ভিত্তিক অর্গানাইজেশন। অর্থাৎ একটা বেসিক রোড নেটওয়ার্কের আওতায় কোনো এলাকাকে প্রথমেই ছোট ছোট ব্লকে ভাগ ক’রে নিয়ে তাতে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আকার এবং আয়তনের প্লট তৈরী করা হয়। তারপর সেই প্লটগুলোকে এক বা একাধিক মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়।

প্লট ভিত্তিক এই ‘এরিয়া ডিভেলপমেন্টের’ ধারণা আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। কারণ প্লট বুঝে পাওয়ার পর সেখানে ইচ্ছামাফিক বিল্ডিং বানিয়ে নেওয়া যায়। ‘ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮’ অনুযায়ী যদিও একাধিক প্লট একত্রিত করার সুযোগ আছে তবুও তেমনটা করতে খুব কমই দেখা যায়। ঢাকার বেশিরভাগ ভূমি-মালিক নিজ নিজ প্লটে আলাদা আলাদা বিল্ডিং নিজ উদ্যোগে অথবা বিভিন্ন ডিভেলপার প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বানিয়ে নেন। যদিও ২০০৮ এর রাজউকের বিধিমালা মেনে বিল্ডিং তৈরী করেন খুব কম লোক/ ডিভেলপার প্রতিষ্ঠান। তারপরও রাজউক আর নানা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান প্লটভিত্তিক একই ধরণের আরো প্রকল্প শুরু করছে এবং বাস্তবায়ন করছে। নতুন প্রকল্প শুরু করার আগে একই ধরণের পুরোনো প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বললেই চলে।

প্লটভিত্তিক প্রকল্পগুলো মূলত আবাসিক। হয়তো বড় কোনো প্রকল্পে কিছু অনাবাসিক বা অন্যান্য ব্যবহারের জন্য কিছু কিছু প্লট রাখা হচ্ছে। সেও আবাসিক প্লটগুলোকে সার্ভিস দেওয়ার কথা ভেবে নয়তো বিশেষ কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। সামগ্রিক নগর পরিকল্পনাকে মাথায় রেখে সেগুলো করা হচ্ছে ব’লে মনে হয় না।

আবাসিক ব্যবহারের জন্য সাধারণত ২.৫, ৩, ৫, ৭.৫, ১০ এবং ২০ কাঠার প্লট তৈরী করা হয়। প্লটগুলো কমপক্ষে ২৫ ফুট চওড়া রাস্তার সাথে সংযুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয় ২০০৪ এর বেসরকারী ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা মোতাবেক। এতে ক’রে ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোতে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরী হচ্ছে। যেমন –

১. বারবার ফুটপাথ ভেঙে যাচ্ছে। ৩০ থেকে ৭০ ফুট পরপর প্লটে ঢোকার জন্য গেইট বা ফটক বানাতে হচ্ছে। আর প্রতিটা ফটকের সামনে থেকে ভেঙে ফেলতে হচ্ছে ফুটপাথের ধারাবাহিকতা। যার ফলে প্লটে বসবাস করা মানুষগুলোর পক্ষেও ফুটপাথগুলো ব্যবহার করা সুবিধাজনক থাকছে না। আর প্লটগুলোর ধার ঘেষে হাটাহাটি না ক’রতে পারার জন্য দীর্ঘ সময় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই অপরিচিত থাকছেন। আবার হাঁটাহাটির স্বাভাবিক আগ্রহটাও নষ্ট হ’য়ে যাচ্ছে হাঁটাকে উপভোগ করতে না পারার জন্য।

২. ঠিক কতগুলো প্লট বা ফ্লাটের জন্য কী পরিমাণ জমি খেলার মাঠ, পার্ক বা খোলা জায়গা হিসেবে থাকা দরকার, ঢাকা আর অন্য বড় শহরগুলোর জন্য বা নিদেন পক্ষে বাংলাদেশের জন্য, তা নিয়ে বিশেষ ভাবনা-চিন্তা আমাদের হাউজিং কোডগুলোতে নেই। একটা বড় এলাকার জমির পরিমাণের উপর নির্ভর ক’রে মাঠ আর পার্কের ব্যবস্থা করাটা অযৌক্তিক। বরং মাঠের সংস্থানের জন্য মূল বিবেচনা হওয়া দরকার হাউজিঙের ধরণ এবং তার জনঘনত্ব। বাস্তবক্ষেত্রে যেটা হচ্ছে সেটা একধরণের প্রতারণাও। হয়তো হাউজিঙের লে-আউট পাস করিয়ে আনার জন্য একটা নকশা করা হয়, যে নকশাতে কিছু পরিমাণ জমি মাঠ বা পার্ক হিসেবে দেখানো হয়। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সেগুলোর অনেকগুলোই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে হাউজিংগুলোতে বাস করতে থাকা মানুষগুলোর জন্য খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকছে না যেখানে পরষ্পরের সাথে মেলামেশা করা যায়। এতে মানুষের স্বাভাবিক শেয়ারিঙের আকাঙ্ক্ষাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আবার মানুষের একটা প্রবণতা হ’লো সে সবাইকে সব কিছু বলে না। একজন মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে বেশ ভাবনা-চিন্তা ক’রে নির্বাচিত কিছু মানুষের কাছেই মাত্র। আর তাই এমন একটা পরিবেশ দরকার যেখানে এই মানুষগুলোকে খুঁজে নেওয়া যবে। দেশের প্লট-কেন্দ্রিক হাউজিংগুলোতে সেই সুযোগ একেবারেই থাকছে না পর্যপ্ত মাঠ, পার্ক বা কমন-স্পেসের অভাবে।

৩. প্লটগুলো ছোট ছোট হওয়ায় তার সংখ্যাও বেশি হচ্ছে। আর প্রতিটা প্লটের জন্য আলাদা আলাদা ক’রে বিভিন্ন সার্ভিসের জন্য আবেদন ক’রতে সামগ্রিকভাবে বেশ বড় একটা সময় আর লোকবলের অপচয়ও হচ্ছে। আবার প্লটগুলোর মালিকেরা সবাই যে একই সাথে ভবন তৈরী করেন বা করতে পারেন তা নয়। ফলে নানা সময় বিভিন্ন সার্ভিস লাইনের সাথে প্লটগুলোর সংযোগ তৈরী করতে হওয়ায় পানি বা গ্যাসের লাইনের জন্য বারবার হাউজিঙের রাস্তায় কাটাকাটির দরকার পড়ছে। আমাদের সার্ভিস দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষ লোকবল আর পর্যাপ্ত অর্থবল দুইয়েরই কমতি আছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সমন্বয়েরও অভাব আছে। আর তাই একবার কাটাকাটি হ’লে সেই রাস্তা ঠিক হ’তে সময় লেগে যায় অনেক।
অথচ প্লটগুলো যদি বড় বড় ক’রে করা যেতো, ধরা যাক ৫ একর বা ১০ একর, তাহলে বারবার সার্ভিস লাইনের জন্য দৌড়াতেও হ’তো না, বারবার ক’রে রাস্তা কাটাকাটিও করতে হ’তো না। ফুটপাথ বারবার ভেঙে যাওয়ার যে ব্যাপারটা আগে বলা হলো সেটাও কমে আসতো।

৪. বেসরকারী হাউজিঙের কোড বা বিধি ব’লছে প্রতিটা প্লটের সামনে ন্যুনতম ২৫’ চওড়ার রাস্তা থাকতে হবে। এই পরিমাণ চাওড়া একটা রাস্তার সাথে যখন আমরা ৫৪’ বা ৭০’ গভীরতার প্লট বানাচ্ছি তখন ব্যবহৃত জমির অনুপাতে রাস্তার পরিমাণ বেশ বেড়ে যাচ্ছে। অমি অনেকগুলো হাউজিঙে গিয়ে দেখেছি এই ধরণের রাস্তাগুলোতে গাড়ি বা মানুষের ভিড় বেশ কমই থাকে। উত্তরা বা বসুন্ধরা এলাকার মূল রাস্তাগুলো বেশ ব্যস্ত হ’লেও প্লটগুলোর সামনের রাস্তাতে তেমন একটা ভিড় দেখা যায় কমই। এই রাস্তাগুলোকে যদি ৫ একর বা ১০ একরের হাউজিঙের অংশ ক’রে নেওয়া যেতো তাহলেও বেশ একটা সামাজিক-পরিসর গ’ড়ে উঠতো। আবার এমন ধরণের রোড-নেটওয়ার্কের জন্য অনেকগুলো নোডও তৈরী হচ্ছে। ফলে বাড়ছে ক্রসিঙের সংখ্যা, যা যানজট তৈরীর অন্যতম প্রধান কারণ।

৫. ছোট প্লটে সাধারণত বেশি উঁচু ভবন (৭তলার অধিক) বানানো বেশ কঠিন। আবার বড় প্লটের সাপেক্ষে ছোট প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে বাড়তি খরচ পড়ে যায়। যেমন ৩ কাঠা জমির একটা ৭ তলা ভবনে যার প্রতিতলাতে একটি ক’রে এ্যাপর্টমেন্ট বা মহল আছে তার জন্য ন্যুনতম একটি সিড়ি ও একটি লিফ্ট দরকার পড়ে। একই সংখ্যক সিড়ি আর লিফ্ট দিয়ে প্রতিতলায় অন্তত ৪ টি মহল আছে এমন ৭ তলা ভবনকে সার্ভিস দেওয়া যায় অনায়াসেই। ৩ কাঠার চারটি প্লটকে একত্রিত ক’রে ১২ কাঠার একটি প্লট বানানো গেলে একই পরিমাণ জমিতে একই সুবিধা সম্বলিত ২৪টি মহল নির্মাণ করা যাবে ৩টি সিড়ি আর ৩টি লিফ্ট কম বানিয়েও। অবশ্য চায়লে অধিক উপযোগীতার জন্য একটি লিফ্ট বেশি বানানো যায়। ৩টি সিড়ি আর ২/৩টি লিফ্টের জন্য যে জায়গা লাগে সেই পরিমাণ জায়গা জমিতে উন্মুক্ত রেখে দেওয়া যেতে পারে ভবনের ব্যবহারকারীদের খেলার মাঠ হিসেবে। সেখানে কিছু ফলের গাছও লাগানো যেতে পারে। বাড়তি পরিমাণ জমি উন্মুক্ত থাকার কারণে তা বৃষ্টির পানি শোষণের জন্যও অধিক উপযোগী হ’তো।
১০ তলার অধিক উঁচু বিল্ডিঙের জন্য যে ধরণের সেট-ব্যাক বিধিমতে দরকার হয় সেটা ছাড়লে ছোট প্লটের জন্য উঁচু ভবন বানানো আরো কঠিন হ’য়ে পড়ে। আবার ভবনের এরিয়া বেড়ে গেলে বেশি পরিমাণে পার্কিঙের জায়গা লাগে। যান্ত্রিক পার্কিং পাতালঘরে (বেইজমেন্ট) করাটাই নানা বিচারে ভাল আর সুবিধাজনকও। কিন্তু ছোট প্লটের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক পাতালঘর বানিয়ে নেওয়াটা বেশ কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও। বেশি পরিমাণ রিটেইনিং-দেয়াল (মাটি আটকে রাখার জন্য পাতালঘরের চারপাশে যে দেয়াল তৈরী করা হয়) দরকার পড়ে ছোট প্লটগুলোতে বেইজমেন্ট বা পাতালঘর তৈরীর জন্য। র‍্যাম্প ব্যবহার ক’রে পার্কিঙের জন্য পাতালঘর তৈরী করতে হ’লে প্লটের আকার ৭.৫ কাঠার কম হ’লে কার্যত কোনো সুবিধাই পাওয়া যায় না।

৬. প্রতিটা প্লটকে আলাদা করা আর সেগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বানাতে হচ্ছে সীমানা-দেয়াল। এই সীমানা-দেয়ালের বৃদ্ধিও কম শংকার নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খরচের পরিমাণও যায় বেড়ে। প্রয়োজন পড়ে অধিক সংখ্যক নিরাপত্তা-প্রহরী।

আবার বড় আকারের প্লটের সমন্বয়ে হাউজিং বা অন্য কোনো কমপ্লেক্স ক’রলে তার চারপাশে প্রাচীর তুলে দিতে হয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে। এই প্রাচীর পরবর্তীতে হ’য়ে দাড়ায় প্রস্রাব করার উপযুক্ত স্থান। বিভিন্ন সরকারী কলোনীগুলো থেকে আমাদের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের সামাজিক আচরণের পরিবর্তন না হ’লে নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাথ তৈরী করা তাই এক রকম অসম্ভব।