সাম্প্রতিক কয়লা সংক্রান্ত ভাবনা….

দিনাজপুরের কয়লা খনি থেকে কয়লা কি ভাবে তোলা যায় তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। আমি ডিটেইল খবর খুব একটা রাখি নাই এই ব্যাপারটার। তবে আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এসেছে গতকাল। সেটা হল এই কয়লার মালিক আসলে কে? সরকার নাকি খনি এলাকার জমির মালিকরা? কার আসলে মালিক হওয়ার কথা বা উচিত?

আমার ভাবনা হল খনির মালিকানা যদি জমির মালিকদের দিয়ে দেয়া হয় এবং খনিকে একটা কম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে কয়লা তোলা বেশ সহজ হয়ে যাবে। কারণ মানুষ আসলে জীবনে নিশ্চয়তা আর স্বচ্ছলতা চাই। কয়লা উত্তলনের নাম করে যদি ওই এলাকার মানুষদের নিজেদের জমি ছাড়তে বাধ্য করা হয় তা হলে সেটা হবে তাদের জীবনকে সবচেয়ে অনিশ্চিত করে ফেলা। ক্ষতিপূরণ করে বা কিছু টাকা দিয়ে রাষ্ট্র যদি তার দায়িত্ব শেষ করতে চাই সেটা পরিণামে খুব ভাল কিছু আনার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। যাহোক আমরা তো আর ঠিক কাল বা পরশু থেকেই কয়লা উত্তোলনে যাচ্ছি না। তাই আমরা ঐ এলাকার মানুষদেরকেই কয়লার খনিতে কিভাবে ব্যবহার করতে পারি তা নিয়ে কি ভাবতে শুরু করতে পারি না?

আমার মনে হয় আমরা খনি এলাকায় একটা সুমারি করে দেখতে পারি। খনিতে কাজ করার জন্য আমাদের কত জন লোক লাগবে? এলাকায় মোট কতজন লোক বসবাস করে? কি ভাবে এবং কত সময়ে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকদেরকে খনিতে কাজ করার উপযোগী করে তুলতে পারব? খনি এলাকা থেকে কিছু লোক কিন্তু আমাদেরকে সরাতেই হবে তা আমরা যে পদ্ধতিতেই কয়লা উত্তোলন করি না কেন। এই সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াটা খুব জটিল এবং সময় সাপেক্ষ। কারণ জমির সাথে সাথে এই মানুষদেরকে তাদের প্রফেশনও ছাড়তে হবে। আর তাতেই শুরু হয়ে যেতে পারে বিরাট একটা মানবিক তথা সামাজিক বিপর্যয়। এখন এই মানুষগুলোকে কয়লা উত্তোলন, পরিবহন, বিপনন এবং ব্যবহার সংক্রান্ত সমস্ত কাজে যত বেশি নিয়োজিত করা যাবে বিপর্যয়ের পরিমান তত কম হবে। কয়লার মালিকানা যদি জমির মালিকদের হাতে থাকে তা হলে কয়লা বিক্রি থেকে প্রাপ্ত টাকা কাজে লাগিয়ে এলাকার মানুষ নিজেদেরকে আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে না কি?

যে সুমারির কথা ভাবছিলাম, খনির কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় নিশ্চয় সেরকম একটা কিছু করা হয়েছে। সেটা কি সবার কাছে প্রকাশ করা যায়? আর উত্তোলনের সাথে সাথে ব্যবহারের ব্যাপারটা নিয়েও কি আমরা এর মধ্যে যথেষ্ট ভেবেছি?

(ভাবনা গুলো খুব অর্বাচিন হয়ে গেছে… প্রচুর পরিসংখ্যান জানা দরকার…. সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা গুলো নোট করে ফেলতে হবে…)

বয়েসী আমি….

প্রায় পৃথিবীর মত বয়েসী হয়ে ওঠা এই জীর্ণ আমি যেন এখনো যৌবনই না পাওয়া এই নগরের সাথে আর পেরে উঠি না…

দূর্নীতি, কি করা যায়…

দূর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান থেকে অব্যহতি নিয়েছেন আলোচিত অবসর নেয়া সামরিক কর্মকর্তাটি। ব্যক্তিগত ভাবে আমি সামরিক লোক দের উপর আস্থা রাখতে পারি না। তাদেরকে আমার মাথা মোটা আর সুযোগ সন্ধানী মনে হয়। যা হোক আমার মাথায় এই মুহূর্তে যেটা এসেছে সেটা হল… আমারা আসলে কি চাই দূর্নীতির ব্যাপারটাতে… আমরা আমাদের পুরোনো দূর্নীতি বাজদের বিচার চাই নাকি নতুন দূর্নীতিবাজ যেন তৈরী না হয় সেটা চাই… আমার ধারণা আমাদের রাস্ট্র খুব চিন্তা ভাবনা করেই দূর্নীতি শুরু করেছিল… স্বাধীনতা লাভের পর যখন বহু প্রতিষ্ঠান রাষ্টায়াত্বকরণ করা হয় তখন কিন্তু আমরা জানতাম না যে আমাদের এই রাষ্ট্র এই সব প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবে না। আমাদের একটা শিক্ষা হল তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্ররাই ভালো পরিচালক বা সংগঠক নয়। তাই আমাদেরকে ফিরতে হল সেই পুরোনো মতবাদেই। উদ্যোগতাই আসলে প্রকৃত এবং যোগ্য পরিচালক।

কিন্তু আমাদের দেশে ঐতিহাসিক ভাবেই অনেক দিন উদ্যোগতা তৈরীর প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। বন্ধ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া ট্রেডিং কম্পানি আর ইংল্যাণ্ডের রাণীর অধীনে থাকার সময়। বন্ধ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসনে থাকার সময়ও। এমন কি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক বছরও। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একটা দাবি ছিল। সেটা হলো উন্নয়ন। এবং দ্রুত উন্নয়ন। প্রশ্ন হলো, কি ধরণের উন্নয়ন। ভৌত ও অবকাঠামো উন্নয়নই বোধকরি মুখ্য ছিল। অথবা আত্মিক উন্নয়নের জন্য যে নায়কদের দরকার পড়ে তাদেরকে আমরা হারিয়ে ফেলায় আমাদের সামনে আসলে ভৌত উন্নয়ন ছাড়া কোন ধারণাও ছিল না। ফলত আমাদের প্রয়োজন পড়ল উদ্যোগতার। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের ভেতর হাতে গোনা দুই চার জন ছাড়া কেউ ছিল না। তো আমারা কি করব?

সেই মুহূর্তে সময়ের দাবি পূরণের জন্য বা আরো একটি বড় বিপর্যয় এড়ানোর জন্য আমাদের রাষ্ট্র, স্বচেতন ভাবেই কিনা জানি না, দ্রুত কিছু উদ্যোগতা তৈরীর ব্যবস্থা নিল। আমরা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে চাইলাম। চাইলাম কিছু শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়, বড় ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চাইলেই তো আর তা পাওয়া যায় না। কারণ কোন ইনিস্টিটিউশনে এদেরকে বানিয়ে নেয়া যায় না। এরা তৈরী হয় অনেকটা প্রাকৃতিক নির্বচনের মত । শুরু হলো একটা নির্বাচন প্রক্রিয়া।

ইতিহাস থেকে আমরা জানি…. প্রাথমিক পুজি যদি অনৈতিক উপায়ে জড়ো না হয় তা হলে তা হতে সময় লেগে যায় কয়েক শতাব্দি, তাও যদি প্রকৃতি এবং প্রতিবেশ সহায় হয়। আমি যত দূর জানি ইউরোপের বেশির ভাগ বড় বড় দেশ অন্যদের সম্পদ লুট করেছে দীর্ঘ একটা সময় ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠার পরিক্রমায় সে যে পরিমাণ অনৈতিক হয়ে উঠেছিল তার কিছু ছিটেফোটা ওদের ওয়েস্টার্ণ মুভি গুলো দেখলে টের পাওয়া যায়। জাপান তো ঐতিহাসিক ভাবে দশ্যুরাষ্ট্র ছিলই। সত্যি কথা বলতে আশির দশকের আগ পর্যন্ত দ্রুত পুজি তৈরীর আর যে দুটি উদাহরণ আমাদের সামনে ছিল তা হল সমাজতন্ত্র এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় এবং আমাদের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকায়, আমাদেরকে হাটতে হয়েছে অনৈতিকতার পথেই। শুনতে খারাপ লাগলেও এই অনৈতিকতার পথে হাটা মানুষরাই হল আমাদের প্রথম প্রজন্মের উদ্যোগতারা। সবাই যে- তা নয়। অনেকেই সেদিন রাষ্ট্রের দেয়া সুযোগ নিয়ে শুধুই ভোগ করেছে। কিন্তু সেটাই কি স্বাভাবিক নয়। উদ্যোগতা হওয়ার মত প্রতিভা কি সবার থাকে? তার উপর অনৈতিকদের মধ্যে কি তা আরো কিছু কম থাকার কথা নয়?

যাহোক অনেক নৈতিকতা বিষর্জন, রক্তক্ষরন, অবিশ্বাস, কলোহের পর আমরা কিছু উদ্যোগতা কিন্তু পেয়েছি আজ। এতে আমাদের কিছু চাওয়া পূরণ হলেও আমাদের কিন্তু পড়তে হয়েছে গভীর কিছু সামাজিক সমস্যায়। আমাদের আজকের চাওয়া , আমার মতে, এই সব সামাজিক সমস্যার একটা আশু সুরাহা।

আমাদের দূর্নীতি দমন কমিশন সেই উদ্দেশ্য পূরণের একটা ইনস্ট্রুমেন্ট। কি হওয়া উচিত এর কাজ ঠিক এই মুহূর্তে?

আমি মনে করি না দূর্নীতি দমন কমিশন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। যার কাজ হবে পুরোনো পাপীদের সনাক্ত করা এবং শাস্তি দেয়া, যা কিছু অন্যায় তা প্রতিরোধ করা। আমার মনে হয় দূদকের কাজের পরিধীর ব্যাপারটা অনেক চিন্তা ভাবনা করে নির্ধারণ করা উচিত।

দূদক তৈরীর কারণ আমি যেটা মনে করি সেটা হল… একটা পর্যায়ে আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের যে প্রাথমিক পুজি জমেছে তার নিরাপত্তা দরকার। আবার লগ্নিকৃত পুজি যেন সর্বোচ্চ উৎপাদন দিতে পারে তার জন্য দরকার সিস্টেম লস কমানো। আক্ষরিক ভাবে দরকার চুরি, ডাকাতি, ছিন্তাই, রাহাজানি কামানো, ঘুষ কমানো, দেন দরবারের সময় কমানো, কাস্টমসের ঝামেলা কমানো আর ফটকা বাজি কমানো। এটা করতে গিয়ে আমরা যদি আমাদের আগের সিদ্ধান্তের সুবিধাভোগীদেরকে হেনস্তা করতে শুরু করি তা হলে তা হবে আসলে আবার কয়েক দশক আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া।

একটি ধারাবাহিকতা না থাকলে শেষ পর্যন্ত কোন কিছুই আসলে অর্জিত হয় না, আপসোস ছাড়া। তাই এই মুহূর্তে থামানো দরকার চলমান দূর্নীতি গুলো… পুরোনো গুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকাটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ তাতে স্থবিরতা তৈরী হয়। মানুষ হিসাবে এবং রাষ্ট্র হিসাবে আমরা স্থবিরতা প্রত্যাশী হতে পারি না।

নাগরিক ভাল লাগা…

ঠিক যে কারণে লেগেছিল ভাল তাকে, আজও সে কারণগুলো বিদ্যমান। কিন্তু আজ আর তাকে ভাল লাগে না আমার। ঠিক যেন এই চারপাশের নগরীর মতো … যাকে আমি ভালোবাসতাম চৈতালী হাওয়ার মতো, আমার ছোটবেলার বন্ধু চড়ুই পাখির থেকেও বেশি।

মনে হয়… কোন কিছুই পাল্টায়নি, শুধু সময় ছাড়া। আসলেই কি পাল্টায়নি? আমার বয়স বেড়েছে। বেড়েছে শহরের পরিধি। বেড়েছে মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে প্রতিষ্ঠান। বেড়েছে টেলিফোন কম্পানি। বেড়েছে বহুজাতিক কম্পানির পুঁজি, প্রভাব। বেড়েছে ধান্দা। কালোবাজারি, ধর্ষণ, হত্যা, হানাহানি, আগুন- সবই বেড়েছে বিস্তর। আমার বয়সের তুলনায় সবকিছু একটু বেশিই বেড়েছে। ক্রসফায়ার বেড়েছে। অবিশ্বাস বেড়েছে। বস্তি বেড়েছে, বস্তিবাসী বেড়েছে, বেড়েছে বিল্ডিং, বিল্ডিঙের হাইট, রাস্তা, রাস্তার গাড়ী, ফ্লাইওভার, কম্পিউটার, কম্পিউটার ভাইরাস, পর্ণ সাইট, বেড়েছে মনিকা বেলুচির নগ্ন ছবির সংখ্যা, সেই সাথে আমার পরিতৃপ্তি। তারপরও আমি বা আমরা এখনো বাড়তে বাকি। অনেকেই এখনো অস্ত্রের মজুত বাড়াতে পারেনি। বাড়াতে পারেনি অন্যের তেল খনিতে প্রবেশাধিকার। প্রতিদিন আমার ক্রেডিটকার্ড শূণ্য হয়। আবার আমি জমা করি। ক্রেডিট বাড়াই। বাড়াই প্রেয়সীর সংখ্যা। জানি আমার ক্রেডিটকার্ড শূণ্য হলেই তারা চলে যাবে। আমিও মুক্তি পার তখন। মুক্তি পাওয়ার কষ্টে আমি বিহ্বল হব কিছুদিন। তারপর আবার এই বাড়বাড়ন্ত নগরের প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে আমার পদচারণা শুরু হবে। পুরোনো কোন প্রেয়সীর সাথে হয়তো দেখা হবে। হয়তো হবে না। হয়তো ভাল লাগবে। হয়তো লাগবে না।